দারসুল কুরআনঃ সূরা আত-তাওবা ৩৮-৪২

আমার লিখা দারসুল কুরআন লেখালেখি

দারসে কুরআনঃ সূরা তাওবা ৩৮-৪২

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ مَا لَكُمْ إِذَا قِيلَ لَكُمُ انفِرُواْ فِي سَبِيلِ اللّهِ اثَّاقَلْتُمْ إِلَى الأَرْضِ أَرَضِيتُم بِالْحَيَاةِ الدُّنْيَا مِنَ الآخِرَةِ فَمَا مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا فِي الآخِرَةِ إِلاَّ قَلِيلٌ

৩৮. হে ঈমানদারগন! তোমাদের কি হলো, যখনই তোমাদের আল্লাহর পথে বের হতে বলা হলো, অমনি তোমরা মাটি কামড়ে পড়ে থাকলে? তোমরা কি আখেরাতের মোকাবেলায় দুনিয়ার জীবন পছন্দ করে নিয়েছো? যদি তাই হয়, তাহলে তোমরা মনে রেখো, দুনিয়ার জীবনের এসব সাজ-সরঞ্জাম আখেরাতে খুব সামান্য বলে প্রমাণিত হবে।

إِلاَّ تَنفِرُواْ يُعَذِّبْكُمْ عَذَاباً أَلِيماً وَيَسْتَبْدِلْ قَوْماً غَيْرَكُمْ وَلاَ تَضُرُّوهُ شَيْئاً وَاللّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ

৩৯. তোমরা যদি না বের হও, তাহলে আল্লাহ তোমাদের যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি দেবেন এবং তোমাদের জায়গায় আর একটি দলকে উঠাবেন, আর তোমরা আল্লাহর কোন ক্ষতি করতে পারবেনা। তিনি সব জিনিসের উপর শক্তিশালী।

إِلاَّ تَنصُرُوهُ فَقَدْ نَصَرَهُ اللّهُ إِذْ أَخْرَجَهُ الَّذِينَ كَفَرُواْ ثَانِيَ اثْنَيْنِ إِذْ هُمَا فِي الْغَارِ إِذْ يَقُولُ لِصَاحِبِهِ لاَ تَحْزَنْ إِنَّ اللّهَ مَعَنَا فَأَنزَلَ اللّهُ سَكِينَتَهُ عَلَيْهِ وَأَيَّدَهُ بِجُنُودٍ لَّمْ تَرَوْهَا وَجَعَلَ كَلِمَةَ الَّذِيْنَ كَفَرُواْ السُّفْلَى وَكَلِمَةُ اللّهِ هِيَ الْعُلْيَا وَاللّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ

৪০. তোমরা যদি নবীকে সাহায্য না করো, তাহলে কোন পরোয়া নেই। আল্লাহ তাকে এমন সময় সাহায্য করেছেন যখন কাফেরা তাকে বের করে দিয়েছিল, যখন সে ছিল মাত্র দুজনের দ্বিতীয় জন, যখন তারা দুজন গুহার মধ্যে ছিল, তখন সে তার সাথীকে বলছিল, “চিন্তিত হয়োনা, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেনসে সময় আল্লাহর নিজের পক্ষ থেকে তার উপর মানসিক প্রশান্তি নাযিল করেন এবং এমন সেনাদল পাঠিয়ে তাকে সাহায্য করেন, যা তোমরা দেখোনি এবং তিনি কাফেরদের বক্তব্যকে নীচু করে দেন। আর আল্লাহর কথা তো সমুন্নত আছেই। আল্লাহ পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়।

انْفِرُواْ خِفَافاً وَثِقَالاً وَجَاهِدُواْ بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنفُسِكُمْ فِي سَبِيلِ اللّهِ ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ

৪১. বের হও, হালকা কিংবা ভারী যাই হওনা কেন, এবং জিহাদ করো আল্লাহর পথে নিজের ধন-প্রাণ দিয়ে। এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয় যদি তোমরা জানতে।

لَوْ كَانَ عَرَضاً قَرِيباً وَسَفَراً قَاصِداً لاَّتَّبَعُوكَ وَلَـكِنْ بَعُدَتْ عَلَيْهِمُ الشُّقَّةُ وَسَيَحْلِفُونَ بِاللّهِ لَوِ اسْتَطَعْنَا لَخَرَجْنَا مَعَكُمْ يُهْلِكُونَ أَنفُسَهُمْ وَاللّهُ يَعْلَمُ إِنَّهُمْ لَكَاذِبُوْنَ

৪২. হে নবী! যদি সহজ লাভের সম্ভাবনা থাকতো এবং সফর হালকা হতো, তাহলে তারা নিশ্চয়ই তোমার পেছনে চলতে উদ্যত হতো। কিন্তু তাদের জন্য তো পথ বড়ই কঠিন হয়ে গেছে। এখন তারা আল্লাহর কসম খেয়ে বলবে, “যদি আমরা চলতে পারতাম তাহলে অবশ্যি তোমাদের সাথে চলতামতারা নিজেদেরকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। আল্লাহ ভালো করেই জানেন তারা মিথ্যাবাদী।

 

নামকরণঃ

    এই সূরার ২টি নাম

১.সূরা আত্-তাওবাঃ সূরার একটি স্থানে মুমিনদের গোনাহ মাফের কথা বলা হয়েছে, এজন্য তাওবা।

২.সূরা আল বারায়াতঃ সূরার শুরুতেই মুশরিকদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষনা দিয়ে সুরা শুরু হয়েছে, এজন্য বারাআত। বারাআত মানে সম্পর্কচ্ছেদ।

    এই সূরার একটি অন্যতম বৈশিষ্ট

           সূরার শুরুতে বিসমিল্লাহ নেই।

           মুফাস্সিরীনে কিরাম এটাকে কুরআনের বিশুদ্ধতা ও পরিবর্তন না হওয়ার দলীল হিসাবে পেশ করেছেন।

 

শানে নুযুলঃ

           এটি আদ্যোপান্ত একটি মাদানী সূরা, যাতে অনেক আহকাম বর্ণনা করা হয়েছে।

           বিশেষতঃ

** যাকাতের হুকুম এই সুরাতে বর্ণিত হয়েছে।

** আর জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহর কথা খোলে খোলে বর্ণনা করা হয়েছে।

           কুরআনে হাকীমের ধারাবাহিকতায় এটি কুরআনের ৯ম সূরা।

           এতে মোট ১২৯টি আয়াত আর ১৬টি রুকু রয়েছে।

    এই সূরার ৩টি ভাষণের সমষ্টি-

১. প্রথম ভাষণঃ (শুরু থেকে তেলাওয়াতকৃত অংশের আগ পর্যন্ত) নাযিল হয়েছে সব শেষে। ৯ম হিজরীর  যিলকদ মাসে।

২. দ্বিতীয় ভাষণঃ (৬ থেকে ৯ রুকুর শেষ পর্যন্ত) নাযিল হয়েছে ৯ম হিজরীর রজব মাসে বা তার কিছু আগে। যখন তাবুক যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে। এখানে মুমিনদের জিহাদের জন্য উদ্বোদ্ধ করা হয়েছে। আর মুনাফিক আর দূর্বল ঈমানদারদেরকে তিরষ্কার করা হয়েছে। আমরা সেই ভাষণের কিছু অংশ তেলাওয়াত করেছি।

৩. তৃতীয় ভাষণঃ (১০ থেকে শেষ পর্যন্ত) নাযিল হয়েছে তাবুক যুদ্ধ থেকে ফিরে আসার পর। যাতে মুনাফিকদের কার্যক্রমের বিরুদ্ধে হুশিয়ারী উচ্চারণ করা হয়েছে। তাবুক যুদ্ধে যারা অংশ নেয়নি, তাদের তিরস্কার ও ভর্ৎসনা করা হয়েছে। সাচ্ছা ঈমানদার যারা তাবুক যুদ্ধে অংশ নেননি, তাদের তিরস্কার ও ক্ষমা ঘোষনা করা হয়েছে।

 

ঐতিহাসিক পটভূমিঃ

  এই সূরার পটভমির শুরু হুদায়বিয়ার সন্ধি থেকে। যাকে কুরআনে বলা হয়েছে ফাতহুম মুবিন।

﴿إِنَّا فَتَحْنَا لَكَ فَتْحاً مُّبِيْناً﴾

 “হে নবী! আমি তোমাকে সুস্পষ্ট বিজয় দান করেছি।”(ফাতহঃ ০১)

  শত বিপদ আর মুসিতবত মোকাবেলা করে হুদায়বিয়া পর্যন্ত ইসলাম মাত্র ৬ বছরে আরবের এক তৃতীয়াংশ এলাকায় শুধু পৌছেনি, বরং একটি সুসংঘটিত ও সংঘবদ্ধ সমাজের ধর্ম, একটি পূর্ণাঙ্গ সভ্যতা ও সংস্কৃতি এবং একটি স্বয়ং সম্পূর্ণ স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে পরিণত হয়ে গিয়েছিল।

  হুদায়বিয়ার সন্ধির ফলে কুরাঈদের সাথে যুদ্ধ বন্ধ হয়ে গেল। দ্বীন ইসলামের প্রচার ও প্রসারের জন্য সৃষ্টি হলো চারদিকে নিরাপদ আর নির্ঝঞ্ঝাট পরিবেশ। এর পরিণতিতে দুইটি গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল মুসলমানরা অর্জন করতে সক্ষম হলো।

১. আরব বিজয়।

২. তাবুক অভিযান।

আরব বিজয়ঃ

ক. মক্কা বিজয়ঃ

হোদায়বিয়ার সন্ধির মাধ্যমে ইসলামী আন্দোলনের দাওয়াত সম্প্রসারণ ও সাংগঠনিক মজবুতি সুযোগ সৃষ্টি হয়। এর ফলে মাত্র ২ বছরে ইসলামের প্রভাব এত বাড়ে, এর শক্তি এতই পরাক্রান্ত ও প্রতাপশালী হয়ে উঠে যে, পুরাতন জাহেলিয়াত ইসলামের মোকাবেলায় অসহায় আর শক্তিহীন হয়ে পড়ে।

অসহায় কুরাইশদের উৎসাহী কিছু লোক পরাজয় আসন্ন দেখে তারা নিজেরাই সন্ধি ভংগ করে। সন্ধির বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে একটি চড়ান্ত যুদ্ধ করতে তারা চাচ্ছিল।

নবী সা. তাদেরকে গুছিয়ে উঠার সুযোগ না দিয়ে সন্ধি ভংগের দায়ে ৮ম হিজরীর রমযান মাসে আকস্মিক মক্কা আক্রমন করে দখল করে নেন। বিনা রক্তপাতে মক্কা বিজয় সংঘটিত হয়।

খ. হোনায়েনঃ

  মক্কা বিজয়ের পর পুরাতন জাহেলী শক্তি হোনায়েনে মরণ কামড় দেয়। বেশ কতিপয় জাহেলিয়াতপন্থী গোত্র তাদের পূর্ণ শক্তির সমাবেশ ঘটায়। আর এর মাধ্যমে তারা মক্কা বিজয়ের সুফল প্রাপ্তি ও পূর্ণতা অর্জনের পথে বাঁধা হয়ে দাড়ায়। মক্কা বিজয়ের পর সারা আরবে শুরু হয়েছিল সংস্কার বিল্পব। আর সেই বিপ্লব ষোলকলায় পূর্ণ হয়ে এগিয়ে চলছিল পূর্ণতার পথে। সেই পূর্ণতার পথে তারা বাঁধার সৃষ্টি করে। কিন্তু তাদের সে চেষ্টাও ব্যর্থ হয়। হোনায়নে তাদের পরাজয়ের মাধ্যমে আরবের নেতৃত্বে কারা দেবে সে ভাগ্যের ফায়সালাও হয়ে যায়। ফায়সালা হয়ে যায় যে, আরব বিশ্ব এখন দারুল ইসলাম হিসাবে ঠিকে থাকবে।

  হোনায়েনের যুদ্ধের ১বছরের মধ্যে আরবের বেশীর ভাগ লোক ইসলাম গ্রহণ করে। আর যারা ইসলাম কবুল করেনি, তারা বিচ্ছিন্ন ভাবে আরবের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে।

  রোম সা¤্রাজ্যের সীমান্তবর্তী এলাকায় নবী সা. ৩০ হাজার সৈন্যের বিশাল বাহিনী হাজির হন। রোমীয়রা মুসলমানদের মুখোমুখী হবার সাহস পায়নি, তাই পিছু হঠে। আর এতে করে তাদের যে দূর্বলতা প্রকাশ পায়, তাতে নবী সা. এবং তার দ্বীনের অপ্রতিরোধ্য ও অজেয় ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।

  এর ধারাবাহিকতায় তাবুক যুদ্ধ থেকে ফিরে আসার সাথে সাথে আরবের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় ৭০ এর মতো প্রতিনিধি দল মদীনায় আসে । ইসলাম গ্রহণ করে, নবী সা. এর নেতৃত্বের আনুগত্য স্বীকার করে।

  কুরআনে যে কথাটা বলা হয়েছে এই ভাবেঃ

﴿ إِذَا جَاء نَصْرُ اللَّهِ وَالْفَتْحُ﴾﴿وَرَأَيْتَ النَّاسَ يَدْخُلُوْنَ فِيْ دِيْنِ اللَّهِ أَفْوَاجاً﴾

যখন আল্লাহর সাহায্য এসে গেলো ও বিজয় লাভ হলো এবং তুমি দেখলে লোকেরা দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করছে।

 

তাবুক অভিযানঃ

  তাবুকের এই অভিযান পরিচালিত হয়েছিল রোম সামাজ্যের মোকাবেলায়।

  রোম সামাজ্যের সাথে সংঘর্ষের শুরু সেই মক্কা বিজয়েরও আগে।

  হুদায়বিয়ার সন্ধির মাধ্যমে প্রাপ্ত সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নবী সা. আরবের বিভিন্ন স্থানে দাওয়াতী গ্রæপ পাঠিয়ে ছিলেন। দাওয়াতী গ্রæপের সাথে ছিল নবী সা. এর পক্ষ থেকে দাওয়াতী চিঠি।

  সিরিয়া সীমান্তবর্তী গোত্র গুলো ছিল বেশীর ভাগ খৃষ্টান এবং রোম সাম্রাজ্যের প্রভাবাধীন।

