আলোচনাঃ রোযা ও তাকওয়া

আলোচনাঃ রোযা তাকওয়া

 

রোযা

রোযা বিষয়ে আল্লাহর নির্দেশঃ

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ﴾

হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোযা ফরয করে দেয়া হয়েছে যেমন তোমাদের পূর্ববর্তী নবীদের অনুসারীদের ওপর ফরয করা হয়েছিল৷ এ থেকে আশা করা যায়, তোমাদের মধ্যে তাকওয়ার গুণাবলী সৃষ্টি হয়ে যাবে ৷ (আল বাকারাঃ ১৮৩)

এই আয়াত থেকে আমরা জানলামঃ ৩টি বিষয়

১. রোযা ফরয।

২. রোযা পূর্ববর্তীদের উপরও ফরয ছিল।

৩. রোযার উদ্দেশ্য মানুষকে মুত্তাকী করা।

 

হাদীসে রোযার বিবরণঃ

عن أبي هريرة رضي الله عنه أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال، قال الله عز وجل: كل عمل ابن آدم له إلا الصيام، فإنه لي وأنا أجزي به، والصيام جنّة، وإذا كان يوم صوم أحدكم فلا يرفث، ولا يصخب، فإن سابّه أحد أو قاتله فليقل: إني امرؤ صائم، والذي نفس محمد بيده لخلوف فم الصائم أطيب عند الله من ريح المسك، للصائم فرحتان يفرحهما: إذا أفطر فرح، وإذا لقي ربه فرح بصومه.

আল্লাহ বলেনঃ বনি আদমের প্রতিটি আমল তার জন্য, কেবল রোযা ছাড়া। কেননা, রোযা রাখা হয় আমার জন্য এবং এর প্রতিদানও আমি প্রদান করবো। রোযা হলো ঢাল স্বরূপ।

عن أبي هريرة رضـ قال: قال رسول الله (صـ) : كل عمل ابن آدم يضاعف الحسنة بعشرة أمثالها إلى سبع مائة ضعف، قال الله تعالى: إلا الصوم، فإنه لي وأنا أجزئ به،  يدع شهوته وطعامه من أجلي.

আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেছেন, ‘আদম সন্তানের প্রতিটি নেক আমল দশগুণ থেকে সাতশত গুণ পর্যন্ত বাড়ানো হয়ে থাকে। আল্লাহ বলেন, কিন্তু সাওম এর ব্যতিক্রম। কেননা সিয়াম একমাত্র আমার জন্য রাখা হয়। আর আমিই তার পুরস্কার প্রদান করবো (আমার যত ইচ্ছা) বান্দা নিজের প্রবৃত্তির দাবীকে অগ্রাহ্য এবং পানাহার পরিহার করে আমার জন্য।’ (বুখারী-মুসলিম)

الصيام والقرآن يشفعان للعبد يقول الصيام إني منعته الطعام والشهوات بالنهار فشفعني فيه ويقول القرآن منعته النوم بالليل فشفعني فيه فيشفهان.

সিয়াম ও কুরআন বান্দার জন্য ক্বিয়ামাতের দিন সুপারিশ করবে।  সিয়াম বলবে, হে রব! আমি তাকে দিনের বেলায় খানা-পিনা ও প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণ থেকে বিরত রেখেছি।  কাজেই তার বিষয়ে তুমি আমার সুপারিশ কবুল করো।  কুরআন বলবে, হে পারওয়ারদিগার! তাকে আমি রাত্রিবেলায় নিদ্রা থেকে বিরত রেখেছি, কাজেই তুমি আমার সুপারিশ কবুল কর।  এমতাবস্থায় আল্লাহ পাক উভয়ের সুপারিশ কবুল করবেন।

 

রোযা আমাদের উপর ফরযঃ

       ﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ﴾ হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোযা ফরয করে দেয়া হয়েছে৷

       হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছেঃ

عن أبي عبد الرحمن عبد الله بن عمر بن الخطاب رضي الله عنهما قال : سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول: بني الإسلام على خمس: شهادة أن لا إله إلا الله، وأن محمدا رسول الله، وإقام الصلاة، وإيتاء الزكاة، وحج البيت، وصوم رمضان.

রাসূল সা. বলেছেনঃ ইসলামের ভিত ৫টি জিনিসের উপর।  ১. সাক্ষ্য প্রদান করাআল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নাই এবং মুহাম্মদ সা. আল্লাহর রাসূল. নামায কায়েম করা। ৩. যাকাত আদায় করা। ৪. বাইতুল্লাহর হজ্জ করা এবং ৫. রামাদ্বানে রোযা রাখা। (বুখারী ও মুসলিম)

 

পূর্ববর্তীদের উপর রোযাঃ

       ﴿ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ﴾ যেমন তোমাদের পূর্ববর্তী নবীদের অনুসারীদের ওপর ফরয করা হয়েছিল৷

       এই আয়াত থেকে প্রমাণিত হয়, আল্লাহর পক্ষ থেকে যত শরীয়াত দুনিয়ায় নাযিল হয়েছে, তার প্রত্যেকটিতে রোযার বিধান ছিল।

       হযরত আদম আ. থেকে নূহ আ. পর্যন্ত প্রতি চাঁদের ১৩,১৪,১৫ তারিখ রোযা রাখার বিধান ছিল। যার নাম ছিল أيام البيض

       ইহুদীরা প্রতি সপ্তাহের শনিবার এবং বছরে ১০ মহররম রোযা রাখতো।

       হযরত মুসা আ. তুর পাহাড়ে অবস্থানের ৪০দিন রোযা পালনের নির্দেশ ছিল।

       খৃষ্টানরা ৫০দিন রোযা পালনের রেওয়াজ ছিল।

 

