দারসে কুরআনঃ সূরা আল আরাফঃ আয়াত ২৬-৩১

 

তেলাওয়াত ও তরজমাঃ

﴿يَا بَنِي آدَمَ قَدْ أَنزَلْنَا عَلَيْكُمْ لِبَاسًا يُوَارِي سَوْآتِكُمْ وَرِيشًا ۖ وَلِبَاسُ التَّقْوَىٰ ذَٰلِكَ خَيْرٌ ۚ ذَٰلِكَ مِنْ آيَاتِ اللَّهِ لَعَلَّهُمْ يَذَّكَّرُونَ﴾

২৬) হে বনী আদম! তোমাদের শরীরের লজ্জাস্থানগুলো ঢাকার এবং তোমাদের দেহের সংরক্ষণ ও সৌন্দর্য বিধানের উদ্দেশ্যে আমি তোমাদের জন্য পোশাক নাযিল করেছি৷ আর তাকওয়ার পোশাকই সর্বোত্তম৷ এই আল্লাহর নিদর্শনগুলোর অন্যতম, সম্ভবত লোকেরা এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবে৷   

﴿يَا بَنِي آدَمَ لَا يَفْتِنَنَّكُمُ الشَّيْطَانُ كَمَا أَخْرَجَ أَبَوَيْكُم مِّنَ الْجَنَّةِ يَنزِعُ عَنْهُمَا لِبَاسَهُمَا لِيُرِيَهُمَا سَوْآتِهِمَا ۗ إِنَّهُ يَرَاكُمْ هُوَ وَقَبِيلُهُ مِنْ حَيْثُ لَا تَرَوْنَهُمْ ۗ إِنَّا جَعَلْنَا الشَّيَاطِينَ أَوْلِيَاءَ لِلَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ﴾

২৭) হে বনী আদম! শয়তান যেন তোমাদের আবার ঠিক তেমনিভাবে বিভ্রান্তির মধ্যে নিক্ষেপ না করে যেমনভাবে সে তোমাদের পিতামাতাকে জান্নাত থেকে বের করেছিল এবং তাদের লজ্জাস্থান পরস্পরের কাছে উন্মুক্ত করে দেবার জন্যে তাদেরকে বিবস্ত্র করেছিল৷ সে ও তার সাথীরা তোমাদেরকে এমন জায়গা থেকে দেখে যেখান থেকে তোমরা তাদেরকে দেখতে পাও না৷ এ শয়তানদেরকে আমি যারা ঈমান আনে না তাদের অভিভাবক করে দিয়েছি৷

﴿وَإِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً قَالُوا وَجَدْنَا عَلَيْهَا آبَاءَنَا وَاللَّهُ أَمَرَنَا بِهَا ۗ قُلْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَأْمُرُ بِالْفَحْشَاءِ ۖ أَتَقُولُونَ عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ﴾

২৮) তারা যখন কোন অশ্লিল কাজ করে তখন বলে, আমাদের বাপ-দাদারদেকে আমরা এভাবেই করতে দেখেছি এবং আল্লাহই আমাদের এমনটি করার হুকুম দিয়েছেন৷ তাদেরকে বলে দাও আল্লাহ কখনো নির্লজ্জতা ও বেহায়াপনার হুকুম দেন না৷ তোমরা কি আল্লাহর নাম নিয়ে এমন কথা বলো যাকে তোমরা আল্লাহর কথা বলে জানো না

﴿قُلْ أَمَرَ رَبِّي بِالْقِسْطِ ۖ وَأَقِيمُوا وُجُوهَكُمْ عِندَ كُلِّ مَسْجِدٍ وَادْعُوهُ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ ۚ كَمَا بَدَأَكُمْ تَعُودُونَ﴾

২৯) হে মুহাম্মাদ! তাদেরকে বলে দাও আমার রব তো সততা ও ইনসাফের হুকুম দিয়েছেন৷তাঁর হুকুম হচ্ছে, প্রত্যেক ইবাদত নিজের লক্ষ্য ঠিক রাখো এবং নিজের দীনকে একান্তভাবে তাঁর জন্য করে নিয়ে তাঁকেই ডাকো ৷ যেভাবে তিনি এখান তোমাদের সৃষ্টি করেছেন ঠিক তেমনিভাবে তোমাদের আবার সৃষ্টি করা হবেও 

﴿فَرِيقًا هَدَىٰ وَفَرِيقًا حَقَّ عَلَيْهِمُ الضَّلَالَةُ ۗ إِنَّهُمُ اتَّخَذُوا الشَّيَاطِينَ أَوْلِيَاءَ مِن دُونِ اللَّهِ وَيَحْسَبُونَ أَنَّهُم مُّهْتَدُونَ﴾

৩০) একটি দলকে তিনি সোজা পথ দেখিয়ে দিয়েছেন কিন্তু অন্য দলটির ওপর গোমরাহী সত্য হয়ে চেপেই বসেছে৷ কারণ তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে শয়তানদেরকে নিজেদের অভিভাবকে পরিণত করেছে এবং তারা মনে করছে, আমরা সঠিক পথেই আছি৷  

﴿يَا بَنِي آدَمَ خُذُوا زِينَتَكُمْ عِندَ كُلِّ مَسْجِدٍ وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا ۚ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ﴾

৩১) হে বনী আদম! প্রত্যেক ইবাদাতের সময় তোমরা নিজ নিজ সুন্দর সাজে সজ্জিত হও৷ আর খাও ও পান করো কিন্তু সীমা অতিক্রম করে যেয়ো না, আল্লাহ সীমা অতিক্রমকারীদেরকে পছন্দ করেন না৷

নামকরণঃ

§ আরাফ মানেঃ উচু স্থান। যা আরবী عُرْفٌ শব্দের বহু বচন। উর্ধ্ব, উচু স্থান, প্রাচীরের উপরিভাগ, টিলাভূমি, ভূমি থেকে অপেক্ষাকৃত উচু স্থান ইত্যাদি বুঝাতে এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়।

§ আরাফ হলোঃ জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী একটি স্থান(الحاجز بين الجنة والنار)জান্নাত ও  জাহান্নামের মধ্যবর্তী একটি অন্তরায়। যেখান থেকে জান্নাত ও জাহান্নাম দেখা যাবে। এখানে জান্নাত প্রার্থী কিছু লোককে রাখা হবে। যেহেতু এই স্থানে অবস্থান করার কারণে সকলকে দেখা যাবে এবং একে অপরকে চিনতে পারবে, তাই এর নাম রাখা হয়েছে আরাফ।

§ এই সূরায় জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝখানে উচু স্থানে অবস্থানকারী তথা আরাফের অধিবাসীদের সম্পর্কে আলোচনা হয়েছে বলে এই সূরার নামকরণ করা হয়েছেঃ সূরা আল আরাফ।

§ এই সূরা ৪৬ নম্বর আয়াতে আরাফ শব্দকে এর নাম হিসাবে গ্রহণ করা হয়েছে।

﴿وَبَيْنَهُمَا حِجَابٌ ۚ وَعَلَى الْأَعْرَافِ رِجَالٌ يَعْرِفُونَ كُلًّا بِسِيمَاهُمْ ۚ وَنَادَوْا أَصْحَابَ الْجَنَّةِ أَن سَلَامٌ عَلَيْكُمْ ۚ لَمْ يَدْخُلُوهَا وَهُمْ يَطْمَعُونَ﴾ ﴿وَإِذَا صُرِفَتْ أَبْصَارُهُمْ تِلْقَاءَ أَصْحَابِ النَّارِ قَالُوا رَبَّنَا لَا تَجْعَلْنَا مَعَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ﴾

এ উভয় দলের মাঝখানে থাকবে একটি অন্তরাল৷ এর উচু স্থানে (আরাফ) অপর কিছু লোক থাকবে৷ তারা জান্নাতে প্রবেশ করেনি ঠিকই কিন্তু তারা হবে তার প্রার্থী৷  তারা প্রত্যেককে তার লক্ষণের সাহায্যে চিনে নেবেজান্নাতবাসীদেরকে ডেকে তারা বলবেঃ তোমাদের প্রতি শান্তি হোক! আর যখন তাদের দৃষ্টি জাহান্নামবাসীদের দিকে ফিরবে, তারা বলবেঃ হে আমাদের রব! এ জালেমের সাথে আমাদের শামিল করো না”  

§ কুরআনে الْأَعْرَافِ শব্দটি এসেছে ২বার। এই সূরার ৪৬ এবং ৪৮ নম্বর আয়াতে।

আলোচ্য বিষয়ঃ

§ কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তুঃ রিসালাতের প্রতি ঈমান আনার দাওয়াত।

§ আলোচনা মূল উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যঃ আল্লাহর পাঠানো রাসূলকে মানার জন্য শ্রোতাদের উদ্বুদ্ধ করা।

     সতর্ক ও ভয় দেখানো হয়েছে মক্কাবাসীদেরকেযাতে তারা অতীতের জাতির মতো রাসূলকে অস্বীকার করার কারণে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন না হয়।

     দাওয়াতের ডিরেকশন-মক্কাবাসীদের থেকে ফিরিয়ে আহলে কিতাব ও সমগ্র মানুষের প্রতি পেশ করা হয়েছে। আর তা থেকে এই আভাস পাওয়া যায় যে, হিজরত নিকটবর্তী এবং রাসূলের জন্য শুধু নিকটের মানুষদের দাওয়াত দেয়ার যুগ শেষ হয়ে যাচ্ছে।

     ইহুদীদেরকেও সম্বোধণ করা হয়েছে।

     নবীর প্রতি ঈমান আনার পর ‍মুনাফেকী আচরণের পরিণাম কি, তা জানিয়ে দেয়া হয়েছে।

     শেষ পর্যায়ে দাওয়াতের কৌশল সম্পর্কে রাসূল সা. ও সাহাবায়ে কিরামদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। আর তাহলোঃ

. বিরুদ্ধবাদীদের উত্তেজনা সৃষ্টি, নিপীড়ন ও দমনমূলক কাজের মোকাবেলায় ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার নীতি অবলম্বন করা।

. আবেগ ও উত্তেজনার বশে মূল উদ্দেশ্যের ক্ষতি হতে পারে এমন কোন পদক্ষেপ গ্রহণ না করা।

নাযিলের সময়কাল

§ মক্কী জীবনের শেষ দিকে নাযিল হওয়া সূরা সমূহের একটি সূরা  সূরা আল আনআমের মতোই একটি সূরা।

§ সূরা আনআম আগে নাযিল হয়েছে, না সূরা আল আরাফ-এ ব্যাপারে মুফাস্সিরগনের কোন সুস্পষ্ট বক্তব্য নাই। তবে সমসাময়িক সময়ে নাযিল হয়েছে বলে সকল মুফাস্সির একমত পোষন করেন।

