জহির ইকবাল মায়াঃ পবিত্র হজ সমাগত কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতে বাহিরের দুনিয়ার কোন হজযাত্রী এবার হজে অংশ নিতে পারছেন না। এখানে পূর্বে হজ সম্পাদন কালে বাস্তব অভিজ্ঞতায় হজকালিন ঘটনা প্রবাহের বর্ননা রয়েছে।

পর্বঃ ০১

সৃষ্টির শুরু থেকে আজও পর্যন্ত যে ইবাদতগাহ দুনিয়ার কোটি কোটি মানুষের কাছে আদৃত ও আরধ্য হয়ে আছে-পবিত্র কাবাগৃহ এর কোনো জুড়ি নেই। পৃথিবীর শতকোটি তাওহীদবাদী মানুষের কাছে রয়েছে এর যিয়ারত এর আকুল বাসনা-এই পরম আকাঙ্খার বাস্তবায়ন ঘটে পবিত্র হজের মাধ্যমে। প্রতি বছর হজ মওসুমে এই উদ্দেশ্যে আল্লাহর অপার করুনায় তারই বান্দারা রওয়ানা হয় সেই পবিত্র ভূমি পানে।

 

হজের প্রারম্ভিক কাজ হচ্ছে নিয়্যাত করা এবং এহরাম বাঁধা।

আমাদের দেশ থেকে যে সব হজযাত্রী বিমানে চড়ে যাবেন তাদেরকে জিয়া আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর বা অন্য বন্দর থেকে এহরাম অবস্থায় বিমানে আরোহন করতে হয়া। কেননা ‘‘মীকাত’’ শুরু হয় জেদ্দা অবতরনের পূর্বেই। অর্থাৎ ‘‘ইয়ালালাম’ পাহাড় আকাশ পথে জেদ্দার আগেই অতিক্রম করা হয় এবং হজ বা উমরাহর জন্য পূর্ব প্রান্ত থেকে আগতদের ‘‘ইয়ালালাম’ পর্বতের কাছ থেকে এহরাম অবস্থায় যাত্রা করতে হয়।

 

আম্মা ও আমি ৭ই এপিল ১৯৯৭ তারিখে মৌলভীবাজার থেকে ঢাকায় পৌঁছে কালাম ভাইদের বাসায় একটু সময় বিশ্রাম নিয়েই এহরাম বেধেঁ বিমান বন্দরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করি। সেখানে গিয়ে দেখি প্রায় সকল হজ্জযাত্রীই এহরাম অবস্থায় বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা (বিমান বন্দরের) সম্পন্ন করতে ব্যস্ত। এখনও যাত্রার ঘন্টা খানেক বাকী। আমরা ও আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ‘‘লাব্বায়েক’ ধ্বনিতে সারিবেঁধে এগিয়ে যাই এবং লাউঞ্জে পৌঁছে প্লেনে উঠার অপেক্ষায় থাকি।

 

মনে অনেক সাহস ও আনন্দ। সবাই শ্বেতশুভ্র পোশাকে এক পবিত্র পরিবেশে শান্ত সৌম্য ভাব গাম্ভীর্যের সাথে বসে আছি। এ অবস্থায় বিভিন্ন ইসলামী জ্ঞানী ব্যক্তি হজের আহকাম-আরকান সম্পর্কিত বিষয়াদি সম্পর্কে মাইক্রফোনে আলোচনা করলেন। এক পর্যায়ে ঘোষণা পেয়ে সবাই নিজ নিজ আসন থেকে দাড়িয়ে উড়োজাহাজের উদ্দেশ্যে বোডিং ব্রীজ পানে হাঁটছি। সারি বেঁধে একে একে সকল যাত্রীই প্লেনে আরোহন করলেন।

 

রাত ১টায় বিমান যাত্রা শুরু করলো। আমাদের বিমান খানা বাংলাদেশ পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গজামশেদপুরকরাচীআরব সাগরশারজাহদাহরান প্রভতি নগরী ও সাগর মহাসাগর পেরিয়ে ছয়-সাত ঘন্টা পর জেদ্দার আকাশে আসতেই নীচে চারিদিকে হাজার হাজার বৈদ্যুতিক বাতির ঝলকানি চোখে পড়লো। কিছুক্ষনের মধ্যেই আমাদের উড়োজাহাজ পবিত্র মাটি স্পর্শ করেপ্লেন রানওয়ে ঘুরে টারমার্কে দাড়িয়ে গেলে আস্তে আস্তে সকল যাত্রীই নেমে গেলেন।

 

আমাদের উঠানো হলো বিশাল বাসে। পৃথিবীর শত বিমান সংস্থার অবিরত ফ্লাইট উঠা-নামা করছে এই বন্দরের। আমাদের বিমান দাড়িয়েছে খানিক দূরে। সঙ্গত কারণেই বাসে করে বিমান বন্দরে উপনীত হতে হবে। আমরা অল্পক্ষণে হজ টার্মিনালে পৌঁছলাম। তখন ফজরের সময়তবে-বাহিরে রাতই মনে হচ্ছে। ঢুকতেই চোখে পড়লো স্বাগতম’ লেখা বোর্ড। অন্যান্য ভাষায়ও এই শব্দটি উৎকীর্ণ রয়েছে। আমরা সবাই প্রথমে ফজরের নামাজের জন্য অজু করে ফ্লোরেই নামাজ আদায় করি। চারদিকে বসে বিশ্রাম নেয়ার মতো জায়গা রয়েছে।

 

বিমান বন্দরে কর্মরত বিভিন্ন এজেন্সীর কর্মকর্তারা এসে পাসপোর্ট চেক করলেনআগমন এবং প্রস্থান কার্ড সংযুক্ত আছে কি না দেখলেন।  অত:পর সুশৃঙ্খলভাবে ইমিগ্রেশন এর জন্য নির্ধারিত জায়গায় প্রবেশ করলে দেখতে পাইএক একটি কম্পিউটার নিয়ে এক একজন অফিসার বসে আছেন। পাসপোর্ট এগিয়ে দিলে কর্মরত ব্যক্তি আরবী ও ইংরেজীতে পবিত্র ভূমিতে স্বাগত জানালেন। তখন সাথে সাথেই পাসপোর্ট এ সিল দিয়ে ফেরত দেয়া হলো।

 

কিছুক্ষণের মধ্যে ল্যাগেজ চেক হলো তালা খুলে সাইড ব্যাগল্যাগেজ দেখাতে হলো কোন অবৈধ মালামাল আছে কি নাতাছাড়া প্রয়োজনীয় ডলার/পাউন্ড সাথে রয়েছে কি না তাও পরীক্ষা হয়। এবার শুরু হলো কষ্টসাধ্য কর্মাটি। সল্প পরিসরে এক ফ্লাইটের সকল যাত্রীকে আটকিয়ে রেখে চলছে ধীরে গতির এ কাজ। এখানে সকল হজ যাত্রীর মুয়াল্লিম নির্ধারন করা হবেমুয়াল্লিম ফি এর ডিডি গ্রহণ করা এবং মিনা আরাফাতজেদ্দা-মক্কা,মদিনা-জেদ্দা প্রভৃতি রূটের বাস আসনের টিকিট এখনই পাসপোর্ট এর সাথে দেয়া হবে। এক একজন যাত্রীর এসব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে অনেক সময় দরকার। সুতরাং প্রচন্ড ভীড়ে কোন রকমে অনেক্ষণ পর্যন্ত দাড়িয়ে এক সময় ভীড় থেকে মুক্ত হয়ে পাশেই সারিবদ্ধভাবে আরবীয় পোশাকে সজ্জিত লোকদের কাছে পাসপোর্ট ও ডিডি দিই।

 

ইউনাইটেড এজেন্ট অফিস নামে প্রতিষ্ঠানে এই কাজের জন্য নিয়োজিত রয়েছে। স্বল্পক্ষণের মধ্যেই পাসপোর্ট টিকেট সহ অন্যান্য কাগজপত্র ঠিকমতো ফেরত পাই। এখন যেতে হবে এয়ারপোর্টের বাংলাদেশ মিশনে। সেখান থেকে বাসে মক্কায় পাঠানো হবে।

পর্বঃ ০২

 

 

আমরা বিমান বন্দরের হজ টার্মিনালে অনুপম কারিগরী নৈপূন্যে তৈরী সিনথেঠিক এর সুউচ্চ ছাদ যার মধ্য দিয়ে আলো ও বাতাস প্রবাহিত হতে পারে এরকম ছাদের নীচ দিয়ে অনেকদূর হেঁটে উপনীত হই বাংলাদেশে পতাকা উড়ানো এবং বেষ্ঠিত বাংলাদেশ শিবিরে।

 

এখানেও অপেক্ষার পালা।

ঘন্টা দেড়েক পরে নির্ধারিত মুয়াল্লিম অফিসের বাস আসায় আমরা পাসপোর্ট হাতে লাইনে দাড়িয়ে ধীরে ধীরে গাড়ীতে উঠি। বাসের দরজায় দাড়ানো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে পাসপোর্ট জমা দিতে হলো। অবশ্য এসব কাজে বাংলাদেশ হজ্জ মিশনের কর্মরত ব্যক্তিরা সৌদিদের সাথে সহযোগিতা করেছেন। বাসের সকল আসন ভর্তি হলে দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়। এখানে আধা ঘন্টার মতো বসে আছি, এক সময় ড্রাইভার পাসপোর্ট নিয়ে ফিরে এসে গাড়ী ষ্টার্ট দেন।

 

এখন আমরা মক্কার উদ্দ্যেশে যাত্রা করছি। এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে গাড়ী মহাসড়ক ধরে মক্কার পথে চলছে। জেদ্দার কাছাকাছি অনেকগুলো শিল্প ইউনিট ও নির্মানাধীন স্থাপনা চোখে পড়লো। কিন্তু অন্তরে ভেসে আছে সেই চিরচেনা, পুত-পবিত্র দুনিয়ার প্রাচীনতম ইবাদতগাহ-কাবা। জেদ্দা থেকে মক্কার দূরত্ব প্রায় ৯৫ কি:মি:। রাস্তার দুধারে মরুময় বালুকারাশি ক্রমশ: পেছনে ফেলে পাহাড় ঘেরা পবিত্র নগরীতে উপনীত হতে চলেছি।  হঠাৎ চোখে পড়লো বিশাল মক্কা গেট। অনুপম নির্মানশৈলীতে লক্ষ লক্ষ রিয়াল ব্যায়ে পবিত্র কোরআন রাখাররেয়ালআকৃতির এই গেট ৮লেন এর মহাসড়কের উপরে নির্মাণ করা হয়েছে। গেট পেরিয়ে একটু সামনেই চেকপোষ্ট। তবে এখানে আমাদের গাড়িকে থামতে হয়নি। সম্ভবত হজযাত্রীবাহী গাড়ীএরকম কোন ষ্টীকার লাগানো ছিল গাড়ীতে।

 

উল্লেখ্য যে, পবিত্র দুই নগরী মক্কা ও মদিনাতে অমুসলিমদের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ। এজন্য চেকপোষ্ট এসব নজরধারী হয় কড়াকড়ি ভাবে। ক্রমে গাড়ী এসে পৌঁছলো শহরের বহিরাংশে,বাসষ্ট্যান্ড এবং সম্বর্ধনা কেন্দ্রে। ড্রাইভার দরজা খোলে দিলে আমাদের স্বাগত জানানো হলো জমজম এর পবিত্র পানি পান করিয়ে। বোতলজাতকৃত জমজম ওয়াটার সকল যাত্রীকে দেয়া হয়।
কিছুক্ষণের মধ্যে ঐতিহ্যবাহী
সোরাহীথেকে ঢেলে প্রাচীন রীতিতে আবারও পান করানো হলো জম জম। সুধূর অতীতে অর্থাৎ ইসলামপূর্ব যুগেও হাজীদের পানি পান করানো মক্কাবাসীর ঐতিহ্য।

 

মিনিট বিশ পরে ড্রাইভার রিপোর্ট দাখিল করে আবারও পাসপোর্ট নিয়ে ফিরে আসলেন। আমারা গাড়ীতে বসা রয়েছে। দু-একজন নীচে নেমেছেন। সবাই নিজ নিজ আসনে ফিরে আসলে, ড্রাইভার মাথাগুনে যাত্রী সংখ্যা ঠিক আছে দেখে পুনরায় যাত্রা করলেন। এক্ষনে আমরা হারাম শরীফের কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। এক জায়গায় এসে গাড়ী থেমে যায়। জায়গাটির নাম ‘‘মিসফালাহ’’- বাংলাদেশী অধ্যূষিত এলাকা। এখানেই আমাদের বাস যাত্রার
সমাপ্তি।

 

এরই মধ্যে দুজন শশ্রু মন্ডিত আরবীয় পোশাক পরিহিত ভদ্রলোক গাড়িতে উঠে একটি করে হাতে পড়ার উপযোগী ব্যাল্ট লাগিয়ে দেন, যাতে মক্তব (অফিস) নম্বর এবং মুয়াল্লিমের নাম উল্লেখ রয়েছে। হারিয়ে যাওয়া হাজীদেরকে এই ব্যাল্ট দেখে শনাক্ত করে নির্দিষ্ট মুয়াল্লিম অফিসে পৌঁছে দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে নিখোঁজ ব্যক্তির মোটামুটি নিরাপত্তা রক্ষিত হয়। এছাড়া গাড়িতেই আমাদের সকলকে একটি কার্ড প্রদান করা হলো।

 

এখন থেকে আমরা স্বাধীনভাবে বিচরণ করতে পারবো। তবে পাসপোর্ট রেখে দেয়া হয় মুয়াল্লিম অফিসে। গাড়ি থেকে নেমে মুয়াল্লিম অফিসের ছোট কামরায় বিশ্রাম নিতে যাই। ইতিপূর্বে মালপত্র নিজেদের নিয়ন্ত্রনে আনি। এখন কাজ হচ্ছে নির্দিষ্ট বাড়িতেপৌঁছা।
প্রথমেই ইতস্তত বোধ করলাম মালপত্র ফেলে উপরের তলায় উঠে ফোন করতে। মুয়াল্লিমের সহযোগি এক বাঙ্গালী বললেন, নিশ্চিন্তে রেখে যান লাখ টাকার জিনিসও কেহ নিতে সাহস করবে না। ভদ্রলোকের কথায় এভাবেই বাহিরে সকল ব্যাগ লাগেজ অরক্ষিত রেখে ৩ তলায় উঠি মালিক সাহেবকে ফোন করতে। এই ভদ্রলোকের বাসায় আমরা হজ মওসুমে ভাড়া থাকবো। ফোনে ঐ ব্যক্তির নাগাল পাইনি। অগত্যা নেমে এসে ৩৫ নম্বর মক্তবের সামনে দাড়িয়ে উনার আগমনের অপেক্ষায় রয়েছি। একই বাসে আসা অন্যান্য যাত্রীরাও এভাবে অপেক্ষা করছেন অথবা বিভিন্ন ব্যক্তি যারা এভাবে হাজীদেরের ঘরভাড়া দিতে এসেছেন এবং এব্যাপারে তাদের সাথে আলাপ করছেন। এদের সকলেই বাংলাদেশী, হজ্ব মওসুমে এভাবে বাড়ি ভাড়া করে হাজীদের জন্য পূণ: ভাড়া দেন এবং একটু ব্যবসা করেন।
হঠাৎ মালিক সাহেব এসে উপস্থিত হলেন। দেশ থেকে ফোন করে আগেই জানিয়েছি কোন ফ্লাইটে আসবো। সে মোতাবেক আমাদের নিতে এসেছেন। তা না করলেও অন্য বাসায় এখান থেকে তাৎক্ষণিক ভাড়া করা যেত।

 

যাকমূহুর্তেই আমি আম্মাকে নিয়ে মালিক সাহেবের সাথে একটি পিকআপ গাড়ীতে মালপত্র সহ যাত্রা করি। মিনিট পাঁচেক পর সুদৃশ্য টানেল (সুড়ং পথ) পেরিয়ে হারাম শরীফের কাছাকাছি পৌঁছে যাই। হারাম শরীফের সুউচ্চ মিনার চোখে পড়তেই সমস্ত শরীরে, হৃদয়মনে ভয় ও আনন্দের সম্মিলনে অভূতপূর্ব অবস্থা মনে আলোড়ন তোলে। হারাম শরীফের পূর্বদিকে গাজ্জা নামক স্থানেই আমাদের থাকার নির্দিষ্ট বাসা। গাড়ি থেকে নেমে রাস্তার পাশেই ত্রিতল পুরাতন এক বাসার দোতলার উঠি। পূর্বাহ্নে আসা হাজীরা রয়েছেন এখানে। অনেকেই পরিচিত একই এলাকার লোক। হজ মওসুমে জন প্রতি ১০০০-২৫০০ রিয়াল ভাড়ায় হাজীরা উঠেন।
এসব ঘরের অনেক গুলোই ব্যবহার অনূপযোগী হওয়া সত্বেও এবং যা সৌদি কর্তৃপক্ষ ভাঙ্গার নির্দেশ দেওয়ার পরও সামান্য মেরামত এবং অভ্যন্তরীণ গৃহ সজ্জা করে এক শ্রেণীর লোক ভাড়া দিচ্ছেন। এসব ঘরে লিফট সুবিধা থাকেনা। ফলশ্রুতিতে উপরের তলাগুলোতে বসবাসকারিদের উঠানামায় দারুন কষ্ঠ এবং হয়রানি হয়। বয়ষ্ক ও মহিলাদের জন্য নীচের দিকে স্থান নেয়া এবং কাবা শরীফের কাছাকাছি ঘরে থাকা উচিৎ। কেননা সবারই মনোকামনা থাকে যে
, প্রতি ওয়াক্ত নামাজ মসজিদুল হারামে জামায়াতে আদায় এবং এতে রয়েছে অনেক ফজিলত।

প্রতি রাকাত নামাজ মসজিদে হারামে আদায় করলে অন্য মসজিদে ১লক্ষ রাকাত এর সমান ছোয়াব পাওয়া যায়। কিন্তু যারা বৃদ্ধ-বৃদ্ধা এবং ক্ষেত্র বিশেষে মহিলাদের পক্ষে দূর থেকে আসা এবং ৪/৫ তলা উঠানামা (লিফট না থাকলে) সম্ভব হয়না। এতে প্রতি ওয়াক্ত নামাজ মসজিদুল হারামে পড়া দূরুহ হয়ে পরে। এতে তারা মনে খুবই আহত হন।

যাকপ্রথমে আমরা মালপত্র গোছিয়ে, একটু খাবার খেয়ে আসর এর নামাজ এবং তৎপরবর্তীতে উমরাহ করার জন্য তৈরী হয়ে মসজিদ পানে অগ্রসর হলাম। ঘর থেকে বেরুলে এমনকি ঘরের পশ্চিম দিকের জানালা দিয়েও মসজিদুল হারাম দেখা যায়। আমাদের বাসার পাশেই রাস্তা এবং তা পেরুলেই হারামের অংশ, এখানে দাড়িয়েও নামাজ আদায় করা হচ্ছে।

 

ভীড়ের কারনে মসজিদ এবং এর চতুর্পাশ্বস্থ চত্বর লোকারন্য, অগত্যা চারদিকে রাস্তায় ও সকল ওয়াক্তের নামাজে দাড়াচ্ছেন মুসল্লিরা। আমরা ও বেশী দূর যেতে পারিনি, এক জায়াগায় নামাজের জন্য দাড়িয়ে যাই।

পর্বঃ ০৩

আজ ৮ই এপ্রিল, এখন হজের ৬/৭ দিন বাকী তদুপরি মক্কায় এত লোকসমাগম। মসজিদের ভিতরে ও নামাজ আদায় করা যাবে তবে এক্ষেত্রে জামায়াতের ঘন্টা দুআগেই প্রবেশ করতে হবে। আমরা উমরাহ করবো, সুতরাং মসজিদের ভিতর দিয়ে কাবা পার্শ্বে পৌঁছতে হবে। এজন্য নামাজান্তে বসে বসে অপেক্ষা করতে থাকি, যাতে ভীড় কমে যায় এবং সামনে এগোতে পারি। মাগরিব এর পূর্বেই বেশ ভিতরে স্থান করে নেই।

নামাজ শেষে বুকভরা আশা নিয়ে জীবনের অবিস্মরণীয় মূহুর্তের অপেক্ষায় রয়েছি। প্রথমেই মূল মসজিদের অংশে সংযুক্ত সাফা ও মারওয়া পাহাড়দ্বয় সংযুক্তকারী করিডোর এর নীচের বাবুস সালাম দরজা দিয়ে প্রবেশ করি। দুনিয়ার শ্রেষ্ট মসজিদে আমার এ নস্বর এবং তুচ্ছ দেহ সমেত অবয়ব শান্তির বারিধারায় অবগাহন করতে পারায় শুকরিয়া জানাতে জানাতে এ অধমের চর্মচক্ষুতে হৃদয়তীর্থ “পবিত্র কাবা” ধরা দিল সমস্ত ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দু রূপে।

পূর্বরাতে বিমানে একজন ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব মাইক্রোফোনে বিভিন্ন মাসলা আলোচনার সাথে একথা ও স্মরণ করে দিয়েছেন যে, কাবা ঘর প্রথম দর্শনের সময় যে দোয়াই করা হবে তা কবুল হয়ে যায়। যদিও মহার্ঘ্য স্মরণেই ছিল, কিন্তু বলিনি সে কথা, শুধু বলেছিঃ প্রভূ তুমি আমাকে তোমার মহান ঘরের কাছে এনেছ, নিজ চোখে দেখেছি, আর কিছুই চাইনা।

এখন আমরা পবিত্র কাবার মুখোমুখি। তাওয়াফের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। পবিত্র মসজিদ এবং এর চারপাশে প্রচন্ড ভীড়। আর এই তাওয়াফের স্থানে প্রচন্ড জনসমাগম । সাথে থাকা নির্দেশক বুঝিয়ে দিলেন কিভাবে দূর থেকে ‘‘হজরে আসওয়াদ’’ বরাবর ফ্লোরে অংকিত রেখায় দাড়িয়ে ‘‘হজের আসওয়াদের’’ দিকে মুখ করে, হাত তোলে মুখে স্পর্শ করে তাওয়াফ শুরু করতে হবে। আমরাও প্রচন্ড ভীড়ে কোন রকমে ঐ কালো দাগে পা রেখে নিয়মানুযায়ী তাওয়াফ শুরু করি।

