দারসুল কুরআনঃ সূরা আল আনফালঃ আয়াত ১১-১৯

দারসুল কুরআনঃ সূরা আল আনফালঃ আয়াত ১১-১৯

দারসে কুরআনঃ সূরা আল আনফালঃ আয়াত ১১১৯

তেলাওয়াত ও তরজমাঃ

﴿إِذْ يُغَشِّيْكُمُ النُّعَاسَ أَمَنَةً مِّنْهُ وَيُنَزِّلُ عَلَيْكُمْ مِّنَ السَّمَاءِ مَاءً لِّيُطَهِّرَكُمْ بِهِ وَيُذْهِبَ عَنْكُمْ رِجْزَ الشَّيْطَانِ وَلِيَــرْبِطَ عَلَىٰ قُلُوبِكُمْ وَيُثَبِّتَ بِهِ الْأَقْدَامَ﴾

১১) আর সেই সময়, যখন আল্লাহ নিজের পক্ষ থেকে তন্দ্রার আকারে তোমাদের জন্য নিশ্চিন্ততা ও নির্ভীকতার পরিবেশ সৃষ্টি করেছিলেন৷ এবং আকাশ থেকে তোমাদের ওপর পানি বর্ষণ করেছিলেন, যাতে তোমাদের পাক -পবিত্র করা যায়, শয়তান তোমাদের ওপর যে নাপাকী ফেলে দিয়েছিল তা তোমাদের থেকে দুর করা যায়, তোমাদের সাহস যোগানো যায় এবং তার মাধ্যমে তোমাদেরকে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়৷

﴿إِذْ يُوحِيْ رَبُّكَ إِلَى الْمَلَائِكَةِ أَنِّيْ مَعَكُمْ فَثَبِّتُوا الَّذِيْنَ آمَنُوا ۚ سَأُلْقِــيْ فِيْ قُلُوْبِ الَّذِيْنَ كَفَرُوا الرُّعْبَ فَاضْرِبُوا فَوْقَ الْأَعْنَاقِ وَاضْرِبُوا مِنْهُمْ كُلَّ بَنَانٍ﴾

১২) আর সেই সময়, যখন তোমার রব ফেরেশতাদেরকে ইঙ্গিত করেছিলেন, এই বলেঃ আমি তোমাদের সাথে আছি , তোমরা ঈমানদারদেরকে অবিচল রাখো, আমি এখনই এ কাফেরদের মনে আতংক সৃষ্টি করে দিচ্ছি৷ কাজেই তোমরা তাদের ঘাড়ে আঘাত করো এবং প্রতিটি জোড়ে ও গ্রন্থী -সন্ধিতে ঘা মারো৷

﴿ذٰلِكَ بِأَنَّهُـــمْ شَاقُّوا اللّٰهَ وَرَسُولَهُ ۚ وَمَنْ يُشَاقِقِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَإِنَّ اللّٰهَ شَدِيْدُ الْعِقَابِ﴾

১৩) এটা করার কারণ , তারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি বিদ্রোহ পোষণ করেছে৷ আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি বিদ্রোহ করে আল্লাহ তার জন্য কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করে রেখেছেন৷ আর আল্লাহর পাকড়াও বড়ই কঠিন৷

﴿ذٰلِكُمْ فَذُوْقُوْهُ وَأَنَّ لِلْكَافِرِيْنَ عَذَابَ النَّارِ﴾

১৪) -এটা হচ্ছে তোমাদের শাস্তি, এখন এ মজা উপভোগ কর৷ আর তোমাদের জানা উচিত, সত্য অস্বীকারকারীদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আযাব৷

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوا إِذَا لَقِيْتُمُ الَّذِيْنَ كَفَرُوا زَحْفًا فَلَا تُوَلُّوْهُمُ الْأَدْبَارَ﴾

১৫) হে ঈমানদারগণ! যখন তোমরা একটি সেনাবাহিনীর আকারে কাফেরদের মুখোমুখি হও তখন তাদের মোকাবিলায় পৃষ্ঠ প্রদর্শন করো না৷

﴿وَمَنْ يُوَلِّهِــــمْ يَوْمَئِذٍ دُبُرَهُ إِلَّا مُتَحَرِّفًا لِّقِتَالٍ أَوْ مُتَحَيِّـــــزًا إِلَىٰ فِئَةٍ فَقَدْ بَاءَ بِغَضَبٍ مِّنَ اللَّهِ وَمَأْوَاهُ جَهَنَّـمُ ۖ وَبِئْسَ الْمَصِيرُ﴾

১৬) যে ব্যক্তি এ অব্স্থায় পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে সে আল্লাহর গযবে ঘেরাও হয়ে যাবে৷ তার আবাস হবে জাহান্নাম এবং ফিরে যাবার জন্যে তা বড়ই খারাপ জায়গা৷ তবে হাঁ যুদ্ধের কৌশল হিসেবে এমনটি করে থাকলে অথবা অন্য কোন সেনাদলের সাথে যোগ দেবার জন্য করে থাকলে তা ভিন্ন কথা৷

﴿فَلَمْ تَقْتُلُوْهُمْ وَلٰكِنَّ اللّٰهَ قَتَلَهُمْ ۚ وَمَا رَمَيْتَ إِذْ رَمَيْتَ وَلٰكِنَّ اللّٰهَ رَمَىٰ ۚ وَلِيُبْلِـــيَ الْمُؤْمِنِينَ مِنْهُ بَلَاءً حَسَنًا ۚ إِنَّ اللّٰهَ سَمِيْعٌ عَلِيْمٌ﴾

১৭) কাজেই সত্য বলতে কি, তোমরা তাদেরকে হত্যা করনি বরং আল্লাহই তাদেরকে হত্যা করেছেন৷ আর তোমরা নিক্ষেপ করনি বরং আল্লাহ নিক্ষেপ করেছেন৷ (আর এ কাজে মুমিনদের হাত ব্যবহার করা হয়েছিল) এ জন্য যে আল্লাহ মুমিনদেরকে একটি চমৎকার পরীক্ষার মধ্য দিয়ে সফলতার সাথে পার করে দেবেন৷ অবশ্যি আল্লাহ সবকিছু শুনেনে ও জানেন৷ 

﴿ذٰلِكُمْ وَأَنَّ اللّٰهَ مُوْهِنُ كَيْدِ الْكَافِرِيْنَ﴾

১৮) এ ব্যাপারটি তো তোমাদের সাথে! আর কাফেরদের সাথে যে আচরণ করা হবে তা হচ্ছে আল্লাহ তাদের কৌশলগুলো দুর্বল করে দেবেন৷

﴿إِنْ تَسْتَفْتِحُوا فَقَدْ جَاءَكُمُ الْفَتْحُ ۖ وَإِنْ تَنْتَهُوا فَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ ۖ وَإِنْ تَعُوْدُوا نَعُدْ وَلَنْ تُغْنِيَ عَنكُمْ فِئَتُكُمْ شَيْئًا وَلَوْ كَثُرَتْ وَأَنَّ اللّٰهَ مَعَ الْمُؤْمِنِينَ﴾

১৯) (এ কাফেরদের বলে দাও) যদি তোমরা ফায়সালা চেয়ে থাকো, তাহলে এই নাও ফায়সালা তোমাদের সামনে এসে গেছে৷ এখন যদি ক্ষান্ত হও, তাহলে তো তোমাদের জন্যই ভাল হবে৷ নয়তো যদি ফিরে আবার সেই বোকামির পুনরাবৃত্তি করো তাহলে আমিও সেই শাস্তির পুনরাবৃত্তি করবো এবং তোমাদের দলবল যত বেশীই হোক না কেন, তা তোমাদের কোন কাজে আসবে না৷ আল্লাহ অবশ্যি মুমিনদের সাথে রয়েছেন৷

 

সূরার ভূমিকা, নামকরণ, ঐতিহাসিক পটভূমি এবং আলোচন্য বিষয় পড়ার জন্য ০১-১০ নম্বর আয়াতের দারসুল কুরআন পড়ুন-এখানে

 