§ পার্থক্য এতটুকু যে, সূরা আল আনআম একসাথে নাযিল হয়েছে-যখন রাসূল সা. উটের উপর সওয়ার ছিলেন। আর সুরা আরাফ একসাথে নাযিল হয়নি।

§ সূরা আল আনআমের বিষয়বস্তু যেমন ছিল আকীদাএই সূরার বিষয়বস্তুও আকীদা।

§ সূরা আল আনআমে আকীদা সম্পর্কে শুধু বর্ণনা এসেছে। আর এই সূরাতে শুধু বর্ণনা নয়, বরং আকীদার বিষয়বস্তু, এর তাৎপর্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।

§ সূরা নাযিলের সময়ে আরবের জাহিলিয়াতের চেহারা প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, অতীতের জাহিলিয়াতের মতো বর্তমানের জাহিলিয়াতের প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য একই ধরণের। যেমনঃ যুক্তিকে দেখেও না দেখা, ব্যক্তি স্বার্থের কারণে সকল যুক্তিকে উপেক্ষা করা।

ব্যাখ্যাঃ

﴿يَا بَنِي آدَمَ قَدْ أَنزَلْنَا عَلَيْكُمْ لِبَاسًا يُوَارِي سَوْآتِكُمْ وَرِيشًا ۖ وَلِبَاسُ التَّقْوَىٰ ذَٰلِكَ خَيْرٌ ۚ ذَٰلِكَ مِنْ آيَاتِ اللَّهِ لَعَلَّهُمْ يَذَّكَّرُونَ﴾

২৬) হে আদম সন্তানেরা, আমি তোমাদের উপর পোশাক (সংক্রান্ত বিধান) পাঠিয়েছি, যাতে করে (এর দ্বারা) তোমরা তোমাদের গোপন স্থান সমূহ ঢেকে রাখতে পারো এবং (নিজেদের) সৌন্দর্যও ফুটিয়ে তুলতে পারো। (তবে আসল) পোশক হচ্ছে (কিন্তু তাকওয়ার পোশাক, আর এটাই হচ্ছে উত্তম (পোশাক)এবং এটি আল্লাহর নিদর্শন সমূহেরও একটি (অংশ, এর উদ্দেশ্য হচ্ছে), যাতে করে মানুষরা এর থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।  

﴿يَا بَنِي آدَمَ﴾ হে বনী আদম!

 

§ ইতিমধ্যে সূরা ২৫ আয়াত পর্যন্ত আদম আ.কে সৃষ্টি, তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন না করায় শয়তান অভিশপ্ত হওয়া, আদম ও হাওয়া আ. এর জান্নাতে অবস্থান, শয়তানের কুমন্ত্রনার শিকার হয়ে জান্নাত থেকে দুনিয়াতে আগমন ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

§ এ পর্যায়ে আলোচনাকে একটি বিশেষ দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আর তার হলো আরববাসীদের অবস্থা। আদম ও হাওয়ার ঘটনা উল্লেখ করে আরববাসীরা কিভাবে শয়তানের ভ্রষ্টতার আর প্রতারনার শিকার তা দেখানো হয়েছে।

§ তখনকার আরববাসী পোষাক ব্যবহার করতো মওসুম অনুযায়ী শরীরকে রক্ষার জন্য। পোষাকের মূল উদ্দেশ্য তাদের কাছে কোন গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। পোষাকের মূল উদ্দেশ্য হলো শরীরের লজ্জাস্থান সমূহ ঢেকে রাখা।

§ তদানিন্তন সময়ে আরবদের অবস্থা ছিলঃ

     তারা নিজেদের লজ্জাস্থানকে অন্যদের সামনে বের করতে শরম অনুভব করতো না।

     তারা খোলা স্থানে উলংগ হয়ে গোসল করতো।

     তারা খোলা জায়গায় সকলের সামনে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিত।

     তাদের পরণের কাপড় খুলে যেতো, লজ্জাস্থান উম্মুক্ত হয়ে যেতো, এতে তারা কোন পরওয়া করতো না।

     তারা হজ্জের সময় অগনিত মানুষের সামনে উলংগ হয়ে তাওয়াফ করতো।

     তাদের এই লজ্জাহীনতায় পুরুষের চেয়ে মেয়েরা ছিল বেশী নির্লজ্জ

     তারা এই লজ্জাহীন আচরণকে ধর্মীয় কাজ এবং সত কাজ মনে করতো।

     এই অবস্থাটা কেবল আরববাসীদের ছিল, এমন নয়। বরং দুনিয়ার অধিকাংশ জাতির এই বেহায়াপনায় নিমজ্জিত ছিল।

§ বিধায়, পুরো আদম সন্তানদেরকে উদ্দেশ্য করে আলোচনা শুরু হচ্ছে।

§ পুরো বনী আদমের জন্য এখানে ম্যাসেজ হচ্ছেঃ

     শয়তানী প্রতারণার সুস্পষ্ট আলামত তোমাদের নিজেদের মাঝে রয়েছে।

     তোমরা নিজের মালিকের পথ নির্দেশনার তোয়াক্কা না করে, নবী রাসূলের দাওয়াত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিজেদেরকে শয়তানের হাতে তুলে দিয়েছো।

     শয়তান তোমাদেরকে মানবিক ফিতরাতের পথ লজ্জা করা থেকে তোমাদের বিচ্যুত করে নির্লজ্জতায় নিক্ষেপ করেছে, যেমন ভাবে নিক্ষেপ করেছিল তোমাদের পিতামাতাকে।

     আর এই বিষয়টা তোমরা চিন্তা করলেই সত্য দেখা দেবে। মানেরাসূলের নেতৃত্ব ও পথনির্দেশনা ছাড়া নিজেদের ফিতরাতি দাবী বুঝা ও পূর্ণ করা সম্ভব নয়।

§ তাওয়াফের সময় কাপড় পরিধান করা না করা প্রসংগে ফি যিলালিল কুরআনের বক্তব্যঃ

     সেই সময়ে কুরাইশা ছিল সবচেয়ে প্রভাবশালী। তারা মনে করতো শ্রদ্ধা পাওয়া তাদের অধিকার, মসজিদে হারামের রক্ষনাবেক্ষণ তাদের অধিকার। পুরো আরব সেটা মানতোও ।  কুরাইশ এবং তাদের সন্তানদেরকে হোমস নামে ডাকা হতো।

     সেই সময়ে কেবল কুরাইশরা নিজেদের কাপড় পরিধান করে কাবা তাওয়াফ করতে পারতো। অন্যদের বেলায় নিয়ম ছিল, যে কাপড় পরে গুনাহ করেছে, সেই কাপড় অপবিত্র। তাই ঐ কাপড় পরে তাওয়াফ করা যাবে না।

     তাদের এই আকীদা ছিল যে, কেবল মাত্র কুরাইশের কাপড় অপবিত্র হয় না।

     বিধায় অন্যান্য মানুষের কাছে তারা কাপড় বিক্রি করতো।  অথবা কারো কাছ থেকে কাপড় ধার নিয়ে তাওয়াফ করতো। যারা কাপড় ক্রয় করতো না, তারা উলংগ অবস্থাতেই তাওয়াফ করতো।

     সময়ের ব্যবধানে দীর্ঘদিন চলার কারণে এটা বাপদাদার নিয়মে পরিণত হয়।

§ সহীহ মুসলিমে একটি হাদীস হযরত উরওয়াহ তার পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন।  তিনি বলেন,

 كانت العرب تطوف بالبيت عراة إلا الحمس، والحمس قريش وما ولدت . كانوا يطوفون بالبيت عراة إلا أن تعطيهم الحمس ثياباً، فيعطي الرجال الرجال، والنساء النساء. وكانت الحمس لا يخرجون من المزدلفة ؛ وكان الناس يبلغون عرفات. ويقولون: نحن أهل الحرم، فلا ينبغي لأحد من العرب أن يطوف إلا في ثيابنا، ولا يأكل إذا دخل أرضنا إلا من طعامنا. فمن لم يكن له من العرب صديق بمكة يعيره ثوباً، ولا يسارٌ يستأجره به كان بين أحد أمرين: إما أن يطوف بالبيت عرياناً وإما أن يطوف في ثيابه، فإذا فرغ من طوافه ألقى ثوبه فلم يمسه أحد. وكان ذلك الثوب يسمى اللقى.

হোমরেস লোক ছাড়া আরবের লোকেরা উলংগ হয়ে তাওয়াফ করতো। এই হোমস বলা হতো কুরাইশ ও তার ঔরসজাত সন্তানদের। আরবের লোকেরা সাধারণতঃ উলংগ হয়ে তাওয়াফ করতো। তবে যাদেরকে হোমসের লোকেরা পরিধানের জন্য কাপড় প্রদান করতো তারা পরতে পারতো। পুরুষরা দিতো পুরুষদেরকে আর নারীরা দিতো নারীদেরকে। সবার মতো এই হোমসের লোকেরা মুজদালিফায় আসতো না। তারা আরাফার মাঠে হাজির হয়ে বলতো, আমরা হারাম এর রক্ষণাবেক্ষণকারী। সুতরাং আমাদের পোষাক না পরে কারো হজ্জ কবুল হবে না এবং আমাদের খাদ্য ছাড়া অন্য কারো খাদ্য ক্রয় করা কারো জন্য জায়েজ হবে না। এতে বহিরাগত লোকদের অনেক সমস্যা হতো। মক্কায় তাদের কোন বন্ধুবান্ধব না থাকলে বা পোশাক ভাড়া নেয়ার মতো স্বচ্ছলতা না থাকলে, তাকে দুইটি অবস্থার যে কোন একটি গ্রহণ করতে হতো। হয় তাকে উলংগ হয়ে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করতে হতো অথবা তার পরিধেয় বস্ত্র পরেই তাওয়াফ করতে হতো। কিন্তু তাওয়াফের পর সে কাপড় খুলে দিতে হতো, যার আর কেউ স্পর্শ করতো না এবং এই পোশাককে বলা হতো লুফা।

﴿قَدْ أَنزَلْنَا عَلَيْكُمْ لِبَاسًا يُوَارِي سَوْآتِكُمْ وَرِيشًا﴾ তোমাদের শরীরের লজ্জাস্থানগুলো ঢাকার এবং তোমাদের দেহের সংরক্ষণ ও সৌন্দর্য বিধানের উদ্দেশ্যে আমি তোমাদের জন্য পোশাক নাযিল করেছি।

§ أَنزَلْنَا আমরা নাযিল করেছি নাযিল তো সেই বস্তুকে বলা হয়, যা উপর থেকে নিচে আসে  তাহলে এখানে নাযিল কেন বলা হলো?