  যাতুত তালাহ নামক স্থানে ঐ সব দাওয়াতী গ্রæপের ১৫জন সদস্যকে হত্যা করা হয়। কেবল মাত্র গ্রæপ লিডার কাব বিন উমাইর গিফারী রা. প্রাণে বেঁচে ফিরে আসেন।

  বুসরার গবর্ণর শুরাহবিল ইবনে আমর, যে ছিল খৃষ্টান ও রোম স¤্রাট কাইসারের অনুগত। তার কাছে নবী সা. এর প্রতিনিধি হারিছ বিন উমাইর দাওয়াত নামা নিয়ে হাজির হলে সে তাকে হত্যা করে।

  সিরিয়া সীমান্ত মুসলমানদের জন্য নিরাপদ করা, ভবিষ্যতে যাতে লোকেরা মুসলমানদের দূর্বল মনে না করে এবং মুসলমানদের উপর জুলুম ও বাড়াবাড়ি করার সাহস না করে সেই উদ্দেশ্যে ৮ হিজরীর শুরুর দিকে নবী সা. ৩হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী সিরিয়া সীমান্তে পাঠান।

  মাআন নামক স্থানে পৌছে মুসলমান বাহিনী জানতে পারলো ২টি খরবঃ

১.   শুরাহবীল ইবনে আমর ১লাখ সৈন্যের বিশাল বাহিনী নিয়ে মুসলামদের মোকাবেলা করতে আসছে।

২.   রোমের কাইসার হিমস নামক স্থানে সশরীরে উপস্থিতি। সে তার ভাই থিয়েডরের নেতৃত্বে আরো ১লাখ সৈন্যের বাহিনী রওয়ানা হয়ে গেছে।

  এসব আতংক জনক খবর পাওয়ার পরও মুসলমানদের ৩হাজারের বাহিনী কোন পরওয়া না করে সামনে অগ্রসর হয়।

  মুতা নামক স্থানে শুরাহবিলের বাহিনীর সাথে প্রচন্ড যুদ্ধ হয়। ৩৩জন কাফের-এর মৃত্যু হয় বনাম ১জন মুসলমান শাহাদাত বরণ করেন।

  মুসলমানরা চ্যাপ্টা হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু সারা আরব বিশ্ব বিস্ময়ের সাথে দেখলো এত শক্তি সত্তে¡ও কাফেররা বিজয়ী হতে পারলো না।

  এই বিজয়ের প্রভাব যে কাজ করলো তাহলো, সিরিয়া ও তার নিকটবর্তী এলাকার আধা স্বাধীন আরব গোত্র এমনকি ইরাকের নিকটবর্তী এলাকায় বসবাস কারী পারস্য প্রভাবাধীন নজদী গোত্রের লোকেরা পর্যন্ত ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে হাজার হাজার লোক ইসলাম গ্রহণ করলো।

  এই সময় রোম সাম্রাজ্যের আরবীয় সৈন্য দলের একজন সেনাপতি ইসলাম কবুল করেন, যার নাম ছিল ফারওয়া ইবনে আমর আল জুযামীতিনি তার ঈমানের কে অকাট্য প্রমাণ পেশ করেন, যা দেখে আশপাশের এলাকার লোক হতচকিত হয়ে পড়ে। আর তাহলো-

 “ফারওয়ান ইসলাম গ্রহণের খবর যখন কাইসার শুনলেন, তখন তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে আসলেন দরবারে। তাকে দুইটি জিনিসের প্রস্তাব দিয়ে একটি গ্রহণের সুযোগ দেয়া হলো।

১. ইসলাম ত্যাগ করো, তাহলে মুক্তি এবং পূর্ব পদে বহাল।

২. মুসলমান থেকো, কিন্তু এর ফলে মৃত্যুদন্ড।

তিনি অত্যন্ত ধীর স্থির ভাবে ইসলামকেই নির্বাচিত করলেন এবং শাহাদাত বরণ করলেন।

  ফারওয়ানের শাহাদাত কাইসারকে চিন্থায় ফেলে দিল। তিনি তার সাম্রাজ্যের বিরোদ্ধে এক ভয়াবহ হুমকি উপলব্দি করলেন-যা আরবের মাটি থেকে তার সাম্রাজ্যের দিকে ক্রমশ এগিয়ে আসছে।

  পরের বছর কাইসার সিরিয়া সীমান্তে সামরিক প্রস্তুতি শুরু করেন, উদ্দেশ্য মুসলমানদের মুতা যুদ্ধের শাস্তি প্রদান। আর তার অধীনে আরবের বিভিন্ন সরদাররা সৈন্য সমাবেশ ঘটায়।

  নবী সা. এ খবর পাওয়ার পর দেরী না করে কাইসারের বিশাল শক্তির সাথে মোকাবেলার সিদ্ধান্ত নেন। কারণ এহেন পরিস্থিতি সামান্য দূর্বলতা প্রদর্শন মানে এতদিনের মেহনত আর পরিশ্রম বরবাদ হয়ে যাওয়া।

  তখনকার পরিস্থিতিটা ছিল এমন, যদি সামান্য দূর্বলতা দেখা যায়, তাহলে-

১. হোনায়েনে আরবের ক্ষয় হওয়ার পথে ও চরম মুমুর্ষ অবস্থার জাহেলিয়াতের বুকে যে শেষ আঘাত আনা হয়েছিল, তারা আবার মাথা ছাড়া দিয়ে উঠবে।

২. মদীনায় মুনাফেকরা তলে তলে গাস্সানের খৃষ্টান বাদশা আর কাইসারের সাথে গোপন যোগাযোগ করে, আর তাদের দূষ্কর্মের অফিস হিসাবে মসজিদে দ্বিরারনির্মাণ করেছিল, তারা মুসলমানদের পিঠে ছুরি বসিয়ে দিন।

৩. সামনে কাইসারের আক্রমণ। যে ইরানীদের পরাজিত করার মাধ্যমে দূর দূরান্ত পর্যন্ত ছিল অত্যন্ত প্রতাপশালী।

  এসব কারণে বর্তমান পর্যন্ত বিজয়ী ইসলাম আকস্মাত পরাজিত হয়ে যেতে পারতো। বিধায় নবী সা এটাকে সত্যের দাওয়াতের জন্য জীবন-মৃত্যুর ফায়সালা কার সময় মনে করে প্রস্তুতির সাধারণ ঘোষনা দিলেন।

  তখনকার সময়ে সমস্যা যা ছিল-

১. চরম দূর্ভিক্ষ।

২. আবহাওয়া প্রচন্ড গরম।

৩. ফসল পাকার সময় কাছে।

৪. সওয়ারী ও সাজ-সরঞ্জামের ব্যবস্থা করা ছিল কঠিন।

৫. অর্থের অভাব ছিল প্রকট।

৬. দুনিয়ার দুইটি বৃহৎ পরাশক্তির মোকাবেলা।

  নবী সা. এর যুদ্ধ যাত্রার নিয়ম ছিলঃ

o   কোথায় যাবেন তা কাউকে বলতেন না,

o   কার সাথে মোকাবেলা করতে হবে, তা কাউকে জানাতেন না।

o   যেখানে যাবার কথা সেই পথে না গিয়ে বাঁকা পথে যেতেন।

কিন্তু এই অভিযানে তিনি কোন গোপনীয়তা অবলম্বন না করে পরিষ্কার বলে দিলেন যে, রোমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, যেতে হবে সিরিয়ার দিকে।

  সেই সময়কার পরিস্থিতির নাজুকতা-যা সবাই অনুভব করছিল।

১. মুশরিকঃ প্রাচীন জাহেলিয়াত প্রেমিকরা যারা তখনো বেঁচে ছিল, তাদের জন্য এটা ছিল আশার আলো। তারা ইসলাম আর  রোম সংঘাত কোন দিকে যায় তার দিকে অধীর আগ্রহে দৃষ্টি নিবন্ধ করে রেখেছিল।

২. মুনাফিকঃ মুনাফেকরা এর পিছনে সকল প্রচেষ্টা নিয়োজিত করে, মসজিদে দ্বিরার বানায়, আর অপেক্ষা করে সিরিয়াতে মুসলমানদের ভাগ্য বিপর্যয় হইবা মাত্র দেশের ভিতর গোমরাহী আর অশান্তির আগুন জ্বালিয়ে দেবে। এজন্য এই অভিযান ব্যর্থ করার জন্য সম্ভাব্য সকল কৌশল তারা গ্রহণ করলো।

৩. মুসলমানঃ মুসলমানেরা অনুভব করছিলেন যে, ২২বছর থেকে তারা যে প্রাণান্তকর সংগ্রাম চালিয়ে আসছেন, এখন তার চড়ান্ত ফায়সালার সময়। সাহস দেখাতে পারলে সারা দুনিয়ার জন্য এ আন্দোলনের দোয়ার খোলে যাবে, আর না পারলে খোদ আরব দেশেই পাততাড়ি গুটাতে হবে

  মুসলমানরা পরিস্থিতি অনুভব করে চরম উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। আর্থিক ভাবে সবাই সর্বোচ্চ ত্যাগ প্রদর্শণ করেন।

  আবু বকর, উমর, উসমান, আব্দুর রাহমান বিন আউফ, মজদুর সাহাবীরা, নারীরা সীমাহীন আর্থিক ত্যাগের উত্তম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেন।

  ৯ম হিজরীর রজব মাসে নবী সা. ৩০ হাজার মুজাহিদ বাহিনী নিয়ে রওয়ানা হন সিরিয়ার পথে। সাথে ১০ হাজার সাওয়ার। এক উটে পালাক্রমে কয়েকজন। গ্রীষ্মের প্রচন্ডতা, পানির স্বল্পতা।

  মুসলমানরা দৃঢ় সংকল্পবদ্ধতার পরিচয় দেন।

  তাবুক পৌছে জানা যায় কাইসার তার সেনা বাহিনীকে সম্মুখ যুদ্ধে নিয়ে আসার সাহস করতে পারেনি, তাই সীমান্ত থেকে সরিয়ে নিয়ে গেছে। সীমান্তে কোন দুশমন নেই। যুদ্ধেরও প্রয়োজন নেই।

  উল্লেখ্য যে,

কাইসারের প্রস্তুতি শেষ হবার আগেই রাসূল সা. সেখানে পৌছে যান। মুতার যুদ্ধের স্মৃতি তার চোখের সামনে, সাথে নবী সা. এর সরাসরি নেতৃত্ব, আবার সৈন্য সংখ্যা ৩ হাজারের পরিবর্তে ৩০ হাজার। বিধায় তার ২লাখ সৈন্য নিয়েও মুকাবিলার সাহস ছিল না।

  বিনা রক্তপাতে অভিযান সফল হওয়ায় নৈতিক বিজয় লাভ হলো। নবী সা. এটাকে যথেষ্ট মনে করলেন।

  রাসূল সা. এ বিজয় থেকে রাজনৈতিক ও সামরিক ফায়দা নেয়াকে অগ্রাধিকার দিলেন।

  তাবুকে ২০দিন অবস্থান করে পার্শবর্তী রাজ্য সমূহ যা রোম সাম্রাজ্যের অধীন ছিল, তাদেরকে ইসলামী সাম্রাজ্যের অধীন করে করদ রাজ্যে পরিণত করলেন। আর এর মাধ্যমে ইসলামী সাম্রাজ্যের সীমা রোম সাম্রাজ্যের সীমা পর্যন্ত পৌছে যায়।

 

তাবুক পরবর্তী ঘটনাঃ

  তাবুক যুদ্ধ হতে ফিরে এসে নবী সা. প্রথম যে কাজটা করলেন, তা হলো মসজিদে দ্বিরার ভেঙ্গে ফেলার নির্দেশ দিলেন।

  এর পর সাচ্ছা মুমিনদের মধ্যে যারা তাবুকের অভিযানে শামীল হতে পারেননি, তাদের বিষয়ে হাত দিলেন নবী সা.। কারণ, ইসলাম এখন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে, ইসলাম নেতৃত্ব দেবে সারা বিশ্বময়। তাই ঘরের মধ্যে দূর্বলতা  না রাখা। তাদের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতের জন্য দৃঢ় কন্ঠে জানিয়ে দেয়া হলো যে, আল্লাহর কালেমা বুুলন্দ করার সংগ্রাম, কাফের আর মুসলমানের সংঘাতই হচ্ছে মুমিনের ঈমানের দাবী যাচাই করার আসল মানদন্ড। এই সংঘর্ষে যে ব্যক্তি ইসলামের জন্য ধন-প্রাণ, সময় ও শ্রম ব্যয় করতে ইতস্তত করবে, তার ঈমান নির্ভরযোগ্য হবেনা।

এ প্রসংগে কাব বিন মালিকের ঘটনাঃ

  নবী সা. তাবুক থেকে মদীনায় ফিরে আসলে যারা যুদ্ধে যেতে পারেননি, তারা ওজর পেশ করার জন্য হাজির হলো। যাদের মাঝে ৮০ জনেরও বেশী মুনাফিক ছিল। রাসূল সা. তাদের মিথ্যা ওজর শুনছিলেন এবং মেনে নিচ্ছিলেন।

  এ পর্যায়ে আসলো ৩জন মুমিনের পালা, পরিষ্কার ভাবে নিজেদের দোষ স্বীকার করলেন। আর রাসূল তাদের ৩জনের ব্যাপারে ফায়সালা মুলতবি রাখলেন। যাদের সম্পর্কে কুরআনে বলা হয়েছেঃ

﴿وَعَلَى الثَّلاَثَةِ الَّذِينَ خُلِّفُواْ حَتَّى إِذَا ضَاقَتْ عَلَيْهِمُ الأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ وَضَاقَتْ عَلَيْهِمْ أَنفُسُهُمْ وَظَنُّواْ أَن لاَّ مَلْجَأَ مِنَ اللّهِ إِلاَّ إِلَيْهِ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ لِيَتُوبُواْ إِنَّ اللّهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ﴾

