দারসুল কুরআনঃ সূরা আল-আরাফঃ আয়াত ১১-২৫

তেলাওয়াত ও তরজমাঃ

﴿وَلَقَدْ خَلَقْنَاكُمْ ثُمَّ صَوَّرْنَاكُمْ ثُمَّ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لِآدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ لَمْ يَكُن مِّنَ السَّاجِدِينَ﴾

১১) আমি তোমাদের সৃষ্টির সূচনা করলাম তারপর তোমাদের আকৃতি দান করলাম অতপর ফেরেশতাদের বললাম,আদমকে সিজদা করো। এ নির্দেশ অনুযায়ী সবাই সিজদা করলো কিন্তু ইবলীস সিজদাকারীদের অন্তরভুক্ত হলো না  

﴿قَالَ مَا مَنَعَكَ أَلَّا تَسْجُدَ إِذْ أَمَرْتُكَ ۖ قَالَ أَنَا خَيْرٌ مِّنْهُ خَلَقْتَنِي مِن نَّارٍ وَخَلَقْتَهُ مِن طِينٍ﴾

১২) আল্লাহ জিজ্ঞেস করলেন, “আমি যখন তোকে হুকুম দিয়েছিলাম তখন সিজদা করতে তোকে বাধা দিয়েছিল কিসে”? সে জবাব দিলঃ আমি তার চাইতে শ্রেষ্ঠ৷ আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছো এবং ওকে সৃষ্টি করেছো মাটি থেকে”। 

﴿قَالَ فَاهْبِطْ مِنْهَا فَمَا يَكُونُ لَكَ أَن تَتَكَبَّرَ فِيهَا فَاخْرُجْ إِنَّكَ مِنَ الصَّاغِرِينَ﴾

১৩) তিনি বললেনঃ ঠিক আছে, তুই এখান থেকে নীচে নেমে যা এখানে অহংকার করার অধিকার তোর নেই বের হয়ে যা আসলে তুই এমন লোকদের অন্তরভুক্ত, যারা নিজেরাই নিজেদেরকে লাঞ্ছিত করতে চায়”।

﴿قَالَ أَنظِرْنِي إِلَىٰ يَوْمِ يُبْعَثُونَ﴾

১৪) সে বললঃ আমাকে সেই দিন পর্যন্ত অবকাশ দাও যখন এদের সবাইকে পুনর্বার ওঠানো হবে”।

﴿قَالَ إِنَّكَ مِنَ الْمُنظَرِينَ﴾

১৫) তিনি বললেনঃ তোকে অবকাশ দেয়া হলো”।

﴿قَالَ فَبِمَا أَغْوَيْتَنِي لَأَقْعُدَنَّ لَهُمْ صِرَاطَكَ الْمُسْتَقِيمَ﴾

১৬) সে বললোঃ তুমি যেমন আমাকে গোমরাহীতে নিক্ষেপ করছো তেমনি আমি ও এখন তোমার সরল-সত্য পথে এ লোকদের জন্যে ওঁত পেতে বসে থাকবো,

﴿ثُمَّ لَآتِيَنَّهُم مِّن بَيْنِ أَيْدِيهِمْ وَمِنْ خَلْفِهِمْ وَعَنْ أَيْمَانِهِمْ وَعَن شَمَائِلِهِمْ ۖ وَلَا تَجِدُ أَكْثَرَهُمْ شَاكِرِينَ﴾

১৭) সামনে-পেছনে, ডাইনে-বাঁয়ে, সবদিক থেকে এদেরকে ঘিরে ধরবো এবং এদের অধিকাংশকে তুমি শোকর গুজার পাবে না”।

﴿قَالَ اخْرُجْ مِنْهَا مَذْءُومًا مَّدْحُورًا ۖ لَّمَن تَبِعَكَ مِنْهُمْ لَأَمْلَأَنَّ جَهَنَّمَ مِنكُمْ أَجْمَعِينَ﴾

১৮) আল্লাহ বললেনঃ বের হয়ে যা এখান থেকে লাঞ্ছিত ও ধিকৃত অবস্থায়। নিশ্চিতভাবে জেনে রাখিস, এদের মধ্য থেকে যারাই তোর অনুসরণ করবে তাদেরকে এবং তোকে দিয়ে আমি জাহান্নাম ভরে দেবো।

﴿وَيَا آدَمُ اسْكُنْ أَنتَ وَزَوْجُكَ الْجَنَّةَ فَكُلَا مِنْ حَيْثُ شِئْتُمَا وَلَا تَقْرَبَا هَٰذِهِ الشَّجَرَةَ فَتَكُونَا مِنَ الظَّالِمِينَ﴾

১৯) আর হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী তোমরা দুজনাই এ জান্নাতে থাকো। যেখানে যা তোমাদের ইচ্ছা হয় খাও, কিন্তু এ গাছটির কাছে যেয়ো না, অন্যথায় তোমরা জালেমদের অন্তরভূক্ত হয়ে যাবে”।

﴿فَوَسْوَسَ لَهُمَا الشَّيْطَانُ لِيُبْدِيَ لَهُمَا مَا وُورِيَ عَنْهُمَا مِن سَوْآتِهِمَا وَقَالَ مَا نَهَاكُمَا رَبُّكُمَا عَنْ هَٰذِهِ الشَّجَرَةِ إِلَّا أَن تَكُونَا مَلَكَيْنِ أَوْ تَكُونَا مِنَ الْخَالِدِينَ﴾

২০) তারপর তাদের লজ্জাস্থান, যা তাদের পরষ্পর থেকে গোপন রাখা হয়েছিল, তাদের সামনে উন্মুক্ত করে দেবার জন্যে শয়তান তাদেরকে কুমন্ত্রণা দিল। সে তাদেরকে বললোঃ তোমাদের রব যে, তোমাদের এ গাছটির কাছে যেতে নিষেধ করেছেন তার পেছনে এ ছাড়া আর কোন কারণই নেই যে, পাছে তোমরা ফেরেশতা হয়ে যাও অথবা তোমরা চিরন্তন জীবনের অধিকারী হয়ে পড়ো”।

﴿وَقَاسَمَهُمَا إِنِّي لَكُمَا لَمِنَ النَّاصِحِينَ﴾

২১) আর সে কসম খেয়ে তাদেরকে বললো, আমি তোমাদের যথার্থ কল্যাণকামী।

﴿فَدَلَّاهُمَا بِغُرُورٍ ۚ فَلَمَّا ذَاقَا الشَّجَرَةَ بَدَتْ لَهُمَا سَوْآتُهُمَا وَطَفِقَا يَخْصِفَانِ عَلَيْهِمَا مِن وَرَقِ الْجَنَّةِ ۖ وَنَادَاهُمَا رَبُّهُمَا أَلَمْ أَنْهَكُمَا عَن تِلْكُمَا الشَّجَرَةِ وَأَقُل لَّكُمَا إِنَّ الشَّيْطَانَ لَكُمَا عَدُوٌّ مُّبِينٌ﴾

২২) এভাবে প্রতারণা করে সে তাদের দুজনকে ধীরে ধীরে নিজের পথে নিয়ে এলো। অবশেষে যখন তারা সেই গাছের ফল আস্বাদন করলো, তাদের লজ্জা স্থান পরস্পরের সামনে খুলে গেলো এবং তারা নিজেদের শরীর ঢাকতে লাগলো জান্নাতের পাতা দিয়ে। তখন তাদের রব তাদেরকে ডেকে বললোঃ আমি কি তোমাদের এ গাছটির কাছে যেতে নিষেধ করিনি এবং তোমাদের বলিনি যে, শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু”?

﴿قَالَا رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ﴾

২৩) তারা দুজন বলে উঠলোঃ হে আমাদের রব! আমরা নিজেদের ওপর জুলুম করেছি। এখন যদি তুমি আমাদের ক্ষমা না করো এবং আমাদের প্রতি রহম না করো, তাহলে নিসন্দেহে আমরা ধ্বংস হয়ে যাবো”।

﴿قَالَ اهْبِطُوا بَعْضُكُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ ۖ وَلَكُمْ فِي الْأَرْضِ مُسْتَقَرٌّ وَمَتَاعٌ إِلَىٰ حِينٍ﴾

২৪) তিনি বললেনঃ নেমে যাওতোমরা পরষ্পরের শত্রু এবং তোমাদের জন্য একটি বিশেষ সময় পর্যন্ত পৃথিবীতেই রয়েছে বসবাসের জায়গা ও জীবন যাপনের উপকরণ”।

﴿قَالَ فِيهَا تَحْيَوْنَ وَفِيهَا تَمُوتُونَ وَمِنْهَا تُخْرَجُونَ﴾

২৫) আর বললেনঃ সেখানেই তোমাদের জীবন যাপন করতে এবং সেখানেই মরতে হবে এবং সেখান থেকেই তোমাদের সবশেষে আবার বের করে আনা হবে।”

নামকরণঃ

♦আরাফ মানেঃ উচু স্থান। যা আরবী عُرْفٌ শব্দের বহু বচন। উর্ধ্ব, উচু স্থান, প্রাচীরের উপরিভাগ, টিলাভূমি, ভূমি থেকে অপেক্ষাকৃত উচু স্থান ইত্যাদি বুঝাতে এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়।

আরাফ হলোঃ জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী একটি স্থান(الحاجز بين الجنة والنار)জান্নাত ও  জাহান্নামের মধ্যবর্তী একটি অন্তরায়। যেখান থেকে জান্নাত ও জাহান্নাম দেখা যাবে। এখানে জান্নাত প্রার্থী কিছু লোককে রাখা হবে। যেহেতু এই স্থানে অবস্থান করার কারণে সকলকে দেখা যাবে এবং একে অপরকে চিনতে পারবে, তাই এর নাম রাখা হয়েছে আরাফ।

♦ এই সূরায় জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝখানে উচু স্থানে অবস্থানকারী তথা আরাফের অধিবাসীদের সম্পর্কে আলোচনা হয়েছে বলে এই সূরার নামকরণ করা হয়েছেঃ সূরা আল আরাফ।

♦ এই সূরা ৪৬ নম্বর আয়াতে আরাফ শব্দকে এর নাম হিসাবে গ্রহণ করা হয়েছে।

﴿وَبَيْنَهُمَا حِجَابٌ ۚ وَعَلَى الْأَعْرَافِ رِجَالٌ يَعْرِفُونَ كُلًّا بِسِيمَاهُمْ ۚ وَنَادَوْا أَصْحَابَ الْجَنَّةِ أَن سَلَامٌ عَلَيْكُمْ ۚ لَمْ يَدْخُلُوهَا وَهُمْ يَطْمَعُونَ﴾ ﴿وَإِذَا صُرِفَتْ أَبْصَارُهُمْ تِلْقَاءَ أَصْحَابِ النَّارِ قَالُوا رَبَّنَا لَا تَجْعَلْنَا مَعَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ﴾

এ উভয় দলের মাঝখানে থাকবে একটি অন্তরাল৷ এর উচু স্থানে (আরাফ) অপর কিছু লোক থাকবে৷ তারা জান্নাতে প্রবেশ করেনি ঠিকই কিন্তু তারা হবে তার প্রার্থী৷  তারা প্রত্যেককে তার লক্ষণের সাহায্যে চিনে নেবেজান্নাতবাসীদেরকে ডেকে তারা বলবেঃ তোমাদের প্রতি শান্তি হোক! আর যখন তাদের দৃষ্টি জাহান্নামবাসীদের দিকে ফিরবে , তারা বলবেঃ হে আমাদের রব! এ জালেমের সাথে আমাদের শামিল করো না”  

♦ কুরআনে الْأَعْرَافِ শব্দটি এসেছে ২বার। এই সূরার ৪৬ এবং ৪৮ নম্বর আয়াতে।

আলোচ্য বিষয়ঃ

♦ কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তুঃ রিসালাতের প্রতি ঈমান আনার দাওয়াত।

♦ আলোচনা মূল উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যঃ আল্লাহর পাঠানো রাসূলকে মানার জন্য শ্রোতাদের উদ্বুদ্ধ করা।

