তাওবাতুন নাসুহাঃ মাওলানা মওদূদীর লিখনী থেকে

তাওবাতুন নাসুহাঃ মাওলানা মওদূদীর লিখনী থেকে

আমাদের সম্মাণিত কুয়াকাটা হুজুর সম্প্রতি তাওবাতুন নাসুহা বিষয়ে বলেছেনঃ কার মতো তাওবা করবো? আল্লাহ বলেনঃ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَّصُوحًا  নাসুহা নামের এক ব্যক্তি, তার মতো তাওবা করো

বিষয়টি বুঝাতে গিয়ে তিনি আরো বিস্তারিত বলেন। তিনি বলেনঃ চিন্তা করেন, কেমন ব্যক্তি যে, কুরআনে নাম এসে গেল? সে কোন নবীও না,  আর নবীর খাদেমও না। সাহাবীও না, সাহাবীর খাদেরও..(না)। বেশী থেকে বেশী একজন বুজুর্গ। আল্লাহর কাছে তার তাওবাটা এতো ভাল লাগছে যে, তার নামটা কুরআনে এসে গেছে। يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَّصُوحًا এরে মুমিন তাওবা করো, নসুহার মতো তাওবা।…..

আল্লাহ মাওলানা মওদূদী রাহ. এর প্রতি রহম করুন-তিনি এতো সুন্দর করে তাওবাতুন নাসুহার ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, কুয়াকাটা হুজুর মাওলানা মওদূদীর এই বক্তব্যটি পড়ার সুযোগ পাননি। 

মাওলানা মওদূদী রাহ. সূরা আত-তাহরীম এর ৮ নম্বর আয়াতে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তার বিখ্যাত তাফসীর তাফহীমূল কুরআনে উক্ত সূরার ১৯ নম্বর টীকাতে উল্লেখ করেনঃ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَّصُوحًا

হে ঈমানদারগণ, আল্লাহর কাছে তাওবা করো, প্রকৃত তাওবা৷”

মূল আয়াতে (تَوْبَةً نَّصُوحًا) শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে ৷ আরবী ভাষায় (نصح) শব্দের অর্থ নিষ্কলুষতা ও কল্যাণকামিতা ৷ খাঁটি মধু যা মোম ও অন্যান্য আবর্জনা থেকে মুক্ত করা হয়েছে তাকে আরবীতে (عسل ناصح ) বলা হয় ৷ ছেঁড়া কাপড় সেলাই করে দেয়া এবং ফাঁটা ফাঁটা কাপড় ঠিক করে দেয়া বুঝাতে আরবী (نصاحة الثوب) শব্দ ব্যবহার করা হয় ৷

অতএব , তাওবা শব্দের সাথে (نصوح) বিশেষণ যুক্ত করলে হয় তার আভিধানিক অর্থ হবেঃ

ক. এমন তাওবা যার মধ্যে প্রদর্শনী বা মুনাফিকীর লেশমাত্র নেই ৷

খ. তার অর্থ হবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিজের কল্যাণ কামনা করবে এবং গোনাহ থেকে তাওবা করে নিজেকে মন্দ পারিণাম থেকে রক্ষা করবে ৷

গ. তার অর্থ হবে গোনাহর কারণে তার দীনদারীর মধ্যে যে ফাটল সৃষ্টি হয়েছে তাওবা দ্বারা তা সংশোধন করবে ৷

ঘ. সে তাওবা করে নিজের জীবনকে এমন সুন্দর করে গড়ে তুলবে যে, অন্যের জন্য সে উপদেশ গ্রহণের কারণ হবে এবং তাকে দেখে অন্যরাও তার মত নিজেদেরকে সংশোধন করে নেবে ৷

‘তাওবায়ে নাসূহ’-এর আভিধানিক অর্থ থেকে এ অর্থসমূহই প্রতিভাত হয় ৷

এরপর অবশিষ্ট থাকে তাওবায়ে নাসূহ এর শরয়ী অর্থ ৷ আমরা এর শরয়ী অর্থের ব্যাখ্যা পাই যির ইবনে হুবাইশের মাধ্যমে ইবনে আবী হাতেম কর্তৃক বর্ণিত একটি হাদীসে ৷

যির ইবনে হুবাইশ বলেনঃ আমি উবাই ইবনে কা’বের (রা) কাছে ‘তাওবায়ে নাসূহ’ এর অর্থ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেনঃ আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে একই প্রশ্ন করেছিলাম ৷ তিনি বললেনঃ এর অর্থ হচ্ছে, কখনো তোমার দ্বারা কোন অপরাধ সংঘটিত হলে তুমি নিজের গোনাহর জন্য লজ্জিত হবে ৷ তারপর লজ্জিত হয়ে সে জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো এবং ভবিষ্যতে আর কখনো ঐ কাজ করো না ৷

হযরত উমর (রা) , হযরত আবদুল্লাহ (রা) ইবনে মাসউদ এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) থেকেও এ অর্থই উদ্ধৃত হয়েছে ৷ অন্য একটি বর্ণনা অনুসারে হযরত উমর ‘তাওবায়ে নাসূহ’র সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবেঃ তাওবার পরে পুনরায় গোনাহ করা তো দূরের কথা তা করার আকাংখা পর্যন্ত করবে না ৷ (ইবনে জারীর) ৷

