বই নোটঃ ইসলামী আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তি

0
219

 বই নোটঃ ইসলামী আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তি

সাইয়েদ আবুল আলা মওদূদী

 

বইটি একটি ভাষণ, যা মাওলানা মওদূদী রহ. নিখিল ভারত জামায়াতে ইসলামীর সম্মেলনের সমাপ্তি অধিবেশনে প্রদান করেন সম্মেলনটি ১৯৪৫ সালের ২১শে এপ্রিল পূর্ব পাঞ্জাবের পাঠান কোর্টেরদারুল ইসলামেঅনুষ্ঠিত হয়

 

ভূমিকা

ইসলামী আন্দোলনের সর্বশেষ ও চূড়ান্ত লক্ষ্য নেতৃত্বের আমূল পরিবর্তন

নেতৃত্বের আমূল পরিবর্তন মানেঃ মানব জীবনের সকল ক্ষেত্র হতে ফাসেক, আল্লাহদ্রোহী ও পাপীষ্ঠ নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব ও প্রাধান্য নির্মূল করা এবং সেই জায়গায় সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা

আমরা বিশ্বাস করি, নেতৃত্ব পরিবর্তনের এই চেষ্টাসাধনা ও সংগ্রাম আমাদের দুনিয়া ও আখেরাতের আল্লাহর রেজামন্দি হাসিলের একমাত্র উপায়

নেতৃত্ব পরিবর্তনের এই বিষয়টির গুরুত্ব সম্পর্কে বর্তমান দুনিয়ার মুসলিম ও অমুসলিম  কেহই পরিপূর্ণরূপে সচেতন ও অবহিত নন

নেতৃত্ব পরিবর্তনের এই কাজটাকেমুসলমানরা মনে করে এটি একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য মাত্র বিষয়টির দ্বীনি গুরুত্ব কতটুকু তা মুসলমানেরা অনুধাবনে সমর্থ হয়না

নেতৃত্ব পরিবর্তনের এই বিষয় সম্পর্কে অমুসলিমদের মাঝে রয়েছে অজ্ঞতা ও হিংসা ফলে তারা মূল সমস্যা সম্পর্কে অচেতন

দুনিয়ার সর্বত্র মানব সমাজের সকল দুঃখদূর্দশা ও বিপদমুসিবতের কেন্দ্রীয় কারণ হচ্ছে মানুষের উপর ফাসেক, আল্লাহদ্রোহী, পাপী ও অসৎলোকের নেতৃত্ব

দুনিয়ার মানুষের কল্যাণ একান্ত ভাবে নির্ভরশীল পৃথিবীর সকল কাজকর্মে সৎ ও আল্লাহর অনুগত মানুষের হাতে নেতৃত্ব ন্যস্ত করা যা মানুষ হৃদয়ংগম করতে পারছে না

বিশ্বের মানব সমাজের অবস্থাঃ

   মহাবিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে, অত্যাচার-জুলুম ও নির্যাতন-নিষ্পেষণের সয়লাব বয়ে চলছে

   মানব চরিত্রে যে সর্বাত্মক ভাঙ্গন ও বিপর্যয় দেখা দিয়েছেমানবীয় সংস্কৃতিঅর্থনীতি ও রাজনীতির প্রতি রন্দ্রে রন্দ্রে যে বিষ সংক্রমিত হয়েছে

   পৃথিবীর যাবতীয় উপায়-উপাদান এবং মানব বুদ্ধির আবিস্কৃত সমগ্র শক্তি ও যন্ত্র যেভাবে মানুষের কল্যাণ ও উন্নতি বিধানের পরিবর্তে ধ্বংস সাধনের কাজে নিয়োজিত হচ্ছে এসবের জন্য মানব সমাজের বর্তমান নেতৃত্বই একমাত্র দায়ি

দুনিয়াতে সৎ ও সত্য প্রিয় লোকদের অভাব নাই কিন্তুঃ

   দুনিয়ার যাবতীয় কাজ-কর্মের কর্তৃত্ব এবং সমাজযন্ত্রের কোনো চাবিকাঠি তাদের হাতে নয়

   বর্তমান দুনিয়ার সব জায়গায় কর্তৃত্ব আল্লাহদ্রোহীআল্লাহ বিমুখজড়বাদী ও নৈতিক চরিত্রহীন লোকদের মুষ্ঠিতে।

এই অবস্থায় সংস্কার বা সংশোধনের জন্য উদ্যোগী এবং বিপর্যয় ও উশৃংখলার বদলে শান্তিশৃংখলা প্রত্যাশায় চেষ্টানুবর্তীরা কেবল সওয়াবের ওয়াজ নসিহত আর আল্লাহর গোলামীর জন্য উপদেশ আর চরিত্র সংশোধনের জন্য মৌখিক উৎসাহ প্রদানই মনজিলে পৌছার জন্য যথেষ্ট নয়

উপায় বা অপরিহার্য কর্তব্যঃ

   সত্যপ্রিয় ও ন্যায়পন্থী মানুষদের একত্রিত ও সুসংঘবদ্ধ হয়ে সামষ্টিক শক্তি অর্জন

   সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন পয়েন্টে বিরাজমান ফাসেক ও আল্লাহদ্রোহী নেতৃত্বের হাত থেকে সমাজ ও রাষ্ট্রকে কেড়ে নেয়া।

   সত্যপন্থী ও আদর্শবান মানুষের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার কার্যকরী পন্থা অবলম্বন করা।

 

নেতৃত্বের গুরুত্ব

মানব সমাজের কর্তৃত্ব ও চাবিকাঠি কার হাতে নিবদ্ধ? এর উপরই মানব জীবনের শান্তিস্বস্তি নিরাপত্তা এবং ভাঙন-বিপর্যয় ও অধপতন একান্তভাবে নির্ভরশীল।

যেমনঃ

   গাড়ী। সব সময় সে দিকেই যায়, তার ড্রাইভার যে দিকে পরিচালনা করে। আর যাত্রীরা সে দিকে যেতে বাধ্য-তা ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক।

   সমাজ নামক গাড়ীও ঠিক সে দিকে অগ্রসর হয়, যে দিকে তার নেতৃত্ব নিয়ে যায়।

   অতএবঃ

o  পৃথিবীর উপায় উপাদান যাদের নেতৃত্বে থাকবেঃ শক্তি, ক্ষমতা, এখতিয়ারের চাবিও তাদের হাতে থাকবে।

o  সেই সব নেতৃত্বের অধীনে জীবনযাপনকারী জনগন তাদের নেতৃত্বের বিপরীত দিকে চলতে পারেনাঃ

§  সাধারণ জনগনের জীবন যাদের হাতে নিবদ্ধ।

§  চিন্তাধারা, মতবাদ ও আদর্শের রূপায়ন বাস্তবায়নের জন্য অপরিহার্য উপায় উপাদান যাদের অর্জিত হবে।

§  ব্যক্তিগত স্বভাব-চরিত্র পুনর্গঠন, সমষ্টিগত নীতি ব্যবস্থার বাস্তবায়ন এবং নৈতিক মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা যাদের রয়েছে।

নেতৃত্ব আল্লাহর অনুগামী, সৎ আর সত্যাশ্রয়ী হলে, সমাজ জীবনের সকল ব্যবস্থাও আল্লাহভীতি, সার্বিক কল্যাণ ও ব্যাপক সত্যের উপর গড়ে উঠে ফলেঃ

   সেখানে অসৎ ও পাপীরাও সৎ এবং নেককার হতে বাধ্য হয়।

   কল্যাণ ও সৎ ব্যবস্থা এবং ভাল রীতিনীতি, আচারঅনুষ্ঠান বিকশিত হয়।

   অন্যায় আর পাপ একেবারে মিটে না গেলেও বিকশিত হতে পারেনা।

নেতৃত্ব আল্লাহদ্রোহী, ফাসেক, পাপীদের হাতে থাকলে সমাজ ব্যবস্থা আল্লাহদ্রোহীতা, জুলুম, অন্যায়, অনাচার ও অসচ্চরিত্রতার পথে চলঅ শুরু করে ফলেঃ

