দারসুল কুরআন – সূরা আল আনফাল – আয়াত ২০-২৮

দারসুল কুরআন – সূরা আল আনফাল – আয়াত ২০-২৮

তেলাওয়াত ও অনুবাদঃ

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَا تَوَلَّوْا عَنْهُ وَأَنتُمْ تَسْمَعُونَ﴾

২০) হে ঈমানদারগণ! আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করো এবং হুকুম শোনার পর তা অমান্য করো না৷

﴿وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ قَالُوا سَمِعْنَا وَهُمْ لَا يَسْمَعُونَ﴾

২১) তাদের মতো হয়ে যেয়ো না, যারা বললো, আমরা শুনেছি অথচ তারা শোনে না৷  

﴿إِنَّ شَرَّ الدَّوَابِّ عِندَ اللَّهِ الصُّمُّ الْبُكْمُ الَّذِينَ لَا يَعْقِلُونَ﴾

২২) অবশ্যি আল্লাহর কাছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ধরনের জানোয়ার হচ্ছে সেই সব বধির ও বোবা লোক যারা -বিবেক বুদ্ধি কাজে লাগায় না৷  

﴿وَلَوْ عَلِمَ اللَّهُ فِيهِمْ خَيْرًا لَّأَسْمَعَهُمْ ۖ وَلَوْ أَسْمَعَهُمْ لَتَوَلَّوا وَّهُم مُّعْرِضُونَ﴾

২৩) যদি আল্লাহ জানতেন এদের মধ্যে সামান্য পরিমানও কল্যাণ আছে তাহলে নিশ্চয়ই তিনি তাদেরকে শুনতে উদ্ধুদ্ধ করতেন৷ (কিন্তু কল্যাণ ছাড়া) যদি তিনি তাদের শুনাতেন তাহলে তারা নির্লিপ্ততার সাথে মুখ ফিরিয়ে নিতো৷  

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَجِيبُوا لِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ إِذَا دَعَاكُمْ لِمَا يُحْيِيكُمْ ۖ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ يَحُولُ بَيْنَ الْمَرْءِ وَقَلْبِهِ وَأَنَّهُ إِلَيْهِ تُحْشَرُونَ﴾

২৪) হে ঈমানদারগণ! আল্লাহ ও তাঁর রসূলের ডাকে সাড়া দাও, যখন রসূল তোমাদের এমন জিনিসের দিকে ডাকেন যা জীবন দান করবে৷ আর জেনে রাখো আল্লাহ মানুষ ও তার দিলের মাঝখানে আড়াল হয়ে আছেন এবং তোমাদের তাঁর দিকেই সমবেত করা হবে৷  

﴿وَاتَّقُوا فِتْنَةً لَّا تُصِيبَنَّ الَّذِينَ ظَلَمُوا مِنكُمْ خَاصَّةً ۖ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ﴾

২৫) আর সেই ফিতনা থেকে দূরে থাকো, যার অনিষ্টকারিতা শুধুমাত্র তোমাদের গোনাহগারদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না৷ জেনে রাখো, আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা৷  

﴿وَاذْكُرُوا إِذْ أَنتُمْ قَلِيلٌ مُّسْتَضْعَفُونَ فِي الْأَرْضِ تَخَافُونَ أَن يَتَخَطَّفَكُمُ النَّاسُ فَآوَاكُمْ وَأَيَّدَكُم بِنَصْرِهِ وَرَزَقَكُم مِّنَ الطَّيِّبَاتِ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ﴾

২৬) স্মরণ করো সেই সময়ের কথা যখন তোমরা ছিলে সামান্য কয়েকজন৷ পৃথিবীর বুকে তোমাদের দুর্বল মনে করা হতো৷ লোকেরা তোমাদের খতম করেই দেয় নাকি, এ ভয়ে তোমরা কাঁপতে৷ তারপর আল্লাহ তোমাদের আশ্রয়স্থল যোগার করে দিলেন, নিজের সাহায্য দিয়ে তোমাদের শক্তিশালী করলেন এবং তোমাদের ভাল ও পবিত্র জীবিকা দান করলেন, হয়তো তোমরা শোকরগুজার হবে৷ 

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَخُونُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ وَتَخُونُوا أَمَانَاتِكُمْ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ﴾

২৭) হে ঈমানদরগণ! জেনে বুঝে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করো না, নিজেদের আমানতসমূহের খেয়ানত করো না৷  

﴿وَاعْلَمُوا أَنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ وَأَنَّ اللَّهَ عِندَهُ أَجْرٌ عَظِيمٌ﴾

২৮) এবং জেনে রেখো, তোমাদের অর্থ-সম্পদ ও তোমাদের সন্তান-সন্তুতি আসলে পরীক্ষার সামগ্রী৷ আর আল্লাহর কাছে প্রতিদান দেবার জন্য অনেক কিছুই আছে৷  

 

 

ব্যাখ্যাঃ

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَا تَوَلَّوْا عَنْهُ وَأَنتُمْ تَسْمَعُونَ﴾

২০) হে যারা ঈমান এনেছো! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো এবং তা থেকে মুখ ফিরিয়ো না।

§ ﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ﴾ হে ঈমানদারগন! আনুগত্য করো আল্লাহর এবং তার রাসূলের।

   এখানে মুমিনদেরকে আল্লাহ ও তার রাসূলের আনুগত্যে করার নির্দেশ দেয়া হচ্ছে

§ ﴿وَلَا تَوَلَّوْا عَنْهُ وَأَنتُمْ تَسْمَعُونَ﴾ আর তোমরা আনুগত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও নাএমন অবস্থায় যে তোমরা হুকুম শুনেছো। অর্থাৎ যখন কোন হুকুম প্রদান করা হবে, তখন হুকুম শুনার পর তার আনুগত্য করো।

   একই সাথে বিরোধীতা করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ প্রদান করা হচ্ছে।

   তাফসীরে মাআরিফুল কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছেঃ

o  শোনার ফল হলো সেমত আমল বা কাজ করা। বিধায়, যে শোনার সাথে কাজের সমন্বয় হয়না, তো কোন কোন করণে বিশ্বাস ও ভক্তি সহকারে না শোনার তুল্য হয়ে যায়-আর এমন কাজটাকে সকলেই নিন্দনীয় গন্য করে।

o  শোনার চারটি স্তর বা পর্যায় রয়েছেঃ

১. কোন কথা কানে নিল সত্য, কিন্তু না বুঝতে চেষ্টা করলে, না বুঝল এবং নাই-বা তাতে বিশ্বাস স্থাপন করলো, আর না সেমতে আমল করলো।

২. কানে শুনল এবং তা বুঝলও, কিন্তু না করল তাকে বিশ্বাস, না করল তাতে আমল।

৩. শুনল, বুঝল এবং বিশ্বাসও করল, কিন্তু তাতে আমল করল না

৪. শুনল, বুঝল, বিশ্বাস করল এবং সেমতে আমলও করল।

শোনার প্রকৃত উদ্দেশ্য সর্বশেষ উল্লেখিত পর্যায়ে অর্জিত হয়-যা পরিপূর্ণ মুমিনের স্তর। আর প্রথম তিনটিকে না শোনাই বলা যায়।

§ আল্লাহর আনুগত্য রাসূল সা. এর আনুগত্যের পাশাপাশি আরেকটি আনুগত্য রয়েছে, যা ইসলামী শরীয়ায় ফরয গন্য করা হয়েছে। আর তা হলোঃ দায়িত্বশীলের আনুগত্য।

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ ۖ فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ۚ ذَٰلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا﴾

হে ঈমানগারগণ! আনুগত্য করো আল্লাহর এবং আনুগত্য করো রসূলের আর সেই সব লোকের যারা তোমাদের মধ্যে দায়িত্ব ও ক্ষমতার অধিকারী৷ (আন-নিসাঃ ৫৯)

   শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী রাহি. তার ইসলামী আন্দোলন ও সংগঠন বইতে নেতৃত্বের আনুগত্যের বিষয়টি ইসলামী রাষ্টের রাষ্ট্রপ্রধানের বিকল্প এবং নায়েবে রাসূলের মর্যাদার অধিকারী বলে উল্লেখ করেছেন।

   রাসূল সা. এর যামানায় রাসুল সরাসরি যে কাজে যুক্ত ছিলেন না, তাতে যাদেরকে দায়িত্ব প্রদান করেছিলেন, তাদের মধ্য থেকে একজনকে আমীর নিযুক্ত করেছেন এবং বলেছেনঃ

عن أبي هريرة < أن رسول الله ﷺ قال: من أطاعني فقد أطاع الله، ومن عصاني فقد عصى الله، ومن يطع الأمير فقد أطاعني، ومن يعص الأمير فقد عصاني .

