রাসূলুল্লাহর বিপ্লবী জীবন

মূলঃ আবু সালিম মুহাম্মদ আব্দুল হাই       অনুবাদ ও সম্পাদনাঃ মুহাম্মদ হাবীবুর রহমান

রাসূলুল্লাহর বিপ্লবী জীবন বইটির পিডিএফ এর জন্য এখানে ক্লিক করুন

 

 

পূর্ব-কথা
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা:)-এর পবিত্র জীবনচরিত পর্যালোচনা করলে এর দুটি বৈশিষ্ট্য সবচেয়ে বেশি প্রতিভাত হয়ে উঠে। প্রথমত, তাঁর জীবনধারার অন্ত-র্নিহিত বৈপ্লবিক আদর্শ যার ছোঁয়ায় মানব জাতির সমাজ ও সভ্যতায় এসেছে বৈপ্লবিক রূপান্তর। দ্বিতীয়ত, সে আদর্শের সু্ষ্ঠু রূপায়নের জন্যে তাঁর নির্দেশিত বৈপ্লবিক কর্মনীতি যার সফল অনুস্মৃতির মাধ্যমে একটি অসভ্য ও উচ্ছৃঙ্খল জনগোষ্ঠী পেয়েছিল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সভ্যতা ও সংস্কৃতির শিরোপা।

দুঃখের বিষয় যে, আজকের মুসলিম মানস থেকে বিশ্বনবীর পবিত্র জীবনচরিতের এই মৌল বৈশিষ্ট্য দুটি প্রায় লোপ পেতে বসেছে। আজকের মুসলমানরা বিশ্বনবীর জীবন আদর্শকে দেখছে খণ্ডিত রূপে, নেহায়েত একজন সাধারণ ধর্মপ্রচারকের জীবন হিসেবে। এর ফলে তার জীবনচরিতের সমগ্র রূপটি তাদের চোখে ধরা পড়ছে না; তার জীবন আদর্শের বৈপ্লবিক তাৎপর্যও তারা উপলব্ধি করতে পারছে না। বস্তুত, আজকের মুসলিম মানসের এই ব্যর্থতা ও দীনতার ফলেই আমরা বিশ্বনবীর পবিত্র জীবনচরিত থেকে আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের কোন বৈপ্লবিক রুপান্তর ঘটানোর তাগিদ অনুভব করছি না।

রসূলুল্লাহর বিপ্লবী জীবনআমাদের এই কুষ্ঠাহীন উপলব্ধিরই স্বাভাবিক ফসল। বিশ্বনবীর বিশাল ও ব্যাপক জীবনের খুঁটিনাটি বিষয়াদি এ পুস্তকের উপজীব্য নয়। এর বিষয়বস্তু প্রধানত তার বৈপ্লবিক আদর্শ ও কর্মনীতি। এই বিশেষ দুটি দিকের উপরই এতে আলোকপাত করা হয়েছে সবিস্তারে। এতে জীবনের চরিতের অন্যান্য উপাদান এসেছে শুধু প্রাসঙ্গিক বিষয় হিসেবে।

পুস্তকটির মূল কাঠামো তৈরি করেছেন ভারতের বিশিষ্ট লেখক আবু সলীম মুহাম্মদ আবদুল হাই। তার সাথে আমরা সংযোজন করেছি অনেক প্রয়োজনীয় তথ্য ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফলে স্বভাবতই পুস্তকটির কলেবর হয়েছে মূলের তুলনায় অনেক সমপ্রসারিত। এর বর্তমান সংস্করণেও সন্নিবিষ্ট হয়েছে অনেক মূল্যবান তথ্য। পুস্তকটির বিষয়টির প্রেক্ষিতে এর বাংলা নামকরণ করেছেন আমার পরম শ্রদ্ধাভাজন মরহুম কবি ফররুখ আহমদ। এর প্রথম অধ্যায়ে উদ্ধৃত কবিতাটির বাংলা অনুবাদ করে দিয়েও তিনি আমায় চির ঋণপাশে আবদ্ধ করে গেছেন। বর্তমান সংস্করণে পুস্তকটির অঙ্গসজ্জা ও মুদ্রণ পরিপাট্যের দিকে বিশেষ লক্ষ্য রাখা হয়েছে। কম্পিউটার কম্পোজের ফলে এ মুদ্রণই শুধু ঝকঝকে হয়নি, আগের তুলনায় এর কলেবর বৃদ্ধি পেয়েছে ১৬ পৃষ্ঠার মত। এছাড়াও পরিশিষ্ট পর্যায়ে ইসলাম প্রচারে মহিলা সাহাবীদের ভূমিকাশিরোনামে একটি নতুন অধ্যায়ও সংযোজিত হয়েছে এ সংস্করণে। এর ফলে পুস্তকটির সৌকার্য ও আকর্ষণ বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণে।

আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, পুস্তকটির এ সংস্করণও পাঠক সমাজে সমাদৃত হবে বিপুল ভাবে।

 

ঢাকা ১ জানুয়ারী, ১৯৯৩

মুহাম্মদ হাবীবুর রহমান

 

 

১. ইসলামী আন্দোলন ও তার অনন্য বৈশিষ্ট্য

 

ইসলাম তথা হযরত মুহাম্মদ (সা:)-এর পয়গাম দুনিয়ার এক বিরাট সংস্কারমূলক আন্দোলন। সৃষ্টির আদিকাল থেকে বিভিন্ন যুগে, বিভিন্ন দেশে খোদা-প্রেরিত নবীগণ এই একই আন্দোলনের পয়গাম নিয়ে এসেছেন। এ কেবল একটি আধ্যাত্নিক আন্দোলনই নয়, বরং এটি মানব জীবনের প্রতিটি দিক ও বিভাগে পরিব্যাপ্ত এক অভূতপূর্ব সংস্কার আন্দোলন। এটি একাধারে আধ্যাত্নিক, নৈতিক, সামাজিক, অর্থনীতিক ইত্যাদি সকল বৈশিষ্টের অধিকারি একটি ব্যাপক ও সর্বাত্নক আন্দোলন।মানব জীবনের কোন দিকই এ আন্দোলনের গণ্ডী-বহির্ভূত নয়।

 

ইসলামী আন্দোলনের গুরুত্ব

দুনিয়ার সংস্কারমূলক বা বিপ্লবাত্নক আন্দোলন বহুবারই দানা বেধে উঠেছে;কিন্তু ইসলামী আন্দোলন তার নিজস্ব ব্যাপকতা এবং অনন্য বৈশিষ্ট্যের দরুণ অন্যান্য সকল আন্দোলনের চেয়ে শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী।এ আন্দোলনের সাথে কিছুটা প্রাথমিক পরিচয় ঘটলেই লোকদের মনে প্রশ্ন জাগে:কিভাবে এ আন্দোলন উত্থিত হয়েছিল?এর প্রবর্তক কিভাবে একে পেশ করেছিলেন এবং তার কি প্রতিক্রিয়া হয়েছিল?কিন্তু এ প্রশ্নগুলোর সঠিক জবাব পাওয়া গেলে শুধু ঐতিহাসিক কৌতূহলই নিবৃত হয়না, বরং এর ফলে আমাদের মানস পটে এমন একটি ব্যাপক ও পূর্ণাঙ্গ সংস্কারমূলক আন্দোলনের ছবি ভেসে উঠে, যা আজকের দিনেও মানব জীবনের প্রতিটি সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান করতে সক্ষম।এখানেই ইসলামী আন্দোলনের আসল গুরুত্ব নিহিত।

এ আন্দোলন যেমন মানুষকে তার প্রকৃত লাভ-ক্ষতির সঠিক তাৎপর্য বাতলে দেয়,তেমনি তার মৃত্যু পরবর্তী অনন্ত জীবনের নিগূঢ় তত্ত্বও সবার সামনে উন্মোচন করে দেয়।ফলে প্রতিটি জটিল ও দুঃসমাধেয় সমস্যা থেকেই মানুষ চিরতরে মুক্তি লাভ করতে পারে। বস্তুত ইসলামী আন্দোলনের এসব বৈশিষ্ট্য একে ঘনিষ্ট আলোকে পর্যবেক্ষণ ও উপলব্ধি করবার এবং এর সর্ম্পকে উত্থাপিত দাবিগুলোর সত্যতা নিরুপণের জন্যে প্রতিটি কৌতূহলী মনকে অনুপ্রাণিত করে।

ইসলামী আন্দোলনকে জানবার ও বুঝবার জন্যেএ পর্যন্ত অনেক বই-পুস্তকই লেখা হয়েছে এবং আগামীতেও লেখা হতে থাকবে। এসব বই-পুস্তকের সাহায্যে ইসলামী আন্দোলন সর্ম্পকে বেশ পরিষ্কার একটি ধারণাও করা চলে,সন্দেহ নেই।কিন্ত প্রদীপ থেকে যেমন আলোকরশ্মি এবং ফুল থেকে খোশবুকে বিচ্ছিন্ন করা চলে না, তেমনি এ জন্যেই যখন ইসলামী আন্দোলনের কথা উঠে, তখন মানুষ স্বভাবতই এর আহ্বায়ক হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর জীবনচরিত এবং এর প্রধান উৎস আল-কুরআনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ জানবার জন্যে উৎসুক হয়ে উঠে। এ ঔৎসুক্য খুবই স্বাভাবিক।

 

ইসলামী আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য

একথা সর্বজনবিদিত যে, মানুষের নৈতিক জীবনের সংশোধন, তার ক্ষতিকর বৃত্তিগুলোর অপনোদন এবং জীবনকে সঠিকভাবে কামিয়াব করে তুলবার উপযোগী একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন পদ্ধতি উপস্থাপনই হচ্ছে মানবতার প্রতি সবচেয়ে পবিত্র এবং এটাই হচ্ছে তার সবচেয়ে সেরা খেদমত।এই উদ্দেশ্যেই দুনিয়ার অসংখ্য মানুষ নিজ নিজ পথে কাজ করে গেছেন।কিন্তু এ ধরণের সংস্কারমূলক কাজ যাঁরা করেছেন, তাঁরা মানব জীবনের কয়েকটি মাত্র ক্ষেত্রকেই শুধু বেছে নিয়েছেন এবং তার আওতাধীনে থেকেই যতদূর সম্ভব কাজ করে গেছেন।কেউ আধ্যাত্নিক ও নৈতিক দিককে নিজের কর্মকাণ্ডকে সীমাবদ্ধ রেখেছেন রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থার সংশোধনের মধ্যে।কিন্তু মানব জীবনের প্রতিটি দিক ও বিভাগের সুষম পুনর্বিন্যাস ও পুনর্গঠনের চেষ্টা করেছেন এমন পূর্ণাঙ্গ সংস্কারবাদী একমাত্র খোদা-প্রেরিত নবীগণকেই বলা যেতে পারে।

মানব জাতির প্রতি বিশ্বস্রষ্টার সবচেয়ে বড় অনুগ্রহ এই যে, তার প্রেরিত সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর দাওয়াত ও জীবন-চরিত কে তিনি অতুলনীয়ভাবে সুরক্ষিত রেখেছেন।বস্তুত এই মহামানবের জীবনী এমন নির্ভুলভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে যে, দুনিয়ার অন্য কোন মহাপুরুষের জীবনী কিংবা কোন ঐতিহাসিক দলিলের লিপিবদ্ধকরণেই এতখানি সতর্কতা অবলম্বনের দাবি করা যেতে পারে না।পরন্ত ব্যাপকতার দিক দিয়ে এর প্রধান বৈশিষ্ট্য এই যে, এতে হযরত (সা )-এর কথাবার্তা, কাজ-কর্ম জীবন-ধারা, আকার-আকৃতি, উঠা-বসা চলন-বলন, লেন-দেন, আচার-ব্যবহার, এমনকি খাওয়া পরা, শয়ন-জাগরণ এবং হাসি-তামাসার ন্যায় সামান্য বিষয়গুলো পর্যন্ত সুরক্ষিত রাখা হয়েছে। মোটকথা, আজ থেকে মাত্র কয়েক শো বছর আগেকার বিশিষ্ট লোকদের সম্পর্কেও যে খুঁটিনাটি তথ্য জানা সম্ভবপর নয়, হযরত মুহাম্মদ (স) সম্পর্কে প্রায় দেড় হাজার বছর পরেও সেগুলো নির্ভুলভবে জানা যেতে পারে।

হযরত মুহাম্মদ(স)-এর জীবন-চরিত পর্যালোচনা করার আগে এর আর একটি বৈশিষ্ট্যের প্রতি আমাদের লক্ষ্য রাখা দরকার।তাহলো এই যে, কোন কাজটি কতখানি গুরুত্বপূর্ণ তা কেবল সেই কাজের পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রেক্ষিতে অনুধাবণ করা চলে। কারণ প্রায়শই দেখা যায় যে, অনুকূল পরিবেশে যে সব আন্দোলন দ্রুতবেগে এগিয়ে চলে,প্রতিকূল পরিবেশে সেগুলোই আবার স্তিমিত হয়ে পড়ে। তাই সাধারণ আন্দোলনগুলোর ক্ষেত্রে দেখা যায় যে,সেগুলোকে গ্রহণ করার জন্যে আগে থেকেই লোকদের ভেতর যথারীতি প্রস্তুতি চলতে থাকে।অত:পর কোন দিক থেকে হঠাৎ কেউ আন্দোলন শুরু করলেই লোকেরা স্বত:স্ফূর্তভাবে তার প্রতি সহানুভূতি জানাতে থাকে এবং এর ফলে আন্দোলনও স্বাভাবিকভাবে এগিয়ে চলে।দৃষ্টান্ত হিসাবে দুনিয়ার আজাদী আন্দোলনগুলোর কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। মানুষ স্বভাবতই বিদেশী শাসকদের জুলুম-পীড়নে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে এবং মনে মনে তার প্রতি ক্ষুব্ধ হতে থাকে।অত:পর কোন সাহসী ব্যক্তি যদি প্রকাশ্যভাবে আজাদীর দাবি উত্থাপন করে,তাহলে বিপদ-মুসিবতের ভয়ে মুষ্টিমেয় লোক তার সহগামী হলেও দেশের সাধারণ মানুষ তার প্রতি সহানুভূতিশীল না হয়ে পারে না।অর্থনৈতিক আন্দোলনগুলোর অবস্থাও ঠিক এইরূপ। ক্রমাগত দু:খ-ক্লেশ এবং অর্থগৃধ্‌নু ব্যক্তিদের শোষণ-পীড়নে লোকেরা স্বভাবই এরূপ আন্দোলনের জন্যে প্রস্তত হতে থাকে।এমতাবস্থায় অর্থনৈতিক বিধি-ব্যবস্থার সংশোধন এবংমানুষের দুঃখ-দুর্গতি মোচনের নামে দেশের কোথাও যদি কোনো বিপ্লবাত্মক আন্দোলন মাথা তুলে দাঁড়ায়, তাহলে লোকেরা স্বভাবতই তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে।কিন্তু এর বিপরীত -সম্পূর্ণ প্রতিকূল পরিবেশে উত্থিত একটি আন্দোলনের কথা ভেবে দেখা যেতে পারে।দৃষ্টান- হিসাবে বলা যায়, কোনো উগ্র মূর্তিপূজারী জাতির সামনে কোনো ব্যক্তি যদি মূর্তিপূজাকে নেহাত একটি অনর্থক ও বাজে কাজ বলে ঘোষণা করে, তাহলে তার ওপর কী বিপদ-মুসিবত নেমে আসতে পারে, একটু ভেবে দেখা দরকার। বস্তুত ইসলামী আন্দোলনের

আহ্বায়ক হযরত মুহাম্মদ(স) কী প্রতিকূল পরিবেশে তার কাজ শুরু করেছিলেন, তা স্পষ্টত সামনে না থাকলে তার কাজের গুরুত্ব এবং তার বিশালতা উপলব্ধি করা কিছুতেই সম্ভবপর হবে না। এ কারণেই তার জীবনচরিত আলোচনার পূর্বে তৎকালীন আরব জাহান তথা সারা দুনিয়ার সার্বিক অবস্থার ওপর কিছুটা আলোকপাত করা দরকার।

 

ইসলামী আন্দোলনের প্রাক্কালে দুনিয়ার অবস্থা

ইসলাম মানুষের কাছে যে দাওয়াত পেশ করেছে, তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বুনিয়াদ হচ্ছে তাওহীদ। কিন্তু এই তাওহীদের আলো থেকেই তখনকার আরব উপদ্বীপ তথা সমগ্র দুনিয়া ছিল বঞ্চিত।তৎকালীন মানুষের মনে তাওহীদ সম্পর্কে সঠিক কোন ধারণাই বর্তমান ছিল না।এ কথা সত্যি যে হযরত মুহাম্মদ (স) এর আগেও খোদার অসংখ্য নবী দুনিয়ায় এসেছেন এবং প্রতিটি মানব সমাজের কাছেই তারা তাওহীদের পয়গাম পেশ করেছেন।কিন্তু মানুষের দুর্ভাগ্য এই যে, কালক্রমে এই মহান শিক্ষা বিস্মৃত হয়ে সে নিজেরই ইচ্ছা-প্রবৃত্তির দাসত্বে লিপ্ত হয়ে পড়ে এবং তার ফলে চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ-উপগ্রহ,দেব-দেবী, নদী-সমুদ্র, পাহপড়-পর্বত, জ্বিন-ফেরেশতা, মানুষ-পশু ইত্যাকার অনেক বস্তুকে নিজের উপাস্য বা মাবুদের মধ্যে শামিল করে নেয়।এভাবে মানুষ এ খোদার নিশ্চিত বন্দেগীর পরিবর্তে অসংখ্য মাবুদের বন্দেগীর আবর্তে জড়িয়ে পড়ে।