   বিপর্যন্ত হয় চিন্তাধারা, আদর্শ ও মতবাদ, জ্ঞানবিজ্ঞান, সাহিত্যশিল্প, রাজনীতি, অর্থনীতি, সভ্যতাসংস্কৃতি, সামাজিক রীতি ও আচার, নৈতিক চরিত্র, পারস্পরিক মুয়ামেলাত, বিচার ও আইন।

   অন্যায় আর পাপ ফুলেফলে বিকশিত হয়।

   কল্যাণ, ন্যায় আর সত্য মৃত্যু বরণ করে।

   দুনিয়া স্থান দেয়না ন্যায় আর সত্যকে। বায়ু আর পানি সত্য ও ন্যায়কে লালন পালন করতে অস্বীকৃতি জানায়।

   আল্লাহর দুনিয়া জুলুম শোষণে সয়লাব হয়ে যায়।

   এমন অবস্থায় অন্যায়ের পথে চলা হয়ে পড়ে সহজ আর ন্যায় ও সত্যের পথে চলা হয়ে উঠে কঠিন।

একটি মিছিলের উদাহরণঃ মিছিলের জনতা যে দিকে যায়সে দিকে যাওয়ার জন্য মিছিলের ব্যক্তিকে খুব একটা শক্তি ব্যয় করতে হয়না বরং ভিড়ের চাপে সে অটোমেটিক সে দিকে অগ্রসর হয় কিন্তু মিছিলের বিপরীত দিকে চলতে হলেও প্রবল শক্তি ব্যয় করেও এক কদম অগ্রসর হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে কেউ যদি একটি এগিয়েও যায়, তাহলে ভিড়ের চাপে সে দশ কদম পিছিয়ে আসে

 এই উদাহরণ আমাদের যা শিখায়ঃ অসৎ ও পাপী লোকদের নেতৃত্বে মানুষ যখন চলে, অন্যায়ের পথে চলা খুবই সহজ হয়ে পড়ে কিন্তু যখন এর বিপরীত তথা সত্যের পথে চলতে চাইলে দেহ মনের সকল শক্তি নিয়োগ করলেও অনিবার্য চাপে পাপ ও অন্যায়ের পথে চলতে বাধ্য হয়

এ বক্তব্য কোন বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব নয় তার প্রমাণ কিছু ঘটনাঃ

   গত এক শতাব্দি আমাদের অঞ্চলের মানুষের মতবাদ, চিন্তাধারা, দৃষ্টিভংগী, রুচি ও স্বভাবপ্রকৃতি, চিন্তাপদ্ধতি ও দৃষ্টিকোণ গভীর ভাবে পরিবর্তন হয়ে গেছে।

   সভ্যতা, চরিত্রের মানদন্ড, চরিত্রের মূল্য, চরিত্রের মাপকাঠি বদলে গেছে।

   আমাদের কোন জিনিস অপরিবর্তিত থাকেনি এবং এই পরিবর্তন আমাদের চোঁখের সামনে হয়েছে।

   এই পরিবর্তনের কারণ নেতৃত্ব। একটি অসৎ নেতৃত্ব সারা দেশের নৈতিক চরিত্র, মনোবৃত্তি, মনস্তত্ব, কাজকর্ম, পারস্পরিক মুয়ামালাত, সমাজসংস্থা ও ব্যবস্থা নিজেদের ইচ্ছা আর রুচি অনুযায়ী সাজিয়েছিল।

   এই পরিবর্তনের বিরোধিতা যারা করেছিলেন বা নেতৃত্ব যারা দিয়েছিলেনঃ

o    সময়ের পরিবর্তনের তাদেরই বংশধরেরা সেই পরিবর্তনের স্রোতে ভেসে গেছে।

o    আলেমদের বংশে নাস্তিক এবং সন্দেহপ্রবণ মুসলমানের সৃষ্টি হয়েছে।

উপরোক্ত আলোচনা তথা পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতা আমাদেরকে এই সিদ্ধান্তে পৌছায় যে, সকল সমস্যার মধ্যে সবেচেয়ে জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ সম্যা হচ্ছে নেতৃত্বের সমস্যা

নেতৃত্বের সমস্যা কেবল এযুগের সমস্যা নয়, এ সমস্যা একটি চিরন্তন সত্য ও চিরকালীন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

আরবী প্রবাদ হচ্ছেঃ الناس على دين ملوكهم “জনগণ নেতৃবৃন্দেরই আদর্শানুসারী হয়ে থাকে

হাদীসে রাসূলে জাতির উত্থান-পতন, গঠন ও ভাঙন ইত্যাদির জন্য দায়ী করা হয়েছে জাতির আলেম, পন্ডিত, শিক্ষিত লোক আর নেতাদের।

সূরা ইসরাঃ ১৬

 

সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা দীন ইসলামের মূল লক্ষ্য

উপরের উদাহরণ বা বিশ্লেষন থেকে সৎ আদর্শ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব ইসলামে কতটুকু তা সহজেই বুঝা যায়

সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে ইসলামের নির্দেশ হচ্ছেঃ

. দুনিয়ার সব মানুষ নিরংকুশ ভাবে আল্লাহর দাস হিসাবে জীবন যাপন করবে। এই দাসত্বের শৃংখল আল্লাহর ছাড়া আর কারো থাকবেনা।

. আল্লাহর দেয়া আইনকে মানব জীবনের একমাত্র আইন হিসাবে গ্রহণ করতে হবে।

. অশান্তি, বিপর্যয়, পাপ ও অন্যায় এ গুলো দুনিয়াবাসীর উপর আল্লাহ অভিশাপ আসার একমাত্র কারণ। তাই এগুলোকে দুনিয়া থেকে মূলসহ উপড়ে ফেলতে হবে।

ন্যায়, সত্য, কল্যাণ, কল্যাণ প্রতিষ্ঠা ও বিস্তার যারা করে, আল্লাহ তাদের পছন্দ করেন এবং ভালবাসেন

সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার এই উদ্দেশ্য সফল হতে পারেনাঃ

   যদি মানব জাতির নেতৃত্ব কাফের ও গোমরাহদের হাতে থাকে।

   ইসলামের অনুসারীরা সেই নেতৃত্ব থেকে সুবিধা নিয়ে ঘরের কোণে বসে আল্লাহর তথাকথিত জিকরএ মগ্ন থাকে।

সকল ন্যায়পন্থী ও আল্লাহ পন্থীদেরকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে শক্তি অর্জন করার মাধ্যমে নেতৃত্বের আমূল পরিবর্তন করে শক্তি প্রয়োগ করে আল্লাহর বিধান ইসলামকে কায়েম করার জন্য আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন

দ্বীনে হক কায়েম করতে হলে নেতৃত্বের পদ ও কর্তৃত্ব সর্বাপেক্ষা অধিক ঈমানদার, সৎ ও আদর্শবান মানুষের হাতে প্রদান করতে হবে

নেতৃত্ব পরিবর্তনের এই রাষ্ট্রীয় বিপ্লব ছাড়া দ্বীন ইসলামের মূল লক্ষ্য ও দাবী পূর্ণতা লাভ করতে পারে না

আর সে জন্য দ্বীন কায়েমের জন্য সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা ইসলামের মূল উদ্দেশ্য নির্ধারিত হয়েছে এটা উপলব্দি না করলে আল্লাহ সন্তোষ লাভ সম্ভব নয়

কুরআনে হাকীমে জামায়াতবদ্ধ হওয়া, নেতার আদেশ শোনা ও মানার বিষয়ে শুধু গুরুত্ব দেয়া হয়নি বরং জামায়াত থেকে স্বেচ্ছায় বের হয়ে যাওয়া ব্যক্তির অপরাধকে হত্যাযোগ্য  অপরাধ বলে গন্য করা হয়েছে যদিও সে কালেমায় বিশ্বাস করে, নামায রোযা পালন করে তার কারণঃ

সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা, দ্বীনে হক প্রতিষ্ঠা এবং দ্বীনে হকের স্থিতিশীলতার জন্য সমষ্টিগত ও সংঘবদ্ধ শক্তি অর্জন আবশ্যক আর যে এই কাজকে ক্ষতিগ্রস্থ করবে সে যত বড় ঈমানদার বা নামযী বা রোযাদার হোক না কেন, তার অপরাধ বড় ও মারাত্মক অপরাধ

কুরআন জিহাদের উপর অত্যাধিক গুরুত্ব আরোপের সাথে সাথে জিহাদ থেকে বিরত থাকার ব্যক্তিকেমুনাফিকবলে আখ্যা দিয়েছে কিন্তু কেন? কারণঃ

   জিহাদ হলো ইসলঅমের সত্য বিধান প্রতিষ্ঠার নামান্তর।

   জিহাদ হলো ঈমানদারের ঈমান পরীক্ষার মাপকাঠি।

   ঈমানদার ব্যক্তি বাতিল ও কাফেরী শাসন ব্যবস্থাতে কখনো সন্তুষ্ট থাকতে পারেনা।

   জিহাদের তথা সত্য দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা, জানমালের কুরবানী দেয়া, ইত্যাদি কাজে গড়িমসি প্রকাশের মাধ্যমে ঈমানের সংশয় প্রকাশ হয়।

   জিহাদে অংশ গ্রহণ না করলে হাজার হাজার সওয়ারে কাজ কোন কল্যাণ দিতে পারে না।

সত্য নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা ইসলামে একটি কেন্দ্রীয় ও মৌলিক বিষয়

ইসলামের প্রতি ঈমানদার ব্যক্তিগত জীবনে ইসলামকে পালন করার মাধ্যমে সব দায়িত্ব পালন হয়ে যায় না অসৎ নেতৃত্ব থেকে কর্তৃত্ব কেড়ে নিয়ে সৎ মানুষে হাতে নেতৃত্বের কর্তৃত্ব তুলে দেয়া ঈমানের ঐকান্তিক ও অনস্বীকার্য দাবী

আল্লাহর মর্জি অনুযায়ী পৃথিবীকে পরিচালনার জন্য নেতৃত্ব পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন উচ্চতর সামগ্রিক প্রচেষ্টা আর সেই জন্য প্রয়োজন আদর্শ জামায়াত যে জামায়াত সত্য নীতিকে অনুসরণ করবে, ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করবে, স্থায়ী রাখবে

দুনিয়ার একমাত্র ঈমানদার ব্যক্তির জন্যও আমি একাকী বা আমি নিঃসম্বল মনে করে বাতিল শাসন ব্যবস্থা সন্তুষ্ট চিত্তে গ্রহণ করা জায়েজ নেই

একই ভাবে أهون البليتين ‘দুটি বিপদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সহজতম বিপদকে গ্রহণ করারঅবাঞ্ছিত কূট-কৌশলের আশ্রয় নেয়াও জায়েজ নেই।

একাকী ও নিঃসংগ ঈমানদারের দায়িত্ব হচ্ছে এক থেকে দাওয়াতের কাজ শুরু করা। আর সেই দাওয়াতে কেউ সাড়া না দিলে সারা জীবন ইসলামের উপর ঠিকে থেকে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়া কর্তব্য

দ্বীন বিরুধী সত্যভ্রস্ট দুনিয়ার পক্ষে কোন প্রচার করা ও কাফেরদের নেতৃত্বের অধীনে ছুটে চলার চেয়ে সত্যের বানী প্রচার করতে করে মৃত্যু বরণ করাই শ্রেষ্ট

এক ব্যক্তির আমন্ত্রনে যদি কিছু লোক পাওয়া যায়, তাহলে তাদেরকে নিয়ে সংগঠন কায়েম করে নেতৃত্ব পরিবর্তনের চেষ্টা করাই একান্ত কর্তব্য

সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা ইসলামে দাবীএটা কুরআন পড়ে যেমন বুঝা যায়, তেমনি বুঝা যায় এটা নবীদের সুন্নাত

 

নেতৃত্বের ব্যাপারে আল্লাহর নিয়ম

একজন কৃষকের উদাহরণঃ

   কৃষি কাজে বীজ অংকুরণের জন্য আল্লাহ নির্ধারিত নিয়ম হচ্ছে পরিপূর্ণ শ্রম সহকারে কৃষি কাজ সম্পন্ন করা। কেবলমাত্র একজন বুজুর্গ, মহৎ গুণের আধার অথবা তাসবীহ পাঠের মাধ্যমে কৃষি কাজে একটি বীজও অংকুরিত হয়না।

   নেতৃত্ব প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও আল্লাহ নির্ধারিত নিয়ম রয়েছে। কেবল সদিচ্ছা বা নেক বাসনার কারণে এই পৃথিবীতে সাফল্য লাভ করা যায়না। কোন মহান আত্মার বরকতে এখানে বাসনা বাস্তবে রূপ নেয় না। বরং এর জন্য আল্লাহ একটি নিয়মে যেমন এই পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, ঠিক এখানকার প্রত্যেকটি বস্তুও একটি স্থায়ী ও অটল নিয়মের অনুসারী।

   নেতৃত্ব লাভ করতে হলে আল্লাহর নিয়মকে অনুসরণ করতে হবে।

   নেতৃত্ব বিপ্লবের উদ্দেশ্য সাধনের জন্য কেবল দোয়া, তাবীজ, সহীহ নিয়ত ইত্যাদি করলে হবে না। আল্লাহর নিয়ম অনুধারণ করতে হবে। চূড়ান্ত উদ্দেশ্য ও চরম লক্ষ্যে বুঝার পর আল্লাহর নিয়ম নীতি কি তাও জানতে হবে। আল্লাহর নিয়মেই নেতৃত্ব লাভ সম্ভব, বিপরীত পদ্ধতিতে নয়।

মানুষ নামক পুরো সত্তাটাকে বিশ্লেষণ করলে আমরা দুটি পরস্পর বিরোধী বস্তু অথচ পরস্পরে ওতপ্রোতভাবে জড়িত বস্তু পাই

. মানুষের স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ও পাশবিক সত্তা। যার উপরে সেই নিয়ম জারি করা রয়েছে, যা অন্যান্য জন্তু জানোয়ারের উপর জারি করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দুনিয়ার সকল জড় পদার্থ যেমন যন্ত্রপাতি, বৈষয়িক উপায় উপদান। নেতৃত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রে এই সব বস্তু মানুষকে ব্যবহার করতে হবে। এবং এই সব বস্তুর ব্যবহার মানুষের নেতৃত্বে আসীন ওয়ার ক্ষেত্রে বড় প্রভাব বিস্তার করে।

. মানুষের মানবিক দিক বা মানুষ হওয়ার দিক। যাকে বলে নৈতিক দিক। যা কোন ভাবেই প্রাকৃতিক সত্তার অধীন বা অনুসারী নয়। এই নৈতিক সত্তা মানুষে স্বাভাবিক প্রাকৃতিক সত্তার উপর প্রভূত্ব বিস্তারি করে। এই নৈতিক সত্তা স্বাভাবিক সত্তাকে ব্যবহার করে অস্র হিসাবে।

আল্লাহ মানুষের মাঝে যে নৈতিক ও চারিত্রিক গুণ দিয়েছেন, সেই গুণ হচ্ছে বস আর জাগতিক শক্তির উপর এই সত্তা বসগিরি করে প্রাকৃতিক নিয়মের কোন প্রভূত্ব নৈতিক সত্তার উপর চলে না

 

 

মানুষের উত্থান-পতন নৈতিক চরিত্রের উপর নির্ভরশীল

বৈষয়িক শক্তি এবং নৈতিক শক্তি এই দুই শক্তি মানুষে মাঝে বিদ্যমান

মানুষের সফলতাব্যর্থতা, উত্থানপতন বৈষয়িক ও নৈতিক উভয় শক্তির উপর নির্ভরশীল

মানুষ বৈষয়িক শক্তি থেকে যেমন নিরপেক্ষ হতে পারেনা, নৈতিক শক্তির মুখাপেক্ষী না হয়ে বাঁচতে পারেনা