     বড়দের থেকে ছোটদের কিছু প্রদান করা হলে, তখনও নাযিল শব্দ ব্যবহৃত হয় মর্যাদায় বড়রা নিচওয়ালাদের কিছু দান করলে সেখানেও নাযিল শব্দ ব্যবহৃত হয়

     কুরআনে হাকীমে ৫৫বার আনযালনা বলা হয়েছে

     কুরআনে সূরা হাদীদ এর ২৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেঃ ﴿وَأَنزَلْنَا ٱلْحَدِيدَ فِيهِ بَأْسٌ شَدِيدٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ﴾ আর লোহা নাযিল করেছি যার মধ্যে বিরাট শক্তি এবং মানুষের জন্য বহুবিধ কল্যাণ রয়েছে৷ 

§ اللباس হলো ستر العورات বা লজ্জাস্থানকে ঢেকে রাখে। আর তাالسوآت (সাওয়াত)

     লিবাস নাযিল করা মানে লিবাসের উপদান সৃষ্টি করা এবং সেই উপাদান থেকে লিবাস তৈরী করার প্রক্রিয়া শিক্ষা দেয়া

§ الريش হলো ما يتجمل به ظاهراً এমন পোষাক, যা সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য পরিধান করা হয়।

§ পোষাকের প্রথম কাজ হলোঃ সতরকে ঢেকে রাখাযা প্রয়োজন পুরণ করার জন্য করা হয়।  আর الريش হলো পরিপূর্ণতা প্রদান করে এবং অতিরিক্ততা প্রদান করে।

§ ইবন জারীর রাহ. বলেনঃ الرياش في كلام العرب الأثاث وما ظهر من الثياب আরবী ভাষায় বাড়ীর আসবাবপত্র ও প্রয়োজনের অতিরিক্ত পোষাককে ريش বলে।

§ ইবনে আব্বাস রা. এর মতে এই আয়াতাংশের তাফসীর হচ্ছেঃ হে বনী আদম! তোমাদের লজ্জাস্থান ঢাকবার ও বেশভূষার জন্য আমি তোমাদেরকে পোশাক পরিচ্ছেদ দিয়েছি।  পোশাকের মধ্যে রয়েছে সূতীবস্ত্র, পশম ও লোমের বস্ত্র।  বেশভূষার মধ্যে রয়েছে ঘরের আসবাবপত্র ও সম্পদ ইত্যাদি।  তার মতে, الرياش المال মালধন ও বিলাসিতাالريش اللباس والعيش والنعيم

§ হযরত আবিল আলা আলশামী থেকে বর্ণিত।  তিনি বলেনঃ

لبس أبو أمامة ثوباً جديداً فلما بلغ ترقوته قال الحمد لله الذي كساني ما أواري به عورتي، وأتجمل به في حياتي، ثم قال سمعت عمر بن الخطاب يقول قال رسول الله صلى الله عليه وسلم ” من استجد ثوباً فلبسه، فقال حين يبلغ ترقوته الحمد لله الذي كساني ما أواري به عورتي، وأتجمل به في حياتي، ثم عمد إلى الثوب الخلق، فتصدق به، كان في ذمة الله، وفي جوار الله، وفي كنف الله حياً وميتاً

আবু উমামা যখন কোন নতুন কাপড় পড়তেন, তখন তিনি বলতেন: আমি ঐ আল্লাহর প্রশংসা করছি যিনি আমাকে পোষাক পরিয়েছেণ, যার দ্বারা আমি আমার দেহ আবৃত করেছি এবং যার মাধ্যমে আমি নিজের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছি। অত:পর বলেন, আমি হযরত উমর উবনুল খাত্তাব রা.কে বলতে শুনেছি। রাসূল সা. বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কোন নতুন কাপড় পরিধান করে, তা গলা পর্যন্ত জড়িয়ে নেয়ার পর বলেঃ الحمد لله الذي كساني ما أواري به عورتي، وأتجمل به في حياتي (সেই আল্লাহ সকল প্রশংসা, যিনি আমাকে পোশাক পরালেন, যা দিয়ে আমি আমার অনাবৃত দেহ আবৃত করলাম এবং যা আমার জীবনকে সৌন্দর্য মন্ডিত করলো।) এরপর সে তার খুলে ফেলা কাপড় সাদাকা করে দেয়, সে আল্লাহর দায়িত্বে চলে আসে। এবং আল্লাহর কাছে চলে আসে। তা তার জীবিত অবস্থায় হোক অথবা মৃত্যুর পরে হোক। (তিরমিযি)

§ আবি মাতার রা. থেকে বর্ণিত, তিনি দেখলেন যেহযরত আলী রা. এর নিকট একটি বালক আসলো। তিনি তার থেকে ৩ দিরহামে একটি জামা খরিদ করলেন। তিনি হাতের হাতের কবজি থেকে পায়ের গিট পর্যন্ত জামাটি পরিধান করলেন। পোষাকটি পরিধান করার পর তিনি বললেনঃ الحمد لله الذي رزقني من الرياش ما أتجمل به في الناس وأواري به عورتي অর্থাৎ প্রশংসা সেই আল্লাহর, যিনি আমাকে ريش দ্বারা সৌন্দর্য মন্ডিত করলেন এবং তা দিয়ে আমি আমার গুপ্ত অংগ সমূহকে আবৃত করলাম। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, এটা আপনি আপনার নিজের পক্ষ থেকে বললেন, না রাসূল সা. এর মুখ থেকে শুনেছেন? তিনি বললেনঃ هذا شيء سمعته من رسول الله صلى الله عليه وسلم আমি রাসূল সা. এর মুখে এটা শুনেছি। তিনি পোষাক পরিধানের সময় বলেছেনঃ الحمد لله الذي رزقني من الرياش ما أتجمل به في الناس، وأواري به عورتي

﴿وَلِبَاسُ التَّقْوَىٰ ذَٰلِكَ خَيْرٌ ۚ ذَٰلِكَ مِنْ آيَاتِ اللَّهِ﴾ আর তাকওয়ার পোশাকই সর্বোত্তম৷ এই আল্লাহর নিদর্শনগুলোর অন্যতম৷

§ لباس التقوى  সম্পর্কেঃ

     উপরে যে লিবাসের আলোচনা করা হলো, তাহলো জাহেরী লিবাস।  যার উদ্দেশ্য হলো দেহ ঢেকে রাখা এবং দেহের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা।

     এখন আলোচিত হচ্ছে এমন এক তাৎপর্যময় লেবাস সম্পর্কেযা দেখা যায়না। ওটার নাম لباس التقوى এটা বাতেনী পোশাক।

     এই লেবাসের সম্পর্ক অন্তরের সাথে এই লেবাসের সম্পর্ক মানুষের আমলের সাথে, চরিত্রের সাথে, নৈতিকতার সাথে, আল্লাহর সাথে সম্পর্কের সাথে

     এই বাতিনী পোষাক মনের দূর্বলতাকে ঢেকে রাখে, মনের সৌন্দর্যকে বৃদ্ধি করে।  কিন্তু এই লেবাসে সুশোভিত হওয়ার জন্য প্রয়োজন বাহ্যিক শরয়ী পোশাকে আচ্চাদিত হওয়া।

     মানুষের মন থেকে যখন তাকওয়ার লেবাস খুলে ফেলা হয়েছে, তখনই বাহ্যিক শরয়ী লেবাসের প্রয়োজন পড়েছে।  এবং শরয়ী লেবাস নাযিল করা হয়েছে।

     এই শরয়ী লেবাস পরিধানের মাধ্যমে সে তাকওয়ার লেবাস পরিধান করবে। এক্ষেত্রে ১. পুরুষেরা রেশমী লেবাস পরবেনা, . পোশাকের নিম্নাঞ্চল ঝুলিয়ে রাখবেনা। ৩. নারীরা মিহি বা পাতলা কাপড় পরবেনা।  ৪. পুরুষ মহিলার পোশাক এবং মহিলা পুরুষের পোশাক পরবেনা।  ৫. অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতীকি পোশাক পরবে না।

     মাআরিফুল কুরআনে বলা হয়েছে, লজ্জাস্থান হেফাজতের পোশাক, সাজ সজ্জার পোষাকের মূল উদ্দেশ্য হলো তাকওয়ার পোশাক গ্রহণ করা বা তাকওয়া অর্জন করা।

     আব্দুর রহমান ইবনে আসলাম বলেন, কোন ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে বলেই তারা সতর ঢেকে রাখেএটিই তাকওয়ার লেবাস।

§ এখানে বর্ণিত লিবাস শব্দের অর্থ নিয়ে মুফাস্সিরিনে কিরাম ইখতিলাফ করেছেন।

     ইকরামা রাহ. বলেনঃ هو ما يلبسه المتقون يوم القيامة এটি এমন পোষাক, যা কিয়ামতের দিন মুত্তাকীদের পরানো হবে।

     কাতাদাহ ও ইবনে জুরাইজ রাহবলেনঃ لباس التقوى الإيمان এর অর্থ হচ্ছে ঈমান।

     ইবনে আব্বাস রা. এর মতেঃ العمل الصالح তা হলো আমলে সালেহ।  ইবনে আব্বাস আরো বলেন, সূতী বস্ত্রের পোশাক আল্লাহর নির্দর্শন সমূহের অন্যতম।

     উরওয়া ইবনে জুবাইর রাহ. বলেনঃ لباس التقوى خشية الله আল্লাহর ভয়।

     আব্দুল্লাহ বিন জায়িদ বিন আসলাম রা. এর মতেঃ لباس التقوى يتقي الله، فيواري عورته، فذاك لباس التقوى এমন পোষাক যা তাকওয়ার সৃষ্টি করে। লজ্জাকে ঢেকে রাখে যে পোষাক, তাই তাকওয়ার লিবাস।

§ উপরোক্ত সকল অর্থই কাছাকাছি অবস্থান করছে। আল্লাহর রাসূল সা. এর এই হাদীসটি পড়লে আমরা পরিস্কার হবো।

সুলাইমান ইবনে আরকাম হাসান রা. থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি হযরত উসমান বিন আফ্ফান রা.কে রাসূলুল্লাহ সা. এর মিম্বরের উপর দেখলাম এই অবস্থায় যে, তিনি একটি জামা পরিধান করেছেন, যার বোতাম গুলো ছিল খোলা। এবং আমি শুনলাম যে তিনি নির্দেশ দিচ্ছেন যেন কুকুরগুলোকে হত্যা করা হয়। এবং নিষেধ করছিলেন কবুতরবাজি থেকে। অতঃপর তিনি বললেনঃ হে মানব সকল! গোপনে গোপনে কাজ করার ক্ষেত্রে আল্লাহকে ভয় করোকেননা আমি রাসূল সা.কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেনঃ আল্লাহ শপথযা হাতে মুহাম্মদ এর প্রাণ, কেউ যদি লুকিয়ে লুকিয়ে কোন কাজ করে, তবে আল্লাহ সেই কাজকে প্রকাশ করে দেবেন। সে কাজ যদি ভাল হয়, তাহলে তো সুনাম হবে। আর মন্দ হলে হবে দূর্ণামঅতঃপর তিনি পড়লেনঃ وَرِيشًا وَلِبَاسُ ٱلتَّقْوَىٰ ذَٰلِكَ خَيْرٌ ذَٰلِكَ مِنْ آيَـٰتِ ٱللَّهِ