আমাদের নবীর সময়ে রোযাঃ

শুরুতে রাসূল সা. এর প্রতি মাসে ৩দিন রোযা রাখার বিধান ছিল, যা ফরয ছিলনা।

দ্বিতীয় হিজরীতে রোযার বিধান ফরয হয়।

রোযা রাখার প্রথম নাযিল হওয়া বিধানে রোযার কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা সম্পন্নদের রোযা না রাখলে মিসকিন খাওয়ানোর বিধান রাখা হয়।

রোযা রাখার দ্বিতীয় নাযিল হওয়া বিধানে রোযা না রেখে মিসকীন খাওয়ানোর সুযোগ বাতিল করা হয়।

ঐ বিধানে কেবলমাত্র নিম্ন শ্রেণীভূক্তদেরকে রোযা না রেখে মিসকিন খাওয়ানো বা পরে রোযা রাখার সুযোগ দেয়া হয়।  তারা হলেনঃ

১. রোগী।

২.         মুসাফির।

৩. গর্ভবতী মহিলা।

৪.         দুগ্ধপোষ্য শিশুর মাতা।

৫. বৃদ্ধযার রোযা রাখার কোন শক্তি নাই।

মুসাফিরের রোযাঃ

মুসাফিরের জন্য রোযা রাখা বা না রাখা ব্যক্তির ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে।

সফর করে ক্লান্ত হয়ে পড়লে রোযা না রাখাই ভাল।

মনে রাখতে হবে আপনার উপর আপনার শরীরের হক রয়েছে।

রাসূল সা. কোন সফরে রোযা রেখেছেন এবং কোন সফরে আবার রোযা রাখেননি।

সাহাবীরা রাসূল সা. এর সাথে সফরে গেলে কেউ রোযা রাখতেন, কেউ রাখতেন না।

এক সফরে এক ব্যক্তির বেহুশ হওয়া। রাসূল সা. কারণ জিজ্ঞেস করলে জানানো হয় যে, সে রোযা রেখেছে। রাসূল সা. বললেন যেঃ এটা সৎকাজ নয়।

যুদ্ধের সময় রাসূল সা. রোযা না রাখার নির্দেশ দিতেন।

হযরত উমর রা. বলেনঃ রাসূল সা. এর সাথে আমি দূ’বার রামাদ্বান মাসে যুদ্ধে যাই। প্রথমবার বদরে এবং দ্বিতীয়বার মক্কা বিজয়ে। এই দুইবার আমরা রোযা রাখিনি।

আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. বর্ণনা করেছেন যে, মক্কা বিজয়ের সময় নবী সা, বলেছিলেনঃ

·         إنه يوم قتال فافطروا  এটা কাফেরদের সাথে লাড়াইয়ের দিন। কাজেই রোযা রাখোনা।

·         إنكم قد دنوتم عدوكم فافطروا أقوى لكمশত্রুর সাথে মোকাবেলা করতে হচ্ছে। কাজেই রোযা রেখোনা। এর ফলে তোমরা যুদ্ধ করার শক্তি অর্জন করতে পারবে।

যে দিন সফরে বের হচ্ছেন, সেদিন বাসাতে থেকে খেয়েও বের হতে পারেন আবার বাসা থেকে বের হয়েও খেতে পারেন। সাহাবীদের মাঝে ২টার আমল পাওয়া যায়।

 

রোযার উদ্দেশ্য হলো তাকওয়াঃ

       ﴿لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ﴾ তোমাদের মধ্যে তাকওয়ার গুণাবলী সৃষ্টি হয়ে যাবে ৷

 

তাকওয়া বিষয়টা কি?

 

তাকওয়া কি ?

   তাকওয়া (تقوى) আরবি শব্দ । (وقاية) হতে এর উৎপত্তি ।

   আভিধানিক অর্থঃ ভয় করা, বিরত থাকা, রক্ষা করা, সাবধান হওয়া, আত্মশুদ্ধি, পরহেযগারী

 

তাকওয়ার সংজ্ঞাঃ

   নিজেকে যে কোনো বিপদ থেকে সম্ভাব্য সকল উপায়ে বাঁচিয়ে রাখা বা কোনো অনিষ্ট হতে নিজেকে দূরে রাখা ইত্যাদি ।

   সাধারণ অর্থে আল্লাহ ভীতিকে তাকওয়া বলা হয় । 

   ফারসী ভাষায়  তাকওয়ার প্রতিশব্দ হচ্ছে পরহেযগারী ।

   ইসলামী পরিভাষায় ব্যক্তি ও সমষ্টিগত জীবনে ইসলামী বিধানে সকল প্রকার খারাপ কাজ ও চিন্তা পরিহার করে, কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশ মতো জীবন যাপনের মাধ্যমে আল্লাহকে প্রতিনিয়ত প্রেমমাখা ভয় করে চলাকে তাকওয়া বলে ।

 

তাত্ত্বিক অর্থে তাকওয়া বলা হয়ঃ

   আল্লাহ-ভীতি জনিত মানুষের মনের সে অনুভূতিকে যা তার জীবনের সকল ক্ষেত্রে স্বতঃস্ফুর্তভাবে আত্মপ্রকাশ করে ।

   কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ বলেন, যে সকল ভাব, প্রবৃত্তি, কাজ পরজগতে ক্ষতিকর এবং যে সমস্ত কার্যকলাপ দৃশ্যতঃ বৈধ বলে মনে হলেও পরিণতিতে মানুষের ধ্বংস ডেকে আনে, সে সকল ভাব, প্রবৃত্তি ও কার্যকলাপ হতে নিজেকে রক্ষা করার জন্যে যথাসাধ্য চেষ্টা করাকে তাকওয়া বলে । তাকোয়ার গুনে গুণান্বিত ব্যক্তিকে “মুত্তাকি” বলে যার বহুবচন মুত্তাকীন

 

তাকওয়া সম্পর্কে কুরআনে হাকীমের বক্তব্যঃ

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَلْتَنظُرْ نَفْسٌ مَّا قَدَّمَتْ لِغَدٍ ۖ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۚ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ﴾