এ পাশেই রয়েছে কাবার দরোজাঅত:পর বায়ে মোড় নিয়েই হাতীম যা বেষ্টনীর মাধ্যমে সুরক্ষিত যা কাবা ঘরের উত্তর পার্শ্ব পরে পশ্চিম পার্শ্ব এবং তৎপরবর্তীতে দক্ষিন-পশ্চিম পার্শ্ব হচ্ছে রোকনে ইয়ামেনী। পুরো কাবাকে ৭ বার প্রদক্ষিন করলে এক তাওয়াফ সম্পন্ন হয়।

অনেকের কাছে শুনেছি এই তাওয়াফের সময় আফ্রিকান কালো মানুষেরা আমাদের মতো ক্ষুদ্রাকার গড়নের মানুষদের ধাক্কা দিয়ে পিছনে ফেলে অগ্রসর হন। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতায় সেরকম মনে হয়নি।এই তাওয়াফে রয়েছেন হাজার হাজার হাজি।

তাওয়াফের সময় কিছু কিছু দোয়া পড়তে হয়। তবে তা মুখস্থ করা সহজসাধ্য নয় এবং তা ফরজ ওয়াজিবও নয়। কিন্তু দুনিয়ার সকল দেশী মানুষেরা তা পড়েন, এক্ষেত্রে অন্যান্য দেশী হাজীদের পদ্ধতি আমার কাছে ভাল লেগেছে। তাদের একজনের হাতে হজের বই যা দেখে একজন উচ্চ স্বরে পড়েন, গ্রুপের বাকীরা এটা শুনে শুনে পড়ছেন। আমি অনেক সময় এসব গ্রুপের ভেতর ঢুকে তাদের সাথে দোয়া পড়ে পড়ে তাওয়াফ করতাম।

পরবর্তীতে নিজেই পকেট সাইজের এরকম বই সঙ্গে নিয়ে দেখে পড়ে তাওয়াফ করেছি। যাক, এভাবে সাত চক্কর শেষ হলে চলে যাই মাকামে ইবরাহীমের’’ পিছনে, যা কাবা ঘর থেকে ১৬/১৭ ফুট দূরে। সেখানে দাড়িয়ে দুরাকাত ‘‘ওয়াজিবুত তাওয়াফ’’ নামাজ আদায় করি।

এখন জমজম পান করার জন্য করার জন্য নির্দিষ্ট স্থানে আম্মাকে নিয়ে গাইডের সাথে প্রবেশ করি। মূল জমজম কূপ কাবাঘরের খুব কাছাকাছি। তবে তা সুবিধাজনক এবং খুব সুন্দর ব্যবস্থায় পান করার সুযোগ রয়েছে। কূপে প্রবেশ করার জন্য মসজিদুল হারামের সিড়ির নিকট দিয়ে ভূগর্ভে প্রবেশ করে প্রায় এক তলা নীচে পৌঁছে পাওয়া যায় সুবিস্তৃত জায়গা এবং দাড়িয়ে পান করার মত উচ্চতায় স্থাপিত অসংখ্য টেপ। তবে মহিলাদের আলাদা প্রবেশ পথে এবং আলাদা জায়গায় একই ধরনের ব্যবস্থায় জম জম পান করতে হয়। সে মোতাবেক আমরা পৌঁছে যাই এবং পবিত্র জম জম পান করি বিপুল আগ্রহ এবং ভাবগাম্ভীর্যের সাথে।

হাজার হাজার হাজী একই কায়দায় এবং সমান উৎসাহে মহার্ঘের ন্যায় তা পান করছেন। আমরা শুধু পানই করিনি, মাথায় গায়ে ঢেলে ঢেলে এই তৃষ্ণার্ত, রুক্ষ শরীরকে পবিত্র করেছি, শান্ত-শীতল করেছি। এখানেও সেই মুসলিম উম্মাহর ঐতিহাসিক সম্মিলন। দুনিয়ার প্রায় সকল দেশের মুসলিমরা একই কায়াদায় শরীরে, মাথায় ঢেলে দিচ্ছেন, আকন্ঠ পান করছেন। এ প্রসঙ্গে বলতে হয় পূর্বে আমার ধারনা ছিল যে, মরুভুমিতে জমজম কূপের অবস্থান,সেহেতু খুব সল্প পরিমান পানি উত্তলিত হয় এবং তা সল্পাহারে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এখানে নিজ চোখে দেখেছি একই সাথে হাজার হাজার হাজী তা ইচ্ছেমতো পরিমাণ গভীর আগ্রহে পান করছেন এবং সঙ্গে আনা বোতল পট ইত্যাদিতে ভরে ভরে নিয়েও যাচ্ছেন। এরই সাথে আমার ধারনায় যে ভূল ছিল তা ভাঙ্গলো এবং সত্যিই আশ্চর্যান্বিতও হলাম।

আমি শুধু পান করেই ফিরে আসতে চাইনি,অধিক উৎসাহে মূল কূপের যেখান খেকে পানি উত্তোলিত হচ্ছে তা দেখার জন্য ভূগর্ভেই হাটতে থাকি। এক সময় বেশ ভিতরের দিকে মূল কূপের উৎস মুখে পৌঁছে যাই। এই সেই কূপ যেখানেথেকে এই নিয়ামত এবং বরকতপূর্ণ জমজম উত্তোলন করা হয়। এখানে বেশ বড় আকারের একটি উন্নত ধরনের পাম্পের সাহায্যে এই জমজম সরবরাহ হচ্ছে। এই কূপের কাছে আসার অন্য উদ্দেশ্য ছিল দোয়া করা। একটি বইতে দেখেছি জমজম কূপের কাছে গিয়ে দোয়া করলে দোয়া কবুল হয়। কাঁচে ঘেরা পাম্প হাইসের পাশে দাড়িয়ে আল্লাহর কাছে ধর্ণা দিচ্ছি।

ভূগর্ভে এখন আমরা যে জায়গায় দাড়িয়ে আছি এর ঠিক উপরেই হাজার হাজার হাজী তাওয়াফ করছেন। আমরা যখন তাওয়াফ করতাম তখন একটি সাদাকালো বৃত্ত অংকিত করে চিহ্নিত দেখেছি মেঝেতে। কূপের কাছে অনেকক্ষণ দাড়িয়ে রইলাম, কিছুতেই মন চায়না ফিরে আসি। এক সময় এই ভেবে এসেছি যে, আল্লাহ চাহে তো আবারও অনায়াসে এখানে আসতে পারবো।

এবার আমাদেরে সাঈ করতে হবে, সাফা থেকে মারওয়া, মারওয়া থেকে সাফা এই দুই পাহাড়ের মধ্যে। আমরা কোন বিরতি না দিয়েই তা শুরু করবো।

প্রায় ২০ ঘন্টা আগে ঢাকা থেকে রওয়ানা দিয়ে জেদ্দা পৌঁছে এবং জেদ্দা থেকে মক্কায় পৌঁছতে বেশ জঠিলতায় কেটেছে আমাদের। তাছাড়া যাত্রার ক্লান্তিতো থাকার কথা, কিন্তু তাওয়াফ শুরু করার পর

দুঘন্টার মতো হয়ে গেছে এখনও কষ্টসাধ্য সাঈ করা বাকী , তদুপরি দেহমনে কোন ক্লান্তির ছাপ নেই।

সাঈ শুরু করতে হবে সাফা থেকে। চলন্ত সিড়ি বেয়ে উঠলাম সাফা পাহাড়ে চূড়ায়। তবে বাস্তবে সে রকম পাহাড় নয় এখন আর। শুধু মাত্র পাহাড়ের চূড়াকে অক্ষত রাখা হয়েছে। একই ভাবে করা হয়েছে মারওয়াকে। সাফা ও মারওয়া পাহাড়দ্বয়কে এমন ভাবে সংযুক্ত করা হয়েছে যা দেখতে ব্রীজ বা করিডোরের মত এবং বাহির থেকে দেখতে উন্নত স্থাপত্যের মসজিদের অংশই মনে হবে। সবই করা হয়েছে শুধু মাত্র হাজী সাহেবানদের সুবিধার জন্য। যাতে সংযুক্ত আছে এয়ারকুলার, ফ্যান, ঝাড়বাতি এবং এর প্রতি অংশের সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি করা হয়েছে বিভিন্ন কারুকাজে।

এই দুই পাহাড়ের মধ্যে বিবি হাজেরা(রা:) তাঁর শিশুপুত্র ইসলাইল (আ:) এর জন্য পানির খোঁজে দৌড়া দৌড়ি করেছিলেন। ঐসময় তিনি ইসমাইল (আ:) যে স্থানে রেখে এসেছিলেন সেখানেই জমজম কূপের সৃষ্টি হয়েছিল। এই স্মৃতিকে চিরঞ্জিব করা হয়েছে হাজিদেরকে সাতবার সাঈ করার মাধ্যমে।

আমরা সাঈ শুরু করলাম সাফা প্রান্ত থেকে। কিছুদূর গিয়ে সবুজবাতি জ্বালানো অংশ (২০/২৫ ফুট জায়গা), এই স্থানটুকু দৌড়ে অতিক্রম করতে হয় এবং নির্দিষ্ট দোয়া পড়তে হয়। বিবি হাজেরা (রা:) এই স্থান দ্রুতবেগে অতিক্রম করেছিলেন এবং ঐসময় তাঁর দৃষ্টি ছিল কাবার দিকে যার কাছাকাছি তিনি ইসমাঙ্গল (আঃ) শুইয়ে রেখে ছিলেন। সেই ঐতিহ্য অনুসরনকরে হাজীরা এই অংশ দ্রুত বেগে অতিক্রম করেন এবং কাবা পানে চেয়ে চেয়ে দোয়া পড়েন। আমরা সেভাবে এই জায়গাটুকু অতিক্রম করে একসময় মারওয়া প্রান্তে উপনীত হই। এভাবে আমাদের প্রথম সাঈ সম্পন্ন হলো।

মারওয়া পাহাড়ের চূড়াকে ও অবিকৃত রেখে দেয়া হয়েছে, এর উপরে বিশাল গম্ভুজ আকৃতির ছাদ অনুপম কারুকার্যে নির্মাণ করা হয়েছে। এখন মারওয়া থেকে সাফায় রওয়ানা হচ্ছি। এভাবে ঘন্টা খানেকের মধ্যে আমাদের সাত চক্কর পূর্ণ হলো।

অতীতে হাজীদের খোলা আকাশের নীচে এভাবে সাত চক্কর দিতে কতইনা কষ্ট হতো। কিন্তু আজ আমরা প্রায় ঘরের মতো ছাদের নীচে যাতে ফ্যান,এয়ারকুলার,ঝাড়বাতি ইত্যাদি কল্যাণে অনায়াসে দুই পাহাড়ের মধ্যে আরামেই সাঙ্গ করছি। সাঈ করার ট্যাক দুইটি একদিকে যাওয়া পাশাপাশি আসা,মধ্যভাগ হইল চেয়ার, পুশ চেয়ার ইত্যাদির রাস্তা। বৃদ্ধ-বৃদ্ধা বা প্রতিবন্ধী হাজীরা এই পথে হইল চেয়ারে বসে সাঈ করেন। সাফা থেকে মারওয়া ৭বার আসা যাওয়ায় ৭ কিঃমিঃ পথ হবে। তদুপরি হাজিরা তা পূর্ন আন্তরিকতার সাথে সম্পন্ন করছেন।

এখন রাত ১১.০০ টা বেজে গেছে এবং এরই মধ্যে আমাদের উমরাহ সম্পন্ন হলো। এবার মারওয়া পাহাড়ের চূড়া থেকে সিড়ি দিয়ে (চলন্ত সিড়ি) নীচে মসজিদুল হারামে নেমে পড়ি।

মসজিদ অনুপম নির্মাণশৈলীতে তৈরী। পিলার খিলান কারুকার্য্যময়। মসজিদ কাবাকে ঘিরে কোনাকার, বৃত্তাকার,কেন্দ্রে পবিত্র কাবা, চারপাশে তাওয়াফের জায়াগা যা ছাদবিহীন। তাওয়াফের জায়গার পার্শ্বে মসজিদে হারামে বসে সম্মুখে কাবাকে রেখে নামাজ পড়ি। নামাজ শেষে বসে আছি তন্ময় হয়ে কাবা পানে চেয়ে। হঠাৎ মনে হলো বাস্তবিকই কাবার সামনে না স্বপ্ন দেখছি।

এখন আর সরে আসতে মন চায়না। আমাদের সাথে যে গাইড ছিলেন উনি অনেক আগেই সাঈ করার ২য় চক্করেই অন্য ভদ্রলোকের গাইড হয়ে চলে গেছেন। আমিই চলে যেতে সায় দিয়েছি। কিন্তু আজ এখানে আমাদের প্রথম দিন এবং ঐ ভদ্রলোক অবশ্যই ঘরে ফিরে গেছেন এবং আমাদের অপেক্ষায় থাকবেন বা দুশ্চিন্তা করবেন। আপাতত দুনিয়ার এই শান্তিময় বরকতময় মহান স্থান থেকে চলে আসতে হচ্ছে। ———–কিছুক্ষনের মধ্যেই আমরা ঘরে ফিরে এসে রাতের খাবার খেয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাবার আয়োজন করি। অন্যান্য হাজী সাহেবানদের সাথে একটু আলাপ হলো, এতে জানতে পারি রাতে মসজিদে হারামে তাহাজ্জুদের আজান হয় তবে জামায়াতে নয় একা একাই পড়তে হয়। এক সময় ঘুমিয়ে পড়ি।

সাথী হাজী সাহেবানরা জাগিয়ে দেন রাত ৩.০০ টার পুর্বেই। তাড়াহুড়া করে তৈরী হয়ে নীচে নেমে রাস্তা পেরিয়ে মসজিদ পানে এগিয়ে যাচ্ছি। কি সুন্দর দৃশ্য হাজার হাজার মুসল্লী মসজিদ পানে ছুটছেন। মধ্যরাত থেকেই মুসল্লিদের ঢল নামে মসজিদে হারাম অভিমুখে। ——–আমরা হেঁটে হেঁটে মূল মসজিদের বাইরের বেষ্টনীর কাছাকাছি নামাজের জন্য জায়গা করে নিই। তাহাজ্জুদ নামাজের শেষে একই জায়গায় বসে আছি ফজরের অপেক্ষায়। ঘন্টাখানেক পরে ফজরের নামাজ শেষে ঘরে ফিরে আসছি। সঙ্গী হাজী সাহেব বললেন রাস্তার কাছে দোকান থেকে নাস্তা কিনে ঘরে ফেরার জন্য সে মোতাবেক নাস্তা কিনে সেই সাত সকালেই তা গ্রহণ করি।

অত:পর আবারও ঘুমিয়ে সকাল ৯ টার দিকে উঠি। কিছুক্ষণ সঙ্গী হাজীদের সাথে বসে সময় কাটিয়ে জোহরের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। সকাল ১০/১১ টার মধ্যে না গেলে মসজিদের ভেতরে জায়গা পাওয়া দূরুহ হবে। সে অনুযায়ী আমরা এগারটার দিকে গিয়ে ও ভীড় টেলে মসজিদের অভ্যন্তর ভাগে জায়গা পাই।

প্রায় ১২.৩০ মিনিটের সময় জোহরের নামায হবে। কেহ কেহ নামাজ পড়ছেন। আমরা বসে আছি। —–প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে মসজিদে হারামে পুরুষ ও মহিলাদের কড়াকড়িভাবে আলাদা নামাজ পড়ার রীতি নেই। তবে মসজিদের কিছু অংশে মহিলাদের আলাদা নামাজ পড়ার জন্য একটু তদারকি করা হয়। বিচ্ছিন্নভাবে পুরুষ ও মহিলারা পাশাপাশি নামাজ পড়েন।

চারিপার্শ্বে দুনিয়ার বিভিন্ন দেশী মুসলিম ভাই-বোনেরা,সবারই ব্যাজ, কার্ড ,পরিচয় সূচক স্কার্ফ, ইত্যাদি রয়েছে। প্রায় সবাই গ্রুপে গ্রুপে অবস্থান করছেন অথবা সুবিধাজনক স্থানের উদ্দেশ্যে সর্তক পদক্ষেপে অগ্রসর হচ্ছেন। তবে কারও মুখে কোন অপ্রয়োজনীয় শব্দ বা হুলস্থুল নেই। কি এক আকর্ষণে আজ তাদের এই মিশন।

সবার সাথেই সবার আন্তরিকতা, সহমর্মিতা এবং সহযোগিতার পরিবেশ। এখানে আল্লাহর উদ্দেশ্যে নিজেকে নিবেদিত করার প্রয়াস সকলেরই। পাশাপাশি বসা ভীন দেশী হাজীদের সাথে করমর্দন করে কুশলাদি জিজ্ঞেস করি। যাদের মধ্যে রয়েছেন ইরানী, মিসরী, তুর্কী ও আফ্রিকান মুসলমান। আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি জেনে তারা খুব খুশী হলেন এবং সাথে সাথে মারহাবা দুনিয়ার সকল মুসলমান ভাই ভাই ইত্যাদি ভাব ব্যক্ত করলেন। এছাড়াও যাদের আলাপ হয়নি তারা কোন দেশ থেকে এসেছেন তাও বুঝা যায়।

প্রত্যেকের ব্যাজও অন্যান্য পরিচিতি সূচক কার্ড ঝুলানো রয়েছে। কেবল মাত্র যাদের এহরামের পোশাক পরনে তাদের ব্যাজ পরার সুযোগ নেই, তবে সাইড ব্যাগ, ঝুলানো (বুকের উপর) ব্যাজ ইত্যাদিতে পরিচিতি সূচক বর্ণনা, পতাকা ইত্যাদি রয়েছে। এসব ব্যাগে সংশ্লিষ্ট দেশের টুরিজম কোম্পানী, বিমান সংস্থা, ব্যাংক প্রভূতির নাম উৎকীর্ণ রয়েছে। এ প্রসঙ্গে অতীব দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, এরকম একটি বহুজাতিক সম্মীলনীতে দেশের পরিচিতি তুলে ধরার কোন প্রয়োজন,প্রচেষ্টা আমাদের নেই।

আমরা যারা বাংলাদেশী হাজী আমাদের দেয়া হয়েছে ২/৩ ইঞ্চি সাইজের অস্পষ্ট ও বাজে ছাপার দায়সারা গোছের কাগজের ব্যাজ, যা ৯৫% হাজীই পরেন নি। স্বাভাবিক কারনেই তা কোন ব্যাজ হয়নি, ল্যামিনেটিং করা হয়নি, ছবি নেয়া সত্ত্বেত্ত তা সংযুক্ত করা হয়নি। একটু আন্তরিকতা নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি একে ল্যামিনেটিং করে হুক লাগিয়ে ছবি সংযুক্ত করে দিতেন তবে নিজেদের নিরাপত্তার কারনে সকলেই তা পরিধান করতেন ।

যে দেশে বিড়ি সিগারেটের মোড়ক যা গ্রামে গঞ্জেই বিক্রি হয় তাও সুদৃশ্য ছাপার উন্নত কাগজে করা হয়। সেখানে একজন হজযাত্রী ৮০/৯০ হাজার টাকা জমা দিয়ে হজে গেলেও তাদেরকে ৮/১০ টাকা খরচ করে একাট নেম ব্যাজ কার্ড তৈরী করে দেয়া হয়নি। এতে হাজীরা পদে পদে দারুন অসুবিধার সম্মুখীন হয়েছেন।

এছাড়া এহরাম অবস্থায় সেলাই বিহীন কাপড় পরিধান করতে হয়, এজন্য এ অবস্থায় এক ধরনের ব্যগ কোমরে ঝুলিয়ে রেখে তাতে মূল্যবান কাগজ পত্র, টিকেট, টাকা-পয়সা রাখতে হয়। কিন্তু এই অতীব প্রয়োজনীয় ব্যাগটি ৮০% হাজীকে দেয়া হয়নি।

এতে তাঁরা ভীষনভাবে সমস্যাগ্রস্থ হয়েছেন। অনেকে টাকা পয়সা, বিমান টিকেট প্রভূতি মূল্যবান ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র শুধুমাত্র ঠিকমত না রাখতে পেরে হারিয়ে ফেলেন।

অপরদিকে ইন্দোনেশিয়ান হাজীদের সে দেশের হজ্ অফিস দুই ধরনের মজবুত ও সুদৃশ্য ব্যাগ, মালয়েশিয়দেরে ও এরকম ব্যাগ, তুর্কীদেরে তাদের সরকার এরকম ব্যাগ যাতে এক সাথে ছাতা ও পানির বোতল রাখা যায় পাকিস্থানীদের এধরনের ব্যাগ,ছাতা,পানির পাত্র দেওয়া হয়েছে এবং প্রত্যেক হাজীই তা সঠিকভাবে পেয়েছেন যার প্রমান নিজ চোখ দেখা গেছে। ইরানী হাজীদেরও একইভাবে তা পরিধান এবং ব্যবহার করতে দেখা গেছে।

এসব প্রদত্ত হয়েছে নিজ নিজ দেশের হজ্জ্ব মন্ত্রনালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থা যারা হজের বিভিন্ন সেবা প্রদান করে তাদের তরফ থেকে। এতে তাদের নিজেদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা রক্ষিত হয়েছে সাথে সাথে বিশ্বের লাখ লাখ হাজিদের কাছে নিজেদের জাতীয়তা, দেশের পরিচিতি তুলে ধরা সম্ভব হয়েছে।

 

ব্যতিক্রম বাংলাদেশের হাজী, এদের দেখে তাদেরই দেশীরা পর্যন্ত স্বদেশী এই পরিচয় পেলেন না। আমাদের দেশের বেশীরভাগ হজ্ব ইচ্ছুক ব্যক্তি শেষ বয়সে হজে আসেন এবং এ ধরনের লক্ষ লক্ষ লোকের সমাবেশে, নিতান্তই অপরিচিত পরিবেশে অনেকসময় সাহস হারিয়ে ফেলেন। এ রকম পরিস্থিতিতে নূন্যতম পতাকাসংযুক্ত ব্যাজধারী অন্য হাজীকে পেলেও মনে সাহস সঞ্চার হয়।

পর্বঃ ০৪

 

হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু

ইতিমধ্যে প্রায় সকল দেশের হাজীগন পবিত্র মক্কা নগরে এসে উপনীত হয়েছেন। হজের আরও দু-এক দিন বাকি। বিভিন্ন দেশের হজ ফ্লাইট গুলো শেষ হয়ে আসছে। সারা দুনিয়ার লাখ লাখ হাজীকে এই পবিত্র নগরী স্বাগত জানিয়ে মক্কা তার মহামহিম রূপ সপ্রতিভ রেখেছে।