﴿لَعَلَّهُمْ يَذَّكَّرُونَ﴾ সম্ভবত লোকেরা এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবে৷

§ এই নিদর্শন সমূহ সম্পর্কে মানুষ যেন চিন্তা ভাবনা করে, মানুষ যেন আল্লাহ অসীম অনুগ্রহ  স্বীকার করে, মানুষ যেন শোকর আদায় করে।

 

﴿يَا بَنِي آدَمَ لَا يَفْتِنَنَّكُمُ الشَّيْطَانُ كَمَا أَخْرَجَ أَبَوَيْكُم مِّنَ الْجَنَّةِ يَنزِعُ عَنْهُمَا لِبَاسَهُمَا لِيُرِيَهُمَا سَوْآتِهِمَا ۗ إِنَّهُ يَرَاكُمْ هُوَ وَقَبِيلُهُ مِنْ حَيْثُ لَا تَرَوْنَهُمْ ۗ إِنَّا جَعَلْنَا الشَّيَاطِينَ أَوْلِيَاءَ لِلَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ﴾

২৭) হে আদম সন্তানেরা! শয়তান যেভাবে তোমাদের পিতামাতাকে জান্নাত থেকে বের করে দিয়েছে, তেমনি করে তোমাদেরও যেন প্রতারিত করতে না পারে।  শয়তান তাদের উভয়ের দেহ থেকে পোশাক খুলে ফেলেছিল। যাতে করে তাদের উভয়ের গোপন স্থান সমূহ উভয়ের কাছে উম্মুক্ত হয়ে পড়ে। (মূলতঃ) সে নিজে এবং তার সংগীসাথীরা তোমাদেরকে এমন স্থান থেকে দেখতে পায়, যেখান থেকে তোমরা তাদেরকে দেখতে পাওনা।

§ এ পর্যন্ত আলোচনায় আমরা যা জানতে পারলামঃ

. পোষাক মানুষের কৃত্রিম কোন জিনিস নয়। বরং পোষাক মানুষের ফিতরাতি একটি বিষয়। আল্লাহ পশুদের জন্য দিয়েছেন লোমের মতো জিনিস। আর মানুষেকে দিয়েছেন লজ্জানুভূতি।

     মানুষের লজ্জাস্থান কেবলমাত্র যৌন কর্ম সম্পাদনের জন্য তৈরী করেননি বরং এগুলোকে সাওআতবানানো হয়েছে।

     আরবীতে সাওয়াতবলা হয় এমন বস্তুকে, যা প্রকাশ করাকে মানুষ খারাপ বা লজ্জাজনক মনে করে।

     সেই সাওয়াত ঢেকে রাখার জন্য আল্লাহ মানুষকে কোন তৈরী করা পোষাক দেননি। বরং মানুষের ফিতরাতকে পোষাক ব্যবহারে উদ্বোদ্ধ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেছেনঃ قَدْ أَنزَلْنَا عَلَيْكُمْ لِبَاسًا যাতে মানুষ নিজেদের বুদ্ধিকে ব্যবহার করে ফিতরাতের দাবী উপলব্দি করে এবং আল্লাহর দেয়া উপায় উপকরণ কাজে লাগিয়ে নিজেদের জন্য পোষাক তৈরী করেতে পারে।

. মানুষের এই ফিতরাতি ও জন্মগত উপলব্দি থেকে প্রয়োজন পোষাকের প্রয়োজন। এই প্রয়োজনটা বাহ্যিক প্রয়োজন নয়, বরং নৈতিক প্রয়োজন।

     মানুষে প্রথমে তার সাওআতআবৃত করবে।

     দ্বিতীয়ত স্বভাবগত চাহিদা ও প্রয়োজন পুরণ করবে। যেমনঃ দৈহিক সৌন্দর্য বিধান করা (রীশ), আবহাওয়া জনিত কারণে দেহের সৌন্দর্য নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করা ইত্যাদি।

     মানুষ আর পশুর মাঝে স্বভাবজাত ভিন্নতাঃ

. পশুর শরীরের লোম তার রীশতথা শুভা বর্ধন করে এবং আবহাওয়ার প্রভাব থেকে তাকে রক্ষা করে।

. পশুর শরীরের লোম তাজ লজ্জাস্থান ঢেকে রাখার কাজ করে না।

. পশুর শরীরের যৌনাঙ্গ তার লজ্জাস্থান বা সাওয়াত নয়। বিধায়, লজ্জাস্থান ঢেকে রাখার স্বভাব বা প্রাকৃতিক অনুভূতি ও চাহিদা পশুর নাই।

. যেহেতু পশুর সাওয়াত নাই, তাই সাওয়াত ঢাকার জন্য পশুর জন্য কোন পোষাকও তৈরী করা হয়নি।

. শয়তানের যুক্ত ছিল, পশুর যেমন সাওয়াত নাই, মানুষেরও তেমন। তাই পোষাক দিয়ে দিয়ে লজ্জাস্থান ঢেকে রাখা কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। বরং যৌনাঙ্গ স্বাভাবিক একটা বিষয়, তা লজ্জাস্থান হিসাবে বিবেচনার মতো গুরুত্ববহ নয়।

. পোষাক কেবল লজ্জাস্থান ঢাকা, শরীরের শোভা বর্ধন ও শরীর হেফাজতের জন্য নয়। বরং পোষাক একটি মহৎ বস্তু। যা নৈতিকতাকে তাকওয়ার মানে পরিণত করে। বিধায় মানুষঃ

     পোষাকের মাধ্যমে সতর বা লজ্জাস্থান ঢাকবে।

     পোষাকের শুভাবর্ধনে সীমা থাকতে হবে। ব্যক্তির মর্যাদার সাথে সংগতিপূর্ণ হবেনিম্নমানের হবে না।

     পোষাক গর্ব, অহংকার ও আত্মম্ভরিতার বাহন হবে না।

     পোষাকের মাধ্যমে মানসিকতার প্রকাশ পাবে। পুরুষ নারীসূলভ পোষাক পরবে না, নারী পুরুষ সুলভ পোষাক পরবে না।

     নিজ জাতির পোষাক পরবে, অন্য জাতির সাদৃশ্য হওয়ার চেষ্টা করবে না।

     পোষাকের এই মানে তখনই পৌছা যাবে, যখন নিজেকে পুরোপুরি আল্লাহর নির্দেশনার আওতায় সম্পর্ক করা সম্ভব হবে।

     মানুষ যখন আল্লাহর পথ নির্দেশ গ্রহণে অসম্মতি জানায়, তখন শয়তান তাদের পৃষ্ঠপোষক ও অভিভাবক হয়ে যায়। আর ফলে তাদেরকে ভূল ও অসৎ কাজে লিপ্ত করে ছাড়ে।

. দুনিয়াতে বিদ্যমান অসংখ্য নির্দশন সমূহযা মানুষকে সত্যের সন্ধান প্রদানে সাহায্য করে। পোষাক তার অন্যতম।

     মানুষ যদি নিজে শিক্ষা গ্রহণ করতে চায়, তাহলে মহাসত্যের সন্ধান পাবে।

     উপরের আলোচনা প্রমাণ করে যে, পোষাক তেমনি ধরণের একটি অন্যতম ও গুরুত্বপূর্ণ আল্লাহ নিদর্শন।

﴿يَا بَنِي آدَمَ لَا يَفْتِنَنَّكُمُ الشَّيْطَانُ كَمَا أَخْرَجَ أَبَوَيْكُم مِّنَ الْجَنَّةِ يَنزِعُ عَنْهُمَا لِبَاسَهُمَا لِيُرِيَهُمَا سَوْآتِهِمَا﴾ হে বনী আদম! শয়তান যেন তোমাদের আবার ঠিক তেমনিভাবে বিভ্রান্তির মধ্যে নিক্ষেপ না করে যেমনভাবে সে তোমাদের পিতামাতাকে জান্নাত থেকে বের করেছিল এবং তাদের লজ্জাস্থান পরস্পরের কাছে উন্মুক্ত করে দেবার জন্যে তাদেরকে বিবস্ত্র করেছিল৷

§ এখানে আদম সন্তানদের সতর্ক করা হচ্ছে, ইবলিস ও আদমের পুরাতন শত্রুতাকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে। আর বুঝানো হচ্ছে, আদম হাওয়ার এবং ইবলিসের মধ্যে যেমন শত্রুতা ছিল তেমনি আদম সন্তান মানুষ এবং ইবলিস সন্তান শয়তানের মাঝে শত্রুতা রয়েছে।  শয়তান আদম আ. ও হাওয়া আ.কে জান্নাত থেকে বের করার এবং তাদের পোশাক খুলে ফেলার মাধ্যম হয়েছে।  বিধায় শয়তান সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবেযাতে সে আদম সন্তানদের কোন ফিতনার মধ্যে না ফেলে।

§ ইবলিসের কুমন্ত্রানয় পড়েঃ

     আদম ও হাওয়া আ. কে সুখের স্থান জান্নাত ছেড়ে কষ্টের জায়গা দুনিয়াতে আবাস গড়তে হয়েছে।

     আদম ও হাওয়া আ. এর দেহের গোপনীয়তা পরস্পরের সামনে প্রকাশ হয়ে পড়ে তাদেরকে লজ্জায় পড়তে হয়।

§ মাআরিফুল কুরআনে বলা হয়েছেঃ ঈমান গ্রহণের পর সর্বপ্রথম ফরয হলো নিজের লজ্জাস্থানকে আবৃত্ত করা। নামায রোযা ইত্যাদির এর পরের কাজ।

§ তাফসীর ফী যিলালিল কুরআনে বলা হয়েছেঃ শয়তানের ওয়াসওয়াসার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হলো আসল যুদ্ধ।  দুনিয়াতে বহু তাগুতী শক্তি আছে, নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও তাদের মনগড়া আইনকে চালু করে মানুষকে সর্বদা দাস বানিয়ে রাখতে চায়।  এরা হচ্ছে মানুষ শয়তান। আর জিন শয়তানরা ঐ মানুষ শয়তানদের কূবুদ্ধি দিয়ে থাকে।  অতএব, মানুষ শয়তানের বিরুদ্ধে শয়তানের বিরুদ্ধে জিহাদ করা করা মানে জিন শয়তানের বিরুদ্ধে জিহাদ করা।

﴿إِنَّهُ يَرَاكُمْ هُوَ وَقَبِيلُهُ مِنْ حَيْثُ لَا تَرَوْنَهُمْ﴾ সে ও তার সাথীরা তোমাদেরকে এমন জায়গা থেকে দেখে যেখান থেকে তোমরা তাদেরকে দেখতে পাও না

§ দুশমন আমাদের দেখছে, কিন্তু আমরা দুশমনকে দেখছিনা। বিধায় হামলা হবে অত্যন্ত ভয়ংকরযা প্রতিরোধ করা কঠিন।

§ বিধায়, দুশমনের কুমন্ত্রনা সম্পর্কে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। আর এর প্রতিকার হলোঃ

     এমন সত্তার আশ্রয় গ্রহণ করা, যিনি দুশমনকে দেখছেনকিন্তু দুশমন তাকে দেখছেনা।

     এমন সত্তার আশ্রয় গ্রহণ করা, যিনি সূক্ষদর্শী এবং দুশমনের সকল বিষয়ে ওয়াকিফহাল।

§ প্রশ্নঃ জিন কি মানুষকে শুধু দেখেমানুষ কি একেবারে জিনকে দেখতে পারে না?