হে ঈমানদাররা, আল্লাহকে ভয় করো৷ আর প্রত্যেককেই যেন লক্ষ রাখে, সে আগামীকালের জন্য কি প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে৷ আল্লাহকে ভয় করতে থাক৷ আল্লাহ নিশ্চিতভাবেই তোমাদের সেই সব কাজ সম্পর্কে অবহিত যা তোমরা করে থাক। (সূরা হাশরঃ ১৮)

﴿يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَىٰ وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا ۚ إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ﴾

হে মানব জাতি, আমি তোমাদেরকে একজন পুরুষ এবং একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি৷ তারপর তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীতে বিভক্ত করে দিয়েছি যাতে তোমরা পরস্পরকে চিনতে পার৷ তোমাদের মধ্যে যে অধিক পরহেজগার সে-ই প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর কাছে অধিক মর্যাদার অধিকারী৷ নিশ্চয়ই আল্লাহ মহাজ্ঞানী ও সবকিছু সম্পর্কে অবহিত। (সূরা হুজুরাতঃ ১৩) 

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ﴾

হে ঈমানদারগণ! তোমরা যথাযথভাবে আল্লাহকে ভয় করো৷ মুসলিম থাকা অবস্থায় ছাড়া যেন তোমাদের মৃত্যু না হয়। (সূরা আলে ইমরানঃ ১০২)

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ﴾

হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সহযোগি হও(সূরা আত তাওবাঃ ১১৯)

 

﴿وَمِنَ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالْأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَٰلِكَ ۗ إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ ۗ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ﴾

আর এভাবে মানুষ, জীব-জনোয়ার ও গৃহপালিত জন্তুও বিভিন্ন বর্ণের রয়েছে৷ আসল ব্যাপার হচ্ছে, আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে একমাত্র জ্ঞান সম্পন্নরাই তাকে ভয় করে৷ নিসন্দেহে আল্লাহ পরাক্রমশালী এবং ক্ষমাশীল৷ (সূরা ফাতিরঃ ২৮)                

﴿إِنَّ اللَّهَ مَعَ الَّذِينَ اتَّقَوا وَّالَّذِينَ هُم مُّحْسِنُونَ﴾

আল্লাহ তাদের সাথে আছেন যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মপরায়ণ৷ (সূরা নাহলঃ ১২৮)                 

﴿وَمَن يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَخْشَ اللَّهَ وَيَتَّقْهِ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْفَائِزُونَ﴾

আর সফলকাম তারাই যারা আল্লাহ ও রসূলের হুকুম মেনে চলে এবং আল্লাহকে ভয় করে এবং তাঁর নাফরমানী করা থেকে দূরে থাকে৷ (সূরা নূরঃ ৫২)

﴿مَّا أَفَاءَ اللَّهُ عَلَىٰ رَسُولِهِ مِنْ أَهْلِ الْقُرَىٰ فَلِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ وَلِذِي الْقُرْبَىٰ وَالْيَتَامَىٰ وَالْمَسَاكِينِ وَابْنِ السَّبِيلِ كَيْ لَا يَكُونَ دُولَةً بَيْنَ الْأَغْنِيَاءِ مِنكُمْ ۚ وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۖ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ﴾

এসব জনপদের দখলমুক্ত করে যে জিনিসই আল্লাহ তাঁর রসূলকে ফিরিয়ে দেন তা আল্লাহ, রসূল, আত্মীয়স্বজন, ইয়াতীম, মিসকীন এবং মুসাফিরদের জন্য৷ যাতে তা তোমাদের সম্পদশালীদের মধ্যেই কেবল আবর্তিত হতে না থাকে৷ রসূল যা কিছু তোমাদের দেন তা গ্রহণ করো এবং যে জিনিস থেকে তিনি তোমাদের বিরত রাখেন তা থেকে বিরত থাকো৷ আল্লাহকে ভয় করো৷ আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা৷ (সূরা হাশরঃ ৭)

﴿إِنَّ الَّذِينَ يَخْشَوْنَ رَبَّهُم بِالْغَيْبِ لَهُم مَّغْفِرَةٌ وَأَجْرٌ كَبِيرٌ﴾

যারা না দেখেও তাদের রবকে ভয় করে, নিশ্চয়ই তারা লাভ করবে ক্ষমা এবং বিরাট পুরষ্কার৷ (সূরা মুলকঃ ১২)

﴿بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ اتَّقِ اللَّهَ وَلَا تُطِعِ الْكَافِرِينَ وَالْمُنَافِقِينَ ۗ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا حَكِيمًا﴾

হে নবী! আল্লাহকে ভয় করো এবং কাফের ও মুনাফিকদের আনুগত্য করো না৷ প্রকৃতপক্ষে আল্লাহই সর্বজ্ঞ ও মহাজ্ঞানী৷ (সূরা আহযাবঃ ১)

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَرَابِطُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ﴾

হে ঈমানদানগণ! সবরের পথ অবলম্বন করো, বাতিলপন্থীদের মোকাবলায় দৃঢ়তা দেখাও, হকের খেদমত করার জন্য উঠে পড়ে লাগো এবং আল্লাহকে ভয় করতে থাকো৷ আশা করা যায়, তোমরা সফলকাম হবে৷ (সূরা আলে ইমরানঃ ২০০)

﴿فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ وَاسْمَعُوا وَأَطِيعُوا وَأَنفِقُوا خَيْرًا لِّأَنفُسِكُمْ ۗ وَمَن يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ﴾

তাই যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় করে চলো৷ শোন, আনুগত্য করো এবং নিজেদের সম্পদ ব্যয় করো৷ এটা তোমাদের জন্যই ভাল৷ যে মনের সংকীর্ণা থেকে মুক্ত থাকলো সেই সফলতা লাভ করবে৷  (সূরা তাগাবুনঃ ১৬)          