ব্যাখ্যাঃ

আয়াতঃ ১১

﴿إِذْ يُغَشِّيْكُمُ النُّعَاسَ أَمَنَةً مِّنْهُ وَيُنَزِّلُ عَلَيْكُمْ مِّنَ السَّمَاءِ مَاءً لِّيُطَهِّرَكُمْ بِهِ وَيُذْهِبَ عَنكُمْ رِجْزَ الشَّيْطَانِ وَلِيَــرْبِطَ عَلَىٰ قُلُوبِكُمْ وَيُثَبِّتَ بِهِ الْأَقْدَامَ﴾

১১) আর সেই সময়, যখন আল্লাহ নিজের পক্ষ থেকে তন্দ্রার আকারে তোমাদের জন্য নিশ্চিন্ততা ও নির্ভীকতার পরিবেশ সৃষ্টি করেছিলেন৷ এবং আকাশ থেকে তোমাদের ওপর পানি বর্ষণ করেছিলেন, যাতে তোমাদের পাক -পবিত্র করা যায়, শয়তান তোমাদের ওপর যে নাপাকী ফেলে দিয়েছিল তা তোমাদের থেকে দুর করা যায়, তোমাদের সাহস যোগানো যায় এবং তার মাধ্যমে তোমাদেরকে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়৷  

﴿إِذْ يُغَشِّيكُمُ النُّعَاسَ أَمَنَةً مِّنْهُ﴾ আর সেই সময়, যখন আল্লাহ নিজের পক্ষ থেকে তন্দ্রার আকারে তোমাদের জন্য নিশ্চিন্ততা ও নির্ভীকতার পরিবেশ সৃষ্টি করেছিলেন৷

§ বদর এবং অহুদে যখন মুসলমানদের মাঝে প্রচন্ড ভীতি আতংক দেখা দিয়েছিল, তখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা মুসলমানদের দিলের মাঝে নিশ্চিন্ততায় ভরে দিলেন এর ফলে তারা তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল সেই বিষয়টি এখানে তুলে ধরা হয়েছে

§ এর মাধ্যমে আল্লাহ তার নিয়ামত ও অনুগ্রহের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে,

. তন্দ্রায় আচ্ছন্ন করে ইহসান করা হয়েছে

. নিজেদের সংখ্যা স্বল্পতা কাফিরদের সংখ্যাধিক্যের ভীতি তন্দ্রার মাধ্যমে কেটে প্রশান্তি নিয়ে আসে

§ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা বিভিন্ন যুদ্ধে মুসলমানদের শংকামুক্ত রাখতে এই ধরণের তন্দ্রার ব্যবস্থা করেন যেমনঃএকই ধরণের সাহায্য মুসলমানদের করা হয়েছিল ওহুদেও যার বর্ণনা এসেছে সূরা আলে ইমরানঃ ১৫৪ আয়াতে

﴿ثُمَّ أَنزَلَ عَلَيْكُم مِّن بَعْدِ الْغَمِّ أَمَنَةً نُّعَاسًا يَغْشَىٰ طَائِفَةً مِّنكُمْ﴾

এ দুঃখের পর আল্লাহ তোমাদের কিছু লোককে আবার এমন প্রশান্তি দান করলেন যে, তারা তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লো ৷

আবু তালহা বলেনঃ

كنت ممن أصابه النعاس يوم أحد، ولقد سقط السيف من يدي مراراً، يسقط وآخذه، ويسقط وآخذه، ولقد نظرت إليهم يميدون وهم تحت الحجف

ওহুদের যুদ্ধের দিন আমারও তন্দ্রা এসেছিল এবং আমার হাত থেকে তরবারী পড়ে যাচ্ছিল। আমি তা উঠিয়ে নিচ্ছিলাম।  পড়ে যাচ্ছিল আর আমি উঠাচ্ছিলাম। আমি জনগনকে দেখছিলাম যে, তারা ঢাল মাথার উপর করে তন্দ্রায় ঢলে পড়ছে।

হযরত আলী রা. বলেনঃ

ما كان فينا فارس يوم بدر غير المقداد، ولقد رأيتنا وما فينا إلاّ نائم، إلا رسول الله صلى الله عليه وسلم يصلي تحت شجرة ويبكي حتى أصبح.

বদরের দিন হযরত মিকদাদ রা. ছাড়া আর কারো কাছে সওয়ারী ছিল না। আমরা সবাই নিদ্রিত অবস্থায় ছিলাম। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সা. একটি গাছের নিচে সকাল পর্যন্ত নামায পড়ছিলেন এবং আল্লাহর সামনে কান্নাকাটি করছিলেন।

হযরত ইবনে মাসউদ রা. বলেনঃ

النعاس في القتال أمنة من الله، وفي الصلاة من الشيطان

যুদ্ধের দিন এই তন্দ্রা যেন আল্লাহর পক্ষ থেকে এক প্রকার শান্তি ও নিরাপত্তা ছিল।  কিন্তু নামাযে এই তন্দ্রাই আবার শয়তানের পক্ষ থেকে হয়ে থাকে।

কাতাদাহ বলেনঃ

النعاس في الرأس، والنوم في القلب، قلت أما النعاس فقد أصابهم يوم أحد، وأمر ذلك مشهور جداً، وأما الآية الشريفة إنما هي في سياق قصة بدر، وهي دالة على وقوع ذلك أيضاً، وكأن ذلك كائن للمؤمنين عند شدة البأس لتكون قلوبهم آمنة مطمئنة بنصر الله، وهذا من فضل الله ورحمته بهم، ونعمته عليهم

তন্দ্রা মাথায় হয় এবং ঘুম অন্তরে হয়। আমি বলি ওহুদের যুদ্ধে মুমিনদেরকে তন্দ্রা আচ্ছন্ন করেছিল। আর এ খবর তো খুবই সাধারণ ও প্রসিদ্ধ।  কিন্তু এই আয়াতে কারিমার সম্পর্ক বদরের ঘটনার সাথে সম্পর্কিত। আর এই আয়াত প্রমাণ করে বদরের যুদ্ধেও মুমিনদের তন্দ্রায় আচ্ছন্ন করা হয়েছিল এবং কঠিন যুদ্ধের সময় এভাবে মুমিনদের উপর তন্দ্রা ছেয়ে যেতো, যাতে তাদের অন্তর আল্লাহর সাহায্যে প্রশান্ত ও নিরাপদ থাকে। মুমিনদের উপর এটা আল্লাহর অনুগ্রহ ও অনুকম্পা।

§ সূরা আল শারহ আয়াতে বলা হয়েছেঃ

﴿فَإِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا﴾﴿إِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا﴾

প্রকৃত কথা এই যে, সংকীর্ণতার সাথে প্রশস্ততাও রয়েছে৷  আসলে সংকীর্ণতার সাথে আছে প্রশস্ততাও ৷(নিশ্চয়ই বর্তমান মুশকিলে সমূহের সাথেই আসানী রয়েছে।)

§ হাদীসে বলা হয়েছেঃ

أن رسول الله صلى الله عليه وسلم لما كان يوم بدر في العريش مع الصديق رضي الله عنه، وهما يدعوان، أخذت رسول الله صلى الله عليه وسلم سنة من النوم، ثم استيقظ مبتسماً فقال أبشر يا أبا بكر هذا جبريل على ثناياه النقع ” ثم خرج من باب العريش وهو يتلو قوله تعالى

বদরের দিন নবী সা. তাঁর জন্য নির্মিত তাবুতে হযরত আবু বকরের সাথে অবস্থান করছিলেন। ইতিমধ্যে নবী সা. এর উপর তন্দ্রা ছেয়ে যায়। অতঃপর তিনি মুচকি হেসে তন্দ্রার ভাব কাটিয়ে উঠেন এবং বলেনঃ হে আবু বকর! সুসংবাদ গ্রহণ কর।  ঐ দেখ, জিবরাইল আ. ধূনিমলিন বেশে রয়েছেন। অতঃপর তিনি তাবু থেকে বের হয়ে আসলেন এবং সূরা আল কামার এর ৪৫ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করলেনঃ ﴿سَيُهْزَمُ الْجَمْعُ وَيُوَلُّونَ الدُّبُرَ﴾ শত্রুদের পরাজয় ঘটেছে এবং তারা পৃষ্ঠ প্রদর্শন পুর্বক পলায়ন করবে।