আর যে ৩জনের ব্যাপার মুলতবি করে দেয়া হয়েছিল, তাদেরকে তিনি মাফ করে দিয়েছেন। পৃথিবী তার সমগ্র ব্যাপকতা সত্তে¡ও যখন তাদের জন্য সংকির্ণ হয়ে গেল, তাদের নিজেরদের প্রাণও তাদের জন্য বোঝা হয়ে দাড়ালো এবং তারা জেনে নিল যে, আল্লাহর হাত থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর নিজের রহমতের আশ্রয় ছাড়া আর কোন আশ্রয় স্থল নেই। তখন আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের দিকে ফিরলেন যাতে তারা তাঁর দিকে ফিরে আসে। অবশ্যই আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল ও করুনাময়।” (আত তাওবাঃ ১১৮)

  এই ৩জনের ব্যাপারে সাধারণ ঘোষনা প্রদান করা হলো যে, আল্লাহর নির্দেশ না আসা পর্যন্ত তাদের সাথে কোন ধরনের সামাজিক সম্পর্ক রাখা যাবেনা।

  এই তিনজন সাহাবী ছিলেনঃ

১. কাব ইবনে মালিক।

২. হিলাল ইবনে উমাইয়াহ।

৩. মুরারাহ ইবনে রুবাই।

  এই তিনজন সাহাবী ছিলেন সাচ্চা মুমিন। তাদের আন্তরিকতার ব্যাপারে তাদের পূর্বের তৎপরতাই পরিস্কার করে দেয়। যেমনঃ ৩জন সাহাবী ওহুদ, খন্দক, হুনাইন সহ অনেক যুদ্ধে রাসূল সা. এর সাথী ছিলেন। আর হিলাল বিন উমাইয়াহ ও মুরারাহ ইবনে রুবাই বদরের যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। বিধায় তাদের ঈমানের সত্যতা ছিল সব রকমের সন্দেহের উর্ধে।

  এ তিন জনের অতীত ফাইল খুবই ভাল। এ প্লাস অথবা গোল্ডেন এ প্লাস। এত ত্যাগী হওয়া সত্তে¡ও নাজুক সময়ে গাফলতির পরিচয় দিলেন, তখন তাদের পাকড়াও করা হয়েছিল।

  নবী সা. তাবুক থেকে ফিরে এসে মুসলমানদের কড়া নির্দেশ দিলেন যে, এদের সাথে সালাম করতে পারবে না। এমনকি ৪০ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর তাদের স্ত্রীদের থেকেও আলাদা হয়ে বসবাসের অর্ডার করা হলো। অবশেষে ৫০তম দিবসে তাদের তাওবা কবুল করা হলো এবং আয়াত নাযিল হলো।

ঘটনার বিবরণ কাব বিন মালিকের মুখেঃ

  কাব বিন মালিকের মুখে। যিনি বৃদ্ধ বয়সে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। তার পুত্র আব্দুল্লাহর কাছে তিনি বর্ণনা করেছেন।

  তাবুকের যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য যখন ঘোষনা দেয়া হলো, সবাই প্রস্তুতি নিচ্ছিল। আমিও মনে মনে চিন্থা করলাম প্রস্তুুতি নেবো।

  আমাকে কেন জানি অলসতায় পেয়ে বসলো। মনে মনে বলতাম-এত তাড়াহুড়া কিসের, রওয়ানা হওয়ার সময় যখন আসবে, তখন ঠিকই প্রস্তুত হয়ে যাবো। তৈরী হতে আর কতক্ষণ লাগে।

  আমি প্রস্তুতিতে পিছিয়ে পড়লাম। একদিন সেনাবাহিনী রওয়ানা হয়ে গেল। আমি ভাবলাম, অসুবিধা নাই-আমি দুদিন পর তাদের সাথে যোগ দিব। তারা চলে গেল। আমাকে অলসতা পেয়ে বসলো। সময় চলে গেল। আমি যেতে পারলাম না।

  আমি মদীনায় থেকে গেলাম। মদীনায় যখন হাটতাম তখন আমার চোখে শুধু তাদেরই পড়তো, যারা হয়তো মুনাফিক, নয়তো দূর্বল ও অক্ষম ব্যক্তি। যাদেরকে আল্লাহ অব্যাহতি দিয়েছেন।

  তাবুক থেকে ফিরে এসে নবী সা. নিয়ম মতো মসজিদে দূরাকাত নফল নামায পড়েলেন। এবং লোকদের সাথে সাক্ষাত করতে বসলেন।

  মুনাফিকরা, যাদের সংখ্যা ৮০ জনের চেয়েও বেশী ছিল, তারা এসে লম্বা লম্বা কসম খেয়ে তারা তাদের ওজর পেশ করতে লাগলো। তাদের সকলের ওজর ছিল বানোয়াট ও সাজানো। রাসূল সা. তাদের লোক দেখানো সব ওজর মেনে নিলেন। তাদের অন্তরের ব্যাপার আল্লাহর উপর ছেড়ে দিয়ে বললেন আল্লাহ তোমাদের মাফ করুন।

  কাব বিন মালিক বলছেন, এর পর আসলো আমার পালা। আমি সামনে গিয়ে সালাম দিলাম। রাসূল সা. আমার দিকে চেয়ে মুচকি হাসলেন, বললেন-আসুন! আপনাকে কিসে আটকে রেখেছিল?

  আমি বললামঃ আল্লাহর কসম, যদি আমি কোন দুনিয়াদারের সামনে হাজির হতাম, তাহলে কোন না কোন কথা বানিয়ে তাকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করতো। আর বানিয়ে কথা বলার কৌশল আমিও জানি।

  আমার দৃঢ় বিশ্বাস, যদি কোন মিথ্যা ওজর উপস্থাপন করে আমি আপনাকে সন্তুষ্ট করেও নেই, তাহলে আল্লাহ নিশ্চয়ই আপনাকে আমার প্রতি আবার নারাজ করে দেবেন। আর আমি যদি সত্য বলি, আর আপনি নারাজ হয়েও যান, আশা রাখি আল্লাহ আমার জন্য ক্ষমার কোন পথ তৈরী করে দেবেন।

  আসলে পেশ করার মতো কোন ওজর আমার নেই। আমি যুদ্ধে যাওয়ার জন্য পুরোপুরি সক্ষম ছিলাম।

  রাসূল সা. বললেন এ ব্যক্তি সত্য কথা বলছে। ঠিক আছে, চলে যাও এবং আল্লাহর ফায়সালার অপকেষা করতে থাকো।

  আমি উঠে গিয়ে আমার গোত্রের লোকদের মাঝে বসলাম। সবাই আমার পিছনে লাগলো, তিরস্কার করলো এই বলে যে, কেন তুমি মিথ্যা ওজর পেশ করলেনা।

  তাদের কথা শুনে রাসূলের কাছে গিয়ে কিছু বানোয়াট ওজর পেশ করতে আগ্রহ সৃষিট হলো। কিন্তু যখন শুনলাম মুরারাহ ইবনে রুবাই আর হেলাল ইবনে উমাইয়া আমার মতো সত্য কথা বলেছে, তখন আমার কথার উপর অটল থাকলাম।

বয়কটঃ

  এর পর নবী সা. হুকুম জারি করলেন, আমাদের ৩জনের সাথে কেউ কথা বলতে পারবেনা।

  অন্য ২জন ঘরের মধ্যে বসে রইল।

  আমি বাহিরে বের হতাম, জামায়াতে নামায পড়তাম, বাজারে ঘোরাফেরা করতাম।

  কেউ আমার সাথে কথা বলতো না। মনে হতো দেশটা বদলে গেছে। আমি এখানে এক অপরিচিত আগন্তুক। কেউ আমাকে চেনেনা, জানোন।

  মসজিদে নামাযে গিয়ে রাসূল সা. কে সালাম করতাম। সালামের জবাবে তাঁর ঠোঁট নড়ে উঠছে কিনা তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতাম। কিন্তু অপেক্ষাই সার হতো।

  রাসূল সা. এর নজর আমার উপর কিভাবে পড়ছে দেখার জন্য আড় চোখে তাকাতাম। অবস্থা ছিল এই যে, আমি যতক্ষণ নামায পড়তাম, ততক্ষণ তিনি আমারদিকে তাকিয়ে থাকতেন। আমি যখন নামায শেষ করতাম, সাথে সাথে চোখ সরিয়ে নিতেন।

  একদিন আমার চাচাত ভাই ও বন্ধু আবু কাতাদার নিকট গেলাম। তাকে সালাম দিলাম। তিনি আমার সালামে জবাব দিলেন না।

  আমি বললামঃ হে আবু কাতাদাহ! আমি তোমাকে আল্লাহ কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করছি,আমি কি আল্লাহ ও তার রাসূলকে ভালবাসি না?

  সে কোন জবাব দিলনা। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম। সে নিরব রইল। তৃতীয় বার জিজ্ঞেস করলাম। সেতখন শুধু বললো, আল্লাহ ও তার রাসূলই ভাল জানেন।

  আমার চোখে পানি এস গেল। আমি তার থেকে চলে গেলাম।

কাফেরদের লোভনীয় প্রস্তাবঃ

  একদিন বাজারে যাচ্ছিলাম। সিরিয়ার নবতী বংশের এক লোকের সাথে দেখা। সে গাস্সান রাজারএকটি চিঠি আমকে দিল। আমি চিঠিটি পড়লাম। যাতে লিখা রয়েছে আমরা শুনেছি, তোমার নেতা তোমার উপর উৎপীড়ন করছে। তুমি কোন নগন্য ব্যক্তি নও। তোমাকে ধ্বংস হতে দেয়া যায় না। আমাদের কাছে চলে এসো। আমরা তোমাকে মর্যাদা দান করবো।

  আমি ভাবলাম এতো আরেক আপদ। আমি সাথে সাথে চিঠি খানা চুলোর আগুনে ফেলে দিলাম।

৪০দিন পরঃ

  এভাবে ৪০দিন কেটে গেল।

  রাসূল সা. এর নিকট থেকে দূত আরো কঠোর নির্দেশ নিয়ে এলো।

  নিজের স্ত্রী থেকে আলাদা হয়ে যাও।

  আমি জিজ্ঞেস করলামঃ তাকে কি তালাক দিয়ে দেবো? জবাব এলো, না তালাক নয়। শুধু আলাদা থাকে। আমি আমার স্ত্রীকে তার বাপের বাড়ী পাঠিয়ে দিলাম। আল্লাহ সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বললাম।

৫০তম দিবসেঃ

  ৫০তম দিবসে ঘরের ছাদে বসেছিলাম।

  নিজের জীবনের প্রতি ধিক্কার জাগছিল।

  হঠাত এক ব্যক্তি চেঁচিয়ে উঠলোঃ কাব ইবনে মালিক, তোমাকে অভিনন্দন।

  একথা শুনেই আমি সেজদায় নত হয়ে গেলাম। আমি নিশ্চিত হয়ে গেলাম, আমার ক্ষমার ঘোষনা জারি হয়ে গেছে।

  লোকেরা দলে দলে ছুটে আসতে লাগলো। সবাই আমাকে মোবারকবাদ দিচ্ছে। তারা বললো, আমার তাওবা কবুল হয়েছে।

অতঃপরঃ

  আমি সোজা মসজিদে নবীর দিকে গেলাম। দেখলাম নবী সা. এর চেহারা আনন্দে উজ্জল।

  আমি সালাম দিলাম। তিনি বললেন,তোমাকে মোবারকবাদ।  আজকের দিনটি তোমার জীবনের সর্বোত্তম দিন।

  আমি জিজ্ঞেস করলাম, এক্ষমা কি আপনার পক্ষ থেকে না আল্লাহর পক্ষ থেকে। তিনি বললেন, আল্লাহ পক্ষ থেকে আর শুনিয়ে দিলেন সেই আয়াত-

﴿وَعَلَى الثَّلاَثَةِ الَّذِينَ خُلِّفُواْ حَتَّى إِذَا ضَاقَتْ عَلَيْهِمُ الأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ وَضَاقَتْ عَلَيْهِمْ أَنفُسُهُمْ وَظَنُّواْ أَن لاَّ مَلْجَأَ مِنَ اللّهِ إِلاَّ إِلَيْهِ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ لِيَتُوبُواْ إِنَّ اللّهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ﴾

 “আর যে ৩জনের ব্যাপার মুলতবি করে দেয়া হয়েছিল, তাদেরকে তিনি মাফ করে দিয়েছেন। পৃথিবী তার সমগ্র ব্যাপকতা সত্তে¡ও যখন তাদের জন্য সংকির্ণ হয়ে গেল, তাদের নিজেরদের প্রাণও তাদের জন্য বোঝা হয়ে দাড়ালো এবং তারা জেনে নিল যে, আল্লাহর হাত থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর নিজের রহমতের আশ্রয় ছাড়া আর কোন আশ্রয় স্থল নেই। তখন আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের দিকে ফিরলেন যাতে তারা তাঁর দিকে ফিরে আসে। অবশ্যই আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল ও করুনাময়।” (আত তাওবাঃ ১১৮)

  আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল। আমার সমস্ত ধন-সম্পদ আল্লাহর পথে সাদাকাহ করে দিতে চাই। এটা আমার তাওবার অংশ বিশেষ।

  রাসূল সা. বললেন, কিছু রেখে দাও, এটা তোমার জন্য ভাল।

  রাসূলের কথা অনুযাী আমার খয়বরের সম্পত্তিটা রেখে বাকী সব সাদাকাহ করে দিলাম।

  আল্লাহর কাছে অঙ্গীকার করলাম, যে সত্য কথা বলার কারণে আল্লাহ আমাকে মাফ করে দিয়েছেন, সেই সত্যের উপর সারা জীবন প্রতিষ্ঠিত থাকবো।

  কাজেই আজ পর্যন্ত আমি জেনে বুঝে যথার্থ সত্য ও প্রকৃত ঘটনা বিরোধী কোন কথা বলিনি। আশা আল্লাহ আগামীতেও আমাকে বাঁচাবেন।

তাবুকের অভিযানে যে সুদূর প্রসারী ফায়দা হলো। তাহলোঃ

১.  আরবদের যারা আরবদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতো, তারা রোমানদের মোকাবেলায় ইসলামের সহযোগী হয়ে গেল।

২.  ইসলাম সমগ্র আরবে নিজের নিয়ন্ত্রন ও বাঁধন মজবুত করে নিল।

৩.  এতদিন যারা মুশরিকদের সাহায্য করছিল মুসলমানদের দলে থেকে সেই সব মুনাফিকদের কোমর ভেঙে গেল। ফলে তারা হতাশ হয়ে ইসলামের কোলে আশ্রয় নিল।