  সতর্ক ও ভয় দেখানো হয়েছে মক্কাবাসীদেরকেযাতে তারা অতীতের জাতির মতো রাসূলকে অস্বীকার করার কারণে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন না হয়।

  দাওয়াতের ডিরেকশন-মক্কাবাসীদের থেকে ফিরিয়ে আহলে কিতাব ও সমগ্র মানুষের প্রতি পেশ করা হয়েছে। আর তা থেকে এই আভাস পাওয়া যায় যে, হিজরত নিকটবর্তী এবং রাসূলের জন্য শুধু নিকটের মানুষদের দাওয়াত দেয়ার যুগ শেষ হয়ে যাচ্ছে।

  ইহুদীদেরকেও সম্বোধণ করা হয়েছে।

  নবীর প্রতি ঈমান আনার পর ‍মুনাফেকী আচরণের পরিণাম কি, তা জানিয়ে দেয়া হয়েছে।

  শেষ পর্যায়ে দাওয়াতের কৌশল সম্পর্কে রাসূল সা. ও সাহাবায়ে কিরামদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। আর তাহলোঃ

. বিরুদ্ধবাদীদের উত্তেজনা সৃষ্টি, নিপীড়ন ও দমনমূলক কাজের মোকাবেলায় ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার নীতি অবলম্বন করা।

. আবেগ ও উত্তেজনার বশে মূল উদ্দেশ্যের ক্ষতি হতে পারে এমন কোন পদক্ষেপ গ্রহণ না করা।

নাযিলের সময়কাল

♦ মক্কী জীবনের শেষ দিকে নাযিল হওয়া সূরা সমূহের একটি সূরাসূরা আল আনআমের মতোই একটি সূরা।

♦ সূরা আনআম আগে নাযিল হয়েছে, না সূরা আল আরাফ-এ ব্যাপারে মুফাস্সিরগনের কোন সুস্পষ্ট বক্তব্য নাই। তবে সমসাময়িক সময়ে নাযিল হয়েছে বলে সকল মুফাস্সির একমত পোষন করেন।

♦ পার্থক্য এতটুকু যে, সূরা আল আনআম একসাথে নাযিল হয়েছে-যখন রাসূল সা. উটের উপর সওয়ার ছিলেন। আর সুরা আরাফ একসাথে নাযিল হয়নি।

♦ সূরা আল আনআমের বিষয়বস্তু যেমন ছিল আকীদাএই সূরার বিষয়বস্তুও আকীদা।

♦ সূরা আল আনআমে আকীদা সম্পর্কে শুধু বর্ণনা এসেছে। আর এই সূরাতে শুধু বর্ণনা নয়, বরং আকীদার বিষয়বস্তু, এর তাৎপর্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।

♦ সূরা নাযিলের সময়ে আরবের জাহিলিয়াতের চেহারা প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, অতীতের জাহিলিয়াতের মতো বর্তমানের জাহিলিয়াতের প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য একই ধরণের। যেমনঃ যুক্তিকে দেখেও না দেখা, ব্যক্তি স্বার্থের কারণে সকল যুক্তিকে উপেক্ষা করা।

ব্যাখ্যাঃ

﴿وَلَقَدْ خَلَقْنَاكُمْ ثُمَّ صَوَّرْنَاكُمْ ثُمَّ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لِآدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ لَمْ يَكُن مِّنَ السَّاجِدِينَ﴾

১১) আমি তোমাদের সৃষ্টির সূচনা করলাম তারপর তোমাদের আকৃতি দান করলাম অতপর ফেরেশতাদের বললাম,আদমকে সিজদা করো। এ নির্দেশ অনুযায়ী সবাই সিজদা করলো। কিন্তু ইবলীস সিজদাকারীদের অন্তরভুক্ত হলো না।  

﴿وَلَقَدْ خَلَقْنَاكُمْ ثُمَّ صَوَّرْنَاكُمْ ثُمَّ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لِآدَمَ ﴾ আমি তোমাদের সৃষ্টির সূচনা করলাম, তারপর তোমাদের আকৃতি দান করলাম, অতপর ফেরেশতাদের বললাম,আদমকে সিজদা করো।

♦ ইবনে জারিরের বক্তব্য, যা ইবনে কাসির উল্লেখ করেছেনঃ  

o এখান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা মানুষের পিতা আদম আ. এবং তার শত্রু ইবলিসের বর্ণনা দিচ্ছেন। যাতে করে আদমের সন্তানেরা ইবলিসকে শত্রু হিসাবে চিনের রেখে তার থেকে বাচতে পারে এবং ইবলিসের দেখানো পথে না চলে।

o لما خلق آدم عليه السلام بيده আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা আদম আ. কে নিজ হাতে তৈরী করলেন। কুন ফাইয়াকুনের মাধ্যমে নয়।

o আদমকে সেজদা করা মানে আদমের সম্মাণ বাড়ানোর বিষয় নয়, বরং কুদরতে ইলাহীকে সিজদা করা এবং তাঁর শান শওকতের সম্মাণ করা।

♦ এখানে বুঝানো হয়েছে, প্রথমে সৃষ্টির পরিকল্পনা করা হয়েছে। তারপর সৃষ্টির মৌলিক উপদান তৈরী করা হয়েছে। তারপর আকৃতি প্রদান করা হয়েছে। আকৃতি প্রদানের পর আদমকে জীবিত মানুষ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করানো হয়েছে। তারপর ফেরেশতাদেরকে সেজদার হুকুম দেয়া হলো।

♦ উপরোক্ত বক্তব্যের ব্যাখা করা হয়েছে সূরা ছোয়াদে৭১ ও ৭২ আয়াতে

﴿إِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَائِكَةِ إِنِّي خَالِقٌ بَشَرًا مِّن طِينٍ﴾  ﴿فَإِذَا سَوَّيْتُهُ وَنَفَخْتُ فِيهِ مِن رُّوحِي فَقَعُوا لَهُ سَاجِدِينَ﴾

সেই সময়ের কথা চিন্তা করো যখন তোমার রব ফেরেশতাদের বললেন, আমি মাটি থেকে একটা মানুষ তৈরী করবো তারপর যখন আমি সেটি পুরোপুরি তৈরী করে ফেলবো এবং তার মধ্যে নিজের রূহ থেকে কিছু ফূঁকে দেবো তখন তোমরা সবাই তার সমানে সিজদানত হবে”

♦ উপরোক্ত আয়াতের সারকথা হলোঃ

. মাটি থেকে একটি মানুষ সৃস্টি করা হবে।

. সৃষ্টির পর তার তাসউইয়া করা হবে বা আকারআকৃতি দেয়া হবে এবং দেহসৌষ্ঠব ও শক্তিসমর্থের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করা হবে।

. নিজের রূহ থেকে কিছু ফুঁকে দিয়ে আদমকে আদমকে অস্তিত্ব দান করা হবে।

♦ সূরা হিজরএ বিষয়টাকে উপস্থাপন করা হয়েছে আয়াত ২৭ ও ২৮

﴿وَإِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَائِكَةِ إِنِّي خَالِقٌ بَشَرًا مِّن صَلْصَالٍ مِّنْ حَمَإٍ مَّسْنُونٍ﴾  ﴿فَإِذَا سَوَّيْتُهُ وَنَفَخْتُ فِيهِ مِن رُّوحِي فَقَعُوا لَهُ سَاجِدِينَ﴾

আর সেই সময়টির কথা ভাবো যখন তোমার রব ফেরেশতাদের বললেন, আমি ছাঁচে ঢালা শুকনো ঠনঠনে মাটি থেকে একটি মানুষ সৃষ্টি করবো, তারপর যখন তাকে পুরোপুরি তৈরী করে ফেলবো তার মধ্যে নিজের রূহ থেকে কিছু ফুঁকে দেবো তখন তোমরা সবাই তার সামনে সিজদানত হবে।”

♦ মানুষের সৃষ্টি সূচনা কিভাবে হলো, কঠিন মাটির পিন্ড থেকে কিভাব মানুষ হলো, কিভাবে মানুষের আকারআকৃতি প্রদান করা হলো, কিভাবে সেই আকৃতির মাঝে ভারসাম্য তৈরী করা হলো, কিভাবে সেই আকৃতিতে ফুঁক দিয়ে প্রাণ প্রদান করা হলোইত্যাদির বিস্তারিত অনুধাবণ আমাদের পক্ষে করা অসম্ভব।

♦ কুরআনের এই বিবরণ ডারউইন প্রদত্ত মতবাদ সম্পর্কে বিপরীত অবস্থানে অবস্থান করছে। ডারউইনের মতবাদ হলো, মানুষ পূর্ণ অমানবিক বা অর্ধমানবিক অবস্থান থেকে নানাবিধ স্তর অতিক্রম করে বিভিন্ন বিবর্তনের মাধ্যমে বর্তমান অবস্থানে এসেছে। তবে অমানবিক অবস্থা থেকে মানবিক অবস্থায় পৌছার কোন কেন্দ্র বিন্দু ঐ মতবাদেও উল্লেখিত হয়নি।

♦ কুরআনের বক্তব্য সুস্পষ্ট। আর তা হলোঃ মানুষের বংশধারার সূচনা একটি নির্ভেজাল মানবিক অস্তিত্ব থেকে। কোন অমানবিক ধারার সাথে ইতিহাসের কোন কোন কালে কোন সম্পর্ক ছিল না। মানুষের জীবনের প্রথম দিন থেকে মানুষ মানুষ হিসাবে এবং পরিপূর্ণ মানবিক চেতনা নিয়েই সৃষ্টি হয়েছে এবং তার জীবনের সূচনা হয়েছে।

♦ মানুষের ইতিহাস সম্পর্কে দুইটি ভিন্ন ধর্মী দৃষ্টিকোন থেকে মানুষ সম্পর্ক দুইটি বিপরীত ধর্মী চিন্তাধারাঃ

. মানুষ জীবজন্তু ও পশু জগতের একটি শাখাঃ মানুষ পশু পাখির ন্যায় এক প্রকারের পশু। বিধায়, তার নৈতিক ও চারিত্রিক আইন তেমনপশু পাখির নৈতিক ও চারিত্রিক আইন যেমন। বিধায়, পশুরা যে ধরণের জীবন ধারা সেই জীবন ধারাই একটি স্বাভাবিক জীবন ধারা। মানুষ আর পশুর মাঝে পার্থক্য হলোঃ মানুষ যন্ত্রপাতি, কলকারখান, শিল্পসভ্যতাসংস্কৃতির সূক্ষ্ন ও নিপুণ কারুকার্য অবলম্বন করে, পশু তা করতে পারে না।

. মানুষ মানুষইস্বতন্ত্র একটি স্বত্ত্বা, স্বতন্ত্র একটি সৃষ্টিঃ মানুষ কেবল বাকশক্তি সম্পন্ন ও সামাজিক ও সংস্কৃতিবান জন্তু নয়, বরং মানুষ পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি। মানুষ কেবলমাত্র বাকশক্তি বা সামাজিকতাবোধের কারণে অন্য জীব ও প্রাণী থেকে আলাদা হয় না। বরং মানুষের নৈতিক দায়িত্ব, ক্ষমতা, এখতিয়ারযা আল্লাহ থেকে পাওয়া, যার ভিত্তিতে আল্লাহর সামনে মানুষকে জবাবদিহি করতে হবেএর কারণে মানুষ জীব জন্তু থেকে আলাদা। আর এর কারণে মানুষ এবং মানুষের সাথে সম্পর্কিত সকল বিষয় ও দৃষ্টিকোণ পশু জাতীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে যায়। আর এই ‍দৃষ্টিকোণের কারণে মানুষ একটি জীবন দর্শন ও একটি নৈতিকসাংস্কৃতিক ব্যবস্থার মূলনীতির অনুসন্ধান করার জন্য তার সৃষ্টিকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে উপরের দিকে উঠায়।

♦ একটি প্রশ্নমানুষ সম্পর্কিত দ্বিতীয় ধারণা নৈতিক ও মনস্তাত্বিক দিক দিয়ে উন্নত পর্যায়ের ধারণা। কিন্তু তা কল্পনা নির্ভর। অথচ প্রথম ধারণাটি যুক্তি ও তথ্য নির্ভর। তাহলে তাকে কিভাব রদ করা হবে?