﴿وَيُنَزِّلُ عَلَيْكُم مِّنَ السَّمَاءِ مَاءً لِّيُطَهِّرَكُم بِهِ ﴾ এবং আকাশ থেকে তোমাদের ওপর পানি বর্ষণ করেছিলেন, যাতে তোমাদের পবিত্র করা যায়

§ বদর যুদ্ধে আগের রাতের বর্ণনা করা হচ্ছে সেই রাতে বৃষ্টি হওয়াতে তিন ধরণের সুফল পাওয়া যায়ঃ

. মুসলমানরা পর্যাপ্ত পরিমানের পানি পেয়ে যায়  যা গর্ত করে তারা সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন

. মুসলমানদের ছিল উপরের দিকে  অবস্থান স্থলে বৃষ্টির ফলে বালু জমাট বেঁধে শক্তি হয়ে যায় যাতে চলা ফেরা সহজ হয়ে যায়

. কাফেরদের অবস্থান ছিল নিচের দিকে ফলে একই বৃষ্টির পানিতে তাদের ওখানে কাদা জমে যায় ফলে হাটাচলা কঠিন হয়ে পড়ে

§ ঘটনাটি হযরত ইবনে আব্বাস রা. বর্ণনা করেন এভাবেঃ

نزل النبي صلى الله عليه وسلم حين سار إلى بدر- والمشركون بينهم وبين الماء – رملة دعصة، وأصاب المسلمين ضعف شديد، وألقى الشيطان في قلوبهم الغيظ يوسوس بينهم تزعمون أنكم أولياء الله تعالى، وفيكم رسوله، وقد غلبكم المشركون على الماء، وأنتم تصلون مجنبين؟ فأمطر الله عليهم مطراً شديداً، فشرب المسلمون، وتطهروا، وأذهب الله عنهم رجس الشيطان، وثبت الرمل حين أصابه المطر، ومشى الناس عليه والدواب

বদরে যেখানে নবী সা. অবতরণ করেছিলেন, সেখানে মুশরিকরা বদরের ময়দানের পানি দখন করে নেয় এবং মুশরিকরা পানি আর মুসলমানদের মাঝখানে এমন ভাবে দাড়ায়, যেন মুসলমানরা পানি ব্যবহার করতে না পারে। শয়তান সেই সুযোগ নিয়ে কুমন্ত্রনা দেয়া শুরু করে যে, তোমরা তো নিজেদেরকে বড় আল্লাহওয়ালা মনে করছো, আর তোমাদের মাঝে স্বয়ং রাসূলও রয়েছেন।  কিন্তু পানির উপর দখলতো রয়েছে মুশরিকদের। তোমরা তো পানি থেকে এমন ভাবে বঞ্চিত যে, নাপাক অবস্থায় নামায আদায় করছো। তখন আল্লাহ প্রচুর পানি বর্ষণ করলেন। মুসলমানরা পানি পানও করলেন, পবিত্রতাও অর্জন করলেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা শয়তানের কুমন্ত্রনাকে খাটো করে দিলেন।  পানির মাধ্যমে মুসলমানদের দিকের বালু শক্ত হয়ে গেল। এতে করে মানুষ ও পশুর চলাচল সুবিধা বেড়ে গেল।

﴿وَيُذْهِبَ عَنكُمْ رِجْزَ الشَّيْطَانِ وَلِيَرْبِطَ عَلَىٰ قُلُوبِكُمْ وَيُثَبِّتَ بِهِ الْأَقْدَامَ﴾ শয়তান তোমাদের ওপর যে নাপাকী ফেলে দিয়েছিল তা তোমাদের থেকে দুর করা যায়, তোমাদের সাহস যোগানো যায় এবং তার মাধ্যমে তোমাদেরকে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়৷

§ رِجْزَ الشَّيْطَانِ মানেঃ শয়তানের ওয়াওয়াসা অথবা বিপদজনক অনিষ্টতা  যার থেকে অন্তরের অবস্থাকে পবিত্র করা হয়

§ যেমন সূরা আল ইনসানে জান্নাতীদের সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ

﴿عَالِيَهُمْ ثِيَابُ سُندُسٍ خُضْرٌ وَإِسْتَبْرَقٌ ۖ وَحُلُّوا أَسَاوِرَ مِن فِضَّةٍ وَسَقَاهُمْ رَبُّهُمْ شَرَابًا طَهُورًا﴾

তাদের পরিধানে থাকবে মিহি রেশমের সবুজ পোশাক এবং মখমল ও সোনালী কিংখাবের বস্ত্ররাজি৷ আর তাদেরকে রৌপ্যের কঙ্কন পরানো হবে৷ আর তাদের রব তাদেরকে অতি পবিত্র শরাব পান করাবেন।  (সূরা আদ দাহরঃ ২১)

o   এখানে মিহি রেশনের সবুজ পোষাক ইত্যাদি হবে জান্নাতিদের বাহিরের সৌন্দর্য। আর তাদেরকে পবিত্র শরাব পান করাবেনযার মাধ্যমে তাদেরকে হিংসা, বিদ্বেষ ইত্যাদি থেকে পবিত্র করা হবেএটা হলো জান্নাতীদের বাতিনী সৌন্দর্য।

§ মুসলমানদের মাঝে বদর যুদ্ধের প্রথম দিকে ভীতির অবস্থা চলে এসেছিল যাকে শয়তানের ছুঁড়ে দেয়া নাপাকী বলা হয়েছে

আয়াতঃ ১২

﴿إِذْ يُوحِيْ رَبُّكَ إِلَى الْمَلَائِكَةِ أَنِّيْ مَعَكُمْ فَثَبِّتُوا الَّذِينَ آمَنُوا ۚ سَأُلْقِيْ فِيْ قُلُوْبِ الَّذِيْنَ كَفَرُوا الرُّعْبَ فَاضْرِبُوا فَوْقَ الْأَعْنَاقِ وَاضْرِبُوا مِنْهُمْ كُلَّ بَنَانٍ﴾

১২) আর সেই সময়, যখন তোমার রব ফেরেশতাদেরকে ইঙ্গিত করেছিলেন, এই বলেঃ আমি তোমাদের সাথে আছি, তোমরা ঈমানদারদেরকে অবিচল রাখো, আমি এখনই এ কাফেরদের মনে আতংক সৃষ্টি করে দিচ্ছি৷ কাজেই তোমরা তাদের ঘাড়ে আঘাত করো এবং প্রতিটি জোড়ে ও গ্রন্থী-সন্ধিতে ঘা মারো৷  

﴿إِذْ يُوحِي رَبُّكَ إِلَى الْمَلَائِكَةِ أَنِّي مَعَكُمْ فَثَبِّتُوا الَّذِينَ آمَنُوا﴾ আর সেই সময়, যখন তোমার রব ফেরেশতাদেরকে ইঙ্গিত করেছিলেন, এই বলেঃ আমি তোমাদের সাথে আছি৷

§ এই বিষয়টা সঠিক করে বলা কঠিন সঠিক ব্যাপার আল্লাহ ভাল জানেন

§ কুরআনের নীতিগত কথামালা ভিত্তিতে অনুমান করা যায় যে,

. যুদ্ধক্ষেত্রে ফেরেশতারা প্রত্যক্ষ লড়াই করেননি এবং তরবারি হাতে সরাসরি মারামারি কাটাকাটিতে অংশ নেননি

. ফেরেশতারা যুদ্ধে অংশ নেন মুসলমানরা যেখানে আঘাত করেছে, তা সঠিক জায়গায় যাতে পড়ে তাতে সহযোগিতা করেন, আঘাত যাতে চূড়ান্ত মারাত্মক হয়সে সহযোগিতা করেছিলেন

§ ইবনে ইসহাক বলেন, ফেরেশতারা যখন বদরে ময়দানে মুসলমান যোদ্ধাদের কাছে আসতেন, তখন বলতেনঃ