৪.  এর পর একটি নাম মাত্র গোষ্ঠী শিরক ও জাহেলী কার্যক্রমে অবিচল থাকলো।

 

আলোচনার ভূমিকাঃ

  রাসূল তাওহীদের দাওয়াত দিয়েছেন

  সেই সময়ে মক্কার মানুষ আল্লাহ চিনতো নামায চিনতো, রোযা চিনতো

  সেই সময়ে ছিল শিরক মিশ্রিত তাওহীদ

  সেই সময়ে আখেরাত সম্পর্কে মানুষ ছিল গাফেল

  ইসমাঈল . এর পর এলাকায় আর কোন নবী আসেনিনি

  মানুষের মাঝে উল্লেখযোগ্য একটি সংখ্যা হানাফী ছিল। হানাফী মানে ইব্রাহীম আ.কে তারা তাদের অনুসরণনীয় অনুকরণীয় হিসাবে মানতো। আর ইব্রাহীম আ. সম্পর্কে আল্লাহ কুরআনে বলেছেন: إِنَّ إِبْرَاهِيمَ كَانَ أُمَّةً قَانِتًا لِّلَّهِ حَنِيفًا وَلَمْ يَكُ مِنَ الْمُشْرِكِينَ প্রকৃতপক্ষে ইবরাহীম নিজেই ছিল একটি পরিপূর্ণ উম্মত,  আল্লাহর হুকুমের অনুগত এবং একনিষ্ঠ৷ সে কখনো মুশরিক ছিল না৷ (আন নাহল: ১২০)

  সেই সময়ে নেতৃত্ব চার ভাগে বিভক্ত ছিলআবদে মনাফের সন্তানদের মাঝে

. বনু হাশেম

. বনু মুত্তালিব

. বনু আবদে শামস বা উমাইয়া

. বনু নওফেল

§ মসজিদে হারামের রক্ষণাবেক্ষন হাজীদের খেদমতবনু হাশেম/বনু মুত্তালিব

§ ব্যবসা, রাজনীতি, যুদ্ধ, শিক্ষাবনু আবদে শামস বনু নওফেল

  এই ক্ষমতাটা ভোগ করতো কুরাইশের নেতৃত্বরা সাধারণ জনগনের কোন বক্তব্য ছিল না

  রাসূল সা. গোত্রীয় ভাগাভাগির এই ক্ষমতা প্রথাকে নিশ্চিহ্ন করে একটি সেন্ট্রাল সিসটেমের অধীনে সমাজ রাষ্ট্র পরিচালনার আহবান জানালে

  সততা, সত্যবাদীতা আর আমানদারীতে নজিরবিহীন চরিত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে সর্বস্তরে সামাজিক নেতৃত্বের যোগ্যতার স্বীকৃতি এবং হাজারে আসওয়াদ সমস্যার রক্তপাতহীন সমাধানে বলিষ্ট ভমিকা পালনের মাধ্যমে নেতৃত্বের জন্য গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ দিলেন। তখন নবীর প্রতি নাযিল হলো-﴿اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِيْ خَلَقَ﴾

পড় তোমার রবের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন।

  নবী সা. চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লেন (অথচ ইকরা-এর দাবী ছিল ময়দানে ঝাপিয়ে পড়া, তাই) আল্লাহ নাযিল করলেন-

﴿يَا أَيُّهَا الْمُدَّثِّرُ﴾﴿قُمْ فَأَنْذِرْ﴾﴿وَرَبَّكَ فَكَبِّرْ﴾

হে বস্র মুড়ি দিয়ে শয়নকারী। উঠো এবং সাবধান করে দাও। তোমার রবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করো।

  রাসূল সা. এর আহবানকৃত সেই ব্যবস্থার একমাত্র অধিপতিلا إله إلا الله وأن محمد رسول الله

  আর সেই ব্যবস্থা একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থাযেখানে ধর্ম, সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, যুদ্ধ, সন্ধি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সব অন্তর্ভূক্ত

  আল্লাহর এ নির্দেশে দাওয়াতের মিশন শুরু। নিজ আত্মীয় কর্তৃক বাঁধার স্বীকার।

  আবু জাহাল আর আবু সুফিয়ানের গোত্র তখন দেখলো যে, তাদের ক্ষমতা চলে যাচ্ছে তাই তারা তার বিরুধীতা শুরু করলো রাসূল সা. সাধারণ মানুষকে সাথে নিয়ে সমাজ পরিবর্তনের ঢাক দিলেন

  পাগল, কবি, যাদুকর ইত্যাদি নানান উপনামের উপহাসের শিকার।

  শারিরিক ও মানসিক শাস্তির সাথে সাথে অর্থনৈকি অবরোধের শিকার।

  তায়েফের বুকে সমাজের প্রতাপশালীদের লেলিয়ে দেয়া উশৃংখল মানুষের পাতরাঘাতে রক্তাক্ত হলেন।

  শত বাঁধা আর প্রতিবন্ধকতা মাড়িয়ে একটি সুখী সমৃদ্ধশালী ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে, শোষনহীন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে দিনরাত অবিরত প্রচেষ্ঠা, একদল আল্লাহভীরু সৎ ও যোগ্য লোক তৈরীর জন্য বিরামহীন সংগ্রাম।

  মদীনা নামক একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের গোড়া পত্তনের লক্ষ্যে ইয়াসরিব বাসী মানুষের সাথে কটনৈতিক যোগাযোগ, দ্বিপাক্ষিক চক্তি ও বাইয়াত। যাকে ইতিহাসে বাইয়াতে আক্বাবাহ বলা হয়।

  সর্বশেষ হত্যার ষড়যন্ত্র।

  কাফেরদের সকল ষড়যন্ত্র নস্যাত করে হযরত আবু বকরকে সাথে নিয়ে চোখের পানি ফেলতে ফেলতে মদীনায় হিজরত।

  যারা সাথী হলো, তাদেরকে নিয়ে তিনি হিজরত করলেন

  রাসূল সা. এর সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলন, নতুন সমাজ গঠনের আন্দোলন, নতুন জাতি গঠনের আন্দোলন সেই আন্দোলনের নাম ছিল ইসলামী আন্দোলন

  রাসূল সা. আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রামের এই কাজ ৫টা কাজের মাধ্যমে সম্পন্ন করেনঃ

. দাওয়াত ইলাল্লাহ।

. শাহাদাত আলান নাস।

. ইকামাতে দ্বীন।

. আমল বিল মারূফ।

. নাহী আনিল মুনকার।

  মদীনায় মদীনা সনদের মাধ্যমে একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট প্রতিষ্ঠা।

  বদরের প্রান্তরে সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য নির্ণয়কারী ঐতিহাসিক যুদ্ধ। যে যুদ্ধে আল্লাহ ফেরেশতা দিয়ে সাহায্য করেছেন-সূরা আলে ইমরানঃ ১২৩

﴿وَلَقَدْ نَصَرَكُمُ اللّهُ بِبَدْرٍ وَأَنتُمْ أَذِلَّةٌ فَاتَّقُواْ اللّهَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ ﴾

“এর আগে তোমরা অনেক দুর্বল ছিলে৷ কাজেই আল্লাহর না শোকরী করা থেকে তোমাদের দূরে থাকা উচিত, আশা করা যায় এবার তোমরা শোকর গুজার হবে

  সেই যুদ্ধে সাহাবায়ে কিরামদের মানসিক অবস্থা কেমন ছিল, তার উপলব্দি করা যায় বদর যুদ্ধের প্রক্ষালে সাহাবায়ে কিরামের মতামত গ্রহণ কালে। হযরত মিকদাদ রা. তার মতামত পেশ করতে গিয়ে বলেছিলেনঃ

يا رسول الله لا نقول كما قالت بنو إسرائيل ﴿إذهب أنت وربك فقاتلا إنا ههنا قاعدون﴾ ولكن إذهب أنت وربك فقاتلا إنا معكما من المقاتلين.

“ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা বলবো না এমন ভাবে, যেমন বলেছিল বনি ঈসরাঈল (আপনি ও আপনার বর যান, যুদ্ধ করুন। আমরা এখানে বসে থাকলাম), বরং আমরা বলবোঃ আপনি ও আপনার বর যান, যুদ্ধ করুন। অবশ্যই আমরা আপনাদের সাথে যুদ্ধে শরীক থাকবো।”

  ওহুদের প্রান্তরের মক্কার কাফেরদের মোকাবেলা। পরদিন মক্কার কাফেরদের পিছু দাওয়া।

  খন্দকে অনেক অনেক দলের সম্মিলিত প্রচেষ্ঠার মোকাবেলা।

  মক্কার কাফেরদের সাথে হুদায়বিয়ায় সন্ধি চক্তি স্বাক্ষর করে ইতিহাসে রাজনৈতিক প্রজ্ঞার এক জলন্ত উদাহরণ হয়ে থাকলেন।

  মদীনায় একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কাজ শুরু করলেন সেই রাষ্ট্র ঠিকিয়ে রাখার জন্য যুদ্ধ করলেন সেই রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে মক্কাকে দখল করলেন

  সেই সময়ের কথা রাসূল সা. মদীনাবাসীকে যুদ্ধের প্রস্তুতিতি নিতে বললেন যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল কালেকশন শুরু হলো সাহাবায়ে কিরামরা দিল উজাড় করে আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করার উদ্দেশ্যে দান করলেন

  তাবুকের অভিযান তাবুকের দিকে যাত্রা শুরু হবে কঠিন পরীক্ষা কারণ এই সময় দারিদ্র পীড়িত মানুষের একমাত্র সম্বল খেজুর কাটার মৌসুম খেজুর পেকে এলো বলে কথা কিছু দিনের মধ্যেই কাটতে হবে না কাটা হলে খেজুর পচে গলে নিঃশেষ হয়ে যাবে

  এই অবস্থায় একদল সাচ্ছা ঈমানদার আর বিরাট সংখ্যক মুনাফেক রাসূল সা. এর তাবুক অভিযানকে নিয়ে সমালোচনা শুরু করলেন ৩জন সাহাবী যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করতে পারলেন না

  সেই সময়ে যারা যুদ্ধে যেতে গড়িমসি করলো, তাদেরকে জানিয়ে দেয়া হলো যে, যুদ্ধ কেবল দেশ রক্ষার বা আত্মরক্ষার সংগ্রাম নয় যুদ্ধ কেবল মদীনার সীমাকে এবং ক্ষমতাকে বৃদ্ধির লড়াই নয় বরং এটা ঈমানী দায়িত্ব আল্লাহর নির্দেশ

ব্যাখ্যা

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ مَا لَكُمْ إِذَا قِيْلَ لَكُمُ انفِرُواْ فِي سَبِيلِ اللّهِ اثَّاقَلْتُمْ إِلَى الأَرْضِ أَرَضِيتُمْ بِالْحَيَاةِ الدُّنْيَا مِنَ الآخِرَةِ فَمَا مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا فِي الآخِرَةِ إِلاَّ قَلِيلٌ

৩৮. হে ঈমানদারগন! তোমাদের কি হলো, যখনই তোমাদের আল্লাহর পথে বের হতে বলা হলো, অমনি তোমরা মাটি কামড়ে পড়ে থাকলে? তোমরা কি আখেরাতের মোকাবেলায় দুনিয়ার জীবন পছন্দ করে নিয়েছো? যদি তাই হয়, তাহলে তোমরা মনে রেখো, দুনিয়ার জীবনের এসব সাজ-সরঞ্জাম আখেরাতে খুব সামান্য বলে প্রমাণিত হবে।

  পূর্বেই বলা হয়েছেঃ রাসূলের জীবনের পুরো কার্যক্রমের নাম হলো ইসলামী আন্দোলন বা জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ। আর তার জীবনের সেই আন্দোলনকে আমরা ৫টি কাজের মাধ্যমে দেখতে পাই।

১. দাওয়াত ইলাল্লাহ।                      

২. শাহাদাত আলান নাস।     

৩. ইক্বামাতে দ্বীন।

৪. ক্বিতাল ফী সাবীলিল্লাহ।    

৫. আমর বিল মারুফ ওয়া নাহী আনিল মুনকার।

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ مَا لَكُمْ إِذَا قِيلَ لَكُمُ انفِرُواْ فِي سَبِيلِ اللّهِ اثَّاقَلْتُمْ إِلَى الأَرْضِ  হে ঈমানদারগন! তোমাদের কি হলো, যখনই তোমাদের আল্লাহর পথে বের হতে বলা হলো, অমনি তোমরা মাটি কামড়ে পড়ে থাকলে?