মানুষ উন্নতি লাভ করুন অথবা পতন হোক কিংবা দূর্বল বা নিস্তেজ হোকসর্বাবস্থা সৃষ্টি হবে এই উভয় শক্তির মাধ্যমে

মানুষের জীবনের মূল সিদ্ধান্তকারী শক্তি হচ্ছে নৈতিক শক্তি, বৈষয়িক শক্তি নয়

বৈষয়িক শক্তি সাফল্য লাভের জন্য অপরিহার্য কিন্তু মানুষের উত্থান, পতনে ভাগ্য নির্ধারণ করে নৈতিক শক্তি

মানুষকে মানুষ বলা হয় তার নৈতিক শক্তির কারণে, দেহসত্তা বা পাশবিক দিকের কারণে নয়

মানুষের একটা দেহ আছে, স্বতন্ত্র সত্তা আছে, শ্বাসপ্রশ্বাস গ্রহণ করে, বংশ বৃদ্ধি করে এই জিনিসটা পশুরও আছে তাই কেবল এই কারণে স্বতন্ত্র মর্যাদার অধিকারী হতে পারেনা মানুষ মর্যাদাবান হয় তার নৈতিক গুণ, নৈতিক স্বাধীনতা ও নৈতিক দায়িত্বের কারণে

মানুষ দুনিয়াতে আল্লাহর খলিফার মর্যাদা পেয়েছে তার নৈতিক গুণের কারণে

মানুষের উত্থান পতনে মানুষের নৈতিক নিয়মবিধান প্রত্যক্ষ ভাবে বিদ্যমান

মানুষের নৈতিক চরিত্র বিশ্লেষন করলে তাতে দুইটি প্রধান দিক ভেসে উঠে

. মৌলিক মানবীয় চরিত্র

. ইসলামী নৈতিক চরিত্র

 

মৌলিক মানবীয় চরিত্রের বিশ্লেষণ

মৌলিক মানবীয় চরিত্র এমন কিছু গুণ, যার উপরে মানুষের নৈতিক সত্তার ভিত্তি স্থাপিত হয়।

মৌলিক মানবীয় চরিত্র এমন কিছু গুনাবলীর সমাবেশ, যা মানুষকে সাফল্যের স্বর্ণ শিখরে নিয়ে যায়। এক্ষেত্রে তার উদ্দেশ্য সৎ হোক কিংবা অসৎ, সে নাস্তিক হোক বা আস্তিক, তার মন, নিয়ত, উদ্দেশ্য কল্যাণ মূলক হোক বা অকল্যাণ মূলক, সৎ উদ্দেশ্যে সে কাজ করুক বা অসৎ উদ্দেশ্যে, সে ঈমানদার নতুবা বেঈমানসকল ক্ষেত্রেই তার সাফল্য অনিবার্য।

মৌলিক মানবীয় চরিত্রের গুণ অর্জনে যারা পিছনে, দুনিয়ার প্রতিদ্বন্ধিতায়ও তারা পিছনে থাকবে।

মানুষ আকীদা বা আমলের দিক দিয়ে ঈমানদার বা কাফের, নেককার বা বদকার, কুসংস্কারাচ্ছন্ন বিপর্যয়কারী-যাই হোক না কেন, দুনিয়াতে বিজয় সুনিশ্চিত করার জন্য নিম্নোক্ত গুনাবলীর অধিকারী হতে হয়ঃ

১. ইচ্ছাশক্তি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ শক্তি।

২. প্রবল বাসনা।

৩. উচ্চাশা ও নির্ভীক সাহস।

৪. সহিষ্ণুতা ও দৃঢ়তা তিতিক্ষা।

৫. কৃচ্ছ্রসাধনা।

৬. বীরত্ব ও বীর্যবত্তা।

৭. সহনশীলতা ও পরিশ্রম প্রিয়তা।

৮. উদ্দেশ্যের আকর্ষণ।

৯. সবকিছুরই উৎসর্গ করার প্রবণতা।

১০. সতর্কতা।

১১. দূরদৃষ্টি ও অন্তরদৃষ্টি বোধশক্তি।

১২. বিচার ক্ষমতা।

১৩. পরিস্থিতি যাচাই করা।

১৪. নিজেকে ঢেলে গঠন করা।

১৫. অনুকূল কর্মনীতি গ্রহণ করার যোগ্যতা

১৬. হৃদয়াবেগ।

১৭. ইচ্ছা বাসনা।

১৮. স্বপ্ন সাধ।

১৯. উত্তেজনার সংযমশক্তি।

২০. মানুষকে আকৃষ্ট করা।

২১. মানুষের হৃদয়মনে প্রভাব বিস্তার করা।

২২. মানুষকে কাজে নিযুক্ত করার দুর্বার বিচক্ষণতা।

নিম্নোক্ত গুণ গুলো মানুষত্বের মূল। যাকে বলা হয় সৌজন্য ও ভদ্রতামূলক স্বাভাব-প্রকৃতি। যার মাধ্যমে মানুষের সম্মান মর্যাদা মানুষের সমাজে স্বীকৃতি পায় এবং প্রতিষ্ঠিত হয়। আর তা হলোঃ

১. আত্মসম্মান জ্ঞান।

২. বদান্যতা।

৩. দয়া-অনুগ্রহ।

৪. সহানুভূতি।

৫. সুবিচার।

৬. নিরপেক্ষতা।

৭. ঔদার্য।

৮. হৃদয়মনের প্রসারতা।

৯. বিশালতা।

১০. দৃষ্টির উদারতা।

১১. সত্যবাদিতা ও সত্যপ্রিয়তা।

১২. বিশ্বাসপরায়ণতা।

১৩. ন্যায়-নিষ্ঠা।

১৪. ওয়াদাপূর্ণ করা।

১৫. বুদ্ধিমত্তা।

১৬. সভ্যতা।

১৭. ভব্যতা।

১৮. পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা।

১৯. মন ও আত্মার সংযম শক্তি।

উপরে বর্ণিত গুণগুলো যে জাতি বা মানব গোষ্ঠীর অধিকাংশ মানুষের মাঝে পাওয়া যায়, মানবতার প্রকৃত মূলধন তারা অর্জন করেছে মনে করতে হবে। যার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী সমাজ ব্যবস্থা গঠন করা অতীব সহজসাধ্য হয়।

এই ধরণের মূলধন একটি সুদৃঢ় ও ক্ষমতাসম্পন্ন সামাজিক রূপ লাভ করতে প্রয়োজন এর সাথে আরো কিছু নৈতিক গুণ। যেমনঃ

১. সমাজের অধিকাংশ মানুষ একটি সামগ্রিক লক্ষ্যকে নিজেদের চরম লক্ষ্যরূপে গ্রহণ করবে।

২. গ্রহণ করা লক্ষ্যকে তার ব্যক্তিগত স্বার্থ-নিজের ধন-প্রাণ ও সম্পদ-সন্তান হতেও অধিক ভালবাসবে।

৩. পরস্পরের মধ্যে প্রেম ভালবাসা ও সহানুভূতির মনোভাব প্রবল হবে।

৪. পরস্পর মিলেমিশে কাজ করার মনোভাব থাকবে।

৫. যতটুক আত্মদান অপরিহার্য, তা করতে প্রস্তুত থাকবে।

৬. ভাল ও মন্দ নেতার মধ্যে পার্থক্য করার বুদ্ধি-বিবেচনা তাদের থাকতে হবে-যাতে যোগ্য ব্যক্তি নেতা নিযুক্ত হয়।

৭. নেতৃবৃন্দের অপরিসীম দূরদৃষ্টি ও গভীর ঐকান্তিক নিষ্ঠা এবং নেতৃত্বের জন্য অপরিহার্য অন্যান্য গুণাবলীও বর্তমান থাকতে হবে।

৮. সকলকে নেতৃবৃন্দের আদেশ পালনে অভ্যস্থ হতে হবে।

৯. নেতৃত্বের উপর জনগণের বিপুল আস্থা থাকতে হবে।

১০. নেতৃবৃন্দের নির্দেশে নিজেদের সমগ্র হৃদয়, মন, দেহের শক্তি এবং যাবতীয় বৈষয়িক উপায়-উপাদান ত্যাগ করতে প্রস্তুত থাকবে।