سَمِعْت هَؤُلَاءِ الْقَوْم يَعْنِي الْمُشْرِكِينَ يَقُولُونَ وَاَللَّهِ لَئِنْ حَمَلُوا عَلَيْنَا لَأَنْكَشِفَنَّ فَيُحَدِّث الْمُسْلِمُونَ بَعْضهمْ بَعْضًا بِذَلِكَ فَتَقْوَى أَنْفُسهمْ

আমরা মুশরিকদের বলতে শুনেছি, তারা বলছে-“যদি মুসলমানরা আমাদেরকে আক্রমন করে, তবে আমরা যুদ্ধের মাঠে টিকতে পারবো না আর এই ভাবে কথাটি মুখ থেকে মুখে ছড়িয়ে পড়ে আর এর মাধ্যমে সাহাবীদের মনোবল বাড়তে থাকে এবং তারা বুঝতে পারেন যে, মুশরিকদের যুদ্ধ করার ক্ষমতা নাই

﴿سَأُلْقِي فِي قُلُوبِ الَّذِينَ كَفَرُوا الرُّعْبَ﴾ তোমরা ঈমানদারদেরকে অবিচল রাখো, আমি এখনই এ কাফেরদের মনে আতংক সৃষ্টি করে দিচ্ছি৷

§ আমি কাফেরদের মনে ভীত সৃষ্টি করে দেবো  অর্থাৎ হে ফেরেশতারা,ثَبِّتُوا أَنْتُمْ الْمُؤْمِنِينَ وَقَوُّوا أَنْفُسهمْ عَلَى أَعْدَائِهِمْ عَنْ أَمْرِي لَكُمْ তোমরা মুমিনদেরকে অটল ও স্থির রাখো এবং তাদের হৃদয়কে দৃঢ় রাখো

﴿فَاضْرِبُوا فَوْقَ الْأَعْنَاقِ وَاضْرِبُوا مِنْهُمْ كُلَّ بَنَانٍ﴾ কাজেই তোমরা তাদের ঘাড়ে আঘাত করো এবং প্রতিটি জোড়ে ও গ্রন্থী-সন্ধিতে ঘা মারো৷ 

§ এর ব্যাখ্যা পাওয়া যায় সূরা মুহাম্মদ এর ৪ নম্বর আয়াতেঃ

﴿فَإِذَا لَقِيتُمُ الَّذِينَ كَفَرُوا فَضَرْبَ الرِّقَابِ﴾

যখন তোমরা (যুদ্ধের ময়দানে) কাফেরদের সম্মুখীন হবে, তখন তাদের গর্দানে মারবে।  

§ আল কাসিম নবী সা. থেকে বর্ণনা করেছেন নবী সা. বলেছেনঃ

إِنِّي لَمْ أُبْعَثْ لِأُعَذِّب بِعَذَابِ اللَّه إِنَّمَا بُعِثْت لِضَرْبِ الرِّقَاب وَشَدِّ الْوَثَاق

আমি আল্লাহর শাস্তিতে জড়িত করার জন্য প্রেরিত হইনি (অর্থাৎ আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত যেমন পূর্ববর্তী উম্মতের উপর প্রেরিত হয়েছে), বরং তাদের সাথে যুদ্ধ করে আমি তাদের গর্দান উড়িয়ে দেবো এবং তাদেরকে শক্তভাবে শৃংখলে আবদ্ধ করবোএজন্য আমি প্রেরিত হয়েছি

আয়াতঃ ১৩

﴿ذٰلِكَ بِأَنَّهُمْ شَاقُّوا اللّٰهَ وَرَسُولَهُ ۚ وَمَن يُشَاقِقِ اللّٰهَ وَرَسُوْلَهُ فَإِنَّ اللّٰهَ شَدِيْدُ الْعِقَابِ﴾

১৩) এটা করার কারণ , তারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি বিদ্রোহ পোষণ করেছে৷ আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি বিদ্রোহ করে আল্লাহ তার জন্য কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করে রেখেছেন৷ আর আল্লাহর পাকড়াও বড়ই কঠিন৷ 

﴿ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمْ شَاقُّوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ ۚ وَمَن يُشَاقِقِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَإِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ﴾ এটা করার কারণ , তারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি বিদ্রোহ পোষণ করেছে৷ আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি বিদ্রোহ করে আল্লাহ তার জন্য কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করে রেখেছেন৷ আর আল্লাহর পাকড়াও বড়ই কঠিন৷ 

§ এই পর্যন্ত বদর যুদ্ধের নানান ঘটনাবলী স্মরণ করানো হলো, যাতে আনফাল শব্দের অন্তরনিহিত অর্থ উদঘাটন করা যায় যেমনঃ

. গনিমতের মালকে নিজেদের চেষ্টা আর মেহনতের ফল মনে করা

. গনিমতের মালের মালিক নিজে বনে যাওয়া

. গনিমতের প্রকৃত পক্ষে আল্লাহর দান

. গনিমতের দাতাই তার সম্পদের পূর্ণ ক্ষমতার অধিকারী

§ এখন বলা হচ্ছে, উপরোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে তোমরা নিজেরা হিসাব করো, আর দেখো এই বিজয়ে তোমাদের প্রচেষ্ঠা, মেহনত, সাহসিকতার পরিমাণ কত? আর আল্লারহ দান ও অনুগ্রহের পরিমাণ কত?

আয়াতঃ ১৪

﴿ذٰلِكُمْ فَذُوْقُوْهُ وَأَنَّ لِلْكَافِرِيْنَ عَذَابَ النَّارِ﴾

১৪) এটা হচ্ছে তোমাদের শাস্তি, এখন এ মজা উপভোগ কর৷ আর তোমাদের জানা উচিত, সত্য অস্বীকারকারীদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আযাব৷  

﴿ذَٰلِكُمْ﴾ এটা হচ্ছে তোমাদের শাস্তি

§ একটু আগে যাদেরকে শাস্তি লাভের যোগ্য উল্লেখ করা হয়েছিল, সেই কাফেরদের সম্পর্কে এখন আলোচনা শুরু হচ্ছে

﴿فَذُوقُوهُ وَأَنَّ لِلْكَافِرِينَ عَذَابَ النَّارِ﴾ এখন এ মজা উপভোগ কর৷ আর তোমাদের জানা উচিত, সত্য অস্বীকারকারীদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আযাব৷  

§ কাফেরদেরকে বলা হচ্ছেঃ তোমরা এই শাস্তির স্বাদ গ্রহণ কর কাফেরদের জানা প্রয়োজন যে, তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের লেলিহান শিখার শাস্তি যেমন ভাবে দুনিয়াতে তোমাদের জন্য শাস্তি রয়েছে, জাহান্নামেও তোমাদের জন্য শাস্তি রয়েছে

আয়াতঃ ১৫

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوا إِذَا لَقِيْتُمُ الَّذِيْنَ كَفَرُوا زَحْفًا فَلَا تُوَلُّوْهُمُ الْأَدْبَارَ﴾

১৫) হে ঈমানদারগণ! যখন তোমরা একটি সেনাবাহিনীর আকারে কাফেরদের মুখোমুখি হও তখন তাদের মোকাবিলায় পৃষ্ঠ প্রদর্শন করো না৷  

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا لَقِيتُمُ الَّذِينَ كَفَرُوا زَحْفًا فَلَا تُوَلُّوهُمُ الْأَدْبَارَ﴾ হে ঈমানদারগণ! যখন তোমরা একটি সেনাবাহিনীর আকারে কাফেরদের মুখোমুখি হও তখন তাদের মোকাবিলায় পৃষ্ঠ প্রদর্শন করো না৷  

§ ঈমানদারদের উদ্দেশ্য করে ধমক ধেয়া হচ্ছে যে, তারা যখন যুদ্ধে কাফেরদের মুখোমুখি হবে, তখন তারা তাদের সাথীদের ছেড়ে যেন পালিয়ে না যায়  এমন পালিয়ে যাওয়ার শাস্তি কি তা পরবর্তী আয়াতে বলা হচ্ছে

