চলে গেলেন বাসিত চাচা: যিনি ছিলেন ৯০ এর ঐতিহাসিক শিরিশতলার সাহসী উচ্চারণ

আমার লিখা আর্টিক্যাল লেখালেখি

বাসিত চাচা। আমাকে যে সব মানুষ উঁচু গলায় `নাম ধরে‘ ডাকেন, তাদের অন্যতম বাসিত চাচা। বাসিত চাচা আজ চলে গেছেন ওপারের সুন্দর জীবনে তার মালিকের কাছে। দোয়া করি হে মাবুদ! বাসিত চাচাকে আমরা ভালবাসতাম, তুমিও ভালবাসো। তুমি জান্নাতে তোমার কাছে তার জন্য একটি ঘর বানিয়ে দিও।

বাসিত চাচার নম্বরটা কিভাবে কিভাবে আমার সংগ্রহে এসে যায়। তার সাথে কথা বলার জন্য কল দেই। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য আর আমেরিকার মধ্যকার সময় জঠিলতার কারণে উনার সাথে আর কথা হয়ে উঠিনি। আমি মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসী হওয়ার পরে উনার সাথে সম্ভবত আর কোন কথা হয়নি।

মাত্র কয়েক মাস আগে বড়লেখার ঐতিহাসিক শিরিশতলায় অবস্থিত ৯০ এর দশকের চয়নিকা গার্মেন্টস-এর  আবুল ভাই (প্রাক্তণ থানা আমীর ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল মালিক ভাইয়ের ছোট ভাই)-এর সাথে ফেইসবুকে যুক্ত হওয়ার প্রেক্ষিতে বাসিত চাচাকে পেয়ে যাই। চাচাকে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠাই। চাচা সাথে সাথে গ্রহণ করেন। এখন চাচা আমাকে দেখেন আমি চাচাকে দেখি। সম্প্রতি তিনি আমার একটি পোষ্টে কমেন্টও করেছিলেন। সেই কমেন্টে পঞ্চাশোর্ধ এই মানুষটা এখনও যে উনার ভাতিজা রয়েছি, এমনটা মনে করিয়ে দিতে ভূলেননি।

 

কে এই বাসিত চাচা? তার সাথে আমার কি সম্পর্ক?

বাসিত চাচা আজ (৩রা মে ২০২১) আমেরিকাতে করোনা আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন হাসপাতালে থেকে ইনতিকাল করেন।

বাসিত চাচার বাড়ী বড়লেখা উপজেলার ৩নং নিজ বাহাদুরপুর ইউনিয়নের আদমপুর গ্রামে। তিনির বড় ভাই জনাব আজীজ মেম্বার সাহেব (তাবলীগের আজীজ মেম্বার নামে বেশী পরিচিত)এর সাথে আমার আব্বার ছিল বন্ধুত্ব, উনাদের বাড়ীতে যাওয়া আসা। সেই সুবাদে আমার আব্বাকে উনি ভাই ডাকতেন। আর ভাইয়ের ছেলে ‘আমি’ ভাতিজা।

বাসিত চাচা রেন্কে চাচা হলেও বয়সে চাচা নন। তার চেয়ে আমি মাত্র ১ ক্লাসের জুনিয়র। ঐতিহ্যবাহী সুজাউল আলিয়া মাদ্রাসায় আমি যখন দশম শ্রেণীতে পড়া শুরু করি, তখন তিনি দাখিল পরীক্ষার্থী।

বাসিত চাচা কৈশোর ও যৌবনে অত্যন্ত ডানপীটে ছিলেন। অত্যন্ত সাহসী ছিলেন। হক কথা বলার উস্তাদ ছিলেন। কোন বিষয়কে অত্যন্ত সুন্দর ভাবে গুছিয়ে বলার কারিগর ছিলেন। সকল ধরণের মানুষের সাথে সম্পর্ক রাখার যাদুকরী কৌশলী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। স্বাধীনচেতা এবং স্বাতন্ত্র বজায় রেখে চলা মানুষ ছিলেন।

বড়লেখার সুজাউল মাদ্রাসা, গাংকুল মাদ্রাসাতে একই সময়ে পড়ালেখা করার কারণে আমি ভাতিজা তার দীর্ঘ দিনের সংগী। বাসিত চাচা কামিল পড়ালেখা করেন সিলেট সরকারী আলিয়া মাদ্রাসাতে।

বাসিত চাচা ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাথী ছিলেন। কিন্তু বড়লেখায় থাকা কালীন তিনি কর্মী ছিলেন। কিন্তু তাকে বন্ধু সংগঠনের সবাই চিনতো শিবিরের নেতা হিসাবে। কারণ?