আবু হুরায়রা রা. রাসূল সা. থেকে বর্ণনা করেন। রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেনঃ যে আমার আনুগত্য করলোসে প্রকৃত পক্ষে আল্লাহর আনুগত্য করলো এবং যে আমার নাফরমানী করলোসে প্রকৃত পক্ষে আল্লাহর নাফরমানী করলো। আর যে আমীরের আনুগত্য করলোসে প্রকৃতপক্ষে আমার আনুগত্য করলোআর যে আমীরের নাফরমানী করলোসে প্রকৃত পক্ষে আমার নাফরমানী করলো। (মুসলিম)

   আল্লামা নঈম সিদ্দিকী রাহি. তার চরিত্র গঠনের মৌলিক উপাদান বইয়ে আনুগত্য বিষয়টাকে একটি প্যাকেজ আঁকারে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেনঃ

. আদেশ ও আনুগত্যের ভারসাম্য সংগঠনের মেরুদন্ড।

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ <  قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ  عَلَيْكَ السَّمْعَ وَالطَّاعَةَ فِي عُسْرِكَ وَيُسْرِكَ وَمَنْشَطِكَ وَمَكْرَهِكَ وَأَثَرَةٍ عَلَيْكَ‏.‏

আবূ হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেনঃ তুমি অবশ্যই আমীরের কথা শুনবে এবং মানবেতোমার সংকট কালে ও সাচ্ছন্দ্যের সময়, অনুরাগ ও বিরাগে এবং যখন তোমার উপর অন্যকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে তখনও।

. আনুগত্য হবে কেবলমাত্র সৎকাজের বেলায়।

﴿وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۖ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ﴾

নেকী ও আল্লাহভীতির সমস্ত কাজে সবার সাথে সহযোগীতা করো এবং গুনাহ ও সীমালংঘনের কাজে কাউকে সহযোগীতা করো না৷ আল্লাহকে ভয় করো৷ তাঁর শাস্তি বড়ই কঠোর৷  (আলমায়িদাহঃ ২)  

عَنِ ابْنِ عُمَرَ < عَنِ النَّبِيِّ ﷺ أَنَّهُ قَالَ : عَلَى الْمَرْءِ الْمُسْلِمِ السَّمْعُ وَالطَّاعَةُ فِيمَا أَحَبَّ وَكَرِهَ إِلاَّ أَنْ يُؤْمَرَ بِمَعْصِيَةٍ فَإِنْ أُمِرَ بِمَعْصِيَةٍ فَلاَ سَمْعَ وَلاَ طَاعَةَ‏.‏

ইবনু উমার রা. এর সুত্রে নবী সা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, মুসলিম ব্যক্তির অবশ্য পালনীয় কর্তব্য হচ্ছে তার প্রতিটি প্রিয় ও অপ্রিয় ব্যাপারে আনুগত্য করা যতক্ষণ না তাকে আল্লাহর অবাধ্যতার আদেশ করা হয়। যদি আল্লাহর অবাধ্যতার আদেশ করা হয় তাতে আনুগত্য নেই।

. ব্যক্তির পরিবর্তনের কারণে আনুগত্য ব্যবস্থার কোন পরিবর্তন হবে না।

عَنْ أَبِي ذَرٍّ <  قَالَ إِنَّ خَلِيلِي أَوْصَانِي أَنْ أَسْمَعَ وَأُطِيعَ وَإِنْ كَانَ عَبْدًا مُجَدَّعَ الأَطْرَافِ ‏.‏

আবূ যার রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার পরম বন্ধু রাসুলুল্লাহ সা. আমাকে উপদেশ দিয়েছেনঃ আমি যেন (আমীরের নির্দেশ) শুনি ও মানি যদি আমীর হাত পা কাটা গোলামও হয়।

মুহাম্মাদ ইবনু বাশশার রাহি. বর্ণিত রেওয়ায়েতে রয়েছেঃ عَبْدًا حَبَشِيًّا مُجَدَّعَ الأَطْرَافِ “হাত-পা কাটা কাফরী গোলামও যদি আমীর হয়।”

আবু ইমরান সুত্রে উক্ত সনদে বর্ণিত হাদীসে আছেঃ عَبْدًا مُجَدَّعَ الأَطْرَافِ “হাত পা কাটা গোলাম”।

عَنْ يَحْيَى بْنِ حُصَيْنٍ < قَالَ سَمِعْتُ جَدَّتِي، تُحَدِّثُ أَنَّهَا سَمِعَتِ النَّبِيَّ ﷺ يَخْطُبُ فِي حَجَّةِ الْوَدَاعِ وَهُوَ يَقُولُ: وَلَوِ اسْتُعْمِلَ عَلَيْكُمْ عَبْدٌ يَقُودُكُمْ بِكِتَابِ اللَّهِ فَاسْمَعُوا لَهُ وَأَطِيعُوا‏.‏

ইয়াহইয়া ইবনু হুসায়ন রাহি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আমার দাদী থেকে শুনেছি, তিনি নবী সা. এর বিদায় হজ্জের ভাষণদানকালে তাকে বলতে শুনেছেনঃ “যদি তোমাদের উপর একজন গোলামকেও কর্মকর্তা নিযুক্ত করা হয় আর সে তোমাদেরকে আল্লাহর কিতাব অনুসারে পরিচালনা করে, তবে তোমরা তার কথা শুনবে এবং মানবে”।

শুবা রাহি.থেকে বর্ণিত রেওয়ায়েতেعَبْدًا حَبَشِيًّا  “কাফ্রী গোলাম” শব্দটি আছে।

আবূ বকর ইবনু আবূ শায়বার বর্ণনায় আছে عَبْدًا حَبَشِيًّا مُجَدَّعًا  “হাত পা কাটা হাবশী গোলাম”।

﴿وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ قَالُوا سَمِعْنَا وَهُمْ لَا يَسْمَعُونَ﴾

২১) আর তোমরা তাদের মতো হয়ো না যারা বলেআমরা শুনেছি, অথচ তারা শুনছে না।

§ ﴿لَا يَسْمَعُونَ﴾ মানেঃ তারা শোনে না।

   এই শোনা মানে কান দিয়ে শোনা নয়, বরং মেনে নেয়া বা গ্রহণ করা বুঝাচ্ছে।

   এখানে সে সব মুনাফিকদের দিকে ইংগিত করা হচ্ছে, যারা আল্লাহর হুকুম মেনে চলতো না, আল্লাহর আনুগত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতো।

   অর্থাৎ তোমরা সেই সব মুনাফিকদের মতো হয়োনা,  যারা শোনার দাবী করে বটে, কিন্তু বিশ্বাস করে বলে দাবী করে না।

﴿إِنَّ شَرَّ الدَّوَابِّ عِندَ اللَّهِ الصُّمُّ الْبُكْمُ الَّذِينَ لَا يَعْقِلُونَ﴾

২২) আল্লাহর কাছে সেই বধির ও বোবা অবশ্যই নিকৃষ্টতম প্রাণী, যারা বোঝার শক্তি রাখে না।

§ ﴿إِنَّ شَرَّ الدَّوَابِّ عِندَ اللَّهِ﴾ অবশ্যি আল্লাহর কাছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ধরনের জানোয়ার হচ্ছে

   الدواب  শব্দটি  دابة এর বহুবচন। যার অর্থঃ যমীনে বিচরণকারী প্রতিটি বস্তু। প্রচলিত পরিভাষায় চারপা বিশিষ্ট জানোয়ারকে বলা دابة হয় ।

   সূরা ত্বীনে মানুষের সৃষ্টি সম্পর্কে আল্লাহ বলছেনঃ

﴿لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ فِي أَحْسَنِ تَقْوِيمٍ﴾﴿ثُمَّ رَدَدْنَاهُ أَسْفَلَ سَافِلِينَ﴾

৪) আমি মানুষকে পয়দা করেছি সর্বোত্তম কাঠামোয়। ৫) তারপর তাকে উল্টো ফিরিয়ে নীচতমদেরও নীচে পৌঁছিয়ে দিয়েছি

o  মানুষ তার ইস্পিত মর্যাদা হারায় তার আচরণে। আর হৃদয় দিয়ে উপলব্দি করে না শোনা তেমনি একটি আমলযা মর্যাদা হারানোর কারণ হয়।

   তাফসীর রুহুল বায়ানএ বলা হয়েছেঃ

o  মানুষ সৃষ্টির দিক দিয়ে সমস্ত সৃষ্টি থেকে শ্রেষ্ট। কিন্তু ফেরেশতাদের নিচে।

o  সেই মানুষ তার আমল, অধ্যাবসায়, হকের আনুগত্য ইত্যাদিতে যখন এগিয়ে যায়, তখন ফেরেশতাদের চেয়ে উত্তম ও শ্রেষ্ট হয়ে যায়।

o  সেই মানুষ যখন হকের আনুগত্য করা থেকে বিমুখ হয়, তখন জানোয়ারের চেয়েও অদম হয়ে যায়।

o  আদমকে সেজদা করার জন্য আল্লাহ ফেরেশতাদের তখনই নির্দেশ দিয়েছেন, যখন সে জ্ঞানী এটা প্রমাণ করার জন্য সকল কিছুর নাম বলে দিয়েছে।

§ ﴿الصُّمُّ الْبُكْمُ﴾ বধির ও বোকা।

   যারা সত্য কথা শোনে না। যারা সত্য কথা বলে না।  যাদের কান এবং মুখ সত্য বলা বা শোনার ব্যাপারে বধির ও বোবা। 

   এখানে সেই সব আদম সন্তানদের কথা বলা হচ্ছে, যাদের তুলনা করা হচ্ছে নিকৃষ্টতম জানোয়ারের সাথেযারা সত্য কথা বলার ব্যাপারে মুক, আর সত্য শোনার ব্যাপারে বধির।

   এরা কারা? এরা কাফের।  চার পায়ের জন্তু তাদের মুখ আছে, কানও আছে, কিন্তু তারা কথা বলতে পারে না, শুনতেও পারেনাওরা ঠিক তাদের মতো।

   সূরা আল বাকারাতে এই ধরণের লোকদের ব্যাপারে বলা হয়েছেঃ

﴿وَمَثَلُ الَّذِينَ كَفَرُوا كَمَثَلِ الَّذِي يَنْعِقُ بِمَا لَا يَسْمَعُ إِلَّا دُعَاءً وَنِدَاءً ۚ صُمٌّ بُكْمٌ عُمْيٌ فَهُمْ لَا يَعْقِلُونَ﴾

১৭১) আল্লাহ প্রদর্শিত পথে চলতে যারা অস্বীকার করেছে তাদের অবস্থা ঠিক তেমনি যেমন রাখাল তার পশুদের ডাকতে থাকে কিন্তু হাঁক ডাকের আওয়াজ ছাড়া আর কিছুই তাদের কানে পৌছে না৷তারা কালা, বোবা ও অন্ধ, তাই কিছুই বুঝতে পারে না ৷  

﴿أُولَٰئِكَ كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ ۚ أُولَٰئِكَ هُمُ الْغَافِلُونَ﴾

১৭৯) তারা পশুর মত বরং তাদের চাইতেও অধম৷ তারা চরম গাফলতির মধ্যে হারিয়ে গেছে৷  

   এটা কারা, কোন কাফেরেরা?