আয়াতঃ ১৬

﴿وَمَنْ يُوَلِّهِــمْ يَوْمَئِذٍ دُبُرَهُ إِلَّا مُتَحَرِّفًا لِّقِتَالٍ أَوْ مُتَحَيِّزًا إِلَىٰ فِئَةٍ فَقَدْ بَاءَ بِغَضَبٍ مِّنَ اللّٰهِ وَمَأْوَاهُ جَهَنَّمُ ۖ وَبِئْسَ الْمَصِيرُ﴾

১৬) যে ব্যক্তি এ অবস্থায় পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে সে আল্লাহর গযবে ঘেরাও হয়ে যাবে৷ তার আবাস হবে জাহান্নাম এবং ফিরে যাবার জন্যে তা বড়ই খারাপ জায়গা৷ তবে হাঁ যুদ্ধের কৌশল হিসেবে এমনটি করে থাকলে অথবা অন্য কোন সেনাদলের সাথে যোগ দেবার জন্য করে থাকলে তা ভিন্ন কথা৷  

﴿وَمَن يُوَلِّهِمْ يَوْمَئِذٍ دُبُرَهُ﴾ যে ব্যক্তি এ অবস্থায় পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে সে আল্লাহর গযবে ঘেরাও হয়ে যাবে৷ তার আবাস হবে জাহান্নাম এবং ফিরে যাবার জন্যে তা বড়ই খারাপ জায়গা৷ 

§ যুদ্ধের হেকমত হিসাবে পশ্চাৎ বরণ নাজায়েজ নয় যেমনঃ

. শত্রুর চাপে নিজেদের দলের পিছনের বাহিনীর যেখানে অবস্থান করছে, সেখানে পৌছার জন্য পশ্চাৎবরণ

. নিজেদের সেনাদলের অন্য কোন গ্রুপের সাথে যুক্ত হওয়ার জন্য  পরিকল্পিত পশ্চাৎবরণ

§ যুদ্ধের হেকমত হিসাবে নয়, কেবলমাত্র কাপুরুষতা ও পরাজিত মানসিকতার কারণে পশ্চাৎ বরণ হারাম কারণঃ

. এখানে উদ্দেশ্য লক্ষ্য মূখ্য নয়, প্রাণ বাঁচানো লক্ষ্য হয়ে উঠেছে

. এই ধরণের পলায়ন কবিরা গোনাহ

§ হযরত সাওবান রা. বর্ণিত হাদীসঃ

ثلاثة لا ينفع معهن عمل الشرك بالله، وعقوق الوالدين، والفرار من الزحف

নবী সা. বলেছেনঃ তিনটি জিনিসের অভাবে কোন সৎ আমলও ফলদায়ক হয় না . আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করা . পিতামাতার অবাধ্য হওয়া ও তাদের বিরুদ্ধাচরণ করা . যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়ন করা

§ রাসূল সা. যে ৭টি বড় বড় গোনাহের কথা বলেছেন, তার একটি হচ্ছে যুদ্ধে থেকে পলায়ন

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ـ رضى الله عنه عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏”‏اجْتَنِبُوا السَّبْعَ الْمُوبِقَاتِ‏”‏‏.‏ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ، وَمَا هُنَّ قَالَ الشِّرْكُ بِاللَّهِ، وَالسِّحْرُ، وَقَتْلُ النَّفْسِ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلاَّ بِالْحَقِّ، وَأَكْلُ الرِّبَا، وَأَكْلُ مَالِ الْيَتِيمِ، وَالتَّوَلِّي يَوْمَ الزَّحْفِ، وَقَذْفُ الْمُحْصَنَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ الْغَافِلاَتِ‏‏.‏

আবূ হুরায়রা (রাঃ) সূত্রে নবী সা. থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, সাতটি ধ্বংসকারী বিষয় থেকে তোমরা বিরত থাকবে। সাহাবীগন বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সেগুলো কি? তিনি বললেন, (১) আল্লাহর সঙ্গে শরীক করা। (২) যাদু (৩) আল্লাহ তাআলা যাকে হত্যা করা হারাম করেছেন, শরীয়ত সম্মত ব্যতীরেকে তাকে হত্যা করা (৪) সুদ খাওয়া (৫) ইয়াতীমের মাল গ্রাস করা (৬) রণক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাওয়া এবং (৭) সরল প্রকৃতির সতী মুমিন নারীদের অপবাদ দেওয়া।

§ প্রশ্ন হচ্ছে যুদ্ধ থেকে পলায়ন কাপুরুষোচিত কাজতাই বলে কি একে বড় গোনাহ গন্য করা হয়েছে? উত্তর হচ্ছে না বরং এর কারণ হলোঃ

o  একজন সৈনিকের ছুটাছুটি, দৌড়াদৌড়ি এবং ছত্রভংগ হয়ে পড়া পুরো বাহিনীকে ভীত করে তুলে এবং অন্যদেরকে পলায়নে উদ্বুদ্ধ করে

o  একবার যখন সেনাদলের মাঝে দৌড়াদৌড়ি পালিয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়, তখন বিপর্যয় ধ্বংস কতদূর গড়াবে, তা বলা মুশকিল

o  এই ধরণের ছুটাছুটি পলায়নপরতা শুধু সৈন্যদলের জন্য ধ্বংসাত্মক নয়, বরং দেশের জন্যও বিপর্যয়ের কারণ হয়

﴿إِلَّا مُتَحَرِّفًا لِّقِتَالٍ أَوْ مُتَحَيِّزًا إِلَىٰ فِئَةٍ فَقَدْ بَاءَ بِغَضَبٍ مِّنَ اللَّهِ وَمَأْوَاهُ جَهَنَّمُ ۖ وَبِئْسَ الْمَصِيرُ﴾ তবে হাঁ যুদ্ধের কৌশল হিসেবে এমনটি করে থাকলে অথবা অন্য কোন সেনাদলের সাথে যোগ দেবার জন্য করে থাকলে তা ভিন্ন কথা৷  

§ এই আয়াতের ব্যাখ্যার ব্যাপারে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. বর্ণিত একটি ঘটনা উল্লেখযোগ্যঃ

عن عبد الله بن عمر رضي الله عنهما قال كنت في سرية من سرايا رسول الله صلى الله عليه وسلم فحاص الناس حيصة، فكنت فيمن حاص، فقلنا كيف نصنع، وقد فررنا من الزحف، وبؤنا بالغضب؟ ثم قلنا لو دخلنا المدينة، فبتنا، ثم قلنا لو عرضنا أنفسنا على رسول الله صلى الله عليه وسلم فإن كانت لنا توبة، وإلا ذهبنا، فأتيناه قبل صلاة الغداة، فخرج فقال من القوم؟ ” فقلنا نحن الفرارون، فقال لا، بل أنتم العكارون، أنا فئتكم، وأنا فئة المسلمين ” قال فأتيناه حتى قبلنا يده.….. من حديث يزيد بن أبي زياد به، وزاد في آخره وقرأ رسول الله صلى الله عليه وسلم هذه الآية { أَوْ مُتَحَيِّزاً إِلَىٰ فِئَةٍ }

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সা. কর্তৃক প্রেরিত একটি ছোট্ট সেনাবাহিনীর একজন সৈনিক ছিলাম লোকদের মাঝে পলায়নের হিড়িক পড়ে গেলে আমিও পালিয়ে যাই তারপর অনুভব করি, আমরা যুদ্ধ হতে পলায়নকারী বিধায় আমরা আল্লাহর শাস্তির যোগ্য হয়ে পড়েছি  আমরা পরামর্শ করে ঠিক করলাম যে, আমরা মদীনায় প্রত্যাবর্তন করে নিজেদেরকে রাসুলুল্লাহ সা. এর সামনে পেশ করবো আমাদের তাওবা করা হলে ভাল, নচেত আমরা দূচোখ যে দিকে যাবে, সেদিকে চলে যাবো এবং কাউকে মুখ দেখাবো না  সে অনুযায়ী আমরা একদা ফজরের নামাযের আগে রাসূলুল্লাহ সা. এর নিকট হাজির হলাম তিনি জানতে চাইলেন, আমরা কারা? আমরা বললামঃ আমরা পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে পলায়নকারী তখন তিনি বললেনঃ না, না, বরং তোমরা নিজের কেন্দ্রস্থলে আগমনকারী  আমি তোমাদের ও তোমাদের মুমিন দলের বন্ধন আমরা একথা শুনে এগিয়ে গিয়ে রাসূল সা. এর হাত চুম্বন করলাম  রাসূল সা. সে সময় এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন

§ হযরত আবু উবাইদা রা. এর শাহাদাত ও হযরত উমর রা. এর উক্তি এবং হযরত নাফে এর কথাতে হযরত উমরের উক্তিঃ

قال عمر بن الخطاب رضي الله عنه في أبي عبيد لما قتل على الجسر بأرض فارس لكثرة الجيش من ناحية المجوس، فقال عمر لو تحيز إلي، لكنت له فئة. هكذا رواه محمد بن سيرين عن عمر. وفي رواية أبي عثمان النهدي عن عمر قال لما قتل أبو عبيد، قال عمر أيها الناس أنا فئتكم. وقال مجاهد قال عمر أنا فئة كل مسلم، وقال عبد الملك بن عمير عن عمر أيها الناس لا تغرنكم هذه الآية، فإنما كانت يوم بدر، وأنا فئة لكل مسلم،

. হযরত আবু উবাইদা রা. ইরানের একটি পুলের উপর শাহাদাত বরণ করেন তখন হযরত উমর রা. বলেনঃ তিনি চতুরতা অবলম্বন করে পারিয়ে আসতে পারতেন  আমি তার আমীর ও বন্ধন রূপে ছিলাম তিনি আমার কাছে চলে আসতেই হতো অতঃপর তিনি বললেনঃ হে লোক সকল! এ আয়াতটিকে কেন্দ্র করে তোমরা ভূল ধারণায় পতিত হয়ো না এটা এটা বদর যুদ্ধের ব্যাপারে ছিল এই সময় আমি প্রত্যেক মুসলমানের জামায়াত বা দল

حدثنا نافع أنه سأل ابن عمر، قلت إنا قوم لا نثبت عند قتال عدونا، ولا ندري من الفئة، إمامنا أو عسكرنا؟ فقال إن الفئة رسول الله صلى الله عليه وسلم فقلت إن الله يقول ﴿إِذَا لَقِيتُمُ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ زَحْفاً ﴾ الآية، فقال إنما أنزلت هذه الآية في يوم بدر، لا قبلها ولا بعدها

. হযরত নাফে রা. হযরত উমর রা. কে বলেনঃ শত্রুদের সাথে যুদ্ধের সময় আমরা যুদ্ধক্ষেত্রে অটল থাকতে পারি না আর আমাদের কেন্দ্র কোনটা তা আমরা জানিনা অর্থাৎ ইমাম আমাদের কেন্দ্র কি সেনাবাহিনীর কেন্দ্র তা আমাদের জানা নেই তখন হযরত উমর রা. বললেনঃ রাসুলুল্লাহ সা. আমাদের কেন্দ্র হযরত নাফে বলেন, আমি বললামঃ আল্লাহ পাক নাযিল করেছেনঃ إِذَا لَقِيتُمُ الَّذِينَ كَفَرُوا زَحْفًا فَلَا تُوَلُّوهُمُ الْأَدْبَارَ তখন তিনি বললেনঃ এ আয়াত বদরের দিনের ব্যাপারে নাযিল হয়েছে এটা বদরের পূর্বে বা পরবর্তী সময়ের জন্য নয়

§ ওহুদের যুদ্ধে এবং হুনাইনের যুদ্ধে এভাবে একই ধরণের ঘটনাকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা উল্লেখ করেন এই ভাবেঃ

﴿إِنَّ الَّذِينَ تَوَلَّوْا مِنكُمْ يَوْمَ الْتَقَى الْجَمْعَانِ إِنَّمَا اسْتَزَلَّهُمُ الشَّيْطَانُ بِبَعْضِ مَا كَسَبُوا ۖ وَلَقَدْ عَفَا اللَّهُ عَنْهُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ حَلِيمٌ﴾

তোমাদের মধ্য থেকে যারা মোকাবিলার দিন পৃষ্ঠ প্রদর্শন করেছিল তাদের এ পদস্খলনের কারণ এই ছিল যে, তাদের কোন কোন দুর্বলতার কারণ শয়তান তাদের পা টলিয়ে দিয়েছিল ৷ আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন ৷ আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল ও সহনশীল। (সূরা আলে ইমরানঃ ১৫৫)

﴿ثُمَّ وَلَّيْتُم مُّدْبِرِينَ﴾

এবং তোমরা পেছনে ফিরে পালিয়ে গিয়েছিলে( সূরা আত তাওবাঃ ২৫)

﴿ثُمَّ يَتُوبُ اللَّهُ مِن بَعْدِ ذَٰلِكَ عَلَىٰ مَن يَشَاءُ ۗ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ﴾

তারপর (তোমরা এও দেখছো) এভাবে শাস্তি দেবার পর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাওবার তাওফীকও দান করেন৷ আল্লাহ ক্ষমাশীল ও করুণাময়৷  ( সূরা আত তাওবাঃ ২৭)

আয়াতঃ ১৭

﴿فَلَمْ تَقْتُلُوْهُمْ وَلٰكِنَّ اللَّهَ قَتَلَهُمْ ۚ وَمَا رَمَيْتَ إِذْ رَمَيْتَ وَلٰكِنَّ اللّٰهَ رَمَىٰ ۚ وَلِيُبْلِيَ الْمُؤْمِنِينَ مِنْهُ بَلَاءً حَسَنًا ۚ إِنَّ اللّٰهَ سَمِيْعٌ عَلِيْمٌ﴾

১৭) কাজেই সত্য বলতে কি, তোমরা তাদেরকে হত্যা করনি বরং আল্লাহই তাদেরকে হত্যা করেছেন৷ আর তোমরা নিক্ষেপ করনি বরং আল্লাহ নিক্ষেপ করেছেন৷ (আর এ কাজে মুমিনদের হাত ব্যবহার করা হয়েছিল) এ জন্য যে আল্লাহ মুমিনদেরকে একটি চমৎকার পরীক্ষার মধ্য দিয়ে সফলতার সাথে পার করে দেবেন৷ অবশ্যি আল্লাহ সবকিছু শুনেনে ও জানেন৷  

﴿فَلَمْ تَقْتُلُوهُمْ وَلَٰكِنَّ اللَّهَ قَتَلَهُمْ ۚ وَمَا رَمَيْتَ إِذْ رَمَيْتَ وَلَٰكِنَّ اللَّهَ رَمَىٰ﴾ কাজেই সত্য বলতে কি, তোমরা তাদেরকে হত্যা করনি বরং আল্লাহই তাদেরকে হত্যা করেছেন৷ আর তোমরা নিক্ষেপ করনি বরং আল্লাহ নিক্ষেপ করেছেন৷ 

§ বদর যুদ্ধে মুসলমান ও কাফেরদের পরস্পর মুখোমুখি ও আঘাত পাল্টা আঘাতের সময় নবী সা. একমুঠো বালি হাতে شاهت الوجوهশত্রুদের চেহারা গুলো বিগড়ে যাকবলে কাফেরদের দিকে ছুড়ে দিলেন আর এই সময়ে কাফেরদের উপর আক্রমন করার জন্য নবী সা. ইংগিত করলে মুসলমানরা আকস্মাত আক্রমন করলো এই আয়াতে এই ঘটনার দিকে ইংগিত করা হয়েছে বলে মাওলানা মওদূদী উল্লেখ করেছেন

§ মাওলানা মওদূদী তার তাফসীরে شاهت الوجوه বলে যে শব্দাবলী উল্লেখ করেছেন, হাদীসের কিতাবে সেই শব্দাবলীর বিবরণ পাওয়া যায় হুনাইনের যুদ্ধের বর্ণনায় যেমনঃ

সহীহ আল মুসলিমঃ হাদীস নম্বর৪৪৬৮সুনানে আদ দারামীঃ হাদীস নম্বরঃ ২৪৯১মিশকাতুল মাসাবিহঃ হাদীস নম্বর৫৮৯১

