আলী আহমদ মাবরুরঃ যারা বই লেখেন, যারা জ্ঞানের চর্চা করেন, তাদের একটি বড়ো যোগ্যতা হলো, তারা সময়টাকে ধারণ করতে পারেন। ইসলামী আন্দোলনের সাফল্য ও বিভ্রান্তি নামে রাহবার অধ্যাপক গোলাম আযমের একটি বই আছে। পড়ছি, আর বিস্মিত হচ্ছি। মনে হচ্ছে, তিনি যেন মাত্র বইটি লিখেছেন। সবাইকে পড়ার অনুরোধ করছি।

বইটির প্রথম অধ্যায়েই তিনি লিখেছেন, মানুষ যে কোনো কাজই করে সাফল্যের প্রত্যাশা নিয়ে। সে কাজে জান, মাল ও সময় ব্যয় করে। ব্যক্তিগত ছোট খাটো কাজ হোক বা জাতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক পরিসরের কোনো কাজ হোক, মানুষ একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যকে সামনে রেখেই অগ্রসর হয়। যে উদ্দেশ্য নির্ধারন করা হয় তা অর্জন করতে পারলেই সফলতা অর্জন হয়েছে বলে ধরে নেয়া হয়।

ইসলামী আন্দোলনে যারা যোগদান করেন তারাও নিশ্চয়ই কোনো উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যই নিজেদের সময়, জান ও মাল বিনিয়োগ করেন। কোনো পার্থিব উদ্দেশ্য হাসিলের লক্ষ্য নিয়ে ইসলামী আন্দোলনে যোগ দেওয়া স্বাভাবিক নয়। তাই কী উদ্দেশ্যে ইসলামী আন্দোলন যোগ দান করা হয়- তা স্পষ্ট হওয়া দরকার।

আন্দোলনের উদ্দেশ্য অনুসন্ধান করলে দু ধরনের উদ্দেশ্য পাওয়া যায়। যারা আন্দোলনে যোগদান করে তারা ব্যক্তিগতভাবে নির্দিষ্ট একটি উদ্দেশ্যকে নিশ্চয়ই সামনে রাখে। আবার গোটা আন্দোলনও সামষ্টিকভাবে কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যকেই টার্গেট বানায়।

ব্যক্তিগত সঠিক উদ্দেশ্য: ইসলামী আন্দোলনে যোগদান করার ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য হলো আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি হাসিলের মাধ্যমে আখেরাতে নাজাত পাওয়ার চেষ্টা করা। সাহাবায়ে কেরামগনও আখেরাতে কল্যাণ লাভের উদ্দেশ্য নিয়েই রাসুলের (সা.) নেতৃত্বে ইকামতে দ্বীনের আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। এই বিরাট আন্দোলনে যারা জান মাল নিয়ে শরীক হয়নি তারা মসজিদে রাসুলের (সা.) ইমামতিতে নামাজ আদায় করলেও চুড়ান্ত পরিণতিতে মুনাফিক হিসেবে ঘোষিত হয়েছে। এ থেকে প্রমাণ হয় যে, ইকামতে দ্বীনের প্রচেষ্টা ছাড়া ঈমানের দাবি পূরণ হয় না।

ব্যক্তিগত ভূল উদ্দেশ্য: শয়তান মানুষকে ভালো কাজ থেকে দূরে রাখার জন্য নানাভাবে চেষ্টা চালায়। যখন সে মানুষকে সত্য পথ থেকে দূরে রাখতে পারে না তখন কাজের সুফল থেকে মানুষকে বঞ্চিত করার জন্য তার নিয়তকে শয়তান কলূষিত করার চেষ্টা করে। বিশুদ্ধ নিয়তে ইসলামী আন্দোলনে যোগ দান করার পর বিভিন্ন কারণে ও পরিবেশে শয়তান সুযোগ বুঝে এমন সব অনুচিত বিষয় তার নিয়তে শামিল করে দেয় যা ব্যক্তির মহৎ উদ্দেশ্যকে নষ্ট করে ফেলে।

উদাহরণ দিলে বিষয়টা আরো পরিস্কার হবে। শয়তান সাংগঠনিক কোনো পদ পাওয়ার জন্য কারো মনে আগ্রহ সৃষ্টি করে দিতে পারে। শয়তান তাকে বোঝায়, এই পদটির জন্য তোমার চেয়ে যোগ্য আর কেউ নেই। সংগঠনের ভালোর জন্যই তোমারই এই পদে আসা উচিত। এভাবে শয়তানের প্ররোচণায় পড়ে ব্যক্তির মধ্যে যখন সেই পদ নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয় তখুনি তার নিয়তটি আর বিশুদ্ধ অবস্থায় থাকে না। সংগঠন যদি তাকে ঐ পদ পাওয়ার সুযোগ না দেয় তাহলে সে আন্দোলনে পিছিয়ে পড়ে এবং আন্দোলনের সাফল্য সম্পর্কে সে হতাশা প্রকাশ করে।

আবার যদি সে সংগঠনে কোনো পদ পায় তাহলে সে বরং সেই পজিশনটিকে মজবুত করার দিকেই বেশি মনোযোগ দেয়। সংগঠনের দাবী অনুযায়ী যেসব দিকে তার গুরুত্ব দেয়া দরকার সেদিকে ফোকাস না করে বরং অন্য কোনো বিষয়ে বেশি মনোযোগ প্রদান করে। বর্তমানে যে পদে সে আছে সেই পদে দীর্ঘদিন ধরে থাকাই তার উদ্দেশ্যে পরিণত হয়।

এ অবস্থায় আন্দোলন তাকে সেই পদ ছেড়ে দেয়ার সুযোগ দিলেও সে উক্ত পদেই থাকতে চায়। পদে টিকে থাকার জন্য সংগঠনকে সংকটের মুখে ঠেলে দিতেও সে দ্বিধা করে না। ব্যক্তিগত জিদ তার মন ও মগজে এমনভাবে গেড়ে বসে যে সংগঠনের স্বার্থ তার কাছে আর গুরুত্ব পায় না।

ব্যক্তিগতভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভই যদি তার মূল উদ্দেশ্য হতো তাহলে সংগঠন কোনো কারণে ভূল বুঝে তার প্রতি অবিচার করলেও সে কোনো অবস্থাতেই ইসলামী আন্দোলনের জন্য ক্ষতিকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারতো না। যদি কারো নিয়তের পবিত্রতা বহাল থাকে, যদি শয়তানের প্ররোচণার অশুদ্ধ চিন্তা তার মধ্যে শামিল না হয় তাহলে ইসলামী আন্দোলন ও সংগঠনের স্বার্থে সে তার সমস্ত জিদ ও ক্ষোভ পরিত্যাগ করতে সক্ষম হয়।

বইটির পিডিএফ ডাউনলোড করতে এখানে ক্লিক করুন

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here