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُحِلُّوا شَعَائِرَ اللَّهِ وَلَا الشَّهْرَ الْحَرَامَ وَلَا الْهَدْيَ وَلَا الْقَلَائِدَ وَلَا آمِّينَ الْبَيْتَ الْحَرَامَ يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِّن رَّبِّهِمْ وَرِضْوَانًا ۚ وَإِذَا حَلَلْتُمْ فَاصْطَادُوا ۚ وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ أَن صَدُّوكُمْ عَنِ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ أَن تَعْتَدُوا ۘ وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۖ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ﴾

হে ঈমানদারগণ ! আল্লাহর আনুগত্য ও ভক্তির নিদর্শনগুলোর অমর্যাদা করো না৷ হারাম মাসগুলোর কোনটিকে হালাল করে নিয়ো না৷ কুরবানীর পশুগুলোর ওপর হস্তক্ষেপ করো না৷ যেসব পশুর গলাল আল্লাহর জন্য উৎর্গীত হবার আলামত স্বরূপ পট্টি বাঁধা থাকে তাদের ওপরও হস্তক্ষেপ করো না৷ আর যারা নিজেদের রবের অনুগ্রহ ও তাঁর সন্তুষ্টির সন্ধানে সম্মানিত গৃহের (কাবা) দিকে যাচ্ছে তাদেরকেও উত্যক্ত করো না৷ হাঁ, ইহরামের অবস্থা শেষ হয়ে গেলে আবশ্যি তোমরা শিকার করতে পারো৷ আর দেখো, একটি দল তোমাদের জন্য মসজিদুল হারামের পথ বন্ধ করে দিয়েছে, এ জন্য তোমাদের ক্রোধ যেন তোমাদেরকে এতখানি উত্তেজিত না করে যে, তাদের বিরুদ্ধে তোমরা অবৈধ বাড়াবাড়ি করতে শুরু করো৷ নেকী ও আল্লাহভীতির সমস্ত কাজে সবার সাথে সহযোগীতা করো এবং গুনাহ ও সীমালংঘনের কাজে কাউকে সহযোগীতা করো না৷ আল্লাহকে ভয় করো৷ তাঁর শাস্তি বড়ই কঠোর৷  (সূরা মায়িদাঃ ২)

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَابْتَغُوا إِلَيْهِ الْوَسِيلَةَ وَجَاهِدُوا فِي سَبِيلِهِ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ﴾

হে ঈমানদারগণ ! আল্লাহকে ভয় করো, তাঁর দরবারে নৈকট্যলাভের উপায় অনুসন্ধান করো এবং তাঁর পথে প্রচেষ্টা ও সাধনা করো, সম্ভবত তোমরা সফলকাম হতে পারবে৷ (সূরা মায়িদাঃ ৩৫)

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا تَنَاجَيْتُمْ فَلَا تَتَنَاجَوْا بِالْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَمَعْصِيَتِ الرَّسُولِ وَتَنَاجَوْا بِالْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي إِلَيْهِ تُحْشَرُونَ﴾

হে ঈমানদারগণ! তোমরা যখণ পরস্পরে গোপন আলাপ-আলোচনায় লিপ্ত হও তখন পাপ, জুলুম ও রসূলের অবাধ্যতার কথা বলাবলি করো না, বরং সততা ও আল্লাহভীতির কথাবার্তা বল এবং যে আল্লাহর কাছে হাশরের দিন তোমাদের উপস্থিত হতে হবে, তাঁকে ভয় কর৷ (সূরা মুজাদালাহঃ ৯)

﴿وَإِنَّ هَٰذِهِ أُمَّتُكُمْ أُمَّةً وَاحِدَةً وَأَنَا رَبُّكُمْ فَاتَّقُونِ﴾

আর তোমাদের এ উম্মত হচ্ছে একই উম্মত এবং আমি তোমাদের রব, কাজেই আমাকেই তোমরা ভয় করো ৷ (সূরা মুমিনুনঃ ৫২)

﴿أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ قِيلَ لَهُمْ كُفُّوا أَيْدِيَكُمْ وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ فَلَمَّا كُتِبَ عَلَيْهِمُ الْقِتَالُ إِذَا فَرِيقٌ مِّنْهُمْ يَخْشَوْنَ النَّاسَ كَخَشْيَةِ اللَّهِ أَوْ أَشَدَّ خَشْيَةً ۚ وَقَالُوا رَبَّنَا لِمَ كَتَبْتَ عَلَيْنَا الْقِتَالَ لَوْلَا أَخَّرْتَنَا إِلَىٰ أَجَلٍ قَرِيبٍ ۗ قُلْ مَتَاعُ الدُّنْيَا قَلِيلٌ وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ لِّمَنِ اتَّقَىٰ وَلَا تُظْلَمُونَ فَتِيلًا﴾

তোমরা কি তাদেরকেও দেখেছো, যাদেরকে বলা হয়েছিল, তোমাদের হাত গুটিয়ে রাখো এবং নামায কায়েম করো ও যাকাত দাও ? এখন তাদেরকে যুদ্ধের হুকুম দেয়ায় তাদের একটি দলের অবস্থা এই দাঁড়িয়েছে যে, তারা মানুষকে এমন ভয় করেছে যেমন আল্লাহকে ভয় করা উচিত অথবা তার চেয়েও বেশী ৷ তারা বলছেঃ হে আমাদের রব ! আমাদের জন্য এই যুদ্ধের হুকুমনামা কেন লিখে দিলে ? আমাদের আরো কিছু সময় অবকাশ দিলে না কেন ? তাদেরকে বলোঃ দুনিয়ার জীবন ও সম্পদ অতি সামান্য এবং একজন আল্লাহর ভয়ে ভীত মানুষের জন্য আখেরাতই উত্তম ৷ আর তোমাদের ওপর এক চুল পরিমাণও জুলুম করা হবে না৷ (সূরা নিসাঃ ৭৭)

﴿وَاتَّقُوا يَوْمًا لَّا تَجْزِي نَفْسٌ عَن نَّفْسٍ شَيْئًا وَلَا يُقْبَلُ مِنْهَا عَدْلٌ وَلَا تَنفَعُهَا شَفَاعَةٌ وَلَا هُمْ يُنصَرُونَ﴾