§ মিশকাতুল মাসাবিহএ বর্ণিত হাদীসটি নিম্নরূপযা بَاب فِي المعجزا মুজিযার বর্ণনায় এসেছেঃ

وَعَنْ سَلَمَةَ بْنِ الْأَكْوَعِ قَالَ غَزَوْنَا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حُنَيْنًا فَوَلَّى صَحَابَةُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَلَمَّا غَشُوا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَزَلَ عَنِ الْبَغْلَةِ ثُمَّ قَبَضَ قَبْضَةً مِنْ تُرَابٍ مِنَ الْأَرْضِ ثُمَّ اسْتَقْبَلَ بِهِ وُجُوهَهُمْ فَقَالَ شَاهَتِ الْوُجُوهُ فَمَا خَلَقَ اللَّهُ مِنْهُمْ إِنْسَانًا إِلَّا مَلَأَ عَيْنَيْهِ تُرَابًا بِتِلْكَ الْقَبْضَةِ فَوَلَّوْا مُدْبِرِينَ فَهَزَمَهُمْ الله عز وَجل وَقَسْمِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ غنائمهم بَين الْمُسلمين رَوَاهُ مُسلم

সালামাহ্ ইবনু আকওয়া‘ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুনায়নের যুদ্ধে আমরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে শরীক ছিলাম। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কতিপয় সাহাবী কাফিরদের মোকাবিলা হতে যখন পলায়ন করলেন। তখন কাফিরগণ রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে চতুর্দিক হতে ঘিরে ফেলল, এমতাবস্থায় তিনি (সা.) খচ্চরের পিঠ হতে নিচে নামলেন। অতঃপর তিনি জমিন হতে এক মুষ্টি মাটি তুলে নিলেন। তারপর কাফিরদের অভিমুখে (شَاهَتِ الْوُجُوهُ) তোমাদের মুখ বিবর্ণ হোক’ এ অভিশাপ বাক্যটি উচ্চারণ করে তা নিক্ষেপ করলেন। (বর্ণনাকারী বলেন,) তাদের যে কোন লোককে আল্লাহ তাআলা সৃষ্টি করেছেন (উপস্থিত কাফিরদের) প্রত্যেকের চক্ষুদ্বয় উক্ত এক মুষ্টি মাটি দ্বারা ভর্তি হয়ে গেল। ফলে তারা ময়দান হতে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করল। এভাবে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে পরাজিত করলেন। পরে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদের হতে লব্ধ গনীমাতের সম্পদসমূহ মুসলিমদের মধ্যে বিতরণ করলেন। (মুসলিম)

§ বান্দার সকল কাজের স্রষ্টা হচ্ছেন আল্লাহ তায়ালা যখন বান্দা কোন নেক কাজ করে, তখন আল্লাহই তা নেক বানিয়ে থাকেন  অর্থাৎ সেই নেক কাজ করার ক্ষমতা আল্লাহই প্রদান করেন  নেক কাজের সাহস ও শক্তি আল্লাহ যুগিয়ে দেন  উপরে ঐ কাফিরদের তোমরা হত্যা করনি, বরং আল্লাহ হত্যা করেছেন বাক্য দ্বারা বুঝানো হচ্ছেঃ তোমাদের এমন শক্তি কি করে হতো যে, তোমরা সংখ্যায় কম হওয়া সত্ত্বেও এতো অধিক সংখ্যক শত্রুকে পারাজিত করো? মুলতঃ এই শক্তি আল্লাহই প্রদান করেছেন যেমন তিনি আলে ইমরানে উল্লেখ করেছেনঃ

﴿وَلَقَدْ نَصَرَكُمُ اللَّهُ بِبَدْرٍ وَأَنتُمْ أَذِلَّةٌ﴾

বদরের যুদ্ধে আল্লাহ তোমাদেরকে বিজয় ও সাহায্য দান করেছিলেন, অথচ তোমরা কত দূর্বল ছিলে। (সূরা আলে ইমরানঃ ১২৩)

§ যুদ্ধে জয়লাভ বা সফলতা সংখ্যাধিক্যে বা অস্রশস্ত্রের প্রাচূর্যের উপর নির্ভর করে না বরং সফলতা নির্ধারিত হয় আল্লাহর পক্ষ থেকে যেমন হুনাইনের যুদ্ধযেখানে মুসলমানদের সৈন্য সংখ্যা বেশী ছিল  কিন্তু আল্লাহ বলছেনঃ

﴿لَقَدْ نَصَرَكُمُ اللَّهُ فِي مَوَاطِنَ كَثِيرَةٍ ۙ وَيَوْمَ حُنَيْنٍ ۙ إِذْ أَعْجَبَتْكُمْ كَثْرَتُكُمْ فَلَمْ تُغْنِ عَنكُمْ شَيْئًا وَضَاقَتْ عَلَيْكُمُ الْأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ ثُمَّ وَلَّيْتُم مُّدْبِرِينَ﴾

এর আগে আল্লাহ বহু ক্ষেত্রে তোমাদের সাহায্য করছেন৷ এই তো সেদিন, হুনায়েন যুদ্ধের দিন (তাঁর সাহায্যের অভাবনীয় রূপ তোমরা দেখছো), সেদিন তোমাদের মনে তোমাদের সংখ্যাধিক্যের অহমিকা ছিল৷ কিন্তু তা তোমাদের কোন কাজে আসেনি ৷ আর এত বড় বিশাল পৃথিবীও তোমাদের জন্য সংকুচিত হয়ে গিয়েছিল এবং তোমরা পেছনে ফিরে পালিয়ে গিয়েছিলে  (সূরা আত তাওবাঃ ২৫)

§ যুদ্ধে বিজয় দানে আল্লাহর নীতি হচ্ছেঃ

﴿ كَم مِّن فِئَةٍ قَلِيلَةٍ غَلَبَتْ فِئَةً كَثِيرَةً بِإِذْنِ اللَّهِ ۗ وَاللَّهُ مَعَ الصَّابِرِينَ﴾

স্বল্প সংখ্যক লোকের একটি দল আল্লাহর হুকুমে একটি বিরাট দলের ওপর বিজয় লাভ করেছে ৷ আল্লাহ সবরকারীদের সাথি ৷ (সূরা বাকারাঃ ২৪৯) 

§  وَمَا رَمَيْتَ إِذْ رَمَيْتَ وَلَٰكِنَّ اللَّهَ رَمَىٰ বলতে এখানে উপরের এই বক্তব্যেরই উদাহরণ দেয়া হচ্ছে যে, হে নবী, যখন তুমি ধুলাবালি নিক্ষেপ করছিলে, তখন প্রকৃতপক্সে তুমি নিক্ষেপ করনি, বরং আল্লাহেই তা নিক্ষেপ করেছিলেন অর্থাৎ নিক্ষেপের কাজটা তোমার দ্বারা হয়েছে, কিন্তু কাফেরদের সকলে চোঁখের মাঝে তা আঘাত করানোর কাজটা আল্লাহর সাহায্যেই হয়েছে

﴿وَلِيُبْلِيَ الْمُؤْمِنِينَ مِنْهُ بَلَاءً حَسَنًا ۚ إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ﴾ (আর এ কাজে মুমিনদের হাত ব্যবহার করা হয়েছিল) এ জন্য যে আল্লাহ মুমিনদেরকে একটি চমৎকার পরীক্ষার মধ্য দিয়ে সফলতার সাথে পার করে দেবেন৷ অবশ্যি আল্লাহ সবকিছু শুনেনে ও জানেন৷  

§ মুমিনরা যেন আল্লাহর নিয়ামত সম্পর্কে অবহিত হয় যে, শত্রু  সংখ্যা তাদের চেয়ে বেশী হওয়ার সত্ত্বেও তিনি তাদেরকে জয়যুক্ত করলেন এবং এজন্য তারা শুকরিয়া আদায় করবে