রাজনৈতিক দিক থেকে তখন পারস্য ও রোম এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি বর্তমান ছিলো। পারস্যের ধর্মমত ছিলো অগ্নিপূজা (মাজুসিয়াত)। এর প্রতিপত্তি ছিলো ইরাক থেকে ভারতের সীমানা পর্যন্ত বিস্তৃত। আর রোমের ধর্ম ছিলো খ্রিষ্টবাদ(ঈসাইয়াত)এটি গোটা ইউরোপ,এশিয়া ও আফ্রিকাকে পরিবেষ্টন করে ছিলো। এ দুটি বৃহৎ শক্তি ছাড়া ধর্মীয় দিক থেকে ইহুদী ও হিন্দু ধর্মের কিছুটা গুরুত্ব ছিলো। এরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ এলাকায় সভ্যতার দাবি করত। অগ্নিপূজা ছাড়া পারস্যে (ইরানে) নক্ষত্রপূজারও ব্যাপক প্রচলন ছিলো। সেই সঙ্গে রাজা-বাদশা ও আমির-ওমরাগণ ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রজাদের খোদা ও দেবতার আসনে অধিষ্ঠিত ছিলো। তাদেরকে যথারীতি সিজদা করা হত এবং তাদের খোদায়ীর প্রশস্তিমূলক সংগীত পরিবেশন করা হত।মোট কথা,সারা দুনিয়া থেকেই তাওহীদের ধারণা বিদায় নিয়েছিলো।

 

রোম সাম্রাজ্য

গ্রীসের পতনের পর রোম সাম্রাজ্যকেই তখন দুনিয়ার সবচেয়ে সেরা শক্তি বলে বিবেচনা করা হত। কিন্তু ঈসায়ী ষষ্ঠ শতকের শেষভাগে এই বৃহৎ সাম্রাজ্যই অধঃপতনের শেষ প্রান্তে এসে উপনীত হয়। রাষ্ট-সরকারের অব্যাবস্থা,শত্রুর ভয়,অভ্যন্তরীন অশান্তি,নৈতিকতার বিলুপ্তি, বিলাসিতার আতিশয্য-এক কথায় তখন এমন কোন দুষ্কৃতি ছিলো না,যা লোকেদের মধ্যে অনুপ্রবেশ করেনি। ধর্মীয় দিক থেকে তো কিছু লোক নক্ষত্র ও দেবতার কল্পিত মূতির পূজা-উপাসনায় লিপ্ত ছিলোই;কিন্তু যারা ঈসার ধর্মের অনুসারী বলে নিজেদের দাবি করত, তারাও তাওহীদের ভাবধারা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্যুত হয়ে পড়েছিলো। তারা হযরত ঈসা(আঃ) ও মরিয়মের খোদায়ী মর্যাদায় বিশ্বাসী ছিলো। পরন্ত তারা অসংখ্য ধর্মীয় ফির্কায় বিভক্ত হয়ে পড়েছিলো এবং পরস্পর লড়াই-ঝগড়ায় লিপ্ত থাকতো। তাদের মধ্যে কবর পূজার ব্যাপক প্রচলন ছিলো। পাদ্রীদের তারা সিজদা করত। পোপ ও বিভিন্ন পর্যায়ের ধর্মীয় পদাধিকারীগণ বাদশাহী,এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে খোদায়ী ক্ষমতা পর্যন্ত করায়ত্ত করে রেখেছিলো। হারাম ও হালালের মাপকাঠী তাদের হাতেই নিবদ্ধ ছিলো। তাদের কথাকে খোদায়ী আইনবলে গণ্য করা হত। পাশাপাশি সংসারত্যাগ বা সন্ন্যাস ব্রতকে ধার্মিকতার উচ্চাদর্শ বলে মনে করা হতো এবং সকল প্রকার আরাম আয়েশ থেকে দেহকে মুক্ত রাখাই শ্রেষ্ঠ ইবাদত বলে বিবেচিত হতো।

 

ভারতবর্ষ

ধর্মীয় দিক থেকে ভারতে তখনপৌরাণিক যুগবিদ্যমান ছিলো। ভারতের ধর্মীয় ইতিহাসে এই যুগটিকে সবচেয়ে অন্ধকার যুগ বলে গণ্য করা হয়। কারণ এ যুগে ব্রাহ্মণ্যবাদ পুনরায় প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলো এবং বৌদ্ধদেরকে প্রায় নির্মূল করে দেয়া হয়েছিলো। এ যুগে শির্কের চর্চা মাত্রাতিরিক্ত রকমে বেড়ে গিয়েছিলো। দেবতাদের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে ৩৩ কোটি পর্যন্ত পৌঁছেছিলো। কথিত আছে যে,বৈদিক যুগে কোন মূর্তি পূজার প্রচলন ছিলনা। কিন্তু এ যুগে মূর্তিপূজার ব্যাপক প্রচলন ঘটেছিলো। মন্দিরের পুরোহিতগণ অনৈতিকতার এক জীবন্ত প্রতীক। সরল প্রাণ লোকেদের শোষাণ ও লুন্ঠন করাই ছিল তাদের প্রধান কাজ। সে যুগে বর্ণবাদ বা জাতিভেদ প্রথার বৈষম্য চরমে পৌছেছিল। এর ফলে সামাজিক শৃংখলা ও ব্যাবস্থাপনা ধ্বংস হয়েছিল। সমাজপতিদের খেয়াল-খুশি মতো আইন কানুন তৈরি করে নেয়া হয়েছিল বিচার ইনসাফকে সম্পূর্ণরুপে হত্যা করা হয়েছিল। বংশ-গোত্রের দৃষ্টিতে লোকেদের মর্যাদা নিরুপন করা হতো। সাধারণ্যে মদপানের ব্যাপক প্রচলন ঘটেছিলো। তবে খোদা প্রাপ্তির জন্য বন-জঙ্গল ও পাহাড়-পর্বতে জীবন কাটানো কে অপরিহার্য মনে করা হতো। কুসংস্কার ও ধ্বংসাত্নক চিন্তাধারা চরমে পৌছেছিলো। ভূত প্রেত, শুভাশুভ গণন এ ভবিষ্যৎ কথনে বিশ্বাস গোটা মানব জীবনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিলো। যে কোন অদ্ভুত জিনিসকেই খোদাবলে গণ্য করা হতো। যে কোন অস্বাভাবিক বস্তুর সামনে মাথা নত করাই ধর্মীয় কাজ বলে বিবেচিত হতো। দেব-দেবী ও মূর্তির সংখ্যা গণনা তো দূরের কথা, তা আন্দাজ অনুমানেরও সীমা অতিক্রম করেছিলো। পূজারিণী ও দেবদেবীদের নৈতিক চরিত্র অত্যন্ত লজ্জাকর অবস্থায় উপনীত হয়েছিলো। ধর্মের নামে সকল প্রকার দুষ্কর্ম ও অনৈতিকতাকে সর্মথন দেয়া হতো। এক এক জন নারী একাধিক পুরুষকে স্বামীরুপে গ্রহণ করতো। বিধবা নারীকে আইনের বলে সকল প্রকার সুখ সম্ভোগ থেকে জীবনভর বঞ্চিত করে রাখা হতো। এই ধরনের জুলুম মূলক সমাজরীতির ফলে জীবন- নারী তার মৃত স্বামীর জ্বলন- চিতায় ঝাঁপ দিয়ে মৃত্যুবরণ করতে পর্যন্ত স্বীকৃত হতো। যুদ্ধে হেরে যাবার ভয়ে বাপ,ভাই ও স্বামী তাদের কন্যা, ভগ্নি ও স্ত্রীকে স্বহস্থে হত্যা করে ফেলতো এবং এতে তারা অত্যন্ত গর্ববোধ করতো। নগ্ন নারী ও নগ্ন পুরুষের পূজা করাকে পূণ্যের কাজ বলে গণ্য করতো। পূজা পার্বণ উপলক্ষে মদ্যপান করে তারা নেশায় চুর হয়ে যেত। মোদ্দাকথা, ধর্মাচরণ, নৈতিকতা ও সামাজিকতার দিক দিয়ে খোদার এই ভূখন্ডটি শয়তানের এক নিকৃষ্ট লীলাভূমিতে পরিণত হয়েছিলো।

 

ইহুদী

আল্লাহর দ্বীনের অনুসারী হিসেবে কোনো সংস্কার-সংশোধন যদি প্রত্যাশা করা যেতো, তাহলে ইহুদীদের কাছ থেকেই করা যেতে পারতো। কিন্তু তাদের অবস্থাও তখন অধঃপতনের চরম সীমায় পৌছে গিয়েছিলো। তারা তাদের দীর্ঘ ইতিহাসে এমন সব গুরুতর অপরাধ করেছে যে, তাদের পক্ষে কোনো সংস্কার মূলক কাজ করাই সম্ভব ছিলো না। তাদের মানসিক অবস্থা অত্যন- শোচনীয় আকার ধারণ করেছিলো। ফলে তাদের ভেতর কোনো নবীর আগমন ঘটলে তাঁর কথা শুনতে পর্যন্ত তারা প্রস্তুত ছিলো না।
এজন্যে কতো নবীকে যে তারা হত্যা করেছে তার ইয়ত্তা নেই। তারা এরুপ ভ্রান্ত ধারণায় নিমজ্জিত ছিলো যে
, খোদার সাথে তাদের একটি বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে; সুতরাং কোনো অপরাধের জন্যেই তিনি তাদের শাস্তি দেবেন না। তারা এ-ও ধারণা করতো যে, বেহেস্তের সকল সুখ-সম্ভোগ শুধু তাদের জন্যেই নির্দ্দিষ্ট করে রাখা হয়েছে।নবুয়্যাত ও রিসালাতকে তারা নিজেদের মীরাসী সম্পত্তি বলে মনে করতো। তাদের আলেম সমাজ দুনিয়া-পুজা ও যুগ-বিভ্রান্তিতে চরমভাবে লিপ্ত হয়ে পড়েছিলো। বিত্তশালী ও শাসক সম্প্রদায়ের মনোতুষ্টির জন্যে সবসময় তারা ধর্মীয়বিধি-বিধানে হ্রাস-বৃদ্ধি করতে থাকতো। খোদায়ী বিধান সমূহের মধ্যে যেগুলো অপেক্ষাকৃত সহজতর এবং তাদের মর্জি মাফিক,সে গুলোই তারা অনুসরণ করতো;পক্ষান্তরে যেগুলো কঠিন ও পছন্দনীয়,সেগুলো অবলীলাক্রমে বর্জন করতো।

পরস্পর যুদ্ধ-বিগ্রহ ও খুন খারাবী করা তৎকালীন ইহুদীদের একটা সাধারণ ব্যাপারে পরিণত হয়েছিলো। ধন-মালের লালসা তাদেরকে সীমাহীনভাবে অন্ধ করে তুলেছিলো এবং এদিক থেকে কিছুমাত্র ক্ষতি হতে পারে, এমন কোন কাজ করতেই তারা প্রস্তুত ছিলো না। এর ফলে তাদের নৈতিক চরিত্র অত্যন্ত দূর্বল হয়ে পড়েছিল। তাদের ভেতরে মুশরিকদের মত মূর্তিপূজাও প্রভাব বিস্তার করেছিল।
যাদু-টোনা
,তাবিজ-তুমার, আমল-তদবীর ইত্যাদি অসংখ্য প্রকার কুপ্রথা তাদের মধ্যে ঢুকে পড়েছিলো এবং তওহীদের সঠিক ধারণাকে তা নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিলো। এমন কি,যখন আল্লাহর শেষ নবী তওহীদের সঠিক দাওয়াত পেশ করেন। তখন এই ইহুদীরাই মুসলমানদের চেয়ে আরব মুশরিকদেরকে উত্তম বলে ঘোষণা করেন।

 

আরব দেশের অবস্থা

দুনিয়ার ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অবস্থা পর্যালোচনার পর এবার খোদ আরব দেশের প্রতি আমরা দৃষ্টিপাত করবো। কারণ, এই গুরুত্বপূর্ণ ভূ-খণ্ডেই আল্লাহর সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী তার আন্দোলনের সূত্রপাত করেন এবং এখানকার পরিস্থিতিই তাকে সর্বপ্রথম মুকাবেলা করতে হয়। আরবের একটি বিরাট অংশ- কোরা উপত্যকা, খায়বার ও ফিদাকে তখন বেশির ভাগ বাসিন্দাই ছিল ইহুদী। খোদ মদীনায় পর্যন্ত ইহুদীদের আদিপত্য কায়েম ছিল। বাকী সারা দেশে পৌত্তলিক রীতি-রেওয়াজ প্রচলিত ছিল। লোকেরা মূতি,পাথর,নক্ষত্র,ফেরেশতা, জ্বিন প্রভৃতির পূজা-উপাসনা করতো।অবশ্য এক আল্লাহর ধারণা তখনও কিছুটা বর্তমান ছিল। তবে তা শুধু এই পর্যন্ত যে, লোকেরা তাকে খোদাদের খোদা বা সবচাইতে বড় খোদাবলে মনে করত। আর এই আকিদাও এতটা দুর্বল ছিল যে কার্যত তারা নিজেদের মনগড়া ছোটখাটো খোদাগুলোর পূজা উপাসনায়ই লিপ্ত থাকতো। তারা বিশ্বাস করতো যে, মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এই সব ছোট খাটো খোদার প্রভাবই কার্যকর হয়ে থাকে। তাই বাস্তব ক্ষেত্রে তারা এগুলেরই পূজা

উপাসনা করতো। এদের নামেই মানত মানতো ও কুরবানী করতো এবং এদের কাছেই নিজ নিজ বাসনা পূরণের আবেদন জানাতো। তারা এও ধারণা করতো এসব ছোট খাটো খোদাকে সন্তষ্ট করলেই আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তষ্ট হবেন। এ ভ্রান্ত লোকেরা ফেরেস্থতাদেরকে খোদার পুত্র কন্যা বলে আখ্যা দিত। জ্বীনদের কে খোদার ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং খোদায়ীর অন্যতম শরিকদার বলে ধারণা করতো এবং এই কারণে তারা তাদের পূজা-উপাসনা করতো, তাদের কাছে সাহায্য কামনা করতো। যে সব শক্তিকে এরা খোদায়ীর শরিকদার বলে মনে করতো, তাদের মূর্তি বানিয়ে যথারীতি পূজা-উপাসনাও করতো। মূর্তি পূজার এতোটা ব্যাপক প্রচলন ঘটেছিল যে, কোথাও কোন সুন্দর পাথর খন্ড দৃষ্টি গোচর হলেই তারা তার পূজা-উপাসনা শূরু করে দিত। এমনকি, একান্তই কিছু না পাওয়া গেলে মাটির একটা স্তুপ বানিয়ে তার উপর কিছুটা ছাগ-দুগ্ধ ছিটিয়ে দিত এবং তার চারদিক প্রদক্ষিণ করতো। মোট কথা, পূজা-উপাসনার জন্য আরবরা অসংখ্য প্রকার মূর্তি নির্মান করে নিয়েছিল। এসকল মূর্তির পাশাপাশি তারা গ্রহ

নক্ষত্রেরও পূজা করতো। বিভিন্ন গোত্রের লোকেরা বিভিন্ন নক্ষত্রের পূজা করতো। এর ভিতর সূর্য ও চন্দ্রের পূজাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তারা জ্বিন-পরী এবং ভূত-প্রেতেরও পূজা করতো। এদের সম্পর্কে নানা প্রকার অদ্ভূত কথা তাদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। এছাড়া মুশরিক জাতি গুলোর মধ্যে আর যে সব কুসংস্কারের প্রচলন দেখা যায়,সেসব ও এদের মধ্যে বর্তমান ছিল।

এহেন ধর্মীয় বিকৃতির সাথে সাথে পারস্পারিক লড়াই-ঝগড়া আরবদের মধ্যে একটা সাধারণ ব্যাপারে পরিণত হয়েছিল। মামুলি বিষয়াদি নিয়ে তাদের মধ্যে যুদ্ধ-বিগ্রহ শুরু হয়ে যেতো এবং বংশ পরম্পরায় তার জের চলতে থাকতো। জুয়াখেলা ও মদ্যপানে তারা এতটা অভ্যস্থ হয়ে পড়েছিল যে, তখনকার দিনে আর কোন জাতিই সম্ভবত তাদের সমকক্ষ ছিল না।মদের প্রশস্তি এবং তার সাথে সংশ্লিষ্ট দুষ্কর্মগুলো প্রসংসায় তাদের কাব্য-সাহিত্য পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। এছাড়া সুদী কারবার, লুটপাট, চৌর্যবৃত্তি, নৃশংসতা রক্তপাত, ব্যভিচার, এবং এ জাতীয় অন্যান্য দুষ্কর্ম তাদেরকে প্রায় মানবরুপি পশুতে পরিণত করেছিল।আপন কন্যা সন্তানকে তারা অপয়া ভেবে জীবন্ত দাফন করতো। নির্লজ্জ আচরণে তারা এতদূর পর্যন্ত পৌঁছেছিল যে, পুরুষ ও নারীর একত্রে নগ্নাবস্থায় কাবা শরীফ তওয়াফ করাকে তারা ধর্মীয় কাজ বলে বিবেচনা করতো। মোটকথা,ধর্মীয়,নৈতিক,সামাজিক,ও রাজনৈতিক জীবনে তখনকার আরব ভূমি অধঃপতনের চরম সীমায় উপনীত হয়েছিল।

 

ইসলামী আন্দোলনের জন্যে আরব দেশের বিশেষত্ব

আরব উপদ্বীপ তথা সমগ্র বিশ্বব্যাপী এই ঘোর অমানিশার অবসান ঘটিযে আল্লাহর পথভ্রষ্ট বান্দাদেরকে তারই মনোনীত পথে চালিত করার জন্যে একটি শুভ প্রভাতের যে একান্ত প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল, এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু এই শুভ প্রভাতটির সূচনার জন্যে আল্লাহ তাআলা সারা দুনিয়ার মধ্যে আরব দেশকে কেন মনোনীত করলেন, প্রসঙ্গত এই কথাটিও আমাদের ভেবে দেখা দরকার। আল্লাহ তাআলা হযরত মুহাম্মদ(স)- কে সারা দুনিয়ার জন্যে হেদায়াত ও দিক-নির্দেশনা সর্বশেষ পয়গামসহ পাঠানোর জন্যে মনোনীত করেছিলেন। সুতরাং তার দাওয়াত সমগ্র দুনিয়ায়ই প্রচারিত হবার প্রয়োজন ছিল। স্পষ্টতই বোঝা যায় যে, এই বিরাট কাজের জন্যে কোন এক ব্যক্তির জীবন-কালই যথেষ্ট হতে পারে না।এর জন্যে প্রয়োজন ছিল:আল্লাহর নবী তার নিজের জীবদ্দশায়ই সৎ ও পুণ্যবান লোকদের এমন একটি দল তৈরি করে যাবেন, যারা তার তিরোধানের পরও তার মিশনকে অব্যাহত রাখবেন। আর এই গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্যে যে ধরনের বিশেষত্ব ও গুণাবরীর প্রয়োজন ছিল, তা একমাত্র আরব অধিবাসীদের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি উন্নত মানের এবং বিপুল পরিমানে পাওয়া যেত। উপরন্ত আরবের ভৌগোলিক অবস্থানকে দুনিয়ার জনবসতিপূর্ণ এলাকার প্রায় কেন্দ্রস্থল বলা চলে। এসব কারণে এখান থেকেই নবীজীর দাওয়াত চারদিকে প্রচার করা সবদিক থেকেই সুবিধাজনক ছিল।