  কুরআনে إذا قيل لكم  এসেছে মাত্র ২বার। আর إذا قيل لكم   এসেছে ১৪বার।

  কুরআনে ما لكم এসেছে ৩৫ বার।

  কুরআনে সূরা নিসায় বলা হয়েছে-আয়াতঃ ৭৫

﴿وَمَا لَكُمْ لاَ تُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللّهِ وَالْمُسْتَضْعَفِينَ مِنَ الرِّجَالِ وَالنِّسَاء وَالْوِلْدَانِ الَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا أَخْرِجْنَا مِنْ هَـذِهِ الْقَرْيَةِ الظَّالِمِ أَهْلُهَا وَاجْعَل لَّنَا مِن لَّدُنكَ وَلِيّاً وَاجْعَل لَّنَا مِن لَّدُنكَ نَصِيراً﴾

 তোমাদের কি হলো, তোমরা আল্লাহর পথে অসহায় নরনারী ও শিশুদের জন্য লড়বে না, যারা দূর্বলতার কারণে নির্যাতিত হচ্ছে? তারা ফরিয়াদ করছে, হে আমাদের মালিক! এই জনপদ থেকে আমাদের বের করে নিয়ে যাও, যার অধিবাসীরা জালেম এবং তোমার পক্ষ থেকে আমাদের কোন বন্ধ, অভিভাবক ও সাহায্যকারী তৈরী করে দাও।

  কুরআনে সূরা নিসায় এর পরের আয়াতেই বলা হয়েছে-আয়াতঃ ৭৬

﴿الَّذِينَ آمَنُواْ يُقَاتِلُوْنَ فِي سَبِيْلِ اللّهِ وَالَّذِيْنَ كَفَرُواْ يُقَاتِلُوْنَ فِي سَبِيْلِ الطَّاغُوْتِ فَقَاتِلُواْ أَوْلِيَاءَ الشَّيْطَانِ إِنَّ كَيْدَ الشَّيْطَانِ كَانَ ضَعِيفاً﴾

মানেঃ লড়াই না করা, লাড়াইয়ের কথা শুনলে মাটি আকড়ে ধরা, দূর্বলের আর্তনাদ শুনে কানে আংগুল টুকিয়ে বসে থাকা এটা ঈমানদারের কাজ নয়। আপনি লড়াই করুন আর না করুন-লড়াই আপনার চলছেই। অতএব শয়তানের পথে লড়াই করছেন এটা যাতে প্রমাণ না হয় সেজন্য আপনাকে লড়াই করতেই হবে আল্লাহর পথে যারা ঈমানদার,তারা লড়াই করে আল্লাহর পথে আর যারা কাফের তারা লড়াই করে তাগুতের পথে। অতএব,তোমরা লড়াই করো, শয়তানের বন্ধুদের  বিরুদ্ধে (তাগুতী শক্তির সাহায্যকারীদের সাথে, আর জেনে রাখো, শয়তানের হাবভাব যতই শক্তিশালী মনে হোক না কেন) শয়তানের ষড়যন্ত্র হয়ে থাকে অত্যন্ত দূর্বল।

  কুরআনে সূরা আল হাদীদ বলা হয়েছে-আয়াতঃ ১০-১২

﴿وَمَا لَكُمْ أَلَّا تُنْفِقُوْا فِي سَبِيْلِ اللَّهِ وَلِلَّهِ مِيْرَاثُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ لَا يَسْتَوِيْ مِنكُمْ مَّنْ أَنفَقَ مِنْ قَبْلِ الْفَتْحِ وَقَاتَلَ أُوْلَئِكَ أَعْظَمُ دَرَجَةً مِّنَ الَّذِيْنَ أَنفَقُوْا مِن بَعْد وَقَاتَلُوْا وَكُلّاً وَعَدَ اللَّهُ الْحُسْنَى وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ﴾﴿مَن ذَا الَّذِيْ يُقْرِضُ اللَّهَ قَرْضاً حَسَناً فَيُضَاعِفَهُ لَهُ وَلَهُ أَجْرٌ كَرِيمٌ ﴾﴿يَوْمَ تَرَى الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ يَسْعَى نُورُهُم بَيْنَ أَيْدِيْهِمْ وَبِأَيْمَانِهِمْ بُشْرَاكُمُ الْيَوْمَ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا ذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيْمُ﴾

১০. কি ব্যাপার যে, তোমরা আল্লাহর পথে খরচ করছো না, অথচ যমীন ও আসমানের উত্তরাধিকার তাঁরই। তোমাদের মধ্যে যারা বিজয়ের পরে অর্থ ব্যয় করবে ও জিহাদ করবে তারা কখনো সে সব লোকদের সমকক্ষ হতে পারে না, যারা বিজয়ের পূর্বে ব্যয় করেছে ও জিহাদ করেছে। বিজয়ের পরে ব্যয়কারী ও জিহাদকারীদের তুলনায় তাদের মর্যদা অনেক বেশী। যদিও আল্লাহ উভয়কে ভাল প্রতিদানের প্রতিশ্রæতি দিয়েছেন। তোমরা যা করছো আল্লাহ সে সম্পর্কে অবহিত।

১১. এমন কেউ কি আছে যে আল্লাহকে ঋণ দিতে পারে? উত্তম ঋণ যাতে আল্লাহ তা কয়েকগুণ বৃদ্ধি করে ফেরত দেন। আর সেদিন তার জন্য রয়েছে সর্বোত্তম প্রতিদান।

১২. যেদিন তোমরা ঈমানদার নারী ও পুরুষদের দেখবে, তাদের নুরতাদের সামনে ও ডান দিকে দৌড়াচ্ছে। (তাদেরকে বলা হবে) আজ তোমাদের জন্য সুসংবাদ। জান্নাত  সমুহ থাকবে যার পাদদেশ দিয়ে ঝর্ণাধারা সমূহ প্রবাহিত হতে থাকবে। যেখানে তারা চিরকাল থাকবে। এটাই বড় সফলতা।

أَرَضِيتُم بِالْحَيَاةِ الدُّنْيَا مِنَ الآخِرَةِ তোমরা কি আখেরাতের মোকাবেলায় দুনিয়ার জীবন পছন্দ করে নিয়েছো?

  আল্লাহর রাস্তায় যখন যে ডাক দেয়া হয়, সে ডাকে সাড়া না দেয়া, মানে-কুরআনের কিছু মানা আর কিছু না মানা। এ সম্পর্কে সূরা বাকারার ৮৫ ও ৮৬নং আয়াতে আল্লাহ বলছেন-

﴿أَفَتُؤْمِنُوْنَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُوْنَ بِبَعْضٍ فَمَا جَزَاء مَن يَفْعَلُ ذَلِكَ مِنكُمْ إِلاَّ خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَى أَشَدِّ الْعَذَابِ وَمَا اللّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ ﴾﴿أُولَـئِكَ الَّذِينَ اشْتَرَوُاْ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا بِالآَخِرَةِ فَلاَ يُخَفَّفُ عَنْهُمُ الْعَذَابُ وَلاَ هُمْ يُنْصَرُوْنَ﴾

তাহলে কি তোমরা কিতাবের একটি অংশের উপর ঈমান আনছো এবং অন্য অংশের সাথে করছো কুফরী? তার পর তোমাদের মধ্য থেকে যারাই এমনটি করবে তাদের শাস্তি এ ছাড়া আর কি হতে পারে যে, দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছিত ও পর্যূদস্ত হবে এবং আখেরাতে তাদেরকে কঠিনতম শাস্তির দিকে ফিরিয়ে দেয়া হবে? তোমাদের কর্মকান্ড থেকে আল্লাহ বেখবর নন।

এই লোকেরাই আখেরাতে বিনিময়ে দুনিয়ার জীবন কিনে নিয়েছে। কাজেই তাদের শাস্তি কমানো হবে না এবং তারা কোন সাহায্যও পাবে না।

  যারা কিছু করতে পারেননি, তাদেরকে যারা ছোট করে দেখেন  (যেমন-জমির মালিক, প্লটের মালিক, ফ্লাটের মালিক, ডাইরেক্টর, শেয়ার হোল্ডার অথবা ভাল চাকুরীজীব-সেন্ট্রাল এসির নিচে ডিউটি) তাদের এই পথ কুফুরীর পথ। যেমন আল্লাহ সূরা বাকারাঃ ২১২ নং আয়াতে বলছেন-

﴿زُيِّنَ لِلَّذِينَ كَفَرُواْ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا وَيَسْخَرُونَ مِنَ الَّذِينَ آمَنُواْ وَالَّذِينَ اتَّقَواْ فَوْقَهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَاللّهُ يَرْزُقُ مَن يَشَاءُ بِغَيْرِ حِسَابٍ﴾

যারা কুফরীর পথ অবলম্বন করেছে তাদের জন্য দুনিয়ার জীবন বড়ই প্রিয় ও মনোমগ্ধকর করে সাজিয়ে দেয়া হয়েছে। এ ধরনের লোকেরা ঈমানের পথ অবলম্বণকারীদেরকে বিদ্রæপ করে। কিন্তু কিয়ামাতের দিন তাকওয়া অবলম্বন কারীরাই তাদের মোকাবেলায় উন্নত মর্যাদায় আসীন হবে। আর দুনিয়ার জীবিকার ক্ষেত্রে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা অপরিমিত দান করে থাকেন।

  যারা দুনিয়ার জীবনের তথাকথিত সফলতা অর্জন করতে পারেননি, তাদেরকে সান্তনা দিয়ে কুরআন বলছে। সূরা আত্ তাওবাঃ আয়াত-৫৫

﴿فَلاَ تُعْجِبْكَ أَمْوَالُهُمْ وَلاَ أَوْلاَدُهُمْ إِنَّمَا يُرِيدُ اللّهُ لِيُعَذِّبَهُمْ بِهَا فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَتَزْهَقَ أَنفُسُهُمْ وَهُمْ كَافِرُونَ﴾

তাদের ধন-দৌলত ও সন্তানের আধিক্য দেখে তোমরা প্রতারিত হয়ো না। আল্লাহ চান, এ জিনিসগুলোর মাধ্যমে দুনিয়ার জীবনে তাদের শাস্তি দিতে। আর তারা যদি প্রাণও দিয়ে দেয়, তাহলে তখন তারা থাকবে সত্য অস্বীকার করার অবস্থায়।

  কুরআন আমাদেরকে বৈরাগী বা সন্নাসী হতে বলেনি। কিন্তু স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে ইহা ক্ষণস্থায়ী জিনিস। সূরা আলে ইমরানে আল্লাহ বলছেন। আয়াত-১৪

﴿زُيِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّهَوَاتِ مِنَ النِّسَاء وَالْبَنِينَ وَالْقَنَاطِيرِ الْمُقَنطَرَةِ مِنَ الذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ وَالْخَيْلِ الْمُسَوَّمَةِ وَالأَنْعَامِ وَالْحَرْثِ ذَلِكَ مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَاللّهُ عِندَهُ حُسْنُ الْمَآبِ﴾

মানুষের জন্য নারী, সন্তান, সোনরূপার স্তুপ, সেরা ঘোড়া, গবাদী পশু ও কৃষি ক্ষেতের প্রতি আসক্তিকে বড়ই সুসজ্জিত ও সুশোভিত করা হয়েছে। কিন্তু এগুলো দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনের সামগ্রী মাত্র। প্রকৃতপক্ষে উত্তম আবাস তো রয়েছে আল্লাহর কাছে।

  কুরআন দুনিয়ার জীবনকে খেল-তামাশার বস্তু বলে আখ্যায়িত করেছে। আখেরাতের প্রতি উৎসাহিত করেছে। সূরা আল আনআমঃ আয়াত-৩২ আর সূরা আনকাবুতের ৬৪ নং আয়াতে

﴿وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلاَّ لَعِبٌ وَلَهْوٌ وَلَلدَّارُ الآخِرَةُ خَيْرٌ لِّلَّذِيْنَ يَتَّقُوْنَ أَفَلاَ تَعْقِلُوْنَ﴾

 দুনিয়ার জীবন তো একটি খে-তামাসার ব্যাপার। আসলে যারা ক্ষতির হাত থেকে বাঁচতে চায় তাদের জন্য আখেরাতের আবাস ভালো। তবে কি তোমরা বুদ্ধি-বিবেচনাকে কাজে লাগাবে না?”

﴿وَمَا هَذِهِ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا لَهْوٌ وَلَعِبٌ ﴾

 আর এ দুনিয়ার জীবন একটি খেলা ও মন ভলানো সামগ্রী ছাড়া আর কিছুই নয়।

  দুনিয়ার জীবনকে খেল-তামাশার বস্তু বানায় তাদেরকে কুরআন সতর্ক করে এই ভাবে। সূরা আল আরাফঃ আয়াত-৫১

﴿الَّذِينَ اتَّخَذُواْ دِينَهُمْ لَهْواً وَلَعِباً وَغَرَّتْهُمُ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا فَالْيَوْمَ نَنْسَاهُمْ كَمَا نَسُواْ لِقَاءَ يَوْمِهِمْ هَـذَا وَمَا كَانُواْ بِآيَاتِنَا يَجْحَدُونَ﴾

যারা নিজেদের দ্বীনকে খেলা ও কৌতুকের ব্যাপার বানিয়ে নিয়েছিল এবং দুনিয়ার জীবন যাদেরকে প্রতারণায় নিমজ্জিত করেছিল। আল্লাহ বলেন, আজ আমিও তাদেরকে ঠিক তেমনিভাবে ভলে যাবো যেভাবে তারা এ দিনটির মুখোমুখী হওয়ার কথা ভলে গিয়েছিল এবং আমার আয়াত সমূহ অস্বীকার করেছিল।

  আসলে দুনিয়ার জীবনটা কেমন? তার উদাহরণ দিচ্ছেন আল্লাহ সূরা ইউনুছঃ আয়াত ২৪

﴿إِنَّمَا مَثَلُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا كَمَاءٍ أَنزَلْنَاهُ مِنَ السَّمَاءِ فَاخْتَلَطَ بِـهِ نَبَاتُ الأَرْضِ مِمَّا يَأْكُلُ النَّاسُ وَالأَنْعَامُ حَتَّىَ إِذَا أَخَذَتِ الأَرْضُ زُخْرُفَهَا وَازَّيَّنَتْ وَظَنَّ أَهْلُهَا أَنَّهُمْ قَادِرُونَ عَلَيْهَا أَتَاهَا أَمْرُنَا لَيْلاً أَوْ نَهَاراً فَجَعَلْنَاهَا حَصِيداً كَأَن لَّمْ تَغْنَ بِالأَمْسِ كَذَلِكَ نُفَصِّلُ الآيَاتِ لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ﴾

দুনিয়ার এ জীবন (যার নেশায় মাতাল হয়ে তোমরা আমার নিশানীগুলোর প্রতি উদাসীন হয়ে যাচ্ছে) এর দৃষ্টান্ত হচ্ছে, যেমন আকাশ থেকে আমি পানি বর্ষণ করলাম, তার ফলে যমীনের উৎপাদন, যা মানুষ ও জীব-জন্তু খায়, ঘন সন্নিবিষ্ট হয়ে গলে। তার পর ঠিক সময় যখন যমীনে তার ভরা বসন্তে পৌছে গেল এবং ক্ষেতগুলো শস্যশ্যামল হয়ে উঠলো। আর তার মালিকরা মনে করলো এবার তারা এগুলো ভোগ করতে সক্ষম হবে, এমন সময় আকস্মাতরাতে বা দিনে আমার হুকুম এসে গেলো। আমি তাকে এমনভাবে ধ্বংস করলাম যেন কাল সেখানে কিছুই ছিল না। এভাবে আমি বিশাদভাবে নিদর্শনাবলী বর্ণনা করে থাকি,তাদের জন্য যারা চিন্থা ভাবনা করে।

  আসলে দুনিয়ার জীবনটা কেমন? তার আরেকটি উদাহরণ দিচ্ছেন আল্লাহ সূরা আল কাহফঃ আয়াত-৪৫