উত্তর হচ্ছেঃ

   উত্তরটি একটি পাল্টা প্রশ্নের মাধ্যমে। আর তাহলো: ডারউইনের বিবর্তনবাদ কি বৈজ্ঞানিক যুক্তি বা তথ্যের মাধ্যমে প্রমাণিত?

   এই ধারণা কেবলমাত্র সে সব লোকেরা সত্য মনে করে ভ্রান্তিতে লিপ্ত, যারা বিজ্ঞান সম্পর্কে ভাসা ভাসা ও স্থুল জ্ঞান রাখেন।

   বিজ্ঞান সম্পর্কে যারা বিশেষজ্ঞ এবং অনুসন্ধান বিশারদ, তারা জানেন যে, গুটিকয় শব্দ ও হাড়গোড়ের লম্বা চওড়া ফিরিস্তি সত্ত্বেও এটি এখনো একটি মতবাদের পর্যায়েই রয়ে গেছে। যে সব যুক্তিকে প্রমাণ্য বলা হচ্ছে, তা কেবলমাত্র সম্ভাব্যতার পর্যায়ে রয়েছে।

   ডারউইনের মতবাদ সম্পর্কে ঠিক ততটুকু বলা যায়: সম্ভাবনা ঠিক কতটুকু, যতটুকু সম্ভাবনা আছে সরাসরি সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমে এক একটি শ্রেণীর পৃথক অস্তিত্ব লাভের।

♦ কাতাদাহ র. ও যহহাক র. এর মতেঃ خَلَقْنَاكُمْ প্রথমে আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর ثُمَّ صَوَّرْنَاكُمْ মানে পরে তার সন্তানদের আকৃতি প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু যেহেতু পরে বলা হয়েছে, ثُمَّ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لِآدَمَ বিধায় এখানে ثُمَّ আসার  কারণে এই ব্যাখ্যা মানা যায়না বলে ইবনে কাসির উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এর মাধ্যমে আদম আ.কেই বুঝানো হয়েছে। আর বহু বচন ব্যবহার করা হয়েছে আদম আ. মানব জাতির প্রতিনিধিত্ব করছেন বলে।

♦ ইবনে আব্বাস রা. এর মতেঃ প্রথমে মানুষকে পুরুষের পিট থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। তার পর মায়ের পেটে তার আকৃতি প্রদান করা হয়েছে।

♦ এখানে প্রশ্ন থেকে যায় যে, সূরা মুমিনুনে আল্লাহ বলেছেনঃ মানুষকে মাটির উপাদান থেকে তৈরী করা হয়েছে। সেই উপাদান পরে নুতফাতে পরিবর্তিত করা হয়েছে। সেই নুতফাকে রক্ত পিন্ড, মাংস পিন্ড, হাড় ইত্যাদিতে রূপান্তর করা হয়েছে। তাহলে মানুষকে মাটি থেকে তৈরী করার মানে কি?

وَلَقَدۡ خَلَقۡنَا الۡاِنۡسَانَ مِنۡ سُلٰلَةٍ مِّنۡ طِيۡنٍ‌ۚ‏ ثُمَّ جَعَلۡنٰهُ نُطۡفَةً فِىۡ قَرَارٍ مَّكِيۡنٍ ثُمَّ خَلَقۡنَا النُّطۡفَةَ عَلَقَةً فَخَلَقۡنَا الۡعَلَقَةَ مُضۡغَةً فَخَلَقۡنَا الۡمُضۡغَةَ عِظٰمًا فَكَسَوۡنَا الۡعِظٰمَ لَحۡمًاثُمَّ اَنۡشَاۡنٰهُ خَلۡقًا اٰخَرَ‌ؕ فَتَبٰرَكَ اللّٰهُ اَحۡسَنُ الۡخٰلِقِيۡنَؕ‏

১২) আমি মানুষকে তৈরী করেছি মাটির উপাদান থেকে, ১৩) তারপর তাকে একটি সংরক্ষিত স্থানে টপ্‌কে পড়া ফোঁটায় পরিবর্তিত করেছি,  ১৪) এরপর সেই ফোঁটাকে জমাট রক্তপিন্ডে পরিণত করেছি, তারপর সেই রক্তপিন্ডকে মাংসপিন্ডে পরিণত করেছি, এরপর মাংসপিন্ডে অস্থি-পঞ্জর স্থাপন করেছি, তারপর অস্থি-পঞ্জরকে ঢেকে দিয়েছি গোশত দিয়ে, তারপর তাকে দাঁড় করেছি স্বতন্ত্র একটি সৃষ্টি রূপে। কাজেই আল্লাহ বড়ই বরকত সম্পন্ন, সকল কারিগরের চাইতে উত্তম কারিগর তিনি।

এর উত্তর হচ্ছেঃ

   আদম আ.কে মাটি থেকে তৈরী করা হয়েছে। আর আদম সন্তানদের নুতফা থেকে তৈরী করা হয়েছে। আর ঐ নুতফার উপাদান হচ্ছেঃ মাটি।

   চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বলছেনঃ মানুষের শরীরে নুতফার তৈরী হয় খাবার থেকে। আর মানুষ যত ধরণের খাবার গ্রহণ করে, তার সবই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে মাটির সংমিশ্রণে তৈরী।

♦ আদম আ. কে সেজদা করার নির্দেশের অর্থঃ এই নয় যে, ব্যক্তি আদমকে সেজদা করা। বরং এই নির্দেশের অর্থ হচ্ছে, মানব জাতির প্রতিনিধিত্বশীল ব্যক্তি হিসাবে আদমকে সিজদা করানো হয়েছিল।

♦ গাইরুল্লাহকে সিজদা করা প্রসংগেঃ

  ইমাম ইবনে তাইমিয়ার মতে, গাইরুল্লাহর জন্য সিজদা করা আল্লাহর হুকুমে। আল্লাহর হুকুম পালন করা ইবাদত। যেমনঃ পাথর পুজা শিরক, কিন্তু হাজারে আসওয়াদকে চুমা দেয়া সুন্নাত। এ ব্যাপারে হযরত উমরের উক্তিটি উল্লেখ যোগ্যঃ

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ سَرْجِسَ، قَالَ رَأَيْتُ الأَصْلَعَ – يَعْنِي عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ – يُقَبِّلُ الْحَجَرَ وَيَقُولُ وَاللَّهِ إِنِّي لأُقَبِّلُكَ وَإِنِّي أَعْلَمُ أَنَّكَ حَجَرٌ وَأَنَّكَ لاَ تَضُرُّ وَلاَ تَنْفَعُ وَلَوْلاَ أَنِّي رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَبَّلَكَ مَا قَبَّلْتُكَ ‏.‏ وَفِي رِوَايَةِ الْمُقَدَّمِيِّ وَأَبِي كَامِلٍ رَأَيْتُ الأُصَيْلِعَ

আবদুল্লাহ ইবনু সারজিস রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি লৌহ মানব অর্থাৎ উমর ইবনুল খাত্ত্বাব রা. কে কালো পাথর হাজারে আসওয়াদ চুমো দিতে দেখেছি এবং তিনি বলেছেন, আল্লাহর শপথ আমি অবশ্যই তোমাকে চুম্বন করব এবং আমি অবশ্যই জানি যে, তুমি একটি পাথর, তুমি কারও ক্ষতিও করতে পার না এবং উপকারও করতে পার না। আমি যদি রসূলুল্লাহ সা. কে তোমায় চুম্বন করতে না দেখতাম তবে আমি তোমায় চুম্বন করতাম না।

  অন্যকথাঃ সেজদা আল্লাহর জন্য করা হয়, আদমকে নয়। যেমনঃ কাবার দিকে সেজদা করা হয়।

  সেজদাঃ মানে সিজদা নয়, আনুগত্য। সেজদা দুই ধরণেরঃ ১. শারিরিক। ২. মানসিক।

  সেজদার বিষয়টা ছিল অন্য জগতে। বিধায়, এই বিষয়টাকে দলীল বানিয়ে এটাকে পৃথিবীতে নিয়ে আসা যাবে না

  গাইরুল্লাহকে সিজদার পারমিশন আল্লাহর পক্ষ থেকে নাই। হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছেঃ

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ “‏ لَوْ كُنْتُ آمِرًا أَحَدًا أَنْ يَسْجُدَ لأَحَدٍ لأَمَرْتُ الْمَرْأَةَ أَنْ تَسْجُدَ لِزَوْجِهَا

আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেনঃ আমি যদি কাউকে অন্য কোন লোকের প্রতি সিজদা করার নির্দেশ দিতাম তাহলে অবশ্যই স্ত্রীকে তার স্বামীর প্রতি সিজদা করার নির্দেশ দিতাম। (এর মানেই হচ্ছে, আদম সন্তানকে অন্য কাউকে সেজদা করার অনুমতি দেয়া হয়নি)।

  সেজদার নির্দেশ ছিল ফেরেশতাদের জন্য। ফেরেশতাদের জন্য যে শরীয়াতে, আদমের জন্য একই শরীয়াত নয়।

﴿ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ لَمْ يَكُن مِّنَ السَّاجِدِينَ﴾ এ নির্দেশ অনুযায়ী সবাই সিজদা করলো। কিন্তু ইবলীস সিজদাকারীদের অন্তরভুক্ত হলো না।  

♦ ইবলিস শব্দের অর্থঃ চরম হতাশ।

♦ ইবলিস কি ফেরেশতা ছিল নাকি?

  আল্লাহর রাসূলের একটি হাদীস থেকে আমরা জানতে পারিঃ

عن عائشة رضي الله عنها قالت قال رسول الله صلى الله عليه وسلم خلقت الملائكة من نور، وخلق إبليس من مارج من نار، وخلق آدم مما وصف لكم

হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেনঃ ফেরেশতাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে নূর থেকে, আর ইবলিসকে সৃষ্টি করা হয়েছে আগুনের শিখা থেকে, আর আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে তোমাদের কাছে যে ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে তথা মাটি দ্বারা।

  ইবলিস নিজেই দাবী করেছে যে তাকে আগুন থেকে তৈরী করা হয়েছে, এজন্য সে মাটির তৈরী আদমকে সেজদা করেনি। আর উপরোক্ত হাদীস থেকে আমরা জানতে পারলাম, আগুন থেকে তৈরী করা সৃষ্টির নাম ইবলিস।

  উপরোক্ত হাদীস থেকে আমরা আরও জানলাম যে, নুর থেকে সৃষ্টি করা সৃষ্টির নাম ইবলিস নয়, বরং ফেরেশতা।

﴿قَالَ مَا مَنَعَكَ أَلَّا تَسْجُدَ إِذْ أَمَرْتُكَ ۖ قَالَ أَنَا خَيْرٌ مِّنْهُ خَلَقْتَنِي مِن نَّارٍ وَخَلَقْتَهُ مِن طِينٍ﴾

১২) আল্লাহ জিজ্ঞেস করলেন, “আমি যখন তোকে হুকুম দিয়েছিলাম তখন সিজদা করতে তোকে বাধা দিয়েছিল কিসে”? সে জবাব দিলঃ আমি তার চাইতে শ্রেষ্ঠ। আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছো এবং ওকে সৃষ্টি করেছো মাটি থেকে”। 

﴿قَالَ مَا مَنَعَكَ أَلَّا تَسْجُدَ إِذْ أَمَرْتُكَ ۖ قَالَ أَنَا خَيْرٌ مِّنْهُ خَلَقْتَنِي مِن نَّارٍ وَخَلَقْتَهُ مِن طِينٍ﴾ আল্লাহ জিজ্ঞেস করলেন, “আমি যখন তোকে হুকুম দিয়েছিলাম তখন সিজদা করতে তোকে বাধা দিয়েছিল কিসে”? সে জবাব দিলঃ আমি তার চাইতে শ্রেষ্ঠ৷ আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছো এবং ওকে সৃষ্টি করেছো মাটি থেকে”। 