কারণ, তিনি ছিলেন অনলবর্ষী বক্তা, সাংঘাতিক সাহসী, মিছিলে সামনের কাতারে থাকা মানুষ।

বড়লেখা কলেজ প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে প্রথম ব্যাচের ছাত্র ছিলেন এখনকার জামায়াতে ইসলামী বড়লেখা উপজেলা আমীর জনাব এমাদুল ইসলাম। তিনি শাহবাজপুর স্কুল থেকে আসা একজন সাধারণ ছাত্র ছিলেন। সংগঠন খুবই একটা বুঝতেন না। এমতাবস্তায় সংগঠন বুঝে এমন মাদ্রাসা পড়ুয়া ২জন ভাইকে বড়লেখা কলেজে ভর্তি হতে নির্দেশ দেন তদানিন্তন উপজেলা শিবির সভাপতি জনাব হাফিজ নেজাম উদ্দিন আহমদ। তার মাঝে ১জন ছিলেন হাফিজ রমিজ ভাই আর আরেকজন ছিলেন আমাদের বাসিত চাচা। ভাগ্যের কি নির্মমতা নির্দেশদাতা আর আনুগত্যকারী কেউ আর আজ আমাদের মাঝে নেই। হাফেজ নিজাম, হাফিজ রমিজ এবং বাসিত চাচা-সকলের নামের পাশে মরহুম শব্দ ব্যবহার করা হবে।

বাসিত চাচা যখন সংগঠনের কাজ করতেন, তখন এখনকার মতো শান শওকত ছিলনা-এতো জনশক্তির বিশাল বহর ছিলনা। সেই সময়ে কর্মীরাই ছিলেন একেকটি প্রতিষ্ঠানের বড় বড় দায়িত্বশীল। বাসিত চাচাদের নেতৃত্বে বড়লেখা কলেজে ইসলামী আন্দোলনের বীজ বপন করা হয়েছিল। এ সব বীজ পাতা পল্লব শাখা প্রশাখায় রূপান্তরিত হয়ে আজ মহীরূপ ধারণ করেছে।

বাসিত চাচা কর্মী ছিলেন ঠিকই। কিন্তু সাথী হিসাবে পালনীয় সকল দায়িত্ব পালন করেছেন। সংগঠনের যে কোন কর্মসূচী বাস্তবায়নে সাহসীকাতার সাথে সামনে থেকেছেন। সুজাউল আলিয়া মাদ্রাসা থেকে গাংকুল মাদ্রাসায় চলে আসার জন্য তাকে নির্দেশ দেয়া হলে সাথে সাথে তা পালন করে গাংকুল মাদ্রাসায় ভর্তি হয়েছেন।

সেই বাসিত চাচা গ্রাম ছেড়ে যখন শহরে ফাঁড়ি জমিয়েছেন, তখন সিলেট শহরে গিয়ে তিনি ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাথী শপথ গ্রহণ করেন।

আমার গ্রাম চান্দগ্রামের হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক আব্দুল লতিফ বাবুল বাসিত চাচার সরাসরি ক্লাসমেট। আমাদের গ্রামে গোষ্ঠীতে আছে বাসিত চাচার নানাবিধ আত্মীয়তা। আর সেই সুবাদে চান্দগ্রামের সাথে উনার আছে একটি হৃদ্যতা। চান্দগ্রাম হাই স্কুল শুরুর দিকে উনি চান্দগ্রাম স্কুলের শিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।

আমরা যারা জুনিয়র তারা বড়লেখার ভবিষ্যত হিসাবে ২জন সিনিয়রকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতাম। আমরা ভাবতাম সময়ের আবর্তনে তারা যখন মুরব্বী হবেন, তখন জননেতা আব্দুল মান্নান ও জননেতা ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল মালিকের শুন্যস্থানে আমরা তাদেরকে বসাবো। তাদেরকে নিয়ে মার্কা দাড়িপাল্লা সহ চষে বেড়াবো বড়লেখার শহর থেকে গ্রাম। মানুষের মাঝে তাদেরকে দেখিয়ে সম্ভাবনার আশা জাগিয়ে তুলবো। তাদের দূ‘জনই আজ আমাদের মাঝে নাই। একজন শাহবাজপুরের মাওলানা আব্দুল হাই খাঁন-যিনি লন্ডনে ইনতিকাল করেন ক‘বছর আগে। আর আমাদের বাসিত চাচা-জনাব মাওলানা আব্দুল বাসিত। দু‘জনই চলে গেলেন আমাদের চেড়ে।

 

প্রতিটি মৃত্যুই আমাদের দরজায় কড়া নেড়ে যায়, বলে যায় তোমারও সময় আসছে। বাসিত চাচা বয়সে আমার খুব সিনিয়র নন। আমার অনেক অনেক জুনিয়ররাও চলে গেছেন। আমাকে অনেক আগেই চলে যাওয়ার কথা। বাসিত চাচার রোগটি আমারও হয়েছিল। আমিও স্বপরিবারে করোনা আক্রান্ত হয়েছিলাম। আমি ফিরে এলাম আর উনি চলে গেলেন।

 

হে আমার মালিক! বাসিত চাচাকে তুমি তোমার জান্নাতে ঠাই দিও। আমাদেরকে সেই জান্নাতের উপযোগী হওয়ার জন্য আমল করার সুযোগ দিও।

লেখাটি আপনার ভাল লাগলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published.