§ হাদীসে এসেছেঃ وكل بلاء حسن أبلانا এবং আল্লাহ আমাদেরকে উত্তমরূপে পরীক্ষা করেছেন

আয়াতঃ ১৮

﴿ذٰلِكُمْ وَأَنَّ اللّٰهَ مُوْهِنُ كَيْدِ الْكَافِرِيْنَ﴾

১৮) এ ব্যাপারটি তো তোমাদের সাথে! আর কাফেরদের সাথে যে আচরণ করা হবে তা হচ্ছে আল্লাহ তাদের কৌশলগুলো দুর্বল করে দেবেন৷  

﴿ذَٰلِكُمْ وَأَنَّ اللَّهَ مُوهِنُ كَيْدِ الْكَافِرِينَ﴾ এ ব্যাপারটি তো তোমাদের সাথে! আর কাফেরদের সাথে যে আচরণ করা হবে তা হচ্ছে আল্লাহ তাদের কৌশলগুলো দুর্বল করে দেবেন৷  

§ এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে মুমিনদের জন্য সুসংবাদ যে, তিনি কাফেরদের চক্রান্তকে নস্যাত কারী বা দূর্বল প্রতিপন্নকারী

আয়াতঃ ১৯

﴿إِنْ تَسْتَفْتِحُوا فَقَدْ جَاءَكُمُ الْفَتْحُ ۖ وَإِنْ تَنْتَهُوا فَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ ۖ وَإِنْ تَعُوْدُوا نَعُدْ، وَلَن تُغْنِيَ عَنكُمْ فِئَتُكُمْ شَيْئًا وَلَوْ كَثُرَتْ وَأَنَّ اللّٰهَ مَعَ الْمُؤْمِنِيْنَ﴾

১৯) (এ কাফেরদের বলে দাও) যদি তোমরা ফায়সালা চেয়ে থাকো, তাহলে এই নাও ফায়সালা তোমাদের সামনে এসে গেছে৷ এখন যদি ক্ষান্ত হও, তাহলে তো তোমাদের জন্যই ভাল হবে৷ নয়তো যদি ফিরে আবার সেই বোকামির পুনরাবৃত্তি করো তাহলে আমিও সেই শাস্তির পুনরাবৃত্তি করবো এবং তোমাদের দলবল যত বেশীই হোক না কেন, তা তোমাদের কোন কাজে আসবে না৷ আল্লাহ অবশ্যি মুমিনদের সাথে রয়েছেন৷

﴿إِن تَسْتَفْتِحُوا فَقَدْ جَاءَكُمُ الْفَتْحُ﴾ (এ কাফেরদের বলে দাও) যদি তোমরা ফায়সালা চেয়ে থাকো, তাহলে এই নাও ফায়সালা তোমাদের সামনে এসে গেছে৷  

§ বদরের প্রান্তরের দিকে রওয়ানার সময় মুশরিকরা কাবা ঘরের গিলাফে ধরে দোয়া করেছিলঃ হে আল্লাহ! উভয় দলের মধ্যে যে দলটি ভাল তাকে বিজয় দান করো

§ ইমাম সুদ্দী রাহ. বলেনঃ মুশরিকরা বদরের যুদ্ধে রওয়ানা হওয়ার প্রাক্ষালে কাবার গেলাফ ধরে দোয়া করেঃ

اللهم انصر أعلى الجندين، وأكرم الفئتين، وخير القبيلتين

§ আবু জেহেল বলেছিলঃ হে আল্লাহ! আমাদের মধ্যে যে দলটি সত্য পথে আছে, তাকে বিজয় দান করো এবং যে দল জুলুমের পথ অবলম্বন করেছে, তাকে লাঞ্চিত করো

عن عبد الله بن ثعلبة بن صعير أن أبا جهل قال يوم بدر اللهم أينا كان أقطع للرحم، وآتانا بما لا يعرف، فأحنه الغداة، وكان ذلك استفتاحاً منه، فنزلت ﴿إِن تَسْتَفْتِحُواْ فَقَدْ جَآءَكُمُ ٱلْفَتْحُ﴾ إلى آخر الآية

আব্দুল্লাহ ইবনে ছায়লাবা ইবনে সাগির থেকে বর্ণিত।  বদরের দিন আবু জেহেল বলেছিলঃ হে আল্লাহ! যারা আমাদের থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে এবং আমাদের সামনে এমন কথা পেশ করছে যা আমাদের জানা নেই। আগামীকাল সকালে তাদেরকে আপনি তাদেরকে লাঞ্ছিত করুন। তখন এই আয়াত নাযিল হয়ঃ

﴿إِن تَسْتَفْتِحُوا فَقَدْ جَاءَكُمُ الْفَتْحُ ۖ وَإِن تَنتَهُوا فَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ ۖ وَإِن تَعُودُوا نَعُدْ وَلَن تُغْنِيَ عَنكُمْ فِئَتُكُمْ شَيْئًا وَلَوْ كَثُرَتْ وَأَنَّ اللَّهَ مَعَ الْمُؤْمِنِينَ﴾

§ সূরা আল আনফালের ৩২ নম্বর আয়াতে এর জবাব দেয়া হয়েছে এই ভাবেঃ

﴿وَإِذْ قَالُوا اللَّهُمَّ إِن كَانَ هَٰذَا هُوَ الْحَقَّ مِنْ عِندِكَ فَأَمْطِرْ عَلَيْنَا حِجَارَةً مِّنَ السَّمَاءِ أَوِ ائْتِنَا بِعَذَابٍ أَلِيمٍ﴾

আর সেই কথাও স্মরণ যোগ্য যা তারা বলেছিলঃ হে আল্লাহ! যদি এটা যথার্থই সত্য হয়ে থাকে এবং তোমার পক্ষ থেকে হয়ে থাকে তাহলে আমাদের ওপর আকাশ থেকে পাথর বর্ষণ করো অথবা কোন যন্ত্রণাদায়ক আযাব আমাদের ওপর আনো৷ 

§ আলোচনার এ পর্যায়ে দুই দলের মধ্যে কোন দলটি ভাল এবং হকপন্থী, তার মিমাংসা করা হলো

﴿وَإِن تَنتَهُوا فَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ ۖ وَإِن تَعُودُوا نَعُدْ وَلَن تُغْنِيَ عَنكُمْ فِئَتُكُمْ شَيْئًا وَلَوْ كَثُرَتْ وَأَنَّ اللَّهَ مَعَ الْمُؤْمِنِينَ﴾ এখন যদি ক্ষান্ত হও, তাহলে তো তোমাদের জন্যই ভাল হবে৷ নয়তো যদি ফিরে আবার সেই বোকামির পুনরাবৃত্তি করো তাহলে আমিও সেই শাস্তির পুনরাবৃত্তি করবো এবং তোমাদের দলবল যত বেশীই হোক না কেন, তা তোমাদের কোন কাজে আসবে না৷ আল্লাহ অবশ্যি মুমিনদের সাথে রয়েছেন৷  

§ কাফেরদের উদ্দেশ্যে বলা হচ্ছেঃ যদি তারা মুসলমানদের ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকে, তাহলে তা তাদের জন্য কল্যাণকর আর যদি আবার এমন কাজ করে, তাহলে তাদেরকে আবার শাস্তি প্রদান করা হবে আর তখন তাদের দল যত বড়ই হোক না কেন

§ সূরা বনি ইসরাইলে বলা হয়েছেঃ

﴿عَسَىٰ رَبُّكُمْ أَن يَرْحَمَكُمْ ۚ وَإِنْ عُدتُّمْ عُدْنَا ۘ وَجَعَلْنَا جَهَنَّمَ لِلْكَافِرِينَ حَصِيرًا﴾

এখন তোমাদের রব তোমাদের প্রতি করুণা করতে পারেন৷ কিন্তু যদি তোমরা আবার নিজেদের আগের আচরণের পুনরাবৃত্তি করো তাহলে আমিও আবার আমার শাস্তির পুনরাবৃত্তি করবো৷ আর নিয়ামত অস্বীকারকারীদের জন্য আমি জাহান্নামকে কয়েদখানা বানিয়ে রেখেছি৷ (আয়াতঃ ৮)

 

 

লেখাটি আপনার ভাল লাগলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.