     কতিপয় উলামায়ে কিরামদের মতেঃ في هذا دليل على أن الجن لا يرون

     ইবনে আব্বাসের মতে, শয়তান ও তার সৈন্যবাহিনীর অবস্থান হলো মানুষের অন্তরে, তাই তাদেরকে দেখতে পাওয়া যায় নাউপলব্দি করা যায়।

     তাফসীরে উমসমানীতে বলা হয়েছে, মানুষ জিনকে একেবারে দেখতে পারেনা, এই আয়াতের মাধ্যমে দলীল পেশ করা সংকীর্ণ দৃষ্টিভংগীর পরিচয়।

     যারা জিনকে দেখা যায় বলে মত প্রকাশ করেন, তারা বলেনঃ জিন দেখার সুযোগ রয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা যখন তাদেরকে দেখানোর ইচ্ছা পোষন করেন, তখন তাদের অবয়বকে উম্মুক্ত করেন দেনযাতে দেখা যায়جائز أن يروا لأن الله تعالى إذا أراد أن يريهم كشف أجسامهم حتى ترى

     আল নুহাস বলেনঃ

من حيث لا ترونهم يدل على أن الجن لا يرون إلا في وقت نبي; ليكون ذلك دلالة على نبوته; لأن الله جل وعز خلقهم خلقا لا يرون فيه، وإنما يرون إذا نقلوا عن صورهم. وذلك من المعجزات التي لا تكون إلا في وقت الأنبياء صلوات الله وسلامه عليهم

     আল কুসিরী বলেনঃ أجرى الله العادة بأن بني آدم لا يرون الشياطين اليوم. وفي الخبر إن الشيطان يجري من ابن آدم مجرى الدم

﴿إِنَّا جَعَلْنَا الشَّيَاطِينَ أَوْلِيَاءَ لِلَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ﴾  এ শয়তানদেরকে আমি যারা ঈমান আনে না তাদের অভিভাবক করে দিয়েছি

§ অর্থাৎ তারা তাদের বেঈমানী কাজের মাধ্যমে শয়তানের বন্ধুত্বকেই তারা নিজেদের জন্য পছন্দনীয় করে নিয়েছে।

§ ইবনে আব্বাস বলেন, যারা মুহাম্মদ সা. ও কুরআনের উপর ঈমান আনেনা, আল্লাহ শয়তানকে তাদের অভিভাবক করে দেন।

§ যে কথাটাকে সূরা আল কাহফের ৫০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে এই ভাবেঃ

﴿ أَفَتَتَّخِذُونَهُ وَذُرِّيَّتَهُ أَوْلِيَاءَ مِن دُونِي وَهُمْ لَكُمْ عَدُوٌّ ۚ بِئْسَ لِلظَّالِمِينَ بَدَلًا﴾ এখন কি তোমরা আমাকে বাদ দিয়ে তাকে এবং তার বংশধরদেরকে নিজেদের অভিভাবক বানিয়ে নিচ্ছো অথচ তারা তোমাদের দুশমন? বড়ই খারাপ বিনিময় জালেমরা গ্রহণ করছে!

 

﴿وَإِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً قَالُوا وَجَدْنَا عَلَيْهَا آبَاءَنَا وَاللَّهُ أَمَرَنَا بِهَا ۗ قُلْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَأْمُرُ بِالْفَحْشَاءِ ۖ أَتَقُولُونَ عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ﴾

২৮) তারা যখন কোন অশ্লিল কাজ করে তখন বলে, আমাদের বাপ-দাদাদেরকে আমরা এভাবেই করতে দেখেছি এবং আল্লাহই আমাদের এমনটি করার হুকুম দিয়েছেন। তাদেরকে বলে দাও আল্লাহ কখনো নির্লজ্জতা ও বেহায়াপনার হুকুম দেন না। তোমরা কি আল্লাহর নাম নিয়ে এমন কথা বলো যাকে তোমরা আল্লাহর কথা বলে জানো না?  

§ উপরোক্ত আয়াতের একটি সুনির্দিষ্ট শানে নুযুল রয়েছে।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, এক মহিলা উলংগ অবস্থায় তাওয়াফ করছিল।

فَيَقولُ عَبدُ اللهِ بنُ عبَّاسٍ: كانتِ المرأَةُ تَطوفُ بالبَيتِ وهي عُريانَةٌ فتَقولُ مَن يُعيرُني تِطوافًا، وَهُو ثَوبٌ تَلبَسُه المرأَةُ تَطوفُ بِه وتَقولُ:
اليَومَ يَبدو بَعضُه أَو كُلُّه ** فَما بَدا مِنه فَلا أُحلُّه

والمقصودُ بقَولِها: إِنَّني لا أُبدي عَورَتي بقَصْدِ الفَحشاءِ، وإِنَّما أُبديه لِحاجةٍ، وَهِيَ ألَّا أَطوفَ بثِيابٍ أَذنبتُ فيها فَلا أُبيحُ لأَحدٍ أنْ يَنظُرَ إِليه أو يَتمَتَّعَ بِه، وَكان أَهلُ الجاهليَّةِ يَطوفونَ عُراةً ويَرمُونَ ثِيابَهم ويَترُكونَها مُلقاةً عَلى الأَرضِ وَلا يَأخُذونَها أبدًا ويَترُكونَها تُداسُ بالأَرجُلِ، فأَنزلَ اللهُ تَعالى: ﴿خُذُوا زِينَتَكُمْ عِنْدَ كُلِّ مَسْجِدٍ الأعراف: 31

وَالمرادُ بِذلكَ: أن يَستُروا عَوراتِهم عِند المساجِدِ، فدَخلَ في ذَلكَ الطَّوافُ والصَّلاةُ والِاعتِكافُ، وغَيرُ ذلكَ.

وفي الحديث: سَببُ نُزولِ هذِه ﴿خُذُوا زِينَتَكُمْ عِنْدَ كُلِّ مَسْجِدٍ في سورةِ الأعرافِ.

﴿وَإِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً قَالُوا وَجَدْنَا عَلَيْهَا آبَاءَنَا وَاللَّهُ أَمَرَنَا بِهَا﴾ তারা যখন কোন অশ্লিল কাজ করে তখন বলে, আমাদের বাপ-দাদাদেরকে আমরা এভাবেই করতে দেখেছি এবং আল্লাহই আমাদের এমনটি করার হুকুম দিয়েছেন

§ এই বক্তব্যটি আরববাসীদের। কুরাইণ ছাড়া পুরো আরববাসী তারা দিন রাতে যে পোষাক পরতো, তা পরিধান করে তাওয়াফ করতো না।  তারা বলতো এই পোষাক পরিধান করে তারা পাপ করেছে, সেই পোষাক পরে তারা তাওয়াফ কিভাবে করতে পারে।  কুরাইশরা কাপড় পরিধান করেই তাওয়াফ করতো।

§ যারা উলংগ অবস্থায় কাবার তাওয়াফ করতো। এবং তারা এই কাজটা ইবাদত মনে করে করতো।  তারা মনে করতো যে, আল্লাহ এই ভাবে করার জন্য তাদেরকে হুকুম দিয়েছেন।

§ মুজাহিদ বলেন, كان المشركون يطوفون بالبيت عراة يقولون نطوف كما ولدتنا أمهاتنا، فتضع المرأة على قبلها النسعة أو الشيء  মুশরিকরা কাবাকে উলংগ অবস্থায় তাওয়াফ করতো আর বলতো আমাদের মায়েরা আমাদেরকে যেভাবে জন্ম দিয়েছে, আমরা সেভাবে তাওয়াফ করি।

﴿قُلْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَأْمُرُ بِالْفَحْشَاءِ﴾ তাদেরকে বলে দাও আল্লাহ কখনো নির্লজ্জতা ও বেহায়াপনার হুকুম দেন না

§ উলংগ হয়ে তাওয়াফ করাটা যারা ইবাদত মনে করতো-তাদের যুক্তিকে খন্ডন করে আল্লাহর বিধান বর্ণনা করা হচ্ছে।

§ অশ্লীলনির্লজ্জ কাজ সুস্থ বিবেক বুদ্ধি ও সুস্থ স্বভাব যাকে ঘৃণা করে।  এসব তালিব দেয়া আল্লাহর শানের খেলাফ। নির্লজ্জ কাজের তালিম দেয়া শয়তানের কাজ।

§ এর মাধ্যমে জানা যায়, নির্লজ্জতার কাজ শয়তান থেকে এসেছে, আর ঢেকে রাখার কাজ আদম থেকে এসেছে। বিধায় বাপ দাদা থেকে উলংগপনার কোন নির্দেশ পাওয়া যায়না। এটা সর্বেয় মিথ্যা।

§ আল্লাহ বেহায়াপনার নির্দেশ দেন নাকথাটা খুব ছোট হলেও এর মাঝে রয়েছে কাবাঘর উলংগ তাওয়াফকারী জাহেলী আকীদার বিরুদ্ধে বড় ধরণের একটি যুক্তি।

. আরবের মানুষ কিছু ধর্মীয় অনুষ্ঠানে উলংগ হতো, তারা এটাকে পবিত্র কাজ মনে করতো। কিন্তু উলংগ হওয়া জিনিসটাকে তারা লজ্জাজনক বিষয় মনে করতো। তার প্রমাণ হলোঃ তারা কোন ভদ্র বা অভিজাত অনুষ্ঠানে বা বাজারে কিংবা নিজের আত্মীয় স্বজনদের সামনে তারা উলংগ হওয়াটাকে পছন্দ করতো না।

. আরবের মানুষ যে ধর্ম পালন করতো, সেই ধর্ম আল্লাহর পাঠানো ধর্ম এবং ধর্মের আনুষ্ঠানিকতা আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত মনে করতো। আর যার কারণে তারা উলংগপনাকে ব্যক্তি জীবনে লজ্জাজনক মনে করলেও ইবাদত মনে করে তারা উলংগ হতো।

§ কুরআন এখানে যুক্তি পেশ করছে যে,

. যে কাজকে তোমরা অশ্লীল কাজ মনে করোসেই কাজকে তোমরা কিভাবে বিশ্বাস করো যে, আল্লাহ হুকুম দিয়ে থাকবেন।

. আল্লাহর তরফ থেকে কোন সময় কোন অশ্লীল কাজের হুকুম আসতে পারে না।

. তোমাদের ধর্মে যদি এমন কোন হুকুম পাওয়া যায়, তাহলে এটা প্রমাণ করে যেএই ধর্ম আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরণ করা নয়।

﴿أَتَقُولُونَ عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ﴾ তোমরা কি আল্লাহর নাম নিয়ে এমন কথা বলো যাকে তোমরা আল্লাহর কথা বলে জানো না? 