এখন শুরু হবে হজের মূল অনুষ্ঠানমালা। আজ ৭ই জিলহজ পবিত্র মক্কায় মসজিদুল হারামের মাননীয় ইমাম সাহেব জোহরের নামাজের পরে খোৎবা দিবেন।

আট তারিখ থেকে হজের বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা শুরু হচ্ছে। ৮ই যিলহজ জোহর থেকে ৯ই যিলহজ ফজর পর্যন্ত মিনায় অবস্থান করার বিধান রয়েছে।

দুপুর বেলা হতেই শত শত বাস, টেক্সি, মাইক্রোবাস,জীপ ভর্তি হয়ে হাজীরা ছুটে চলেছেন মিনা অভিমুখে। আমরাও এহরাম পরে লাব্বায়েকধ্বনি সহযোগে রাত ১১.০০ টার দিকে মাইক্রোবাসে করে মিনা প্রান্তর অভিমুখে রওয়ানা হই।

মক্কা থেকে মিনার দূরত্ব ৪/৫ মাইলের বেশী হবেনা। অধিকাংশ হাজীই পায়ে হেটে সেখানে পৌঁছান। হজের মূল যে পাঁচ দিনের কর্মসূচী তা এখন থেকে শুরু হবে। আমরা এই কয়েক দিনের ব্যবহার্য্য সামান্য কাপড় চোপড়, অজিফা, হজের নিয়মকানুন সম্বলিত বই ইত্যাদি সঙ্গে নিয়েই রওয়ানা করি।

মিনার কাছাকাছি আসতেই হজের ব্যবস্থাপনা অর্থাৎ বিভিন্ন তাবু সম্বলিত অবকাঠামো এবং হাজার হাজার বৈদ্যুতিক বাতির আলোর ঝলকানি চোখ জুড়িয়ে দিল। উচু নিচু টিলা-পাহাড়, সমতলে পিছঢালা রাজপথ চিরে এগিয়ে চলেছে আমাদের গাড়ি।

সমগ্র মিনা উপত্যকা উৎসবের সাজে সজ্জিত। কয়েক লক্ষ তাবু টানানো হয়েছে মিনায়। আরো রয়েছে দীর্ঘ ৮/৯ কি:মি: বিস্তৃত শেড বা ছাদ যুক্ত রাস্তা। এই শেড মিনার অংশে তাবুর বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হয়। লাখ লাখ হাজী ২/৩ দিন এসব শেডে অবস্থান করেন। আমাদের গাড়ি এই শেডের এক জায়গায় এসে থেমে যায়।

পূর্ব থেকে আমাদের ৭০/৮০ জনের জন্য বেশ কিছু জায়গা এই শেডের নীচে দখলে রাখা হয়েছে। আমাদের গৃহকর্তার সহকর্মীরা এসে এখানে আমাদের অবস্থান করার জন্য এ ব্যবস্থা করেছেন। এই শেড চলে এসেছে মক্কা থেকে মিনা-মুজদালেফা পর্যন্ত। এই শেডের ধরণ এরকম-নীচ পাকা রাস্তার মতো, উপরে উচু টিনের চালা। উপরে দুই পার্শ্বে টারবাইন সদৃশ্য ফ্যান যা প্রতিনিয়ত বাতাস দিয়ে চলেছে এবং একটু বিরতি দিয়ে দিয়ে ওজুখানা, টয়লেট, বাথরুম ইত্যাদি। এই শেডের মিনার অংশে ৩/৪ দিনের জন্য হাজার হাজার হাজী অবস্থান করেন।

যদিও হাজীদের মিনায় অবস্থানের জন্য নির্ধারিত রয়েছে তাবু এবং সকল হাজীকেই মুয়াল্লিম ফি-র সাথে এই তাবু ভাড়া পরিশোধ করতে হয়েছে পূর্বেই। আমরা অতিরিক্ত ব্যবস্থা হিসেবে এই শেডে অবস্থান গ্রহণ করি। এতে বেশ ঝামেলামুক্ত ও নিরাপদে অবস্থান করা যায়।( ১৯৯৭ সালের পর থেকে সকল হজ রত ব্যক্তিদেরে অগ্নিনিরোধ শীতাতপনিয়ন্ত্রিত তাবুতে অবস্থান করতে হয়)

মিনায় অবস্থান করে ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়া সুন্নত। অর্থাৎ ৮ই জিলহজ জোহর থেকে ৯ই জিলহজ ফজর পর্যন্ত এই ৫ ওয়াক্ত নামাজ এখানে আদায় করা সুন্নাত। কিন্তু আমরা কিছুটা আগেই এখানে এসে পৌঁছেছি। অর্থাৎ ৭ই যিলহজ রাত থেকে আমরা মিনায় অবস্থান করছি। পরদিন ৮ই জিলহজ মিনা অভিমুখে লক্ষ লক্ষ হাজী মক্কা থেকে রওয়ানা হবেন। তবে ইতোমধ্যে অসংখ্য হাজী মিনার পৌঁছে বিভিন্ন তাবু এবং এই শেডে অবস্থান গ্রহন করেছেন।

আমরা ঘুমানোর জন্য বিছিয়ে দেবার মতো এমন কিছু আনিনি। নীচে মাদুর ছিল। এর উপরে চাদর দিয়ে ঘুমানোর চেষ্ঠা করছি। এরই মধ্যে অনেকেই ঘুমিয়ে পড়েছেন। আমাদের সঙ্গী সাথীদের দুই/এক জন জাগ্রত আছেন। আমার ঘুম আসছেনা। রাত ২.৩০ টা হয়ে গেছে। কাছেই ছিলেন সমবয়সী দু-তিনজন যারা একই সাথে একই গৃহে সপ্তাহ দিন মক্কায় বসবাস করছি। এখন অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। কিন্তু আগে তাদের সাথে কোন পরিচয় ছিলোনা। ইংল্যান্ডে বসবাস করেন, দেশের বাড়ী বৃহত্তর সিলেটে। সবাই মিলে চা পান করি। আফ্রিকান মেয়ে মানুষেরা বড় ফ্লাক্সে ঘুরে ঘুরে চা বিক্রি করছেন।এসব মহিলারা আরবীতে চা-কে চায়ে, দুধকে হালিব এবং চিনিকে সুগা-র উচ্চারণ করেন।

মরুভূমিতে রাত আরামদায়কই। ধু-ধু বাতাস, কখন হিমেল পরশ, রাতকে বেশ উপভোগ্য মনে হলো। শেষ রাতে একটু ঘুমিয়ে ফজরে জাগলাম। ওজু, নামাজ সেরে বসে আছি। এতক্ষণ পার্শ্ববর্তী রাস্তা জুড়ে হাজীরা দলে দলে আসছেন। এদের মধ্যে কেহ কেহ আমাদের পাশাপাশি জায়গা করে নিতে চাইলেন। রাতে বেশ জায়গা দখল করেই ঘুমিয়েছি। কিন্তু এখানে কাউকে বাধা দিতে মন চায়না। একটু নড়ে চড়ে নতুন আগত হাজীদের অবস্থানের সুযোগ করা হয়েছে।

এখন সকাল হয়েছে। নাস্তার জন্য সামনেই দোকান বসেছে। আমরা ৭/৮ জনের জন্য নাস্তা কিনি। আগেই জেনেছি মিনা-আরাফাত-মুজদালেফায় খাওয়া দাওয়া একটু কষ্টকর। বড় দোকান-পাঠ নেই। এখানে শুধুমাত্র হজের ৪/৫ দিন লোক সমাগম হয়। বাণিজ্যিক কোন গুরুত্ব সম্পন্ন এলাকা নয়। জনবসতি নেই, সুতরাং ব্যাপক সংখ্যক দোকান মার্কেট বা অফিস- আদালত থাকার কথা নয়।

নাস্তা জায়গায় বসেই খেলাম। এখন আর চারপাশে খালি জায়গা নেই। শুধু মাত্র প্রয়োজনের তাগিদে একটু একটু পা ফেলে ওজুখানা বা কিছু কিনে আনার জন্য শত শত মানুষের পাশ দিয়ে যেতে বা আসতে পারি।

ইতোমধ্যে বেলা বেড়ে গেছে। সকাল ৯-১০টা হবে। ঢালা বিছানায় রাতে যারা শেডে ঘুমিয়েছেন, এখন উঠে গেছেন সবাই এবং নিজ নিজ অবস্থান স্খলে বসে বসে আল্লাহকে ম্মরণ করছেন। কেহ কেহ অজিফাও কোরআন তেলাওয়াত করছেন। আমিও একটু সময় তেলাওয়াত করে ক্ষনিকের জন্য গা এলিয়ে দিই।

কখন যে ঘুমিয়ে পড়ি, ঘুম ভাঙ্গলে ঘড়িতে দেখি সকাল ১০.৩০ মিনিট। উঠে বসতেই চোখে পড়ল হাজী জনা কয়েক হাজী দাড়িয়ে দূরে কি যেন দেখছেন! একটু শোরগোলও শোনা গেল। আমি নিজেও উঠে দাড়াই। বেশ দূরে ক্ষীন ধোয়া উদগীরন চোখে পড়লো। খানিকটা চিন্তিত হলাম। এভাবে প্রায় বছরেই মিনায় অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। এতো আগে জানা ছিল। বেশ কিছুক্ষণ এভাবে দাড়িয়ে দাড়িয়ে আগুনের উৎস স্থলের দিকে দৃষ্টি নিবন্ধ রাখি।

ইতোমধ্যে সকল হাজীই উঠে দাড়িয়েছেন। কেহ কেহ নড়া চড়া শুরু করে দিয়েছেন। ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি আমাদের পার্শ্ববর্তী রাস্তা দিয়ে দ্রুত গতিতে যাতায়াত শুরু করেছে। এ মূহুর্তে সমগ্র মিনা উপত্যকায় আতংক ছড়িয়ে গেছে।

বেলা ১১টা হবে, এ সময়ে হাজার হাজার হাজী মিনা অভিমুখে স্রোতের মতো চলছেন মক্কা থেকে। আজ দুপুর থেকে (জোহর) আগামীকাল ফজর পর্যন্ত মিনায় অবস্থান করে ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা সুন্নাত। কিন্তু ভীড় ও ঝামেলা এড়াতে বেশীর ভাগ হাজীই পূর্বাহ্নে মিনার পৌঁছে যান। সুতরাং দিনের এ সময় পর্যন্তই ১৬/১৭ লক্ষ হাজী মিনায় এসে পৌঁছেছেন।

এই অবস্থায় এক প্রকার অবরোধ্য পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আতংকগ্রস্ত নারী পুরুষ দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে দৌড়াদৌড়ি শুরু করেছেন। লাখ লাখ লোকের একটু নড়া চড়াতেই সর্বত্র প্রচন্ড ভীড়, ঠেলাঠেলি শুরু হয়েছে যাতে পদপিষ্ট হয়ে হাজারো প্রাণহানির সমূহ সম্ভাবনা থাকে।

আমরা আগুণের মূল উৎস থেকে বেশ দূরে অবস্থান করায় যদিও আমাদের পাশাপাশি জায়গায় এরকম ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি কিন্তু আগুণের উৎসস্থলের কাছাকাছি কি ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তা সহজেই অনুমেয়।

শুরুতে আগুনের বিস্তৃতি তেমন না থাকলেও ক্রমেই তা দ্রুততর বেগে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লো। এতে যে কারণটি যোগ হয়েছে তা হচ্ছে প্রচন্ড গতিতে বাতাস বইতে থাকা। মরু সাইমুম ঝড়ের বেগে বাতাস বইতে থাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ইতোমধ্যে হালকা সবুজ রং এর ফায়ার ফাইটর হেলিকপ্টার এর আনাগোনা শুরু হয়েছে। কাছাকাছি পাহাড়ের উপরের নির্দিষ্ট ব্যাস থেকে পানি এনে আগুনের লেলিহান শিখায় নিক্ষেপ করছে কপ্টার। কিন্তু এই প্রচেষ্টা ফলবান হলোনা। নীচ থেকে মনে হলো এই নিক্ষিপ্ত পানি আগুনের উত্তাপের কাছ পরাভূত হচ্ছে এবং তা আগুনের সংস্পর্শে আসার আগেই শুকিয়ে যাচ্ছে।

একই সাথে বিভিন্ন তাবুর কাছাকাছি পোষ্ট থেকেও চারিদিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছিটিয়ে পড়ছে পানি। ফায়ার বিগ্রেডের শত শত ফায়ার ফাইটার পানিবাহী গাড়ী থেকে ক্রমাগত আগুনের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে গেলেন। কিন্তু বিভিন্ন তাবুর কাছাকাছি গ্যাস সিলিন্ডার যা রান্নার কাজে ব্যবহারের জন্য ছিল, সেগুলো বিস্ফারিত হওয়ার সাথে সাথে চতুরপার্শ্বের অন্যান্য তাবুগুলোও আগুনের সংস্পর্শে জ্বলতে থাকলো। উপরোন্তু অধিক সংখ্যক লোক আহত হতে লাগলেন। এতক্ষনে আগুনের বলয় আমাদের কাছাকাছি চলে আসছে। আমাদের শিবিরে চরম ভীতির সৃষ্টি হয়। সবাই নিজ নিজ প্রয়োজনীয় জিনিস পত্র হাতে নিয়ে এক জায়গায় জড়ো হই। আমাদের গাইড মেগাফোনে গ্রুপের সকল সদস্যকে সংগবদ্ধভাবে অপেক্ষা করতে বললেন। সাথে সাথে আমাদের নিয়ে মাইকে বিভিন্ন দোয়া দুরুদ পড়তে থাকেন।

আমরা সকলেই এই চরম বিপদের সময় আল্লাহর সাহায্য ছাড়া আর কারো পক্ষে এই বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাওয়া যে একেবারে অসম্ভব তা মনে প্রাণে অনূভব করছি। জীবনের এরকম মূহুর্তে জগতের সকল মানুষই নিরুপায় হয়ে একমাত্র আল্লাহর কাছেই ধর্না দেয়, এই অভিজ্ঞতাটি এরকম অবস্থায়ই শুধুমাত্র অনুভুত হয়।

এখন আগুন আরও কাছাকাছি চলে এসেছে। এ অবস্থায় আমরা আর গাইডের আশ্বাসে এ জায়গায় স্থির থাকতে পারছি না। আমি খুব চাপ প্রয়োগ করি গাইড মালিক সাহেবকে যাতে আমাদের কোন নিরাপদ জায়াগায় নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু উনি আবারও বিভিন্নভাবে একথা বুঝাতে চেষ্টা করলেন যে, আগুনের আর আমাদের মধ্যবর্তী তাবুগুলোর পার্শ্বে একটি বড় রাস্তা আছে এবং এই রাস্তার এ পাশে আগুনের বিস্তৃতি অসম্ভব।

যদিও রাস্তাটি ঘনসন্বিবেশিত তাবুর কারণে দেখা যাচ্ছিলো না। উপরোন্ত আমার পক্ষেও এরকম কথায় বিশ্বাস স্থাপন সম্ভব ছিলনা এজন্য যে শুরুতে আগুন যে জায়গায় ছিল এখন তা অবিশ্বাস্য দূরত্বে এবং চতুর্দিক গ্রাস করে আমাদের থেকে ৫০গজ এর মধ্যেই এসে গেছে, এবং তা যে গতিতে আসছে তাতে মিনিট দশেক এর মধ্যেই আমাদের জন্য ভয়াবহ বিপদের কারন হবে।

এক পর্যায়ে নিজ দায়িত্বই এখান থেকে সরে যেতে শুরু করলাম। কিন্তু ৫/৬ ফুট গিয়ে রাস্তায় পা দিতেই উত্তাপে (রৌদ্রের) পায়ে ফোসকা পড়ার উপক্রম হলো। তাড়াহুড়া করতে গিয়ে জুতা অনেক আগেই শেডে ফেলে এসেছি। এরকম বিপদে সবকিছু মনে হওয়া স্বাভাবিক নয়। শুধু সেন্ডেলই নয়, কাপড় চোপড় সমেত আর একটি ব্যাগ ও ফেলে এসেছি। উদ্দেশ্য ছিল দৌড়াদৌড়ি শুরু হলে কাগজ পত্র ও টাকা পয়সা ব্যাতিত সবকিছু ফেলেই শুধু মাত্র প্রাণ নিয়েই ছুটবো এবং এরকম মনোভাব নিয়েই হাটা শুরু করি।

কিন্তু রাস্তায় পা ফেলতেই এ আশা ও তিরোহিত হলো। কেননা এরকম উত্তপ্ত রাস্তায় জুতা ছাড়া চলা অসম্ভব, আবার এরকম অনিশ্চিত যাত্রা বোকামী ও হতে পারে। তাছাড়া রাস্তায় প্রচন্ড ভীড় এবং এই পরিস্থিতে ভীড় খুবই বিপদজনক। কেননা এসব ভীড়ে ও ঠেলাঠেলিতে অতীতে অনেক হাজীর প্রাণহানীর ঘটনা ঘটেছে।

আমরা রাস্তায় নেমেই দু-চার পা এগিয়ে অন্যপাশে একটু দাড়ানোর মতো জায়গা পেয়েই অবস্থান নিই। সাথে থাকা তোয়ালে ভাজ করে উত্তাপ থেকে বাচাঁর জন্য রাস্তায় ফেলে এর উপর পা রেখে কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থাকলাম। এখনও বিপদ কাটেনি। এরকম সর্বগ্রাসী বিপদে আর পড়তে হয়নি। নিজেকে নিতান্ত অসহায় মনে হচ্ছে তবে সৃষ্টিকর্তা যে একজন তারই কাছে সাহায্য চাইতে হয় ব্যাপারটা সত্যিকার অর্থে তখনই ঘটে যখন মানুষ এ ধরনের মানবিক বিপর্যয়ে পতিত হয়। আমরাও সেই মহান দয়াময় আল্লাহর করুণাময় আশা ছাড়া এ থেকে পরিত্রাণের উপায় নেই ভেবে তারই কাছে মনে প্রানে সাহায্য চাইলাম।

অনেক পূর্বেই আমাদের এ প্রতিথী জন্মেছিল যে এই দূর্যোগের অবসান মানবিক প্রচেষ্ঠায় অসম্ভব। হঠাৎ স্মরণ হলো পানি সংকট দেখা দিতে পারে। অগ্নিকান্ডের শুরুতেই বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায়। এ ধরনের দূর্যোগের সময় পানিই সবচেয়ে বেশি ব্যয়িত হয়। তদুপরি এই বিশৃংখলা অবস্থায় খাবার দাবার এর সংকট হওয়ার কথা। সেক্ষেত্রে পানিই হবে মরূভূমির আবহাওয়ার সাময়িক ক্ষুধা তৃষ্ণা নিবারণের একমাত্র উপায়। কিন্তু আমাদের কাছে আছে ১ লিটারের ও কম পরিমাণ পানি।

শুরুতে মূল্যবান মালপত্র সমেত ব্যাগ ফেলে আসলেও ওয়াটার পট ঠিকই পলায় ঝুলিয়েছে। এবার একজন মহিলা যিনি আমাদের গ্রুপেরই একজন একটু পানি পান করতে চাইলেন। আমি পান করতে দিলাম। তবে এটুকুও বলতে হয়েছে মজুদ সীমিত অগত্যা কঠিন বিপদের জন্য খানিক রাখতে হবে। মহিলা স্বল্প পরিমাণ পান করে অধিক সন্তুষ্টি প্রকাশ করলেন।

এ অবস্থায় অনেক্ষণ দাড়িয়ে আছি। আমরা দূরে যাইনি শেডে আমাদের পূবর্তন অবস্থানস্থলের কাছেই রয়েছি। তবে আমাদের মতো কাছাকাছি আমাদের গ্রুপের স্বল্পসংখ্যক লোকই আছেন। বেশিরভাগ লোক ছুঠোছুটি করে অনেক আগেই অজানা গন্তেব্যে চলে গেছেন।

হঠাৎ বাতাসের গতি পরিবর্তিত হয়ে আমাদের উল্টো দিকে নিবন্ধ হলো। যদিও ঘন্টা খানেক থেকে আমাদের শেডের পাশের তাবুগুলো জ্বলছিল এবং দ্রুত নতুন নতুন তাবুকে আক্রমণ করে আগুনের বিস্তৃতি অব্যাহত ছিল কিন্তু সরাসরি শেডের দিকে আসেনি। কাছাকাছি ধ্বংসলীলা রেখে গেলেও তা বিপদমুক্ত দূরত্বে চলে যাচ্ছে।

এ পর্যায়ে অনেক খানি নিরাপদ মনে হলো। মেহেরবান আল্লাহতালা হয়তো আমাদের মতো দূর্বল ঈমানদারকে এরকম কঠিন পরীক্ষা থেকে অব্যহতি দিয়েছেন। আমরা কাছেই শেডে মূল অবস্থানে ফিরে আসি। তবে আমাদের পূর্বতন অবস্থান স্থলে এখন আর কোন জায়গা অবশিষ্ট নেই।

আগুনের দিক পরিবর্তন ও স্মিমিতি আচ করে মূহুর্তে সমগ্র এলাকা পূর্বের চেয়ে বেশী মানুষের অবস্থানস্থলে পরিণত হয়েছে। এই মিনায় আমাদের আরোও ১২ ঘন্টার মতো অবস্থান করতে হবে। আগের চেয়ে এক তৃতীয়াংশ জায়গায়।

গ্রুপের অনেকেই ফিরে এসেছেন। আসলে কেহই বেশী দূরে যেতে পারেনি। আমরা আটোসাটো করে কোন রকমে পা রাখার জায়গা করে দাড়িয়ে রইলাম। আমাদের গ্রুপের মহিলাদের জন্য কাছাকাছি অবস্থানকারী হাজিরা (পুরুষ) বেশ খানিকটা জায়গা ছেড়ে দিলেন। এসব মহানুভব লোক বাংলাদেশী তবে সৌদিআরবে বিভিন্ন জায়গায় প্রবাস জীবন যাপন করেছেন এবং এ বছর হজ করছেন।

বয়সে নবীন এই হাজী ভাইরা যে জায়গা ছেড়েছেন তাতে আমাদের মহিলারা গা এলিয়ে শুয়ে থাকতে পারলেন। এই ভাইদের মহানুভবতাও সচেতনতা সত্যিই প্রশংসার দাবীদার।