এছাড়া আরবী ভাষারও একটি অতুলনীয় বিশেষত্ব ছিল। কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে এই ভাষায় যতটা সহজে ও হৃদয়গ্রাহী করে পেশ করা যেতো, দুনিয়ার অন্য কোন ভাষায় তা সম্ভবপর ছিল না। সর্বোপরি, আরবদের একটা বড়ো সৌভাগ্য ছিল যে, তারা কোনো বিদেশি শক্তির শাসনাধীন ছিল না। গোলামীর অভিশাপে মানুষের চিন্তা ও মানসিকতার যে নিদারুণ অধঃগতি সূচিত এবং উন্নত মানবীয় গুণাবলীরও অপমৃত্যু ঘটে,আরবরা সে সব দোষ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিল। তাদের চারদিকে পারস্য ও রোমের ন্যায় বিরাট দুটি শক্তির রাজত্ব কায়েম ছিল; কিন্তু তাদের কেউই আরবদের কে গোলামীর শৃঙ্খলে আবদ্ধ করতে পারেনি।তারা ছিল দুর্ধর্ষ প্রকৃতির বীর জাতি; বিপদ-আপদকে তারা কোনোদিন পরোয়া করতো না। তারা ছিল স্বভাবগত বীর্যবান;যুদ্ধ-বিগ্রহকে তারা মনে করতোএকটা খেল-তামাসা মাত্র। তারা ছিল অটল সংকল্প আর স্বচ্ছ দিলের অধিকারী। যে কথা তাদের মনে জাগতো,তা-ই তারা মুখে প্রকাশ করতো। গোলাম ও নির্বোধ জাতিসমূহের কাপুরুষতা ও কপট মনোবৃত্তির অভিশাপ থেকে তারা ছিল সম্পূর্ণ মুক্ত। তাদের কাণ্ডজ্ঞান,বিবেক-বুদ্ধিও মেধা-প্রতিভা ছিল উন্নত মানের। সূক্ষ্ণাতিসূক্ষ্ণ কথাও তারা অতি সহজে উপলব্ধি করতে পারতো। তাদের স্মরণ শক্তি ছিল অত্যন্ত প্রখর; এক্ষেত্রে সমকালীন দুনিয়ার কোনো জাতিই তাদের সমকক্ষ ছিল না।তারা ছিল উদারপ্রাণ, স্বাবলম্বী ও আত্ম-মর্যাদা সম্পূর্ণ জাতি। করো কাছে মাথা নত করতে তারা আদৌ অভ্যস্ত ছিল না।
সর্বোপরি
, মরুভূমির কঠোর জীবন-যাত্রায় তারা হয়ে ওঠেছিল নিরেট বাস্তববাদী মানুষ। কোন বিশেষ পয়গাম কবুল করার পর বসে বসে তার প্রশস্তি কীর্তন করা তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না;বরং সে পয়গামকে নিয়ে তারা মাথা তুলে দাঁড়াতো এবং তার পিছনে তাদের সমগ্র শক্তি-সামর্থ্য নিয়োজিত করতো।

 

আরবদের সংশোধনের পথে বাধা

আরব দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, তার শক্তিশালী ভাষা এবং তার বাসিন্দাদের এসব বৈশিষ্ট্যের কারণেই আল্লাহ তাআলা তাঁর সর্বশেষ নবীকে এই জাতির মধ্যে প্রেরণ করার সিদ্ধান্ত করেন, সন্দেহ নেই।কিন্তু এই অদ্ভূত কওম কে সংশোধন করতে গিয়ে খোদ হযরত মুহাম্ম্‌দ (স)-কে যে বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয়, তার গুরুত্বও কোনো দিক দিয়ে কম ছিল না। আগেই বলেছি, কোনো কাজের সঠিক মূল্যায়ন করতে হলে সে কাজটির চারদিকের অবস্থা ও পরিবেশের কথা বিচার করা প্রয়োজন।এই দৃষ্টিতে বিচার করলে আরব ভূমির সেই ঘনঘোর অন্ধকার যুগে এ ইসলামী আন্দোলনের সূচনা ও তার সাফল্যকে ইতিহাসের এক নজিরবিহীন কীর্তি বলে অভিহিত করতে হয়। আর একারণেই আরবদের ন্যায় একটি অদ্ভূত জাতিকে দুনিয়ার নেতৃত্বের উপযোগী করে গড়ে তুলতে গিয়ে হযরত মুহাম্মদ(স)-কে যে সীমাহীন বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করতে হয়েছে, তাকেও একটা অলৌকিক ব্যাপার ছাড়া আরা কিছুই বলা চলে না।

কাজেই আরবদের এই বৈশিষ্ট্যেগুলো যে পর্যন্ত সামনে না রাখা হবে, সে পর্যন্ত হযরত মুহামামদ(স)- এর নেতৃত্বে সম্পাদিত বিশাল সংস্কার কার্যকে কিছুতেই উপলব্ধি করা যাবে না।এই কওমটির সংশোধনের পথে যে সমস্ত জটিলতার অসুবিধা বর্তমান ছিল, তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্যও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আমরা এখানে বিবৃত করছি। আরবরা ছিল একটা নিরেট অশিক্ষিত জাতি।খোদার সত্তা ও গুণাবলী সম্পর্কিতজ্ঞান, নবুয়্যাতের স্বরূপ ও গুরুত্ব, ওহীর তাৎপর্য, আখিরাত সম্পর্কিত ধারণা, ইবাদতের অর্থ ইত্যাদি কোনো বিষয়ই তারা ওয়াকিফহাল ছিল না।পরন্ত তারা বাপ-দাদার আমল থেকেই প্রচলিত রীতিনীতি ও রসম রেওয়াজের অত্যন্ত অন্ধ অনুসারী ছিল এবং তা থেকে এক ইঞ্চি পরিমাণ দূরে সরতেও প্রস্তুত ছিল না। অথচ ইসলামের যাবতীয় শিক্ষাই ছিল তাদের এই পৈত্রিক ধর্মের সম্পূর্ণ বিপরীত। অন্যদিকে শির্ক থেকে উদ্ভূত সকল মানসিক ব্যাধিই তাদের মধ্যে বর্তমান ছিল। অহংকার ও আত্মম্ভরিতার ফলে তাদের বিবেক-বুদ্ধি হয়ে পড়েছিল প্রায় নিস্ক্রিয়।পারস্পরিক লড়াই-ঝগড়া তাদের একটা জাতীয় বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছিল। এ জন্যে শান্ত মস্তিষ্কে ও গভীরভাবে কোনো কিছু চিন্তা করা তাদের পক্ষে সহজতর ছিল না।তাদের কিছু ভাবতে হলে তা যুদ্ধ-বিগ্রহের দৃষ্টিকোণ থেকেই ভাবতো, এর বাইরে তাদের আর কিছু যেন ভাববারই ছিল না।সাধারণভবে দস্যুবৃত্তি,লুটতরাজ ইত্যাদি ছিল তাদের জীবিকা নির্বাহের উপায়।এ থেকে সহজেই আন্দাজ করা চলে যে,হযরত মুহাম্মদ(স)-এর দাওয়াত তাদের ভেতর কী প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল। তিনি যখন তাদের কে ইসলামের দিকে আহ্বান জানান, তখন তাদের কাছে তা মনে হয়েছিল একটি অভিনব দুর্বোধ্য ব্যাপার। তারা বাপ-দাদার আমল থেকে যে সব রসম-রেওয়াজ পালনে অভ্যস্ত, যে সব চিন্তা-খেয়াল তারা মনের মধ্যে পোষণ করেছিল -এ দাওয়াত ছিল তার সম্পূর্ণ বিপরীত। এ দাওয়াতের মূল কথা ছিল: লড়াই-ঝগড়া বন্ধ করো, শান্তিতে বসবাস করো,দস্যুবৃত্তি ও লুটতরাজ থেকে বিরত থাকো, বদভ্যাস ও ধ্বংসাত্মক চিন্তাধারা পরিহার করো, সর্বোপরি জীবিকার জন্যে হারাম পন্থা ত্যাগ করো। স্পষ্টতই বোঝা যায়,এ ধরণের একটি সর্বাত্মক বিপ্লবী পয়গামকে কবুল করা তাদের পক্ষে কত কঠিন ব্যাপার ছিল।

মোটকথা, তৎকালীন দুনিয়া অবস্থা, আরব দেশের বিশেষ পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট জাতির স্বভাব-প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য-বিশেষত্ব -এর কোন জিনিসই ইসলামী আন্দোলনের পক্ষে অনুকূল ছিল না।কিন্তু যখন এর ফলাফল প্রকাশ পেলো,তখনই স্পষ্ট বোঝা গেল:

বজ্রের ধ্বনি ছিল সেথবা ছিল সে সওতে হাদী

দিল যে কাঁপায়ে আরবের মাটি রাসূল সত্যবাদী।

জাগালো সে এক নতুন লগ্ন সকলের অন্তরে,

জাগায়ে গেল সে জনতাকে চির সুপ্তির প্রান্তরে!

সাড়া পড়ে গেল চারদিকে এই সত্যের পয়গামে,

হলো মুখরিত গিরি-প্রান্তর চির সত্যের নামে।

বস্তুত এটই ছিল ইসরামী আন্দোলনের সবচেয়ে বড় মুজিজা। এই মুজিজার কথা যখন উত্থাপিত হয়, তখন স্বভবতই হযরত মুহাম্মদ(স)- জীবনধারা আলোচনা এবং তার পেশকৃত পয়গামকে নিকট থেকে উপলব্ধিকরার জন্যে প্রতিটি উৎসুক মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে।পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে এই বিষয়টি আমরা পাঠকদের সামনে তুলে ধরবার চেষ্টা করবো।

 

 

২. জন্ম ও বাল্যকাল

 

বংশ পরিচিতি

হযরত মুহাম্মদ(স)-এর সম্মানিত পিতার নাম আব্দুল্লাহ।তিনি কবার মুতাওয়াল্লী আবদুল মুত্তালিবের পুত্র ছিলেন। তার বংশ-পরম্পরা উর্ধ্ব দিকে প্রায় ষাট পুরুষ পর্যন্ত পৌঁছে ইব্রাহীম (আঃ)-তনয় হযরত ইসমাঈল(আ)-এর সাথে মিলিত হয়েছে।তার খান্দানের নাম কুরাইশ।আরব দেশের অন্যান্য খান্দানের মধ্যে এটিই পুরুষানুক্রমে সবচেয় শ্রেষ্ঠ ও সম্মানিত খান্দান বলে পরিগণিত হয়ে আসছে। আরবদেশের ইতিহাসে এই খান্দানের অনেক বড়ো বড়ো মান্য-গণ্য ব্যক্তির নাম দেখতে পাওয়া যায়।এদের ভেতর আদনান, নাযার, ফাহার, কালাব, কুসসী প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কুসসী তার জামানায় কাবা শরীফের মুতাওয়াল্লী ছিলেন।তিনি অনেক বড়ো বড়ো স্মরণীয় কাজ করে গেছেন।যেমন: হাজীদের পানি সরবরাহ করা, তাদের মেহমানদারির ব্যবস্থা করা ইত্যাদি। তার পরেও তার খান্দানের লোকেরা এই সকল কাজ আঞ্জাম দিতে থাকে।এসব জনহিতকর কাজ এবং কাবা শরীফের মুতাওয়াল্লী হবার কারণে কুরাইশরা সারা আরব দেশে অতীব সম্মানিত ও গুরুত্বপূর্ণ খান্দান হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।সাধারণভাবে আরবে লুটতরাজ, রাহাজানি ইত্যাকার দুষ্কৃতি হিসেবে স্বীকতি প্রচলিত ছিল এবং এ কারণে রাস্তাঘাট আদৌ নিরাপদ ছিল না।কিন্তু কাবা শরীফের মর্যাদাও হাজীদের খেদমতের কারণে কুরাইশদের কাফেলার ওপর কখনো কেউ হামলা করতো না।তারা শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের ব্যবসায়ের পণ্য এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যেতে পারতো। আব্দুল মুত্তালিবের দশটি(মতান্তরে বারোটি) পুত্র ছিল।কিন্তু কুফর বা ইসলামের বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে তাদের মধ্যে পাঁচ জন মাত্র খ্যাতি লাভ করেন। প্রথম আব্দুল্লাহ, ইনি হযরত(স)-এর পিতা। 

দ্বিতীয়,আবু তালিব; ইনি ইসলাম কবুল করেননি বটে,তবে কিছুকাল হযরতের সাহায্য ও পৃষ্টপোষকতা করেছেন।তৃতীয়,হযরত হামযা(রা) এবং চতুর্থ,হযরত আব্বাস(রা)-এরা দুজনই ইসলামে সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নেন এবংইসলামের ইতিহাসে অতীব উচ্চ মর্যাদা লাভ করেন।আর পঞ্চম হচ্ছে আবু লাহাব;ইসলামের প্রতি বৈরিতার কারণে ইতিহাসে যার নাম সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। কুরাইশদের একটি গোত্রের নাম হচ্ছে জাহারা। এই গোত্রের ওহাব বিন আবদুল মানাফের কন্যা আমিনার সঙ্গে আবদুল্লাহর বিবাহ হয়। সমগ্র কুরাইশ খান্দানের ভেতর ইনি একজন বিশিষ্ট মহিলা ছিলেন।বিবাহকালে আবদুল্লাহর বয়স ছিল মাত্র সতেরো বছর।বিয়ের পর খান্দানী রীতি অনুযায়ী তিনি তিন দিন শ্বশুরালয়ে অবস্থান করেন।অতঃপর ব্যবসায় উপলক্ষে সিরিয়া গমন করেন। ফিরবার পথে মদিনা পর্যন্ত পৌঁছেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং সেখানেই ইন্তেকাল করেন। ঐ সময় আমিনা অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন।

 

জন্ম তারিখ

ঈসায়ী ৫৭১ সালের ২০ এপ্রিল মুতাবেক ৯ রবিউল আওয়াল সোমবারের সুবহে সাদিক।এই স্মরণীয় মুহূর্তে রহমতে ইলাহীর ফয়সালা মুতাবেক সেই মহান ব্যক্তিত্ব জন্ম গ্রহণ করলেন,সারা দুনিয়া থেকে জাহিলিয়াতের অন্ধকার বিদূরিত করে হেদায়েতের আলোয় গোটা মানবতাকে উদ্ভাসিত করার জন্যে যার আবির্ভাব ছির একান্ত অপরিহার্য এবং যিনি ছিলেন কিয়ামত পর্যন্ত এই দুনিয়ায় বসবাসকারী সমগ্র মানুষের প্রতি বিশ্বপ্রভুর পরম আর্শিবাদ স্বরূপ।জন্মের আগেই এই মহামানবের পিতার ইন্তেকাল হয়েছিল। তাই দাদা আবদুল মুত্তালিব এর নাম রাখলেন মুহাম্মদ(স)।

 

শৈশবে লালন-পালন

সর্বপ্রথম হযরত(স)- এর স্নেহময়ী জননী আমিনা তাকে দুধ পান করান। দু-তিন দিন পর আবু লাহাবের বাঁদী সাওবিয়াও তাকে স্তন্য দান করেন। সে জামানার রেওয়াজ অনুযায়ী শহরের সম্ভান- লোকেরা তাদের সন্তান-সন্ততিকে দুধ পান করানো এবং তাদের লালন -পালনের জন্য গ্রামাঞ্চলে পাঠিয়ে দিতেন।সেখানকার খোলা আলো-হাওয়ায় তাদের স্বাস্থ্য ভালো হবে এবং তারা বিশুদ্ধ আরবী ভাষা শিখতে পারবে বলে তারা মনে করতেন।কেনা, আরবের শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামাঞ্চলের ভাষা অধিকতর বিশুদ্ধ বলে ধারণা করা হতো।এই নিয়ম অনুযায়ী গ্রামের মেয়েরা শহরে এসে বড়ো বড়ো অভিজাত পরিবারের সন্তানদের লালন- পালনের জন্যে সঙ্গে নিয়ে যেতো। তাই হযরত(স)-এর জন্মের কয়েক দিন পরই হাওয়াযেন গোত্রের কতিপয় মহিলা শিশুর সন্ধানে মক্কায় আগমন করেন।এদের হালিমা সাদিয়া নাম্নী এক মহিলাও ছিলেন। এই ভাগ্যবতী মহিলা অপর কোন বড়ো লোকের শিশু না পেয়ে শেষ পর্যন্ত আমিনার ইয়াতিম শিশু সন্তানকে নিয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হন।

দুবছর পর আমিনা তাঁর শিশু পুত্রকে ফেরত নিয়ে আসেন। এর কিছুদিন পর মক্কায় মহামারী বিস্তার লাভ করলো। তাই আমিনা তাকে আবার গ্রামে পাঠিয়ে দিলেন।সেখানে তিনি ছয় বছর পর্যন্ত অতিবাহিত করেন।

হযরত (স)- এর বয়স যখন ছবছর, তখন আমিনা তাকে নিয়ে মদিনায় গমন করেন সম্ভবত স্বামীর কবর জিয়ারত অথবা কোন আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাত করার জন্যে তিনি এই সফরে বের হন।মদিনায় তিনি প্রায় এক মাস কাল অবস্থান করেন। কিন্তু ফিরবার পথে আরওয়া নামক স্থানে তিনি মৃত্যু বরণ করেন এবং সেখানেই চিরতরে সমাহিত হন।