১১. পুরো জাতির জনমত এতো সজাগ-সচেতন ও তীব্র হতে হবে, যাতে কল্যাণের বিপরীত ক্ষতিকারক কোনো জিনিসকেই নিজেদের মধ্যে টিকতে দেবে না।

উপরে বর্ণিত গুনাবলী গুলোকে বলে মৌলিক মানবীয় চরিত্র। কারণ এগুলো মানুষের নৈতিক শক্তি ও প্রতিবার মূল উৎস।

মৌলিক মানবীয় চরিত্র হচ্ছে ইস্পাতের মতো। যার মাধ্যমে তৈরী হয় ধারালো অস্র। এটাই ইস্পাতের স্বার্থকতা। ঐ ধারালো অস্র কিভাবে ব্যবহৃত হলো, তার সাথে সম্পর্ক ব্যবহারকারীর।

যে সৎ উদ্দেশ্যে কাজ করতে চায়, তার জন্য ইস্পাতের অস্রই উপযোগী, কাঠের অস্র নয়।

রাসূল সা. এর হাদীসে এখানে বিশেষ ভাবে উল্লেখ যোগ্যঃ خياركم فى الجاهلية خياركم فى الاسلامতোমাদের মধ্যে ইসলাম পূর্ব জাহেলি যুগের উত্তম লোকগণ ইসলামী যুগেও উত্তম ও শ্রেষ্ঠ প্রমাণিত হবে।

মূল হাদীসঃ

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ، قَالَ: قِيلَ: يَا رسولَ الله، مَنْ أكرمُ النَّاس؟ قَالَ: «أَتْقَاهُمْ»، فَقَالُوا: لَيْسَ عَنْ هَذَا نسألُكَ، قَالَ: «فَيُوسُفُ نَبِيُّ اللهِ ابنُ نَبِيِّ اللهِ ابنِ نَبيِّ اللهِ ابنِ خليلِ اللهِ»، قالوا: لَيْسَ عَنْ هَذَا نسألُكَ، قَالَ: «فَعَنْ مَعَادِنِ العَرَبِ تَسْأَلوني؟ خِيَارُهُمْ في الْجَاهِليَّةِ خِيَارُهُمْ في الْإِسْلَامِ إِذَا فقُهُوا». متفق عليه.

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ، قَالَ:سُئِلَ رسولُ اللهِ صلَّى اللهُ عليهِ و سلَّمَ : أيُّ الناسِ أَكْرَمُ ؟ قال : أَكْرَمُهُمْ عندَ اللهِ أَتْقَاهُمْ . قالوا : ليس عن هذا نَسْأَلُكَ ، قال : فَأَكْرَمُ الناسِ و في روايةٍ : إنَّهُ الكريمُ ابنُ الكريمِ يُوسُفُ نَبِيُّ اللهِ ابْنُ نبيِّ اللهِ ابنِ نبيِّ اللهِ ابنِ خَلِيلِ اللهِ . قالوا : ليس عن ذلكَ نَسْأَلُكَ ، قال : فَعَنْ مَعَادِنِ العَرَبِ تَسْأَلونِي ؟ قالوا : نَعَمْ ، قال : فَخِيارُكُمْ في الجاهليةِ خِيارُكُمْ في الإسلامِ إذا فَقِهوا

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ، عن النبي قالالناس معادن كمعادن الذهب والفضة، خيارهم في الجاهلية خيارهم في الإسلام إذا فقهوا، والأرواح جنود مجندة، فما تعارف منها ائتلف، وما تناكر منها اختلف

 

জাহেলিয়াতে যে যোগ্য, কর্মক্ষম ও প্রতিভাধর ছিল, ইসলামে এসে সেই যোগ্যতম কর্মী বা নেতা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। পার্থক্য এটুকু যে, আগে যোগ্যতা ও প্রতিভা ভূল পথে ব্যয় হতো, এখন সঠিক পথে ব্যয় হয়।

অকর্মণ্য লোক জাহেলিয়াতে যেমন কোন কিছু করতে পারেনি, ওরা ইসলামেও কিছু করতে সমর্থ নয়।

রাসূল সা. এর অনুসারী ও সংগী হয়েছিলেন আরবের  সর্বাপেক্ষা উত্তম ও প্রতিভা সম্পন্ন মানুষ গুলো। ফলে খুব কম সময়ে সিন্ধু থেকে আটলান্টিক মহাসাগরের উপকুল পর্যন্ত  বিরাট এলাকায় ইসলামের বিস্তার লাভ করেছিল।

আরবের অকর্মণ্য, অপদার্থ, বীর্যহীন, ইচ্ছাশক্তি বিবর্জিত, বিশ্বাস-অযোগ্য লোকরা যদি নবী সা.এর অনুসারী ও সংগী হতো, তাহলে এমন তিড়ৎ ফল পাওয়া যেতো না।

ইসলামী নৈতিকতা

 

মানুষের নৈতিক চরিত্র বিশ্লেষন করলে চরিত্রের যে দুইটি দিক পাওয়া যায়, তার একটা হলো উপরের মৌলিক মানবিয় চরিত্র আর অপরটি হলোঃ ইসলামী নৈতিকতা এই চরিত্রটা হচ্ছে মৌলিক মানবীয় চরিত্রকে বিশুদ্ধ করে এবং এর পরিপূরক

ইসলাম মানুষের মৌলিক মানবয়ি চরিত্রকে সঠিক ও নির্ভূল পয়েন্টের সাথে যুক্ত করে দেয় ফলে তা কল্যাণকর ও মঙ্গলজনক হয়ে যায়

মৌলিক মানবীয় চরিত্র একটা নিউট্রেল বস্তু বিধায় তা ভালমন্দ, কল্যাণঅকল্যাণ সব হতে পারে যেমনঃ একটা তরবারীযা ডাকারেত হাতে থাকলে জুলুমের হাতিয়ার হবে অপর দিকে মুজাহিদের হাতে থাকলে কল্যাণ আর মঙ্গলের নিয়ামক হবে

তাওহীদি দাওয়াতের লক্ষ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন দাওয়াত কবুলকারীরা তাই আল্লাহর সন্তুষ লাভের জন্য সাধনা ও মেহনত করে বলেঃ

   واليك نسعى ونحفد “হে আল্লাহ! আমাদের সকল চেষ্টা-সাধনা এবং সকল দুঃখ ও শ্রম স্বীকারের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে তোমার সন্তোষ লাভে।

   اياك نعبدولك نصلى ونسجد “হে আল্লাহ! আমরা তোমারই দাসত্ব করি এবং তোমার জন্য আমরা নামায ও সিজদায় ভুলুণ্ঠিত হই।

প্রচেষ্টার এই ধারাবাহিকতায় মানুষের জীবন ও মনের শক্তি নিয়ন্ত্রিত ও সংশোধিত হয় সংশোধনের এই ধারাবাহিকতায় যে সব মানুষের মাঝে মানবীয় চরিত্র আছে, তা নিম্নোক্ত অবস্থা ধারণ করেঃ

. মৌলিক মানবীয় চরিত্রটা নিউট্রেল অবস্থা থেকে সঠিক পথে পরিচালিত হওয়া শুরু করে এই ধারাবাহিকতা চূড়ান্ত ভাবে ব্যক্তি, বংশ, পরিবার, দেশ, জাতির শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের চেয়ে একান্তভাবে হকের বিজয়ের জন্য লক্ষ্যে পৌছে যার ফলে তা সারা পৃথিবীতে রহমত ও কল্যাণের বিরাট উৎস হয়ে দাড়ায়

. ইসলাম মৌলিক মানবীয় চরিত্রকে সুদৃঢ় করে দেয় এবং তা সীমাহীন সম্প্রসারিত হয় যেমন ধৈর্যের উদাহরণঃ সবচেয়ে বেশী ধৈর্যশীল ব্যক্তির ধৈর্য যদি বৈষয়িক স্বার্থে হয় আর তা যদি শিরক বা বস্তবাদী চিন্তা থেকে রস নেয়, তাহলে তার একটা সীমা থাকে এক সময় তা শেষ হয়ে যায় যার পরিসমাপ্তি হয় নিস্তেজ ও নিষ্প্রভ হওয়ার মধ্য দিয়ে কিন্তু ধৈর্যের রস যদি তাওহীদের উৎস থেকে গ্রহণ করা হয়, তাহলে তা কেবলমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে হয় নিবেদিত ফলে ধৈর্যের সীমা অতল মহাসাগর স্পর্শ করে ফলে মহাবিপদেও তা শুষ্ক হয়না