আর সেই দিনকে ভয় করো, যেদিন কেউ কারো কোন কাজে আসবে না , কারোর থেকে ফিদিয়া (বিনিময়)গ্রহণ করা হবে না, কোন সুপারিশ মানুষের জন্য লাভজনক হবে না এবং অপরাধীরা কোথাও কোন সাহায্য পাবে না ৷ (সূরা বাকারাঃ ১২৩)

﴿يَسْأَلُونَكَ عَنِ الْأَهِلَّةِ ۖ قُلْ هِيَ مَوَاقِيتُ لِلنَّاسِ وَالْحَجِّ ۗ وَلَيْسَ الْبِرُّ بِأَن تَأْتُوا الْبُيُوتَ مِن ظُهُورِهَا وَلَٰكِنَّ الْبِرَّ مَنِ اتَّقَىٰ ۗ وَأْتُوا الْبُيُوتَ مِنْ أَبْوَابِهَا ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ﴾

লোকেরা তোমাকে চাঁদ ছোট বড়ো হওয়ার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করছে ৷ বলে দাওঃ এটা হচ্ছে লোকদের জন্য তারিখ নির্ণয় ও হজ্জের আলামত তাদেরকে আরো বলে দাওঃ তোমাদের পেছন দিক দিয়ে গৃহে প্রবেশ করার মধ্যে কোন নেকী নেই ৷ আসলে নেকী রয়েছে আল্লাহর অসন্তুষ্টি থেকে বাঁচার মধ্যেই , কাজেই তোমরা দরজা পথেই নিজেদের গৃহে প্রবেশ করো ৷ তবে আল্লাহকে ভয় করতে থাকো , হয়তো তোমরা সাফল্য লাভে সক্ষম হবে ৷ (সূরা বাকারাঃ ১৮৯)

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَآمِنُوا بِرَسُولِهِ يُؤْتِكُمْ كِفْلَيْنِ مِن رَّحْمَتِهِ وَيَجْعَل لَّكُمْ نُورًا تَمْشُونَ بِهِ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ۚ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ﴾

হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁর রসুল (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর ওপর ঈমান আনো৷ তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে দ্বিগুণ রহমত দান করবেন, তোমাদেরকে সেই জ্যোতি দান করবেন যার সাহায্যে তোমরা পথ চলবে এবং তোমাদের ত্রুটি -বিচ্যুতি মাফ করে দেবেন৷  আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও দয়ালু৷  (সূরা হাদীদঃ ২৮)                

﴿بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُقَدِّمُوا بَيْنَ يَدَيِ اللَّهِ وَرَسُولِهِ ۖ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۚ إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ﴾

হে মু’মিনগণ! আল্লাহ ও তাঁর রসূলের চেয়ে অগ্রগামী হয়ো না৷ আল্লাহকে ভয় করো৷ আল্লাহ সবকিছু শোনেন ও জানেন৷ (সূরা হুজুরাতঃ ১)

﴿بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ ۚ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا﴾

হে মানব জতি ! তোমাদের রবকে ভয় করো৷ তিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন একটি প্রাণ থেকে ৷ আর সেই একই প্রাণ থেকে সৃষ্টি করেছেন তার জোড়া ৷ তারপর তাদের দুজনার থেকে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে দিয়েছেন বহু পুরুষ ও নারী ৷ সেই আল্লাহকে ভয় করো যার দোহাই দিয়ে তোমরা পরস্পরের কাছ থেকে নিজেদের হক আদায় করে থাকো এবং আত্মীয়তা ও নিকট সম্পর্ক বিনষ্ট করা থেকে বিরত থাকো৷ নিশ্চিতভাবে জেনে রাখো, আল্লাহ তোমাদের ওপর কড়া নজর রেখেছেন৷ (সূরা নিসাঃ ১)

 

তাকওয়া সম্পর্কে হাদীসে রাসূলে যে বক্তব্য পাওয়া যায়ঃ

عن عطية بن عروة السعدي -رضي الله عنه- قالَ: قال رسولُ اللهِ -صلى الله عليه وسلم-: “لا يَبْلُغُ العبدُ أنْ يكونَ من المتقينَ حتى يَدَعَ ما لا بَأسَ بِهِ، حَذَرًا مِمَّا به بَأسٌ“.

আতিয়া আস সাদী রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূল সা. বলেছেনঃ কোন ব্যক্তি পাপ কাজে জড়িয়ে পড়ার আশংকা যে সব কাজে গুনাহ নাই তা পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত আল্লাহভীরু লোকদের অন্তর্ভূক্ত হতে পারে না। (তিরমিযী ও ইবনে মাজাহ)

عن عائشة أن النبي صلى الله عليه وسلم قال لها:  يا عائشة إياك ومحقرات الذنوب فإن لها من الله طالباً

আয়েশা রা. হতে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, হে আয়েশা, ছোটখাট গুনাহের ব্যাপারে সতর্ক হও। কেননা এ জন্যও আল্লাহর নিকট জবাবহিতি করতে হবে। (ইবনে মাজাহ)

عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: “إِنَّهُ لَيْسَ شَيْءٌ يُقَرِّبُكُمْ مِنَ الْجَنَّةِ, وَيُبَاعِدُكُمْ مِنَ النَّارِ إِلَّا قَدْ أَمَرْتُكُمْ بِهِ , وَلَيْسَ شَيْءٌ يُقَرِّبُكُمْ مِنَ النَّارِ, وَيُبَاعِدُكُمْ مِنَ الْجَنَّةِ إِلَّا قَدْ نَهَيْتُكُمْ عَنْهُ, وَأَنَّ الرُّوحَ الْأَمِينَ نَفَثَ فِي رُوعِيَ أَنَّهُ لَنْ تَمُوتَ نَفْسٌ حَتَّى تَسْتَوْفِيَ رِزْقَهَا, فَاتَّقُوا اللهَ وَأَجْمِلُوا فِي الطَّلَبِ, وَلَا يَحْمِلَنَّكُمُ اسْتِبْطَاءُ الرِّزْقِ أَنْ تَطْلُبُوهُ بِمَعَاصِي اللهِ, فَإِنَّهُ لَا يُدْرَكُ مَا عِنْدَ اللهِ إِلَّا بِطَاعَتِهِ