﴿وَاضْرِبْ لَهُمْ مَّثَلَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا كَمَاءٍ أَنزَلْنَاهُ مِنَ السَّمَاءِ فَاخْتَلَطَ بِهِ نَبَاتُ الْأَرْضِ فَأَصْبَحَ هَشِيماً تَذْرُوهُ الرِّيَاحُ وَكَانَ اللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ مُّقْتَدِراً ﴾

আর হে নবী! দুনিয়ার জীবনের তাৎপর্য তাদেরকে এ উপমার মাধ্যমে বুঝাও যে, আজ আমি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করলাম, ফলে ভপৃষ্ঠের উদ্ভিদ খুব ঘন হয়ে গেলো আবার কাল ও উদ্ভিদগুলোই শুকনো ভষিতে পরিণত হলো, যাকে বাতাস উড়িয়ে নিয়ে যায়। আল্লাহ সব জিনিসের উপর শক্তিশালী।

فَمَا مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا فِي الآخِرَةِ إِلاَّ قَلِيلٌ  যদি তাই হয়, তাহলে তোমরা মনে রেখো, দুনিয়ার জীবনের এসব সাজ সরঞ্জাম আখেরাতে খুব সামান্য বলে প্রমাণিত হবে।

  এর দূটি অর্থ।

১. আখেরাতের অনন্ত জীবন ও সেখানকার সীমাহীন সাজ-সরঞ্জাম দেখার পর জানতে পারবে যে, দুনিয়ার জীবনকালে ভোগের যে বড় বড় সম্ভাবনা ও বিলাস সামগ্রী লাভ করা হয়েছিল, তা এই আখেরাতের সীমাহীন সম্ভাবনার কাছে অত্যন্ত সামান্যই বটে। আর তখন নিজের সংকীর্ণ দৃষ্ঠি ও অদূরদর্শিতার জন্য আফসোস করতে থাকেব যে, এত বুঝানো হলো, অথচ বুঝ গ্রহণ করলাম না, এখন এই বিপুলতা থেকে বঞ্চিত হলাম।

২. দুনিয়ার জীবনের এই ঐশ্বর্য, সাজ-সরঞ্জাম আখেরাতে কোন কাজে লাগবেনা। মৃত্যুর সাথে সাথে এগুলোর সাথে সম্পর্ক শেষ। মৃতের সাথে যাবেনা। বরং যা আল্লাহর সন্তোষ অর্জনের প্রত্যাশায় কুরবানী করা হয়েছে, যার ভালবাসা আল্লাহ ও তাঁর দ্বীনের ভালবাসাকে প্রাধান্য দিয়েছে, একমাত্র সেই সামান্য জিনিসই সেখানে যাবে।

  সূরা আল রাদেঃ আয়াত-২৬ আল্লাহ বলছেন-

﴿اللّهُ يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ يَشَاءُ وَيَقَدِرُ وَفَرِحُواْ بِالْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا فِي الآخِرَةِ إِلاَّ مَتَاعٌ﴾

আল্লাহ যাকে ইচ্ছা রিযিক সম্প্রসারিত করেন এবং যাকে চান মাপাজোকো রিযিক দান করেন। এরা দুনয়িার জীবনে উল্লসিত, অথচ দুনিয়ার জীবন আখেরাতের তুলনায় সামান্য সামগ্রী ছাড়া আর কিছুই নয়।

  কুরআনের অন্যত্র সূরা আলে ইমরানে আল্লাহ বলছেন-দুনিয়াটা একটা বাহ্যিক প্রতারণার বস্তু। আয়াত-১৮৫

﴿كُلُّ نَفْسٍ ذَآئِقَةُ الْمَوْتِ وَإِنَّمَا تُوَفَّوْنَ أُجُورَكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَمَن زُحْـزِِحَ عَنِ النَّارِ وَأُدْخِلَ الْجَنَّةَ فَقَدْ فَازَ وَما الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلاَّ مَتَاعُ الْغُرُورِ﴾

অবশেষে প্রত্যেক ব্যক্তিকে মরতে হবে এবং তোমরা সবাই কিয়ামতের দিন নিজেদের পূর্ণ প্রতিদান লাভ করবে। একমাত্র সেই ব্যক্তিই সফলকাম হবে, যে সেকানে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা পাবে এবং যাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে। আর এ দুনিয়াটা তো নিছক একটা বাহ্যিক প্রতারণার বস্তু ছাড়া আর কিছুই নয়।

  দুনিয়া আর আখেরাতের জীবনের উপসংহার।

ক. সূরা নিসার ৭৪নং আয়াতে আল্লাহ বলছেন-

﴿فَلْيُقَاتِلْ فِي سَبِيلِ اللّهِ الَّذِينَ يَشْرُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا بِالآخِرَةِ وَمَن يُقَاتِلْ فِي سَبِيلِ اللّهِ فَيُقْتَلْ أَو يَغْلِبْ فَسَوْفَ نُؤْتِيهِ أَجْراً عَظِيماً﴾

“(এই ধরনের লোকদের জানা উচিত) আল্লাহর পথে তাদের লড়াই করা উচিত যারা আখেরাতের বিনিময়ে দুনিয়ার জীবন বিকিয়ে দেয়। তার পর যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে লড়বে এবং মারা যাবে অথবা বিজয়ী হবে, তাকে নিশ্চয়ই আমি মহাপুরস্কার দান করবো।

খ. সূরা তাওবার ১১১নং আয়াতে আল্লাহ বলছেন-

﴿إِنَّ اللّهَ اشْتَرَى مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُم بِأَنَّ لَهُمُ الجَنَّةَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللّهِ فَيَقْتُلُونَ وَيُقْتَلُونَ﴾

নিশ্চয়ই আল্লাহ খরিদ করে নিয়েছেন যারা মুমিন, তাদের জান আর ধন সম্পদ জান্নাতের বিনিময়ে। বিধায় তারা লড়াই করবে আল্লাহর পথে। এতে তারা মারবে এবং মরবে।

গ. সূরা ইউনুসের ৭ ও ৮নং আয়াতে আল্লাহ বলছেন-

﴿إَنَّ الَّذِينَ لاَ يَرْجُونَ لِقَاءنَا وَرَضُواْ بِالْحَياةِ الدُّنْيَا وَاطْمَأَنُّواْ بِهَا وَالَّذِينَ هُمْ عَنْ آيَاتِنَا غَافِلُونَ﴾﴿أُولَٰئِكَ مَأْوَاهُمُ النَّارُ بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ﴾

এ কথা সত্য যারা আমার সাক্ষাতের আশা পোষণ করে না এবং পার্থিব জীবনেই পরিতৃপ্ত ও নিশ্চিন্তে থাকে আর আমার নিদর্শণ সমূহ থেকে গাফেল, তাদের শেষ আবাস হবে জাহান্নাম এমন সব অসৎ কাজের কর্মফল হিসেবে যে গুলো তারা (নিজেদের ভল আকীদা ও ভল কার্যদারা কারণে) ক্রমাগত ভাবে আহরণ করতো।

إِلاَّ تَنفِرُواْ يُعَذِّبْكُمْ عَذَاباً أَلِيماً وَيَسْتَبْدِلْ قَوْماً غَيْرَكُمْ وَلاَ تَضُرُّوهُ شَيْئاً وَاللّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ

৩৯. তোমরা যদি না বের হও, তাহলে আল্লাহ তোমাদের যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি দেবেন এবং তোমাদের জায়গায় আর একটি দলকে উঠাবেন, আর তোমরা আল্লাহর কোন ক্ষতি করতে পারবেনা। তিনি সব জিনিসের উপর শক্তিশালী।

  বের হবেনা কে? দুনিয়ার লোভে? আল্লাহ তারও জবাব দিয়ে দিলেন কুরআনে সুরা তাওবায়-আয়াতঃ ২৪

﴿قُلْ إِن كَانَ آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَآؤُكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَعَشِيرَتُكُمْ وَأَمْوَالٌ اقْتَرَفْتُمُوهَا وَتِجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمَسَاكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبَّ إِلَيْكُم مِّنَ اللّهِ وَرَسُولِهِ وَجِهَادٍ فِي سَبِيلِهِ فَتَرَبَّصُواْ حَتَّى يَأْتِيَ اللّهُ بِأَمْرِهِ وَاللّهُ لاَ يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ﴾

হে নবী! বলে দাও, যদি তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই, তোমাদের স্ত্রী, তোমাদের আত্মীয়-স্বজন, তোমাদের উপার্জিত সম্পদতোমাদের যে ব্যবসায়ে মন্দা দেখার ভয়ে তোমরা তটস্থ থাক এবং তোমাদের  যে বাসস্থানকে তোমরা খবই পছন্দ কর-এসব যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এবং তাঁর পথে জিহাদ করার চাইতে তোমাদের কাছে বেশী প্রিয় হয়, তাহলে আল্লাহর ফায়সালা তোমাদের কাছে না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করো। আল্লাহ ফাসেকদেরকে কখনো সত্য পথের সন্ধান দেন না।

  জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহর কাজ খুবই ওজন ওয়ালা কাজ। কেউ যদি মনে করেন সামাজিক গুরুত্ব পূর্ণ কাজ করে, বেহেশতে যাবেন, তাহলে আল্লাহ তাদের উদ্দেশ্যে বলছেন। সূরা আত্ তাওবা-আয়াতঃ ১৯-২০

﴿أَجَعَلْتُمْ سِقَايَةَ الْحَاجِّ وَعِمَارَةَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ كَمَنْ آمَنَ بِاللّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ وَجَاهَدَ فِي سَبِيلِ اللّهِ لاَ يَسْتَوُونَ عِندَ اللّهِ وَاللّهُ لاَ يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ ﴾﴿الَّذِينَ آمَنُواْ وَهَاجَرُواْ وَجَاهَدُواْ فِي سَبِيلِ اللّهِ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ أَعْظَمُ دَرَجَةً عِندَ اللّهِ وَأُوْلَئِكَ هُمُ الْفَائِزُونَ﴾

 তোমরা কি হাজীদের পানি পান করানো এবং মসজিদে হারামের রক্ষণা-বেক্ষণ করাকে এমন ব্যক্তিদের ব্যক্তিদের কাজের সমান মনে করে নিয়েছো, যারা ঈমান এনেছে আল্লাহর প্রতি ও পরকালের প্রতি এবং সংগ্রাম-সাধনা করেছে আল্লাহর পথে? এ উভয় দল আল্লাহর কাছে সমান নয়। আল্লাহ জালেমদের পথ দেখান না। আল্লাহর কাছে তো তারাই উচ্চ মর্যাদার অধিকারী, যারা ঈমান এনেছে এবং তাঁর পথে ঘর-বাড়ী ছেড়েছে ও ধন-প্রাণ সমর্পণ করে জিহাদ করেছে। তারাই সফলকাম।

إِلاَّ تَنفِرُواْ يُعَذِّبْكُمْ عَذَاباً أَلِيماً তোমরা যদি না বের হও, তাহলে আল্লাহ তোমাদের যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি দেবেন

  ফরয়ী বিধান হলো, যতক্ষণ যুদ্ধ করার জন্য সাধারণ ঘোষনা না আসবে, ততক্ষণ পর্যন্ত জিহাদ ফরযে কিফায়া। অর্থাৎ কিছু লোক জিহাদ করে নিলেই সকলের উপর থেকে মাফ হয়ে যায়। কিন্তু সর্বাত্মক জিহাদের জন্য যখন আহবান জানানো হবে, তখন জিহাদ ফরযে আইন। এমতাবস্থায় যে জিহাদে অংশ নেবেনা, তার ঈমানই গ্রহণ যোগ্য হবেনা।

وَيَسْتَبْدِلْ قَوْماً غَيْرَكُمْ এবং তোমাদের জায়গায় আর একটি দলকে উঠাবেন

  মানে আল্লাহর কাজ কারো উপর নির্ভরশীল নয়। তোমরা করলে তা হবে, না করলেও তা হবে। আল্লাহ কাজটা করার সুযোগ করে দিলেন, এটা তার মেহেরবানী ও অনুগ্রহ। যদি অজ্ঞতার কারণে সুযোগ না নাও, তাহলে তিনি অন্য কোন জাতিকে এই সুযোগ দেবেন। এতে তোমরা ব্যর্থ বলে গন্য হবে।

 إِلاَّ تَنصُرُوهُ فَقَدْ نَصَرَهُ اللّهُ إِذْ أَخْرَجَهُ الَّذِينَ كَفَرُواْ ثَانِيَ اثْنَيْنِ إِذْ هُمَا فِي الْغَارِ إِذْ يَقُولُ لِصَاحِبِهِ لاَ تَحْزَنْ إِنَّ اللّهَ مَعَنَا فَأَنزَلَ اللّهُ سَكِينَتَهُ عَلَيْهِ وَأَيَّدَهُ بِجُنُودٍ لَّمْ تَرَوْهَا وَجَعَلَ كَلِمَةَ الَّذِيْنَ كَفَرُواْ السُّفْلَى وَكَلِمَةُ اللّهِ هِيَ الْعُلْيَا وَاللّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ

৪০. তোমরা যদি নবীকে সাহায্য না করো, তাহলে কোন পরোয়া নেই। আল্লাহ তাকে এমন সময় সাহায্য করেছেন যখন কাফেরা তাকে বের করে দিয়েছিল, যখন সে ছিল মাত্র দুজনের দ্বিতীয় জন, যখন তারা দুজন গুহার মধ্যে ছিল, তখন সে তার সাথীকে বলছিল, “চিন্তিত হয়োনা, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন। সে সময় আল্লাহর নিজের পক্ষ থেকে তার উপর মানসিক প্রশান্তি নাযিল করেন এবং এমন সেনাদল পাঠিয়ে তাকে সাহায্য করেন, যা তোমরা দেখোনি এবং তিনি কাফেরদের বক্তব্যকে নীচু করে দেন। আর আল্লাহর কথা তো সমুন্নত আছেই। আল্লাহ পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়।

  নবী সা. এর হিজরতের সময়ের ঘটনার দিকে ইংগিত করা হয়েছে। সেই সময় সাথী আবু বকর চিন্থিত হয়ে পড়লে নবী বলেছিলেন-﴿لاَ تَحْزَنْ إِنَّ اللّهَ مَعَنَا﴾ ভয় করোনা, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।

  আল্লাহ সেই সময় মানসিক শান্তি প্রদান করলেন। সাহায্য করলেন সৈন্যদল দিয়ে।

  প্রশ্ন হচ্ছে সেই সাহায্যকারী আল্লাহ কি এখন নেই?