   বাস্তব ক্ষেত্রে অমুসলিমদের ধৈর্য খুবই সংকীর্ণ ও নগন্য হয়ে থাকে। যেমন যুদ্ধের ময়দানে তারা দৃঢ়তার সাথে ধৈর্য ধরে অগ্রসর হয়। কিন্তু যুদ্ধ শেষে তাদের ধৈর্য ঠিকে থাকেনা। তােই পাশবিক লালসা চরিতার্থ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

   অপর দিকে মুসলমানদের ধৈর্য সীমাহীন। সেই ধৈর্য নির্দিষ্ট কয়েকটি ব্যাপারে নয়, বরং সকল প্রকার লোভলালসা, ভয়, আতংক, শংকা, দূঃখদূর্দশা, বিপদমুসিবত, ক্ষতিলোকসান, পাশবিক প্রবৃত্তির হাতচানিসকল ক্ষেত্রে তারা সবর এখতিয়ার করে ঠিকে থাকে। মুমিনের জীবনে এক বিন্দু সফলতা না থাকলেও চিন্তা ও কর্মক্ষেত্রে কোন পদস্খলন হয়না। অগনিত লোভ লালসা হাতচানি দিয়ে ডাকলেও সে অন্যায় এবং পাপ এই কারণে বিরত থাকে। যাকে শরীয়া সবর নামে আখ্যায়িত করেছে।

   উপরোক্ত কারণ সমূহের কারণে কাফেরদের মৌলিক মানবীয় গুনাবলী আর মুসলমানদের মৌলিক মানবীয় গুনাবলীতে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।

. মৌলিক মানবীয় চরিত্রের মাঝে ইসলাম নৈতিকতার এক অতি জাঁকজমকপূর্ণ পর্যায় রচনা করে যার ফলে মানুষঃ

   সৌজন্য ও মাহাত্মের উচ্চ ও চূড়ান্ত পর্যায়ে আরোহন করে।

   স্বার্থপরতা, আত্মম্ভরিতা, অত্যাচার, নির্লজ্জতা, অসংলগ্নতা, উশৃংখলতা হতে পবিত্র হয়।

   আল্লাহর ভয়, তাকওয়া, আত্মশুদ্ধি, সত্যবাদিতা, সত্যপ্রিয়তা মনে জেগে উঠে।

   নৈতিক দায়িত্ববোধ গড়ে তুলে।

   সৃষ্টি জগতের প্রতি দয়াবান, সৌজন্যশীল, অনুগ্রহ সম্পন্ন, সহানুভূতিপূর্ণ, বিশ্বাসভাজন, স্বার্থহীন, সদিচ্ছাপূর্ণ, নিষ্কলুষ নিমর্মল ও নিরপেক্ষ, সুবিচারক এবং সার্বক্ষনিক সত্যবাদী ও সত্যপ্রিয় হয়ে ‍উঠে।

   এমন এক প্রকৃত ধারণ করে, যার কারণ সব সময় তার কাছ থেকে সব সময় ভাল জিনিসের আশা করা যায় এবং খারাপ তার দিক থেকে পাওয়ার আশংকা থাকেনা।

   মানুষ শুধু ব্যক্তিগত ভাবে সৎ হয়না বরং সে কল্যাণের দরজা উদঘাটনকারী এবং অকল্যাণ রোধকারী হয়ে উঠে। হাদীসের ভাষায়ঃ مفتاح للخير ومفلاق لشر কল্যাণের দ্বার উৎঘাটন এবং অকল্যাণের পথ রোধকারী

   এমন ইসলামী নৈতিকতার ধারকের উপর ন্যায়ের প্রচার ও প্রতিষ্ঠা এবং অন্যায়ের প্রতিরোধ ও মূলোৎপাটনের বিরাটপ কর্তব্য পালনের দায়িত্ব প্রদান করে।

   আর এমন গুনাবলী সম্পন্ন মানুষের সর্বাত্মক বিজয়াভিযানে মোকাবেলা করা কোন পার্থিব শক্তির সাধ্যের মধ্যে থাকেনা।

 

 

নেতৃত্ব সম্পর্কে আল্লাহর নীতির সারকথা

দুনিয়ায় কাউকে নেতৃত্ব প্রদানের জন্য সৃষ্টির সূচনা থেকে আল্লাহর একটি স্থায়ী নিয়ম বা রীতি চলে আসছে দুনিয়া যতদিন থাকবে, ততদিন এই নিয়ম জারী থাকবে

দুনিয়াতে যখন ইসলামী নৈতিকতা ও মৌলিক মানবীয় চরিত্রের অধিকারী এবং জাগতিক উপায় উপকরণ ব্যবহারে পারদর্শী কোন সংসংগঠিত দল থাকে, তখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দুনিয়ার নেতৃত্ব এমন দলের হাতে দেন, যে দল মৌলিক মানবীয় চরিত্রে ভূষিত এবং জাগতিক উপায় উপকরণ ব্যহারে অন্য যে কোন দল থেকে অধিকতর অগ্রসর

আল্লাহ চান, তার এই পৃথিবীর শৃংখলা বিধান বিধায় শংখলা বিধানে যে দল সবচেয়ে বেশী যোগ্য বলে প্রমাণিত হয়, আল্লাহ দুনিয়ার নেতৃত্ব তাদের হাতেই অর্পন করেনএটা আল্লাহর স্থায়ী নীতি

যখন ইসলামী নৈতিকতা ও মৌলিক মানবীয় চরিত্র উভয় দিক দিয়ে যখন কেউ সর্বাধিক শ্রেষ্ট প্রমাণিত হবে, তখন পৃথিবীর নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব তার হাতেই অর্পিত হবে অন্য কারো কাছে যাওয়া অসম্ভব এবং আল্লাহর স্থায় নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত

এই ধরণের লোকদের হাতে ক্ষমতা প্রদান করার ব্যাপারে কুরআনে আল্লাহর ওয়াদা রয়েছে বিধায় এই অবস্থায় কাফেরদের হাতে নেতৃত্ব থাকবে এ ধারণা করা যেতে পারে না

কিন্তু মনে রাখতে হবে যে, কোন এক ব্যক্তির সৎ হওয়া বা বিচ্ছিন্ন ভাবে অসংখ্য ব্যক্তির সৎ হওয়ার মাধ্যমে এই শর্ত পূরণ হয়না এই ধরণের সৎ ব্যক্তি যত বড় আল্লাহর ওলী বা নবী হোন না কেন, আল্লাহর নিয়ম অনুযায়ী সে নেতৃত্ব পাবেনা

আল্লাহ নেতৃত্ব প্রদান করার জন্য যে ওয়াদা করেছেন, তা কোন ব্যক্তিকে নয় বরং দলকে বলা হয়েছে ওরা নিজেকে خيرامة “সর্বোত্তম জাতি”  امة وسطا “মধ্যম পন্থানুসারী জাতি” বলে নিজেরেদ প্রমাণ করতে হবে

অবস্থা এমন নয় যে, মৌলিক মানবীয় গুনাবলী ও ইসলামী নৈতিকতায় সমৃদ্ধ একটা দল তৈরী হবে আর সংগে সংগে আকাশ থেকে ফেরেশতা নাযিল হয়ে কাফের ও ফাসেকদেরকে নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব হতে বিচ্যুত করে এই দলকে ক্ষমতায় আসীন করবেন।

বরং নিয়ম হচ্ছে, জীবনের প্রত্যেকটি দিক ও বিভাগে কাফের ও ফাসেক নেতৃত্বে সাথে দ্বন্দ্ব ও প্রত্যক্ষ মোকাবেলা হবে। আর সেই মোকাবেলা সত্যপ্রীতির উত্তম পরাকাষ্টা প্রমাণ করতে হবে, নেতৃত্বকে শক্তির মাধ্যমে ছিনিয়ে আনার যোগ্যতা প্রদর্শন করতে হবে-যা নবীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য ছিল।