ইবনে মাসুদ রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেনঃ আল্লাহর নির্ধারিত রিযিক পূর্ণ মাত্রায় লাভ না করা পর্যন্ত কোন লোকই মারা যাবে না। সাবধান! আল্লাহকে ভয় কর এবং বৈধ পন্থায় আয় উপার্জনের চেষ্টা কর। রিযিকপ্রাপ্তিতে বিলম্ব যেন তোমাদেরকে অবৈধ পন্থা অবলম্বনে প্ররোচিত না করে। কেননা আল্লাহর কাছে যা কিছু রয়েছে তা কেবল আনুগত্যের মাধ্যমে লাভ করা যায়। (ইবনে মাজাহ)

عن أبي هريرة رضي الله عنه، قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: « المسلم أخو المسلم، لا يظلمه، ولا يخذله، ولا يكذبه، ولا يحقره، التقوى هاهنا – ويشير إلى صدره الشريف ثلاث مرات – بحسب امرئ من الشر أن يحقر أخاه المسلم، كل المسلم على المسلم حرام: دمه وماله وعرضه

আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেনঃ মুসলমান মুসলমানের ভাই। সে তার উপর যুলুম করবে না, তাকে অসহায় অবস্থায় পরিত্যাগ ও করবে না এবং তাকে তুচ্ছ জ্ঞান করবে না। তিনি নিজের বুকের দিকে ইশারা করে বলেন, তাকওয়া এখানে, তাকওয়া এখানে, তাকওয়া এখানে। কোন লোকের নিকৃষ্ট সাব্যস্ত হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে তার মুসলিম ভাইকে তুচ্ছ জ্ঞান করে। প্রতিটি মুসলমানের জীবন, ধন-সম্পদ ও মান-সম্মান সকল মুসলমানের সম্মানের বস্তু (এর উপর হস্তক্ষেপ করা তাদের জন্য হারাম)। (মুসলিম)

عن الحسن بن علي رضي الله عنه قال: حفظت من رسول الله صلى الله عليه وسلم دع ما يريبك إلى ما لايريبك فإن الصدق طمأنينة والكذب ريبة

হাসান ইবনে আলী রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সা. এর জবান মুবারক হতে এই কথা ‍মুখস্ত করে নিয়েছি, য জিনিস সংশয়ের মধ্যে ফেলে দেয় তা পরিত্যাগ করে যা সন্দেহের উর্ধে তা গ্রহণ কর। কেননা সততাই শান্তির বাহন এবং মিথ্যাচার সন্দেহ সংশয়ের উৎস। (তিরমিযী)

 وعن أبي ذر رضي الله عنه : دخلت على رسول الله – صلى الله عليه وسلم – فذكر الحديث بطوله إلى أن قال : قلت : يا رسول الله أوصني . قال : ” أوصيك بتقوى الله ، فإنه أزين لأمرك كله ” قلت : زدني . قال : ” عليك بتلاوة القرآن وذكر الله عز وجل ، فإنه ذكر لك في السماء ، ونور لك في الأرض ” . قلت : زدني . قال : ” عليك بطول الصمت ، فإنه مطردة للشيطان وعون لك على أمر دينك ” قلت : زدنيقال إياك وكثرة الضحك ، فإنه يميت القلب ويذهب بنور الوجه قلت : زدني . قال : ” قل الحق وإن كان مرا ” . قلت : زدني . قال : ” لا تخف في الله لومة لائم ” . قلت : زدني . قال : ” ليحجزك عن الناس ما تعلم من نفسك ”  

হযরত আবু যার গিফারী রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি একদা রাসুলুল্লাহ সা. এর খেদমতে হাজির হলাম। অতঃপর (হযরত আবুযার, নতুন তাঁর নিকট হতে হাদীসের শেষের দিকের কোন বর্ণনাকারী) একটি দীর্ঘ হাদীস  বর্ণনা কর।  (এ হাদীস এখানে বর্ণনা করা হয়নি) এ প্রসংগে হযরত আবু যার বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, আমাকে নসীহত করুন। নবী করীম সা. বললেন, আমি তোমাকে নসিহত করছি তুমি আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর। কেননা ইহা তোমার সমস্ত কাজকে সুন্দর, সুষ্ঠু ও সৌন্দর্য মন্ডিত করে দেবে। আবু যার বলেন, আমি আরো নসিহত করতে বললাম। তখন তিনি বললেন, তুমি কুরআন মজিদ তিলাওয়াত করো এবং আল্লাহকে সব সময় স্মরণ রাখবে। কেননা এ তেলাওয়াত ও আল্লাহর স্মরণের ফলেই আকাশ রাজ্যে তোমাকে স্মরণ করা হবে এবং এ যমীনেও তা তোমার নুর স্বরূপ হবে। আব যর আবার বললেন, হে রাসূল! আমাকে আরো নসীহত করুন। তিনি বললেন, বেশীর ভাগ চুপচাপ তাকা ও যখা সম্ভব কম কথা বলার অভ্যাস কর। কেননা, এ অভ্যাস শয়তান বিতাড়নের কারণ হবে এবং দ্বীনের ব্যাপারে ইহা তোমার সাহায্যকারী হবে। আবু যার বলেন, আমি বললাম আমাকে আরো কিছু নসিহত করুন। বললেন, বেশী হাসিও না, কেননা ইহা অন্তরকে হত্যা করে এবং মুখমন্ডলের জ্যোতি ইহার কারণে বিলীন হয়ে যায়। আমি বললাম, আমাকে আরো উপদেশ দিন। তিনি বললেন, সব সময়ই সত্য কথা ও হক কথা বলবে-লোকের পক্ষে তা যথই দূঃসহ ও তিক্ত হোক না কেন। বললাম আমাকে আরো নসিহত করুন। তিনি বললেন, আল্লাহর ব্যাপারে কোন উৎপীড়কের উৎপীড়নকে আদৌ ভয় করো না।  আমি বললাম আমাকে আরো নসিহত করুন।  তিনি বললেন, তোমার নিজের সম্পর্কে তুমি যা জান, তা যেন তোমাকে অপর লোকদের দোষত্রুটি সন্ধানের কাজ হতে বিরত রাখে। (বায়হাকী)