§ এই যে উলংগ হয়ে তাওয়াফ করা আল্লাহর নির্দেশ বলে চালানো হলো, তার ব্যাপারে সতর্ক করা হলো যে, যা আল্লাহর বলে তোমরা নিশ্চিত জাননা, সেই কথা আল্লাহর বলে তোমরা চালিয়ে দিও না।

 

﴿قُلْ أَمَرَ رَبِّي بِالْقِسْطِ ۖ وَأَقِيمُوا وُجُوهَكُمْ عِندَ كُلِّ مَسْجِدٍ وَادْعُوهُ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ ۚ كَمَا بَدَأَكُمْ تَعُودُونَ﴾

২৯) হে মুহাম্মাদ! তাদেরকে বলে দাও আমার রব তো সততা ও ইনসাফের হুকুম দিয়েছেনতাঁর হুকুম হচ্ছে, প্রত্যেক ইবাদত নিজের লক্ষ্য ঠিক রাখো এবং নিজের দীনকে একান্তভাবে তাঁর জন্য করে নিয়ে তাঁকেই ডাকো যেভাবে তিনি এখান তোমাদের সৃষ্টি করেছেন ঠিক তেমনিভাবে তোমাদের আবার সৃষ্টি করা হবেও  

﴿قُلْ أَمَرَ رَبِّي بِالْقِسْطِ﴾ হে মুহাম্মাদ! তাদেরকে বলে দাও আমার রব তো সততা ও ইনসাফের হুকুম দিয়েছেন৷

 

§ الْقِسْطِ মানে আদল। আর আদল হলোঃ সবকিছুতে মধ্যমপন্থা অবলম্বন।  কোন কিছু বাড়ানো বা কমানো না করার নাম আদল।  রুহুল মায়ানীতে বলা হয়েছেঃ আল্লাহ সকল কাজে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করে কমবেশী থেকে বিরত থাকার হেদায়াত দিচ্ছেন।  বিধায়, অশ্লীলতা ও বেহায়াপনার নির্দেশ তিনি কিভাবে দিতে পারেন?

§ ইবনে আব্বাসের মতে, ন্যায় বিচার মানে তাওহীদ।

﴿وَأَقِيمُوا وُجُوهَكُمْ عِندَ كُلِّ مَسْجِدٍ وَادْعُوهُ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ﴾ তাঁর হুকুম হচ্ছে, প্রত্যেক ইবাদত নিজের লক্ষ্য ঠিক রাখো এবং নিজের দীনকে একান্তভাবে তাঁর জন্য করে নিয়ে তাঁকেই ডাকো

§ عِندَ كُلِّ مَسْجِدٍ এর মাসজিদ শব্দটির অর্থ

     সিজদা গ্রহণ করে তার ভাবার্থ গ্রহণ করা হয়েছে নামায।  অপর দিকে وُجُوهَكُمْ প্রকাশ্য অর্থ গ্রহণ করা হয়েছে। অর্থাৎ নামাযের সময় নিজের মুখকে সোজা রাখবেতথা কাবার দিকে রাখবে।  এই মত প্রকাশ করেছেন মাওলানা মাহমুদুল হাসান।

     অন্যান্য মুফাস্সিররা وَأَقِيمُوا وُجُوهَكُمْ এর অর্থ করেছেনঃ সর্বদা মনে প্রাণে আল্লাহর ইবাদতের প্রতি মননিবেশ করবে।

     হাফিজ ইবনে কাসির এর মতেঃ সকল ইবাদতে সোজা থাকবে। নবী সা. এর দেখানো তরিকায় থাকবে।  ইবাদত কবুল হওয়ার শর্ত ২টি। ১. একান্ত ভাবে আল্লাহর জন্য হওয়া। ২. রাসূলের তরীকা অনুযায়ী হওয়া। আকীমু উজুহাকুম দ্বারা রাসূলের তরীকার দিকে ইংগিত করা হয়েছে।

§ সারকথা হলোঃ দ্বীনের সাথে অর্থহীন রীতি বা আনুষ্ঠানিকতার কোন সম্পর্ক নাই।

§ যে দ্বীনের শিক্ষা দেয়া হচ্ছে, তার মূলনীতি হলোঃ

. মানুষ তাদের জীবনকে প্রতিষ্ঠিত করবেঃ সত্য, সততা, ন্যায়নিষ্ঠা ও ভারসাম্যের উপর।

. ইবাদতে অবিচল থাকতে হবে সঠিক লক্ষের উপরঃ আল্লাহর ইবাদত ছাড়া অন্য কারো ইবাদতের স্পর্শ থাকবে না। আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন মাবুদের আনুগত্য, দাসত্ব, হীনতা ও দীনতার সামান্য প্রকাশও ঘটবে না।

. চাইতে হবে কেবল আল্লাহর কাছেঃ এই চাওয়া পথনির্দশনা, সাহায্য, সমর্থন, পৃষ্ঠপোষকতা, হেফঅজত ও সংরক্ষণ সকল ক্ষেত্রে। আর তার জন্য শর্ত হলোঃ

     নিজের দ্বীনকে কেবলমাত্র আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট করা।

     জীবন সকল বিষয় পরিচালিত হবে কুফরী, শিরক, গোনাহ ও অন্যের গোলামীর ভিত্তিতে। আর সাহায্য চাওয়া হবে আল্লাহর কাছেএমন যেন না হয়।

. আখেরাতের প্রতি ঈমানঃ এই আকীদা পোষন করতে হবে যে, যে প্রক্রিয়ায় জন্মগ্রহণ করে দুনিয়াতে এসেছে, তেমনি অন্য একটি জগতেও তার জন্ম হবে এবং এই দুনিয়ার সকল কাজের হিসাব আল্লাহর কাছে দিতে হবে।

﴿كَمَا بَدَأَكُمْ تَعُودُونَ﴾ যেভাবে তিনি এখান তোমাদের সৃষ্টি করেছেন ঠিক তেমনিভাবে তোমাদের আবার সৃষ্টি করা হবেও

§ ﴿كَمَا بَدَأَكُمْ تَعُودُونَ﴾ যেভাবে তিনি এখান তোমাদের সৃষ্টি করেছেন ঠিক তেমনিভাবে তোমাদের আবার সৃষ্টি করা হবেও। -এই বক্তব্য নিয়ে মুফাস্সিরদের মাঝে মতানৈক্য দেখা যায়ঃ

     এক পক্ষের মতঃ কথার অর্থ হলোঃ যখন তোমরা কিছুই ছিলেনা, তখন তিনি তোমাদেরকে যেমন সৃষ্টি করেছেন, একই ভাবে তুমি মরে যাবার পরও তিনি আবার তোমাকে পুনর্জীবিত করবেনই।

     ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, একদিন রাসূল সা. নসিহত করতে গিয়ে বললেনঃ হে লোক সকল! তোমরা কিয়ামতের দিন উলঙ্গ ও খৎনা না করা অবস্থায় উঠবে।  কারণ, জন্মের সময় তোমরা এভাবেই ছিলে।

     মুজাহিদ রাহ. বলেন, এর অর্থ হলোঃ মুসলমান মুসলমান অবস্থা আর কাফির কাফির অবস্থায় উঠানো হবে।

     আবু আলিয়া বলেন, আল্লাহর ইলম অনুযায়ী যে রূপে আমল ছিল সে ভাবে উঠানো হবে।

     মুহাম্মদ ইবনে কাব এর মতে এর অর্থঃ যদি কারো জন্ম হয় দূর্ভাগা অবস্থায় তাহলে অর্ভাগা অবস্থায় আর জন্ম যদি হয় সৌভাগ্যের উপর, তাহলে ভাগ্যবান অবস্থায় উঠানো হবে।

     সূরা আত তাগাবুন এর ২নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেঃ ﴿هُوَ الَّذِي خَلَقَكُمْ فَمِنكُمْ كَافِرٌ وَمِنكُم مُّؤْمِنٌ﴾ তিনি আল্লাহ, যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তোমাদেরকে মধ্য থেকে কেউ কাফির এবং কেউ মুমিন।

     ইবনে মাসউদ রা. বর্ণিত হাদীসযা সহীহ বুখারীতে উল্লেখ করা হয়েছেঃ

فوالذي لا إله غيره إن أحدكم ليعمل بعمل أهل الجنة، حتى ما يكون بينه وبينها إلا باع أو ذراع، فيسبق عليه الكتاب، فيعمل بعمل أهل النار، فيدخلها، وإن أحدكم ليعمل بعمل أهل النار حتى ما يكون بينه وبينها إلا باع أو ذراع، فيسبق عليه الكتاب، فيعمل بعمل أهل الجنة، فيدخل الجنة

আল্লাহর রাসূল সা. বলেছেনঃ আল্লাহর শপথ! কোন লোক জান্নাতিদের আমল করতে থাকে এমন কি তারও জান্নাতের মধ্যে মাত্র এক গজের ব্যবধান থেকে যায়। এমতাবস্তায় তাকদীরের লিখন তার উপর জয়যুক্ত হয়ে যায়, ফলে সে জাহান্নামীদের আমল করতে শুরু করে এবং এর উপর মৃত্যু বরণ করে। সুতরাং সে জাহান্নামে প্রবেশ কর। অপর দিকে, কোন লোক সারা জীবন ধরে জাহান্নামীদের আমল করতে থাকে এবং জাহান্নাম হতে মাত্র এক গজ দূরে অবস্থান করে। এমন সময় আল্লাহর লিখন তার উপর জয়যুক্ত হয়। ফলে সে জান্নাতীদের আমল শুরু করে দেয় এবং ঐ অবস্থাতেই মারা গিয়ে জান্নাতে পবেশ করে।