ইতোমধ্যে বেলা ২.৩০ হয়ে গেছে। জোহারের নামাজ পড়া হয়নি। কোন উপায়ে ওজু খানায় পৌছে ওজু সেরে জোহরের নামাজ আদায় করি।

আগুন প্রচন্ড বাতাসে দূরের উচু পাহাড় অতিক্রম করে ওপর পার্শ্বে চলে যাচ্ছে। হাজীদের মধ্যে উদ্বেগ আশংকার অবসান হয়েছে।

আবারও তারা এই শ্রমসাধ্য ইবাদত মহান হজের আহকাম পালনের সুর্তীব্র বাসনায় নিজেদের নিবেদিত করেছেন। কোথাও কোন হৈ-হুল্লর নেই। শুধুমাত্র লাব্বায়েকধ্বনিতে এই মিনা উপত্যকা অভিমুখে হাজীদের মিছিল চলছে।

পর্বঃ ০৫

আরাফাতের উদ্দেশ্য যাত্রা এবং ইয়াওমুল আরাফা বা আরাফাত দিবস

এতবড় অগ্নিকান্ডের পরও এই মিনায় খোদাপ্রেমিক মানুষের অব্যাহত আগমন এবং তাঁরই শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষনা ক্ষনিকের জন্য বন্ধ হয়নি।
আগুনের সূত্রপাতের পর যদিও কর্তৃপক্ষ মিনা অভিমুখে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে রাস্তা পরিষ্কার রাখেন শুধুমাত্র অগ্নিনির্বাপনে নিয়োজিত বিভিন্ন এজেন্সির গাড়ি চলাচলের জন্য। কিন্তু বিপদ কেটে যাওয়ায় রাস্তা খোলে দিলে আবারও স্রোত প্রবাহিত হয় মিনা অভিমুখে।

এ অবস্থায় এখন হাজার হাজার হাজী খোলা আকাশের নীচে ধ্বংসাবসেষের উপরই জায়গা করে নিতে হবে। কেননা মূল ব্যবস্থাপনার লক্ষাধিক তাবু ইতোমধ্যে আগুনের লেলিহান শিখায় পরিনত হয়েছে। আসরের নামাজের সময় হয়ে গেছে, এখনও পর্যন্ত সাংবাদিক পুলিশ, আমি, ও মেডিকেল টিম, অকুস্থলের দিকে দ্রুত বেগে ছুটছে।

এতক্ষণ সারা বিশ্বের দেশে দেশে এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের কথা প্রচার হয়েছে। সংগত কারনেই নিজেদের কুশল জানানো জরুরী হয়ে পড়েছে আপনদের উদ্বিগ্নতা নিরসনের জন্য।

গত রাতেই দেখেছি কাছাকাছি টেলিফোন বুথ রয়েছে। কিন্তু অত্যধিক জনসমাগমে এখন আর সেই রাস্তার কাছে বুথগুলো দেখা যাচ্ছেনা। সঙ্গী এক হাজী জানালেন ঘন্টা দুইলাইনে দাড়িয়ে ও ব্যর্থ মনোরম হয়ে ফিরে এসেছেন বুথের কাছ থেকে।

অগ্নিকান্ডের পর দুনিয়ার সকল হাজীরাই এখন টেলিফোন নিজেদের ভাগ্য সম্পর্কে আপনজনদের ত্বরিত অবগত করাতে জড়ো হয়েছেন এই অতীব জরুরী যন্ত্রটির কাছে ক্রমে রাত ঘনিয়ে এলো। এখনও পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হয়ে আসেনি। আমাদের শেডের অনেক অংশে বিদ্যুৎ নেই। তবে দূরে ষ্ট্রিটলাইট গুলো ঠিকই জ্বলছিল। রাত হতেই মৃদুমন্দ বাতাস বইছে। সেজন্য গরম অনুভূত হচ্ছেনা। রাত ৯-১০ টার দিকে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা শেডে আমাদের অংশে স্বাভাবিক হয়ে আসে।

গত রাতে এখানে আসার সময় যদিও চারিদিক উংসবের সাজে সজ্জিত ছিল। চারিদিকে বৈদ্যুতিক বাতি তাবুর অবস্থান নির্দেশ করছিল, অন্ধকারে আজ তা ভূতরে নগরে পরিবর্তিত মনে হচ্ছে। কেবলমাত্র শেডে আলো জ্বালানো সম্ভব হয়েছে।
এই শেডে উচু টিনের ছাদ থাকায় এবং এছাড়া আর কোন দাহ্য বস্তু না থাকায় বিস্তৃতি সম্ভব হয়নি। এজন্য নিজেদের ভাগ্যবান মনে করলাম। 

রাত ১০/১১ টার দিকে খাবার খেয়ে ঘুমানোর আয়োজন ব্যস্ত হই। তবে যেখানে দাড়ানোরই জায়গার অভাব সেখানেই একটুখানি ঘুমানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছি। এরই মধ্যে অনেককে ঘুমিয়ে যেতে দেখেছি। তবে এত স্বল্প
পরিসরে আমার ঘুম আসেনি।

রাত দুটার দিকে আমাদের গ্রুপের লোকজনকে জাগানো হলো। কথা ছিল ফজরের পরে আরাফাত অভিমুখে যাত্রা করবো। কিন্তু গ্রুপের কিছু অতি উৎসাহী লোকের চাপে অনেক আগেই আমরা যাত্রা করছি।

৮ জিলহজ্ব জোহর থেকে ৯ই জিলহজ্ব ফজর পর্যন্ত এ ৫ ওয়াক্ত নামায মিনায় অবস্থান করে আদায় করা সুন্নাত। কিন্তু আমাদের এখানে আনা হয়েছে ৭ই জিলহজ্ব রাতে এবং ইতোমধ্যে আমরা এখানে ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে ফেলেছি। তবে নির্দিষ্ট করে দেয়া সেহ ৫ ওয়াক্ত এখানে আদায় হয়নি। এর কারণ ভীড়, ট্রাফিক জ্যাম, জায়গা না পাওয়া ইত্যাদি এড়াতে এরকম সময়সূচী হয়েছে আমাদের।

রাত ২.৩০ এর দিকে গ্রুপের সবাই একত্রিত হই। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বাসের ব্যবস্থা করেছেন। কয়েক মিনিটির মধ্যে কাছেই রাস্তায় দাড়ানো বাসে একে একে সবাই উঠি। এখনই আমরা সেই মহান প্রান্তর যার মর্যাদা ও গুরুত্ব পবিত্র কোরআনে ও রাসুলের বানীতে লিপিবদ্ধ আছে সেখানে রওয়ানা হবো। আমরা কয়েকজন উঠেছি বাসের ছাদে। যদিও জীবনে কোনদিন বাসের ছাদে চড়িনি কিন্তু অনেকটা ইচ্ছে করেই উঠি উপরে। সকল মহিলা এবং বাকী পুরুষেরা বসেছেন বাসের ভেতরে। গাড়ি চলতে শুরু করলো। গত দিনের আগুনের ধ্বংসলীলা প্রত্যক্ষ করে করে আমরা এগিয়ে চলেছি আরাফা অভিমুখে। গাড়ী এখানে মিনা অতিক্রম করেনি। দুধারে তাবুর অস্থিত্ব নেই, শুধু ভস্মিভূত ট্রান্সফরমার, এয়ারকুলার, গাড়ী ইত্যাদিই চোখে পড়লো। মিনা পেরিয়ে এখন গাড়ি মুজদালেফা স্পর্শ করছে। রাস্তায় পার্শ্বে সারিসারি গাছ এবং ক্যানেল এর অস্তিত্ব রয়েছে। কিন্তু এখন পানি শূণ্য। মরুভূমিতে পানি সেচের ব্যবস্থা রয়েছে। মনে হয় কাছাকাছি আরাফাতের পাহাড় এবং তায়েফের বৃষ্টির পানি এদিকে নেমে আসে এবং এই পানি আটকিয়ে সেচের ব্যবস্থা করা হয় কৃষি কাজের জন্য। আগামী কাল পুনরায় মুজদালেফায় ফিরে এসে এক রাতের জন্য অবস্থান করবো। এটা হজ্জের অন্যতম পালনীয় অনুষ্ঠান।

ইতিমধ্যে দু-দুটি ফ্লাইওভার পেরিয়ে এগিয়ে চলেছি আরফাত পানে। আমরা দুধারের নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক দৃশ্য এবং সুদৃশ্য আলোকিত সড়কমালা নয়নভরে অবলোকন করলাম। একসময়য় উপনীত হই আরফাতের সীমায় এবং এই মাত্র প্রবেশ করলাম আরাফাতে।

চারিদিকে হাজার হাজার নিমগাছ এবং এর বেহেস্তী হাওয়া আমাদের দুলিয়ে জানিয়ে দিল এই পবিত্র স্থানের অপার মহিমা। সমস্ত শরীর মন এমনই এক শান্তিতে ভরে উঠলো। মনের অজান্তে বলে ফেললাম দুনিয়ার বেহেস্ত হচ্ছে প্রভুর অসীম রহমতের এই জায়গা।

আরাফাত রিং রোড চিড়ে গাড়ি এগিয়ে চললো অনেক দূর। এখন আমরা মসজিদে নিমেরার কাছাকাছি চলে এসেছি। এখনো এখনো আল্লাহর মেহমানদের কোলাহল শুরু হয়নি। এক শান্ত সুশোভিত সুবহে সাদেকের প্রাক্কালে আমাদের আগমন ঘটেছে এই তীর্থে গাড়ি থেমে গেলে আমরা নেমে যাওয়ার নির্দেশ পাই। গ্রুপের সাহায্যকারী ভাইদের তত্ত্বাবধানে ১১নং হাসপাতালের কাছে ৪নং ক্রস রোডে আমরা জায়গা করে নিই সমস্ত আরাফাত জুড়ে রয়েছে লক্ষ লক্ষ নিম গাছ। আর এসব গাছের শান্ত সুশীল ছায়া এবং নির্মল হাওয়া হাজীদের প্রভুর একান্ত অনুগত হিসেবে সেবা দান করে প্রতি বছর ৯ই জিলহজ।

আমরা যারা মক্কায় একই ঘরে একই সাথে অবস্থান করছিলাম, আজ আরাফাতে রয়েছি একই সাথে এই জায়গায়। ক্রস রোডে যেখানে আমরা বসেছি তা রাস্তার মতোই। এর দুপাশে নিম গাছ এবং গাছের নিচেই আমাদের অবস্থানস্থল। দুধারে গ্রুপে গ্রুপে হাজীদের অবস্থান। মধ্যভাগ লোক চলাচলের জন্য উন্মুক্ত। তবে এই
রাস্তায় যানবাহন প্রবেশ করে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে ।

আরাফাত রিং রোডের যেখানে ক্রস রোডের প্রবেশ পথ সেখানে গাড়ি চলাচলে প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এভাবে পুরো ময়দান এরকম শত শত ক্রস রোডে বিভক্ত । এটা খুবই বাস্তব ভিত্তিক করে নির্মান করা হয়েছে, যাতে হাজীদের সুবিধাজনক অবস্থান নিশ্চিত হয়েছ। এখানে লাখ লাখ হাজী একই সময়ে অবস্থান, আসা যাওয়া করতে কোন ঠেলাঠেলি বা ভিড় হয়না। আমরা নীচে এবং উপরে ক্রিপল টানিয়ে নিই। ইতোমধ্যে ফজরের সময় হয়ে গেলো, কাছেই বাথরুম, অজুখানা। বেশ স্বাছন্দে অজু সেরে নামাযের জন্য দাড়াই। নামাজ শেষে ফলমূল দিয়ে নাস্তার আয়োজন হয়। পূর্বেই অবগত ছিলাম আরাফাতে খাবারের ভালো ব্যবস্থা নাই। সেজন্য মিনা থেকে এসব ফলমূল কিনে এনেছিলাম। দিনের আলোক রেখা উদ্ভাসিত হওয়ার পূর্বেই তিনজন বাংলাদেশী যুবক রুটি বিক্রির জন্য নিয়ে এলো। এরা বাংলাদেশী, হজ মওসুমে এভাবে বাংলাদেশী যুবকেরা যাদের বেশীরভাগই বেকার এবং রোজগারের আশায় এরকম প্রচেষ্ঠা চালায়।

আমি ৫/৬ জনের জন্য ৪৫ রিয়ালে নাস্তা কিনি। তবে এগুলো ছিল খাবার অযোগ্য এবং বাস্তবে মাংসের বদলে চর্বি ও হাড়ের ঝুল বৈ কিছু নয়। শুরুতেই স্বদেশীদের দ্বারা এই পবিত্র স্থানে প্রতারিত হই। 

কিছুক্ষণের মধ্যেই সুন্দর সকাল শুরু হয়। আমরা ২/৩ জন হাটতে হাটতে একটু সামনেই আরাফাত রিং রোডে উপনীত হই। রাস্তার পাশ দিয়ে বিভিন্ন দেশের হাজীরা আসছেন পায়ে হেটে আর মধ্যে দিয়ে শত শত বাস, মাইক্রোবাস, জীপ ইত্যাদি দ্রুতবেগে ছুটছে হাজীদের নিয়ে। এতই বিশাল রাস্তা এতকিছুর পরও ফাঁকা দেখাচ্ছ।

পুলিশ ও স্কাউটরা বিশাল ময়দানের ম্যাপ হাতে নিয়ে এবং হাজীদের জিজ্ঞাসার জবাবে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিচ্ছে। আকাশে সতর্ক প্রহরায় রয়েছে কয়েকটি কপ্টার। আমরা দাড়িয়ে চারিদিকে ময়দানের বিশালত্ব অনুভব করছি। তবে তা হাজার হাজার নিম গাছের কারণে সেভাবে দেখা যাচ্ছে না। এক পুলিশ অফিসারের কাছে গত দিনের অগ্নিকান্ডে প্রানহানীর সংখ্যা জানতে চাই, কিন্তু বেচারা আরবী ছাড়া অন্যভাষা বুঝতে অক্ষম। কিছুক্ষণের মধ্যে হকারের দেখা পাই। সাথে সাথেই এক কপি আরব নিউজ পত্রিকা কিনে হেডিংয়ে ২০০ জন নিহত সংবাদ পড়। আমাদের এলাকার অনেকের জন্য দুঃচিন্তা হলো, যারা ব্যালটি হিসেবে হজ করতে এসেছেন।

এক্ষণে লাখ লাখ হাজী এই বিশাল প্রান্তরে সমবেত হয়েছেন। আজকের এই মহান দিনে প্রভাত থেকেই অনুভব করছি এক স্বর্গীয় অনুভব। মনের মধ্যে কি এক আশ্চর্য প্রশান্তি। এখানে সব কিছুই আপন। শত অচেনাকেও মনে হয় চিরচেনা। 

আমরা জানি মরুভূমি বালুকাময়। কিন্তু আরাফাতে রয়েছে আমাদের দেশের মতো সবুজের হাতছানি । আমাদের অবস্থানস্থলের চারিদিকে সুশৃঙ্খল ও সুবিন্যস্তভাবে ময়দানকে সন্নিবেশিত করা হয়েছে।৷৷৷ এক জায়গায় বসে থাকলে ময়দান মনে হয় না। অসংখ্য নিম জাতীয় গাছের আড়ালে রয়েছেন লাখ লাখ হাজী এবং সকলেই মহান প্রভূর অসীম অনুগ্রহ লাভের, অফুরান রহমত লাভে র আশায় এই ময়দানে অবস্থান করেন একটি নির্দিষ্ট দিনের নির্দিষ্ট সময়কালে পর্যনত।

দুপুরের পূর্বেই গোসল সেরে আসি কাছেই বাথরুমে গিয়ে। এসময় আবারও প্রধান সড়কে পৌঁছি একাকী। রাস্তায় হাজার হাজার হাজী, সকলেই কাছাকাছি ময়দানে সুবিধামত জায়গায় অবস্থান গ্রহণের জন্য ছুটছেন। অনেকে আমাদের পাশের খালি জায়গায় সাময়িক অবস্থানের জন্য মাদুরচাদর ইত্যাদি ফেলছেন।

অন্যদিকে প্রধান সড়কের পাশে কন্টেইনার বাহী গাড়ী, বিশাল ভ্যান ইত্যাদি থামিয়ে ভেতর থেকে বিভিন্ন প্রকার ফলের জুস, ডেয়ারী প্রডাক্টব্রেড ইত্যাদি হাজীদের উদ্দেশ্যে ছুড়ে দেয়া হচ্ছে। আমি এগিয়ে গিয়ে এরকম কয়েকটি জুসপ্যাক,ব্রেড ইত্যাদি সংগ্রহ করি। এভাবে আরাফার দিনে এবং হজের সময় বিভিন্ন কোম্পানী তাদের
উৎপাদিত পন্যের হাজার হাজার প্যাক বিনা মূল্যে হাজীদের মধ্যে বিতরণ করে। তাছাড়া সে দেশের বিভিন্ন ধনাঢ্য ব্যক্তিরা আস্ত চিকেনফ্রাই
, ফ্রাইডরাইস ও বিতরণ করেন হাজীদের মধ্যে। পানিবাহী গাড়ী থেকে ঠান্ডা পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। এ থেকে আমরা নিজেদের ওয়াটার পট গুলো ভর্তি করে আনি।

জোহরের পূর্বে হজের খোৎবা দেওয়া হবে। নির্দিষ্ট সময়ে মসজিদে নিমেরায় পৌঁছে যদিও খোৎবা শুনার কথা, কিন্তু তেমন কেউ এখান থেকে যাননি। আমরা যারা এখানে অবস্থান করছি, পাশাপাশি অন্যান্য দেশী হাজীরাও নিজ নিজ স্থানে জোহরের নামাজ আদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছি। মসজিদে নিমেরায় খোৎবা শেষ হলে জোহর ও আসরের নামাজ একই সাথে আদায় করতে হয়।

দুপুরের পরে সকলেই একটু একটু খাবার খেয়েছি। এ সময়ে কেহই খাবার দাবারের তেমন গুরুত্ব দেন না বা স্বল্প আহারেই তুষ্ট থাকেন। আর দুতিন ঘন্টার মধ্যেই আমরা আরাফাত ত্যাগ করবো মুজদালেফার উদ্দেশ্যে। এই কয়েকঘন্টা অতীব বরকতময়। এই ময়দানে বসে দোয়া করা, আল্লাহর কাছে করুনা চাওয়া সুভাগ্যের। আমি নিজে এখানে মহান আল্লাহকে সেভাবে ম্মরণ করতে পারি নি। এজন্য নিজেকে খুবই দূর্ভাগা মনে হচ্ছে।

লাখ লাখ হাজী এখানে বসে সেই মহান সত্তার কাছে প্রার্থনা করছেন, চোখের জলে গা ভাসিয়েছেন এবং তারই অপার রহমতের ভাগিদার হয়েছেন। এই ময়দান এবং আরাফাতের দিন সম্পর্কে হাদিসে বলা হয়েছে ‘‘কেহ যেন আরাফার দিনে এখানে বসে নিজেকে গোনাহগার মনে না করে’’

সুতরাং এই দিনের প্রতিটি মুহুর্তে একমাত্র আল্লাহকে ম্মরণ এবং তারই করুনার জন্য নিজেকে নিবেদিত করার এক অপূর্ব সুযোগ। এই মহার্ঘ্য দিবসের অবসান হতে চলেছে। আমাদের জন্য গাড়ী খোঁজা হচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা রওয়ানা হবো মুজদালেফা অভিমুখে। বিকেল ৫টায় দিকে একটু হেঁটে এগিয়ে গিয়ে মূল সড়কে দাড়ানো গাড়িতে উঠে। এই দিনে যানবাহন যোগাড় এবং সময়মত পাওয়া দূরুহ ব্যাপার। হাজার হাজার হাজী পায়ে হেঁটেই মুজদালেফা পৌঁছান। ৩/৪ মাইলের মতো পথ। তবে নারী ও বৃদ্ধ লোকজন এভাবে হেঁটে যাওয়া সম্ভব নয়সমীচিন ও নয়।

আমাদের গাইডও সাহায্যকারীরা একটু পটু ই বলতে হয়। তাৎক্ষণিক গাড়ী সংগ্রহ সম্ভব হয়েছে তাদের দ্বারা। উনারা বেশ বছর থেকে এ কাজে নিয়োজিত আছেন। তবে এসব ব্যবস্থা বেসরকারী ভাবেই হচ্ছে। মূল ব্যবস্থাপনায় এসব দায়িত্ব নির্দিষ্ট মুয়াল্লিমদের এবং এজন্য আমাদের সকলকেই মুয়াল্লিম ফি, মিনা-আরাফাত-মুজাদালেফা আসা যাওয়ার ভাড়াও পরিশোধ করতে হয়েছে। কিন্তু এতে নিশ্চিত থাকলে এবং উপর নির্ভর করলে অনেক সময় সমস্যায় পড়তে হয়। অতীতে অনেক অভিযোগ শুনেছি, ঠিকমত মুয়াল্লিম প্রদত্ত গাড়ি না পাওয়া, গাড়িতে জায়গা না পাওয়া, এবং গাড়ির জন্য অপেক্ষা করতে করতে একেবারে না পাওয়া, শেষে অনেক বিড়ম্বনায় পড়া। সুতরাং আমরা এসব সমস্যা এড়াতে এক ব্যক্তির ঘরে মক্কায় অবস্থান থাকা-পাওয়া, মিনা আরাফাত -মুজদালেফা যাওয়া আসা অর্থাৎ হজের অনুষ্ঠানসমূহ উনার তত্ত্বাবধানে এবং ব্যবস্থাপনায় করতে চুক্তিবদ্ধ হয়েছি।