হযরত আলী (রা) একবার এক বেদুঈনকে মুখ থেকে ঝটপট করে তাওবা ও ইসতিগফারের শব্দ উচ্চারণ করতে দেখে বললেন, এতো মিথ্যাবাদীদের তাওবা ৷ সে জিজ্ঞেস করলো, তাহলে সত্যিকার তাওবা কি? তিনি বললেন সত্যিকার তাওবার সাথে ছয়টি জিনিস থাকতে হবেঃ

(১) যা কিছু ঘটেছে তার জন্য লজ্জিত হও ৷

(২) নিজের যে কর্তব্য ও করণীয় সম্পর্কে গাফলীতি করছ তা সম্পাদন কর ৷

(৩) যার হক নষ্ট করেছ তা ফিরিয়ে দাও ৷

(৪) যাকে কষ্ট দিয়েছ তার কাছে মাফ চাও ৷

(৫) প্রতিজ্ঞা করো ভবিষ্যতে এ গোনাহ আর করবে না ৷ এবং

(৬) নফসকে এতদিন পর্যন্ত যেভাবে গোনাহর কাজে অভ্যস্ত করেছ ঠিক তেমনি ভাবে আনুগত্যে নিয়োজিত কর ৷ এতদিন পর্যন্ত নফসকে যেভাবে আল্লাহর অবাধ্যতার মজায় নিয়োজিত রেখেছিলে এখন তাকে তেমনি আল্লাহর আনুগত্যের তিক্ততা আস্বাদন করাও(কাশশাফ) ৷

তাওবা সম্পর্কিত বিষয়ে আরো কয়েকটি জিনিস ভালভাবে বুঝে নেয়া দরকারঃ

১. প্রকৃতপক্ষে তাওবা হচ্ছে কোন গোনাহের কারণে এ জন্য লজ্জিত হওয়া যে, তা আল্লাহর নাফরমানী ৷ কোন গোনাহের কাজ স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর অথবা বদনামের কারণ অথবা আর্থিক ক্ষতির কারণ হওয়ায় তা থেকে বিরত থাকার সংকল্প করা তাওবার সংজ্ঞায় পড়ে না ৷

২. যখনই কেউ বুঝতে পারবে যে, তার দ্বারা আল্লাহর নাফরমানী হয়েছে, তার উচিত তৎক্ষনাৎ তাওবা করা, এবং যেভাবেই হোক অবিলম্বে তার ক্ষতিপূরণ করা কর্তব্য, তা এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয় ৷

৩. তাওবা করে বারবার তা ভঙ্গ করা, তাওবাকে খেলার বস্তু বানিয়ে নেয়া এবং যে গোনাহ থেকে তাওবা করা হয়েছে বার বার তা করতে থাকা তাওবা মিথ্যা হওয়ার প্রমাণ ৷ কেননা, তাওবার প্রাণ সত্তা হচ্ছে, কৃত গোনাহ সম্পর্কে লজ্জিত হওয়া কিন্তু বার বার তাওবা ভঙ্গ করা প্রমাণ করে যে, তার মধ্যে লজ্জার অনুভূতি নেই ৷

৪. যে ব্যক্তি সরল মনে তাওবা করে পুনরায় ঐ গোনাহ না করার সংকল্প করেছে মানবিক দুর্বলতার কারণে যদি পুনরায় তার দ্বারা সেই গোনাহর পুনরাবৃত্তি ঘটে তাহলে এ ক্ষেত্রে পূর্বের গোনাহ পুনরুজ্জীবিত হবে না তবে পরবর্তী গোনাহের জন্য তার পুনরায় তাওবা করা উচিত ৷

৫. যখনই গোনাহর কথা মনে পড়বে তখনই নতুন করে তাওবা করা আবশ্যক নয় ৷ কিন্তু তার প্রবৃত্তি যদি পূর্বের পাপময় জীবনের স্মৃতিচারণ করে আনন্দ পায় তাহলে গোনাহের স্মৃতিচারণ তাকে আনন্দ দেয়ার পরিবর্তে লজ্জাবোধ সৃষ্টির কারণ না হওয়া পর্যন্ত তার বার বার তাওবা করা উচিত ৷ কারণ, যে ব্যক্তি সত্যিই আল্লাহর ভয়ে গোনাহ থেকে তাওবা করেছে সে অতীতে আল্লাহর নাফরমানী করেছে এই চিন্তা করে কখনো আনন্দ অনুভব করতে পারে না ৷ তা থেকে মজা পাওয়া ও আনন্দ অনুভব করা প্রমাণ করে যে, তার মনে আল্লাহর ভয় শিকড় গাড়তে পারেনি ৷

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদের সকলের প্রচেষ্টাকে ইবাদত হিসাবে কবুল করুন। আমীন।

লেখাটি আপনার ভাল লাগলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন
আমার লিখা আর্টিক্যাল লেখালেখি