♦ হযরত আয়েশা রা. বর্ণিত হাদীসঃ যা তিনটি ভাষায় বর্ণনা পাওয়া যায়।

عن عائشة رضي الله عنها قالت قال رسول الله صلى الله عليه وسلم

خلقت الملائكة من نور، وخلق إبليس من مارج من نار، وخلق آدم مما وصف لكم

خلق الله الملائكة من نور العرش، وخلق الجان من مارج من نار، وخلق آدم مما وصف لكم

وخلقت الحور العين من الزعفران

হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেনঃ ফেরেশতাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে নূর থেকে, আর ইবলিসকে সৃষ্টি করা হয়েছে আগুনের শিখা থেকে, আর আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে তোমাদের কাছে যে ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে তথা মাটি দ্বারা। আর হুর তৈরী করা হয়েছে জাফরান থেকে।

♦ ইবলিসের যুক্তিঃ

   –   সে আগুনের তৈরীযা ধর্ম হলো উর্ধ্বগামী। সে তার সৃষ্টি উপাদান অনুযায়ী নিম্নগামী হওয়ার নয়।

   –   মাটির ধর্ম হলোঃ ধৈর্য, সহিষ্ঞুতা, নম্রতা, স্থিরতা। যা লাতা পাতা আর উদ্ভিদ জন্মার স্থানযা সব সময় নিম্নগামী হয়।

♦ ইবলিসের এই যুক্তি খন্ডনঃ

   –   ইবলিস আদম সৃষ্টির উপাদানের প্রতি নজর দিয়েছে, তার সৃষ্টি প্রক্রিয়ার দিকে নজর দেয়নি। যেখানে আদমকে তৈরী করেছেন আল্লাহ নিজ হাতেকুন ফাইয়াকুনের মাধ্যমে নয়। যার মাঝে আল্লাহ নিজে রূহকে ভরে দিয়েছেন।

   –   ইবলিসী বক্তব্যে ‍যুক্তি দেয়া হয়েছে। মনে রাখতে হবেচন্দ্র সূর্যের ইবাদতও কিয়াসের উপর ভিত্তি করে শুরু হয়েছিল।

   –   আল্লাহর শানে আরগুমেন্ট পেশের কোন সুযোগ নাই। কিন্তু সে আরগুমেন্ট পেশ করেছে। যা ছিল ঔদ্যত্তপূর্ণ আচরণ।

♦ ইবলিকে তো নির্দেশ করা হয়নি, তাহলে সে কেন সেজদা করবে এবং না করার কারণে অভিশপ্ত হবে?

   –   সমাবেশের অধিকাংশরা ফেরেশতা ছিল, কিন্তু নির্দেশটি সমাবেশের সকলের জন্য ছিল।

   –   নির্দেশে যে ইবলিস অন্তর্ভূক্ত ছিল, একথা ইবলিসও বুঝেছে। বিধায়, সে এ কথা বলেনি যেসেজদা করার জন্য তো ফেরেশতাদের বলা হয়েছে, আমাকে বলা হয়নি।

   –   পুরুষ মহিলা একটি সমাবেশে উপস্থিত থাকলে আমরা কোন কোন সময় আমরা শুধু পুরুষকে সম্মোধন করে কথা বলি। এর দ্বারা মহিলাদেরকেও তথা সমাবেশে উপস্থিত সকলকে বুঝায়।

   –   ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতির একটি ছোট সংখ্যার মাঝে একজন ছিল ইবলিস। যে ফেরেশতাদের সাথে চলা ফেরা ছিল। বিধায় মাত্র ১জনের জন্য আলাদা সম্বোধনের প্রয়োজন ছিল না।

﴿قَالَ فَاهْبِطْ مِنْهَا فَمَا يَكُونُ لَكَ أَن تَتَكَبَّرَ فِيهَا فَاخْرُجْ إِنَّكَ مِنَ الصَّاغِرِينَ﴾

১৩) তিনি বললেনঃ ঠিক আছে, তুই এখান থেকে নীচে নেমে যা। এখানে অহংকার করার অধিকার তোর নেই। বের হয়ে যা। আসলে তুই এমন লোকদের অন্তরভুক্ত, যারা নিজেরাই নিজেদেরকে লাঞ্ছিত করতে চায়”।

﴿قَالَ فَاهْبِطْ مِنْهَا فَمَا يَكُونُ لَكَ أَن تَتَكَبَّرَ فِيهَا فَاخْرُجْ ﴾ তিনি বললেনঃ ঠিক আছে, তুই এখান থেকে নীচে নেমে যা। এখানে অহংকার করার অধিকার তোর নেই। বের হয়ে যা

♦ অর্থাৎ আমার অবাধ্যতার কারণে এবং আমার আনুগত্যহীনতার কারণে তুমি এখান থেকে বেরিয়ে যাও। তুমি তাকাব্বুরি বা অহংকার করেছো, তোমার অহংকার করার কোন অধিকার ছিল না। কারণ অহংকার হচ্ছে কেবল আল্লাহর জন্য।

مِنْهَا বা এখান থেকে বলতে কি বুঝানো হয়েছে?

   –   এখান থেকে বলতে কেউ কেউ জান্নাতকে বুঝিয়েছেন।

   –   আবার কেউ কেউ ইবলিসের মর্যাদা “মালাকুতি আলা” পদকে বুঝিয়েছেন।

﴿ إِنَّكَ مِنَ الصَّاغِرِينَ﴾ আসলে তুই এমন লোকদের অন্তরভুক্ত, যারা নিজেরাই নিজেদেরকে লাঞ্ছিত করতে চায়

♦ আয়াতে صَّاغِرِينَ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। صَّاغِرِ শব্দের অর্থ হলোঃ লাঞ্ছনা ও অবমাননার মধ্যে সন্তুষ্ট থাকা। যে নিজেই লাঞ্ছনা, অবমাননা ও নিকৃষ্টতর অবস্থা অবলম্বন করে, তাকে صَّاغِرِ বলা হয়।

إِنَّكَ مِنَ الصَّاغِرِينَ  এর মানে হলোঃ

   –   আল্লাহর গোলাম এবং সৃষ্টি হওয়া সত্ত্বেও নিজে অহংকারে নিমজ্জিত হওয়া।

   –   নিজের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের একটি ধারণা নিজে নিজে তৈরী করে নেয়া।

   –   আর নিজে নিজে নিজের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা তৈরীর মাধ্যমে নিজেকে নিজে অপমানিত করে, লাঞ্ছিত করে।

   –   এই মিথ্যা অহমিকা আর মর্যাদার ভিত্তিছাড়া দাবী, নিজের জন্মগত ও নির্ধারিত অধিকার ছাড়া নিজে নিজেই নিজেকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে আসীন করার মাধ্যমে নিজেকে বড়, শ্রেষ্ঠ ও মর্যাদাশালী করতে পারে।

   –   এই ধরণের কাজ করার মাধমে নিজে মিথ্যুক প্রমাণিত হবে, লাঞ্ছিত হবে এবং অপমাণিত হবে।

   –   এই অবস্থার তথা লাঞ্ছনার কারণ হবে সে নিজে।

﴿قَالَ أَنظِرْنِي إِلَىٰ يَوْمِ يُبْعَثُونَ﴾

১৪) সে বললঃ আমাকে সেই দিন পর্যন্ত অবকাশ দাও যখন এদের সবাইকে পুনর্বার ওঠানো হবে”।

﴿قَالَ أَنظِرْنِي إِلَىٰ يَوْمِ يُبْعَثُونَ﴾ সে বললঃ আমাকে সেই দিন পর্যন্ত অবকাশ দাও যখন এদের সবাইকে পুনর্বার ওঠানো হবে”।

♦ ইবলিসের অনুসারীদের বয়স বেশী হয়।

﴿قَالَ إِنَّكَ مِنَ الْمُنظَرِينَ﴾

১৫) তিনি বললেনঃ তোকে অবকাশ দেয়া হলো”।

﴿قَالَ إِنَّكَ مِنَ الْمُنظَرِينَ﴾ তিনি বললেনঃ তোকে অবকাশ দেয়া হলো।

♦ ইবলিস কিয়ামত অবধি অবকাশ পেল।

♦ এই অবকাশ পেয়ে সে ‍বিদ্রোহ ও একগুঁয়েমী শুরু করলো।

♦ ইবলিস বললোহে আল্লাহ! যেমনভাবে আপনি আমাকে পথভ্রষ্ট করে দিলেন, তেমনি ভাবে আমিও আদম সন্তানদেরকে সিরাতাল মুস্তাকীম থেকে বিভ্রান্ত করবো।

﴿قَالَ فَبِمَا أَغْوَيْتَنِي لَأَقْعُدَنَّ لَهُمْ صِرَاطَكَ الْمُسْتَقِيمَ﴾

১৬) সে বললোঃ তুমি যেমন আমাকে গোমরাহীতে নিক্ষেপ করছো তেমনি আমি ও এখন তোমার সরল-সত্য পথে এ লোকদের জন্যে ওঁত পেতে বসে থাকবো,

﴿قَالَ فَبِمَا أَغْوَيْتَنِي ﴾ সে বললোঃ তুমি যেমন আমাকে গোমরাহীতে নিক্ষেপ করছো

♦ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. أَغْوَيْتَنِي এর অর্থ  করেছেনআবার  أَضْلَلْتَنِي  আবার কেউ কেউ এর অর্থ করেছেনأَهْلَكْتَنِي

♦ শয়তানকে গোমরাহীতে নিক্ষেপ করার মানেঃ

   –   এর মাধ্যমে শয়তান তার গোনাহের দায় আল্লাহর উপর চাপাচ্ছে। আল্লাহকে দোষারোপ করছে।

   –   শয়তানের অভিযোগঃ

o   আদমকে সিজদা করার অর্ডার দিয়ে তাকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ঠেলে দেয়া হয়েছে।

o   নিজের আত্মাভিমান ও আত্মম্ভরিতায় আঘাত দিয়ে এই অবস্থায় ফেলা হয়েছে।

o   যার কারণে আমি নাফরমানী করেছি।

o   শয়তান নিজের অহমিকা ও বিদ্রোহ লুকিয়ে রেখেছিল। যা সে গোপনই রাখতে চেয়েছিল।

o   এই অহমিকা ও বিদ্রোহ লুকিয়ে রাখা একধরণের হীন ও নির্বোধ আচরণ। বিধায় এর কোন জবাব আল্লাহ দেননি।

﴿ لَأَقْعُدَنَّ لَهُمْ صِرَاطَكَ الْمُسْتَقِيمَ﴾ তেমনি আমি ও এখন তোমার সরল-সত্য পথে এ লোকদের জন্যে ওঁত পেতে বসে থাকবো,

صِرَاطَكَ الْمُسْتَقِيمَ বলতেঃ

o    طريق الحق، وسبيل النجاة সত্য পথ বা মুক্তির পথ বুঝানো হয়েছে।

o   মুজাহিদ রাহ. বলেছেনঃ  صراطك المستقيم يعني الحق সিলাতিকাল মুস্তাকিম মানে সত্যের পথ।

o   মুহাম্মদ বলেছেনঃ طريق مكة মক্কার পথ।

o   ইবনে জারির বলেছেনঃ أن الصراط المستقيم أعم من ذلك এই শব্দটি সমুদয় অর্থের জন্য আম।

♦ একথার মাধ্যমে ইবলিস আল্লাহকে চ্যালেঞ্জ দিয়েছে।  এর মাধ্যমে সে বিদ্রেুাহ ও একগুয়েমী শুরু করলো।

♦ ইবলিসের চ্যালেঞ্জের বিষয় হলো, আল্লাহর কাছে এটা প্রমাণ করা যে, মানুষ শ্রেষ্ট নয়-বরং সে নিজে শ্রেষ্ট।