. কুরাইশের বনু আবদিদ দারএর লোকজনএই মত ইবনে আব্বাস ও মুজাহিদের।

. মুনাফিকদের বুঝানো হয়েছে। তবে মুনাফিক ও মুশরিকদের মাঝে কোন পার্থক্য নাই। কারণ দুই পক্ষই জ্ঞান বিবেকহীনএই মত মুহাম্মদ বিন ইসহাকের।

   তাফসীরে জালালাইনে বলা হয়েছেঃ

o  এই আয়াতের অর্থ দাড়ায়ঃ আল্লাহর নিকট সে সমস্ত লোক সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট ও চতুষ্পদ জীবতুল্য, যারা সত্য ও ন্যায়ের শ্রবণের ব্যাপারে বধির এবং তা গ্রহণ করার ব্যাপারে মুক। যারা মুক ও বধির, তাদের সামান্য বুদ্ধি থাকলেও তারা ইশারাইংগিতে নিজেদের মনের কথা ব্যক্ত করে এবং অন্যের কথা উপলব্দি করে। কিন্তু এরা মুক ও বধির হওয়ার সাথে সাথে বির্বোধও বটে।  আর যে মুক ও বধির হয় বুদ্ধি বিজর্জিত, তাকে বুঝাবার কোন পথ থাকে না।

﴿وَلَوْ عَلِمَ اللَّهُ فِيهِمْ خَيْرًا لَّأَسْمَعَهُمْ ۖ وَلَوْ أَسْمَعَهُمْ لَتَوَلَّوا وَّهُم مُّعْرِضُونَ﴾

২৩) আর আল্লাহ যদি জানতেন-তাদের মধ্যে কোন ভাল কিছু আছে, তবে অবশ্যই তাদেরকে শোনাতেন, আর যদি তাদের শোনার শক্তি দিতেন তারা উপেক্ষাকারী হিসেবে মুখ ফিরিয়ে নিতো।

§ ﴿وَلَوْ عَلِمَ اللَّهُ فِيهِمْ خَيْرًا لَّأَسْمَعَهُمْ﴾ যদি আল্লাহ জানতেন এদের মধ্যে সামান্য পরিমাণও কল্যাণ আছে, তাহলে নিশ্চয়ই তিনি তাদেরকে শুনতে উদ্ধুদ্ধ করতেন৷

   মুফতি তাকী উসমানী তার তাফসীর তাওযীহুল কুরআনে উল্লেখ করেছেনঃ কল্যাণ মানে এখানে সত্যের অনুসন্ধিৎসা বুঝানো হয়েছে। যাদের দিলের মধ্যে সত্যের প্রতি অনুসন্ধিৎসা আছে, কেবল তাদেরকেই আল্লাহ সত্য বোঝার ও মানার তাওফীক দান করেন।

§ ﴿لَتَوَلَّوا وَّهُم مُّعْرِضُونَ﴾ তাহলে তারা নির্লিপ্ততার সাথে মুখ ফিরিয়ে নিতো।

   যেহেতু তাদের মাঝে সত্যের প্রতি ভালবাসা নেই, তাদের মাঝে সত্যের জন্য কাজ করার আবেগ বা প্রেরণা নেই।  এমন অবস্থায় যদি তাদেরকে আল্লাহর আদেশ পালন করার জন্য যুদ্ধে যাওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করা হতো, তাহলে পরিশেষে দেখা যেতো যে তারা যখন দেখতো বিপদ এসে গেছে, তখন তারা পালিয়ে যেতো।

   আর তারা যদি তখন পালিয়ে যেতো, তাহলে তা যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারী মুমিনদের জন্য কল্যাণের পরিবর্তে ক্ষতির কারণ হতো।

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَجِيبُوا لِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ إِذَا دَعَاكُمْ لِمَا يُحْيِيكُمْ ۖ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ يَحُولُ بَيْنَ الْمَرْءِ وَقَلْبِهِ وَأَنَّهُ إِلَيْهِ تُحْشَرُونَ﴾

২৪) হে ঈমানদারগন! তোমরা সাড়া দেবে আল্লাহর ডাকে এবং রাসূলের ডাকে যখন তিনি তোমাদেরকে এমন কিছুর প্রতি ডাকেন যা তোমাদেরকে সজীব করে, আর তোমরা জেনে রেখো! নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষ ও তার অন্তরের মাঝে আড়াল হয়ে থাকেন এবং তোমাদেরকে অবশ্যই তার নিকট সমবেত করা হবে।

§ ﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَجِيبُوا لِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ إِذَا دَعَاكُمْ لِمَا يُحْيِيكُمْ﴾ হে ঈমানদারগণ! আল্লাহ ও তাঁর রসূলের ডাকে সাড়া দাও, যখন রসূল তোমাদের এমন জিনিসের দিকে ডাকেন যা জীবন দান করবে৷

عن أبي سعيد بن المعلى < قال كنت أصلي، فمر بي النبي ﷺ فدعاني فلم آته حتى صليت، ثم أتيته، فقال ما منعك أن تأتيني؟ ألم يقل الله ﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَجِيبُوا لِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ إِذَا دَعَاكُمْ لِمَا يُحْيِيكُمْ﴾ ثم قال: لأعلمنك أعظم سورة في القرآن قبل أن أخرج .فذهب رسول الله صلى الله عليه وسلم ليخرج، فذكرت له.

আবু সাঈদ ইবনুল মায়াল্লা বলেন, একদিন আমি নামায পড়ছিলাম। এমতাবস্থায় নবী সা. আমার নিকট দিয়ে গমন করলেন। তিনি আমাকে ডাক দেন, কিন্তু আমি নামাযে থাকায় সাথে সাথে উপস্থিত হতে পারলাম না।  নামায শেষ করে তার কাছে উপস্থিত হলাম। তিনি বললেনঃ তুমি এতক্ষেণ কেন আসনি? আল্লাহ কি বলেননিঃ ﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَجِيبُوا لِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ إِذَا دَعَاكُمْ لِمَا يُحْيِيكُمْ﴾ অতঃপর তিনি বললেনঃ আমি বের হওয়ার আগে অবশ্যই তোমাকে কুরআনের একটি মহাসম্মানিত সূরা শিখাবো।  এরপর রাসূল সা. যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলে আমি তাকে স্মরণ করে দিলাম।

   এ হাদীস থেকে আমরা জানলামঃ রাসূল সা. এর নির্দেশ পালনে দেরী করা যাবে না।

   ফকীহগন এই হাদীস থেকে মাসআলা বের করেন যে,

ক. রাসূল সা. এর নির্দেশ পালন করতে নামাযের মধ্যে যদি কোন কাজ করা হয়, তাহলে নামায নষ্ট হবে না।

খ. রাসূলের নির্দেশ আসলে নামায ভেঙে ফেলে প্রথমে রাসূলের নির্দেশ পালন করবেন, তারপর নামায পড়বেন।

গ. এমন কাজ যা করতে বিলম্ব হলে কঠিন ক্ষতির আশংকা থাকে, এমন কাজে নামায ছেড়ে দেয়া এবং পরে নামায কাজা করা। যেমনঃ অন্ধ ব্যক্তি কুপে পড়ে যাচ্ছে বা সাপ এসে দংশন করতে পারে।

§ ﴿لِمَا يُحْيِيكُمْ﴾ যা জীবন দান করবে৷

   যা জীবন দান করবেঃ এটা কি? এ ব্যাপারে তাফসীর কারণ একাধিক মত প্রকাশ করেনঃ

১. আল্লামা সুদ্দী রাহি. বলেনঃ এটা ঈমান। কারণ কাফিররা হলো মৃত।

. কাতাদাহ রাহি. বলেনঃ এটি কুরআনযাতে দুনিয়া ও আখেরাতের জীবন এবং এর কল্যাণ আলোচিত হয়েছে।

. মুজাহিদ রাহি. এর মতেঃ এটি হলো হক বা সত্য।

. ইবনে ইসহাক রাহি. বলেনঃ এটি হলো জিহাদ, যার মাধ্যমে আল্লাহ মুসলমানদের সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি করে সম্মানজনক জীবন দান করেন।

. মাআরিফুল করআনে বলা হয়েছেঃ ঈমান, কুরআন, সত্যের প্রতি আনুগত্য এর সবই সঠিক। কেননা এর মাধ্যমে মানুষের আত্মা সঞ্জীবিত হয়।

   তাওযীহুল কুরআনে বলা হয়েছেঃ মানুষের প্রকৃত জীবন হলো আখেরাতের জীবন এবং সে জীবন অনন্ত জীবন। সাধরণ ভাবে দুনিয়ার ক্ষুদ্র জীবনকে দীর্ঘ করার জন্য মানুষ কঠিন অপারেশন করতে রাজী হয়ে যায়। তাহলে আখেরাতের অনন্ত জীবনের জন্য শ্রম ত্যাগ হাসিমুখে মেনে নিতে সমস্যা কোথায়? যদি কেউ সেই ত্যাগ করতে পারে, তাহলে অনন্ত জীবনে স্বাচ্ছন্দ ও সুখী জীবনের অধিকারী হবে।

§ ﴿وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ يَحُولُ بَيْنَ الْمَرْءِ وَقَلْبِهِ وَأَنَّهُ إِلَيْهِ تُحْشَرُونَ﴾ আর জেনে রাখো আল্লাহ মানুষ ও তার দিলের মাঝখানে আড়াল হয়ে আছেন এবং তোমাদের তাঁর দিকেই সমবেত করা হবে৷

   মানুষকে মুনাফেকী আচরণ থেকে বাঁচাতে হলে প্রভাবশালী পদ্ধতি হলো তাদের মধ্যে দুইটি বিশ্বাস ঢেলে দেয়া।  আর মানুষের মনে এই দুইটি বিশ্বাস যত বেশী শক্তিশালী হবে, মানুষ ততই মুনাফিক আচরণ থেকে দূরে থাকবে।  মুনাফিকী আচরণের বিরুদ্ধে নসিহত করতে কুরআনে এই দুইটি বিশ্বাসের কথা বলা হয়েছে। আর সেই বিশ্বাস গুলো হলোঃ

. যাবতীয় কাজ সেই আল্লাহর সাথে জড়িত, যিনি মনের অবস্থাও জানেন। বিধায় মানুষ মনের মাঝে কি কি ইচ্ছা, আশা, আকাংখা, উদ্দেশ্য, লক্ষ্য ও চিন্তাভাবনা লুকিয়ে রেখেছে, তা আল্লাহর কাছে দিনের আলোর মতো পরিস্কার।

. একদিন আল্লাহর সামনে হাজির হতেই হবে। তার হাত থেকে বাঁচার কোন সুযোগ নাই।

قال ابن عباس< يحول بين المؤمن وبين الكفر، وبين الكافر وبين الإيمان.