আরাফাতে এখনও পর্যন্ত আমরা অবস্থান করছি, তবে গাড়িতে, একেবারে গাড়ির ছাদে। অনেকটা উৎসুক্য নিয়েই উঠেছি। সন্ধ্যার পূর্বক্ষণ রৌদ্র কিরণ নেই, আছে মৃদু বাতাস। আমাদের গাড়ী এখনো দাড়িয়ে। হাজার হাজার গাড়ী ছুটছে মুজদালেফা পানে,এখন আরাফাত থেকে বিদায় নেবার পালা। প্রশস্থ,পর্যাপ্ত সড়ক এবং সর্বাধুনিক ট্রাফিক পদ্ধতি এবং যোগাযোগ অবকাঠামো । সুতরাং তেমন দু:চিন্তার কারণ নেই। দূরে দেখা যাচ্ছে ঠিকই গাড়ি চলছে তবে সুশৃংঙ্খল ভাবে চলাচলের জন্য একটির পর একটি লেনের যানবাহনকে যেতে দেয়া হচ্ছে। এখনও আরাফাত দিবস এর অবসান হয়নি। আমাদের জোহর থেকে মাগরেব পর্যন্ত অবস্থান করার কথা। গাড়ীর ছাদ থেকে চারিদিকে পুরো ময়দান অবলোকন করার সুযোগ পাচ্ছি। আকাশে কয়েকটি হেলিকপ্টার চক্কর দিচ্ছে। ময়দানের একটি জায়গার জাবালে রহমত দৃষ্টি গোচর হচ্ছে। শ্বেত পাথরের উচু স্তম্ভের দ্বারা জাবালে রহমতের অবস্থান নির্ণয় করা যায়। সেখানে অনেক হাজী এখনও অবস্থান করছেন। সব দিকেই তাবু এবং তাবু ছাড়াও গাছের নীচে হাজীদের অবস্থান এখনও বিদ্যামান রয়েছে।

লাখ লাখ হাজি রয়েছেন মুজদালেফার পথে গাড়ীতে এবং পায়ে হেটে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের লেনের গাড়িগুলো চলতে শুরু করলো। আস্তে চলতে চলতে হঠাৎ দ্রুত চলতে শুরু করলো আমাদেরকে বহনকারী গাড়িটি। আমরা কাছাকাছি মুজদালেফার ময়দানে রাত্রি যাপন করবো ইনশাআল্লাহ ।

পর্বঃ ০৬

 

মুজদালিফায়।। রাত্রি যাপন কয়েক মিনিটের মধ্যে মুজদালেফার বড় মসজিদ চোখ পড়লো অনেক হাজী নামাজের জন্য মসজিদে প্রবেশ করছেন। আমরা এখানে না নেমে আরেকটু সামনে গিয়ে মুজদালেফার ময়দানে গাড়ি থেকে নেমে পড়ি।

গাইডের সহযোগিরা দ্রুত শতরঞ্জি,ম্যাট ইত্যাদি মাটিতে বিছিয়ে দিলেন। এখানে জায়গার স্বল্পতা ও তাড়াহুড়া রয়েছে। কারণ একই সময়ে সকল হাজীই আরাফাত থেকে মুজদালেফার পৌঁছেন। তাছাড়া মিনা আরাফাতের মতো সুশৃংঙ্খল ও সুযোগ সুবিধা সম্পন্ন অবকাঠামো এখানে নেই বা অপ্রতুল। ইতিমধ্যে আমরা জায়গা নিয়ে দাড়িয়েছি। এখন এশার নামাজের সময়। মুজদালেফায় এশার ওয়াক্তে মাগরেব এশা একত্রে আদায় করতে হয়। -প্রথমেই প্রয়োজন হলো পানির। অজুপ্রাকৃতিক প্রয়োজন রয়েছে প্রায় সকলের। যদিও একটি টয়লেট ও অজুখানার পার্শ্বে অবস্থান নিয়েছি আমরা। তবে তা ছিল বহুসংখ্যক লোকের জন্য যা খুবই সমস্যার। অনেক্ষণ লাইনে দাড়িয়েও ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ফিরে আসতে হলো। এ অবস্থায় আবারও পানির খোঁজে বের হই। খানিক দূরে একটি পানির টেপে অজু সেরে অবস্থান স্থলে ফিরে এসে জামায়তে শরিক হলাম।

প্রথমে মাগরিবের ফরজ তিন রাকাত তারপর আরেক একামতে একই জায়গায় একই ইমামের পেছনে এশার ফরজ চার রাকাত আদায় করি। আমাদের গ্রুপের মহিলারাও এভাবে নামাজ আদায় করলেন।

রাত ৯.৩০ হয়েছেকিন্তু খাওয়া-দাওয়া হয়নি আমাদের গ্রুপের সদস্যদের। সেজন্য ক্ষুধায় অস্থির অনেকেই। গত দুদিন থেকেই খাওয়া দাওয়া হচ্ছে না ঠিকমত। গ্রুপের তত্ত্বাবধায়ক সংগ্রহ করলেন সংক্ষিপ্ত খাবার। বিরিয়ানীর মতো-দুএক টুকরা মাংস এবং পোলাও। তবে ভাল মানের না হওয়ায় যায়নি। নিজেই বেবর হই ভাল কিছুর সন্ধানে। ময়দানেরই এক জায়গায় বিক্রি হচ্ছে মাটনকারি এবং রুটি। ১৫ রিয়ালে কিনেতিন বন্ধু মিলে খেলাম সেটুকু।

বেশ রাত হয়ে গেছে। ঘুমানোর চেষ্টা করছি। এখানে মিনার মতো তাবু বা শেড নেই। খোলা আকাশ উপরেনীচে শুধু ছোট ছোট কংকর এবং এর উপরে পাতলা শতরঞ্জি আর চাদর। নীচে কংকারের অস্থিত্ব গায়ে অনুভূত হচ্ছে।

এই মুজদালেফার ময়দান থেকে সংগ্রহ করতে হয় ছোট ছোট কংকর। পরদিন প্রভাতে তা মিনায় পৌঁছে জামরায় (শয়তানের প্রতি) নিক্ষেপ করতে হয়। সঙ্গী সাথীদের নিয়ে সংগ্রহ করি কিছু কংকর। বাকী প্রয়োজনীয় সংখ্যক সাথীরা পূর্বেই সংগ্রহ করেছেন আমার জন্য। উন্মুক্ত আকাশের নীচে ঘুম আসছে না। আজ বাদশাহ্ ফকির নির্বিশেষে লক্ষ লক্ষ আল্লাহর দাস এই কংকরময় ভূমিতে রাত্রিযাপন করছেন। আমাদের পাশাপাশি ছিলেন বিভিন্ন আরব দেশের পুরুষ ও মহিলারা। কোন ভেদাভেদ নেই আজ। সবাই একইরকম দীনহীন বিছানায় শুয়েছেন।

আরব দেশীও সম্ভবত মিশরীয় হাজীদের একটি গ্রুপ মধ্যরাতে ঘুম থেকে উঠে চলে যাচ্ছেন। শেষ রাতের দিকে আমাদের গ্রুপের মহিলা সদস্যদের দুতিনজন পুরুষ হাজীসহ মক্কায় পাঠানো হয়েছে। কারণ এখানে পয়ঃব্যবস্থা একেবারে অপ্রতুল। ভোরে রমী (কংকর নিক্ষেপ) করা মহিলাদের পক্ষে সম্ভব পর হবে না।

আমরা গ্রুপের ৩০/৩৫ জন ফজর নামাজ পর্যন্ত অবস্থান করলাম। বাদ ফজর রমী’ করার জন্য মুজদালেফায় থেকে মিনায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি।

আজ ১০ই জিলহজ্জ। আজ থেকে ৩দিন মিনায় কংকর নিক্ষেপ করতে হয়মিনা উপত্যাকার ৩টি নির্দিষ্ট জামরায়। আমাদের গ্রুপের মুজদালেফা থেকে যাত্রা করতে বিলম্ব হচ্ছে। পায়ে হেঁটেই যাব মিনায়। কেননা গাড়ি পাওয়া এখন দুষ্কর হয়ে পড়েছে। ফজরের নামাজের পর থেকেই রাস্তায় ভীষণ ভীড়। লাখ লাখ হাজী মিনার পথে রয়েছেন। অবশেষে একজন হাজীর নেতৃত্বে কয়েকজন গাইডসমেত অভিশপ্ত শয়তানের বিরুদ্ধে ঘৃনা ও ক্ষোভ নিয়ে যাত্রা শুরু হল। অন্তরে চিরদুশমন ইবলিসের প্রতি প্রচন্ড বিদ্বেষ ভাবাপন্ন হয়ে সকলই ছুটলাম জামরা অভিমুখে। ৪/৫ কি.মি. দূরে পৌঁছতে হবে। দ্রুত হেঁটে হেঁটে মিছিলের মত করে চলছে বিভিন্ন দেশের হাজীদের কাফেলা। ভিড়ে দল ছুট হওয়ার ভয় রয়েছে। সেজন্য একজনের হাতে রয়েছে সনাক্তকারী পতাকা। গ্রুপের সকলেই থাকে অনুসরণ করে ছুটছে।

রাস্তার পাশে কিছু দূর অন্তর অন্তর টেপযুক্ত ঠান্ডা পানির আধার রয়েছে। এতে পিপাসা স্বস্থির সুযোগ হয়েছেতবে দেরী করার অবকাশ নাই। ১৫/২০ সেকেন্ডর মধ্যে পানি পান করে আবারও অনুসরণ করছি পতাকাবাহী ব্যক্তির। একসময় এসে পৌছলাম গন্তব্যের কাছাকাছি। দুধারে বিশাল এবং উঁচু পর্বতমাঝখানে প্রশস্ত সড়কদূরে জামরার অবস্থানকিন্তু সেখানে প্রচন্ড ভিড়ে শুধু মানুষের মাথাই দেখা যাচ্ছে।

আমরাও এগিয়ে যাচ্ছি ভিড় ঠেলে ঐ ভিড়ে জুতা পায়ে থাকবে না তাই ফেলে দেই পা থেকে। একটু এগিয়ে কংকর নিক্ষেপের চত্তর বা কমপাউন্ডহাজীদের জন্য সুবিধাজনক করে নির্মাণ করা হয়েছে।

টারবাইনফ্যান স্থাপন করা হয়েছে উঁচু ছাদ যুক্ত ঐ কমপাউন্ডে। এর বিভিন্ন অংশে রয়েছে ৩টি জামরা। অর্থ্যাৎ তিন শয়তানের অবস্থান (প্রতিকী)। একটি চেয়ে আরেকটি খানেক দূরে। ঐ কংকর নিক্ষেপ খুবই জুকিপূর্ণ। যেকোনো সময়েই পদপৃষ্ঠ হওয়ার আশংকা রয়েছে।

প্রতি বছরই কংকর নিক্ষেপের (রমি করা) সময় দূর্ঘটনায় ৭/৮ জন হাজী প্রাণ হারান। রমি করার প্রথম দিন ১০ জিলহজ সর্বপ্রথম বড় শয়তানের প্রতি কংকর নিক্ষেপ করা হয়।

এখন সকাল ৮টা ৩০ মিনিট হবে। এই স্থানে জমায়েত হয়েছেন কয়েক লক্ষ হাজী। আমি সঙ্গী কয়েকজনের পুরনো হাজীসহ কাছাকাছি যাবার চেষ্ঠা করলাম কংকর নিক্ষেপ করতে। কয়েক মুহুর্ত পরেই প্রচন্ড ভিড় ও ঠেলা-ধাক্কা শুরু হওয়ায় সঙ্গি সাথীদের কখন যে হারিয়ে ফেলেছি তা মনে করার ফুসরত নেইনিজের প্রাণ বাঁচানো দায় এরককম অবস্থা। ২০/২৫ জন একেক ধাক্কা সামলিয়ে কিভাবে নিজেকে খাড়া রেখেছে আল্লাহই জানেন। তবে সবসময় প্রাণান্ত চেষ্ঠা করেছি যাতে নিচে পড়ে না

যাই এবং বড় শয়তান নির্দিষ্ট স্তম্ভের কাছে যেতে। একসময় ৮/১০ ফুট কাছে পৌছে নির্দিষ্ট সংখ্যক কংকর নিক্ষেপ করি জামরায়। যদিও সবগুলো স্তম্ভ স্পর্শ করেনিএর পিছনে কারণ ও ছিল। এমনি নাজুক পরিস্থিতে দুহাত দূরেও কোন কিছু সঠিকভাবে নিক্ষেপ সম্ভব নয়। এখন মোটামুটি নিশ্চিন্ত হলাম। সবচেয়ে কঠিন কাজটি যেকোন প্রকারেই হউক সম্পন্ন হওয়ায়। 

রমী’ করা বা কংকর নিক্ষেপ ঝুকিপূর্ণ হওয়ার কারণ হচ্ছে এই সময় বিশ্ব মুসলিমের শয়তানের প্রতি চূড়ান্ত ক্ষোভ ও ঘৃণার বর্হিপ্রকাশ ঘটে। এতসব ঠেলা-ধাক্কা যা ছিল নিজের জীবনের প্রতি প্রবল ঝুকিপূর্ণ এবং মারাত্মক পরিনতির ডেকে আনত তা কেবল মাত্র শয়তানের প্রতি ঘৃণা ও প্রতিশোধ গ্রহণের নিমিত্তে হয়েছে। হাজীরা যেভাবে শয়তানের প্রতি কংকর ছুড়তে উদ্যত হন তা কেবল প্রত্যক্ষদর্শীরাই বুঝতে পারেনঅনেক জুতাছাতিইত্যাদি নিয়ে বেহুশের মতো এগিয়ে যাচ্ছেন লক্ষ পানে।

 

পরবর্তী কাজ হচ্ছে কোরবানী করা এবং মাথার চুল ছাটা। কমপাউন্ডের বাইরে অনেক গুলো সেলুনের চুল কাটা হচ্ছে। তাছাড়া বিভিন্ন দেশী হাজীরা নিজেরা একে অন্যের মাথা কামিয়ে নিচ্ছে খোলা জায়গায়। আমি আর বিলম্ব না করে মক্কায় পৌছে যেতে মনস্থ করলাম।

একাকি পায়ে হেটে কমাপাউন্ডের বাইরে বড় রাস্তায় উপনীত হই। রাস্তায় অসংখ্য বাস বোঝাই হয়ে হাজীরা ছুটছেন মক্কাভিমুখে। কোনটিতে তিল ধারণের জায়গা নেই। এখানে আমাদের গ্রুপের কোন নিজস্ব আয়োজন নেই। তাছাড়া এখন আমি দলছুট। সুতরাং একাই পথ খোঁজে গাড়ি যোগাড় করতে হচ্ছে। ভীষণ ক্লান্তি অনুভব করছি। সকালে অনেক পথ পায়ে হেটে মিনায় পৌছেছি। পরবর্তীতে কংকর নিক্ষেপের সময় শরীরের উপরে খুব বেশী চাপ এবং ধাক্কা গেছে। এই অবস্থায় মক্কায় পৌছে যাওয়া ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারিনি। তবেদাড়িয়ে থেকে গাড়ি পাওয়া সম্ভব নয় ভেবে চলতে শুরু করিকিছু দূর যাওয়ার পর বাসস্ট্যান্ডঅনেক গুলো গাড়ি দাড়িয়ে লোক উঠাতে দেখে এগিয়ে যাই।

উঠতে উঠতে সবগুলো আসন দখল হয়ে যাওয়া অগত্যা দাড়িয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। গাড়ি চলতে শুরু করল। তবে রাস্তায় ভীষণ যানজট থাকায় গাড়ি একটু এগুলেই থামতে হচ্ছে। ড্রাইভার ভাড়া উঠানো শুরু করলো। ৩/৪ মাইল পথে কিন্তু ভাড়া দিতে হলো ২০ রিয়াল করে। ঘন্টা দেড়েক পরে গাড়ি থামলতবে হারামের অন্য প্রান্তে।

এখন আমাকে হারাম শরীফের পাশ দিয়ে ৩কি.মি পথ হেঁটে পৌছাতে হবে বাসায়। গাড়ি থেকে নেমেই পানিড্রিংকস ইত্যাদি কিনে পান করিকিছুক্ষণের মধ্যে বাসায় পৌছে পূর্বাহ্নে আসা হাজীদের সঙ্গে সাক্ষাত করি। উনারা বয়সে প্রবীণ এবং মহিলা এই জন্য কংকর নিক্ষেপে যাননি। আজ সৌদি আরবে ঈদ-উল-আযহা উদযাপিত হয়েছেশুনলাম সকালের দিকে মসজিদুল হারামে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে যারা হজ পালনরত তাদের বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা থাকে এদিন। সুতরাং ঈদের নামাজ নেই হাজীদের। 

মিনায় কংকর নিক্ষেপের পর কোরবানি করতে হয় এইজন্য নির্দিষ্ট ময়দানে গিয়ে তার সম্পন্ন করা হয়। অন্য বিকল্প হচ্ছে ইসলামী উন্নয়ন ব্যংকের মাধ্যমে দেয়া। আমি পূর্বাহ্নে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ব্যাংকের মাধ্যমে তা আদায় করব। সে অনুযায়ী নির্দিষ্ট সংখ্যক কোরবানির জন্য টাকা দিয়ে টোকেন সংগ্রহ করি। ঘর থেকে নেমেই রাস্তার অন্যপাশে ব্যাংকের বুথ। সুতরাং অনায়াসে তা সম্পন্ন করি। বাংলাদেশসহ অন্যান্য মুসসলিম দেশে যে কোরবানির মাংস আসে তা ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংকের মাধ্যমে যেসকল কোরবানি হয় সেই মাংস। ব্যাংক থেকে জানতে পারি ১১টার দিকে কোরবানি হবে। কোরবানি হওয়ার পর মাথার চুল কামাতে হয়।

এখনও সকাল ১১টার অনেক বাকী। বাসায় গিয়ে একটু শুয়ে পড়লাম। পাঁচ দিনের হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা অনেকটা শেষ হয়ে আসছে। এখন বাকী মিনায় গিয়ে পরবর্তী দুইদিন কংকর নিক্ষেপ এবং মক্কায় পবিত্র কাবায় তাওয়াফে যিয়ারত। গত তিন-চারদিনে মিনা- আরাফাত-মুজদালেফায় বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতায় শরীরের উপর খুব দখল গেছে। এজন্য ভাবছিলাম মক্কায় পৌঁছেই বিশ্রাম নেবঘুমাবো। তবে ঘুম আসলো না ঠিকই কিন্তু বেশ স্বস্থি পাচ্ছি। 

এখন মাথা কামাতে হবে। ঘর থেকে বেরিয়েই চুল কাটার সেলুন। সেলুনে লম্বা লাইন। লোকজন ঘরের বাহিরে রোদ্রে দাড়িয়ে আছেন চুল কাটতে। বিশেষ ধরনের যন্ত্র দিয়ে আরামেই চুল কাটা হচ্ছে। মাথা পিছু ১০ রিয়াল।অনেক্ষণ দাড়াতে হবে লাইনে সেহেতু সাথে সাথেই আসলাম ঘরে। আগেই সঙ্গী হাজীদের দুজন জানিয়েছেন কামিয়ে দিবেন। সে অনুযায়ী তাদেরই শরণাপন্ন হই। তাঁরা সযত্নে কাজটি করলেন। তবে পটু না হওয়ায় সময় লাগলো আধা ঘন্টা এবং রেজার দরকার হলো দুটি। এভাবেই বেশীর ভাগ হাজী একে অন্যের মাথা কামানোর কাজ করেন। নইলে হাজার হাাজার নাপিত প্রয়োজন হতো। কিছুক্ষণের মধ্যেই গোসল সেরে এহরাম খোলো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসি।

এদিন আমরা আর মিনার ফিরে যাইনি। পরবর্তী ২দিনও মিনায় অবস্থান করে কংকর নিক্ষেপ করতে হয়। কিন্তু আমরা প্রথম দিন কংকর নিক্ষেপের পর পরই মক্কায় ফিরে এসেছি। তবে দৃশ্যত: এভাবে অনেক হাজীই মক্কায় ফিরেছেন। এখন শুধুমাত্র পরবর্তী দুদিন মিনার গিয়ে তা সম্পন্ন করে আসবেন। আবার কেহ কেহ এই সুন্নাত আদায়ের জন্য পুনরায় মিনার গিয়ে রাত্রিযাপন এবং দিবাভাগে কংকর নিক্ষেপের কাজটি করবেন। এসময় হজের ফরজ তাওয়াফও করতে হয়। এজন্য মক্কায় আসার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তবে তাওয়াফ সম্পন্ন করে মক্কায় না থেকে মিনার রাত্রি যাপনই রীতি। আমরা এ কাজটি সঠিকভাবে করতে পারিনিযেহেতু মিনায় রাত্রি যাপন করিনি। কংকর নিক্ষেপের ২য় দিন জোহরের পর থেকে তা করতে হয়। আমরা ঘরের সকল সঙ্গী একই সাথে সেখানে যাব ঠিক করি। একজন ছিলেন আরজু ভাইপুরনো হাজী। যিনি বেশ কয়েক বৎসর মক্কায় কাটিয়েছেন এবং কয়েকবার হজও করেছেন। আমরা মক্কা থেকে বাস চেপে জামরায়’ উপস্থিত হই আরজু ভাইয়ের নেতৃত্ব। পুরোপুরি অনুসরণ করি তাকে। যেদিকে লোকজন ঢুকছেন কংকর নিক্ষেপের জন্য উনি সেদিকে না ঢুকে একেবারে উল্টোদিকে গিয়ে অনায়াসে জামরারে একেবার নিকটে পৌঁছলেন আমাদের নিয়ে। এ মুহুর্তে ভাবতে অবাক লাগছেএভাবে স্তম্ভের (জামরা) যে পাশে হাজীদের রোষ বেশীবৃত্তের (স্তম্ভ) ঠিক উল্টোদিকে একেবারে কম সংখ্যক হাজী দাড়িয়ে দাড়িয়ে কংকর নিক্ষেপ করছেন।

আমরা এতই সহজে এই কাজটি করলাম যা গতকালই ছিল অকল্পনীয়। নির্দিষ্ট দোয়া পড়ে একটি করে সাতটি কংকর নিক্ষেপ করতে হয় প্রতিটি জামরায়। আবার কংকর নিক্ষেপ শেষে ও দোয়া পড়তে হয়। অতপর: পরবর্তী জামরা গুলোতে এর চেয়েও সহজে একই কৌশল অবলম্ব করে কংকর নিক্ষেপ করতে পেরেছি সঠিকভাবে। বিকেলের দিকে সকলেই ফিরে আসি মক্কায়।

পর্বঃ ০৭

আজ রাতে আমরা ফরজ তাওয়াফ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা করেছি। সে মোতাবেক রাত ১২টায় জামান ভাই, কবির ভাই,আরজু ভাই, আম্মা, আমি এবং প্রথমোক্ত দুজনের মাতা এবং আরজু ভাইয়ের শাশুড়ীসহ পবিত্র খানায়ে কাবায় তাওয়াফে যিয়ারতশুরু করি।