♦ ইবলিস প্রমাণ করতে চায়ঃ কিয়ামত পর্যন্ত অবকাশের সুযোগ নিয়ে, সুযোগের যথাযথ ব্যবহার করে কাজ করা। সেই কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করা যে, ইবলিসের মোকাবেলায় মানুষকে যে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করা হয়েছে, মাটির তৈরী মানুষ সেই মর্যাদার যোগ্য নয়। বরং সে নাফরমান, নিমক হারাম এবং অকৃতজ্ঞ।

♦ ইবলিসের অবকাশ মানে শুধু সময়ের অবকাশ নয়, বরং কাজ করার সব ধরণের সুযোগের অবকাশ। মানুষকে বিভ্রান্ত করে, মানুষের দূর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে তাকে অযোগ্য প্রমাণ করার অবকাশ।

♦ ইবলিসের অবকাশের আবেদন আল্লাহ মনজুর করেছেন। সূরা বনী ইসরাঈলে বলা হয়েছেঃ

﴿وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لِآدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ قَالَ أَأَسْجُدُ لِمَنْ خَلَقْتَ طِينًا﴾﴿قَالَ أَرَأَيْتَكَ هَٰذَا الَّذِي كَرَّمْتَ عَلَيَّ لَئِنْ أَخَّرْتَنِ إِلَىٰ يَوْمِ الْقِيَامَةِ لَأَحْتَنِكَنَّ ذُرِّيَّتَهُ إِلَّا قَلِيلًا﴾﴿قَالَ اذْهَبْ فَمَن تَبِعَكَ مِنْهُمْ فَإِنَّ جَهَنَّمَ جَزَاؤُكُمْ جَزَاءً مَّوْفُورًا﴾﴿وَاسْتَفْزِزْ مَنِ اسْتَطَعْتَ مِنْهُم بِصَوْتِكَ وَأَجْلِبْ عَلَيْهِم بِخَيْلِكَ وَرَجِلِكَ وَشَارِكْهُمْ فِي الْأَمْوَالِ وَالْأَوْلَادِ وَعِدْهُمْ ۚ وَمَا يَعِدُهُمُ الشَّيْطَانُ إِلَّا غُرُورًا﴾﴿إِنَّ عِبَادِي لَيْسَ لَكَ عَلَيْهِمْ سُلْطَانٌ ۚ وَكَفَىٰ بِرَبِّكَ وَكِيلًا﴾

৬১) আর স্মরণ করো, যখন আমি ফেরেশতাদের বললাম, আদমকে সিজদা করো, তখন সবাই সিজদা করলো কিন্তু ইবলীস করলো নাসে বললো, “আমি কি তাকে সিজদা করবো যাকে তুমি বানিয়েছো মাটি দিয়ে?  ৬২) তারপর সে বললো, দেখোতো ভালো করে, তুমি যে একে আমার ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছো, এ কি এর যোগ্য ছিল? যদি তুমি আমাকে কিয়ামতের দিন পর্যন্ত অবকাশ দাও তাহলে আমি তার সমস্ত সন্তান সন্ততির মূলোচ্ছেদ করে দেবো, মাত্র সামান্য কজনই আমার হাত থেকে নিস্তার পাবে৬৩) আল্লাহ বললেন, ঠিক আছে, তুমি যাও, এদের মধ্য থেকে যারাই তোমার অনুসরণ করবে তুমিসহ তাদের সবার জন্য জাহান্নামই হবে পূর্ণ প্রতিদান৬৪) তুমি যাকে যাকে পারো তোমার দাওয়াতের মাধ্যমে পদস্খলিত করো, তাদের ওপর অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনীর আক্রমণ চালাও, ধন-সম্পদে ও সন্তান-সন্ততিতে তাদের সাথে শরীক হয়ে যাও এবং তাদেরকে প্রতিশ্রুতির জালে আটকে ফেলো, আর শয়তানের প্রতিশ্রুতি ধোঁকা ছাড়া আর কিছুই নয়। ৬৫) নিশ্চিতভাবেই আমার বান্দাদের ওপর তোমার কোনো কর্তৃত্ব অর্জিত হবে না এবং ভরসা করার জন্য তোমার রবই যথেষ্ট 

♦ এখানে শয়তানকে যে ক্ষমতা ও ইখতিয়ার দেয়া হয়েছে, তাহলোঃ

   শয়তান আদম আ. ও তার সন্তানদের সত্য পথ থেকে সরিয়ে নেয়ার জন্য নিজের ইচ্ছামত কৌশল অবলম্বন করতে পারবে।

   শয়তানের নেয়া কর্মকৌশলে আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন বাঁধা দেয়া হবে না।

   শয়তানের নেয়া কৌশলে মানুষ বিভ্রান্ত হবার পথ খোলা থাকবে।

   কিন্তু এখানে একটা শর্ত আছে। তা হলোঃ إِنَّ عِبَادِي لَيْسَ لَكَ عَلَيْهِمْ سُلْطَانٌ  অর্থাৎ “আমার বান্দাদের ওপর তোমার কোন কর্তৃত্ব থাকবে না এর মানে-

o   জবরদস্তি করে তাদেরকে তোমার পথে নেয়ার ক্ষমতা দেয়া হবে না। কেবল,

o   বিভ্রান্তির মাঝে নিক্ষেপ করা যাবে।

o   মিথ্যা আশার ছলনায় ভূলানো যাবে।

o   খারাপ কাজ আর গোমরাহীকে সুন্দর আকৃতি দিয়ে উপস্থাপন করতে পারবে।

o   ভোগ বিলাসের আনন্দ আর স্বার্থে লোভ দেখিয়ে ভূল পথে আহবান করতে পারবে।

   সূরা ইবরাহীমের ২২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেঃ কিয়ামতের দিন আল্লাহর আদালত থেকে ফায়সালা শুনিয়ে দেবার পর শয়তান তার অনুসারী মানুষদেরকে বলবেঃ

﴿وَمَا كَانَ لِيَ عَلَيْكُم مِّن سُلْطَانٍ إِلَّا أَن دَعَوْتُكُمْ فَاسْتَجَبْتُمْ لِي ۖ فَلَا تَلُومُونِي وَلُومُوا أَنفُسَكُم ﴾

তোমাদের ওপর আমার তো কোন জবরদস্তি ছিল না, আমার অনুসরণ করার জন্যে আমি তোমাদের বাধ্য করিনি আমি তোমাদেরকে আমার পথের দিকে আহবান জানিয়েছিলাম, এর বেশী আমি কিছুই করিনি আর তোমরা আমার আহবান গ্রহণ করেছিলে কাজেই এখন আমাকে তিরষ্কার করো না বরং তোমাদের নিজেদেরকেই তিরস্কার করো”

♦ শয়তান কিভাবে সিরাতাল মুসতাকিমে বসে থাকে, সে সম্পর্কে রাসূল সা. এর হাদীস বর্ণনা করেছেন সাবুরা ইবনে আবিল ফাকাহ রা. তিনি বলেন, আমি রাসূল সা. কে বলতে শুনেছি:

إن الشيطان قعد لابن آدم بطرقه، فقعد له بطريق الإسلام، فقال أتسلم وتذر دينك ودين آبائك؟ قال فعصاه وأسلم ” قال ” قعد له بطريق الهجرة، فقال أتهاجر وتدع أرضك وسماءك، وإنما مثل المهاجر كالفرس في الطول؟ فعصاه وهاجر، ثم قعد له بطريق الجهاد وهو جهاد النفس والمال، فقال تقاتل فتقتل، فتُنكَح المرأة، ويقسم المال؟ قال فعصاه وجاهد ” وقال رسول الله صلى الله عليه وسلم ” فمن فعل ذلك منهم فمات، كان حقاً على الله أن يدخله الجنة، وإن قتل، كان حقاً على الله أن يدخله الجنة، وإن غرق، كان حقاً على الله أن يدخله الجنة، أو وقصته دابة، كان حقاً على الله أن يدخله الجنة

বনি আদমকে প্রতারিত করার জন্য শয়তান বনি আদমের চলার পথে বসে পড়ে। সে প্রতারিত করার জন্য ইসলামের পথে বসে পড়ে এবং বলে তুমি কি ইসলাম গ্রহণ করবে আর তোমার এবং তোমার বাপ দাদার ধর্ম ত্যাগ করবে?“ এরপর ঐ লোকটা যখন শয়তানের অবাধ্য হয়ে ইসলাম গ্রহণ করে, তখন শয়তান হিজরতের রাস্তায় এসে অবস্থান গ্রহণ করে এবং বলে, তমি নিজের জন্মভূমি আর নিজের আকাশ ত্যাগ করছো কেন? মুহাজিরের মর্যাদা তো একটা ঘোড়ার সমানও নয়। এরপর ঐ লোকটা যখন শয়তানের অবাধ্য হয়ে হিজরত করে নেয়, তখন শয়তান এসে অবস্থান নেয় তার জিহাদের পথে। আর এই জিহাদ নফসের জিহাদ ও মালের জিহাদ। সে ঐ ব্যক্তিকে বলে, তুমি কি জিহাদের জন্য বের হচ্ছো, তুমি মারা যাবে, তোমার স্ত্রী অন্যেকে বিয়ে করে নেবে। তোমার সম্পদ লোকজনে ভাগাভাগি করে নিয়ে যাবে। এরপরও লোকটা শয়তানের অবাধ্য হয়ে জিহাদে অংশ নেয়। রাসূলুল্লহ সা. বলেন: তোমাদের মাঝে যে ব্যক্তি এই ধরণের কাজ করে এবং মৃত্যু বরণ করে। তখন আল্লাহর উপর ওয়াজিব হয়ে যায় যে, তাকে জান্নাতে  প্রবেশ করাবেনসে মৃত্যু বরণ করলে, বা সে পানিতে ডুবে মরলে, বা পশু দ্বারা পদদলিত হয়ে মরলে।

﴿ثُمَّ لَآتِيَنَّهُم مِّن بَيْنِ أَيْدِيهِمْ  وَمِنْ خَلْفِهِمْ  وَعَنْ أَيْمَانِهِمْ  وَعَن شَمَائِلِهِمْ  وَلَا تَجِدُ أَكْثَرَهُمْ شَاكِرِينَ﴾

১৭) সামনে-পেছনে, ডাইনে-বাঁয়ে, সবদিক থেকে এদেরকে ঘিরে ধরবো এবং এদের অধিকাংশকে তুমি শোকর গুজার পাবে না”।

﴿ثُمَّ لَآتِيَنَّهُم مِّن بَيْنِ أَيْدِيهِمْ وَمِنْ خَلْفِهِمْ وَعَنْ أَيْمَانِهِمْ وَعَن شَمَائِلِهِمْ ۖ وَلَا تَجِدُ أَكْثَرَهُمْ شَاكِرِينَ﴾ সামনে-পেছনে, ডাইনে-বাঁয়ে, সবদিক থেকে এদেরকে ঘিরে ধরবো এবং এদের অধিকাংশকে তুমি শোকর গুজার পাবে না”।

♦ ইবনে আব্বাস বলেন:

o   সামনে থেকে আসবোঃ মানে আমি তাদের সামনে আখেরাতকে সন্দেহপূর্ণ করে তুলবো أشككهم في آخرتهم

o   পিছন থেকে আসবোঃ মানে আমি তাদের কাছে দুনিয়াকে মোহময় করে তুলবো–  أرغبهم في دنياهم

o   ডান থেকে আসবোঃ মানে তাদের দ্বীনের মধ্যে সন্দেহ তৈরী করে ফেলবো أشبه عليهم أمر دينهم

o   বাম থেকে আসবোঃ গোনাহের কাজ তাদের নিকট গ্রহণীয় করে তুলবো أشهي لهم المعاصي

♦ ইবলিসের সেই চ্যালেঞ্জ প্রতিফলিত হয় সূরা সাবার ২০ ও ২১ নম্বর আয়াতে

﴿وَلَقَدْ صَدَّقَ عَلَيْهِمْ إِبْلِيسُ ظَنَّهُ فَاتَّبَعُوهُ إِلَّا فَرِيقًا مِّنَ الْمُؤْمِنِينَ﴾ ﴿وَمَا كَانَ لَهُ عَلَيْهِم مِّن سُلْطَانٍ إِلَّا لِنَعْلَمَ مَن يُؤْمِنُ بِالْآخِرَةِ مِمَّنْ هُوَ مِنْهَا فِي شَكٍّ ۗ وَرَبُّكَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ حَفِيظٌ﴾