ইবনে আব্বাস বলেন যে, তিনি আড়াল হয়ে আছেন মুমিন ও কুফরীর মাঝে এবং কাফির ও ঈমানের মাঝে। মুমিনকে তিনি কুফরী করতে দেন না এবং কাফিরদেরকে ঈমান আনতে দেন না।

   সুদ্দী রাহ. বলেনঃ

এর অর্থ হলোঃ কেউই এই ক্ষমতা রাখে না যে, তাঁর অনুমতি ছাড়া ঈমান আনে বা কুফরী করে।

   কাতাদাহ রাহ. বলেনঃ

এই আয়াতটি সূরা ক্বাফএর ১৬ নম্বর আয়াতঃ ﴿وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ﴾ (আমি তার ঘাড়ের রগের চেয়েও তার বেশী কাছে আছি) এর মতো।

عن أنس بن مالك < قال كان النبي ﷺ يكثر أن يقول:يا مقلب القلوب ثبت قلبي على دينك. قال فقلنا يا رسول الله آمنا بك، وبما جئت به، فهل تخاف علينا؟ قال:نعم، إن القلوب بين إصبعين من أصابع الله تعالى يقلبها.

আনাস ইবনে মালিক রা. হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সা. বেশী বেশী বলতেনঃيا مقلب القلوب ثبت قلبي على دينكহে অন্তরকে পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন।” (আনাস রা. বলেন) আমরা তখন বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল সা.! আমরা আপনার উপর এবং কুরআনের উপর ঈমান এনেছি। আমাদের ব্যাপারে আপনার কোন সন্দেহ রয়েছে কি?” তিন উত্তরে বলেনঃ হ্যাঁ! কেননা এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই যে, তোমাদের পরিবর্তন ঘটে যাবে। কারণ, মানুষের অন্তর আল্লাহর দূঅঙ্গুলির মাঝে রয়েছে। তিনি যখন ইচ্ছা করবেন তখন বদলিয়ে দেবেন।

عن النواس بن سمعان الكلابي < يقول سمعت النبي ﷺ يقول:ما من قلب إلا وهو بين أصبعين من أصابع الرحمن رب العالمين، إذا شاء أن يقيمه أقامه، وإذا شاء أن يزيغه أزاغهز وكان يقول: يا مقلب القلوب ثبت قلبي على دينك. قال :والميزان بيد الرحمن يخفضه ويرفعه.

আন-নাওয়াস ইবনে সামআন আল-কালাবী রা. হতে বর্ণিত বলেন, রাসূল সা.কে বলতে শুনেছিঃ প্রত্যেক অন্তর আল্লাহর দূটি আঙ্গুলির মধ্যভাগে রয়েছে। আল্লাহ যখন এটাকে সোজা রাখার ইচ্ছা করেন, তখন তা সোজা থাকে আর যখন বাঁকা করে দেয়ার ইচ্ছা করেন কথন তা বাঁকা হয়ে যায়। অতঃপর তিনি বলেনঃ মিজান আল্লাহর হাতে রয়েছে। ইচ্ছা করলে তিনি একে হালকা করে দেবেন এবং ইচ্ছা করলে ভারী করবেন।” (নাসাীয় ও ইবনে মাযাহ)

أم سلمة < تحدث أن رسول الله ﷺ كان يكثر في دعائه يقول: اللهم مقلب القلوب ثبت قلبي على دينك. قالت فقلت يا رسول الله أوَإِنَّ القلوب لتقلب؟ قال نعم، ما خلق الله من بشر من بني آدم، إلا أن قلبه بين أصبعين من أصابع الله عز وجل، فإن شاء أقامه، وإن شاء أزاغه فنسأل الله ربنا أن لا يزيغ قلوبنا بعد إذ هدانا، ونسأله أن يهب لنا من لدنه رحمة إنه هو الوهابقالت فقلت يا رسول الله ألا تعلمني دعوة أدعو بها لنفسي؟ قال بلى، قولي اللهم رب النبي محمد اغفر لي ذنبي، وأذهب غيظ قلبي، وأجرني من مضلات الفتن ما أحييتني

উম্মে সালমা রা. বলেনঃ আল্লাহর রাসূল সা. বেশী বেশী করে এই দোয়া পড়তেনঃ اللهم مقلب القلوب ثبت قلبي على دينك আমি জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! অন্তর কি পরিবর্তিত হয়?” উত্তরে তিনি বললেনঃ হ্যাঁ! আল্লাহ ইচ্ছা করলে মানুষের অন্তর সোজা রাখে এবং ইচ্ছা করলে বাঁকা করে দেন। এজন্য আমরা দোয়া করিঃ

﴿رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً ۚ إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ﴾

হে আমাদের মালিক! হেদায়াত দানের পর আমাদের অন্তর গুলোকে বাঁকা করবেন না এবং আমাদেরকে আপনার পক্ষ থেকে রহমত দান করো। নিশ্চয়ই আপনি বড় দাতা।

হযরত উম্মে সালমা বলেন, আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল সা. আমাকে এমন একটি দুআ শিখিয়ে দিন, যার মাধ্যমে আমি নিজের জন্য প্রার্থনা করবো। তখন রাসুল সা. বললেনঃ

اللهم رب النبي محمد اغفر لي ذنبي، وأذهب غيظ قلبي، وأجرني من مضلات الفتن ما أحييتني

হে আল্লাহ! হে নবী মুহাম্মদ সা. এর রব! আমার গুনাহ মাফ করো, আমার অন্তরের ক্রোধ দূর করো এবং যতদিন আমাকে জীবিত রাখবেন, ততদিন আমাকে বিভ্রান্তিকর ফিৎনা থেকে বাঁচিয়ে রাখুন।

عبد الله بن عمرو< أنه سمع رسول الله ﷺ يقول إن قلوب بني آدم بين أصبعين من أصابع الرحمن كقلب واحد، يصرفها كيف شاء ” ثم قال رسول الله صلى الله عليه وسلم اللهم مصرف القلوب صرف قلوبنا إلى طاعتك

আব্দুল্লাহ ইবেন আমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূল সা.কে বলতে শুনেছেনঃ বনী আদমের অন্তরগুলো আল্লাহর দূৎটি আঙ্গুলির মাঝে একটি অন্তরের ন্যায়। তিনি যেভাবে চান সে ভাবেই এগুলোকে ফিরিয়ে থাকেনঅতঃপর তিনি বলেনঃ اللهم مصرف القلوب صرف قلوبنا إلى طاعتك হে আল্লাহ! হে অন্তরগুলোকে পরিবর্তনকারী! আমাদের অন্তরগুলোকে আপনার আনুগত্যের দিকে ফিরিয়ে দাও।” (বুখারী ও মুসলিম)

   যেহেতু আমরা জানিনা কখন আমাদের মনের অবস্থা কি হবে, সেহেতু করণীয় হলোঃ

যখনই কোন ভাল কাজ করার বা খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকার সুযোগ আসবে, সাথে সাথে তা করে নেয়া। দেরী না করা। সময়টাকে গনিমত হিসাবে গ্রহণ করা।

عَن ابْنِ عَبَّاسٍ < قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللهِ – صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ – لِرَجُلٍ وَهُوَ يَعِظُهُ اغْتَنِمْ خَمْسًا قَبْلَ خَمْسٍ : شَبَابَكَ قَبْلَ هِرَمِكَ وَصِحَّتَكَ قَبْلَ سَقَمِكَ وَغِنَاءَكَ قَبْلَ فَقْرِكَ وَفَرَاغَكَ قَبْلَ شُغْلِكَ وَحَيَاتَكَ قَبْلَ مَوْتِكَ

ইবনে আব্বাস রা. বর্ণিত, রাসূল সা. এক ব্যক্তিকে উপদেশ দিয়ে বলেন, পাঁচটি বস্তুকে পাঁচটির পূর্বে গনীমত জেনে মূল্যায়ন করো . বার্ধক্যের পূর্বে তোমার যৌবনকে . অসুস্থতার পূর্বে তোমার সুস্থতাকে. অসচ্ছলতার পূর্বে তোমার সচ্ছলতাকে. ব্যস্ততার পূর্বে তোমার অবসরকে এবং ৫. মরণের পূর্বে তোমার জীবনকে।

 

﴿وَاتَّقُوا فِتْنَةً لَّا تُصِيبَنَّ الَّذِينَ ظَلَمُوا مِنكُمْ خَاصَّةً ۖ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ﴾

২৫) আর তোমরা এমন ফিতনা থেকে বেঁচে থাকো যাতোমাদের মধ্যে যারা যুলুম করেছে তাদের উপর পতিত হবে না বিশেষ ভাবে; এবং জেনে রেখো! নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি দানে অত্যন্ত কঠোর।

§ ﴿وَاتَّقُوا فِتْنَةً لَّا تُصِيبَنَّ الَّذِينَ ظَلَمُوا مِنكُمْ خَاصَّةً﴾ আর সেই ফিতনা থেকে দূরে থাকো, যার অনিষ্টকারিতা শুধুমাত্র তোমাদের গোনাহগারদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না৷

   ফিতনা একটি সর্বব্যাপী সামাজিক অনাচার।

   ফিতনা এমন একটি অনাচার, যা মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়ে মানুষের জীবন দুর্ভাগ্য ও ধ্বংস ডেকে আনে৷

   ফিতনা নামক অনাচারের শিকার কেবল যারা গোনাহ করে তারা হয়না।

   ফিতনা নামক অনাচারের শিকার হয় যারা পাপাচারে জর্জরিত সমাজে বসবাস করা বরদাশত করে নেয়৷