  আল্লাহ ইচ্ছা করলে কি এখনও সৈন্য পাঠাতে পারেন না?

انْفِرُواْ خِفَافاً وَثِقَالاً وَجَاهِدُواْ بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنفُسِكُمْ فِي سَبِيلِ اللّهِ ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ

৪১. বের হও, হালকা কিংবা ভারী যাই হওনা কেন, এবং জিহাদ করো আল্লাহর পথে নিজের ধন-প্রাণ দিয়ে। এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয় যদি তোমরা জানতে।

  انْفِرُواْ خِفَافاً وَثِقَالاً  এখানে হালকা আর ভারী শব্দ দূটি ব্যাপক অর্থবোধক। যেমন-

        স্বেচ্চায় ও সাগ্রহে অথবা অনিচ্ছায় ও অনাগ্রহে।

        আপন মতের সাথে মিলুক অথবা না মিলুক।

        যুক্তি সংগত মনে হোক অথবা অযৌক্তিক মনে হোক।

        স্বচ্ছলতায় ও সমৃদ্ধির মধ্যে অথবা দারিদ্রের নির্মম কষাঘাতের মধ্যে।

        সাজ সরঞ্জামে সজ্জিত হয়ে অথবা নিঃসম্বল অবস্থায়।

        অনুকুল অবস্থা হোক অথবা প্রতিকল।

        যৌবন দীপ্ত ও সুস্বাস্থ্য নিয়ে অথবা বৃদ্ধ, দূর্বল অবস্থা নিয়ে।

        সুস্থ হোন অথবা অসুস্থ হোন।

        অবসর হোন অথবা কর্মব্যস্ত হোন।

        মানসিক অবস্থা ভাল থাকুক অথবা চিন্থিত থাকুন।

এই কাজ উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য ফরযঃ

﴿وَجَاهِدُوا فِي اللَّهِ حَقَّ جِهَادِهِ ۚ هُوَ اجْتَبَاكُمْ وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنْ حَرَجٍ ۚ مِّلَّةَ أَبِيكُمْ إِبْرَاهِيمَ ۚ هُوَ سَمَّاكُمُ الْمُسْلِمِينَ مِن قَبْلُ وَفِي هَٰذَا لِيَكُونَ الرَّسُولُ شَهِيدًا عَلَيْكُمْ وَتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ ۚ فَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ وَاعْتَصِمُوا بِاللَّهِ هُوَ مَوْلَاكُمْ ۖ فَنِعْمَ الْمَوْلَىٰ وَنِعْمَ النَّصِيرُ﴾

৭৮) আল্লাহর পথে জিহাদ করো যেমন জিহাদ করলে তার হক আদায় হয়৷ তিনি নিজের কাজের জন্য তোমাদেরকে বাছাই করে নিয়েছেন  এবং দীনের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কোনো সংকীর্ণতা আরোপ করেননি৷ তোমাদের পিতা ইবরাহীমের মিল্লাতের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাও৷ আল্লাহ আগেও তোমাদের নাম রেখেছিলেন মুসলিমএবং এর (কুরআন) মধ্যেও (তোমাদের নাম এটিই) যাতে রসূল তোমাদের ওপর সাক্ষী হন এবং তোমরা সাক্ষী হও লোকদের ওপর৷ কাজেই নামায কায়েম করো, যাকাত দাও এবং আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত হয়ে যাও৷ তিনি তোমাদের অভিভাবক, বড়ই ভালো অভিভাবক তিনি, বড়ই ভালো সাহায্যকারী তিনি। (সূরা হাজ্জঃ ৭৮)

এই কাজ সকল নবীদের উপর ফরয ছিলঃ

﴿شَرَعَ لَكُم مِّنَ الدِّينِ مَا وَصَّىٰ بِهِ نُوحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَىٰ وَعِيسَىٰ ۖ أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ ۚ كَبُرَ عَلَى الْمُشْرِكِينَ مَا تَدْعُوهُمْ إِلَيْهِ ۚ اللَّهُ يَجْتَبِي إِلَيْهِ مَن يَشَاءُ وَيَهْدِي إِلَيْهِ مَن يُنِيبُ﴾

১৩) তিনি তোমাদের জন্য দীনের সেই সব নিয়ম-কানুন নির্ধারিত করেছেন যার নির্দেশ তিনি নূহকে দিয়েছিলেন এবং ( হে মুহাম্মাদ) যা এখন আমি তোমার কাছে ওহীর মাধ্যমে পাঠিয়েছি৷ আর যার আদেশ দিয়েছিলাম আমি ইবরাহীম (আ) মূসা (আ) ও ঈসা (আ)৷ তার সাথে তাগিদ করেছিলাম এই বলে যে, এ দীনকে কায়েম করো এবং এ ব্যাপারে পরস্পর ভিন্ন হয়ো না৷ (হে মুহাম্মাদ) এই কথাটিই এসব মুশরিকের কাছে অত্যন্ত অপছন্দনীয় যার দিকে তুমি তাদের আহবান জানাচ্ছো৷ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা আপন করে নেন এবং তিনি তাদেরকেই নিজের কাছে আসার পথ দেখান যারা তাঁর প্রতি রুজু করে(সূরা আশ শুরাঃ ১৩)

এই কাজ ফেতনা দূর না হওয়া অবধি করতে হবেঃ

﴿وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّىٰ لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ لِلَّهِ ۖ فَإِنِ انتَهَوْا فَلَا عُدْوَانَ إِلَّا عَلَى الظَّالِمِينَ﴾

১৯৩) তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করতে থাকো যতক্ষণ না ফিতনা নির্মূল হয়ে যায় এবং দীন একমাত্র আল্লাহর জন্য নিদিষ্ট হয়ে যায় ৷ তারপর যদি তারা বিরত হয় তাহলে জেনে রাখো যালেমদের ছাড়া আর করোর ওপর হস্তক্ষেপ করা বৈধ নয়(সূরা বাকারাঃ ১৯৩)

এই কাজ করতে হবে, যেখানে আর্তমানবতাঃ

﴿وَمَا لَكُمْ لَا تُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالْمُسْتَضْعَفِينَ مِنَ الرِّجَالِ وَالنِّسَاءِ وَالْوِلْدَانِ الَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا أَخْرِجْنَا مِنْ هَٰذِهِ الْقَرْيَةِ الظَّالِمِ أَهْلُهَا وَاجْعَل لَّنَا مِن لَّدُنكَ وَلِيًّا وَاجْعَل لَّنَا مِن لَّدُنكَ نَصِيرًا﴾

৭৫) তোমাদের কী হলো, তোমরা আল্লাহর পথে অসহায় নরনারী ও শিশুদের জন্য লড়বে না, যারা দুর্বলতার কারণে নির্যাতীত হচ্ছে ? তারা ফরিয়াদ করছে, হে আমাদের রব ! এই জনপদ থেকে আমাদের বের করে নিয়ে যাও, যার অধিবাসীরা জালেম এবং তোমার পক্ষ থেকে আমাদের কোন বন্ধু , অভিভাবক ও সাহায্যকারী তৈরী করে দাও৷ (সূরা নিসাঃ ৭৫)

এই কাজ ঈমানের দাবীঃ

﴿إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَىٰ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُم بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ ۚ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَيَقْتُلُونَ وَيُقْتَلُونَ ۖ وَعْدًا عَلَيْهِ حَقًّا فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنجِيلِ وَالْقُرْآنِ ۚ وَمَنْ أَوْفَىٰ بِعَهْدِهِ مِنَ اللَّهِ ۚ فَاسْتَبْشِرُوا بِبَيْعِكُمُ الَّذِي بَايَعْتُم بِهِ ۚ وَذَٰلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ﴾

১১১) প্রকৃত ব্যাপার এই যে, আল্লাহ মুমিনদের থেকে তাদের প্রাণ ও ধন-সম্পদ জান্নাতের বিনিময়ে কিনে নিয়েছেন৷ তারা আল্লাহর পথে লড়াই করে এবং মারে ও মরে৷ তাদের প্রতি তাওরাত ,ইনজীল ও কুরআনে(জান্নাতের ওয়াদা) আল্লাহর জিম্মায় একটি পাকাপোক্ত ওয়াদা বিশেষ৷ আর আল্লাহর চাইতে বেশী নিজের ওয়াদা পূরণকারী আর কে আছে? কাজেই তোমরা আল্লাহর সাথে যে কেনা-বেচা করছো সে জন্য আনন্দ করো৷ এটিই সবচেয়ে বড় সাফল্য৷ (সূরা বাকারাঃ ১১১)

এই কাজ মসজিদের হারামের রক্ষণাবেক্ষনের চেয়েও দামীঃ

﴿أَجَعَلْتُمْ سِقَايَةَ الْحَاجِّ وَعِمَارَةَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ كَمَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَجَاهَدَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ ۚ لَا يَسْتَوُونَ عِندَ اللَّهِ ۗ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ﴾ ﴿الَّذِينَ آمَنُوا وَهَاجَرُوا وَجَاهَدُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ أَعْظَمُ دَرَجَةً عِندَ اللَّهِ ۚ وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْفَائِزُونَ﴾

১৯) তোমরা কি হাজীদের পানি পান করানো এবং মসজিদে হারামের রক্ষণাবেক্ষণ করাকে এমন ব্যক্তিদের কাজের সমান মনে করে নিয়েছ যারা ঈমান এনেছে আল্লাহর প্রতি ও পরকালের প্রতি এবং সংগ্রাম -সাধনা করেছে আল্লাহর পথে ?

২০) এ উভয় দল আল্লাহর কাছে সমান নয়৷ আল্লাহ জালেমদের পথ দেখান না৷ আল্লাহর কাছে তো তারাই উচ্চ মর্যাদার অধিকারী , যারা ঈমান এনেছে এবং তার পথে ঘর-বাড়ি ছেড়েছে ও ধন-প্রাণ সমর্পন করে জিহাদ করেছে৷ তারাই সফলকাম ৷(সূরা বাকারাঃ ১৯২০)

এক কাজ সকল অবস্থায় করতে হবেঃ

﴿انفِرُوْا خِفَافًا وَثِقَالًا وَجَاهِدُوْا بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنفُسِكُمْ فِي سَبِيْلِ اللَّهِ ۚ ذَٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ﴾

৪১) -বের হও, হালকা, কিংবা ভারী যাই হওনা কেন, এবং জিহাদ করো আল্লাহর পথে নিজের ধন-প্রাণ দিয়ে৷ এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয় যদি তোমরা জানতে৷ (বাকারাঃ ৪১)

এই কাজে শামীল হয়ে ঈমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়ঃ

﴿أَحَسِبَ النَّاسُ أَن يُتْرَكُوا أَن يَقُولُوا آمَنَّا وَهُمْ لَا يُفْتَنُونَ﴾ ﴿وَلَقَدْ فَتَنَّا الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ ۖ فَلَيَعْلَمَنَّ اللَّهُ الَّذِينَ صَدَقُوا وَلَيَعْلَمَنَّ الْكَاذِبِينَ﴾

২) লোকেরা কি মনে করে রেখেছে, “আমরা ঈমান এনেছিকেবলমাত্র একথাটুকু বললেই তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে, আর পরীক্ষা করা হবে না?

৩) অথচ আমি তাদের পূর্ববর্তীদের সবাইকে পরীক্ষা করে নিয়েছি আল্লাহ অবশ্যই দেখবেন কে সত্যবাদী এবং কে মিথ্যুক(সূরা আনকাবুতঃ ২-৩)

﴿أَمْ حَسِبْتُمْ أَن تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَأْتِكُم مَّثَلُ الَّذِينَ خَلَوْا مِن قَبْلِكُم ۖ مَّسَّتْهُمُ الْبَأْسَاءُ وَالضَّرَّاءُ وَزُلْزِلُوا حَتَّىٰ يَقُولَ الرَّسُولُ وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ مَتَىٰ نَصْرُ اللَّهِ ۗ أَلَا إِنَّ نَصْرَ اللَّهِ قَرِيبٌ﴾

২১৪) তোমরা কি মনে করেছো, এমনিতেই তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করে যাবে? অথচ তোমাদের আগে যারা ঈমান এনেছিল তাদের ওপর যা কিছু নেমে এসেছিল এখনও তোমাদের ওপর সেসব নেমে আসেনি ৷ তাদের ওপর নেমে এসেছিল কষ্ট-ক্লেশ ও বিপদ-মুসিবত, তাদেরকে প্রকম্পিত করা হয়েছিল ৷ এমনকি সমকালীন রসূল এবং তাঁর সাথে যারা ঈমান এনেছিল তারা চীৎকার করে বলে উঠেছিল, অবশ্যিই আল্লাহর সাহায্য নিকটেই(সূরা বাকারাঃ ২১৪)

এই কাজ করতে বিপদ আসবেঃ

﴿وَلَنَبْلُوَنَّكُم بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ ۗ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ﴾ ﴿الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ﴾

১৫৫) আর নিশ্চয়ই আমরা ভীতি, অনাহার, প্রাণ ও সম্পদের ক্ষতির মাধ্যমে এবং উপার্জন ও আমদানী হ্রাস করে তোমাদের পরীক্ষা করবো ৷ এ অবস্থায় যারা সবর করে

১৫৬) এবং যখনই কোন বিপদ আসে বলেঃ আমরা আল্লাহর জন্য এবং আল্লাহর দিকে আমাদের ফিরে যেতে হবে (সূরা বাকারাঃ ১৫৫১৫৬)

এই কাজের প্রতি ভালবাসা থাকতে হবে সবচেয়ে বেশীঃ

﴿قُلْ إِن كَانَ آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَعَشِيرَتُكُمْ وَأَمْوَالٌ اقْتَرَفْتُمُوهَا وَتِجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمَسَاكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبَّ إِلَيْكُم مِّنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَجِهَادٍ فِي سَبِيلِهِ فَتَرَبَّصُوا حَتَّىٰ يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ ۗ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ﴾

২৪) হে নবী! বলে দাও, যদি তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান ও তোমাদের ভাই তোমাদের স্ত্রী ,তোমাদের আত্মীয় -স্বজন , তোমাদের উপার্জিত সম্পদ , তোমাদের যে ব্যবসায়ে মন্দা দেখা দেয়ার ভয়ে তোমরা তটস্থ থাক এবং তোমাদের যে বাসস্থানকে তোমরা খুবই পছন্দ কর-এসব যদি আল্লাহ ও তার রসূল এবং তার পথে জিহাদ করার চাইতে তোমাদের কাছে বেশী প্রিয় হয়, তাহলে আল্লাহর ফায়সালা তোমাদের কাছে না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা কর আল্লাহ ফাসেকদেরকে কখনো সত্য পথের সন্ধান দেন না৷ (সূরা আত তাওবাঃ ২৪)

এই কাজ চলবে ততদিন, দ্বীন কায়েম হবেনা যতদিনঃ

﴿وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّىٰ لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ كُلُّهُ لِلَّهِ ۚ فَإِنِ انتَهَوْا فَإِنَّ اللَّهَ بِمَا يَعْمَلُونَ بَصِيرٌ﴾

৩৯) হে ঈমানদারগণ! এ কাফেরদের সাথে এমন যুদ্ধ করো যেন গোমরাহী ও বিশৃংখলা নির্মূল হয়ে যায় এবং দীন পুরোপুরি আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট হয়ে যায়(সূরা আনফালঃ ৩৯)

এই কাজ জান্নাত লাভের মাধ্যমে, জাহান্নাম থেকে মুক্তির উপায়ঃ

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلَىٰ تِجَارَةٍ تُنجِيكُم مِّنْ عَذَابٍ أَلِيمٍ﴾ ﴿تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَتُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنفُسِكُمْ ۚ ذَٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ﴾

১০) হে ঈমান আনয়নকারীগণ! আমি কি তোমাদেরকে এমন একটি ব্যবসায়ের  সন্ধান দেবো যা তোমাদেরকে কঠিন আযাব থেকে মুক্তি দেবে?