 

মৌলিক মানবীয় চরিত্র ও ইসলামী নৈতিক শক্তির তারতম্য

নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় নৈতিক শক্তির গুরুত্ব খুবই বেশী যেখানে নৈতিক মক্তি মানে মৌলিক মানবীয় চরিত্র, সেখানে জাগতিক উপায় উপাদান ও জড়শক্তির গুরুত্ব অপরিসীম কোথাও যদি বৈষয়িক জড়শক্তি বিপুল পরিমাণে বর্তমান থাকে, তাহলে সামান্য নৈতিক শক্তির মাধ্যমে বিজয় অর্জন করা যায়

কোথাও নৈতিক শক্তি প্রবল হলেও কেবলমাত্র বৈষয়িক শক্তির অভাবে পিছে পড়ে যেতে হয়

যেখানে ইসলামী নৈতিকতা ও মৌলিক মানবীয় চরিত্র দুইটি সমন্বয় করা হবে, সেখানে বৈষয়িক জড়শক্তির কম হলেও নৈতিক শক্তির কারণে বিজয় লাভ করা যাবে

অংকের হিসাবেঃ

মৌলিক মানবীয় চরিত্র+ বৈষয়িক জড়শক্তি ১০০% = বিজয়

ইসলামী নৈতিকতা+মৌলিক মানবীয় চরিত্র+বৈষয়িক জড়শক্তি ২৫%=বিজয়

ইসলামী নৈতিকতা=৭৫%

রাসূল সা. এর সময়ে মাত্র ৫% জড়শক্তি বিজয়ের জন্য যথেষ্ট ছিল যা কুরআনে বলা হয়েছেঃ ان يكن منكم عشرون صابرون يغلبوا مائتينতোমাদের মধ্যে যদি বিশজন পরম ধৈর্যশীল লোক হয় তবে তারা দুশ জনের উপর জয়ী হতে পারবে।

মাত্র ৫% জড়শক্তি নিয়ে বিজয়ী হওয়ার এই তথ্যটিঅন্ধভক্তি ভিত্তিক ধারণাঅথবা মোজেযা বা কেরামত নয়

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ইসলামী নৈতিকতা কিভাবে ৭৫% বা ৫০% বৈষয়িক জড়শক্তির প্রয়োজন কিভাবে পুরণ করবে?

বিষয়টা বুঝানোর জন্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে পর্যালোচনা করা হয়েছে যেখানে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, জাপান ও জার্মানীর কেন পরাজয় হলো কারণ যুদ্ধরত দল গুলো মৌলিক মানবীয় চরিত্রের দিকে দিয়ে সমানে সমান ছিল এমন কি কোন কোন ক্ষেত্রে জাপান ও জার্মানীর মৌলিক মানবীয় চরিত্র ছিল অধিক  কিন্তু মিত্র পক্ষের বৈষয়িক কার্যকারনের আনুকল্য বেশী ছিল তাদের জনশক্তি ছিল কয়েক গুণ বৈষয়িক জড় উপায়উপাদান তাদের ছিল অধিক ছিল ভৌগলিক ও ঐতিহাসিক আনুকূল্য ইত্যাদি কারণে দুই পক্ষের  মৌলিক মানবীয় চরিত্র সমান হওয়ার পরও বৈষয়িক আনুকূল্যে মিত্রপক্ষ বিজয়ী হয়

যে জাতির জনসংখ্যা বেশী, বৈষয়িক জড় উপায় উপাদান বেশী তারাই বিজয়ী হয় যাদের জনসংখ্যা কম, তারা দাড়াতে পারেনা

মৌলিক মানবীয় চরিত্র আর প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের ভিত্তিতে উদ্ভাসিত জাতি হয় জাতীয়তাবাদী, তারা অন্যান্য অঞ্চল দখল করতে চায় অথবা অন্যান্য অঞ্চলকে নিজেদের আদর্শ ও নিয়মের সমর্থক করতে চায় এমন জাতির ২টি অবস্থার মধ্যে যে কোন একটি অবস্থা হওয়া অনিবার্যঃ

o    এই জাতির বৈষয়িক জড়শক্তি ও জাগতিক উপায়উপাদানের দিক দিয়ে অন্যান্য জাতির চেয়ে শ্রেষ্ঠ ও অগ্রসর হওয়া ছাড়া প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়লাভ করার অন্য কোন পথ থাকবেনা কারণ যে সব জাতিকে সে ধ্বংস  করার জন্য বা তার উপর কর্তৃত্ব করার জন্য অগ্রসর হবে, সেই সব জাতি তীব্র ঘৃণা ও বিদ্বেষী মনোভাব নিয়ে প্রতিরোধ করবে এবং এ ক্ষেত্রে তারা তাদের সর্বশক্তি প্রয়োগ করবে

o    জাতি যদি হয় কোন আদর্শের নিশান বরদার, তাহলে ঐ জাতি যদি মস্তিষ্ক প্রভাবান্বিত করার নীতি গ্রহণ করে, তাহলে যে জাতির উপর  বিজয়ী হবার উদ্যোগী হবে, তাদেরকে পরাজিত করতে বেশী শক্তি প্রয়োগ করতে হবে না কিন্তু এখানে লক্ষনীয় বিষয় হচ্ছেঃ

   কিছু মনভূলানো নীতি আদর্শ কখনো মানুষের মান মানসিকতাকে প্রভাবিত করতে পারে না

   এজন্য প্রয়োজন সদিচ্ছা, সহানুভূতি, হিতাকাংখা, সততা, সত্যবাদিতা, নিঃস্বার্থতা, উদারতা, বদান্যতা, সৌজন্য ও ভদ্রতা এবং নিরেপেক্ষ সুবিচার নীতি

   এই গুণ গুলো হতে হবে অকৃত্রিম ও নিষ্কলুষযা যুদ্ধসন্ধি, জয়পরাজয়, বন্ধুতাশত্রুতা সকল পরিস্থিতিতে কঠিন পরিক্ষায় প্রমাণিত

   এই ভাবধারা স্থান মৌলিক মানবীয় চরিত্রের অনেক উর্ধেউন্নত চরিত্রের উচ্চতম ধাপের সাথে সম্পর্কিত

বিধায়, নিছক মৌলিক মানবীয় চরিত্র ও বৈষয়িক শক্তির মাধ্যমে উঠে আসা জাতিসে জাতি জাতীয়তাবাদী হোক অথবা ছদ্মবেশী তথা গোপনীয় ভাবে জাতীয়তাবাদের আদর্শ প্রচারকারী হোক, তাদের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হয়ে থাকে ব্যক্তিগত বা শ্রেণীগত বা জাতীয় স্বার্থ লাভ করা

উদাহরণঃ আমেরিকা, বৃটেন, রাশিয়ার পররাষ্ট্রনীতি

এই ধরণের প্রত্যেকটা জাতি প্রতিপক্ষের সামনে দূর্জয় দূর্গ হয়ে দাড়া নৈতিক ও বৈষয়িক সকল শক্তি প্রয়োগ করে ফলে আক্রমনকারী শক্তি যতই জড়শক্তির ধারক হোক, তারা বুহ্য ভেদ করতে পারেনা যেমনঃ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ

একটি জাতির লোক দিয়ে গঠিত দল বা মানবগোষ্ঠী গঠিত হওয়া দোষের নয়, যদি সেই দল বা মানবগোষ্ঠীর মধ্যে নিম্নোক্ত কোয়ালিটি পাওয়া যায় যেমনঃ

   একই জাতি হিসাবে গড়ে না উঠে একটি আদর্শবাদী জামায়াত হিসাবে দাড়াবে

   ব্যক্তিগত, শ্রেণীগত ও জাতীয় স্বার্থপরতার উর্ধে থেকে বিশ্ব মানবতা নিয়ে কাজ করবে

   চেষ্টা সাধনার লক্ষ্য হবে একটি আদর্শের অনুসরণের মাধ্যমে বিশ্বমানবতার মুক্তি সাধন এবং গোটা ব্যবস্থার পূণপ্রতিষ্ঠা