   ফিতনার উদাহরণ হলোঃ যখন কোন শহরে ময়লা আবর্জনা এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিচ্ছিন্ন ভাবে জমে থাকেঃ

o  তখন তার প্রভাব ও থাকে সীমাবদ্ধ৷ এ অবস্থায় শুধুমাত্র যেসব লোক নিজেদের শরীরে ও ঘরোয়া পরিবেশে ময়লা আবর্জনা ভরে রেখেছে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়৷

o  যখন সেখানে ময়লা আবর্জনার স্তুপ ব্যাপকভাবে জমে উঠতে থাকে এবং সারা শহরে ময়লা প্রতিরোধ ও নিষ্কাশণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্যে প্রচেষ্টা চালাবার মতো একটি দলও থাকে না তখন মাটি, পানি ও বাতাসের সর্বত্রই বিষক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ে৷

o  ফলে যে মহামারী দেখা দেয় তাতে যারা ময়লা আবর্জনা ছড়ায় যারা নোংরা ও অপরিচ্ছন্ন থাকে এবং যারা ময়ল ও আবর্জনার বসবাস করে তারা সবাই আক্রান্ত হয়৷

   নৈতিক ময়লা ও আবর্জনার বেলায়ও ঠিক একই ব্যাপার ঘটেঃ

o  যদি তা ব্যক্তিগত পর্যায়ে কিছু ব্যক্তির মধ্যে থাকে এবং সৎ ও সত্যনিষ্ঠ সমাজের প্রতিপত্তির চাপে কোণঠাসা ও নিস্তেজ অবস্থায় থাকে তাহলে তার ক্ষতিকর প্রভাব সীমাবদ্ধ থাকে৷

o  যখন সমাজের সামষ্টিক বিবেক দুর্বল হয়ে পড়ে , নৈতিক অনিষ্টগুলোকে দমিয়ে রাখার ক্ষমতা তার থাকে না, সামাজ অংগনে অসৎ, নির্লজ্জ ও দুশ্চরিত্র লোকেরা নিজেদের ভেতরের ময়লাগুলো প্রকাশ্যে উৎক্ষিপ্ত করতে ও ছড়াতে থাকে, সৎলোকেরা নিষ্কর্মা হয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত সততা ও সদগুণাবলী নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে এবং সামাজিক ও সামাষ্টিক দুষ্কৃতির ব্যাপারে নীরব ভূমিকা পালন করে তখন সামগ্রিকভাবে গোটা সামাজের ওপর দুর্ভোগ নেমে আসে৷

o  এ সময় এমন ব্যাপক দুর্যোগের সৃষ্টি হয় যার ফলে বড়-ছোট, সবল-দুর্বল, সবাই সমানভাবে বিপর্যয় ও বিধ্বস্ত হয়৷

   রাসূল যে সংস্কার ও হেদায়াতের কর্মসূচী এবং যে কাজে অংশগ্রহণ করার আহবান এর মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিগত ও সামাজিক উভয় দিক দিয়ে যথার্থ জীবনের গ্যারান্টি৷

   যদি সাচ্চা দিলে আন্তরিকতা সহকারে সেই আহবানে অংশ না নেওযা হয় এবং সমাজের বুকে যেসব দুস্কৃতি ছড়িয়ে রয়েছে সেগুলোকে বরদাশত করা হয়, তাহলে ব্যাপক বিপর্যয় দেখা দেবে৷

   এমন অনেক লোক আছে, যারা কার্যত দুস্কৃতিতে লিপ্ত হয় না এবং দুস্কৃতি ছাড়াবার জন্যে তাদেরকে দায়ীও করা যায় না বরং নিজেদের ব্যক্তিগত জীবনে তারা সুকৃতির অধিকারী।  তবুও এ ব্যাপক বিপদ তাদেরকেও আচ্ছন্ন করে ফেলবে৷

   এ দৃষ্টিভংগীকেই ইসলামের ব্যক্তি চরিত্র ও সমাজ সংস্কারমূলক কাজের মৌলিক দৃষ্টিকোণ বলা যেতে পারে৷

   মুফতী তাকী উসমানী বলেনঃ একজন মুসলমানের দায়িত্ব শুধু শরীয়ার অনুসারী বানানো নয়, বরং মন্দ কাজের বিস্তার রোধ করা।

   সূরা আরাফের ১৬৩-১৬৬ আয়াতে শনিবারওয়ালাদের ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত পেশ করতে গিয়ে এ এক কথাই বলা হয়েছেঃ

﴿وَاسْأَلْهُمْ عَنِ الْقَرْيَةِ الَّتِي كَانَتْ حَاضِرَةَ الْبَحْرِ إِذْ يَعْدُونَ فِي السَّبْتِ إِذْ تَأْتِيهِمْ حِيتَانُهُمْ يَوْمَ سَبْتِهِمْ شُرَّعًا وَيَوْمَ لَا يَسْبِتُونَ ۙ لَا تَأْتِيهِمْ ۚ كَذَٰلِكَ نَبْلُوهُم بِمَا كَانُوا يَفْسُقُونَ﴾﴿وَإِذْ قَالَتْ أُمَّةٌ مِّنْهُمْ لِمَ تَعِظُونَ قَوْمًا ۙ اللَّهُ مُهْلِكُهُمْ أَوْ مُعَذِّبُهُمْ عَذَابًا شَدِيدًا ۖ قَالُوا مَعْذِرَةً إِلَىٰ رَبِّكُمْ وَلَعَلَّهُمْ يَتَّقُونَ﴾﴿فَلَمَّا نَسُوا مَا ذُكِّرُوا بِهِ أَنجَيْنَا الَّذِينَ يَنْهَوْنَ عَنِ السُّوءِ وَأَخَذْنَا الَّذِينَ ظَلَمُوا بِعَذَابٍ بَئِيسٍ بِمَا كَانُوا يَفْسُقُونَ﴾

১৬৩) আর সমুদ্রের তীরে যে জনপদটি অবস্থিত ছিল তার অবস্থা সম্পর্কেও তাদেরকে একটু জিজ্ঞেস করো৷ তাদের সেই ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দাও যে, সেখানকার লোকেরা শনিবারে আল্লাহর হুকুম অমান্য করতো এবং শনিবারেই মাছেরা পানিতে ভেসে ভেসে তাদের সামনে আসতো৷ অথচ শনিবার ছাড়া অন্য দিন আসতো না৷ তাদের নাফরমানীর কারণে তাদেরকে আমি ক্রমাগত পরীক্ষার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছিলাম বলেই এমনটি হতো৷ 

১৬৪) আর তাদের একথাও স্মরণ করিয়ে দাও, যখন তাদের একটি দল অন্য দলকে বলেছিল, তোমরা এমন লোকদের উপদেশ দিচ্ছো কেন যাদেরকে আল্লাহ ধ্বংস করবেন বা কঠোর শাস্তি দেবেন? জবাবে তারা বলেছিল, এসব কিছু এ জন্যেই করছি যেন আমরা তোমাদের রবের সামনে নিজেদের ওপর পেশ করতে পারি এবং এ আশায় করছি যে, হয়তো এ লোকেরা তাঁর নাফরমানী করা ছেড়ে দেবে৷

১৬৫) শেষ পর্যন্ত তাদেরকে যে সমস্ত হেদায়াত স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছিল তারা যখন সেগুলো সম্পূর্ণ ভুলে গেলো তখন যারা খারাপ কাজে বাধা দিতো তাদেরকে আমি বাঁচিয়ে নিলাম এবং বাকি লোক যারা দোষী ছিল তাদের নাফরমানীর জন্য তাদেরকে কঠিন শাস্তি দিলাম৷ 

   ফেতনার মাধ্যমে মুমিন এবং কাফের উভয়কে পরীক্ষা করা হয়। এখানে সেই পরীক্ষার ব্যাপারে ভয় প্রদর্শণ করা হচ্ছে।

   যুবাইর রা.কে বলা হয়েছিলঃ يا أبا عبد الله ما جاء بكم؟ ضيعتم الخليفة الذي قتل، ثم جئتم تطلبون بدمه؟  হে আবু আব্দুল্লাহ! আমীরুল মুমিনীন উসমান রা.কে হত্যা করা হয়েছে। এভাবে আপনারা তাঁকে হারিয়ে ফেলেছেন। অতঃপর এখন তাঁর খুনের দাবীদার হচ্ছেন! খুনের যদি দাবীদারই হবেন, তবে তাঁকে নিহত হতে দিলেন কেন?” উত্তরে যুবাইর রা. বলেছিলেনঃএটা ছিল আল্লাহর পরীক্ষা যার মধ্যে আমরা জড়িয়ে পড়েছি। إنا قرأنا على عهد رسول الله ﷺ وأبي بكر وعمر وعثمان رضي الله عنهم  আমরা নবী সা. আবু বকর রা. উমরা রা. ও উসমান রা. এর কুরআনের আয়াত পাঠ করেছিলামঃ ﴿وَاتَّقُوا فِتْنَةً لَّا تُصِيبَنَّ الَّذِينَ ظَلَمُوا مِنكُمْ خَاصَّةً﴾ কিন্তু তখন আমাদের ধারণা ছিলান যে, আমরাও এর মধ্যে পতিত হবো।  لم نكن نحسب أنا أهلها حتى وقعت منا حيث وقعت শেষ পর্যন্ত ঐ পরীক্ষা আমাদের উপর এসে পড়েছে।  মুসলমানের দূটি দল পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। হযরত উসমান এর হত্যাকে কেন্দ্র করেই এই পরীক্ষা সূচনা হয়েছে।

   যুবাইরা রা. আরো বলেনঃ الزبير يقول لقد قرأت هذه الآية زماناً، وما أرانا من أهلها، فإذا نحن المعنيون بهاআমরা সদা সর্বদা এ আয়াতটি পাঠ করতাম। কিন্তু এটা যে আমাদের উপরই সত্যরূপে প্রমাণিত হবে, তা আমরা জানতাম না।

   হাসান বসরী বলেনঃ في هذه الآية قال نزلت في علي وعثمان وطلحة والزبير رضي الله عنهم এই আয়াতটি হযরত আলী, উসমান, তালহা ও যুবাইর রা. এর ব্যাপারে নাযিল হয়েছে।

   ইবনে আব্বাস রা. এই আয়াতের তাফসীরে বলেনঃ أمر الله المؤمنين أن لا يقروا المنكر بين ظهرانيهم، فيعمهم الله بالعذاب মুমিনদের উপর নির্দেশ রয়েছেপাপকে তোমরা নিজেদের মধ্যে আসতে দিও না। যেখানেই কাউকে কোন অসৎ কাজ করতে দেখবে, সত্ত্বর তাতে তা থেকে বিরত রাখো নতুবা শাস্তি সবার উপরে আসবে।

   ইবনে মাসউদ রা. বলেনঃ ما منكم من أحد إلا وهو مشتمل على فتنة তোমাদের প্রত্যেকেই এই পরীক্ষায় পতিত হবে। কেননা আল্লাহ বলেনঃ

﴿إِنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ ۚ وَاللَّهُ عِندَهُ أَجْرٌ عَظِيمٌ﴾

তোমাদের অর্থ-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি একটি পরীক্ষা৷ আর কেবলমাত্র আল্লাহর কাছে আছে বিরাট প্রতিদান৷ (আত তাগাবুনঃ ১৫)

§ ﴿وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ﴾ জেনে রাখো, আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা৷  

عَن حُذَيفَةَ < عَنِ النَّبيّ ﷺ قَالَ: وَالَّذِي نَفْسي بِيَدِهِ، لَتَأْمُرُنَّ بِالمَعْرُوفِ، وَلَتَنْهَوُنَّ عَنْ المُنْكَرِ أَوْ لَيُوشِكَنَّ اللهُ أنْ يَبْعَثَ عَلَيْكُمْ عِقَاباً مِنْهُ ثُمَّ تَدْعُوْنَهُ فَلا يُسْتَجَابُ لَكُمْ.