     সাহাল বিন সাদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেছেনঃ إن العبد ليعمل فيما يرى الناس بعمل أهل الجنة، وإنه من أهل النار، وإنه ليعمل فيما يرى الناس بعمل أهل النار، وإنه من أهل الجنة، وإنما الأعمال بالخواتيم

     কোন লোকের আমল মানুষের কাছে জান্নাতীদের আমল মনে হবে, অথচ সে হবে জাহান্নামী। অপর দিকে কোন লোকের আমল জাহান্নামীদের আমল বলে মানুষের কাছে মনে হবে, কিন্তু সে হবে জান্নাতী। প্রত্যেকের আমল তার সর্বশেষ অবস্থানের উপর নির্ভর করে।

     আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেনঃ

﴿وَالَّذِي قَدَّرَ فَهَدَىٰ﴾

যিনি তাকদীর গড়েছেন তারপর পথ দেখিয়েছেন। (সূরা আল আলাঃ ৩)

﴿الَّذِي أَعْطَىٰ كُلَّ شَيْءٍ خَلْقَهُ ثُمَّ هَدَىٰ﴾

যিনি প্রত্যেক জিনিসকে তার আকৃতি দান করেছেন তারপর তাকে পথ নির্দেশ দিয়েছেন(সূরা ত্বাহাঃ ৫০)

     সূরা রূমে ৩০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেনঃ

﴿فَأَقِمْ وَجْهَكَ لِلدِّينِ حَنِيفًا ۚ فِطْرَتَ اللَّهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا ۚ لَا تَبْدِيلَ لِخَلْقِ اللَّهِ ۚ ذَٰلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ وَلَٰكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ﴾

কাজেই ( হে নবী এবং নবীর অনুসারীবৃন্দ ) একনিষ্ঠ হয়ে নিজের চেহারা এ দীনের দিকে স্থির নিবদ্ধ করে দাও৷ আল্লাহ মানুষকে যে প্রকৃতির ওপর সৃষ্টি করেছেন তাঁর ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাও৷ আল্লাহ তৈরি সৃষ্টি কাঠামো পরিবর্তন করা যেতে পারে না৷ এটিই পুরোপুরি সঠিক ও যথার্থ দীন৷ কিন্তু অধিকাংশ লোক জানে না৷

     হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত হাদীস, যা বুখারী ও মুসলিমের উল্লেখ করা হয়েছে। যাতে জানা যায় যে প্রত্যেক মানব শিশু ফিতরাত তথা ইসলামের উপর জন্ম গ্রহণ করে।  كل مولود يولد على الفطرة، فأبواه يهودانه وينصرانه ويمجسانه প্রত্যেক শিশুই ইসলামী স্বভাবের উপর জন্ম গ্রহণ করে। কিন্তু তাদের পিতামাতা তাদেরকে ইহুদী, খৃষ্টান বা অগ্নিপূজক বানিয়ে থাকে।

     একই কথার প্রতিধ্বনি শোনা যায় হাদীসে কুদসীতে।

عن عياض بن حمار قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول الله تعالى إني خلقت عبادي حنفاء، فجاءتهم الشياطين، فاجتالتهم عن دينهم

হযরত ইয়াজ বিন হাম্মার রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেনঃ আল্লাহ বলেন, আমি আমার বান্দাকে তো সৎ স্বভাবের উপর সৃষ্টি করেছিলাম। তারপর তাদের কাছে আসলো শয়তান এবং তাদেরকে বিভ্রান্ত করে তাদের দ্বীন থেকে তাদেরকে সরিয়ে নিয়ে গেছে।

§ যেহেতু ফিরে যেতে হবে, সেহেতু পরবর্তী জীবনের ফিকির করা উচিত।  সূরা হাশর এর ১৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেঃ

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَلْتَنظُرْ نَفْسٌ مَّا قَدَّمَتْ لِغَدٍ ۖ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۚ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ﴾

হে ঈমানদাররা, আল্লাহকে ভয় করো৷ আর প্রত্যেককেই যেন লক্ষ রাখে, সে আগামীকালের জন্য কি প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে৷ আল্লাহকে ভয় করতে থাক৷ আল্লাহ নিশ্চিতভাবেই তোমাদের সেই সব কাজ সম্পর্কে অবহিত যা তোমরা করে থাক৷

 

﴿فَرِيقًا هَدَىٰ وَفَرِيقًا حَقَّ عَلَيْهِمُ الضَّلَالَةُ ۗ إِنَّهُمُ اتَّخَذُوا الشَّيَاطِينَ أَوْلِيَاءَ مِن دُونِ اللَّهِ وَيَحْسَبُونَ أَنَّهُم مُّهْتَدُونَ﴾

৩০) একটি দলকে তিনি সোজা পথ দেখিয়ে দিয়েছেন কিন্তু অন্য দলটির ওপর গোমরাহী সত্য হয়ে চেপেই বসেছে৷ কারণ তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে শয়তানদেরকে নিজেদের অভিভাবকে পরিণত করেছে এবং তারা মনে করছে, আমরা সঠিক পথেই আছি৷

﴿فَرِيقًا هَدَىٰ وَفَرِيقًا حَقَّ عَلَيْهِمُ الضَّلَالَةُ ۗ إِنَّهُمُ اتَّخَذُوا الشَّيَاطِينَ أَوْلِيَاءَ مِن دُونِ اللَّهِ وَيَحْسَبُونَ أَنَّهُم مُّهْتَدُونَ﴾ একটি দলকে তিনি সোজা পথ দেখিয়ে দিয়েছেন কিন্তু অন্য দলটির ওপর গোমরাহী সত্য হয়ে চেপেই বসেছে৷ কারণ তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে শয়তানদেরকে নিজেদের অভিভাবকে পরিণত করেছে এবং তারা মনে করছে, আমরা সঠিক পথেই আছি৷ 

 

§ এরা হচ্ছে সেই সব লোক, যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে শয়তানকে বন্ধু ও সংগী করে নিয়েছে।  তাদের অবস্থা হলো এমন যে, তারা গোমরাহীতে থাকার পরও তারা মনে করে যে আমরা সঠিক পথে আছি, সঠিক কাজ করছি, সঠিক পথে চলছি। সূরা কাহফের ১০৪ নম্বর আয়াতে এই কথার প্রতিধ্বনি হয়েছে এই ভাবেঃ

﴿الَّذِينَ ضَلَّ سَعْيُهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ يَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ يُحْسِنُونَ صُنْعًا﴾

তারাই, যাদের দুনিয়ার জীবনের সমস্ত প্রচেষ্টা ও সংগ্রাম সবসময় সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত থাকতো এবং যারা মনে করতো যে, তারা সবকিছু সঠিক করে যাচ্ছে৷ 

§ ইবনে আব্বাসের মতে, যাদেরকে আল্লাহ হেদায়াত দান করেন, তারা হলো আহলে ইয়ামীন বা ডানপন্থী। অপর দিকে যাদেরকে গোমরাহীতে রাখেন, তারা হলো আহলে শীমাল বা বামপন্থী

 

﴿يَا بَنِي آدَمَ خُذُوا زِينَتَكُمْ عِندَ كُلِّ مَسْجِدٍ وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا ۚ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ﴾

৩১) হে বনী আদম! প্রত্যেক ইবাদাতের সময় তোমরা নিজ নিজ সুন্দর সাজে সজ্জিত হও৷ আর খাও ও পান করো কিন্তু সীমা অতিক্রম করে যেয়ো না, আল্লাহ সীমা অতিক্রমকারীদেরকে পছন্দ করেন না৷ 

﴿يَا بَنِي آدَمَ خُذُوا زِينَتَكُمْ عِندَ كُلِّ مَسْجِدٍ﴾ হে বনী আদম! প্রত্যেক ইবাদাতের সময় তোমরা নিজ নিজ সুন্দর সাজে সজ্জিত হও 

 

§ خُذُوا زِينَتَكُمْ মানে তোমরা তোমরা সাজ গ্রহণ করো। তাফহীমুল কুরআনে বলা হয়েছেঃ তোমরা নিজ নিজ সুন্দর সাজে সজ্জিত হও।

§ সুন্দর সাজ বলতে পরিপূর্ণ পোষাক পরিচ্ছেদ।

§ ইবাদতের জন্য বিশেষ করে সিজদা করতে দাড়ালে কেবলমাত্র লজ্জাস্থান ঢেকে রাখার মতো পোষাক নয়। বরং সামর্থ অনুযায়ী পরিপূর্ণ পোষাক গ্রহণ করতে হবে। যাঃ

     লজ্জাস্থান আবৃত হবে।

     সৌন্দর্যের প্রকাশ ঘটবে।

     নিজেদের এমন সাজে সজ্জিত করবে, এমন আকৃতি ধারণ করবে, যাতে উলংগপনা তো দূরের বিষয়অশ্লীতার লেশমাত্র পাওয়া যাবে না।

§ এই বক্তব্যের মাধ্যমে মূর্খ বা অজ্ঞ লোকেরা তাদের ভূলনীতির মাধ্যমে ইবাদতে যে সব কাজ করতো, তার প্রতিবাদ করা হচ্ছে। মূর্খরা মনে করতোঃ

     ইবাদত করা উচিতউলংগ বা অর্ধ উলংগ হয়ে।

     ইবাদত করা উচিতনিজেদের আকার, আকৃতি ও বেশভূষা বিকৃত করে।

§ এই আয়াতের মাধ্যমে মুলতঃ মুশরিকদের আমলের প্রতিবাদ করা হচ্ছে, যারা উলংগ হয়ে বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করতো এবং এই কাজকে তারা শরয়ী বিধান বলে মনে করতো।

     হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ كانوا يطوفون بالبيت عراة، الرجال والنساء، الرجال بالنهار، والنساء بالليل، وكانت المرأة تقول সেই সময়ে পুরুষ ও নারীরা কাবাঘরকে উলংগ অবস্থায় তাওয়াফ করতো।  দিনের বেলা পুরুষেরা আর রাতের বেলা মহিলারা।  মহিলারা বলতোঃ اليومَ يبدو بعضُه أو كلُّه وما بدا منه فلا أُحِلُّه আজ খুলে যাচ্ছে কিছু অংশ অথবা পূর্ণ অংশ এবং যে অংশটা এর থেকে খুলে যায়, তাকে আমি হালাল করছি না।

§ আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা এই আয়াতের মাধ্যমে জানিয়ে দিলেন যে, তোমরা প্রত্যেক নামাযের সময়ে শরীরকে উলংগ অবস্থা থেকে রক্ষা করো এবং তোমাদের লজ্জাস্থানকে আবৃত করে ফেল আর সুন্দর সাজে সজ্জিত কর।