১১) তোমরা আল্লাহ ও তার রসূলের প্রতি ঈমান আন এবং আল্লাহর পথে অর্থ-সম্পদ ও জান-প্রাণ দিয়ে জিহাদ করো এটাই তোমাদের জন্য অতিব কল্যাণকর যদি তোমরা তা জান৷ (সূরা আস সাফঃ ১০১১)

এই কাজ সবচেয়ে উত্তম ইবাদতঃ

  উপরে যে আযাব বলা হয়েছে তা থেকে বাঁচতে হলে আল্লাহ দিয়েছেন একটি সহজ পথ। আর তাহলো, কুরআনের সূরা সফ-আয়াতঃ১০-১১

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلَى تِجَارَةٍ تُنجِيْكُم مِّنْ عَذَابٍ أَلِيمٍ ﴾﴿تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَتُجَاهِدُوْنَ فِي سَبِيْلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنفُسِكُمْ ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ ﴾

হে ঈমান আনয়নকারীগন! আমি কি তোমাদেরকে এমন একটি ব্যবসায়ের সন্ধান দেবো, যা তোমাদেরকে কঠিন আযাব থেকে মুক্তি দেবে? তোমরা আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি ঈমান আন এবং আল্লাহর পথে অর্থ-সম্পদ ও জান-প্রাণ দিয়ে জিহাদ করো। এটাই তোমাদের জন্য অতিব কল্যাণকর, যদি তোমরা তা জান।

  আল্লাহ আরো বেশী কিছু বলেছেন। আয়াত-১২-১৩

﴿يَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَيُدْخِلْكُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ وَمَسَاكِنَ طَيِّبَةً فِي جَنَّاتِ عَدْنٍ ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ﴾﴿وَأُخْرَى تُحِبُّونَهَا نَصْرٌ مِّنَ اللَّهِ وَفَتْحٌ قَرِيبٌ وَبَشِّرِ الْمُؤْمِنِينَ﴾

আল্লাহ তোমাদের গোনাহ মাফ করে দেবেন এবং তোমাদেরকে এমনসব বাগানে প্রবেশ করাবেন যার নিচে দিয়ে ঝর্ণাধারা বয়ে চলবে। আর চিরস্থায়ী বসবাসের জায়গা জান্নাতের মাধ্যে তোমাদেরকে সর্বোত্তম ঘর দান করবেন। এটাই বড় সফলতা। আর আরেক জিনিস যা তোমরা আকাংখা করো, আল্লাহ তাও তোমাদের দেবেন আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য ও অতি নিকটবর্তী সময়ে বিজয়। হে নবী! ঈমানদারদেরকে এর সুসংবাদ দান করো।

لَوْ كَانَ عَرَضاً قَرِيباً وَسَفَراً قَاصِداً لاَّتَّبَعُوكَ وَلَـكِنْ بَعُدَتْ عَلَيْهِمُ الشُّقَّةُ وَسَيَحْلِفُونَ بِاللّهِ لَوِ اسْتَطَعْنَا لَخَرَجْنَا مَعَكُمْ يُهْلِكُونَ أَنفُسَهُمْ وَاللّهُ يَعْلَمُ إِنَّهُمْ لَكَاذِبُوْنَ

৪২. হে নবী! যদি সহজ লাভের সম্ভাবনা থাকতো এবং সফর হালকা হতো, তাহলে তারা নিশ্চয়ই তোমার পেছনে চলতে উদ্যত হতো। কিন্তু তাদের জন্য তো পথ বড়ই কঠিন হয়ে গেছে। এখন তারা আল্লাহর কসম খেয়ে বলবে, “যদি আমরা চলতে পারতাম তাহলে অবশ্যি তোমাদের সাথে চলতাম। তারা নিজেদেরকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। আল্লাহ ভালো করেই জানেন তারা মিথ্যাবাদী।

  মানে মোকাবেল হবে রোমের মতো একটি পরাশক্তির সাথে। অন্য দিকে প্রচন্ড গরম। দেশে দেখা দিয়েছে দূর্ভিক্ষ। নতুন বছরের ফসল কাটার সময় (অগ্রহায়ন মাস)। যার জন্য তাবুকের সফর ছিল অত্যন্ত কঠিন ও চড়া মূল্যের।

  আল্লাহ যাদেরকে তার দ্বীনের হয়ে কাজ করার সুযোগ দেন, তাদেরকে বারবার পরীক্ষা করেন। পরীক্ষা এ জন্য যে-সূরা আনকাবুতঃ ২-৩

﴿أَحَسِبَ النَّاسُ أَن يُتْرَكُوا أَن يَقُولُوا آمَنَّا وَهُمْ لَا يُفْتَنُونَ ﴾﴿وَلَقَدْ فَتَنَّا الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ فَلَيَعْلَمَنَّ اللَّهُ الَّذِينَ صَدَقُوا وَلَيَعْلَمَنَّ الْكَاذِبِينَ﴾

 লোকেরা কি মনে করে রেখেছে, আমরা ঈমান এনেছি কেবলমাত্র একথাটুকু বললেই তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে, আর পরীক্ষা করা হবে না? অথচ আমি তাদের পূর্ববর্তীদের সবাইকে পরীক্ষা করে নিয়েছি। আল্লাহ অবশ্যই দেখবেন কে সত্যবাদী এবং মিথ্যুক।

﴿أَمْ حَسِبْتُمْ أَن تَدْخُلُواْ الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَأْتِكُم مَّثَلُ الَّذِينَ خَلَوْاْ مِن قَبْلِكُم مَّسَّتْهُمُ الْبَأْسَاء وَالضَّرَّاء وَزُلْزِلُواْ حَتَّى يَقُولَ الرَّسُولُ وَالَّذِينَ آمَنُواْ مَعَهُ مَتَى نَصْرُ اللّهِ أَلا إِنَّ نَصْرَ اللّهِ قَرِيبٌ﴾

তোমরা কি মনে করেছো, এমনিতেই তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করে যাবে? অথচ তোমাদের আগে যারা ঈমান এনেছিল তাদের উপর যা কিছু নেমে এসেছিল এখনও তোমাদেও উপর সে সব নেমে আসেনি। তোদের উপর নেমে এসেছিল কষ্ট-ক্লেশ ও বিপদ-মুসিবত, তাদেরকে প্রকম্পিত করা হয়েছিল। এমনকি সমকালীন রাসূল এবং তাঁর সাথে যারা ঈমান এনেছিল তারা চিৎকার করে বলে উঠেছিল, আল্লাহ সাহায্য কখন আসবে? অবশ্যিই আল্লাহর সাহায্য অতি নিকটে। (বাকারাঃ ২১৪)

﴿أَمْ حَسِبْتُمْ أَن تَدْخُلُواْ الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَعْلَمِ اللّهُ الَّذِينَ جَاهَدُواْ مِنكُمْ وَيَعْلَمَ الصَّابِرِينَ﴾

 তোমরা কি মনে করে রেখেছো তোমরা এমনিতেই জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ এখনো আল্লাহ দেখেনইনি, তোমাদের মধ্যে কে তাঁর পথে প্রাণপণ যুদ্ধ করতে প্রস্তুত এবং কে তাঁর জন্য সবরকারী।(সূরা আলে ইমরানঃ ১৪২)

﴿أَمْ حَسِبْتُمْ أَن تُتْرَكُواْ وَلَمَّا يَعْلَمِ اللّهُ الَّذِينَ جَاهَدُواْ مِنكُمْ وَلَمْ يَتَّخِذُواْ مِن دُونِ اللّهِ وَلاَ رَسُولِهِ وَلاَ الْمُؤْمِنِينَ وَلِيجَةً وَاللّهُ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ﴾

 তোমরা কি একথা মনে করে রেখেছো যে তোমাদের এমনিই ছেড়ে দেয়া হবে? অথচ আল্লাহ এখনো দেখেননি তোমাদের মধ্যে থেকে কারা (তার পথে) সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালালো এবং আল্লাহর রাসূল ও মুমিনদের ছাড়া কাউকে অন্তরঙ্গ বন্ধু রূপে গ্রহণ করলো না? তোমরা যা কিছু করো আল্লাহ তা জানেন।” (আত্ তাওবাঃ ১৬)

  আর এই পরীক্ষা হয় নানান ভাবে। যেমন-

﴿وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوفْ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الأَمَوَالِ وَالأنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ ﴾

 আর নিশ্চয়ই আমরা ভীত, অনাহার, প্রাণ ও সম্পদের ক্ষতির মাধ্যমে এবং উপার্জন ও আমদানী হ্রাস করে তোমাদের পরীক্ষা করবো। এ অবস্থায় যারা সবর করে তাদের জন্য সুসংবাদ। (বাকারাঃ ১৫৫)

﴿وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ حَتَّى نَعْلَمَ الْمُجَاهِدِينَ مِنكُمْ وَالصَّابِرِينَ وَنَبْلُوَ أَخْبَارَكُمْ﴾

 আমি তোমাদেরকে অবশ্যই পরীক্ষা করবো যাতে আমি তোমাদের অবস্থা যাঁচাই করে দেখে নিতে পারি তোমাদের মধ্যে কে জিহাদকারী এবং কে ধর্যশীল। (মুহাম্মদঃ ৩১)

উপসংহারঃ

  দুনিয়ার জীবন হলো ক্ষনিক্ষের জীবন। মুমিনদেরকে আখেরাতের জীবনকে প্রধান্য দিতে  হবে।

  আল্লাহর পথের কাজ সকল কাজের বড় কাজ। আল্লাহর পথে ডাক আসলে অবহেলা প্রদর্শন করা যাবেনা।

  ইসলামী আন্দোলনরে কাজ হক আদায় করে করতে হবে। নতুবা আখরোতে শাস্তি হবে, দুনিয়াতে অন্যদের অধীনে থেকে নির্যাতিত হতে হবে।

  ইসলামী আন্দোলন করা মানে আল্লাহ বা নবীকে সাহায্য করা নয়। বরং একাজ আল্লাহ করিয়ে নেন। কিন্তু যে কাজ করেনা, সেই বদ নসীব। দ্বীনের কাজ করতে পারা সৌভাগ্যের বিষয়, না পারা নিজেরই দূর্ভাগ্য বটে।

  সুস্থ-অসুস্থ, স্বচ্ছল-অস্বচ্ছল, অবসর-ব্যস্ত, সক্ষম-অক্ষম র্সবাবস্তায় ইসলামী আন্দোলনের সাথে লেগে থাকতে হবে। জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহর কাজ করতে হবে সকল অবস্থায়।

  ইসলামী আন্দোলন শুধু সময়ের কুরবানী নয়-ইসলামী আন্দোলন মানে জানের সাথে মালের কুরবানী।

  দ্বীনের কাজ আল্লাহর কাজ, বিধায় ইহা শুরু করলে আল্লাহর সাহায্য মিলে।

  কুফুর ও ইসলামের সংঘাত, ব্যাপারটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও নাজুক। কুফুরকে সহযোগীতা করা তো দুরের ব্যাপার, সারা জীবন ইসলামী আন্দোলনে থেকে যদি কোন এক সময় সামান্য ভল করে বসে, তাহলে সারা জিন্দেগীর বন্দেগী ও দ্বীনদারী ঝুকির সম্মুখীন হয়। যেহেতু বদর ওহুদ আহযাব আর হুনাইনের মতো ভয়াবহ যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করা লোকের মতো খাটি মুসলমানরাও সামান্য ভলের কারণে রক্ষা পায়নি।

  দ্বীনের পথে কাজের সবকটি পর্য্যায়কে এক একটি পরীক্ষা মনে করতে হবে এবং সে পরীক্ষা ফেল করে ফেললাম কি না সে টেনশন থাকতে হবে।

 

  দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে গড়ি মসি করা মামুলি ব্যাপার নয়। বরং গড়িমসি কোন কোন সময় গোনাহের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যায়। তখন এই কথা বলে লাভ হবে না যে, এ উদ্দেশ্যে আমি কাজটি করিনি। আমার নিয়ত সহীহ ছিল।

লেখাটি আপনার ভাল লাগলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন
  • 1
  • 1
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    3
    Shares

1 thought on “দারসুল কুরআনঃ সূরা আত-তাওবা ৩৮-৪২

Leave a Reply

Your email address will not be published.