এই ফরজ তাওয়াফে ভীষণ ভিড় হয়। কেননা এই নির্দিষ্ট তিন দিনের মধ্যে সকল হাজীই অর্থাৎ ২৫/৩০ লাখ লোক তাওয়াফ করেন। সঙ্গত কারণেই চরম ভিড় পূর্ণ হওয়ার কথা। আমরা রাতের এই সময়টিকে বেছে নেই, অপেক্ষাকৃত কম ভীড় হবার কারণে। তদুপরি বেশি ভিড়েই একে একে ৭বার কাবাকে প্রদক্ষিণ করি গ্রুপের সকলে।

অতপর দুরাকাত ওয়াজিবুত-তাওয়াফ নামাজ আদায় এবং জমজম পান করার পর আমরা সাফা পাহাড়ের চূড়ায় উঠি চলন্ত সিড়িতে। এখন সায়ীকরতে হবে, সাফা থেকে মারওয়া মারওয়া থেকে সাফা—সাতবার। এটা যদিও আমাদের (যুবক) জন্য তেমন কষ্টসাধ্য নয় কিন্তু মহিলাদের জন্য সমস্যা হবে। জামান ভাইয়ের মাতা প্রায় ৭২ বছর বয়সী। তদুপরি গত বছর হার্টির বাইপাস সার্জারী হয়েছে। বসা থেকে একাকী উঠতেই পারেননা ধরে উঠাতে হয়।

উনাকে সায়ীকরাতে অবশ্যই হুইল চেয়ার প্রয়োজন। কিন্তু ঘন্টাখানেক খোঁজাখুজি করেও হুইল চেয়ার, পুশ চেয়ার কিছুই পাওয়া যায়নি। আম্মা ঐদিন একটু অসুস্থ ছিলেন, আমিও খোঁজকরি আম্মার জন্য, একাজে নিয়োজিত রয়েছে অনেক হুইল চেয়ারওয়ালা।

এসব হুইল চেয়ারওয়ালাকে স্বাভাবিক অবস্থায় একজনের সায়ী করাতে দিতে হয় ১০০ রিয়াল। কিন্তু ৫০০ রিয়ালে পাওয়া যাচ্ছে না। তখন আমাদের পরিচয় পত্র সাথে ছিল না, থাকলে মসজিদের সেবা বিভাগ থেকে বিনে পয়সায় হুইল চেয়ার আনা যেত অক্ষম এবং অসুস্থদেরে সায়ী করানোর জন্য।

এখন দুজনই কঠোর মনোভাব প্রদর্শন করলেন। পায়ে হেঁটেই সাত চক্কর সম্পন্ন করবেন। এছাড়া উপায়ও ছিল না। এটা ছিল ফরজ তাওয়াফ এবং এর সায়ীকরতে হয়। সুতরাং আল্লাহর নামে এবং তারই উপর ভরসা করে যুবক বৃদ্ধ-বৃদ্ধা সকলেই সায়ী শুরু করলেন এবং কোন বিরতি না দিয়ে সাত চক্কর সম্পন্ন করলেন।

এখন রাত ৩টায় মতো হয়েছে। প্রায় ৩ ঘন্টায় আমরা সম্পূর্ন তাওয়াফ ও আনুষাঙ্গিক করণীয় বিষয় গুলো শেষ করে মহান আল্লাহর শুকরিয়া জ্ঞাপন করি। নীচে নেমে মসজিদুল হারামে বসে বসে আল্লাহকে স্মরণ করছি। তাহাজ্জুদ এবং ফজর পড়ে ভোরে সকলেই ঘরে ফিরি।

আজ ১২ই জিলহজ শুক্রবার। এখনই গোসল সেরে প্রস্তুতি নিয়ে যেতে হবে মসজিদুল হারামে। এমনিতেই ভিতরে জায়গা পাওয়া মুশকিল।
তদুপরি পবিত্র জুমাবার। মসজিদের বহিরাংশে বেশ পেছনেই জায়গা পাই। 
গত শুক্রবার ও আমরা মক্কায় ছিলাম। ঐদিন মসজিদুল হারামের একেবারে ছাদে উঠে জুমার নামাজ পড়েছি খোলা আকাশের নীচে। আজও খোলা চত্তরে পড়ছি প্রখর রোধে।

তবে আমাদের দেশের মতো আদ্র আবহাওয়া নয়, সেজন্য শরীর ঘামে না এবং ভ্যাপসা গরম অনুভূত হচ্ছে না। আমরা রোদ থেকে বাঁচতে ছাতা ও জায়নামাজ মাথার উপর ধরি।

বিশাল জামায়াত। লাখ লাখ মুসল্লী শরীক হয়েছেন। ইমাম সাহেব খোৎবা দিলেন। পরে নামাজ আদায় করি। ঘরে ফেরার সময় রাস্তায় বিশাল লরি থেকে রাজর্কীয় উপহার হিসেবে ঠান্ডা পানি দেওয়া হচ্ছে বিনামূল্যে।

বিকেলের দিকে মিনায় কংকর নিক্ষেপের জন্য ৩য় এবং শেষ বারের মতো যেতে হবে। ৩টার সময় ঘরের বাইরে এসে গাড়ীর জন্য অনেক্ষণ অপেক্ষার পর একটি বাসে করে পাঁচ / সাত কি:মি: দূরে মিনায় পৌঁছলাম। গাড়ি থেকে নেমে কিছুদূর হেটেই নির্দিষ্ট জায়গায় কংকর গুলো নিক্ষেপ করে দোয়া পড়ি। এক্ষণে হজের করণীয় সকল
গুরুত্ব পূর্ণ কাজ সম্পন্ন হলো।

ফিরতি পথে মক্কার উদ্দেশ্যে গাড়িতে উঠি। মাগরেবের নামাজ ক্বাযা হয়ে যায়। বিলাস বহুল বাসের ড্রাইভার পথ ভুলে বিভিন্ন জায়গা ঘুরে দুঘন্টা পর হারাম শরিফের পাশে পৌছলো। হজের সময় সারা সৌদিআরব থেকেই বাড়তি রোজগারের আশায় শত শত গাড়ি ও ড্রাইভার মক্কায় আসে। সম্ভবত বাইরে কোন শহরের ড্রাইভার এজন্য এভাবে পথ ভুলে ছিল।

এশার নামাজের জন্য মসজিদে উপস্থিত হলাম। মসজিদুল হারামে ইমাম সাহেব খুবই সুমধুর কেরাতসহ নামাজ পড়ান। অনেক নামাজে ইমাম সাহেবকে দেখেছি ক্বেরাত কান্নাজড়িত কন্ঠে পড়াচ্ছেন। আমার কাছে মনে হয়েছে তা কোন মক্কী সূরার আয়াত বিশেষ। সম্ভবত মক্কার কাফের মুশরিকরা নবীজীকে যেভাবে কষ্ট ও উৎপীড়ন করেছে যেসব ঘটনার ইংগিত রয়েছে এসব আয়াতে।

(আসলে সেসব আয়াতে ছিল আললাহর আযাব বা শাস্তির কথা যা আমি বহু বছর পড়ে বুঝতে পারি)

ইমাম সাহেব এতই দরাজ গলায় এবং মধুরতানে তা আবৃত্তি করতেন এতে আমার শুনামাত্র সর্বদাই চোখে জল আসতো অঝোর ধারায়। এত দরদ নিয়ে পবিত্র কালামে পাক থেকে কেরাত পড়েনসে এক অপূর্ব স্মৃতি হয়ে আজও মনে বেজে উঠে। আবারও ঐ পবিত্র অঙ্গনে পৌঁছানোর পরই এরকম সুমধুর কন্ঠে কোরআন শুনতে পারবো।

মক্কা শরীফে আমাদের খাওয়া দাওয়া বা পানি কষ্ট হয়নি। বোতলজাত মিনারেল কিনতে হতে কখনও। আবার একটু কষ্ট করে লাইনে দাড়িয়ে জম জম ওয়াটার সংগ্রহ করা যায় মসজিদের বাইরের টেপগুলো থেকে।

নামাজের সময় পানির খালি বোতল নিয়ে মসজিদে প্রবেশ করলে সহজেই সংগ্রহ করা যেত জমজমের পবিত্র পানি। অন্যান্য পানিয় যেমন ফলের জুস প্যাক, সফট ড্রিংকস ইত্যাদি একেবারে সস্তা। ৩ রিয়ালে ৩ লিটার জুস পাওয়া যায়। আরো রয়েছে আপেল, আঙ্গুর, মাল্টা, কলা ইত্যাদি। বড় বড় তাজা সাগর কলা কেজি প্রতি ৫ রিয়াল। গড়ে একটি ১ রিয়াল। দক্ষিণ আমেরিকার ইকোয়েডর’ থেকে আমদানীকৃত। বেশ মিষ্টি প্রায় দেশীয় স্বাদের এসব কলা এতোই তাজা যে দেশে কখনও দেখিনি। তাছাড়া বিভিন্ন গ্রোসারী দোকানের ফ্রিজে রয়েছে দই ও মাটা। একেবারে দেশী টক দই। ২/৩ রিয়ালে ৩০০/৪০০গ্রাম এর কৌটা কেনা যায়। আরও আছে উন্নতমানের গাভী থেকে সংগ্রহিত পাস্তরিত দুধ, বেশ স্বাদের এই দুধ। বেকারী বা প্রেষ্ট্রিসপে রয়েছে স্লাইস ব্রেড, প্রেষ্টি জাতীয় খাদ্য সামগ্রী। তবে আমাদের দেশের মতো মজাদার নয়। সপিংমল এবং সুপার মার্কেট গুলোতে রয়েছে আইসক্রীম পার্লার। পৃথিবীর নামীদামী আইসক্রীম বিক্রি হচ্ছে এসব দোকানে। একেবারে কম দামের এক কাপ আইসক্রীম ২ রিয়াল।তাছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন ফ্লেভারে প্রস্তুত অন্যান্য আইসক্রীম। মসজিদুল হারামের সামনের মার্কেটে রয়েছে অনেকগুলো টেক- এওয়ে, ফাষ্টফুড সপ ও রেষ্টুুরেন্ট। রেষ্টুরেন্টে প্রস্তুত হচ্ছে আস্তা মুরগীর গ্রীল, দাম বেশ সস্তা-৯/১০ রিয়াল। তুর্কীরা হরদম খাচ্ছেন বড় বড় রুটি দিয়ে।

মিসরীয়রা এখানে গ্রীলের সাথে রুটি অথবা চিকেন গ্রীল-ফ্রাইডরাইস উপভোগ করছেন।

আমরা মক্কায় থাকা কালীন ঘরে প্রস্তুত বাংলাদেশী খাবার ঘরোয়া পরিবেশ খেয়েছি। বাংলাদেশী রুই, পাঙ্গাস ছাড়া ও অনেক ধরনের মাছ পাওয়া যেত এখানে। অন্যাদিকে ছাগল, দুম্বা,মুরগ,গরু এমনকি উঠের মাংসের স্বাদও গ্রহণ করেছি। এজন্য আমাদের মাথা ঘামাতে হতোনা। খাওয়ার সময় হলে তা আমাদের সামনে পরিবেশিত হতো গৃহকর্তার সাহায্যকারী লোকজন দ্বারা।

চা-নাস্তা, ফলমুল ইত্যাদি বাইরে থেকে কিনে এনেই খেতে হতো। তাও আবার ঘর থেকে নেমে দুপা এগোলেই দোকান। ১মিনিটের কম সময়ে এককাপ চা প্রস্তুত হয়ে যেত এসব দোকানে। পয়সা খরচ হতো ১রিয়াল।

আমাদের দেশী হাজীরা সম্ভবত কোমল পানীয় ও জুসের চেয়ে চা-ই বেশী পান করেছেন। যা চিরন্তন অভ্যাস অত্যধিক গরমের দেশ হলেও সকাল সন্ধ্যায় প্রিয় পানীয় তালিকায় চা-ই ছিল শীর্ষে। 

পর্বঃ ০৮

আজ ১৪ই জিলহজ। সকালে ঘুম থেকে উঠে বাংলাদেশ মিশনে যাই। মিসফালাহ হয়ে হেঁটে হেঁটে পৌঁছলাম মিশনে। উদ্দেশ্য টিকেট কনফার্ম করা।

এমনিতে ৩রা মে শিডিউল ফ্লাইটে যাত্রা। এর পূর্বে মদিনা মনোয়ারায় নবী পাকের পবিত্র রওজা যিয়ারত সহ সেখানে ৪০ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করার রেওয়াজ। তবে আমরা মদিনা যাওয়ার ছাড়পত্র পাবো প্রায় ১০দিন আগে।

ফ্লাইটের ১১/১২ দিন আগে সংশ্লিষ্ট মুয়াল্লিম অফিসে গিয়ে মক্কা থেকে মদিনা যাওয়ার বাসের টিকেট আনতে হয়। আমাদের দেশে ফেরত যাত্রা ৩রা মে, সুতরাং এখনই আমাকে বিমান টিকেট কনফার্ম ও বাসের টিকেট সংগ্রহ করতে হবে।

প্রথমেই গিয়েছি বিমানের অস্থায়ী অফিস-বাংলাদেশ হজ্জ মিশনে। ভীষন ভিড়, সবাই এসেছেন একই উদ্দেশ্যে। এর আগের দিন বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত এভাবে এখানে এসে ফিরে যেতে হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা না আসায়।

অগত্যা দীর্ঘ লাইনের সদস্য হয়ে মিশন অফিসের সিড়িতে জায়গা করে নিতে হয়। ক্রমে লাইন নীচ তলা/থেকে চার তলা পর্যন্ত দীর্ঘ হলো। ঘন্টা তিনেক এভাবে নানান অনভিপ্রেত ঘটনায় সাক্ষী হয়ে কাউন্টার পর্যন্ত পৌঁছলাম।

কাউন্টারে বিমান পার্সোনাল টিকিট দেখে মন্তব্য করলেন বি জি-৩৮ ফ্লাইটের যাত্রীদেরকে টিকেট রি-কনফার্ম করতে হবে না। যাত্রার ৮ ঘন্টা পুর্বে বিমানবন্দরের নর্থ টার্মিনালে রিপোর্ট করলেই হবে।

এ নোটিশ পূর্বাহ্নেই মিশনের বাইরে ঝুলানো দেখেও কষ্ট করে দাড়িয়ে রইলাম অধিকতর অবগতি ও নিশ্চিত হওয়ার জন্য। এই কয়েক ঘন্টার মধ্যে কম করে হলেও ৫টি ঝগড়া প্রত্যক্ষ করি। এটা ছিল সাময়িক সুব্যবস্থার মধ্যে একটা স্বাভাবিক দেশীয় অভিজ্ঞতা। অর্থাৎ হজ্জ্বের ১৫দিন মক্কায় অবস্থানকালীন সময়ে এবং মিনা-আরাফাত-মুজদালিফায় ও পরবর্তী কালে মদিনায় হাজার হাজার লোক একই সাথে অজু, গোসল,বাথরুম ইত্যাদি জন্য লাইনে দাড়ানো থাকলেও অথবা গাড়িতে উঠা নামা নিয়ে কোন তুচ্ছ অসৌজন্য বা ঝগড়া বিবাদ, পুলিশ-জনতা কিংবা হাজার হাজার ক্রেতা এবং শত শত দোকানে কোন ঝগড়া বিবাদের অনুপস্থিতি এবং যখনই আমরা শুধুমাত্র বাংলাদেশী উপরোন্ত সদ্য হাজী সাহেবান হয়ে নিজেদের দেশীয় মুসলমান ভাইয়ে ভাইয়ে কটু বাক্য বিনিময়, ঝগড়া প্রত্যেক্ষ করে এ কথাই হৃদয়ে গ্রোথিত হয়েছে যে, আমারা কোন অবস্থাতেই স্বার্থ ত্যাগ করতে প্রস্তুত নয় ।

হজ মিশন থেকে বেরিয়ে কিছু দুর পায়ে হেঁটে ৩৫নং মক্তবে( মোয়াল্লেম অফিস) উপস্থিত হই মদিনায় যাওয়ার বাসের টিকিটের জন্য। এখানে তেমন ঝামেলা নেই । বিমান টিকিট দেখিয়ে বাস টিকিট সংগ্রহ করি অনায়াসে ।

কর্তব্যরত অফিসিয়েল দেশে ফেরত যাএার তারিখ দেখে ১০/১১ দিনে আগে মদিনা যাওয়া বাস টিকিট প্রদান করেন । এবার অনেকটা আশ্বস্ত হয়ে ঘরে ফিরি।

আজ একুশে এপ্রিল আর মাত্র একদিন বাকী, তারপরই এই পবিত্র শহর ছেড়ে চলে যেতে হবে আমাদের।

২৩ শে এপ্রিল রাতে উঠবো বাসে, মদিনায় পৌছবো ২৪ শে এপ্রিল সকালে। এখন মন খারাপ হতে লাগল ,যদি আর ৪/৫ টা দিন এখানে থাকার সুযোগ হতো, অন্তত কয়েকবার তাওয়াফ সহ অনেক ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের সুযোগ পেতাম হারাম শরীফে। সম্ভব হতো যদি ফ্লাইট পেছানো যেতো । কিন্তু সে ঝুকি নেয়া সমীচিন নয়। কেননা পিছাতে চাইলে অনেক শেষের ফ্লাইট ধরতে হবে। উপরোন্তু বেশীর ভাগ হাজীর ফিরতি ফ্লাইট অনেক দেরীতে। অনেকে চাচ্ছেন আগাতে। এ অবস্থায় ওকে করা তারিখ এর ভরসায় থাকতে হচ্ছে।

আজ উমরাহ করবো। রাতের খাওয়া দাওয়া সেরে ১১টার দিকে বের হই। উমরাহর জন্য প্রথমে আয়েশা (রা:) মসজিদে গিয়ে দুরাকাত নফল নামাজ পড়ে নিয়ত করতে হয়।

হারাম শরীফের যেদিকে আমাদের বাসা সে দিকে সৌদি পাবলিক ট্রান্সপোর্ট কোম্পানীর বাস ছাড়ে। এখান থেকে সাময়িক বিরতি দিয়ে দ্বিতল বাস ঐ উমরাহ মসজিদ বা আয়েশা মসজিদের উদ্দেশ্যে ছাড়ে।

এর আগেও শুনেছি যে বাস কন্টাক্টর যিয়ারাহ যিয়ারাহ বলতে। অর্থ্যাৎ উমরাহ বা যিয়ারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা। কাছাকাছি আসতেই ফুলুসশব্দ শুনলাম, আমাদের একজন বুঝলেন অর্থ, অর্থাৎ টিকেট । কাছেই কাউন্টার থেকে টিকেট সংগ্রহ করি। জনপ্রতি ২ রিয়াল বেশ সস্তা। এমনিতে মাইক্রোবাস বা টেক্সিতে জনপ্রতি ১০ রিয়াল।

জামান ভাই, কবীর ভাই এবং আমি গাড়িতে গিয়ে দুতলায় উঠে একেবারে সামনের আসনে বসে পড়ি। এই প্রথম উমরার জন্য আয়শা মসজিদে পানে ছুটছি। পাশে এসে বসলেন অন্য এক ভদ্র লোক। গাড়ী চলছে দ্রুতই, তবে কিছু দুরে পর পর স্টপেজ এবং এতে নির্দিষ্ট সময় থামছে মনে হলো বেশ পথ ঘুরে চলছে গাড়ি।

পথিমধ্যে মক্কার অনেক বাণিজ্যিক এলাকা চোকে পড়লো। বেশ সুন্দর শহর রাতে আরও সুশোভিত হয়ে উঠেছে। রাস্তার পাশে বিলাস বহুল মার্কেট, পাঁচতারা হোটেল। ম্যাকডোনাল্ডস সহ প্রসিদ্ধ রেস্টুরেন্ট। এত দিন এসব এলাকায় আসা হয়নি, সঙ্গত কারণেই।

গত কয়েকদিন হজের আনুষ্ঠানিকতা এবং কাবাকে ঘিরে ছিল আমাদের কর্মসূচি। এখন হয়তো দুএকদিন অবস্থান করলে এইসব জায়গা ঘুরে ঘুরে দেখা যেত। আমরা তিনজন ছাড়া পাশাপাশি আর কোন বাংলাদেশী হাজী নেই এবং কেহই আয়শা মসজিদের অবস্থান জানিনা। অগত্যা পাশের সিটের আরব ভাইকে জিজ্ঞেস করি কতদুরে উমরাহ মসজিদ? ভদ্রলোক আরবীতে বললেন এবং ইঙ্গিতে বুঝালেন তার অর্থ হয়োত সামনেই এবং দেখিয়ে দেবো।

তবে অনেক দূর গিয়েও যখন পথ শেষ হয়নি তখন বরং একটু সন্দেহ হলো। এমন সময় আরব ভদ্রলোক দেখিয় দিলেন সামনেই মসজিদ। গাড়ী থেমে গেলে অনেক যাএীর সাথে আমরাও নেমে পড়ি।

বেশ বড় এবং চমৎকার সৌন্দর্যমন্ডিত মসজিদ। বাইরে ওযু সেরে মসজিদে প্রবেশ করি। কারুকার্যময় এবং সম্ভবত নিকট অতীতে এটি নির্মিত হয়েছে। পুরো মসজিদের মেঝেতে কার্পেটে মোড়া। উপরে এতো বিশাল ঝাড়বাতি আশ্চর্য হতে হয়। জামান ভাই দুনিয়ার বহু দেশ ভ্রমণ করেছেন । উনিও অভিভূত হয়ে গেলেন।

সবাই তন্ময় হয়ে এর বিশালত্ব এবং সৌন্দর্য অবলোকন করেছি। দুরাকাত নফল নামায আদায় করে উমরাহ্র জন্য নিয়ত করি। মনে খুব আফসোস হলো আবারও এখানে আসার। তবে আপাতত তা সম্ভব হবেনা।

এখনই হারাম শরীফের উদ্দেশ্যে ফেরত আসবো। এবার বাস নেই। মাইক্রোবাসে জনপ্রতি ১০ রিয়াল ভাড়ায় ফিরি। ড্রাইভার সংক্ষিপ্ত পথে চলে আসায় খুব কম সময়েই উমরাহ্ গেটে উপনীত হই। অত:পর হারাম শরীফের ভেতর দিয়ে তাওয়াফ এর স্থানে এসে তাওয়াফ শুরু করি।

একে একে সাতবার কাবা প্রদক্ষিণ করেওয়াজিবুত তাওয়াফ”, জম জম পান, সায়ী সম্পন্ন করতে ভোরে সাড়ে তিনটা বেজে যায়। ফজর পড়ে ঘরে আসি।