আম্মার মৃত্যুর পর হযরত(স)-এর লালন-পালন ও দেখা শোনার ভার দাদা আবদুল মুত্তালিবের ওপর অর্পিত হয়। তিনি হামেশা তাকে সঙ্গে-সঙ্গে রাখতেন।হযরত(স)- এর বয়স যখন আট বছর,তখন দাদা আবদুল মুত্তালিবও মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তিনি হযরত(স)-এর লালন পালনের ভার পুত্র আবু তালিবের ওপর ন্যস্ত করে যান। তিনি এই মহান কর্তব্য অতীব সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে পালন করেন। আবু তালিব এবংআবদুল্লাহ (হযরতের পিতা)সহোদর ভাই ছিলেন।এদিক দিয়েও হযরত(স)- এর প্রতি আবু তালিবের গভীর মমত্ব ছিল।তিনি নিজের ঔরসজাত সন্তানদের চাইতেও হযরত(স)-কে বেশি আদায় যত্ন করতেন।শোবার কালে তিনি হযরত(স)-কে সঙ্গে নিয়ে শুইতেন;বাইরে বেরুবার সময়ও তিনি তাকে সঙ্গে নিয়ে বেরুতেন।

হযরত(স)-এর বয়স যখন দশ-বারো বছর, তখন তিনি সমবয়স্ক ছেলেদের সঙ্গে মাঠে ছাগলও চরান।আরবে এটাকে কোন খারাপ কাজ বলে মনে করা হতো না।ভালো ভালো সম্ভান্ত ঘরের ছেলেরাও তখন মাঠে ছাগল চরাতো।

আবু তালিব ব্যাবসায় করতেন। কুরাইশদের নিয়ম অনুযায়ী বছরে একবার তিনি সিরিয়া যেতেন।হযরত(স)-এর বয়স তখন সম্ভবত বারো বছর; এসময় একবার আবু তালিব সিরিয়া সফরের ইরাদা করলেন।সফরকালীন কষ্টের কথা স্মরণ করে তিনি হযরত(স)-কে সঙ্গে তিনি অনিচ্ছুক ছিলেন। কিন্তু হযরত(স)-এর প্রতি তার অত্যন্ত প্রগাঢ় মমতা ছিল; তাই সফরে রওয়ানা করার সময় তার সঙ্গে যাবার জন্যে হযরত(স) পীড়াপীড়ি শুরু করলে আবু তালিব তার মনে আঘাত দিতে পারলেন না।তিনি হযরত(স)-কে সঙ্গে নিয়ে গেলেন।

 

 

৩. নবুয়্যাতের আগে

 

ফুজ্জারে যুদ্ধ

ইসলাম-পূর্বযুগে আরবদের মধ্যে এক সুদীর্ঘ ও অসমাপ্য ধারা বর্তমান ছিল। এর ভেতর সবচেয়ে ভয়ংকর ও মশহুর ছিল ফুজ্জারের যুদ্ধ।এই যুদ্ধ কুরাইশ ও কায়েস গোত্রসমূহের মধ্যে সংঘটিত হয়। এতে কুরাইশদের ভূমিকা ছির সম্পূর্ণ ন্যায়ানুগ;তাই হযরত(স) ও কুরাইশদের পক্ষ থেকে এতে অংশগ্রহণ করেন।কিন্তু তিনি করো ওপর আঘাত হানেন নি এ যুদ্ধে প্রথমে কায়েস এবং পরে কুরাইশরা জয়লাভ করে। শেষ অবধি সন্ধি মারফত এর পরিসমাপ্তি ঘটে।

 

হিলফুল ফুযুল

এভাবে অনবরত যুদ্ধ-বিগ্রহের ফলে আরবের শত শত পরিবার ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিল।লোকদের না ছিল দিনের বেলায় কোন স্বস্তি আর নাছিল রাত্রে কোন আরাম।ফুজ্জারের যুদ্ধের পর এই পরিস্থিতিতে অতিষ্ঠ হয়ে কিছু কল্যাণকামী লোক এর প্রতিকারের জন্যে একটা আন্দোলন শুরু করেন।হযরত(স)-এর চাচা জুবাইর ইবনে আবদুল মুত্তালিব পরিস্থিতি দ্রুত শোধরাবার জন্যে বাস্তব ধর্মী কাজের প্রস্তাব নিয়ে এগিয়ে এলেন।এর কিছু দিন পর কুরাইশ খান্দানের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিগন জমায়েত হয়ে নিম্নোক্ত চুক্তি সম্পাদন করেনঃ

১.আমরা দেশ থেকে অশান্তি দূর করবো।

২.পথিকের জান-মালের হেফাজত করবো।

৩.গরীবদের সাহায্য করতে থাকবো।

৪.মজলুমের সহায়তা করে যাবো।

৫.কোনো জালেমকে মক্কায় আশ্রয় দেব না।

এই চুক্তিতে হযরত(স) ও অংশগ্রহণ করেন এবং তিনি অত্যন্ত আনন্দিত হন।নবুয়্যাতের জামানায় এ চুক্তি সম্পর্কে তিনি মন্তব্য করেন:আমাকে ঐ চুক্তির বদলে যদি একটি লাল রং-এর মূল্যবান উটও দেয়া হতো, তবু তা আমি কবুল করতাম না।আজো যদি কেউ এরুপ চুক্তির জন্যে আমাকে আমন্ত্রণ জানায়, তাতে সাড়া দিতে আমি প্রস্তুত।

 

কাবা গৃহের সংস্কার

তখন কাবা গৃহের শুধু চারটি দেয়াল বিদ্যমান ছিল। তার ওপর কোনো ছাদ ছিল না।দেয়ালগুলোও বড়জোর মানুষের দৈর্ঘ্য সমান উঁচু ছিল।পরন্ত গৃহটি ছিল খূব নীচু জায়গায়। শহরের সমস্ত পানি গড়িয়ে সেদিকে যেতো।ফলে পানি প্রতিরোধ করার জন্যে বাঁধ দেয়া হতো। কিন্তু পানির চাপে বাঁধ বারবার ভেঙ্গে যেতো এবং গৃহ প্রাঙ্গনে পানি জমে উঠতো। এভাবে গৃহটি দিন দিন ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছিল। তাই গৃহটি ভেঙ্গে ফেলে একটি নতুন মজবুত গৃহ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়া হল।
সমগ্র কুরাইশ খান্দান মিলিতভাবে নির্মাণ কাজ শুরু করলো। কেউ যাতে এ সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত না হয়
, সেজন্য বিভিন্ন গোত্রের লোকেরা গৃহের বিভিন্ন অংশ ভাগ করে নিলো।কিন্তু কাবা গৃহের দেয়ালে যখন হাজরে আসওয়াদস্থাপনের সময় এলো তখন বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে তুমুল ঝগড়া বেধে গেলো।প্রত্যেক গোত্রই দাবি করছিল যে, এ খেদমতটি শুধু তারাই আঞ্জাম দেবার অধিকারী্‌ অবস্থা এতদূর গড়ালো যে, অনেকের তলোয়ার পর্যন্ত কোষমুক্ত হলো।
চারদিন পর্যন্ত এই ঝগড়া চলতে থাকলো। পঞ্চম দিন আবু উম্মিয়া বিন মুগিরা নামক এক প্রবীণ ব্যক্তি প্রস্তাব করেন যে
,আগামীকাল প্রত্যুষে যে ব্যক্তি এখানে সবার আগে হাজির হবে,এর মিমাংসার জন্যে তাকেই মধ্যস্থ নিয়োগ করা হবে। সে যা সিদ্ধান্ত করবে, তাই পালন করা হবে। সবাই এ প্রস্তাব মেনে নিলো।

পরদিন আল্লাহর কুদরতে সর্বপ্রথম যে ব্যক্তির ওপর সবার নজর পড়লো, তিনি ছিলেন রাহমাতুল্লিল আলামিন হযরত মুহাম্মাদ(স)। ফয়সালা অনুযায়ী তিনি হাজরে আসওয়াদ স্থাপন করতে ইচ্ছুক প্রতিটি খান্দান কে একজন করে প্রতিনিধি নির্বাচন করতে বললেন্।অতঃপর একটি চাদর বিছিয়ে তিনি নিজ হাতে পাথরটিকে তার ওপর রাখলেন এবং বিভিন্ন গোত্রের প্রতিনিধিগণকে চাদরের প্রান্ত ধরে পাথরটিকে ওপরে তুলতে বললেন। চাদরটি তার নির্দিষ্ট স্থান বরাবর পৌছলে হাজরে আসওয়াদকে যথাস্থানে স্থাপন করলেন। এভাবে তিনি একটি সংঘর্ষের সম্ভাবনা বিনষ্ট করে দিলেন। এ সংঘর্ষে কতো খুন-খারাবী হতো,কে জানে!

এবার কাবার যে নয়া গৃহ নির্মিত হলো,তার ওপর যথারীতি ছাদও দেয়া হলো;কিন্তু পুরো ভূমির গৃহ নির্মাণের উপযোগী উপকরণ না থাকায় এক দিকের ভূমি কিছুটা বাইরে ছেড়ে দিয়ে নয়া ভিত্তি গড়ে তোলা হলো। এই অংশটিকেই এখন হিত্তিমবলা হয়।

 

ব্যবসায়ে আত্মনিয়োগ

আরবদের, বিশেষত কুরাইশদের পুরানো পেশা ছিল ব্যবসায় হযরত(স)-এর চাচা আবু তালিবও একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। এ কারণেই হযরত(স)-যখন যৌবনে পদার্পন করেন, তখনও তিনি ব্যবসায় কে অর্থোপার্জনের উপায় হিসাবে গ্রহণ করেন।কিশোর বয়সে চাচার সঙ্গে তিনি ব্যবসায় উপলক্ষে যে সফর করেন,তাতে তার যথেষ্ঠ সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।এ ব্যাপারে তিনি লোকদের কাছে অত্যন্ত বিশ্বস্ত প্রতিপন্ন হলেন।লোকেরা তার ব্যবসায়ে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে নিজ নিজ মূলধন তার কাছে জমা করতে লাগলো।পরন্ত ওয়াদা পালন,সদাচরণ ন্যায়পরায়ণতা,বিশ্বস্ততা ইত্যাদি কারণেও তিনি লোকদের অত্যন্ত শ্রদ্ধা অর্জন করলেন। এমনকি, লোকেরা তাকে আস-সাদিক’(সত্যবাদী) আল-আমীন’(বিশ্বস্ত) বলে সাধারণভাবে অভিহিত করতে লাগলো।ব্যবসায় উপলক্ষে তিনি সিরিয়া,বসরা, বাহরাইন ও ইয়েমেনে কয়েকবার সফর করেন।

 

খাদীজার সাথে বিবাহ

তখন খাদীজা নামে আরবে এক সম্ভ্রান্ত ও বিত্তশালী মহিলা ছিলেন।তিনি হযরত(স)- এর দূর সম্পর্কের চাচাতো বোন ছিলেন।প্রথম বিবাহের পর তিনি বিধবা হন এবং দ্বিতীয় বিবাহ করেন। কিন্তু কিছুদিন পর তার দ্বিতীয় স্বামীও মৃত্যুবরণ করেন এবং পুনরায় বিধবা হন।তিনি অত্যন্ত সম্মানিত ও
সচ্চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। লোকেরা তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে মুগ্ধ হয়ে তাকে
তাহিরা’(পবিত্রা) বলে ডাকতো।তার আগে ধন-দৌলত ছিল। তিনি লোকদের কে পুঁজি এবং পণ্য দিয়ে ব্যবসায় চালাতেন। 

হযরত(স)-এর বয়স তখন পঁচিশ বছর। ইতোমধ্যে ব্যবসায় উপলক্ষে তিনি বহুবার সফর করেছেন। তার সততা,বিশ্বস্ততা ও সচ্চরিত্রের কথা জনসমাজে ছড়িয়ে পড়েছিল।তার এ খ্যাতির কথা শুনে হযরত খাদীজা তার কাছে এই মর্মে পয়গাম পাঠান: আপনি আমার ব্যবসায়ের পণ্য নিয়ে সিরিয়া গমন করুন। আমি অন্যান্যদের কে যে হারে পারিশ্রমিক দিয়ে থাকি, আপনাকেও তা-ই দেবো। হযরত(স)- তার এই প্রস্তাব কবুল করলেন এবং পণ্যদ্রব্য নিয়ে সিরিয়ার অন্তর্গত বসরা পর্যন্ত গমন করলেন।

খাদীজা হযরত(স)-এর অসামান্য যোগ্যতা ওঅতুলনীয় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে মুগ্ধ হয়ে প্রায় তিন মাস পর তার কাছে বিয়ের পয়গাম প্রেরণ করেন। হযরত(স)-তার পয়গাম মন্‌জুর করলেন এবং বিয়ের দিন-ক্ষণও নির্ধারিত হলো। নির্দিষ্ট দিনে আবু তালিব, হযরত হামযা এবং খান্দানের অপরাপর বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে হযরত(স) খাদীজার বাড়িতে উপস্থিত হলেন। আবু তালিব বিয়ের খোতবা পড়লেন। পাঁচ শো তালায়ী দিরহাম (স্বর্ণ-মুদ্রা) বিয়ের মোহরানা নির্ধারিত হলো। বিবাহকালে হযরত খাদীজার বয়স চল্লিশ বছর এবং তার পূর্বোক্ত দুই স্বামীর ঔরসজাত দুই পুত্র ও এক কন্যা ছিল।

 

অসাধারণ ঘটনাবলী

দুনিয়ায় যতো বিশিষ্ট
লোকের আবির্ভাব ঘটে তাঁদের জীবনে শুরু থেকেই অসাধারণ কিছু নিদর্শনাবলী লক্ষ্য করা যায়। এ দ্বারা তাঁদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা সহজেই অনুমান করা চলে। একথা অবশ্য এমন সব লোকের বেলায়ই প্রযোজ্য
,যারা পরবর্তী কালে কোন বিশেষ খান্দান,কওম বা দেশের উল্লেখযোগ্য সংস্কার সাধন করে থাকেন। কিন্তু যে মহান সত্তাকে কিয়ামত অবধি সারা দুনিয়ার নেতত্বের জন্যে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং যাকে মানব জীবনের প্রতিটি দিক ও বিভাগের পূর্ণ সংস্কারের জন্যে প্রেরণ করা হয়েছে,তার জীবন-সূচনায় এমন অসাধারণ নিদর্শনাবলী তো প্রচুর পরিমাণে দৃষ্টিগোচর হওয়ায় স্বাভাবিক। তাই স্বভাবই তার জীবনী গ্রন্থগুলোয় এ ধরণের নিদর্শনাবলীর প্রচুর উল্লেখ দেখা যায়। কিন্তু যে সকল ঘটনা প্রামাণ্য বিশুদ্ধ রেওয়ায়েতসহ উল্লিখিত হয়েছে, তার কয়েকটি নিম্নে উদ্ধৃত হলোঃহযরত(স) বলেছেনঃ আমি যখন আমার মায়ের গর্ভে ছিলাম, তখন তিনি স্বপ্নে দেখেন যে, তার দেহ থেকে একটি আলো নির্গত হয়েছে এবং তাতে সিরিয়ার রাজপ্রাসাদ পর্যন্ত আলোকিত হয়ে গেছে।বহু রেওয়ায়েত থেকে এ-ও জানা যায় যে, তখন ইহুদী ও খ্রিষ্টান এক নতুন নবীর আগমন প্রতিক্ষায় ছিল এবং এ ব্যাপারে তারা নানা রকম ভবিষ্যত বাণী করেছিল।

রাসূল (স)-এর বাল্যকালের একটি ঘটনা। তখন কাবা গৃহ কিছুটা সংস্কার কার্য চলছিল এবং এ ব্যাপারে বড়োদের সাথে ছোট ছোট ছেলেরাও ইট বহণ করে নিয়ে যাচ্ছিল।এই ছেলেদের মধ্যে হযরত (স) এবং চাচা হযরত আব্বাসও ছিলেন। হযরত আব্বাস তাকে লক্ষ্য করে বললেনঃতোমার লুঙ্গি খূলে কাঁধের ওপর নিয়ে নাও, তাহলে ইটের চাপে ব্যথা পাবে না।তখন তো বড়োরা পর্যন্ত নগ্ন হতে লজ্জানুভব করতো না।কিন্তু হযরত(স) যখন এরুপ করলেন, নগ্নতার অনুভূতিতে সহসা তিনি বেহঁশ হয়ে পড়লেন।তার চোখ দুটো ফেটে বের হয়ে যাবার উপক্রম হলো। সম্ভিত ফিরে এলে তিনি শুধু বলতে লাগলেনঃআমার লুঙ্গি আমার লুঙ্গি লোকেরা তাড়াতাড়ি তাকে লুঙ্গি পরিয়ে দিল। কিছুক্ষণ পর আবু তালিব তার অবস্থা জানতে চাইলে তিনি বললেনঃআমি সাদা কাপড় পরিহিত এক লোককে দেখতে পাই। সে আমাকে বললো, শিগগির সতর আবৃত কর।সম্ভবত এই প্রথম হযরত(স) গায়েবী আওয়াজ শুনতে পান।

আরবে তখন আসর জমিয়ে কিসসা বরার একটা কুপ্রথা চালু ছিল। লোকেরা রাত্রি বেলায় কোন বিশেষ স্থানে জমায়েত হতো এবং কাহিনীকাররা রাতের পর রাত তাদের নানারুপ উদ্ভট কিস্‌সা-কাহিনী শোনাতো।বাল্য বয়সে হযরত(স)একবার এই ধরণের আসরে যোগদান করার ইরাদা করেন।কিন্তু পথিমধ্যে একটা বিয়ে মজলিস দেখার জন্যে তিনি দাঁড়িয়ে যান এবং পরে সেখানেই ঘুমিয়ে পড়েন। অতঃপর চোখ মেলে দেখেন যে ভোর হয়ে গেছে। এরুপ তার জীবনে আরো একবার সংঘটিত হয়। এভাবে আল্লাহ তাআলা তাকে কুসংসর্গ থেকে রক্ষা করেন।