 

তাকওয়ার বিষয়টা মানব সৃষ্টির সূচনা থেকেআদম আ. এর ২ সন্তানের কথোপকথন ছিল এভাবেঃ

﴿وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ ابْنَيْ آدَمَ بِالْحَقِّ إِذْ قَرَّبَا قُرْبَانًا فَتُقُبِّلَ مِنْ أَحَدِهِمَا وَلَمْ يُتَقَبَّلْ مِنَ الْآخَرِ قَالَ لَأَقْتُلَنَّكَ ۖ قَالَ إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللَّهُ مِنَ الْمُتَّقِينَ﴾ ﴿لَئِن بَسَطتَ إِلَيَّ يَدَكَ لِتَقْتُلَنِي مَا أَنَا بِبَاسِطٍ يَدِيَ إِلَيْكَ لِأَقْتُلَكَ ۖ إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ رَبَّ الْعَالَمِينَ﴾

আর তাদেরকে আদমের দু-ছেলের সঠিক কাহিনী ও শুনিয়ে দাও৷ তারা দুজন কুরবানী করলে তাদের একজনের কুরবানী কবুল করা হলো, অন্য জনেরটা কবুল করা হলো না৷ সে বললো, আমি তোমাকে মেরে ফেলবো৷ সে জবাব দিল, আল্লাহ তো মুত্তাকিদের নজরানা কবুল করে থাকে ৷ তুমি আমাকে মেরে ফেলার জন্য হাত উঠালেও আমি তোমাকে মেরে ফেলার জন্য হাত উঠাবো না৷ আমি বিশ্ব জাহানের প্রভু আল্লাহকে ভয় করি। (আল মায়িদাহঃ ২৭২৮)

 

তাকওয়ার কথা কুরআন বলেছে মানব জাতিকে প্রথম সম্বোধনেইঃ

﴿يَا أَيُّهَا النَّاسُ اعْبُدُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ وَالَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ﴾

হে মানব জাতি৷  ইবাদাত করো তোমাদের রবের, যিনি তোমাদের ও তোমাদের পূর্বে যারা অতিক্রান্ত হয়েছে তাদের সবার সৃষ্টিকর্তা, এভাবেই তোমরা নিষ্কৃতি লাভের আশা করতে পারো৷ (আল বাকারাঃ ২১)

 

তাকওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যখন নামাযের নির্দেশ দেয়া হয়েছেঃ

﴿وَاسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ ۚ وَإِنَّهَا لَكَبِيرَةٌ إِلَّا عَلَى الْخَاشِعِينَ﴾﴿الَّذِينَ يَظُنُّونَ أَنَّهُم مُّلَاقُو رَبِّهِمْ وَأَنَّهُمْ إِلَيْهِ رَاجِعُونَ﴾

সবর ও নামায সহকারে সাহায্য নাও ৷  নিসন্দেহে নামায বড়ই কঠিন কাজ, কিন্তু সেসব অনুগত বান্দাদের জন্য কঠিন নয় ৷ যারা মনে করে, সবশেষে তাদের মিলতে হবে তাদের রবের সাথে এবং তাঁরই দিকে ফিরে যেতে হবে ৷ (আল বাকারাঃ ৪৫৪৬)

 

তাকওয়ার কথা বলা হচ্ছেযখন রোযার নির্দেশ দেয়া হচ্ছেঃ

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ﴾

হে ঈমানদাগণ! তোমাদের ওপর রোযা ফরয করে দেয়া হয়েছে যেমন তোমাদের পূর্ববর্তী নবীদের অনুসারীদের ওপর ফরয করা হয়েছিল৷ এ থেকে আশা করা যায়, তোমাদের মধ্যে তাকওয়ার গুণাবলী সৃষ্টি হয়ে যাবে৷ (আল বাকারাঃ ১৮৩)

 

তাকওয়া এতো গুরুত্বপূর্ণ কেন?

       এই বিষয়টা বুঝার জন্য আমাদেরকে যেতে হবে ইতিহাসের কাছে

       ইতিহাস বলছে, আল্লাহর রাসূল সা. যে দাওয়াত মক্কায় শুরু করেছিলেন, সেই দাওয়াত একদল মানুষ মানছিল, অন্যদল মানুষ প্রত্যাখ্যান করছিল

       যারা প্রত্যাখ্যান করছিলতারা কেন প্রত্যাখ্যান করছিল? তারা বুঝেছিলঃ

o   এই দাওয়াত প্রচলিত সকল কিছু পালটিয়ে দিয়ে আল্লাহর নিয়মে চালানো দাওয়াত

o   এই দাওয়াত আল্লাহর নিয়মে সব কিছু চালাতে মুহাম্মদকে নেতৃত্ব প্রদানের দাওয়াত

o   এই দাওয়াত মানে চলমান নেতৃত্বের আমূল পরিবর্তনের দাওয়াত

o   এই দাওয়াত মানুষের উপর মানুষের প্রভূত্ব খতম করে সকল মানুষকে একটি স্ট্যান্ডার্ড মর্যাদায় নিয়ে আসার দাওয়াত

       যা দাওয়াত কবুল করেছিলেনতারা কেন কবুল করেছিলেন, তারা বুঝেছিলেন?