সেদিন ছিল ২৩শে এপ্রিল, মক্কায় আমাদের শেষ দিন। সকাল থেকেই মন খারাপ হয়ে আছে। এই পবিত্রতম শান্তির পীঠস্থানে আমাদের আশ্রয় থাকছেনা। দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ মানব যেথায় কাটিয়াছে জীবনের অনেক স্মরণীয় ক্ষণ, যেখানে অবতীর্ণ হয়েছিল শ্রেষ্ঠ কিতাব , যেখানে প্রেরিত হয়েছেন আল্লাহর প্রিয় রাসুল, সেই মহামহিম এর জন্ম তীর্থ এই নগরীতে আমাদের ঠাঁই হয়েছিল দুসপ্তাহ।

আজ এর বিদায় প্রহর চলছে বিকালে অর্থাৎ মাগরিবের কিছু সময় আগে বিদায়ী তাওয়াফের জন্য চলে আসি এহরাম পড়ে। যথা নিয়মে তাওয়াফ শেষ করেছি। আজ খানিকটা কম ভিড় তাওয়াফে। চেষ্টা করি হজের আসওয়াদস্পর্শ করতে। কিন্তু একসময় বিফল মনোরথ হতে হলো আমাদের।

তবে কাবাগাত্রে ভালোভাবেই দুহাত সহ মাথা-মুখ,কপাল দিয়ে চুম্বন করা সম্বব হলো। হাতিমএ ঢুকে দোয়া করার সুযোগ দান করলেন আল্লাহ্ পাক।

খানায়ে কাবার চারপাশের দেয়াল গিলাফে ঢাকা। এই গিলাফে খুব উন্নত মানের বিশেষ ধরণের কালোকাপড়ের উপর স্বর্ণের সুতায় উৎকীর্ণ রয়েছে বিভিন্ন আয়াত। প্রতি বছর এই গিলাফ পরিবর্তন করা হয় হজের পূর্বে। এই সময় পবিত্র কাবা ঘর ধৌত করা হয়। বাদশাহ ধর্মীয় ব্যক্তি বর্গ. কাবা শরীফের ইমাম ও গভর্ণরগণ এই ধৌতকার্যে অংশগ্রহণ করেন। কাবার দরেজা পুরোপুরি স্বর্ণ নির্মিত।

এই দরোজা হজরে আসওয়াদ বা কালো পাথর যে স্থানে প্রতিস্থাপিত এর নিকটবর্তী এবং বেশ উঁচুতে স্থাপিত। গড় উচ্চতার একজন ব্যক্তি কোন রকমে হয়তো এই দরজার নীচের অংশ স্পর্শ করতে পারবেন।

লোকজন যাতে গিলাফে ধরাধরি করে এর অমর্যাদা না করতে পারেন, সেজন্য হজের সময় গিলাফ একটু উঁচুতে উঠিয়ে রাখা হয়। এই গিলাফ প্রস্তুতির জন্য রয়েছে একটি স্বতন্ত্র ফ্যাক্টরী এবং একদল দক্ষ কুশলী। সারা বছর এরা ব্যস্ত থাকেন, গিলাফ প্রস্তুতে এবং এর উপর স্বর্ণের কারুকাজ এবং ক্যালিওগ্রাফি সৃষ্টিতে।

বৃষ্টি হলে কাবার ছাদে যে পানি জমে তা ‘‘মিজাবে রহমত’’ দিয়ে নীচে ছড়িয়ে পড়ে।

তাওয়াফ শেষ হতেই মাগরেবের ওয়াক্ত হয়ে গেল, নামাজের জন্য দাড়িয়ে যাই দ্বিতীয় কাতারে। দুতিন হাত দূরেই কাবা, কাবাকে কেন্দ্র করে চারদিকে বৃত্তাকার কাতারে দাড়িয়েছেন আল্লাহর মেহমানরা। আর দূর দুরান্তের নামাজীরা কাবাকেই অনুসরন করছেন। বাংলাদেশে যারা নামাজ পড়ছেন তারা ক্বিবলাহ অনুসরণ করেন পশ্চিম দিকে।

আর অল্প কিছক্ষণই ঠাঁই হবে আমাদের শান্তিময়, রকতময় জায়গায়। তারপর বিচ্ছেদ হবে বাহ্যিক। হৃদয়তো পড়ে থাকবে মক্কা আর মদিনায়। প্রভূর কাছে আবারও তার মেহমান হওয়ার পরম আকুতি জানিয়ে একসময় বিদায় নিলাম।

পর্বঃ ০৯

মদিনা মনোয়ারার উদ্দেশ্যে রওয়ানা

রাত এগারটায় বাসযাত্রা, মক্কা থেকে মদিনায়।

সব ঠিকঠাক, তবে কেনাকাটা নয়, ক্যান ভর্তি করে নিতে আবে-জমজম। জেরিক্যানে পাঁচ লিটারের মত জমজম ওয়াটার নিলাম। ইচ্ছে ছিল আরও বেশি, সাহস করিনি, ভারি হয়ে যাবে সেকারণে।

রাত দশটায় বিদায় দিলেন প্রিয় হাজী সাহেবানরা, যাদের সাথে এই দুই সপ্তাহ খুবই আন্তরিকতাপূর্ণ পরিবেশে কাটিয়েছি। তবে একেবারে বিদায় নয়, আবারও দেখা হবে মদিনায়উনারাও দুতিন দিন পরে মদিনায় পৌছবেন এবং একই ঘরে বা পাশা-পাশি ঘরে থাকব আট-দশ দিন।

মিছফালায় গিয়ে ৩৫ নম্বর মুয়াল্লিম অফিসের সামনে নামলাম। সামনেই বাস দাড়ানো। অনেকেই উঠে বসে আছেন। আম্মাও আমি দুজন উঠে গেলাম।

মালপত্র উপরে উঠানো হলো, কিন্তু সকলের মতোই জেরিক্যান সাথে নিয়ে গাড়িতে আসন গ্রহন করি। আধা ঘন্টার মধ্যেই বাস ছাড়লো। আমরা আজ এমনি এক মূহুর্তের মুখোমুখি হচ্ছি। একদিকে ছেড়ে যেতে হচ্ছে পবিত্রতম নগরী, যেখানে অবতীর্ণ হয়েছিল পবিত্র কোরআন, যার বুকে নিয়ে আছে পবিত্র ঘর কাবা

অন্যদিকে রওয়ানা দিচ্ছি নবী মুহাম্মদ (স:) এর প্রিয় স্মৃতি বিজড়িত এবং নবীর (দঃ)স্মৃতিতে ধন্য এবং যেখানে শায়িত আছেন রাহমাতুল্লিল আলামিন।

দশ মিনিটের মধ্যে গাড়ি চলে এলো পবিত্র হারাম শরিফের সন্নিহিত রাস্তায় এবং এর পাশ দিয়ে চলে যেতে যেতে দেখলাম সবকটি মিনারের উজ্জল আলো আকাশের সু-উচ্চ রেখায় মিলিয়ে যাচ্ছে।

গাড়ি নগরী অতিক্রম করে মক্কা মদিনা হাইওয়ে চিরে চলতে শুরু করলো এবং প্রথমেই একটি চেকপোষ্টে থেমে রিপোর্ট করছে।

একটু আগেই যাত্রার শুরুতেই মুয়াল্লিম অফিস থেকে বাসের সকল যাত্রীর পাসপোর্ট যা মক্কায় পৌঁছার দিন মুয়াল্লিমের তত্ত্বাবধানে নেয়া হয়েছিল তা আবারও গাড়ির ড্রাইভারের কাছে দেওয়া হয়।

পাসপোর্ট হাজীদের সাথে সাথে মক্কা,মদিনা ,জেদ্দা ভ্রমন করছে মুয়াল্লিম বা তার প্রতিনিধির তত্ত্বাবধানে। কিন্তুু হাজীদের পাসপোর্ট তাদের নিজেদের কাছে দেওয়া হবে জেদ্দা এয়ারপোর্টে পৌঁছার পর দেশে ফেরত যাত্রার আগে।

ড্রাইভার গাড়িতে যাত্রী ও পাসপোর্ট মিলিয়ে রিসিপ্টসহ গ্রহন করেছে এবং মদিনায় পৌঁছে সংশ্লিষ্ট মক্তব বা মুয়াল্লিম অফিসে জমা দেবে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্রথম চেক- ইন শেষ হলো । আমাদের কোন চেক- ইন করা হয়নি। ড্রাইভার কাগজ পত্র ও পাসপোর্ট দেখিয়ে ছাড়পত্র নিয়ে এলে আবারও যাত্রা শুরু হয়।

প্রশস্থ মটরওয়ে , চারলেনের ওয়ানওয়ে মধ্যে স্টিল ফেন্সিং ডিভাইডার , পাশাপাশি বিপরীত দিকে আরেকটি চারলেনের রাস্তা। খানিক চাঁদনী রাতে মদিনার পথে চলছি গাড়িতে। দুধারের মরু প্রান্তর, কোথাও উঁচু-নিচু পাহাড় তবে বৃৃৃৃক্ষ শূন্যই মনে হলো।

দুর্ভাগ্য যাচ্ছি রাতের বেলা , দিনে গেলে বেশ ভালোভাবেই দুধারের বিস্তীর্ণ অঞ্চল এবং মরু-বালুকা অথবা উঠের কাফেলাও হয়ত চোঁখে পড়তো।

এই সেই মদিনার পথ যেদিকে নবী (সঃ) হিযরত করেছিলেন। তবে হিযরতের পথ ও বর্তমান জাতীয় মহাসড়ক (মক্কা-মদিনা) এক রাস্তা নয়। একালে রাস্তা সোজা রাখতে পাহাড়-টিলা কেটে অথবা টানেল করে তা পরিবর্তিত হয়েছে।

মহাসড়কে অনেক বাস, মাইক্রোবাস, টেক্সি চলছে। আমাদের গাড়ী খুব দ্রুতই ছুটছে। প্রায় দুঘন্টা পরে এক মরুদ্যানে যাত্রা বিরতি হলো। বিশাল অভ্যর্থনা কেন্দ্র-আলোকিত চারদিক, বড়-বড় রেষ্ট্রুরেন্ট, ফলের দোকান, ওযুখানা সহ নামাজের স্থান রয়েছে এখানে। বিস্তৃর্ণ খোলা জায়গায় অনেকে গাড়ি থেকে নেমে সাময়িক বিরতিতে একটু ঘোরাফেরা করছেন।

রেষ্ট্রুরেন্টে আফ্রিকান হাজীরা ভাতসহ ফিস ফ্রাই উপভোগ করছেন। আমরা রাতের খাবার খেয়েই যাত্রা করি, তারপরও কিছু ফলমুল কিনে রেখেছি এবং খাওয়ারও তেমন ইচ্ছে হচ্ছেনা। সুতরাং একটু পায়চারী করে আবারও গাড়িতে উঠে বসি। ঘন্টাখানেক এর মধ্যে পুনরায় গাড়ি ছাড়লো।

রাত তিনটার মত হবে, তন্দ্রা অনুভূত হচ্ছে। একসময় সুবহে- সাদেকের ক্ষীন আলো পূর্বাকাশে দেখা দেয়।

ক্রমেই আকাশ ফর্সা হয়ে আসছে। আমরাও মদিনার কাছাকাছি চলে এসেছি। গাড়ি থামিয়ে নামাজের জন্য নামলাম। দুপাশে লালচে শিলা খন্ডের মতো মৃত্তিকার পাহাড়। সম্ভবত তা লাভাস্তর, বেশ সুন্দর এবং অপূর্ব লাগলো। নামাজ শেষে আবারও চলছে গাড়ী।

সকাল হয়েছে, কিছু ঘর বাড়ী চোঁখে পড়লো এবং নীচু সমতল জায়গায় বিচ্ছিন্নভাবে সবুজ কাটাজাতীয় গাছের অস্তিত্ব রয়েছে এখানে। আরও এগিয়ে গেলে খেজুর বাগান দৃষ্টিগোচর হয়। দেখতে পৌঁছে যাই মদিনা মনোয়ারার বহিরাংশে।

এখানে সংবর্ধনা কেন্দ্র। ড্রাইভার নেমে গিয়ে রিপোর্ট করে। আমরা নিজ নিজ আসনে বসে আছি সকলেই। এখান থেকে দুতিনজন ভদ্রলোক গাড়ীতে উঠলেন। সঙ্গে অনেক গুলো খাবার আইটেম। আমাদের সকলকে দেওয়া হলো ব্রেড, জুস,দুধ,দুই, প্রভুতির অনেকগুলো প্যাক। কিছু দেয়া হয়েছে রাজকীয় উপহার হিসেবে বাকী গুলো সংশ্লিষ্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সৌজন্যে। আমাদের দুজনের এক বোঝা হয়ে যায়।

এভাবে আমরা সংবর্ধিত হলাম সুন্দর সকালে পুনরায় গাড়ী ছুটলো মদিনার অভ্যন্তরে।

অপূর্ব সুন্দর শহর, চারিদিকে গাছ-গাছালি, ঘন সবুজ লতায় ঘেরা সড়ক- দ্বীপ, রাস্তার পাশে খেজুর বাগান, মোহনীয় রাজপথ, বিশাল বিশাল অট্টালিকা। হঠাৎ ঢুকে গেলাম টানেলে (সাবওয়ে) ।

সম্ভবত মদিনার মসজিদে নববীর পাশ দিয়ে চলে গেছে টানেল। টানেল পেরিয়ে রাস্তায় উঠেই দেখতে পাই মসজিদে নববীর সবুজ গম্ভুজ। আরেকটু সামনে গিয়েই গাড়ী থেমে যায়। এখানেও ড্রাইভার পাসপোর্ট সহ নেমে মক্তবে রিপোর্ট জমা দিল।

বেশ কিছুক্ষণ পরে ফিরে এসে আবারও চলতে শুরু করলো। শেষ পর্যন্ত মসজিদে নববীর সোজা সামনের সিটিন ষ্টিটেআমাদের নামিয়ে দেয়। -বাঙ্গালী প্রধান এলাকা। আমাদের গন্তব্যও কাছাকাছি। এক পিকআপ ভ্যানের ড্রাইভারকে ঠিকানা দেখাতেই বললেন, হেটে যেতে পারবেন।

অগত্যা অনেকগুলো ব্যাগ লাগেজসহ হেঁটেই নির্দিষ্ট ঠিকানায় পৌঁছলাম। এই এলাকার নাম বাংলা মাকের্ট। পুরাতন বিল্ডিং ভাড়া নিয়ে বাঙ্গালিরা হজ মৌসুমে হাজীদের কাছে ভাড়া দেন।

আমরা অন্য তিনজন হাজীর সাথে মিলিত হয়ে এখানে একটি রুম ভাড়া করি ১০০০ রিয়ালে। ইতিমধ্যে সকাল নয়টা বেজেছে। যোহরের বেশ দেরী। জিনিসপত্র গোছিয়ে যোহরের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। সঙ্গি দুজনই সৌদিআরব প্রবাসী সুতরাং তাদের সাথেই যোহরের জন্য রওয়ানা করি।

ঘর থেকে পাঁচ মিনিটের রাস্তা, পাঁয়ে হেঁটে যাওয়া। দুপুর বেলা বেশ কড়া রোদ। মিনিট দু পরেই মসজিদের সোজা সামনের প্রশস্ত রাস্তায় পা রাখি।

সুউচ্চ এবং সৃদৃশ্য মিনার। চমৎকার কারুকার্যময় মিনার, গম্ভুজ, দেয়াল, প্রখর রোদে জ্বল জ্বল করছে। উঁচু মিনারে স্থাপিত মাইকের হর্ণ থেকে সুমধুর আযান ধ্বনি ভেসে আসছে। আমরা এখন মসজিদের বহিরাংশে পৌছলাম। দামী মার্বেল পাথরের বড় বড় টাইলসের মেঝে। এখান থেকে চল্লিশ-পঞ্চাশ গজ দূরেই মূল মসজিদ।

মসজিদের চারপাশেই এরকম চল্লিশ-পঞ্চাশ গজ মূল্যবান টাইলসের মেঝে বিছানো। মসজিদ থেকে বিশ গজের মত শ্বেত পাথরের মেঝে। প্রখর রোদেও উত্তপ্ত হয় না। বরং ঠান্ডা থাকে,এর উপর দিয়ে এখন হাটছি। মসজিদের সিংহদ্বারে উপনীত আমরা।

কারুকার্যময় বিশাল দরোজা, উপরে নম্বর দেয়া আছে। সম্ভবত ২১ নম্বর দরজা দিয়ে প্রবেশ করি। হৃদয়ময় এক অনাবিল শান্তি আর আনন্দে ভরে উঠে। মসজিদের বেশ ভেতরে ঢুকেই এক জায়গায় বসে পড়ি। মহিলাদের অন্য দরোজা দিয়ে প্রবেশ করে আলাদা অংশে নামাজ পড়তে হয়।

মদিনার মসজিদে নববীতে বেশ সুশৃঙ্খলভাবে পৃথক পৃথক জায়গায় নারী ও পুরুষেরা নামাজ পড়েন। আমি একটি নম্বর যুক্ত ওযুখানাকে পরিচয় সূচক জায়গা পূর্বেই ঠিক করে রেখেছি। মসজিদের বাইরে ওযু ও টয়লেট আন্ডারগ্রাউন্ডের প্রবেশ পথ একটু উঁচু ঘরের মত স্থান এবং এতে ইংরেজী ও আরবীতে নম্বর দেয়া আছে। দূর থেকে অনায়াসে নম্বর দেখে পুনরায় মিলিত হওয়া যায়। নামাজ শেষে আমি মসজিদের বাইরে এসে ঐ জায়গায় পৌঁছে অপেক্ষারত থাকি একটু চিন্তিতভাবে।

অল্পক্ষণের মধ্যেই আম্মা নির্দিষ্ট স্থানে এলেন। এখন আবারও মসজিদের ভিতর দিয়ে নবী পাকের রওজার উদ্দেশ্যে অগ্রসর হলাম।

সঙ্গী ভদ্রলোক গাইডের মতো নিয়ে যেতে থাকলেন। রওজা শরীফ মসজিদের মিহরাবের কাছাকাছি। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় একসাথে পুরুষ ও মহিলা থাকায়। যিয়ারতের জন্য পুরুষ ও মহিলাদের আলাদা আলাদা ভাবে সুযোগ দেয়া হয়। সুতরাং এ মুহুর্তে সেই পবিত্র স্থানে পৌঁছা সম্ভব হচ্ছে না। দিনের নির্দিষ্ট কয়েক ঘন্টা মহিলাদের যিয়ারতের ঐ অংশে যেতে দেয়া হয়। এজন্য এখানে সর্বোচ্ছ শৃঙ্খলা ও সতর্কতা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে।

আজ যোহর থেকে শুরু হলো আমাদের চল্লিশ ওয়াক্ত নামাজ। এই প্রিয় পবিত্র মাটিতে পোঁছার পর থেকে কোন উদ্বেগ, উৎকন্ঠে নেই আমাদের। এত নির্বিঘন নিরাপদ দিন যাপন। যেন চির আপন নীড়ে ফিরছে পক্ষিকূল।

ঐদিনই আসরের পরে আমি ও একই ঘরে অবস্থানকারী অন্য দুই হাজী ভাইয়ের সাথে নবী (স:) রওজা যিয়ারতের সুযোগ পাই। এ উদ্দেশ্যে আম্মাকেও মিশরীয় একদল মহিলার সাথে যিয়ারতের জন্য পাঠিয়ে দেই। আমার সৌভাগ্য ঘটেছে এভাবে-আসরের নামাজ মসজিদে নববীতে আদায় করে মূল সবুজ গম্ভুজের নীচের যে জায়গায় নবী পাকের রওজা শরীফ, সেই পবিত্র স্থানের উদ্দেশ্যে হাটতে থাকি সামনের দিকে।

একটু সময়ের মধ্যেই চোখে পড়লো সেই অংশ যেখানে মিহরাব, রওজাতুম-মিল-রিয়াজুল জান্নাহ এবং পাশাপাশি রওজা শরীফ। খুব ধীরে ধীরে পরম শ্রদ্ধার সাথে সেই মহান নেতার স্মৃতি ধন্য তারই অবস্থান স্থল সেই পূত-পবিত্র স্থানের কাছাকাছি এসে পৌছে যাচ্ছি।

দুচোখ বেয়ে অঝোর ধারায় বইতে থাকল অশ্রু। এই অংশ কারুকার্যময় নানান রংয়ের ঝাড়বাতি, খিলান, দেয়াল সবই সৌন্দর্যময়। সম্ভবতঃ তুর্কী সুলতানদের আমলে নির্মিত। রাসুল (সাঃ) এর মিহরাবও চোখে পড়ল।এখানে এসে প্রথমেই জান্নাতের টুকরার যে অংশ সেই রওজা ও মিহরাবের মধ্যবর্তী সাদা কার্পেটে মোড়া রওজাতুম মিন রিয়াজুল জান্নাহ-য় দুরাকাত নফল নামাজ আদায় করে এগিয়ে যেতে থাকলাম নবী (সঃ) রওজায় সালাম জানাতে।

সারি বেঁধে আস্তে আস্তে এগিয়ে যাচ্ছি, একটু সামনেই রওজা শরীফ। এখানে অন্য দৃশ্য , কান্নায় বুকে ভাসিয়ে সালাম জানাচ্ছে হাজারও মুসলমান। আমি পরবর্তীতে যতবারই এখানে এসেছি একই অবস্থা হয়েছে প্রত্যেকের মতো। ইচ্ছে করেও কান্না থামানো যাবে না। রসূল (স:) এর রওজার পাশাপাশি রওয়ায় শুয়ে আছেন খলিফা হযরত আবুবকর (রা:) এবং হযরত ওমর (রা:)। একটি রওজার সমান জায়গা খালি রয়েছে এখানে। যিয়ারত শেষে আমরা দরোজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসে দশ-বার ফুট দূরে আরেক দরোজা দিয়ে আবারও মসজিদের পবিত্র অঙ্গনে ঢুকে রওজার পিছনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ দোয়া দুরুদ পড়লাম।

ঐ স্থানের কিছু জায়গা এক ফুটের মত উঁচু, এখানে বসে অনেকেই কোরআন তেলাওয়াত করছেন। আসহাবে সুহফারা এখানে বসে ইবাদত করতেন।

 