২০) তাদের ব্যাপারে ইবাসিল তার ধারণা সঠিক পেয়েছে এবং একটি ক্ষুদ্র মুমিন দল ছাড়া বাকি সবাই তারই অনুসরণ করছে। ২১) তাদের ওপর ইবলিসের কোন কর্তৃত্ব ছিল না৷ কিন্তু যা কিছু হয়েছে যে, আমি দেখতে চাচ্ছিলাম কে পরকাল মান্যকারী এবং কে সে ব্যাপারে সন্ধিহান।তোমার রব সব জিনিসের তত্ত্বাবাধায়ক।

♦ আল্লাহর রাসূল সা. তাই সব সময় দোয়া করতেনঃ

اللهم إني أسألك العفو والعافية في ديني ودنياي وأهلي ومالي، اللهم استر عوراتي، وآمن روعاتي، واحفظني من بين يدي، ومن خلفي، وعن يميني، وعن شمالي، ومن فوقي، وأعوذ بك اللهم أن أغتال من تحتي

হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে ক্ষমা ও নিরাপত্তা কামনা করছি, দ্বীনের জন্য এবং দুনিয়ার জন্য। আমার পরিবার ও সম্পদের জন্য। হে আল্লাহ! আমার আমার গোনাহ গুলো ঢেকে দাও, ভয় থেকে আমাকে নিরাপদে রাখুন, আমাকে সামনের দিক থেকে রক্ষা করুন, পিছন থেকে নিরাপদে রাখুন, ডান থেকে নিরাপদে রাখুন এবং বাম থেকে নিরাপদে রাখুন। উপরের দিক থেকে নিরাপদে রাখুন। হে আল্লাহ আমি আশ্রয় চাই শয়তানের নিচের দিকে থেকে বিস্তার করা প্রতারণার জাল থেকে।

﴿قَالَ اخْرُجْ مِنْهَا مَذْءُومًا مَّدْحُورًا ۖ لَّمَن تَبِعَكَ مِنْهُمْ لَأَمْلَأَنَّ جَهَنَّمَ مِنكُمْ أَجْمَعِينَ﴾

১৮) আল্লাহ বললেনঃ বের হয়ে যা এখান থেকে লাঞ্ছিত ও ধিকৃত অবস্থায়। নিশ্চিতভাবে জেনে রাখিস, এদের মধ্য থেকে যারাই তোর অনুসরণ করবে তাদেরকে এবং তোকে দিয়ে আমি জাহান্নাম ভরে দেবো।

﴿قَالَ اخْرُجْ مِنْهَا مَذْءُومًا مَّدْحُورًا ۖ لَّمَن تَبِعَكَ مِنْهُمْ لَأَمْلَأَنَّ جَهَنَّمَ مِنكُمْ أَجْمَعِينَ﴾  আল্লাহ বললেনঃ বের হয়ে যা এখান থেকে লাঞ্ছিত ও ধিকৃত অবস্থায়। নিশ্চিতভাবে জেনে রাখিস, এদের মধ্য থেকে যারাই তোর অনুসরণ করবে তাদেরকে এবং তোকে দিয়ে আমি জাহান্নাম ভরে দেবো।

♦ ইবনে জারীরের বর্ননা অনুযায়ী:

o   مَذْءُوم  অর্থ: দোষী ও অপমানিত।

o   مَّدْحُور অর্থ: বিতাড়িত ও বহিষ্কৃত।

﴿وَيَا آدَمُ اسْكُنْ أَنتَ وَزَوْجُكَ الْجَنَّةَ  فَكُلَا مِنْ حَيْثُ شِئْتُمَا وَلَا تَقْرَبَا هَٰذِهِ الشَّجَرَةَ فَتَكُونَا مِنَ الظَّالِمِينَ﴾

১৯) আর হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী তোমরা দুজনাই এ জান্নাতে থাকো। যেখানে যা তোমাদের ইচ্ছা হয় খাও, কিন্তু এ গাছটির কাছে যেয়ো না, অন্যথায় তোমরা জালেমদের অন্তরভূক্ত হয়ে যাবে”।

﴿وَيَا آدَمُ اسْكُنْ أَنتَ وَزَوْجُكَ الْجَنَّةَ فَكُلَا مِنْ حَيْثُ شِئْتُمَا وَلَا تَقْرَبَا هَٰذِهِ الشَّجَرَةَ فَتَكُونَا مِنَ الظَّالِمِينَ﴾ আর হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী তোমরা দুজনাই এ জান্নাতে থাকো। যেখানে যা তোমাদের ইচ্ছা হয় খাও, কিন্তু এ গাছটির কাছে যেয়ো না, অন্যথায় তোমরা জালেমদের অন্তরভূক্ত হয়ে যাবে”।

♦ এখানে বসবাসের ক্ষেত্রে কেবল আদমকে আর তার স্ত্রীকে বলা হয়েছে। এর মানে শয়তান জান্নাতে ছিল না।

♦ জান্নাতে বসবাসের ক্ষেত্রে আল্লাহর শর্ত হচ্ছেঃ এখানে বসবাস করা যাবে, যা খুশী তা পানাহার করা যাবে, কিন্তু নির্ধারিত একটি গাছের কাছে যাওয়া যাবে না। যদি এই শর্ত লংঘন করা হয়, তাহলে যারা নিজেদের উপর জুলুম করবে-তারা তাদের অন্তর্ভূক্ত হবে।

الشَّجَرَةَ  কোন ধরণের গাছ ছিল?

عن ابن عباس، قال كانت الشجرة التي نهى الله عنها آدم وزوجته السنبلة

ইবনে আব্বাস রা. বলেনঃ আদম আ.কে যে গাছের ফল খেতে নিষেধ করা হয়েছিল তা ছিল একটি গমের শীষ।

﴿فَوَسْوَسَ لَهُمَا الشَّيْطَانُ لِيُبْدِيَ لَهُمَا مَا وُورِيَ عَنْهُمَا مِن سَوْآتِهِمَا وَقَالَ مَا نَهَاكُمَا رَبُّكُمَا عَنْ هَٰذِهِ الشَّجَرَةِ إِلَّا أَن تَكُونَا مَلَكَيْنِ أَوْ تَكُونَا مِنَ الْخَالِدِينَ﴾

২০) তারপর তাদের লজ্জাস্থান, যা তাদের পরষ্পর থেকে গোপন রাখা হয়েছিল, তাদের সামনে উন্মুক্ত করে দেবার জন্যে শয়তান তাদেরকে কুমন্ত্রণা দিল। সে তাদেরকে বললোঃ তোমাদের রব যে, তোমাদের এ গাছটির কাছে যেতে নিষেধ করেছেন তার পেছনে এ ছাড়া আর কোন কারণই নেই যে, পাছে তোমরা ফেরেশতা হয়ে যাও অথবা তোমরা চিরন্তন জীবনের অধিকারী হয়ে পড়ো”।

﴿فَوَسْوَسَ لَهُمَا الشَّيْطَانُ لِيُبْدِيَ لَهُمَا مَا وُورِيَ عَنْهُمَا مِن سَوْآتِهِمَا وَقَالَ مَا نَهَاكُمَا رَبُّكُمَا عَنْ هَٰذِهِ الشَّجَرَةِ إِلَّا أَن تَكُونَا مَلَكَيْنِ أَوْ تَكُونَا مِنَ الْخَالِدِينَ﴾ তারপর তাদের লজ্জাস্থান, যা তাদের পরষ্পর থেকে গোপন রাখা হয়েছিল, তাদের সামনে উন্মুক্ত করে দেবার জন্যে শয়তান তাদেরকে কুমন্ত্রণা দিল। সে তাদেরকে বললোঃ তোমাদের রব যে, তোমাদের এ গাছটির কাছে যেতে নিষেধ করেছেন তার পেছনে এ ছাড়া আর কোন কারণই নেই যে, পাছে তোমরা ফেরেশতা হয়ে যাও অথবা তোমরা চিরন্তন জীবনের অধিকারী হয়ে পড়ো”।

♦ শয়তান দেখলো, সে ছিল “মালাকুতি আলা”, সেখান থেকে তাকে নামিয়ে করা হলো مَذْءُوم  অর্থ: দোষী ও অপমানিত এবং مَّدْحُور অর্থ: বিতাড়িত ও বহিষ্কৃত। সে হিংসা জ্বলে উঠলো।

♦ সে তার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আদম আর হাওয়াকে কুমন্ত্রনা দিল।

♦ মানুষের স্বভাবজাত হচ্ছে, সে যেখানে আছেতার থেকে উপরে উঠতে চায়। বিধায় শয়তান সেই উপরে উঠানোর লোভ দেখালো। সে বললোঃ তোমরা যদি এই গাছের কাছে যাও, তাহলে তোমাদের ২টি ফায়দা। ১. তোমরা চিরকাল এই বেহেশতে থাকবেএখান থেকে বের হবে না। ২. তোমরা ফেরেশতার পর্যায়ে চলে যাবে।

♦ শয়তানের কুমন্ত্রনায় পড়ার কারণে আদম আর হাওয়ার মাঝে তাদের পরস্পরের লজ্জাস্থানের কুরদতী যে আবরণ ছিল, তা খসে পড়লো। যার কারণে তারা পরস্পরে পরস্পরের লজ্জাস্থান দেখতে পেল।

♦ লজ্জা মানুষের স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক অনুভূতিঃ মানুষের লজ্জা সৃষ্টিগত। মানুষের জন্মের প্রথম দিন থেকে এ গুণটি মানুষের মধ্যে রয়েছে। মানুষের মাঝে লজ্জার গুণ কৃত্রিম ভাবে সৃষ্টি হয়নি। লজ্জা বাহির থেকে অর্জিত কোন জিনিস নয়।

♦ শয়তানের নিয়ম হচ্ছে, শয়তান যখন কাউকে দিয়ে অপকর্ম করাতে চায়, তখন তাকে অশ্লীলতার দিকে আহবান করে। তাকে উলংগ করে। সেখানে সে এই কাজটা করলো।

♦ শয়তানের উলংগ করার এই নীতি আজ অবধি অব্যাহত আছে। ইতিহাস বলে, শয়তান বড় বড় ব্যক্তিদেরকে বিপদগামী করতে নারীকে ব্যবহার করেছে।

♦ ইসলামী সাম্রাজ্যের বড় বড় শাসকদেরকে কাফিররা নিজেদের করে নিতে সুন্দরী ললনাদেরকে দাসী হিসাবে উপহার প্রদান করে তাদেরকে গোয়েন্দা হিসাবে ব্যবহার করেছে। সুলতান সালাহ উদ্দিন আইয়ুবী, আব্বাসী খেলাফত, উসমানী খেলাফতের ইতিহাস পড়লে আমরা তার ভূরি ভূরি প্রমাণ পাই।

♦ মানুষের স্বভাবসূলভ সিরাতাল মুস্তাকীম থেকে সরানোর জন্য শয়তানের প্রথম কৌশল লজ্জানুভূতিতে আঘাতঃ মানুষকে প্ররোচিত করার জন্য শয়তানের প্রথম কৌশল ছিল লজ্জানূতিতে আঘাত করা, নির্লজ্জতা ও অশ্লিলতার দুয়ার খুলে দেয়া। প্রতিপক্ষকে আক্রমনের জন্য দূর্বল স্থান হলো মানুষের যৌন বিষয়ক দিক। লজ্জা মানব প্রকৃতির দূর্গরক্ষক। শয়তান ও তার মুরিদানদের কর্মনীতিতে আজও এই ধারা অব্যাহত। তারা বিভ্রান্ত করার জন্য সমাজের মেয়েদের উলংগ করে বাজারে দাড় করিয়ে প্রগতির কাজ শুরু করে।