o   এই দাওয়াত সমাজ পরিবর্তনের দাওয়াত

o   এই দাওয়াত শান্তি আর ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার দাওয়াত

o   এই দাওয়াত অধিকার প্রতিষ্ঠার দাওয়াত

o   এই দাওয়াত মানুষের প্রভূত্ব থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিজেদেরকে একটি স্ট্যান্ডার্ড মর্যাদায় নিয়ে আসার দাওয়াত

       শোষন মুক্ত এই ধরণের একটি পরিবেশ তৈরী করার জন্য প্রয়োজন একদল মানুষ,

o   যারা এই দাওয়াতের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগে প্রস্তুত হবে

o   যারা এই দাওয়াতকে তার জীবনের উদ্দেশ্য হিসাবে গ্রহণ করবে

o   যারা এই দাওয়াতের প্রয়োজনে নিজের দুনিয়াবী সকল স্বার্থ আর সুবিধাকে কুরবানী দেবে

o   যারা এই দাওয়াতের প্রয়োজনে নিজের সঞ্চিত সকল অর্থ সম্পদ বিলিয়ে দেবে

o   যারা এই দাওয়াতের প্রয়োজনে নিজের শিশুকাল, কৈশোর জীবন আর যৌবনের বসন্ত সমূহের স্মৃতিময় জন্মভূমিকে ত্যাগ করে, মা বাবাভাইবোনস্ত্রী পুত্রব্যবসা বানিজ্যজমি জমাধন সম্পদ সব কিছু ত্যাগ করে চির জীবনের জন্য অন্য জনপদের হিজরত করবে

o   আর এই অবস্থার সৃষ্টি তখনই হবে, যখন তার মাঝে থাকবে আল্লাহর ভয়

o   যে ভয়ের কারণে তারা ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করবে, অধিকারীর অধিকার প্রদান করবে

o   যারা চলবে মুহাম্মদ সা. এর নেতৃত্বে নিঃসংকোচেবিনা প্রশ্নে

       ১৪শ বছর আগে এমনই এক সময়ে রাসূল মুহাম্মদ সা. দ্বীনের দাওয়াত দেয়ার পর যে মানুষ গুলো তার দাওয়াত কবুল করেছিলেন, তাদের মক্কার এলাকায় দাড়ানোর মতো একটুকরা জমি ছিল না

       তাই নবী সা. সিদ্ধান্ত নিলেন, নিজেদের দাড়াবার মতো এক খন্ড জমি দরকার  যেখানে

o   নির্ভয়ে  ইসলামের কথা বলা যাবে

o   এতো দিন যে ন্যায় বিচার ও শোষন মুক্ত শাসন ব্যবস্থার কথা বলা হচ্ছে, তার একটা মডেল দাড় করানো যাবে

o   সেই মডেল রাষ্ট্র গঠন করার জন্য প্রয়োজন একদল মানুষ, যাদের গুনাবলীর কথা এতোক্ষণ আলোচনা করা হলো

o   সেই মানুষ গুলোকে গড়ার জন্য তাদের মধ্যে আল্লাহর ভয় সৃষ্টির জন্য নামায ফরয করা হলো

o   সেই মানুষযারা মদীনায় হিজরত করলেন, তাদের হাতে এখন প্রচন্ড ক্ষমতা, তাদের জিম্মায় এখন মানুষের অর্থ সম্পদ

o   সেই অবস্থায় যাতে তারা ক্ষমতার অপব্যবহার না করেন, মানুষের সম্পদকে নিজেদের সম্পদ মনে না করেন, তার জন্য আল্লাহ রোযাকে ফরয করলেনযাতে তাদের মাঝে আল্লাহর ভয় সৃষ্টি হয়

       ইতিহাস সাক্ষী দেয়সেই আল্লাহর ভয়ে ভীত মানুষ গুলোর নেতৃত্বে এমন একটা সমাজ প্রতিষ্ঠা লাভ করলো, যা

o   ১০০০ সুসজ্জিত বিশাল বাহিনীকে মাত্র ৩১৩জনের বাহিনী বদরের প্রান্তরে নাস্তে নাবুদ করে ছাড়লো

o   যে মক্কা থেকে চোঁখে জলে সিক্ত হয়ে মানুষ গুলো মদীনায় হিজরত করলো, তারাই বিনা রক্তপাতে মক্কাকে দখল করলো

o   যাদের শাসন ব্যবস্থায় প্রধান বিচারপতি ১ বছর পর এসে রাষ্ট্রপতির কাছে দাবী জানালেন, বিচারপতির পদকে বিলুপ্ত করার জন্য কারণ ১ বছরে তার আদালতে একটি মামলাও দায়ের হয়নি

o   যে শাসন ব্যবস্থার বারাকাতে মদীনার দিকে দিকে যাকাত খাওয়ার লোক খোঁজে পাওয়া যায়নি

       সমস্যা সংকুল আমাদের প্রিয় জন্মভূমিকে সুখী সমৃদ্ধশালী একটি কল্যাণ রাষ্ট্র করতে হলে রোযার শিক্ষায় শিক্ষিত একদল আল্লাহ ভীরু মানুষের নেতৃত্ব প্রয়োজন

       অতএব, আমাদেরকে রোযা যে আল্লাহভীরুতার গুণ সৃষ্টি করতে চায়, সেই ধরণের আল্লাহভীরুতার গুণে গুনান্বিত হতে হবে। সুখী সমৃদ্ধশালী কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠান যোগ্য কারিগর হতে হবে।

       এর মাধ্যমে আমরা হবে আল্লাহর যোগ্য খলিফা, যাদের জন্য আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তৈরী করেছেন জান্নাত-যার নিচ দিয়ে প্রবাহমান ঝর্ণাধারা।

       আমাদেরকে আল্লাহ সেই জান্নাতের মেহমান হিসাবে কবুল করুন। আমীন।

লেখাটি আপনার ভাল লাগলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.