রাসূল(স) যে যুগে জন্মগ্রহণ করেন, তখন মক্কা মূর্তি-পূজার সবচেয়ে বড়ো কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছিল।খোদ কাবা গৃহে তখন তিন শষাটটি মূর্তির পূজা হতো এবং তার নিজ খান্দানের লোকেরা অর্থাৎ কুরাইশরাই তখন কাবার মুতাওয়াল্লী বা পূজারী ছিলেন।কিন্তু এতদ সত্ত্বও হযরত(স) কোনদিন মূর্তির সামনে মাথা নত করেন নি এবং সেখানকার কোন মুশরিকী অনুষ্ঠানেও অংশ নেন নি। এছাড়া কুরাইশরা আর যে সব খারাপ রসম-রেওয়াজে অভ্যস্ত ছিল, তার কোন ব্যাপারে হযরত(স) কোনদিন তার খান্দানের সহযোগিতা করেন নি।

 

 

৪.নবুয়্যাতের সূচনা

হযরত(স) এর বয়স প্রায় চল্লিশের কাছাকাছি পৌঁছলো। তার জীবনে এবার আর একটি বিপ্লবের সূচনা হতে লাগলো।  র্জনে বসে একাকী আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থাকা এবং আপন সমাজের নৈতিক ও ধর্মীয় অধঃপতন সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনায় তিনি মশগুল হয়ে পড়লেন।তিনি ভাবতে লাগলেনঃ তার কওমের লোকেরা ভাবে হাতে-গড়া মূর্তিকে নিজেদের মাবুদ ও উপাস্য বানিয়েছে।নৈতিক দিক থেকে তারা কত অধঃপাতে পৌঁছেছে! তাদের এই সব ভ্রান্তি কি করে দূরীভূত হবে?খোদা-পরস্তির নির্ভুল পথ কিভাবে তাদের দেখানো যাবে? এই বিশ্ব-জাহানের প্রকৃত স্রষ্টা মালিকের বন্দেগী করা উচিত? এমন অসংখ্য রকমের চিন্তা ও প্রশ্ন তার মনের ভেতর তোলপাড় করতে লাগলো। ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে এসব বিষয়ে তিনি গভীর ভাবে চিন্তা করতে লাগলেন।

 

হেরা গুহায় ধ্যান

মক্কা মুয়াজ্জমা থেকে তিন মাইল দূরে অবস্থিত জাবালূন নূর-এ হেরানামে একটি পর্বত-গুহা ছিল।হযরত(স) প্রায়শই সেখানে গিয়ে অবস্খান করতেন এবং নিবিষ্ট চিত্তে চিন্তা-ভাবনা ও খোদার ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। সাধারণত খানাপিনার দ্রব্যাদি তিনি সঙ্গে নিয়ে যেতেন, শেষ হয়ে গেলে আবার নিয়ে আসতেন।কখনো কখনো হযরত খাদীজা(র) ও তা পৌঁছে দিতেন।

 

সর্ব প্রথম ওহী নাযিল

এভাবে দীর্ঘ ছয়টি মাস কেটে গেল। হযরত চল্লিশ বছর বয়সে পদার্পণ করলেন। একদা তিনি হেরা গুহার ভেতর যথারীতি খোদার ধ্যানে মশগুল রয়েছেন্‌ সময়টি তখন রমজান মাসের শেষ দশক।সহসা তার সামনে আল্লাহর প্রেরিত এক ফেরেশতা আত্নপ্রকাশ করলেন। ইনি ফেরেশতা-শ্রেষ্ঠ জিবরাঈল(আ)।ইনিই যুগ যুগ ধরে আল্লাহর রাসূলদের কাছে তার পয়গাম নিয়ে আসতেন। হযরত জিবরাঈল(আ) আত্নপ্রকাশ করেই হযরত(স)-কে বললেনঃপড়োতিনি বললেনঃ আমি পড়তে জানি নাএকথা শুনে জিবরাঈল(আ) হযরত(স)-কে বুকে জড়িয়ে এমনি জোরে চাপ দিলেন যে, তিনি থতমত খেয়ে গেলেন।অতঃপর হযরত(স)-কে ছেড়ে দিয়ে আবার বললেনঃপড়োকিন্তু তিনি আগের জবাবেরই পুনরুক্তি করলেন।জিবরাঈল(আ) আবার তাকে আলিঙ্গন করে সজোরে চাপ দিলেন এবং বললেনঃপড়োএবারও হযরত(স)জবাব দিলেনঃআমি পড়তে জানি না।পুনর্বার জিবরাঈল(আ) হযরত(স)-কে বুকে চেপে ধরলেন এবং ছেড়ে দিয়ে বললেনঃ

اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ{1} خَلَقَ الْإِنسَانَ مِنْ عَلَقٍ{2} اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ{3} الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ{4} عَلَّمَ الْإِنسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ{5}

পড়ো তোমার প্রভুর (রব) নামে, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন;সৃষ্টি করেছেন জমাট-বাঁধা রক্ত থেকে। পড়ো এবং তোমার প্রভু অতীব সম্মানিত, যিনি কলম দ্বারা শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি মানুষকে এমন জিনিস শিখিয়েছেন যা সে জানতো না।

এই হচ্ছে সর্বপ্রথম ওহী নাযিলের ঘটনা।এ ঘটনার পর হযরত(স) বাড়ি চলে গেলেন।তখন তার পবিত্র অন্তঃকরণে এক প্রকার অস্থিরতা বিরাজ করছিল।তিনি কাঁপতে কাঁপতে খাদীজা (রা) কে বললেনঃআমাকে শিগগির কম্বল দ্বারা ঢেকে দাওখাদীজা(রা) তাকে কম্বল দিয়ে ঢেকে দিলেন। অতঃপর কিছুটা শান্ত ও স্বাভাবিক হয়ে এলে তিনি খাদীজা (রা)-এর কাছে সমস্ত ঘটনা প্রকাশ করলেন;বললেনঃ আমার নিজের জীবন সম্পর্কে ভয় হচ্ছেখাদীজা(রা) বললেনঃনা, কক্ষনোই নয়।আপনার জীবনের কোন ভয় নেই।খোদা আপনার প্রতি বিমুখ হবেন না।কেননা আত্মীয়দের হক আদায় করেন;অক্ষম লোকদের ভার-বোঝা নিজের কাঁধে তুরে নেন;গরীব-মিসকিনদের সাহায্য করেন;পথিক-মুসাফিরদের মেহমানদারী করেন।মোটকথা, ইনসাফের খাতিরে বিপদ- মুসিবতের সময় আপনিই লোকদের উপকার করে থাকেন।’ এরপর খাদীজা(রা) হযরত(স)-কে নিয়ে প্রবীণ খ্রিস্টান ধর্মবেত্তা অরাকা বিন নওফেলের কাছে গমন করলেন।তিনি তাওরাত সম্পর্কে খুব ভালো পাণ্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন। হযরত খাদীজা(রা) তার কাছে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করলেন।তিনি সব শুনে বললেনঃ এ হচ্ছে মূসার ওপর অবতীর্ণ সেই নামূস’(গোপন রহস্যজ্ঞানী ফেরেশতা)। হায়! তোমার কওমের লোকেরা যখন তোমাকে বের করে দেবে, তখন পর্যন্ত আমি যদি জিন্দা থাকতাম! হযরত(স) জিজ্ঞেস করলেনঃ আমার কওমের লোকেরা কি আমায় বের করে দেবে? অরাকা বললেনঃ তুমি যা কিছু নিয়ে এসেছো, তা নিয়ে ইতঃপূর্বে যে-ই এসেছে, তার কওমের লোকেরা তার সঙ্গে দুশমনি করেছে। আমি যদি তখন পর্যন্ত জিন্দা থাকি, তাহলে তোমায় যথাসাধ্য সাহায্য করবোএর কিছুদিন পরই অরাকার মৃত্যু ঘটে।

এরপর কিছুদিন জিবরাঈলের আগমন বন্ধ রইলো। কিন্তু হযরত(স) যথারীতি হেরা গুহায় যেতে থাকলেন।এই অবস্থা অন্তত ছয়মাস চলতে থাকলো।এই বিরতির ফলে কিছুটা ফায়দা হলো। মানবীয় প্রকৃতির দরুণ তার অন্তরে ওহী নাযিলের ঔৎসুক্য সঞ্চারিত হলো। এমন কি, এই অবস্থা কিছুটা বিলম্বিত হলে তাকে সান্ত্বনা দেবার জন্যে জিবরাঈলের আগমন শুরু হলো। তবে ঘন ঘন নয়,মাঝে মাঝে। জিবরাঈল এসে তাকে এই বলে প্রবোধ দেন যে,আপনি নিঃসন্দেহে আল্লাহর রাসূল মনোনীত হয়েছেন। এরপর হযরত(স) শান্ত চিত্তে প্রতিক্ষা করতে লাগলেন। কিছুদিন পর জিবরাঈল ঘন ঘন আসা শুরু করলেন।

 

 

৬. মুজিযা ও মিরাজ

মুজিযা কথাটির সাধারণ অর্থ কোন অলৌকিক বা অস্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু দ্বীন ইসলামের পরিভাষায় মুজিযা হচ্ছে এক প্রকারের চূড়ান্ত দলীল কোন পয়গম্বরের নবুয়্যাত প্রমাণ করার জন্যে আল্লাহ তাআলা চূড়ান্ত পদক্ষেপ হিসাবে বিশ্ববাসীর সামনে এই দলিল কে উপস্থাপন করেন। অবশ্যতার জন্যে শর্ত এই যে, দলিলের বিষয়বস্তুকে সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম হতে হবে। দৃষ্টান্ত স্বরুপ বলা যায়ঃ আগুনের কাজ হচ্ছে দাহ করা, কিন্তু এ ক্ষেত্রে দাহ করবে না;সমুদ্রের ধর্ম হচ্ছে প্রবাহিত হওয়া, কিন্তু এ ক্ষেত্রে প্রবাহ থেমে যাবে;বৃক্ষের স্বভাব হচ্ছে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা, কিন্তু এক্ষেত্রে সে চলমান হবে। অনুরুপভাবে মৃত জীবিত হয়ে উঠবে, লাঠি সাপে পরিণত হবে ইত্যাদি। যেহেতু দুনিয়ার প্রত্যেকটি কাজের আসল কারন হচ্ছে আল্লাহর মহিমা এবং তার ইচ্ছা মাত্র, সেহেতু কোন কোন কাজ যেমন নির্ধারিত নিয়মে ক্রমাগত সম্পন্ন হতে থাকে, ঠিক তেমনি কোন কোন কাজ আল্লাহ তাআলার মহিমায় এই স্বাভাবিক নিয়ম থেকে বিচ্যুত হয়ে কোন অস্বাভাবিক নিয়মেও হতে পারে। আর যখন আল্লাহর ইচ্ছা হয়,তখন তা হয়েও থাকে।

আল্লাহ তাআলা অধিকাংশ নবীকেই তাদের নবুয়্যাতের সত্যতা প্রমাণের জন্যে মুজিযার ক্ষমতা দান করেছিলেন। কিন্তু সে মুজিযা কাফিরদের ঈমান আনা ও বিশ্বাস পোষণের কারণ হিসাবে খুব কমই কাজ করেছে।আগেই বলা হয়েছে মজিযা হচ্ছে এক প্রকারের চূড়ান্ত দলিল।এজন্যে লোকেরা যখন মুজিযা দেখার পরও নবীকে অস্বীকার করেছে, তখন তাদের ওপর আল্লাহ তাআলা গযব নাযিল করেছেন এবং দুনিয়া থেকে তাদেরকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয়েছে। মক্কার কুরাইশরাও হযরত (সা)-এর কাছে মুজিযা দাবি করেছিল। তাদের এই দাবিকে বারবার এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছিল। কারণ আল্লাহ তাআলার নিয়মানুযায়ী কোন জনগোষ্ঠী কে তাদের দাবি অনুসারে যদি কোন মুজিযা দেখানো হয়,তাহলে তারপর তাদের সামনে শুধু দুটি পথই খোলা থাকেঃঈমান অথবা ধ্বংস। কুরাইশদেরকে এক্ষুনি ধ্বংস দেয়ার ইচ্ছা আল্লাহ তাআলা ছিল না। সে জন্য তাদের দাবিকেও বারবার এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছিল। কিন্তু ইসলামের দাওয়াত পেশ করতে যখন দীর্ঘ দশ-এগারটি বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেল এবং অন্যান্য মুমিনদের মনে মাঝে মাঝে আগ্রহ জাগতো লাগলো:হায়!আল্লাহর তরফ থেকে যদি কোন অলৌকিক নির্দশন প্রকাশ পেত, যা দেখে অবিশ্বাসী লোকেরা ঈমান আনতো ইসলামের সত্যতা স্বীকার করতো! কিন্তু তাদের এই আগ্রহের জবাবে বলা হচ্ছিলঃ দেখো, অধৈর্য হয়ো না। যে ধারা ও নিয়মে আমি আন্দোলন পরিচালনা করছি, ঠিক সেভাবে ধৈর্য ও নিষ্ঠার সঙ্গে তুমি কাজ করতে থাকো। মুজিয়া দ্বারা কাজ হাসিল করতে চাইলে তা অনেক আগেই সম্পন্ন হয়ে যেত। আমি যদি ইচ্ছা করতাম তো এক একটি কাফিরের অন্তর মোমের মত নরম করে দিতাম এবং তাদেরকে জোরপূর্বক সুপথে চালিত করতাম। কিন্তু এ আমার নীতি নয়। এভাবে না মানুষের ইচ্ছাশক্তি ও ক্ষমতার কোন পরীক্ষা হয়ে থাকে আর না তার চিন্তাধারা ও নৈতিক জীবনে আদর্শ সমাজ গড়ার উপযোগী কোন বিপ্লব আসতে পারে। তথাপি লোকদের বেপরোয়া আচরণ এবং তাদের অবিশ্বাসের ফলে যদি তুমি ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মুকাবেলা করতে না পারো তো তোমার যা ইচ্ছা হয় তা-ই করো। জমিনের মধ্যে ঢুকে অথবা আসমানে উঠে কোন মুজিযা নিয়ে এসো।

কিন্তু এর অর্থ এ নয় যে, হযরত (সা:)-কে কোন মুজিযায় দান করা হয়নি। তার সবচেয়ে বড় মুজিযা তো খোদ কুরআন মজীদ। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন উপলক্ষে তার ব্যক্তিসত্ত্বা থেকে অসংখ্য মুজিযা প্রকাশ পেয়েছে। এর মধ্যে চন্দ্র দ্বিখণ্ডিতকরণ এবং তার মহাকাশ ভ্রমণ (মিরাজ) অত্যন- গুরুত্বপূর্ণ। এতৎভিন্ন বহুতর ভবিষ্যৎ বাণীর সফল হওয়া, তার দুআর ফলে পানি বর্ষিত হওয়া, লোকদের সুপথপ্রাপ্ত হওয়া, প্রয়োজনের সময় অল্প জিনিস বৃদ্ধি ওয়া, রুগ্ন ব্যক্তির আরোগ্য লাভ করা, পানি প্রবাহিত হওয়া ইত্যাকার অসংখ্য মুজিযা বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ পেয়েছে।

 

চন্দ্র দ্বিখন্ডিতকরণ

মক্কার কাফিরদের সামনে প্রমাণ পেশ করার জন্যে হযরত(সা:)-কে যে সব মুজিযা দেখাতে হয়, তন্মধ্যে চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত করণের ঘটনাটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ। হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা:) এই ঘটনাটি বিবৃত করেছেন এবং সহীহ বুখারী, মুসলিম প্রভৃতি হাদিস গ্রন্থে তা উল্লেখিত হয়েছে। তিনি এ ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলেন এবং স্বচক্ষে চাঁদকে দুটুকরা হতে দেখেছেন। তিনি বলেনঃ আমরা হযরত(সা:)- এর সঙ্গে মিনায় ছিলাম, ঠিক এমনি সময় দেখলাম চন্দ্রটি দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল এবং তার একটি খন্ড পাহাড়ের দিকে চলে গেল। হযরত(সা:) বললেন: সাক্ষী থেকো।কিন্তু আগেই বলা হয়েছে, মুজিযা দেখার পরই কাফিররা ঈমান আনবে, এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই; বরং কার্যত দেখা যায় যে সব লোকের মন অবিশ্বাস ও হঠকারিতায় পরিপূর্ণ,কেবল তারাই মুজিযা দাবি করে। এভাবেই তারা নিজেদের অবিশ্বাসকে আঁকড়ে থাকার জন্যে বাহানা তালাশ করে থাকে। নচেত যাদের অন্তরে ঈমান কববুল করার মত যোগ্যতা থাকে এবং যারা পার্থিব স্বার্থের জালেও জড়িত নয়, তাদের কাছে তো হযরত (সা:) এর মহান চরিত্র এবং তার শিক্ষাগুলোই সবচেয়ে বড়ো মুজিযা। আর এই শ্রেণীর লোকেরাই যে সত্য ধর্ম গ্রহণে হামেশা অগ্রবর্তী হয়ে থাকে, তা বলাই বাহুল্য। তাই চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত হবার পরও কাফিররা বলতে পারলো; ‘ওহো, এটা তো একটা জাদুর সাহায্যে চিরদিনই এরকম হয়ে আসছে।এভাবে তারা সুপথ প্রাপ্তির এক দুর্লভ সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হলো। অবশ্য এমনি সুস্পষ্ট নিদর্শনের পরও তারা আল্লাহর রাসূলকে মিথ্যা মনে করায় তাদের ব্যাধির তালিকায় আরো একটি গুরুতর ব্যাধি সংযোজিত হলো।

 

মিরাজ

মিরাজ অর্থ ঊর্ধে আরোহণ করা। যেহেতু হযরত (সা:) তার এক মহাকাশ ভ্রমণ সম্পর্কে এই শব্দটি ব্যবহার করেছেন, এজন্যে তার এই ভ্রমণ কে মিরাজ বলা হয়। এর অপর নাম হচ্ছে ইসরা অর্থাৎ রাতের পর রাত ভ্রমণ করা। এ ভ্রমণ যেহেতু রাতের পর রাত অব্যাহত ছিল, সে জন্যে একে ইসরাও বলা হয়। কুরআন পাকে এই শব্দটিই ব্যবহৃত হয়েছে।