হুযাইফাহ রা. থেকে বর্ণিত, নবী সা বলেন, “তার কসম যাঁর হাতে আমার প্রাণ আছে! তোমরা অবশ্যই ভাল কাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করবে, তা না হলে শীঘ্রই আল্লাহ তা’আলা তাঁর পক্ষ থেকে তোমাদের উপর আযাব পাঠাবেন। অতঃপর তোমরা তাঁর কাছে দো’আ করবে; কিন্তু তা কবুল করা হবে না।”

عن أمّ سلمة < زوج النبي ﷺ قالت سمعت رسول الله ﷺ يقول: إذا ظهرت المعاصي في أمتي، عمهم الله بعذاب من عند، فقلت يا رسول الله أما فيهم أناس صالحون؟ قال: بلى. قالت فكيف يصنع أولئك؟ قال:  يصيبهم ما أصاب الناس، ثم يصيرون إلى مغفرة من الله ورضوان.

নবী সা. এর সহধর্মিনী উম্মে সালমাহ রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সা.কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেনঃ আমার উম্মতের মধ্যে পাপ যখন সাধারণ ভাবে প্রকাশ পাবে, তখন আল্লাহ সাধারণ ভাবে শাস্তি পাঠাবেন। তখন আমি জিজ্ঞেস করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল সা.! তাদের মাঝে সৎ লোক থাকলেও কি? উত্তরে তিনি বললেনঃ হ্যাঁ, তারাও শাস্তিতে জড়িয়ে পড়বে। কিন্তু (মৃত্যুর পর) তারা আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি লাভ করবে।

﴿وَاذْكُرُوا إِذْ أَنتُمْ قَلِيلٌ مُّسْتَضْعَفُونَ فِي الْأَرْضِ تَخَافُونَ أَن يَتَخَطَّفَكُمُ النَّاسُ فَآوَاكُمْ وَأَيَّدَكُم بِنَصْرِهِ وَرَزَقَكُم مِّنَ الطَّيِّبَاتِ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ﴾

২৬) আর তোমরা স্মরণ করো, যখন তোমরা ছিলে দুনিয়অতে সংখ্যায় খুবই কমদূর্বল অসহায় হিসেবে ছিলে গণ্য, তোমরা ভয় করতে যে, লোকেরা তোমাদেরকে হঠাৎ ধরে নিয়ে যাবে। অতপর তিনি তোমাদেরকে আশ্রয় দেন ও নিজ সাহায্যে তোমাদেরক শক্তিশালী করেন এবং পবিত্র বস্তুসমূহ থেকে তোমাদেরকে জীবিকা দান করেন। যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করো।

§ ﴿وَاذْكُرُوا إِذْ أَنتُمْ قَلِيلٌ مُّسْتَضْعَفُونَ فِي الْأَرْضِ تَخَافُونَ أَن يَتَخَطَّفَكُمُ النَّاسُ فَآوَاكُمْ وَأَيَّدَكُم بِنَصْرِهِ وَرَزَقَكُم مِّنَ الطَّيِّبَاتِ﴾ স্মরণ করো সেই সময়ের কথা যখন তোমরা ছিলে সামান্য কয়েকজন৷ পৃথিবীর বুকে তোমাদের দুর্বল মনে করা হতো৷ লোকেরা তোমাদের খতম করেই দেয় নাকি, এ ভয়ে তোমরা কাঁপতে৷ তারপর আল্লাহ তোমাদের আশ্রয়স্থল যোগার করে দিলেন, নিজের সাহায্য দিয়ে তোমাদের শক্তিশালী করলেন এবং তোমাদের ভাল ও পবিত্র জীবিকা দান করলেন

   কাতাদাহ ইবনে দাআমাহ আল সুদাউসী রাহি. এই আয়াত সম্পর্কে বলেনঃ

كان هذا الحي من العرب أذل الناس ذلاً، وأشقاه عيشاً، وأجوعه بطوناً، وأعراه جلوداً، وأبينه ضلالاً، من عاش منهم عاش شقياً، ومن مات منهم ردي في النار، يؤكلون ولا يأكلون، والله ما نعلم قبيلاً من حاضر أهل الأرض يومئذ كانوا أشر منزلاً منهم، حتى جاء الله بالإسلام، فمكن به في البلاد، ووسع به في الرزق، وجعلهم به ملوكاً على رقاب الناس، وبالإسلام أعطى الله ما رأيتم، فاشكروا الله على نعمه فإن ربكم منعم يحب الشكر، وأهل الشكر في مزيد من الله.

আরবের লোকেরা অত্যন্ত লাঞ্ছিত অবস্থায় ছিল। তাদের জীবন ছিল অত্যন্ত দূর্বিসহ। তাদের পেটে খাবার ছিল না, পরনে কাপড় ছিল না।  আর সঠিক পথ থেকে তারা ছিলা পথভ্রষ্ট। তারা দূর্বিসহ জীবন যাপন করছিল।  তাদের মাঝে যারা মৃত্যু বরণ করতো, তাদেরকে আগুনে নিক্ষেপ করা হতো।  তারা খাবার পেতো না, বরং তাদেরকেই খেয়ে নেয়া হচ্ছিল।  দুনিয়ার বুকে তাদের চেয়ে বেশী লাঞ্ছিত ও অপমানিত কোন জাতি ছিল বলে আমাদের জানা নেই। এমন অবস্থায় আল্লাহ ইসলাম নিয়ে আসলেন।  সেই লাঞ্ছিত লোক গুলো দেশের পর দেশ দখল করে নিল। তাদের রিযক বৃদ্ধি হয়ে যায়তারা মানুষের উপর আমীর ও বাদশাহ বনে যায়। আল্লাহ তাদেরকে সব কিছু দান করেছেন, যা তোমরা দেখতে পারছো। সুতরাং তোমরা নিয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞ হও।  কেননা তোমাদের বর তোমাদের নিয়ামত প্রাপ্ত করেছেন এবং তিনি কৃতজ্ঞদের ভালবাসেন। আর আহলে শোকররা আল্লাহর পক্ষ থেকে আরো বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়।

§ ﴿لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ﴾ হয়তো তোমরা শোকরগুজার হবে৷

   শোকর গুজার হওয়ার ক্ষেত্রে প্রাপ্তির একটি হিসাব থাকে। তদানিন্তন মুসলমানদের প্রাপ্তির খাতায় কি রয়েছে?

. মুসলমানদেরকে দূর্বলতার অবস্থান থেকে বের করে আরা হয়েছে।

. মক্কার বিপদসংকুল জীবন থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

. মদীনায় শান্তি ও নিরাপত্তার ভূমিতে আশ্রয় দেয়া হয়েছে।

. মদীনা উত্তম রিযিক এর ব্যবস্থা করা হয়েছে।

   এসব নিয়ামতের প্রাপ্তি স্বীকারই কেবল শোকরগুজারী নয়, বরং এই সব নিয়ামত প্রাপ্তির ফলে শোকরগুজারী হলোঃ

1. যে আল্লাহ এই অনুগ্রহ করেছেন সেই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করা।

2.রাসূল যে আন্দোলনের সূচনা করেছেন, সে আন্দোলনকে সফল করার জন্য আন্তরিকতা ও উৎসর্গিত মনোভাব নিয়ে আত্মনিয়োগ করা।

3.আন্দোলনের পথে আসা বাধা, বিপদ ও ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনার সামনে আল্লাহর উপর ভরসা করে সাহসের সাথে মোকাবেলা করা।

4.মনে এই একীন রাখা যে যিনি ইতিমধ্যে বিপদ থেকে উদ্ধার করেছেন, তিনি ভবিষ্যতেও উদ্ধার করবেন।

   শোকরগুজারী কেবল মুখের স্বীকৃতি নয়, বরং কাজের মাধ্যমে।

   শোকরগুজারী মুখে স্বীকার করার পারও তা নাশুকরী হয় তখনঃ

. যখন অনুগ্রহকারীর সন্তুষ্টি লাভের জন্যে প্রচেষ্টা না চালানো হয়।

২. যখন অনুগ্রহকারীর খিদমত করার ব্যাপারে আন্তরিক না হওয়া হয়।

৩. যখন “না জানি আগামীতেও তিনি অনুগ্রহ করবেন কিনা” এ ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করা হয়।

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَخُونُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ وَتَخُونُوا أَمَانَاتِكُمْ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ﴾

২৭) হে যারা ঈমান এনেছো! তোমরা খিয়ানত করো না আল্লাহ ও রাসূলের সাথে এবং খিয়ানত করো না তোমাদের আমানত সমূহের এমতাবস্থায় যে, তোমরা তা অবগত।

§ ﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَخُونُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ وَتَخُونُوا أَمَانَاتِكُمْ﴾ নিজেদের আমানতসমূহের খেয়ানত করো না৷  

 

 

 

   জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ বর্ণনা করেনঃ

أن أبا سفيان خرج من مكة، فأتى جبريل رسول الله ﷺ فقال إن أبا سفيان بمكان كذا وكذا، فقال رسول الله ﷺ إن أبا سفيان في موضع كذا وكذا، فاخرجوا إليه واكتموا فكتب رجل من المنافقين إليه إن محمداً يريدكم، فخذوا حذركم، فأنزل الله عز وجل ﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَخُونُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ وَتَخُونُوا أَمَانَاتِكُمْ﴾

আবু সুফিয়ান রা. মক্কা থেকে বর হন। জিব্রাঈল আ. এসে রাসুলুল্লাহ সা.কে জানান যে, আবু সুফিয়ান রা. অমুক জায়গায় রয়েছেন। তখন রাসুলুল্লাহ সা. সাহাবীদের বলেনঃ আবু সুফিয়ান অমুক জায়গায় রয়েছে। তাকে গ্রেফতার করার জন্য বেরিয়ে পড়। তিনি একথা সম্পূর্ণরূপে গোপন রাখতে বলেন।  কিন্তু একজন মুনাফিক আবু সুফিয়ানকে লিখে পাঠায়ঃ إن محمداً يريدكم، فخذوا حذركمমুহাম্মদ ধরতে যাচ্ছেন, সুতরাং সাবধান হয়ে যাও।তখন নাযিল হয়ঃ ﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَخُونُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ وَتَخُونُوا أَمَانَاتِكُمْ﴾

   এ আয়াত আবু লাবাবহ ইবনে আবদিল মুনযির রা. সম্পর্কে নাযিল হয়েছেঃ

أنزلت في أبي لبابة بن عبد المنذر< حين بعثه رسول الله ﷺ إلى بني قريظة لينزلوا على حكم رسول الله صلى الله عليه وسلم فاستشاروه في ذلك، فأشار عليهم بذلك، وأشار بيده إلى حلقه، أي إنه الذبح، ثم فطن أبو لبابة، ورأى أنه قد خان الله ورسوله، فحلف لا يذوق ذواقاً حتى يموت، أو يتوب الله عليه، وانطلق إلى مسجد المدينة، فربط نفسه في سارية منه، فمكث كذلك تسعة أيام حتى كان يخر مغشياً عليه من الجهد، حتى أنزل الله توبته على رسوله، فجاء الناس يبشرونه بتوبة الله عليه، وأرادوا أن يحلوه من السارية، فحلف لا يحله منها إلا رسول الله صلى الله عليه وسلم بيده، فحله، فقال يا رسول الله إني كنت نذرت أن أنخلع من مالي صدقة، فقال يجزيك الثلث أن تصدق به

যখন রাসূলুল্লাহ সা. আবু লুবাবাহকে ইয়াহুদী বানু কুরাইয়ার নিকট প্রেণ করেন যেমন তারা রাসূল সা. এর হুকুমের শর্ত মেনে নিয়ে দূর্গ খালি করে দেয়। তারা তখন আবু লুবাবাহর কাছে পরামর্শ চায়। তখন তিনি তাদেরকে এ ব্যাপারে পরামর্শ দেন এবং তিনি স্বীয় হাত দ্বারা স্বীয় গলার প্রতি ইশারা করেনঅর্থাৎ হত্যা করা হবে। এরপর আবু লুবাবাহ বুঝতে পারেন যে, তিনি আল্লাহ ও রাসূল সা. এর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। অতঃপর তিনি শপথ করেন যেম আল্লাহ তাঁর তাওবা কবুল না করা অবধি তিনি মরে যাবেন সেও ভাল কিন্তু কোন খাদ্য খাবেন না। এরপর তিনি মদীনার মসজিদে এসে খুটির সাথে নিজেকে বেঁধে ফেলে।  এভাবে নয়দিন কেটে যায়।  ক্ষুধা ও পিপাসয় কাতর হয়ে তিনি চেতনাহীন হয়ে পড়েন।  অবশেষে রাসূলুল্লাহ সা. এর প্রতি আল্লাহ তায়ালা তাঁর তাওবা কবুলের আয়াত নাযিল হয়। মানুষ তাকে এই সুসংবাদ দেয়ার জন্য তার কাছে আসে এবং তার বাঁধন খুলে দিতে চায়।  কিন্তু তিনি শপথ করেন, রাসূল সা. যতক্ষণ নিজহাতে তার বন্ধন খুলে দেবেন না, ততক্ষণ তিনি বন্ধন মুক্ত হবেন না। পরে রাসূল সা. তার বন্ধন খুলে দিলে তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল সা.! আমি আমার সমস্ত সম্পদ সাদাকা করে দিরাম। তখন রাসুলুল্লাহ সা. বলেনঃ মোর জন্য একতৃতীয়াংশ সাদাকা করাই যথেষ্ট।

 

 

 

   নিজেদের আমানত সমূহ মানেঃ

. কারো উপর বিশ্বাস বা আস্থা রেখে তার উপর দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়া।

. যার উপর দায়িত্ব প্রদান করা হলো তাকে আনুগত্য করতে এবং অঙ্গিকার পালন করতেও দায়িত্ব দেয়া।

. কোন সামাজিক চূক্তি পালন বা দলীয় গোপনীয়তা রক্ষা বা ব্যক্তিগত বা দলীয় সম্পত্তি রক্ষা করা বা কোন পদে আসীন হওয়ার পর শপথও হতে পারে। যা কোন ব্যক্তির উপর আস্তা রেখে দল তাকে দায়িত্ব প্রদান করে।

   সূরা নিসার ৫৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেঃ

﴿إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَىٰ أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُم بَيْنَ النَّاسِ أَن تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ ۚ إِنَّ اللَّهَ نِعِمَّا يَعِظُكُم بِهِ ۗ إِنَّ اللَّهَ كَانَ سَمِيعًا بَصِيرًا﴾

হে মুসলিমগণ ! আল্লাহ তোমাদের যাবতীয় আমানত তার হকদারদের হাতে ফেরত দেবার নির্দেশ দিচ্ছেন৷ আর লোকদের মধ্যে ফায়সালা করার সময় “আদল” ও ন্যায়নীতি সহকারে ফায়সালা করো৷ আল্লাহ তোমাদের বড়ই উৎকৃষ্ট উপদেশ দান করেন৷ আর অবশ্যি আল্লাহ সবকিছু শোনেন ও দেখেন৷  

   এর ব্যাখায় মাওলানা মওদূদী রাহি. বলেনঃ

o  বনী ইসরাঈলরা যে সব খারাপ কাজে লিপ্ত ছিল, তোমরা তা থেকে দূরে থাকো।

o  বনী ইসরাঈল কি খারাপ কাজ করেছিল?

. তারা আমানত সমূহ তথা দায়িত্বপূর্ণ পদ, ধর্মীয় নেতৃত্ব ও জাতীয় নেতৃত্ব সে সব লোকদের দিয়েছিল, যারা অযোগ্য, সংকীর্ণমনা, দুশ্চরিত্র, দূর্নীতিপরায়ন, খেয়ানতকারী ও ব্যভিচারী।

. অসৎ লোকের হাতে নেতৃত্ব থাকার কারণে পুরো জাতি অনাচারে লিপ্ত হয়ে যায়।

. তাদের মাঝে ইনসাফ ও ন্যায় নীতির প্রাণশক্তি বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল।

. তারা ব্যক্তি ও জাতীয় স্বার্থে নির্দ্বিধায় ঈমান বিরোধী কাজ করতো।

. তারা সত্য জেনেও সুস্পষ্ট হঠ ধর্মীতায় লিপ্ত হতো।

. তারা ইনসাফের গলায় ছুরি চালাতে কুন্ঠিত হতো না।

o  একই ধরণের অভিজ্ঞাতা পাওয়া যায় নবী সা. এর সময়ের মুসলমানদের সময়েঃ

. তাদের সামনে একদিকে ছিল মুহাম্মদ সা. ও ঈমানদারদের পবিত্র জীবনধারা, অপর দিকে মুশরিকদের জীবনধারা। যারা কণ্যা সন্তানদের জীবন্ত কবর দিতো, বিমাতাদের বিয়ে করতো, উলংগ অবস্থার কাবা তাওয়াফ করতো

. এই সময়ে আহলি কিতাবরা মুহাম্মদ সা. ও তার সাথীদের কে প্রাধান্য না দিয়ে মুশরিকদের প্রাধান্য দিতো।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা এই ধরণের বেইনসাফীর বিরুদ্ধে উপদেশ দিলেনঃ তোমরা ওদের মতো অবিচারক হইওনা।  বন্ধুত্ব এবং শত্রুতা যাই হোক, সর্বাবস্তায় ইনাফ ও ন্যায়ের নীতি অবলম্বন করবে।

عن ابن عباس <﴿وَتَخُونُوا أَمَانَاتِكُمْ﴾ الأمانة الأعمال التي ائتمن الله عليها العباد، يعني الفريضة، يقول ﴿لَا تَخُونُوا﴾ لا تنقضوها. وقال في رواية ﴿لَا تَخُونُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ﴾، يقول بترك سنته، وارتكاب معصيته.

আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেনঃ এখানে আমনত শব্দ দ্বারা ঐসব আমলকে বুঝানো হয়েছে, যেগুলোকে আল্লাহ তাঁর বান্দার উপর ফরয করে রেখেছেন। বিধায় ভাবার্থ হলোঃ ফরয ভেঙ্গে দিয়ো না, সুন্নাতকে তরক করো না এবং পাপকাজ থেকে দুরে থাকো।

﴿وَاعْلَمُوا أَنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ وَأَنَّ اللَّهَ عِندَهُ أَجْرٌ عَظِيمٌ﴾

২৮) এবং জেনে রেখো, তোমাদের অর্থ-সম্পদ ও তোমাদের সন্তান-সন্তুতি আসলে পরীক্ষার সামগ্রী৷  আর আল্লাহর কাছে প্রতিদান দেবার জন্য অনেক কিছুই আছে৷  

আর জেনে রেখো, তোমাদের ধনসম্পদ ও তোমাদের সন্তানসন্ততিতো অবশ্যই একটি পরীক্ষা, আর আল্লাহ! অবশ্যই তাঁর নিকট রয়েছে মহান প্রতিদান।

§ ﴿وَاعْلَمُوا أَنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ﴾ এবং জেনে রেখো, তোমাদের অর্থ-সম্পদ ও তোমাদের সন্তান-সন্তুতি আসলে পরীক্ষার সামগ্রী৷ 

   মানুষের ঈমানী চেতনা নষ্ট হয়, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতায় বিশৃংখলার সৃষ্টি হয়, যে জন্য মানুষ মুনাফেকী করে, বিশ্বাসঘাতকাতা করে, খেয়ানত করে তাহলোঃ

. অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রতি সীমাতিরিক্ত আগ্রহ।

. সন্তান সন্ততির স্বার্থের প্রতি সীমাতিরিক্ত আগ্রহ।

   মুসলমানদের সতর্ক করা হচ্ছে যে, তোমরা যাতে এ গুলোর মোহে পড়ে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত না হও।

   সম্পদ আর সন্তান দুনিয়া নামক পরীক্ষা কেন্দ্রে পরীক্ষার সামগ্রী।

﴿وَلَنَبْلُوَنَّكُم بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ ۗ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ﴾

আর নিশ্চয়ই আমরা ভীতি, অনাহার, প্রাণ ও সম্পদের ক্ষতির মাধ্যমে এবং উপার্জন ও আমদানী হ্রাস করে তোমাদের পরীক্ষা করবো ৷ এ অবস্থায় যারা সবর করে। (আল-বাকারাহঃ ১৫৫) 

﴿وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ حَتَّىٰ نَعْلَمَ الْمُجَاهِدِينَ مِنكُمْ وَالصَّابِرِينَ وَنَبْلُوَ أَخْبَارَكُمْ﴾

 আমি তোমাদের কে অবশ্যই পরীক্ষা করবো যাতে আমি তোমাদের অবস্থা যাঁচাই করে দেখে নিতে পারি তোমাদের মধ্যে কে জিহাদকারী এবং কে ধৈর্যশীল৷ (মুহাম্মদঃ ৩১) 

   যাকে আমরা পুত্র বা কন্যা বলে জানি, তারা আসলে পরীক্ষার সামগ্রী।

   যাকে আমরা সম্পত্তি বা ব্যবসা বলে জানি, তাও পরীক্ষার সামগ্রী।

   এই পরীক্ষা সামগ্রী গুলো আমাদের হাতে দেয়ার কারণ,

o  আমরা অধিকার ও দায় দায়িত্বের প্রতি কতটুকু সচেতন তা পরীক্ষা করা।

o  আবেগ তাড়িত হয়ে কতদূর সত্য ও সঠিক পথে চলি তা পরীক্ষা করা

o  পার্থিক বস্তুর প্রেমে আসক্ত নফসকে কতটুকু নিয়ন্ত্রনে রাখতে পারি, তার পরীক্ষা করা।

o  আল্লাহ যতটুক অধিকার দিয়েছেন, তার কতটুকু আদায় করি, তার পরীক্ষা করা।

   সূরা আল কাহফে বলা হয়েছেঃ

﴿الْمَالُ وَالْبَنُونَ زِينَةُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَالْبَاقِيَاتُ الصَّالِحَاتُ خَيْرٌ عِندَ رَبِّكَ ثَوَابًا وَخَيْرٌ أَمَلًا﴾

৪৬) এ ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দুনিয়ার জীবনের একটি সাময়িক সৌন্দর্য-শোভা মাত্র৷ আসলে তো স্থায়িত্ব লাভকারী সৎকাজগুলোই তোমার রবের কাছে ফলাফলের দিক দিয়ে উত্তম এবং এগুলোই উত্তম আশা-আকাঙ্ক্ষা সফল হবার মাধ্যম৷ 

   সূরা আত তাগাবুনে বলা হয়েছেঃ

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ مِنْ أَزْوَاجِكُمْ وَأَوْلَادِكُمْ عَدُوًّا لَّكُمْ فَاحْذَرُوهُمْ ۚ وَإِن تَعْفُوا وَتَصْفَحُوا وَتَغْفِرُوا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ﴾﴿إِنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ ۚ وَاللَّهُ عِندَهُ أَجْرٌ عَظِيمٌ﴾

১৪) হে সেই সব লোক যারা ঈমান এসেছো, তোমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের মধ্যে কেউ কেউ তোমাদের শত্রু৷ তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাক৷ আর যদি তোমরা ক্ষমা ও সহনশীলতার আচরণ করো এবং ক্ষমা করে দাও তাহলে আল্লাহ অতিব ক্ষমাশীল, অতিব দয়ালু৷ 

১৫) তোমাদের অর্থ-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি একটি পরীক্ষা৷ আর কেবলমাত্র আল্লাহর কাছে আছে বিরাট প্রতিদান৷

   সূরা আল আম্বিয়াতে বলা হয়েছেঃ

﴿وَنَبْلُوكُم بِالشَّرِّ وَالْخَيْرِ فِتْنَةً﴾

৩৫) আর আমি ভালো ও মন্দ অবস্থার মধ্যে ফেলে তোমাদের সবাইকে পরীক্ষা করছি৷ 

   সূরা আল মুনাফিকুনে বলা হয়েছেঃ

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُلْهِكُمْ أَمْوَالُكُمْ وَلَا أَوْلَادُكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ ۚ وَمَن يَفْعَلْ ذَٰلِكَ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ﴾

৯) হে সেই সব লোক যারা ঈমান এসেছো, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তানাদি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফিল করে না দেয়৷ যারা এরূপ করবে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকবে৷  

§ ﴿وَأَنَّ اللَّهَ عِندَهُ أَجْرٌ عَظِيمٌ﴾ আর আল্লাহর কাছে প্রতিদান দেবার জন্য অনেক কিছুই আছে৷  

   এতক্ষণ যে সন্তান সন্ততির কথা আলোচনা হলো, আল্লাহর কাছে তার চেয়ে বহু গুণে উত্তম প্রতিদান রয়েছে।  আর তা হলো জান্নাত।

   সন্তান আর সম্পদটা শত্রুর মতো, যাতে ক্ষতিকারক এবং মানুষের জন্য কল্যাণকর নয় এমন বস্তু রয়েছে। কিন্তু আল্লাহর কাছে যা রয়েছে, তা শুধুই উত্তম।

   হাদীসে রয়েছেঃ

يقول الله تعالى يا بن آدم، اطلبني تجدني، فإن وجدتني وجدت كل شيء، وإن فتك فاتك كل شيء، وأنا أحب إليك من كل شيء .

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন, হে বনি আদম! তুমি আমাকে খোঁজ কর, পেয়ে যাবে। আর যদি তুমি আমাকে পেয়ে যাও, তাহলে মনে করো সবকিছুই পেয়ে গেছো।  আর যদি আমাকে হারিয়ে ফেলো, তাহলে সবকিছুই হারিয়ে ফেললে।  তোমার কাছে আমিই সবচেয়ে বেশী প্রিয় হওয়া উচিত।

   আরেকটি সহীহ হাদীসে আল্লাহর রাসূল সা. বলেনঃ

ثلاث من كن فيه، وجد حلاوة الإيمان من كان الله ورسوله أحب إليه مما سواهما، ومن كان يحب المرء لا يحبه إلا لله، ومن كان أن يلقى في النار أحب إليه من أن يرجع إلى الكفر بعد إذ أنقذه الله منه

তিনটি জিনিস যার মাঝে রয়েছে, সে ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করলো।  ১. যার কাছে সকল জিনিসের চেয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সবচেয়ে প্রিয়। ২. যে কাউকে কেবল মাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ভালবাসে। ৩. যার কাছে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়াও অধিক পছন্দনীয় সেই কুফরীর দিকে ফিরে যাওয়া অপেক্ষা, যে কুফরী থেকে আল্লাহ তাকে বাঁচিয়েছেন। (বুখারী ও মুসলিম)

   এই ভালবাসা হতে হবে নিজের নফস, পরিবার, সম্পদ এবং দুনিয়ার সকল মানুষের চেয়ে বেশী।  সহীহ হাদীসে আল্লাহর রাসূল সা. বলেনঃ

والذي نفسي بيده لا يؤمن أحدكم حتى أكون أحب إليه من نفسه وأهله وماله والناس أجمعين

যার হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ! তোমাদের কেউই পরিপূর্ণ মুমিন হতে পারবেনা, যতক্ষণ না আমি তার কাছে প্রিয় হবো তার নফস থেকে, তার পরিবার পরিজন হতে, তার সম্পদ থেকে এবং সমস্ত লোকদের থেকে।

   এই ভালবাসার প্রতিধ্বনি শোনা যায় সূরা তাওবার আয়াতেঃ

﴿قُلْ إِن كَانَ آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَعَشِيرَتُكُمْ وَأَمْوَالٌ اقْتَرَفْتُمُوهَا وَتِجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمَسَاكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبَّ إِلَيْكُم مِّنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَجِهَادٍ فِي سَبِيلِهِ فَتَرَبَّصُوا حَتَّىٰ يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ ۗ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ﴾

 

২৪) হে নবী! বলে দাও, যদি তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান ও তোমাদের ভাই তোমাদের স্ত্রী,তোমাদের আত্মীয়-স্বজন, তোমাদের উপার্জিত সম্পদ, তোমাদের যে ব্যবসায়ে মন্দা দেখা দেয়ার ভয়ে তোমরা তটস্থ থাক এবং তোমাদের যে বাসস্থানকে তোমরা খুবই পছন্দ কর-এসব যদি আল্লাহ ও তার রসূল এবং তার পথে জিহাদ করার চাইতে তোমাদের কাছে বেশী প্রিয় হয়, তাহলে আল্লাহর ফায়সালা তোমাদের কাছে না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা কর আল্লাহ ফাসেকদেরকে কখনো সত্য পথের সন্ধান দেন না৷  

লেখাটি আপনার ভাল লাগলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন
আমার লিখা দারসুল কুরআন লেখালেখি