   জাতীয়, ভৌগলিক, শ্রেণীগত ও বংশীয় বা গোত্রীয় বৈষম্য থাকবেনা

   সকলের মর্যাদা ও অধিকার এবং সমান সুযোগ সুবিধা থাকবে

   আদর্শ ও নীতি অনুসরণে যারা অগ্রসর ও শ্রেষ্ঠ, তারাই মর্যাদার অধিকারী হবে

   নতুন সমাজে বিজিত জাতির লোক ঈমান এনার পর সে যদি আদর্শ অনুসরণে অগ্রসর ও শ্রেষ্ট হয়ে যায়, তাহলে বিজয়ীরা তাদের সকল প্রচেষ্টার ফল ঐ ব্যক্তির পদতলে আরোপ করে তাকে নেতা হিসাবে অনুসারী হয়ে কাজ করবে

একটি আদর্শবাদী দলের পরিচয়ঃ

   যখন নিজ আদর্শ প্রচার শুরু করে, তখন শুরু হয় বিরোধীদের প্রতিরোধ পরিনামে দুই দলে শুরু হয় দ্বন্দ্ব

   দ্বন্দ্ব যত তীব্র হয়, আদর্শবাদী দল তত উন্নত চরিত্র ও মানবিক গুণ মহাত্বের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করতে থাকে

   বিরোধীতার মোকাবেলায় কর্মনীতির মাধ্যমে প্রমান হয় যে, আদর্শবাদী দলের উদ্দেশ্য সৃষ্টিজগতের কল্যাণ সাধন

   আদর্শবাদী দল বিরুদ্ধবাদীদের ব্যক্তি সত্ত্বা বা জাতীয়তার সাথে কোন শত্রুতা রাখে না শত্রুতা কেবলমাত্র বিরোধীদের জীবনধারা ও চিন্তা বা মতবাদের সাথে যা পরিত্যাগ করা মাত্র রক্ত পিপাসু শত্রুও ভালবাসা পেয়ে যায়

   আদর্শবাদী দলের লোকদের বিরোধীদের ধন দৌলতের প্রতি কোন লক্ষ্য থাকেনা বিরোধীদের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক কল্যাণৈই তাদের কাম্য হয়

   আদর্শবদী দল কঠিন মুহুর্তেও মিথ্যা, প্রতারণা ও শঠতার আশ্রয় নেয় না

   আদর্শবাদী দলের অবস্থান হয়ঃ কুটিলতার পরিবর্তে সহজ সরল কর্মনীতি গ্রহণ করবে। সীমাহীন উত্তেজনার মূহুর্তেও নির্মমতার পথে বেঁচে নেবেনা, আদর্শের পথ পরিত্যাগ করবে না।

   আদর্শবাহী দল সর্ববস্থায় আদর্শকে ধারণ করে নিজেকে কষ্টিপাথরে যাচাইকৃত সোনা হিসাবে বিশ্ববাসীর সামনে উপস্থাপন করবে।

   আর এই সব গুনাবলী কেবল আন্দাজ অনুমান নির্ভর নয়। বরং নবী সা. এই ধরণের উদাহরণ উপস্থাপন করেছিলেন।

উপরের এই আলোচনা প্রমাণ করে যে, নৈতিক শক্তি হলো শক্তির আসল উৎস। বিধায় মৌলিক মানবীয় চরিত্রের সাথে যদি ইসলামী নৈতিকতা মিলে, তাহলে দুনিয়ার অন্য কোন দলের পক্ষে নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের অধিকারী হওয়া সম্ভব নয়।

উপরের আলোচনা থেকে মুসলমানদের অধপতনের কারণটাও স্পষ্ট হয়েছে।  মুসলমানরা যেমন বৈষয়িক গুণে গুনান্বিত, না মৌলিক মানবীয় চরিত্রে ভূষিত থবা ইসলামী নৈতিকতায় সজ্জিত। বিধায়, এই অবস্থায় মুসলমানরা নেতৃত্ব বা কর্তৃত্বে আসীন হওয়া সম্ভব নয়।

এই অবস্থায় নেতৃত্ব আর কর্তৃত্ব কাফেরদের হাতে নেতৃত্ব দান করাই আল্লাহর নীতি বা রীতি। আর এটা এজন্য যে, তাদের মাঝে মৌলিক মানবীয় চরিত্রের সাথে জাগতিক উপায় উপাদান রয়েছে, শৃংখলা বিধানের যোগ্যতা রয়েছে। তারা এ ক্ষেত্রে বর্তমানে শ্রেষ্ট এটা তারা প্রমাণ করতে পেরেছে।

 

ইসলামী নৈতিকতার চার পর্যায়

কুরআন হাদীসের শিক্ষা অনুযায়ী ইসলামী নৈতিকতার ক্রমিক পর্যায় ৪টিঃ

১. ঈমান।

২. ইসলাম।

৩. তাকওয়া।

৪. ইহসান।

ইসলামী নৈতিকতার এই পর্যায় গুলো ধারাবাহিক বা পর্যায়ক্রমিক। বিধায় প্রথমটির ‍উপর দ্বিতীয়টি এবং এই ধারাবাহিকতায় দাড়িয়ে আছে। বিধায় প্রথম দিকের গুলোর অনুপস্থিতিতে পরের গুলো কল্পনাই করা যায় না।

এ ব্যাপারে আমাদের মধ্যে ধারণাগত ভূল থাকার কারণে আমরা ঈমান ও ইসলাম বাদ দিয়ে তাকওয়া ও ইহসান অনুসন্ধান করি।

ঈমান

ঈমান ইসলামী জিন্দেগীর প্রাথমিক ভিত্তিপ্রস্তর। যা তাওহীদ, রিসালাত স্বীকার করার মাধ্যমে হাসিল করতে হয়।

আইনগত মুসলমান হওয়ার জন্য উপরোক্ত ২টি বিষয়ই যথেষ্ট। কিন্ত যে ইমারতের উপর ইসলাম তাকওয়া ও ইহসান দাড়াবে, সেই ইমরাতের ফাউন্ডেশন হিসাবে যথেষ্ট নয়।

ইসলাম তাকওয়া ও ইহসান নামক স্থর যে ভিত্তির উপর দাড়াবে, সেই ভিত্তিকে গভীর ও সুদৃঢ় হতে হবে।

আল্লাহ প্রতি স্বীকারোক্তির মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি ঈমান শুরু হয়। কিন্তু এটা সাদাসিধে ভাবে ইসলামে প্রবেশের মাধ্যম।  যার বিস্তারিত রূপ পাওয়া যায় প্রবেশ করার পর।

ঈমান মানেঃ

   আল্লাহ বর্তমান, সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা, অদ্বিতীয়। সেজন্য তাকে মাবুদ মানতে হয়, তার উপাসনা করতে হয়।

   আল্লাহর রয়েছে গুণ, অধিকার, ক্ষমতা-যাতে কেউ শরীক নাই।

   আল্লাহকে চিনার ও তার নির্দেশ মানার জন্য আছে তার কিতাব।

   আল্লাহর প্রতি ঈমান মানে সবকিছু আল্লাহর জন্য উৎসর্গ করা। তার জন্য জানমাল কুরবান করতে হয়।

   আল্লাহর প্রতি ঈমান মানে তার নিশর্ত আনুগত্য।

   আল্লাহর প্রতি ঈমান মানে সকল কিছুতে তার মালিকানা দিতে হয়।

   রাসূলকে নেতা হিসাবে মানতে হয়, মানতে হয় পথপ্রদর্শক হিসাবে।

   আল্লাহর নাযিলকৃত সবকিছুতে ঈমান আনতে হয়।

   পরকালকে মানতে হয়। পরকালের জবাবদিহিতা বুঝতে হয়।

এই ধরণের ভিত্তি সমূহের উপর দাড়াবে ইসলামী জিন্দেগীর বিরাট প্রাসাদ।

 

ইসলাম

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here