আল্লাহর নবীদেরকে দাওয়াত, তাবলীগ, ও ইকামতের দ্বীনের যে বিরাট খেদমত আঞ্জাম দিতে হয়, সে জন্যে অত্যন্ত উচু দরের ঈমান ও সুদৃঢ় বিশ্বাসের প্রয়োজন। এ কারণেই তারা যে অদৃশ্য সত্যের প্রতি ঈমান আনার জন্যে আহ্বান জানিয়ে থাকেন, তা অন্তত তাদের নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করা দরকার। কারণ তাদেরকে সারা দুনিয়ার সামনে এ কথা দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করতে হয় যে, তোমরা শুধু আন্দাজ অনুমানের ভিত্তিতে একটা জিনিসকে অস্বীকার করছো; অথচ আমরা নিজ চোখে দেখা সত্যকেই বিবৃত করছি। তোমাদের কাছে আছে শুধু আন্দাজ-অনুমান, আমাদের কাছে আছে ইলম ও জ্ঞান।এজন্যে অধিকাংশ নবীর কাছেই ফেরেশতা আত্মপ্রকাশ করেছে, তাদেরকে আসমান ও জমিনের বিশাল রাজত্ব প্রত্যক্ষ করানো হয়েছে, স্বচক্ষে বেহেশত ও দোযখ দেখানো হয়েছে এবং এ জীবনেই মৃত্যুর পরবর্তী অবস্হা সম্পর্কে অবহিত করানো হয়েছে মিরাজ বা ইসরা এ ধরণেরই একটা ঘটনা মাত্র।এতে একজন মুমিনকে যে সব অদৃশ্য সত্যের প্রতি ঈমান আনতে হয়, হযরত (সা:)-কে তা স্বচক্ষে দেখানো হয়েছে।

মিরাজের ঘটনা কোন তারিখে ঘটেছিল, এ সম্পর্কে হাদিসে বিভিন্ন রুপ বর্ণনা পাওয়া যায়। অবশ্য সমস্ত বর্ণনা সামনে রেখে ঐতিহাসিকগণ এ তথ্যকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন যে, এ ঘটনা হিজরতের প্রায় বছর দেড়েক আগে ঘটেছিল। এ সম্পর্কে বুখারী এবং মুসলিমের বর্ণনা সামনে রাখলে যে মোটামুটি বিবরণ পাওয়া যায়, তা নিম্নরূপঃ একদিন সকাল বেলা হযরত (সা:) প্রকাশ করেনঃগত রাতে আমার প্রভু আমায় অত্যন্ত সম্মানিত করেন। আমি শুয়ে বিশ্রাম করছিলাম, এমন সময় জিবরাঈল এসে আমাকে জাগিয়ে কাবা মসজিদে নিয়ে যান। সেখানে তিনি আমার বক্ষ বিদীর্ণ করেন এবং তা জমজমের পানি দ্বারা ধুয়ে ফেলেন অত:পর তাকে ঈমান ও হিকমত দ্বারা পূর্ণ করে বিদীর্ণ স্থান পূর্বের ন্যায় জুড়ে দেন। এরপর তিনি আমার আরোহণের জন্যে খচ্চরের চেয়ে কিছু ছোট একটি সাদা জানোয়ার উপস্থিত করেন। তার নাম ছিল বুরাক।
এটি অত্যন্ত দ্রুতগতি সম্পন্ন জানোয়ার ছিল। আমি তার ওপর আরোহণ করতেই বায়তুল মুকাদ্দাস গিয়ে উপনীত হলাম। এখানে বুরাকটি মসজিদে আকসার দরজার সাথে বেঁধে রেখে আমি মসজিদে প্রবেশ করে দু
রাকায়াত নামাজ পড়লাম। এই সময় জিবরাঈল আমার সামনে দুটি পেয়ালা উপস্থিত করলেন। তার একটিতে শরাব এবং অপরটিতে দুধ ছিল। আমি দুধের পেয়ালাটি গ্রহণ করে শরাবেরটি ফেরত দিলাম। এটা দেখে জিবরাঈল বললেনঃআপনি দুধের পেয়ালাটি গ্রহণ করে স্বভাব ধর্মকেই (দ্বীনে ফিতরাত) অবলম্বন করেছেন। এর পর মহাকাশ ভ্রমণ শুরু হল। আমরা যখন পথম আকাশ পর্যন্ত পৌঁছলাম, তখন জিবরাঈল পাহারাদার ফেরেশতা কে দরজা খুলে দিতে বললেন। সে জিজ্ঞেস করলো, তোমার সাথে কে আছেন?’ জিবরাঈল বললেন,‘মুহাম্মদ। ফেরেশতা আবার জিজ্ঞেস করলো, ‘একে কি ডাকা হয়েছে?’ জিবরাঈল বললেন, ‘হ্যাঁ ডাকা হয়েছে।একথা শুনে ফেরেশতা দরজা খুলতে খুলতে
বললো
, ‘এমন ব্যক্তিত্বের আগমন মুবারক হোক।আমরা ভেতরে ঢুকতেই হযরত আদম(আ:)-এর সঙ্গে সাক্ষাত হলো। জিবরাঈল আমায় বললেন, ‘ইনি আমার পিতা আদম। আপনি একে সালাম করুন। আমি সালাম করলাম। তিনি সালামের জবাবদান প্রসঙ্গে বললেন, ‘ খোশ আমদেদ! হে নেক পুত্র, হে সত্য নবী! এর পর আমরা দ্বিতীয় আকাশে পৌঁছলাম এবং প্রথম আকাশের ন্যায় সওয়াল -জওয়াবের পর দরজা খুলে দেওয়া হলো।
আমরা ভেতরে গেলাম হযরত ইয়াহইয়া ও হযরত ঈসা(আ:)- এর সঙ্গে সাক্ষাত হলো। জিবরাঈল তাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন
, ‘খোশ আমদেদ, হে নেক ভ্রাতা, হে সত্য নবী! অত:পর আমরা তৃতীয় আকাশে পৌঁছলাম। এখানে হযরত ইউসুফ (আ:) এর সঙ্গে দেখা হলো। আগের মতই তার সঙ্গে সালাম কালাম হলো। অনুরুপভাবে চতুর্থ আকাশে হযরত ইদরীস (আ:) এর সঙ্গে, পঞ্চম আকাশে হযরত হারুন (আ:) এর সঙ্গে এবং ষষ্ঠ আকাশে হযরত মূসা(আ:) এর সঙ্গে সাক্ষাত হলো। সর্বশেষ সপ্তম আকাশে হযরত ইবরাহীম (আ:) এর সঙ্গে সাক্ষাত হলো এবং তিনিও সালামের জবাব দান প্রসঙ্গে বললেন,‘খোশ আমদেদ! হে নেক পুত্র,হে নেক নবী! এরপর আমাকে সিদরাতুল মুনতাহানামক একটি সমুন্নত বরই গাছ পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেয়া হলো। এর ওপর অগনিত ফেরেশতা জোনাকির মতো ঝিকমিক করছিল।

এখানে হযরত (সা:) অনেক গোপন রহস্য প্রত্যক্ষ করলেন। তিনি আল্লাহ তাআলার সঙ্গেও কথাবার্তা বললেনএ সময় আল্লাহ তাআলা তার উম্মতের জন্যে মোট পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ ফরয করে দিলেন। এ সব প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার পর তিনি যখন প্রত্যাবর্তন করছিলেন, তখন আবার হযরত মূসা(আ)এর সঙ্গে সাক্ষাত হলো। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃবলুন খোদার দরবার থেকে কি উপহার নিয়ে যাচ্ছেন?’ হযরত (সা:) বললেন, ‘দিন-রাত পঞ্চাশ ওয়াক্ত
নামাজ
?’ মূসা(আ:) বললেন, ‘আপনার উম্মত এত বড় বোঝা বহন করতে পারবে না; কাজেই আপনি ফিরে যান এবং এটা কম করে আনুন।হযরত (সা:) আবার ফিরে গেলেন এবং নামাজের ওয়াক্ত কমানোর জন্যে আবেদন জানালেন। ফলে ওয়াক্তের সংখ্যা কিছুটা কমিয়ে দেয়া হলো।কিন্তু মূসা(আ:) হযরত (সা:) কে বারবার পাঠালেন এবং প্রত্যেক বারই সংখ্যা কমতে লাগলো।
অবশেষে কমতে কমতে সংখ্যা মাত্র পাঁচটি রয়ে গেল। এতেও হযরত মূসা(আ:) নিশ্চিত হলেন না
, বরং তিনি আরো কম করানোর কথা বললেন। কিন্তু হযরত (সা:) বললেন:আমার আর কিছু বলতে লজ্জা করছে।এ সময় আল্লাহ তাআলার তরফ থেকে এই মর্মে ঘোষণা এলো:যদিও আমি নামাজের সংখ্যা পঞ্চাশ থেকে পাঁচ করে দিয়েছিম তবুও তোমার উম্মতের মধ্যে যারা নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করবে, তাদেরকে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজেরই পুরস্কার দান করা হবে।

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ছাড়া এই উপলক্ষে আল্লাহর নিকট থেকে আরও দুটি উপহার পাওয়া গেল। একটি হচ্ছে সূরা বাকারার শেষ আয়াত সমষ্টি, যাতে ইসলামের মৌল আকিদাগুলো এবং ঈমানের পূর্ণতার বিষয় বিবৃত করার পর এই মর্মে সুসংবাদ দেয়া হয়েছে যে, মুসিবতের দিন এখন সমাপ্ত প্রায়। দ্বিতীয় হচ্ছে এই সুসংবাদ যে, উম্মতে মুহাম্মদীর যারা অন্তত শিরক থেকে বেঁচে থাকবে, তারা ক্ষমাপ্রাপ্ত হবে।এই ভ্রমণকালে হযরত (সা:) স্বচক্ষে বেহেশত এবং দোযখও পরিদর্শন করেন। মৃত্যুর পর আপন কৃত কর্মের দৃষ্টিতে মানুষকে যে সমস্ত পর্যায় অতিক্রম করতে হয়, তার কয়েকটি দৃশ্যও তার সামনে উপস্থাপন করা হয়।

মহাকাশ থেকে প্রত্যাবর্তনের পর তিনি আবার বায়তুল মুকাদ্দাস গিয়ে দেখেন যে, অন্যান্য নবীগণ সেখানে সমবেত হয়েছেন।
তিনি নামাজ পড়লেন এবং সবাই তার পেছনে নামাজ আদায় করলেন। এরপর তিনি নিজের জায়গায় ফিরে আসেন এবং ভোর বেলা সেখান থেকে সজাগ হন।

 

মিরাজের গুরুত্ব ভবিষ্যতের জন্যে ইঙ্গিত

সকাল বেলা হযরত (স) মহাকাশ ভ্রমণের এই ঘটনার কথা জনসমক্ষে বিবৃত করলেন। বিরুদ্ধবাদী কাফের কুরাইশরা তাকে মিথ্যাবাদী (নাউযুবিল্লাহ) বলে অভিহিত করলো। পক্ষান্তরে যাদের হৃদয়ে তার সত্যতা ও সত্যবাদিতা সম্পর্কে আস্থা ছিল, তারা এর প্রতিটি হরফকেই সত্য বলে মেনে নিল। তারা বললোঃ হযরত যখন নিজেই এ ঘটনার কথা বলেছেন,তখন এর সবটাই সত্য।এভাবে মিরাজের ঘটনা একদিকে ছিল ঈমান ও নবুয়্যাত স্বীকারের পরীক্ষাস্বরুপ, অন্যদিকে ছিল খোদ হযরত (সা:) এর পক্ষে অসংখ্য গায়েবী রহস্য প্রত্যক্ষ করার উপায়। সেই সঙ্গে এ ছিল সেই অনাগত বিপ্লবের প্রতিও এক সুস্পষ্ট ইঙ্গিত যা ইসলামী আন্দোলনকে অনতিকালের মধ্যেই সংঘটিত করতে হয়েছিল। এই ইঙ্গিতের বিস্তৃত বিবরণ কুরআন পাকের সূরা বনী ইসরাঈলে (মিরাজ সম্পর্কিত আলোচনায়) বিবৃত হয়েছে। এই সূরার বিষয়বস্ততে যেসব সুস্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে, তা নিম্নরুপঃ

 

নেতৃত্ব থেকে ইহুদীদের অপসারণ

বনী ইসরাঈল গণ এই পর্যন্ত
আল্লাহর দ্বীনের উত্তরাধিকার আল্লাহর বাণীর সাথে বিশ্ববাসীকে পরিচিত করানোর মহান
দায়িত্বে অধিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু তারা এ খেদমত আঞ্জাম দেয়া তো দূরের কথা
, বরং নিজেরাই অসংখ্য প্রকার পাপাচারে
লিপ্ত হয়ে আল্লাহর দ্বীনের খেদমত করার অযোগ্য হয়ে পড়েছিল। সুতরাং এ খেদমতের
দায়িত্ব এবার বনী ইসমাঈলের ওপর ন্যস্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হলো এবং হযরত (সা:)- কে
এই খান্দানের মধ্যেই প্রেরণ করা হলো। ইতঃপূর্বে বনী ইসরাঈলকে সরাসরি উদ্দেশ্য করে
কিছু বলা হয় নি
; কিন্তু
এবার সূরা বনী ইসরাঈলে তাদের কে বলে দেয়া হলো যে
, এ পর্যন্ত তোমরা যা ভুলভ্রান্তি করেছো
তাতো করেছোই। এর আগে তোমাদেরকে দু
দুবার যাচাই করা হয়েছে; কিন্তু তোমরা আপন দোষ-ত্রুটি সংশোধন
করোনি। এবার বনী ইসমাঈলের এই নবীকে পাঠানোর পর তোমাদেরকে শেষ বারের মতো সুযোগ দেয়া
হচ্ছে। যদি তোমরা এর আনুগত্য করো
, আবার তোমরা উন্নতির পথে চলতে পারবে।

বস্তত মক্কার চরম উৎপীড়ন
ও পেরেশানীময় জীবনে এই ইঙ্গিত ছিল একটি মস্তবড় সুসংবাদ
, যা পরবর্তীকালে হুবহু সত্য প্রমাণিত
হয়েছিল।

 

মক্কার কাফিরদের প্রতি সতর্কবাণী

মক্কার কাফিরদের
জুলুম-পীড়ন এবং হঠকারিতা ইতোমধ্যে চরমে পৌঁছেছিল। তারা বারবার চ্যালেঞ্জ দিতে
লাগলোঃ
মুহাম্মদ
যদি আল্লাহর রাসূলই হবে তাহলে আমাদের অবিশ্বাসের কারণে আমাদের ওপর কেন আযাব নাযিল
হয় না
? তাহলে তো সে আমাদেরকে ভয়
দেখাতে পারতো।
এর
জবাবে তাদেরকে বলা হলোঃ
আল্লাহ
তাআলার শাশ্বত নীতি এই যে
, যতক্ষণ
পর্যন্ত না কোন জাতির মধ্যে আল্লাহর রাসূল আসেন
, ততক্ষণ তার ওপর কোন আযাব নাযিল হয় না।
যখন রাসূল আগমন করেন
, তখন
জাতির বিত্তবান ও প্রভাবশালী লোকেরা তার সত্য প্রচারের পথ রোধ করার জন্যে কোমর
বেঁধে লেগে যায়। অন্যদিকে সাধারণ ও নির্যাতিত লোকেরা তার সহযোগিতা করার জন্যে
এগিয়ে আসে। অবশ্য প্রথমোক্তদের মধ্যে সত্যকে গ্রহণ করার জন্যে যোগ্যতাসম্পন্ন কিছু
লোকও বর্তমান থাকে এবং তারা এগিয়ে এসে সত্যকে গ্রহণও করে। এরপর এই দুই দলের মধ্যে
দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষ শুরু হয়ে যায় এবং পরিণামে মজলুমের জন্যে আল্লাহর সাহায্য আসে।এই
সাহায্যের একটা নির্দিষ্ট সময় আছে। কিন্তু মানুষ স্বভাবতই তাড়াহুড়া প্রবণ বলে কখনো
কখনো সে অকল্যাণকর জিনিসকেও ভালো মনে করে দাবি করতে থাকে। তার এটা খেয়ালই হয় না যে
,আল্লাহ তাআলার প্রত্যেকটি কাজই তার
নিজস্ব সময়ের জন্য নির্ধারিত। দিন-রাতের আবর্তনের বিষয়টির প্রতিই লক্ষ করো:এর ভেতর
আল্লাহ তাআলার কতবড় নিদর্শন রয়েছে এবং একটি বাঁধা-ধরা নিয়ম অনুযায়ী কিরুপ একের পর
এক দিন-রাত ঘুরে আসছে। অতীত ইতিহাস লক্ষ করে দেখঃ নূহ(আ:) এর পর থেকে এ পর্যন্ত কত
জাতিকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে।বস্তত আল্লাহ তার বান্দাদের অবস্থা পুরাপুরি অবগত
রয়েছেন।তিনি প্রত্যেকের কৃত কর্ম অনুযায়ী প্রতিফল দিয়ে থাকেন। সুতরাং মক্কার
কাফিরদেরও জানা উচিত যে
, তারা
প্রথম আল্লাহর রাসূলের দাওয়াতের মুকাবেলায় যে ভূমিকা গ্রহণ করবে
, তার পরিপ্রেক্ষিতেই তাদের সঙ্গে
ব্যবহার করা হবে। আর চূড়ান্ত ফয়সালার সময় এখন খুবই নিকটবর্তী।

 

ইসলামী সমাজের বুনিয়াদ

এবার মুসলমানদের জীবন
থেকে দুঃখ-রজনীর অবসান ঘটায় এবং ইসলামী নীতির ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গ একটি সমাজ গঠিত
হবার সময় ঘনিয়ে এলো। মি
রাজের
ঘটনা থেকে এই ইসলামী সমাজের বুনিয়াদী নীতিসমূহও উপহার পাওয়া গেল। যে নীতিসমূহ
ভবিষ্যতে ইসলামী জীবন পদ্ধতির জন্যে নির্দেশক নীতিমালা হিসেবে কাজ করবে
, তার সংক্ষিপ্ত সার হচ্ছে:

১.আল্লাহর সাথে আর কাউকে
প্রভু ও মাবুদ বানানো যাবেনা। ইবাদত-বন্দেগী
, আনুগত্য ও আজ্ঞানুবর্তিতাও তার সাথে
কাউকে শরীক করা চলবে না।