﴿وَقَاسَمَهُمَا إِنِّي لَكُمَا لَمِنَ النَّاصِحِينَ﴾

২১) আর সে কসম খেয়ে তাদেরকে বললো, আমি তোমাদের যথার্থ কল্যাণকামী।

﴿وَقَاسَمَهُمَا إِنِّي لَكُمَا لَمِنَ النَّاصِحِينَ﴾ আর সে কসম খেয়ে তাদেরকে বললো, আমি তোমাদের যথার্থ কল্যাণকামী।

♦ দুনিয়াতে যে কেউ যখন কারো ক্ষতি করতে চায়, তখন সরাসরি প্রস্তাব না দিয়ে নিজেকে প্রথমে কল্যাণকামী হিসাবে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলে। শয়তানও একই নীতি অবলম্বন করলো। প্রথমে নিজেকে কল্যাণকামী হিসাবে উপস্থাপন করলো। পরে টোপ ফেললো।

♦ অসৎ কাজের প্রকাশ্য আহবানে মানুষ সাড়া দেয় না। তাই অসৎকাজ করানোর জন্য কল্যাণকামীর ছদ্মাবেশ নিতে হয়ঃ অসত কাজের সরাসরি আহবান মানুষ কম গ্রহণ করেএটা মানুষের ফিতরাত। বিধায় মানুষকে জালে ফাসাতে কল্যাণকামীর বেশ ধারণ করতে হয়।

♦ বর্তমান অবস্থান থেকে উপরে উঠার আকাংখা চিরন্তনঃ মানুষের চিরন্তন স্বাভাকি আকংখা হলো বর্তমান অবস্থান থেকে উচ্চতর দিকে গমন। শয়তান এই ফিতরাতি বিষয়কে বিবেচনায় নিয়েই কাজ করে এবং প্রথমেই সফল হয়। বিধায় শয়তান মানুষকে ধোঁকা দেয়ার জন্য উপরে উঠানোর টোপ ফেলে। মানুষ এই টোপ গ্রহণ করে যে পথে চলে, সেই পথ তাকে নিচে নামিয়ে দেয়।

﴿فَدَلَّاهُمَا بِغُرُورٍ ۚ فَلَمَّا ذَاقَا الشَّجَرَةَ بَدَتْ لَهُمَا سَوْآتُهُمَا وَطَفِقَا يَخْصِفَانِ عَلَيْهِمَا مِن وَرَقِ الْجَنَّةِ ۖ وَنَادَاهُمَا رَبُّهُمَا أَلَمْ أَنْهَكُمَا عَن تِلْكُمَا الشَّجَرَةِ وَأَقُل لَّكُمَا إِنَّ الشَّيْطَانَ لَكُمَا عَدُوٌّ مُّبِينٌ﴾

২২) এভাবে প্রতারণা করে সে তাদের দুজনকে ধীরে ধীরে নিজের পথে নিয়ে এলো। অবশেষে যখন তারা সেই গাছের ফল আস্বাদন করলো, তাদের লজ্জা স্থান পরস্পরের সামনে খুলে গেলো এবং তারা নিজেদের শরীর ঢাকতে লাগলো জান্নাতের পাতা দিয়ে। তখন তাদের রব তাদেরকে ডেকে বললোঃ আমি কি তোমাদের এ গাছটির কাছে যেতে নিষেধ করিনি এবং তোমাদের বলিনি যে, শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু”?

﴿فَدَلَّاهُمَا بِغُرُورٍ ۚ فَلَمَّا ذَاقَا الشَّجَرَةَ بَدَتْ لَهُمَا سَوْآتُهُمَا وَطَفِقَا يَخْصِفَانِ عَلَيْهِمَا مِن وَرَقِ الْجَنَّةِ ۖ وَنَادَاهُمَا رَبُّهُمَا أَلَمْ أَنْهَكُمَا عَن تِلْكُمَا الشَّجَرَةِ وَأَقُل لَّكُمَا إِنَّ الشَّيْطَانَ لَكُمَا عَدُوٌّ مُّبِينٌ﴾ এভাবে প্রতারণা করে সে তাদের দুজনকে ধীরে ধীরে নিজের পথে নিয়ে এলো। অবশেষে যখন তারা সেই গাছের ফল আস্বাদন করলো, তাদের লজ্জা স্থান পরস্পরের সামনে খুলে গেলো এবং তারা নিজেদের শরীর ঢাকতে লাগলো জান্নাতের পাতা দিয়ে। তখন তাদের রব তাদেরকে ডেকে বললোঃ আমি কি তোমাদের এ গাছটির কাছে যেতে নিষেধ করিনি এবং তোমাদের বলিনি যে, শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু”?

♦ আদম আ.কে প্ররোচিত করতে হাওয়া আ.কে ব্যবহার করা হয়েছে, কুরআন এই ধারণাকে খন্ডন করেঃ আদম আ.কে প্ররোচিত করতে হাওয়া আ. কে ব্যবহার করা হয়েছে ক্রীড়নক হিসেবেকুরআন এই ধারণা খন্ডন করে। কুরআনের বক্তব্য হলো: উভয়কেই সে ধোকা দেয়। বিধায় এটি হযরত হাওয়ার বিরুদ্ধে একটি অপপ্রচার এবং এই অপপ্রাচারের মাধ্যমে সারা দুনিয়ার নারীদের নৈতিক সামাজিক ও আইনগত মর্যাদা হ্রাস করা হয়

عن أبي بن كعب رضي الله عنه، قال كان آدم رجلاً طوالاً، كأنه نخلة سحوق، كثير شعر الرأس، فلما وقع فيما وقع به من الخطيئة، بدت له عورته عند ذلك، وكان لا يراها، فانطلق هارباً في الجنة، فتعلقت برأسه شجرة من شجر الجنة، فقال لها أرسليني. فقالت إني غير مرسلتك، فناداه ربه عز وجل يا آدم أمِنِّي تفر؟ قال يا رب إني استحييتك،

হযরত উবাই ইবনে কাব রা. বলেন, হযরত আদম আ. খেজুর বৃক্ষের ন্যায় দীর্ঘাকৃতির ছিলেন। তাঁর মাথার চুল ছিল ঘন ও লম্বা। যখন তিনি ভূল করে বসলেন, তখন তাঁর দেহাবরণ খুলে গল। এর আগে তিনি নিজের লজ্জাস্থানের দিকে লক্ষ্য করতেন না। এখন তিনি ব্যাকুল হয়ে জান্নাতের মধ্যে এদিক ওদিক ফিরতে লাগলেন। জান্নাতের িএক গাছে সংগে তার মাথার চুল জড়িয়ে পড়লো। তিনি বলতে লাগলেনঃ হে গাছ! আমাকে ছেড়ে দাও। গাছ বলে উঠলোঃ আমি আপনাকে ছাড়বো না। তখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আদমকে ডাক দিয়ে বললেনঃ তুমি কি আমার নিকট থেকে পালিয়ে যাচ্ছো? আদম উত্তরে বললেনঃ হে আমার মালিক! আমি আপনার কাছে লজ্জাবোধ করছি। কেননা, আমার দেহাবরণ খুলে গেছে।

♦ নিষিদ্ধ গাছের কোন গুণ ছিল, যার কারণে তার কাছে যাওয়াতে আদম ও হাওয়ার লজ্জা স্থান অনাবৃত হয়েছে-এই ধারণা ভূলঃ নিষিদ্ধ গাছের গুণের কারণে আদম ও হাওয়ার লজ্জাস্থান অনাবৃত হয়েছে এমন ধারণা ভূল। আল্লাহর নাফরমানীর কারণে তা হয়েছে। আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করার কারণে আল্লাহর হেফাজত উঠে যায়। এর মাধ্যমে একথা প্রকাশ পেল যে, মানুষ আল্লাহর না ফরমানী করলে একদিন তার আবরণ মুক্ত হয়ে যাবেই। মানুষ ততদিন আল্লাহর সাহায্য পাবে, যতক্ষণ আনুগত্য করবে। রাসূল সা. দোয়া করতেনঃ

اللهم رحمتك أرجو فلا تكلني إلى نفسي طرفة عين وأصلح لي شأني كله لا إله إلا أنت 

হে আল্লাহ! আমি তোমার রহমতের আশা করি৷ কাজেই এক মুহুর্তের জন্যেও আমাকে আমার নিজের হাতে সোপর্দ করে দিয়ো না।”

وَرَقِ الْجَنَّةِ কি?

   ইবনে আব্বাস রা. এর মতে ওয়ারাকিল জান্নাহ মানে তীন গাছের পাতা।

﴿قَالَا رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ﴾

২৩) তারা দুজন বলে উঠলোঃ হে আমাদের রব! আমরা নিজেদের ওপর জুলুম করেছি। এখন যদি তুমি আমাদের ক্ষমা না করো এবং আমাদের প্রতি রহম না করো, তাহলে নিসন্দেহে আমরা ধ্বংস হয়ে যাবো”। 

﴿قَالَا رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ﴾ তারা দুজন বলে উঠলোঃ হে আমাদের রব! আমরা নিজেদের ওপর জুলুম করেছি। এখন যদি তুমি আমাদের ক্ষমা না করো এবং আমাদের প্রতি রহম না করো, তাহলে নিসন্দেহে আমরা ধ্বংস হয়ে যাবো”।

♦ শয়তান মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ট প্রমাণের প্রথম পদক্ষেপ ব্যর্থ হয়েছেঃ

মানুষেকে শয়তানের মোকাবেলায় শ্রেষ্ঠত্ব প্রদানের প্রেক্ষিতে শয়তানের দায়িত্ব ছিল, তা অসার প্রমান করা। কিন্তু প্রথম পদক্ষেপেই শয়তান ব্যর্থ হয়। মানুষ তার মালিকের নির্দেশ পালনে পুরোপুরে সফল হয়নি-কিন্তু তা হয়েছে প্রতিপক্ষের জালে ফাঁসার কারণে। আর এই জালে আটকে লজ্জাবরণ সরে যাওয়াতে মানুষের আচরণ প্রমান করেছে নৈতিকতার দিকে দিয়ে সে কত উন্নত ও শ্রেষ্ঠ। মানুষের সফলতা হলোঃ

১. শয়তান নিজে শ্রেষ্ঠত্বের দাবী করেছিল, মানুষে নিজে শ্রেষ্ঠত্বের দাবী করেনি-তাকে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করা হয়েছে।

২. শয়তান আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে অহংকার ও আত্মম্ভরিতার সাথে স্বেচ্ছায়, আর মানুষ প্ররোচিত হয়ে অনিচ্ছায়।

৩. মানুষ অসৎকাজের প্রকাশ্য আহবানে সাড়া দেয়নি। বরং অসৎকাজ করানোর জন্য অসৎকাজের আহবায়ককে সৎকাজের আহবায়কের লেবাস ধারণ করতে হয়েছিল।

৪. মানুষে নিচের দিকে যাওয়ার উদ্দেশ্যে নিচের দিকে যায়নি, বরং উপরের নিকে যাবে বলে নিচের দিকে যায়।

৫. শয়তানকে সতর্ক করার পর সে ভূল স্বীকার করেনি। উল্টা নাফরমানীতে অটল থেকেছে। মানুষকে সতর্ক করার পর মানুষ বিদ্রোহ না করে ভূলের জন্য লজ্জিত হয়েছে, ভূল স্বীকার করেছে, আনুগত্যের দিকে ফিরে এসেছে, ভূলের জন্য শুধু ক্ষমা চায়নি-মালিকের রহমতের ছায়ায় আশ্রয় চেয়েছে।