পাশেই হযরত ফাতিমা (রা:)র ঘর। বেশিক্ষণ এখানে দাঁড়ানো যাবেনা, অন্যান্য হাজীদের পরিদর্শন ও দোয়া দুরুদের সুযোগ দিতে হবে। একসময় ফিরে এলাম।

পর্বঃ ১০ (শেষ পর্ব)

মদিনার দিনগুলো

মদিনায় আজ আমাদের প্রথম দিন। আট-নয় দিন এই প্রিয় শহরে থাকার সুযোগ হবে ইনশাআল্লাহ এবং সকল ওয়াক্তের নামাজ মসজিদে নববীতে পড়ার বাসনা আমাদের।

মসজিদে নববীর চারপাশে বিশাল দালান, মার্কেট, ফ্লাট, হোটেল । দুনিয়ার সকল দেশের হাজীরাই মদিনায় আট-দশদিন অবস্থানের সুযোগ পান। অনেকের মদিনায় থাকা হয় হজের পরে।

সুতরাং এখানকার মার্কেটে প্রচুর বেঁচাকেনা হয়। এখানে রয়েছে সুসজ্জিত গহনার, ইলেকট্রনিক্স, গার্মেন্টস, কার্পেট এবং বইয়ের দোকান। আমি মাগরেবের আগে একটু সময়ের জন্য এসব মার্কেটে ঘুরতে যাই। হালকা পানীয় পান ও নাস্তা সেরে ফিরে আসি নামাজের জন্য।

হাজার হাজার হাজী মসজিদের বহিরাংশে শেষ বিকেলে বসে বসে বিশ্রাম নিচ্ছেন। অনেকে শপিং করে এসে কেনা জিনিস পত্র নিয়ে বসে আছেন শ্বেত পাথরে মোড়া মসজিদে নববীর বহিরাংশে। কোন রকম প্যাক যাতে কাপড়- চোপড় বা দাহ্য বস্তু নিয়ে মসজিদে প্রবেশ করা যায় না, হয় বাইরে রেখে ঢুকতে হবে নতুবা বাইরেই নামাজ আদায় করতে হবে।

মাগরেব, এশা আদায় করে আমরা ঘরে ফিরি। আমাদের অবস্থান স্থল বাংলা মার্কেট। এখানে অনেকগুলো খাবারের দোকান রয়েছে। বাংলাদেশী হোটেল থেকে খাবার কিনে ঘরে বসেই রাতের খাবার গ্রহণ করি।। পুরোপুরি দেশী খাবার। আলুভর্তা থেকে পাঙ্গাস মাছ পর্যন্ত রয়েছে এগুলোতে। মাংস আরও সহজলভ্য। কেহ কেহ গ্রোসার সপ থেকে আস্ত রুই মাছ কিনে এনে নিজেরাই রান্না করে খাচ্ছেন।

আমরা খাবার শেষে ঘুমিয়ে পড়ি। শেষ রাতে জেগে তাহাজ্জুদ এবং ফজরের নামাজের জন্য মসজিদে নববী পানে ছুটলাম। একটু ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছে, যদিও দিনের বেলায় ছিল অত্যধিক গরম। নামাজ শেষে ঘরে আসার পথে হেটেল থেকে পরোটা ও ভাজী কিনে আনি নাস্তার জন্য। নাস্তা সেরে আরেক দফা ঘুমের আয়োজন।

সকাল নয়টার দিকে জেগে ঘর থেকে বেরিয়েই চা-এর দোকান থেকে চা কিনে আনি। তারপর ধীরে ধীরে গোসল ও প্রস্তুতি নিয়ে যোহরের জন্য মসজিদে নববীতে যাই।

মদিনার মসজিদে নববীর বহিরাংশে চারিদিকে ভূগর্ভে রয়েছে ওযু ,বাথ, টয়লেটর সর্বাধুনিক ব্যবস্থা। হাজার হাজার লোক এক সাথে এসব ব্যবহার করতে পারেন।

চলন্ত সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে চারটি ফ্লোরের যে কোনটিতে ঢুকে এ প্রয়োজন সম্পন্ন করা যায়। মার্বেল টাইলসের তৈরী এসব ওযু খানায় কোটি কোটি রিয়াল ব্যয়ে হাজী সাহেবানদের সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করা হয়েছে।

চার ফ্লোরের আন্ডারগ্রান্ড কারপার্ক। ভূ-গর্ভে আগামী পঞ্চাশ-ষাট বছরের প্রয়োজন পূরণের মত পঞ্চাশ হাজার গাড়ি পার্কের জায়গা রয়েছে এসব পার্কিং লটে।

ওযুখানা ও টয়লেটে এত দামী মার্বেল পাথরের টাইলসে নির্মিত যা আমাদের দেশে ধন্যঢ্য ব্যক্তিদের বাড়ীর মূল ঘরে সন্নিবেশিত টাইলসের চেয়েও সুদৃশ্য। এতে রয়েছে স্বাস্থ্যকর সব ব্যবস্থা এবং প্রতিমুহুর্তে এর পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে শত শত কর্মী বাহিনী।

মদিনায় মসজিদে নববীর নিকটবর্তী স্থানেই প্রসিদ্ধ আল গারখাদ যাকে জান্নাতুন বাকী গোরস্থান নামে জানি। এখানে শায়িত আছেন খলিফা হযরত উসমান (রাঃ) হযরত ফাতিমা (রাঃ) সহ অনেক প্রসিদ্ধ সাহাবী তাবেঈ, তাবেঈন সহ মুমিন মুসলমানগন।

মদিনায় আসার দ্বিতীয় দিনে আমরা জান্নাতুল বাকী গোরস্থানে যিয়ারতের জন্য প্রবেশ করি। সুরম্য উঁচু প্রাচীর ঘেরা এই বিশাল কবরগাহ। তবে কবরের উপর কোন স্থাপনা বা জাঁকজমক নেই।

সাদামাটা কংকরময় এই গোরস্থানের বিভিন্ন অংশে সরুপথে হেঁটে হেঁটে যিয়ারত করা যায়।

প্রসিদ্ধ সাহাবী বা খলিফার কবর এরকম কোন পরিচয়সূচক চিহ্ন নেই কোথাও। কিন্তু জান্নাতুল বাকীর কোথায় কোন প্রসিদ্ধ সাহাবীর কবর এরকম নির্দেশনাযুক্ত A ৪ সাইজের ম্যাপ মাঝে মাঝে গোপনে বিলি হয়। তবে সৌদি পুলিশ এসব পরিচয় নির্দেশনা যুক্ত ম্যাপ কারো কাছ পেলে তৎক্ষনাৎ বাজেয়াপ্ত করে থাকে।

আমাদের যিয়ারকালীন সময়ে ইরানী হাজীদের একটি গ্রুপ জান্নাতুল বাকী গোরস্থানের একটি জায়গায় গিয়ে কান্না কাটি করতে দেখছি।। সম্ভবত তা ছিল হযরত ফাতিমা (রাঃ) কবর। আমরা যিয়ারতর শেষে ফিরে আসি।

দ্বিতীয় দিনও আসরের পরে নবী পাকের রওজা শরীফ যিয়ারতের সুযোগ মহান আল্লাহ পাক অসীম অনুগ্রহে দান করেন।

মাগরেব ও এশার মধ্যবর্তী সময়ে কিছু সময় মসজিদ সংলগ্ন পূর্ব পাশের শপিংমলে ঘুরে ঘুরে প্রয়োজনীয় কেনাকাটা সেরে একেবারে এশার নামাজ মসজিদে আদায় করে ঘরে আসি। বাইরে থেকে আনা খাবার খেয়ে ঘুমাতে যাই।

পরের দিন সকালে সরকারী (সৌদি) ভ্রাম্যমান মেডিকেল সেন্টার থেকে ঔষধ নিয়ে আসলাম। আম্মা জ্বর ও মাথা ব্যথায় ভুগছিলেন। ঐদিনই মদিনায় বাংলাদেশ হজ মিশনে যাই বিমানের ফেরত যাত্রার টিকিট নিয়ে।

বিমানের কর্তব্যরত অফিসিয়েলকে দেখালে তিনি জানান জাল ষ্টিকার এ ওকে করা হয়েছে। পি.এন.আর বর্ণনার সাথে এর মিল নেই। টিকেটে উল্লেখ রয়েছে ৩রা মে ফেরত যাত্রা এবং তা ওকে করা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে ঐ দিনের ফ্লাইটে আমরা যেতে পারবো না।

এবার পড়তে হলো বিপাকে। বিমান কর্মকর্তা বিনীত ভাবেই বলেন যে, তার করার কিছু নেই। পরে এই রহস্যের কারণ জানলাম। যে ট্রাভেল এজেন্ট আমাদের টিকিট-ভিসার ব্যবস্থা করেছেন তারা ভিসা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে এভাবে সিডিউল ফ্লাইটে আসন খালি না থাকলেও নকল ওকে করা ষ্টিকার লাগিয়েছেন, এজন্য যে, সৌদি দূতাবাস ফেরত যাত্রার কনফার্ম টিকিট ছাড়া ভিসা দিতে হয়ত কিছুটা অপারগতা প্রকাশ করে।

পরের দিন আমি এই অফিসে এসে সহানুভূতিশীল বিমান কর্মকর্তাদের আন্তরিক প্রচেষ্ঠায় চার দিনের পরের ফ্লাইটে আসন লাভ করি এবং উদ্বিগ্নতা থেকে রক্ষা পাই।

এভাবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রায় বছরই আমাদের দেশী হাজীরা বিড়ম্বনার শিকার হন।

মদিনায় প্রিয় নবীর বহু স্মৃতি জড়িয়ে আছে। আছে বদর, ওহুদ, খন্দক প্রভৃতি ইতিহাস খ্যাত প্রান্তর এবং ইসলামের গৌরবোজ্জ্বল যুগের স্মারক। রয়েছে নবী (সঃ) এর স্মৃতি ধন্য মসজিদে কোবা, বিভিন্ন কুপ গুহা এবং বিভিন্ন মসজিদ। এসব পবিত্র স্থানে সকলেই ভ্রমণ করেন।

আমরাও একদিন আট-দশ জন একত্রিত হয়ে এসকল স্থানে যাই। আমরা একটি গাড়ীযোগে মসজিদে কোবায় সর্বপ্রথম পৌছি। অপূর্ব স্থাপত্য কৌশলে নির্মিত এই মসজিদ। মসজিদের বাইরে ওযু করে পবিত্র অঙ্গনে ঢুকে দুরাকাত নামাজ পড়ে চলে আসি মহাবীর হামজা (রাঃ) মহান ত্যাগ এবং সাহসিকতার স্মৃতি মন্ডিত এবং ইসলামের ইতিহাসে বিখ্যাত ওহুদ প্রান্তরে।

এখানে হযরত হামজা (রাঃ) সত্তর জন সাথীসহ ওহুদ যুদ্ধে ইসলামের জন্য শাহাদাৎ বরণ করেন। গাড়ীতে বসা অবস্থায় চোঁখে পড়লো রক্তিম ওহুদ পর্বত যেন শহীদের রক্তে উজ্জীবিত আজও এবং এরই প্রতিক্রিয়ায় রক্তবর্ণ ধারণ করে রযেছে।

শহীদদের মহান ত্যাগের স্মৃতিতে কান্না এসে যায়। দুচোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে জল। গাড়ি থেকে নেমে হযরত হামজা (রাঃ) এর কবর যিয়ারত করার জন্য এগিয়ে যাই। এই স্থানটি উঁচু দেয়াল ঘেরা অবস্থায় রয়েছে। এক জায়গায় গ্রীলের মত করে দেয়া হয়েছে যার বাইরে থেকে রওজা দেখা যায়।

অতপর আমরা মসজিদে কিবলাতাইন এ চলে আসি। এ মসজিদে রাসুল (সঃ) নামাজরত অবস্থায় কেবলা পরিবর্তনের আয়াত নাজিল হয় এবং তখন থেকেই বায়তুল মোকাদ্দস এর পরিবর্তে পবিত্র কাবা কিবলাহ নির্ধারিত হয়।

আমরা এই ঐতিহাসিক মসজিদে নফল নামাজ আদায় করে মদিনার অন্য এলাকায় এবং ইসলামের প্রাথমিক যুগের এবং নবী (সঃ) সহ তদীয় সঙ্গী সাথীদের স্মৃতি বিজড়িত খামসাহ মসজিদ বা পাঁচ মসজিদ পরিভ্রমণ করি।

খন্দক যুদ্ধের সময় সাহাবীরা এবং নবী (সঃ) এসব মসজিদে ইাবাদত বন্দেগী করেন। এখানে প্রাচীন ছোট ছোট পাঁচটি মসজিদ রয়েছে।

আমরা কয়েক ঘন্টা ইসলামের গেীরবোজ্জ্বল যুগের স্মৃতি স্মারক পরিদর্শন শেষে মদিনায় নিজ নিজ ঘরে ফিরে আসি।

ইতিমধ্যে মদিনায় আমাদের অবস্থান তিন চার দিন হয়ে গেছে। সবকিছু নিয়ম মাফিক চলছে। নামাজ, ঘুমানো, খাওয়া ছাড়া তেমন কোন কঠিন কাজ নেই আমাদের। খুব আরামেই কাটছে দিন। মসজিদে নববী, বাংলা মার্কেট, সিটিন স্ট্রিট এখন আমাদের কাছে খুবই পরিচিত।

মাঝে মাঝে আশপাশের অন্য অংশে অবসর সময়ে বেড়াতে যাই। নামাজের অনেক আগেই বাসা থেকে বের হয়ে ২০-২৫ গজ সামনেই মক্কায় যাারা সঙ্গী ছিলেন তাদের বাসায় উঠে একই সাথে নামাজে রওয়ানা হই। আমাদের মক্কা ত্যাগের ২-৩ দিন পর তারা মক্কা থেকে এখানে পৌছেছেন। এখন আবার আগের মতই চায়ের, গল্প গুজবের সংক্ষিপ্ত আড্ডা হয় পূর্ণমিলনে।

তবে আমাদের সঙ্গীরা বাংলাদেশে ফিরছেন না আপাতত। তারা বৃটেন প্রবাসী এবং বৃটেনেই ফিরে যাবেন। সুতরাং আর ৫-৭ দিন হবে দেখা তাদের সাথে।

পূর্বেই উল্লেখ করেছি হাজীরা মদিনায় বেশ কেনাকাটা করেন। আমরাও এর ব্যতিক্রম নই। মদিনার খেজুর, আরবীয় তেঁতুলসহ বিভিন্ন ফলমূল্যর রয়েছে সুখ্যাতি।

আমরা ১২-১৩ রিয়াল দরের (কেজি) বেশ সুস্বাদু জাতের মদিনায় উৎপন্ন খেজুর ক্রয় করি। এছাড়াও রয়েছে আবজু জাতের খেজুর। খুব উচ্চমূল্যের এই খেজুর প্রতি কেজি ১২০ রিয়ালে বিক্রি হয়। বীজবিহীন এই খেজুর নবী (সাঃ) এর প্রিয় ছিল বলে জনশ্রতি আছে।

আমরা মদিনার বিাভন্ন মার্কেট থেকে জায়নামাজও কিনলাম। ইস্তাম্বুল ও মদিনায় প্রস্তুত এসব জায়নামাজ-এর কদর রয়েছে সারা বিশ্বে।

এই চমৎকার ইসলামি পরিবেশে কেটে গেল আমাদের কয়েকটি দিন। বিদায়ের পালা চলে আসছে। আর দুই তিন দিন পরেই চলে যেতে হবে।

মসজিদে নববীর বিভ্ন্নি অংশে নামাজ পড়েছি বিভিন্ন দিন, বিশাল বিস্তৃত মসজিদের ভেতরে প্রায় সময়ই স্থান সংকুলান হয়ে যায় সব মুসল্লীর। মাঝে মাঝে বহিরাংশও ভরে যায় মুসল্লীতে।

আমি দুই তিন দিন মসজিদের একেবারে ছাদে উঠে নামাজ পড়েছি। সেখানে রয়েছে অনেকগুলো গম্ভুজ আকৃতির ঘর। অনেকটা মসজিদুল আকসার উপরের ধাঁচে নির্মিত।

গত কয়েক বছর(১৯৯৭ সালের আগে) পূর্বে মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববী সম্প্রসারণ করে নবরূপ দেয়া হয়েছে। বিশাল বাজেট প্রায় পঞ্চাশ হাজার কোটি রিয়াল খরচ হয়েছে এই সম্প্রসারণ কাজে। দু

দুনিয়ার সবচেয়ে বৃহৎ শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অবকাঠামো রয়েছে পবিত্র মদিনা মনোয়ারায়। দুনিয়ার নামিদামী সব প্রযুক্তি ও সুযোগ সুবিধার সমন্বয় ঘটানো হয়েছে এসব নির্মাণে। সৌদি আরবের সর্ববৃহৎ নির্মাণ সংস্থা সৌদি বিন লাদেন গ্রপ নিয়োজিত ছিল এই প্রকল্প বাস্তবায়নে।

এখনও এই সংস্থাই দুই পবিত্র মসজিদ-মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববীতে রক্ষাণাবেক্ষণ এবং সাধারণ সেবা কার্যে নিয়োজিত রয়েছে। সৌদি বিন লাদেন গ্রুপের ইউনিফর্মধারী হাজার হাজার কর্মী সর্বক্ষণ ব্যস্ত আছেন, ধোয়া মোছা, পানি সরবরাহসহ সব ধরণের সেবা কার্যে।

মক্কা থেকে অনেক দূরে হলেও মদিনায় মসজিদে নববীতে পবিত্র জমজমের পানি সরবরাহ করা হয়। মক্কা থেকে প্রতিদিন পানিবাহী গাড়ি মদিনায় পৌছে জমজমের পবিত্র পানি নিয়ে।

নামাজের আগে-পরে বা যে কোন সময়ই মসজিদের সর্বত্র স্থাপিত বিভিন্ন পানির আধার থেকে ঠান্ডা জমজমের পানি পান করা, বোতল ভর্তি করে আনা যায় অনায়াসে।

নামাজ শেষে অনেকেই মসজিদের মেঝেতে কার্পেটের উপর শুয়ে থাকেন। এতই শান্তিময় এবং আরামদায়ক এ স্থান, মুহুর্তেই ঘুম এসে যায়। খুব উন্নত ধরণের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা, শব্দ নিয়ন্ত্রণ আলোক ব্যবস্থা এবং সৌন্দর্যময় চারদিক।

আজ শেষ বারের মত যিয়ারত করলাম নবী পাকের রওজা মোবারক। রওজাতুমমিন রিয়াজুল জান্নায় নফল নামাজ পড়ে দোয়া করলাম। সবশেষে এশার নামাজ মসজিদে নববীতে পড়ে বেদনা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ঘরে ফিরি।

সঙ্গীদের অনেকেই মদিনা ত্যাগ করেছেন। দু জন রয়েছেন এখনও। কবীর ভাই ও তার মাতা।উনারা আমাদের বিদায় দিলেন।

প্রথমেই একটি টেক্সিতে করে পৌছালাম বাস টার্মিনালে। অবশ্য দুদিন আগেই সংশ্লিষ্ট অফিস থেকে বাস টিকিট সংগ্রহ করি। নিদিষ্ট বাসে উঠে যাএার অপেক্ষায় থাকি।

রাত ১১টার দিকে গাড়ি ছাড়লো। ভোরে জেদ্দার কাছাকাছি এক জায়গায় নেমে ফজরের নামাজ পরে পূণরায় বাসে করেই জেদ্দা বিমান বন্দরে পৌছি। বিমান বন্দরে আমাদেরকে নিজ নিজ পাসপোর্ট প্রদান করা হয়।

আরও প্রায় ২৪ ঘন্টা পরে আমাদের বিমান যাএা হবে দেশের উদ্দেশ্যে। এই সময়টুকু বন্দরেই কাটাতে হবে। বিমান বন্দরের এক জায়গায় অবস্থানের জন্যে নির্ধারিত আছে।

এখানে কর্তব্যরত রয়েছেন হজ মিশনের কর্তা ব্যক্তিরা। আমরা শতরঞ্জি মেঝেতে বিছিয়ে এরই উপর অবস্থান গ্রহন করলাম। প্রায় একদিন একরাত এখানেই কাটালাম। পাশাপাশি অন্য দেশের হাজীরাও রয়েছেন বিভিন্ন অংশে। তবে তাদেরকে এত দীর্ঘক্ষণ এখানে থাকতে হয়নি। ৪/৫ ঘন্টা পরপর এক এক গ্রুপের ফ্লাইট হয়েছে এবং নতুন নতুন গ্রুপ ঔ জায়গায় প্রতিস্থাপিত হয়েছে।

আমরা ঘোষণা মোতাবেক বিমান বন্দরের বাংলাদেশ বিমানের বুথে রিপোর্ট করলাম। বিমান কতৃপক্ষের নির্দেশনা মোতাবেক আমাদেরকে ২৪ ঘন্টার আগেই আসতে হয়েছে।

কিন্তু বিমানের যাএী হিসেবে এই সংস্থাটির দায়িত্ব ছিল উল্লেখিত দীর্ঘ সময় পর্যন্ত যাএীদের খোজ নেয়া,প্রয়োজনীয় সেবা প্রদান এবং যাএী সাধারণের অসুবিধার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা।

কিন্তু এসবের কোনটিই করা হয়নি বিমান কতৃপক্ষের তরফ থেকে।

পরদিন সকাল ৮টার দিকে (৭ মে ৯৭) আমরা ইমিগ্রেশন অতিক্রম করে বিমানে আরোহণ করার পথে আমাদের সকলকে প্রদান করা হয় সম্পূর্ণ কোরআনুল করিমের বাংলা তর্জমা (তাফসির) ।

পুণ্যভূমি থেকে বিদায়ের প্রাক্কালে দুই পবিত্র মসজিদের খাদেম বাদশাহ ফাহাদের তরফ থেকে দেয়া হয় এই অসামান্য উপহার। যা জীবনে চলার পথে প্রতিনিয়ত দেবে সঠিক দিক নির্দেশনা।

দীর্ঘ একমাস মক্কা, মদিনা, মিনা, আরাফাত মুজদালেফায় ইসলামের যে শাশ্বত সুন্দর রূপের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল যাতে উদ্বেলিত হয়েছে আমাদের হৃদয় মন। এই তাজা প্রান নিয়ে,সত্য, সমুজ্জ্বল স্মৃতি নিয়ে ফিরছি স্বদেশের পথে।

(সমাপ্ত)

 

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here