২.পিতামাতা কে সম্মান এবং
তাদের আনুগত্য করে চলতে হবে। কোথাও তাদের আনুগত্য খোদার আনুগত্যের প্রতিকূল হলে
সেখানে তাদের আনুগত্য বর্জন করতে হবে।

৩.আত্মীয়-কুটুম্ব,মিসকীন ও মুসাফিরদের হক আদায় করতে
হবে। সমাজের নাগরিকদের পরস্পরের ওপর যে অধিকার রয়েছে
, তার প্রতি উপেক্ষা বা ঔদাসিন্য দেখানো
যাবে না। সমস্ত অধিকার সঠিক ভাবে আদায় করতে হবে। নচেত কোন সামাজিক ব্যবস্থা
শোধরানো যেতে পারে না।

৪. অপব্যয় ও অপচয় করা
যাবে না
;কেননা
খোদার দেয়া সম্পদকে অনর্থক ব্যয় করা শয়তানের কাজ যে সমাজের লোকেরা নির্বিচারে অর্থ
ব্যয় করে অর্থের মায়ায় সম্পূর্ণরুপে হাত গুটিয়ে বসে
,তা কখনো সুস্থ বা সমৃদ্ধ হতে পারে না।
অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে মধ্যম পন্থা অবলম্বন করতে হবে।

৫.দারিদ্র্য ও অনটনের ভয়ে
সন্তান হত্যা করো না
; কেননা
জীবিকার ব্যবস্থা করা খোদার কাজ এবং তিনি তার ইন্তেজাম করেই থাকেন। কাজেই
খাদ্যাভাবের আশংকায় ভবিষ্যত বংশধর ধ্বংস করো না। এটা অত্যন্ত গুনাহর কাজ এবং
সামাজিক আত্মহত্যার নামান্তর।

৬.ব্যভিচারের নিকটবর্তী
হয়ো না
এই নোংরা কাজটি থেকে শুধু বেঁচে থাকাই
নয়
, বরং এই ঘৃন্য কাজে
উৎসাহজনক প্রত্যেকটি তৎপরতায় খতম করে দাও। যে সমাজ এই লা
নত থেকে মুক্ত না হবে, সে নিজেই নিজের মূলোচ্ছেদ করবে এবং
শীগগীরই ধ্বংসের মুখে নিক্ষিপ্ত হবে।

৭.অন্যায় ভাবে কাউকে
হত্যা করো না। যে সমাজে লোকদের জীবন-প্রাণ নিরাপদ নয়
, তা কখনো সমৃদ্ধ হতে পারে না।
শান্তিপূর্ণ অবস্থা ছাড়া কোন সমাজেরই উন্নতি লাভ করা সম্ভব নয়। কাজেই সর্বপ্রথম
জান-মালের নিরাপত্তা বিধান করা আবশ্যক।

৮.ইয়াতিমের সঙ্গে
সদ্ব্যবহার করো। অক্ষম
, দুর্বল, অসহায় লোকদের সাহায্য করো। যে সমাজে
দুর্বল ও অক্ষম লোকদের অধিকার সংরক্ষণ না করা হবে
, তা কখনো প্রগতি অর্জন করতে পারবে না।

৯.আপন অঙ্গিকার পূর্ণ
করো। কারণ অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। অঙ্গীকার বলতে লোকদের পারস্পরিক
চুক্তি ও প্রতিশ্রুতি যেমন বুঝায়
, তেমনি ঈমান আনার সময় খোদার সাথে মুমিন বান্দাহর কৃত ওয়াদাকে
বুঝায়।

১০. ওজন ও মাপ-জোখের সময়
দাঁড়িপাল্লা ও মাপকাঠি ঠিক রেখো। লেন-দেনের ব্যাপারে সততা ও ন্যায়পরায়ণতা বজায়
রাখা এবং পরের অধিকার সংরক্ষণ করা সমাজের শান্তি ও শৃঙ্খলার জন্যে অতীব
প্রয়োজন।যেখানে লোকদের পরস্পরের প্রতি আস্থা না থাকবে এবং সাধারণভাবে লোকেরা পরের
হক মেরে খাবার ফিকিরে থাকবে
, সেখানে কোন সুস্থ সামাজিক পরিবেশ গড়ে উঠতে পারে না।

১১.যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান
নেই
, তার পিছনে ছু্‌টো না।
অজানা ও অজ্ঞাত বিষয়ের পেছনে ছুটা এবং আন্দাজ অনুমানের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের
ফলেই লোকদের পারস্পরিক অবনতি ঘটে। কাজেই এই সব দোষ-ত্রুটি থেকে প্রত্যেকটি উত্তম
সমাজেরই মুক্ত হওয়া উচিত। লোকদের জেনে রাখা দরকার যে
,তাদের কান, চোখ এবং মন সম্পকেই সবচেয়ে বেশি
জিজ্ঞাসা করা হবে।

১২.জমিনের ওপর অহংকারের
সাথে চলো না
; কেননা
গর্ব ও অহংকার মানুষকে নিকৃষ্ট চরিত্রের দিকে ঠেলে দেয়।এই দোষের ফলেই মানুষ সমাজের
পক্ষে অনিষ্ঠের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কাজেই নিজের মুকাবেলায় অন্য কাউকে হেয় মনে না করা
এবং কারো সঙ্গে অমানুষিক আচরণ না করা পারস্পরিক সম্পর্কের সুস্থতা বিধানের জন্যে
একান্ত অপরিহার্য।

 

হিজরতের জন্য ইঙ্গিত

আল্লাহ তাআলা যখন কোন
জাতির মধ্যে তার রাসূল প্রেরণ করেন
, তখন সেই জাতির লোকেরা যাতে সেই
রাসূলের দাওয়াত শুনতে
,বুঝতে
এবং গ্রহণ করতে পারে
, তজ্জন্যে
তিনি কিছুকাল সুযোগ প্রদান করেন। এই সুযোগের ফলে কিছু লোক তো আপনাতেই সেই দাওয়াত
কবুল করে নেয়।
, কিন্তু
বেশির ভাগ লোকই পার্থিব স্বার্থ
, বাপ-দাদার অন্ধ অনুসৃতি ও প্রবৃত্তির গোলামীতে লিপ্ত থাকে
বলে সেই দাওয়াত কে বর্জন করে এবং তার বিরোধিতায় কোমর বেঁধে লেগে যায়। অবশেষে এমন
এক সময় আসে
, যখন
স্পষ্টতই বোঝা যায় যে
, জাতির
মধ্যেকার যোগ্য লোকেরা আন্দোলনকে কবুল করে নিয়েছে
; এখন আর এ আন্দোলনের প্রতি কর্ণপাত
করতে এ সম্পর্কে ভাবনা-চিন্তা করতে আগ্রহী কোন লোক বাকী নেই।

বস্তত এমনই পর্যায়ে এসেই
জাতির লোকেরা নবীর কাছে মু
জিযা
দাবি করে বসে এবং প্রায়শই সে জাতির সামনে মু
জিযা উপস্থাপন করা হয়। তাই এ পর্যায়ে এসে হযরত(সা:)
এর কাছেও মু
জিযা
দাবি করা হলো এবং তিনি বিভিন্ন রূপ মু
জিযা প্রদর্শনও করলেন। কিন্তু এতৎসত্ত্বেও যখন
অবিশ্বাসীরা তাদের অবিশ্বাসের ওপর অটল হয়ে রইলো
, তখন স্থির করা হলো যে, এখন এ জাতির মধ্যে থেকে এ নবীর চলে
যাওয়াই উচিত। কেননা এখন যেকোন মুহূর্তে এদের ওপর আযাব আসতে পারে। এই আযাব কখনো
আসমান বা জমিনের কোন প্রাকৃতিক শক্তির মাধ্যমে আসে আবার তা কখনো মুমিনের দ্বারাও
সংঘটিত হয়। তাই আল্লাহ তাআলা এই সূরা বনী ঈসরাইলেই তার এ নিয়মের কথা উল্লেখ করে
নবীকে সুস্পষ্ট ভাষাই বলেন যে
,‘এই লোকগুলো হঠকারিতার চরমে পৌঁছে খুব শিগগিরই তোমাকে এই
জনপদ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করবে।যদি তা-ই হয়
, তাহলে তোমার বিদায়ের পর এরা এখানে
নিশ্চিত থাকতে পারবে না। তোমার পূর্বে আমি যতো রাসূল পাঠিয়েছি
, সবার ক্ষেত্রেই এ নিয়ম চলে এসেছে। আর
এখনো এতে কোন পরিবর্তন সূচিত হবে না।

 

তাহাজ্জদ নামাজের গুরুত্ব

এই সঙ্গে উদ্ভূত
পরিস্থিতি মুকাবেলায় আত্মিক প্রস্ততি গ্রহণের জন্যে ফরয নামাজ ফরজ নামাজ ছাড়াও
তাহাজ্জদ নামাজের আয়োজন করার নির্দেশ দেয়া হলো। এ ছাড়াও হিজরতের জন্যে নবীকে
নিম্নোক্ত দো

শিখিয়ে দেয়া হলোঃ
হে
প্রভু আমাকে ভালো জায়গা চিনে নেবার তওফীক দিও এবং এখান থেকে সহি-সালামতে বের করে
নিও আর নিজের তরফ থেকে সাহায্য পাঠিয়ে দুশমনদের ওপর বিজয় দান করো।
অতঃপর এই সুসংবাদও প্রদান করা হলো যে, সত্যের বিজয় এবং মিথ্যার পতন
অবশ্যম্ভাবী
; কারণ
পতনের জন্যেই মিথ্যার উত্থান। এর জন্যে শুধু শর্ত এই যে
, সত্যকে ময়দানে উপস্থিত থাকতে হবে।

এরপর হঠকারিতার বশবর্তী
হয়ে মক্কার কাফিররা যে সব প্রশ্ন ও আপত্তি উত্থাপন করেছিল
, তারও জবাব দেয়া হলো। এভাবে
যুক্তি-প্রমাণ কানায় কানায় পূর্ণ করে দেয়ার পর শিক্ষণীয় বিষয়ে হিসেবে হযরত
মূসা(আ:)- এর ঘটনাবলীর উল্লেখ করা হলো।

 

এ যুগের আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য

এ পর্যায়ে কুরআনের যেসব
অংশ নাযিল হচ্ছিলো
, সমকালীন
অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তার কয়েকটি বৈশিষ্ট্য নিম্নরূপঃ

১. আল্লাহর ওপর নির্ভরতা

মানুষের প্রকৃতি এই যে, যখন সে কোনো কাজের জন্যে চেষ্টা-সাধনা
করে এবং তার আশানুরূপ ফলাফল লাভে ব্যর্থ হয়
, তখন তার ওপর একটা নৈরাশ্যের অন্ধকার
নেমে আসতে থাকে। সত্যের আন্দোলনের নিশানবাহীদের জন্যে এই পর্যায়টিই সবচেয়ে বেশি
কঠিন হয়ে থাকে। খোদা না করুন
,তারা যদি এরূপ নৈরাশ্যের শিকারে পরিণত হয়,তাহলে তাদের এবং গোটা আন্দোলোনের
পক্ষে তা এক বিরাট ব্যর্থতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কাজেই এমনই পর্যায়ে সঠিক পথে থাকা
এবং ফলাফলকে সম্পূর্ণ খোদার ওপর ছেড়ে দিয়ে নিরবিচ্ছিন্ন সংগ্রাম চালিয়ে যাবার জন্য
অত্যন্ত মজবুত ঈমানের প্রয়োজন। তাই এই কঠিন পর্যায়ে আল্লাহ তাআলা বিশেষভাবে এ
সম্বন্ধেই পথনির্দেশ নাযিল করেন। দীর্ঘ বারো বছরের নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টা সাধনার যে
ফলাফল সামনে ছিল
, তা
একজন সাধারণ লোকের পক্ষে ছিল নিরুৎসাহ ব্যঞ্জক। তাছাড়া এত দীর্ঘদিন পরেও মুমিনদের
যে সব উৎপীড়নের সম্মুখীন হতে হচ্ছিল
, তাও নেহাত কম তিতিক্ষার ছিল না। এ
জন্যে মুমিনদের হৃদয় কে মজবুত করা এবং তাদেরকে সঠিক পথে চালিত করার জন্যে এ
পর্যায়ে বিশেষভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলো।

এ ব্যাপারে সূরা
আনকাবুতের প্রতিপাদ্য বিষয় একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত। এতে মুমিনদের সুস্পষ্ট ভাষায়
বলে দেওয়া হলো যে
, তোমরা
যে পথে চলবার সিদ্ধান্ত নিয়েছো
, যাচাই-পরীক্ষা হচ্ছে সে পথের অপরিহার্য মঞ্জিল। এই নিরিখ
দ্বারা যাচাই করেই ঈমানের প্রশ্নে সত্যবাদী আর মিথ্যাবাদীদের মধ্যে পার্থক্য
নির্ণয় করা হয়। কিন্তু মুমিনদের এই যাচাই-পরীক্ষা করার অর্থ এই নয় যে
, কাফিররা প্রকৃতপক্ষে প্রাধান্য লাভ
করেছে
, বরং তাদেরও জেনে নেয়া
উচিত যে
, খোদার
মুকাবেলায় তারা কখনোই বিজয়ের গৌরবে গৌরবান্বিত হতে পারবে না। শেষ পর্যন্ত সত্যের
আওয়াজ বুলন্দ হবেই। এ জন্যে শুধু শর্ত এই যে
, সত্যের অগ্রসেনাদেরকে ধৈর্য ও
সহিঞ্চুতার দ্বারা আল্লাহর সাহায্যের যোগ্য প্রতিপন্ন হতে হবে। এ প্রসঙ্গে
মুমিনদেরকে আরো বলা হলো:এ পথে তো স্বভাবতই বাধা-বিপত্তি ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা এসে
থাকে
,কিন্তু তাদের কিছুতেই
নিরাশ হওয়া উচিত নয়। এর আগেও আল্লাহর যে সমস্ত বান্দাহ ইসলামের আওয়াজ বুলন্দ
করেছেন
, তাদেরকেও এমনি অবস্থাই
অতিক্রম করতে হয়েছে। হযরত নূহ (আ:)-এর কথা উল্লেখ করে বলা হলো যে
, তিনি দীর্ঘ সাড়ে নশ বছর পর্যন্ত কতো ধৈর্য ও সহিঞ্চুতার
সাথে আপন জাতির বিরোধিতা সহ্য করেছেন। অনুরূপভাবে হযরত ইবরাহীম (আ:)
, হযরত লূত(আ:), হযরত শুআইব(আ:), হযরত সালেহ(আ:) প্রমুখকেও এমনি
পরিস্থিতিরই মুকাবেলা করতে হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সত্যেরই বিজয় হয়েছে এবং
মিথ্যাকে ময়দান ছেড়ে পালাতে হয়েছে।

এর আগে বলা হয়েছে যে, কাফিরদের মুজিযা দাবির ফলো হযরত(সা:)
এবং অন্যান্য মুমিনদের হৃদয়ে কখনো কখনো এই মর্মে আগ্রহ জাগতোঃ হায়! এমন কোন মুজিযা
যদি প্রকাশ পেত
, যা
দেখে এই লোকগুলো ঈমান আনতো।এই আগ্রহের জবাবে আল্লাহ তাআলা যে পথনির্দেশ পাঠিয়েছেন
, তাও ইতঃপূর্বে আলোচিত হয়েছে। এই
উপলক্ষে আল্লাহ তাআলা তার সর্বশেষ নবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মু
জিযার প্রতি লোকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে
বলেন
, তোমরা তো মুজিযা দাবি
করছো
; কিন্তু তার পূর্বে যে
মুজিযা দুনিয়ার শেষ পর্যন্ত মানব জাতির জন্যে এক স্থায়ী নিদর্শন রূপে বিরাজ করবে
এবং যাতে রয়েছে প্রতিটি জ্ঞানী ও সমঝধার মানুষের জন্যে নির্ভুল পথনির্দেশ
,সেই কুরআন মজীদের ওপর সর্বপ্রথম
তোমাদের দৃষ্টি নিক্ষেপ করা উচিত।

এই পর্যায়ে অবতীর্ণ সূরা
আনকাবুতে বলা হয়েছেঃ
নবুয়্যাতের
আগে হযরত(সা:) যে কোন প্রকার পুথিগত জ্ঞান অর্জন করেন নি এবং কোনরুপ লেখাপড়া
পর্যন্ত শেখেন নি
, তা ঐ
বিরুদ্ধবাদীদের মধ্যে কে না জানে। কিন্তু তা সত্ত্বেও তার পেশকৃত কালাম এত উন্নত
এবং জ্ঞানগর্ভ যে একজন উম্মী লোক যে এমন অপূর্ব কালাম পেশ করতে পারে
, তাদের বড়ো বড়ো আলেমরা পর্যন্ত তার কোন
দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে না। এতৎসত্ত্বেও এই লোকগুলো অবিরত মু
জিযা দাবি করে চলেছে। এদেরকে বলে দিন,মুজিযা প্রকাশ পাওয়া বা না পাওয়া তো
আমার প্রভুর ইচ্ছাধীন বিষয়। আমি শুধু তোমাদের পরিণতি সম্পর্কে ভয় প্রদর্শনকারী
মাত্র। অবশ্য আমি তোমাদেরকে যে আল্লাহর বাণী শুনাই
,তা আমার নবুয়্যাতের দাবি প্রমাণের
জন্যে যথেষ্ঠ কিনা তা তোমাদের একটু ভেবে দেখা দরকার। তোমরা একটু গভীরভাবে চিন্তা
করলেই বুঝতে পারবে যে
, যে সব
লোকের ভেতর হৃদয়কে ঈমানের সম্পদে সমৃদ্ধ করার মতো প্রয়োজনীয় যোগ্যতা রয়েছে
, এ বাণীসমূহ কেবল তাদেরই জন্যে রহমত ও
নসিহত স্বরুপ।

২. কুরআন শ্রেষ্ঠ মুজিযা

বসত হযরত(সা:)- কে যতো মুজিযাই দান করা হয়েছে তন্মধ্যে করআন
নিসন্দেহ শ্রেষ্ঠ মু
জিযা।