§ এই আয়াতের মাধ্যমে বাইতুল্লাহর তাওয়াফের ইবাদতও শামীল রয়েছে।

§ প্রখ্যাত মুফাস্সির কাতাদাহ এর সম্পর্কে বলেনঃ عن أنس مرفوعاً أنها نزلت في الصلاة في النعال، ولكن في صحته نظر হযরত আনাস রা. থেকে একটি মারফু হাতীদ পাওয়া যায়, যাতে বলা হয়েছেঃ এই আয়াত নামাযের সময় জুতা পরিধান সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। কিন্তু এই হাদীসের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে প্রশ্ন রয়েছে।

§ নামাযের সময় সুন্দর সাজে সজ্জিত হওয়া মানে সুন্দর পোষাক পরিধান করার সাথে বিশেষ করে জুমুয়া ও ঈদের দিনে সুগন্ধি ব্যবহার, মেসওয়াক করা ইত্যাদি অন্তর্ভূক্ত।

§ উত্তম পোষাক কিঃ ইবনে আব্বাস রা. বর্ণিত মারফু হাদীসে জানা যায়, তিনি বলেন রাসূল সা. বলেছেনঃ

البسوا من ثيابكم البياض فإنها من خير ثيابكم، وكفنوا فيها موتاكم، وإن خير أكحالكم الإثمد، فإنه يجلو البصر، وينبت الشعر

তোমরা সাদা পোষাক পরিধান কর, কেননা এটা হচ্ছে সবোত্তম পোষাক।  তোমাদের মৃতদেরকেও এই পোষাকে দাফন করানো হয়।  তোমরা চোঁখে সুরমা ব্যবহার কর, কেননা, এটা দৃষ্টিশক্তিকে তীক্ষ্ন করে এবং ভ্রু গজায়।

﴿وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا﴾ আর খাও ও পান করো কিন্তু সীমা অতিক্রম করে যেয়ো না

§ এই আয়াতের মূল কথা হচ্ছেঃ

. বান্দার দৈন্যদশা, আনাহারে কষ্ট করা জীবন, হালাল জীবিকা থেকে মাহরুম থাকা আল্লাহর কাছে প্রিয় জিনিস নয়।

. আল্লাহর বান্দা আল্লাহর গোলামী করার কারণে উপরোক্ত অবস্থার শিকার হওয়া আল্লাহ চান না।

. ভাল পোষাক পরা, পবিত্র খাবার খাওয়া, হালাল খাবার খাওয়ার মাধ্যমে আল্লাহ খুশী হোন।

. হালালকে হারাম অথবা হারামকে হালাল করলে আল্লাহর সীমা অতিক্রম করা হয়। আর শরীয়তে এটা আসল গোনাহ হিসাবে চিহ্নিত হয়।

§ ইবনে আব্বাস রা. এরই আয়াতের মর্ম সম্পর্কে বলেনঃ

كل ما شئت، والبس ما شئت، ما أخطأتك خصلتان سرف ومخيلة

তোমরা যা ইচ্ছা খাও এবং যা ইচ্ছা পান করতোমাদের উপর কোনই দোষারোপ করা হবে না।  তবে দুটি জিনিস নিন্দনীয় বটে। একটি হচ্ছে অপব্যয় ও অমিতাচার এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে দর্প ও অহংকার।

§ মুজাহিদ বলেনঃ كُلُواْ وَٱشْرَبُواْ ﴿ মানে أمرهم أن يأكلوا ويشربوا مما رزقهم الله আল্লাহ তোমাদের যে রিযিক দিয়েছেন, তা তোমরা খাবে এবং পান করবেএটাই আল্লাহর নির্দেশ।

§ আব্দুর রহমান বিন জায়েদ বিন আসলাম এর মতেঃ وَلاَ تُسْرِفُوۤاْ ﴿ মানে ولا تأكلوا حراماً، ذلك الإسراف তোমরা খাও। কিন্তু হারাম খেয়ো না আর এটাই অপব্যয়।

§ যারা উলংগ হয়ে কাবা তাওয়াফ করতো, তারা হজ্জের মৌসুমে নিজেদের জন্য চর্বি হারাম করে নিতো।  কেউবা ছাগলের দুধ খাওয়া, আবার কেউ কেউ গোশত খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিল। আল্লাহ বলে দিলেন, চর্বি হারাম নয়।  দুধ বা গোশত হরাম নয়।  তোমরা খাও পান করো, এ ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না।

§ ইবনে আব্বাসের মতে, তোমরা প্রয়োজন মতো খাও এবং পান করো, কিন্তু অতিরিক্ত খেয়োনা এবং পান করো নাএটাই ইসরাফ।

§ কারো কারো মতেঃ হারামকে হালাল করা, নির্লজ্জ ভাবে খাবারের পিছনে ছুট, ক্ষুধা না থাকার পরও খাবারের জন্য বসা, অসময়ে খাওয়া, খাওয়ার চাহিদা নাইতবুও খাবারের জন্য বসা, দৈহিক কর্মদক্ষতা ও সুস্থতার জন্য যথেষ্ঠ নয়এমন কম খাবার খাওয়া, স্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর জিনিস খাওয়া এসবই ইসরাফের অন্তর্ভূক্ত।

§ কুরআনে হাকীমে সূরা বনি ইসরাঈলে ২৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেঃ

﴿إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ ۖ وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِرَبِّهِ كَفُورًا﴾

বাজে খরচ করো না৷ যারা বাজে খরচ করে তারা শয়তানের ভাই আর শয়তান তার রবের প্রতি অকৃতজ্ঞ৷ 

§ খরচ কিভাবে করবে, তা বলা হয়েছে একই সূরার ২৯ নম্বর আয়াতেঃ

﴿وَلَا تَجْعَلْ يَدَكَ مَغْلُولَةً إِلَىٰ عُنُقِكَ وَلَا تَبْسُطْهَا كُلَّ الْبَسْطِ فَتَقْعُدَ مَلُومًا مَّحْسُورًا﴾

নিজের হাত গলায় বেঁধে রেখো না এবং তাকে একেবারে খোলাও ছেড়ে দিয়ো না, তাহলে তুমি নিন্দিত ও অক্ষম হয়ে যাবে৷

§ আর এই গুণটা মুমিনের অন্যতম গুণ। তাই মুমিনদের বিস্তারিত পরিচয় দিতে গিয়ে সূরা আল ফুরক্বানএর ৬৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেঃ

﴿وَالَّذِينَ إِذَا أَنفَقُوا لَمْ يُسْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذَٰلِكَ قَوَامًا﴾

তারা যখন ব্যয় করে তখন অযথা ব্যয় করে না এবং কার্পণ্যও করেনা বরং উভয় প্রান্তিকের মাঝামাঝি তাদের ব্যয় ভারসাম্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে৷

§ মুফতি মুহাম্মদ শফী উপরোক্ত আয়াত থেকে ৮টি মাসআলা পেশ করেছেনঃ

. যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকু পানাহার করা ফরয।

. শরীয়াতের দলীলের মাধ্যমে যতক্ষণ পর্যন্ত কোন বস্তু হারাম প্রমাণিত হয়নি, ততক্ষণ পর্যন্ত সকল বস্তু হালাল।

. আল্লাহ ও রাসূলের নিষিদ্ধ করা বস্তুর ব্যবহার অপব্যয় ও অবৈধ।

. আল্লাহ যা হালাল করেছেন সে গুলো হারাম মনে করা অপব্যয় ও মহাপাপ।

. পেট ভরে খাওয়ার পর আহার করা নাজাযেজ।

. যতটুকু না খেলে শরীর দূর্বল হবে এবং ফরয কাজ সম্পাদন করা কঠিন হবে, এরচেয়ে কম খাওয়া অবৈধ।

. সব সময় খাওয়ার চিন্তায় মগ্ন থাকা অপব্যয়।

. মনে কিছু চাইলেই তা খাওয়া অপব্যয়।

§ চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে পানাহারে সমতা সকল রোগ থেকে মুক্ত থাকার উত্তম ব্যবস্থা।

§ খলিফা হারুনুর রশীদের খৃষ্টান চিকিৎসক হযরত আলী বিন হুসাইন কে বললঃ

দুনিয়াতে দূটি শাস্ত্র হলো প্রকৃত শাস্ত্র। ১. ধর্মীয় শাস্ত্র। ২. দেহ শাস্ত্র বা চিকিৎসাশাস্ত্র। তোমাদের কুরআনে চিকিৎসা শাস্ত্রের কোন বিষয় নাই। উত্তরে হযরত আলী বিন হুসাঈন বললেনঃ আল্লাহ তায়ালা গোটা চিকিৎসা শাস্ত্রকে কুরআনের ১টি আয়াতের অর্ধেক অংশে ভরে দিয়েছেন। আর সে আয়াতাংশ হলোঃ ﴿وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا﴾

এর পর উক্ত চিকিৎসক বললোঃ তোমাদের রাসূলের বাণীর মাঝে চিকিৎসা বিষয়ে কিছু আছে? তিনি বললেনঃ রাসূল সা. কয়েকটি বাক্যের মাধ্যমে পুরো চিকিৎসা শাস্ত্র বর্ণনা করেছেন তিনি বলেছেনঃ

        পাকস্থলী রোগের আকর

        ক্ষতিকর বস্তু থেকে বিরত থাকার চিকিৎসার মূল

        দেহকে সে সব বস্তু দাও, যাতে সে অভ্যস্ত

খৃষ্টান চিকিৎসক তখন বললোঃ তোমাদের কুরআন এবং তোমাদের রাসূল চিকিৎসা শাস্ত্রের কোন সূত্র আর বাকি রাখেননি

§ হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেনঃ পাকস্থলী হলো দেহের চৌবাচ্চা। দেহের সমস্ত শিরাউপশিরা এ চৌবাচ্চা থেকে সিক্ত হয়। পাকস্থলী সুস্থ হলে সমস্ত শিরাউপশিরা রোগব্যাধি নিয়ে সমস্ত দেহে ছড়িয়ে পড়বে।

হাদীসটির বিশুদ্ধতা নিয়ে বাদপ্রতিবাদ আছে। কিন্তু কম খাওয়া, খাওয়ার ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন নিয়ে অসংখ্য হাদীসে জোর দেয়া হয়েছে।

﴿إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ﴾ আল্লাহ সীমা অতিক্রমকারীদেরকে পছন্দ করেন না

§ ٱلْمُسْرِفِينَ মানে المتعدين বা সীমালংঘনকারী।

 

§ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সকল কাজে সীমা নির্ধারণ কর দিয়েছেন। হালালের যেমন সীমা আছে, হারামেরও সীমা আছে। এই সীমা আল্লাহ নির্ধারিত। এখানে হাত দেয়ার ক্ষমতা কারো নাই। আল্লাহ সেই সীমা লংঘনের ব্যাপারে সতর্ক করছেন।

download, button, internet
লেখাটি আপনার ভাল লাগলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.