♦ এর মাধ্যমে মানুষের পথ ও শয়তানের পথ আলাদা তা দেখানো হয়েছেঃ

মানুষের পথ আর শয়তানের পথ সম্পূর্ণ আলাদা দূ’টি পথ।

শয়তানের পথ হলোঃ

১. আল্লাহর বন্দেগীর পথ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া।

২. আল্লাহর মোকাবিলায় বিদ্রোহের পতাকা উচ্চ করা।

৩. সতর্ক করার পর বিদ্রোহে অটল থাকা।

৪. যারা আল্লাহর পথে চলে তাদেরকে বিভ্রান্ত ও প্ররোচিত করা-গোনাহ ও নাফরমানীর পথে ঢাকা।

মানুষের পথ হলোঃ

১. শয়তানের প্ররোচনা ও অপহরণ প্রচেষ্টা মোকাবিলা করা।

২. শয়তানের প্রচেষ্টায় বাঁধা দেযা।

৩. শয়তানী চাল ও কৌশল বুঝা।

৪. শয়তানের হাত থেকে বাচার জন্য সব সময় সতর্ক থাকা।

৫. সতর্ক থাকার পরও পা পিছলে গেলে বন্দেগী ও আনুগত্যের পথে েনিজের নিজের ভূলের জন্য লজ্জিত হওয়া।

৬. নিজের মালিকের দিকে ফিরে আসা।

৭. নিজের অপরাধ ও ভূলের প্রতিকার ও সংশোধন করা।

♦ উপরের এই দীর্ঘ কাহিনী থেকে যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যের সন্ধান পাওয়া যায়, তাহলোঃ

১. লজ্জা মানুষের স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক অনুভূতিঃ

২. মানুষের স্বভাবসূলভ সিরাতাল মুস্তাকীম থেকে সরানোর জন্য শয়তানের প্রথম কৌশল লজ্জানুভূতিতে আঘাতঃ

৩. অসৎ কাজের প্রকাশ্য আহবানে মানুষ সাড়া দেয় না। তাই অসৎকাজ করানোর জন্য কল্যাণকামীর ছদ্মাবেশ নিতে হয়ঃ

৪. বর্তমান অবস্থান থেকে উপরে উঠার আকাংখা চিরন্তনঃ

৫. আদম আ.কে প্ররোচিত করতে হাওয়া আ.কে ব্যবহার করা হয়েছে, কুরআন এই ধারণাকে খন্ডন করেঃ

৬. নিষিদ্ধ গাছের কোন গুণ ছিল, যার কারণে তার কাছে যাওয়াতে আদম ও হাওয়ার লজ্জা স্থান অনাবৃত হয়েছে-এই ধারণা ভূলঃ

৭. শয়তান মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ট প্রমাণের প্রথম পদক্ষেপ ব্যর্থ হয়েছেঃ

৮. এর মাধ্যমে মানুষের পথ ও শয়তানের পথ আলাদা তা দেখানো হয়েছেঃ

আল্লাহ প্রদত্ত শিক্ষাঃ

১. তোমরা যে পথে চলছো, তা শয়তানের পথ।

২. আল্লাহর হেদায়াতের পরোয়া না করে জিন শয়তান ও মানুষ শয়তানকে বন্ধু ও অভিভাবক হিসাবে গ্রগণ করা নির্ভেজাল শয়তানী।

৩. সতর্কবানী উচ্চারণের পরও ভূলের উপর অবিচল থাকা ও শয়তানী প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া নির্ভিজাল শয়তানী কর্মনীতি।

৪. তোমরা তোমাদের আদি ও চিরন্তন দুশমেরন ফাঁদে পড়েছো এবং পূর্ণ পরাজয় বরণ করেছো।

৫. তোমরা যদি নিজেদের শত্রু না হও, তোমাদের মধ্যে যদি সামান্য মানবিক চেতনা থাকে, তাহলে ভূল শুধরিয়ে নাও, সতর্ক হও এবং নিজেদের বাপ মায়ের পথ অনুসরণ করে সিরাতাল মুস্তাকীমের পথে চলো।

﴿قَالَ اهْبِطُوا بَعْضُكُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ ۖ وَلَكُمْ فِي الْأَرْضِ مُسْتَقَرٌّ وَمَتَاعٌ إِلَىٰ حِينٍ﴾

২৪) তিনি বললেনঃ নেমে যাওতোমরা পরষ্পরের শত্রু এবং তোমাদের জন্য একটি বিশেষ সময় পর্যন্ত পৃথিবীতেই রয়েছে বসবাসের জায়গা ও জীবন যাপনের উপকরণ”।

﴿قَالَ اهْبِطُوا ﴾  তিনি বললেনঃ নেমে যাও

এখানে اهْبِطُوا বলতে কাকে বা কাদেরকে বুঝানো হয়েছে?

এখানে আদম, হাওয়া এবং ইবলিস সবাইকে বুঝানো হয়েছে। যার বিবরণ পাওয়া যায় সূরা আত ত্বাহা-১২৩ নম্বর আয়াতেঃ

﴿قَالَ اهْبِطَا مِنْهَا جَمِيعًا ۖ بَعْضُكُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ ۖ فَإِمَّا يَأْتِيَنَّكُم مِّنِّي هُدًى فَمَنِ اتَّبَعَ هُدَايَ فَلَا يَضِلُّ وَلَا يَشْقَىٰ﴾

১২৩) আর বললেন, “তোমরা (উভয় পক্ষ অর্থাৎ মানুষ ও শয়তান) এখান থেকে নেমে যাও, তোমরা পরস্পরের শত্রু থাকবে৷ এখন যদি আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে কোন নির্দেশনামা পৌছে যায় তাহলে যে ব্যক্তি আমার সেই নির্দেশ মেনে চলবে সে বিভ্রান্তও হবে না, দুর্ভাগ্য পীড়িতও হবে না৷  

এর মাধ্যমে আদম ও হাওয়া আ. কে জান্নাত থেকে বের হওয়ার হুকুম করা হচ্ছেনা, বরং দুনিয়ায় গমনের নির্দেশ প্রদান করা হচ্ছে।

ভূল ধারণাঃ অনেকে মনে করেন, আদম আর হাওয়া আ.কে আল্লাহর হুকুম অমান্য করার শাস্তি হিসাবে এই আয়াতের মাধ্যমে জান্নাত থেকে বের করা হয়। কিন্তু আমাদেরকে মনে রাখতে হবে যে, কুরআনে এ বিষয় সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছেঃ

১. আল্লাহ তাদের তাওবা কবুল করেন।

২. তাদেরকে মাফ করে দেন।

৩. তাওবা কবুল করা এবং মাফ করে দেয়ার পর শাস্তি হতে পারে না।

এই আয়াতের মাধ্যমে মানুষকে যে উদ্দেশ্যে বানানো হয়েছিল, সেই উদ্দেশ্য পূর্ণ করা হয়েছে। যা বর্ণিত হয়েছে তাফহীমূল কুরআনের সূরা বাকারার ৩৫-৩৮ আয়াতের ব্যাখ্যায়ঃ

﴿وَقُلْنَا يَا آدَمُ اسْكُنْ أَنتَ وَزَوْجُكَ الْجَنَّةَ وَكُلَا مِنْهَا رَغَدًا حَيْثُ شِئْتُمَا وَلَا تَقْرَبَا هَٰذِهِ الشَّجَرَةَ فَتَكُونَا مِنَ الظَّالِمِينَ﴾ ﴿فَأَزَلَّهُمَا الشَّيْطَانُ عَنْهَا فَأَخْرَجَهُمَا مِمَّا كَانَا فِيهِ ۖ وَقُلْنَا اهْبِطُوا بَعْضُكُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ ۖ وَلَكُمْ فِي الْأَرْضِ مُسْتَقَرٌّ وَمَتَاعٌ إِلَىٰ حِينٍ﴾ ﴿فَتَلَقَّىٰ آدَمُ مِن رَّبِّهِ كَلِمَاتٍ فَتَابَ عَلَيْهِ ۚ إِنَّهُ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ﴾ ﴿قُلْنَا اهْبِطُوا مِنْهَا جَمِيعًا ۖ فَإِمَّا يَأْتِيَنَّكُم مِّنِّي هُدًى فَمَن تَبِعَ هُدَايَ فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ﴾

৩৫) তখন আমরা আদমকে বললাম, “তুমি ও তোমার স্ত্রী উভয়েই জান্নাতে থাকো এবং এখানে স্বাচ্ছন্দের সাথে ইচ্ছে মতো খেতে থাকো, তবে এই গাছটির কাছে যেয়ো না। অন্যথায় তোমরা দুজন যালেমদের অন্তরভুক্ত হয়ে যাবে।৩৬) শেষ পর্যন্ত শয়তান তাদেরকে সেই গাছটির লোভ দেখিয়ে আমার হুকুমের আনুগত্য থেকে সরিয়ে দিল এবং যে অবস্থার মধ্যে তারা ছিল তা থেকে তাদেরকে বের করে ছাড়লো। আমি আদেশ করলাম, “এখন তোমরা সবাই এখান থেকে নেমে যাও। তোমরা একে অপরের শত্রু। তোমাদের একটি নিদিষ্ট সময় পর্যন্ত পৃথিবীতে অবস্থান করতে ও জীবন অতিবাহিত করতে হবে।৩৭) তখন আদম তার রবের কাছ থেকে কয়েকটি বাক্য শিখে নিয়ে তাওবা করলো। তার রব তার এই তাওবা কবুল করে নিলেন। কারণ তিনি বড়ই   ক্ষমাশীল ও অনুগ্রহকারী। ৩৮) আমরা বললাম, “তোমরা সবাই এখান থেকে নেমে যাও। এরপর যখন আমার পক্ষ থেকে কোন হিদায়াত তোমাদের কাছে পৌছুবে তখন যারা আমার সেই হিদায়াতের অনুসরণ করবে তাদের জন্য থাকবে না কোন ভয় দুঃখ বেদনা।  

﴿بَعْضُكُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ ۖ وَلَكُمْ فِي الْأَرْضِ مُسْتَقَرٌّ وَمَتَاعٌ إِلَىٰ حِينٍ﴾ তোমরা পরষ্পরের শত্রু এবং তোমাদের জন্য একটি বিশেষ সময় পর্যন্ত পৃথিবীতেই রয়েছে বসবাসের জায়গা ও জীবন যাপনের উপকরণ”।

ইবনে আব্বাস রা. এর মতে مُسْتَقَرٌّ মানেঃ কবর, কিংবা পৃথিবীর উপরিভাগ ও তলদেশ বুঝানো হয়েছে।  

﴿قَالَ فِيهَا تَحْيَوْنَ وَفِيهَا تَمُوتُونَ وَمِنْهَا تُخْرَجُونَ﴾

২৫) আর বললেনঃ সেখানেই তোমাদের জীবন যাপন করতে এবং সেখানেই মরতে হবে এবং সেখান থেকেই তোমাদের সবশেষে আবার বের করে আনা হবে।”

﴿قَالَ فِيهَا تَحْيَوْنَ وَفِيهَا تَمُوتُونَ وَمِنْهَا تُخْرَجُونَ﴾ আর বললেনঃ সেখানেই তোমাদের জীবন যাপন করতে এবং সেখানেই মরতে হবে এবং সেখান থেকেই তোমাদের সবশেষে আবার বের করে আনা হবে।”

সূরা ত্বা-হা ৫৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

﴿مِنْهَا خَلَقْنَاكُمْ وَفِيهَا نُعِيدُكُمْ وَمِنْهَا نُخْرِجُكُمْ تَارَةً أُخْرَىٰ﴾

এ মাটি থেকেই আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি, এরি মধ্যে তোমাদেরকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবো এবং এ থেকেই আবার তোমাদেরকে বের করবো।

আদম সন্তান যতদিন বেঁচে থাকবে, ততদিন পৃথিবীকে তার বাসস্থান বানানো হয়েছে। আদম সন্তান পৃথিবীতেই মৃত্যু বরণ করবে, মৃত্যুর পর এই পৃথিবীতেই তার কবর হবে এবং কিয়ামতের দিন তাকে এই পৃথিবী থেকেই উঠানো হবে।

শিক্ষাঃ

লেখাটি আপনার ভাল লাগলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.