হযরত(সা:)- নিজেও কুরআন
পাককে তার সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ মু
জিযা বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেনঃ প্রত্যেক পয়গম্বরকেই আল্লাহ তাআলা
প্রচুর মু
জিযা
দান করেছেন তা দেখেই লোকেরা ঈমান এনেছে। কিন্তু আমাকে যে মু
জিযা দান করা হয়েছে, তা হচ্ছে আমার প্রতি অবতীর্ণ
ওহী(কুরআন) এজন্যে আমি প্রত্যাশা করি
, কিয়ামতের দিন আমার অনুগতের সংখ্যাই
সবচেয়ে বেশি হবে। বস্তত কুরআন হচ্ছে এক স্থায়ী মু
জিযা এবং অন্যান্য মুজিযা হচ্ছে
সাময়িক। সেসব মু
জিযা
বিলীন হয়ে গেছে
; কিন্তু
এ মু
জিযা কিয়ামত পর্যন্ত
অক্ষয় হয়ে থাকবে এবং লোকদেরকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করতে থাকবে। কুরআন পাকের ছন্দোময়
ভাষা
,এর মাধুর্য ও লালিত্য এতে
মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি বহির্ভত অদৃশ্য খবরাখবর ও ভবিষ্যত বাণীর উল্লেখ
,এর অপূর্ব প্রভাব বিস্তারকারী ক্ষমতা, এর বিধি-বিধান ও শিক্ষাসমূহের অতুলনীয়
কল্যাণকর ভূমিকা
,আজ
পর্যন্ত কুরআন উপস্থাপিত জীবন পদ্ধতির মতো কার্যকর আর কোন জীবন পদ্ধতি উদ্ভাবনে
মানব সমাজের ব্যর্থতা
, এর
বিষয়বস্ত বৈচিত্র্য ও ব্যাপকতা সত্ত্বেও সকল প্রকার অসংগতি ও বৈপরিত্য থেকে তার
মুক্ত থাকা
,সর্বোপরি
এক নিরক্ষর ব্যক্তির জবান থেকে এইসব বাণী নিসৃত হওয়া
এসব কিছুই কুরআন পাকের মুজিযা হবার জন্যে অকাট্য প্রমাণ। এই
সমস্ত দলিল প্রমাণের ভিত্তিতে আজো হযরত মুহাম্মদ (সা:)-এর নবয়্যাত সম্পর্কে
মানুষের মন পুরোপরি নিশ্চিন্ত ও নিঃসন্দেহ হতে পারে এবং তা হয়েও থাকে।

৩. চূড়ান্ত কথা

এ পর্যায়ে অবতীর্ণ
কালামের আর একটি বৈশিষ্ট্য এই যে
, এবার থেকে কাফিরদের সাথে অত্যন্ত সস্পষ্ট ও চূড়ান্ত ভাবে
কথা বলা শুরু হলো। এর ধরণটা ছিলো এই যে
, এবার বুঝানো এবং বাতলানোর পর্যায় শেষ
হয়ে গেছে। মানবার যদি ইচ্ছা থাকে তো এখনো সময় আছে
, মেনে নাও। নচেত অবিশ্বাস ও হঠকারিতার
পরিণাম ভোগ করার জন্যে তৈরি হও।

তাই হযরত(সা:)- তাদেরকে
সস্পষ্টত বলে দিলেন: আমি আমার প্রভুর তরফ থেকে অবতীর্ণ একটি উজ্জ্বল প্রমাণের ওপর
দাঁড়িয়ে আছি। আর তোমরা তাকে এই বলে অস্বীকার করছো যে
, এই অবিশ্বাসের ফলে যে আযাব আসার তা
আসুক। কিন্তু তোমাদেরকে আমি জানিয়ে দিচ্ছি
, যে বস্তুটির জন্যে তোমরা তাড়াহুড়ো
করছো
, তা আমার হাতে নেই। এ
সম্পর্কিত ফয়সলা সম্পূর্ণ খোদার হাতে। এটা যদি আমার এখতিয়ারের বিষয় হতো
, তাহলে কবে এর মিমাংসা হয়ে যেত!
গায়েবের খবর তো শুধু আল্লাহ তাআলাই জানেন। কোন কাজের জন্যে কোন সময় উপযুক্ত
, তা তিনিই ভালো বুঝেন। তিনি যখন ইচ্ছা
তখন তোমাদের ওপর আযাব নাযিল করতে পারেন। এ আরো কিছুটা অগ্রসর হয়ে নির্দেশ করা হলোঃ
যে সব লোক দ্বীনের
ব্যাপারটিকে একটি খেল তামাসা মনে করে নিয়েছে এবং দুনিয়ার জীবনেই মোহগ্রস্থ হয়ে আছে
, তাদেরকে নিজস্ব অবস্থার ওপরই ছেড়ে
দাও। অবশ্য তাদেরকে যথারীতি কুরআন শুনাতে থাকো। এরপরও যদি তারা সত্যকে মেনে নিতে
রাজি না হয়
, তাহলে
তাদেরকে বলে দাওঃ লোক সকল! তোমরা যা করতে চাও তা নিজের জায়গায় করতে থাকো আর আমিও
আমার জায়গায় কাজ করতে থাকি। এর পরিণামে কে সঠিক পথে আছে
, তা শিগগিরই তোমরা জানতে পারবে।

এই ধরনের কালামের এ একটি
দৃষ্টান্ত মাত্র। এ ছাড়াও এই পর্যায়ে ওহীতে এ ধরণটি অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত
হয়ে ওঠে এবং প্রায় দ্ব্যর্থহীন ভাবে ঘোষণা করা হয় যে
, এবার বিষয়টি সম্পর্কে চূড়ান্ত
সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রত্যাসন্ন হয়ে উঠেছে।

৪. হিজরতের প্রস্তুতি

এতৎভিন্ন এ পর্যায়ের
কালামে হিজরতের জন্যেও বারবার ইশারা আসতে লাগলো। এই সূরা আনকাবুতেই নির্দেশ করা
হলোঃ
হে আমার বান্দাহ গণ!তোমরা
শুধু আমারই বন্দেগী করতে থাকো। আমার বন্দেগীর কারণে যদি স্বদেশের জমিন তোমাদের
জন্যে সংকীর্ণ হয়ে যায়
, তাহলে
সে জন্যে কোন পরোয়া করো না। আমার জমিন অত্যন্ত প্রসস্ত
; এজন্য যদি ঘরবাড়িও ও ছেড়ে দিতে হয় দাও, কিন্তু আমার বন্দেগীর সম্পর্ক ছিন্ন
করো না।কোন জানদারের পক্ষে সবচেয়ে বড় ভয় যা হতে পারে
, তাহলো মৃত্যুভয়। নিশ্চয় জেনে রেখ, প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ
করতে হবে এবং তার পর সবাইকে আবার আমার কাছেই ফিরে আসতে হবে। কাজেই সেই মৃত্যু যদি
আমার পথেই আসে
, তাহলে
আর চিন্তা কিসের
? যে কেউ
ঈমান ও সৎকর্মের পুঁজি নিয়ে আসবে
, তাকে এমন আরামদায়ক বাগিচায় স্থান দেয়া হবে, যার নিম্নদেশ দিয়ে ঝর্ণাধারা
প্রবাহিত। সেখানে চিরকাল সে অবস্থান করবে। যারা ঈমানদার ও সৎকর্মশীল
, যারা কঠিন থেকে কঠিনতর পরিস্থিতিতেও
আল্লাহর দ্বীনের পথে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকে এবং যারা নিজেদের প্রতিটি ক্রিয়াকর্মে
শুধু আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ওপরই ভরসা রাখে
, তাদের জন্যে এ কত উত্তম বিনিময়!এরপর
বলা হলো যে
, আল্লাহর
পথে ঘর-বাড়ি ছাড়বার দ্বিতীয় ভয় হচ্ছে আর্থিক দুর্গতি। এ সম্পর্কে তাদের এই
প্রত্যয়কে আরো মজবুত করা হলো যে
, প্রকৃতপক্ষে রিযিক দেবার ক্ষমতা সম্পূর্ণ আল্লাহর হাতে
নিবদ্ধ।দুনিয়ায় বিচরণশীল কত প্রাণী রয়েছে
; তাদের কেউই আপন রিযিক সঙ্গে নিয়ে
বেড়ায় না। কিন্তু তা সত্ত্বেও আল্লাহ তাদের রিযিক যুগিয়ে থাকেন। কাজেই রিযিক দাতা
হিসেবে তার ক্ষমতা সম্পর্কে তোমরা কেন নিরাশ হও এবং তিনি তোমাদের রিযিকের ব্যবস্থা
করবেন না বলে কেন ভয় পাও
?এছাড়া
এ পর্যায়ের অপর সূরা বনী ইসরাঈলে হিজরতের জন্যে দু
আ ও শিক্ষাদান করা হলো। বলা হলোঃ দুআ প্রার্থনা করোঃ প্রভু হে! আমায় উত্তম জায়গায় পৌঁছিয়ে
দাও
, মক্কা থেকে ভালভাবে বের
করে নাও এবং শত্রুর ওপর বিজয় ও সাহায্য দান করো।
আর হে নবী!ঘোষণা করে দাওঃ সত্য এসে
পড়েছে এবং মিথ্যা অপসৃত হয়েছে। মিথ্যাকে অপসৃত হতেই হয়েছে।
মোটকথা, এ পর্যায়ের কালামে এগুলো ছাড়াও এ ধরনের
আরো বহুতর ইঙ্গিত রয়েছে। এতে একদিকে যেমন সেই প্রত্যাসন্ন বিপ্লবের দিকে ইঙ্গিত
করা হচ্ছিল
, অন্যদিকে
তেমনি এরূপ পরিস্থিতির মুকাবেলায় যে প্রস্তুতির দরকার
, তার প্রতিও বারবার দৃষ্টি আকর্ষণ করা
হচ্ছিল। আখিরাতের প্রতি দৃঢ় প্রত্যয় স্থাপন করা
, অন্তর থেকে পার্থিব সম্পদের বাসনা
মুছে ফেলা
, খালেস
তওহীদ এবং তার দাবিগুলোকে মনের ভেতর বদ্ধমূল করে নেয়া
, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো অবলম্বনকে মনের
মধ্যে স্থান না দেয়া
, কেবল
তারই সত্ত্বার ওপর পুরোপুরি ভরসা করা
, তার কাছ থেকে প্রাপ্ত নির্দেশাবলীকে
কিছুমাত্র হ্রাস-বৃদ্ধি না করে যথারীতি পেশ করতে থাকা এবং এসব কাজের জন্যে
প্রয়োজনীয় শক্তি অর্জনের নিমিত্ত নামাজ কায়েম করা ও তার প্রতি পুরোপুরি মনোযোগ
দেয়া ইত্যাকার উপায়-উপকরণের মাধ্যমে মুসলমানদের কে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছিল। সেই
সঙ্গে এই কঠিনতর পরিস্থিতিতেও দ্বীনের প্রচার অব্যাহত রাখার জন্যে তাদেরকে
প্রয়োজনীয় নির্দেশ প্রদান করা হচ্ছিল।

 


৭. হিজরত

হিজরত শব্দের সাধারণ অর্থ হচ্ছে
পরিত্যাগ কিংবা পরিবর্জন। কিন্তু ইসলামী পরিভাষায় হিজরত বলতে বুঝায়: দ্বীন ইসলামের
খাতিরে নিজের দেশ ছেড়ে এমন স্থানে গমন করা যেখানে প্রয়োজন সমূহ পূর্ণ হতে পারে।
কারণ ইসলামী জীবন যাপন করার এবং আল্লাহর দ্বীনের দিকে আহ্বান জানানোর আজাদী যে
দেশে নেই
, সে দেশকে শুধু আয়-উপার্জন,ঘর-বাড়ি,ধন-সম্পত্তি কিংবা আত্মীয়-স্বজনের
খাতিরে আঁকড়ে থাকা মুসলমানদের পক্ষে আদৌ জায়েয নয়।

প্রসঙ্গত একটি কথা জেনে
রাখা দরকার যে
,আল্লাহর
দ্বীনের প্রতি ঈমান পোষণকারীর পক্ষে কোনো কুফরী রাষ্ট্র ব্যবস্থার অধীনে জীবন যাপন
করা কেবল দুটি অবস্থায়ই সঙ্গত হতে পারে। একঃ সংশ্লিষ্ট দেশে ইসলামের কতৃত্ব
প্রতিষ্ঠা এবং কুফরী ব্যবস্থাকে ইসলামী ব্যবস্থায় রুপান্তরিত করার জন্যে সে
ক্রমাগত চেষ্টা-সাধনা করতে থাকবে
এ যাবত মক্কায় থেকে মুসলমানেরা যেরূপ
চেষ্টা-সাধনা করে আসছিল এবং সে জন্যে সর্বপ্রকার দুঃখ-মুসিবত সহ্য করেছিল।
দুই:সংশ্লিষ্ট দেশ থেকে তার বেরোবার কোন পথ যদি সত্যই না থাকে কিংবা ইসলামী ধারায়
জীবন যাপন ও ইসলামী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার নিমিত্ত চেষ্টা-সাধনা করার উপযোগী কোন
জায়গা যদি সে খুঁজে না পায়। কিন্তু দ্বীনের প্রয়োজন পূর্ণ হবার উপযোগী জায়গা যখনি
পাওয়া যাবে
এবার
মদিনা থেকে যেমন প্রত্যাশা করা গিয়েছিল
তখন অবশ্যই তাদের হিজরত করে সেখানে
চলে যেতে হবে। তবে এক্ষেত্রে যারা নিতান্তই অক্ষম ও পঙ্গু এবং যারা অসুস্থতা কিংবা
দারিদ্র্যের কারণে কোন প্রকারেই হিজরতের জন্যে সফর করতে সক্ষম নয়
, কেবল তারাই ক্ষমা পাবার যোগ্য।

 

মদিনায় সাধারণ মুসলমানদের হিজরত

মদিনায় ইতোমধ্যেই ইসলাম
বেশ কিছুটা প্রচারিত হয়েছিল। এই অবস্থায় মক্কায় যে সব মুসলমান কাফিরদের হাতে
উৎপীড়িত হচ্ছিল
, হযরত(সা:)
তাদেরকে মদিনায় হিজরত করার নির্দেশ দিলেন। এটা টের পেয়েই কাফিররা মুসলমানদেরকে
বিরত রাখার জন্যে জুলুমের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিল এবং যাতে মুঠো থেকে বেরিয়ে যেতে
না পারে
, সে
জন্যে সর্বোত ভাবে চেষ্টা করতে লাগলো। কিন্তু মুসলমানেরা তাদের ধন প্রাণ ও
সন্তান-সন্ততির জীবন বিপন্ন করেও নিছক দ্বীনের খাতিরে দেশ ত্যাগ করাকেই পছন্দ
করলো। কোন প্রলোভন বা ভয়-ভীতিই তাদেরকে এই সংকল্প থেকে বিরত রাখতে পারলো না।
ক্রমান্বয়ে বহু সাহাবী মদিনায় চলে গেলেন। এখন হযরত(সা:)এর সঙ্গে থেকে গেলেন শুধু
হযরত আবু বকর(রা:) এবং হযরত আলী(রা:)। আর থাকলো দারিদ্র্য ও শারীরিক অক্ষমতা হেতু
সফর করতে অসমর্থ এমন কিছূ সংখ্যক মুসলমান।

 

হযরত (সা:) কে হত্যা করার সলা-পরামর্শ

এভাবে নবুয়্যাতের ত্রয়োদশ
বছরের সুচনা পর্যন্ত বহূ সাহাবী মদীনায় হিজরত করলেন। কুরাইশরা দেখতে পেল মুসলমানরা
একে একে মদীনায় গিয়ে শক্তি সঞ্চয় করছে এবং সেখানে ইসলাম ক্রমশ প্রসার লাভ করছে। এর
ফলে তারা অত্যন্ত শংকিত হয়ে উঠলো এবং ইসলামকে চিরতরে খতম করে ফেলার পন্থা সর্ম্পকে
চিন্তা-ভাবনা করলে লাগলো। সাধারন জাতীয় সমস্যাবলী সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা ও
সলা-পরামর্শ করার জন্যে
দারুন্নদ্‌ওয়ানামে তাদের একটি জায়গা নির্দিষ্ট
ছিলো। সেখানে প্রত্যেক গোত্রের প্রধান ব্যক্তিগণ জমায়েত হলো এবং এই আন্দোলনকে
পর্যুদস্ত করার জন্যে কি পন্থা অবলম্বন করা যায়
, সে সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা শুরু করলো।
কেউ কেউ পরামর্শ দিলো: মুহাম্মদ (সাঃ)-কে শৃংখলিত করে কোন ঘরের মধ্যে বন্দী করে
রাখা উচিত। কিন্তু কেউ কেউ মত প্রকাশ করলো যে
, মুহাম্মদ (সাঃ) এর সঙ্গী-সাথীগণ হয়তো আমাদের কাছ থেকে
তাঁকে ছিনিয়ে নিয়ে যাবে এবং তার ফলে আমাদের পরাজয়ও ঘটতে পারে
; এজন্যে উক্ত পরামর্শ প্রত্যাখ্যান করা
হলো। কেউ কেউ আবার পরামর্শ দিলো যে
, তাঁকে নির্বাসিত করা উচিত। কিন্তু
মুহাম্মদ (সাঃ) যেখানে যাবেন সেখানেই তাঁর অনুগামী বাড়তে থাকবে এবং তাঁর আন্দোলনও
যথারীতি সামনে অগ্রসর হবে
;
আশংকায় উক্ত পরামর্শও নাকচ করা হলো। অবশেষে আবু জেহেল পরামর্শ দিলো:
প্রত্যেক গোত্র থেকে একজন করে যুবক
মনোনীত করা হবে
; এরা
সবাই এক সঙ্গে মুহাম্মদ (সাঃ)-এর ওপর হামলা করবে এবং তাঁকে হত্যা করে ফেলবে। এর
ফলে তাঁর রক্ত সকল গোত্রের মধ্যে বিভক্ত হয়ে যাবে। আর সমস্ত গোত্রের সঙ্গে একাকী
লাড়াই করা হাশিমী খান্দানের পক্ষে কিছুতেই সম্ভবপর হবে না।
এ অভিমতটি সবাই পছন্দ করলো এবং শেষ
পর্যন্ত এ কাজের জন্যে একটি রাত ও নির্দিষ্ট করা হলো। সিদ্ধান্ত করা হলো যে
নির্দিষ্ট রাতে মনোনীত ব্যক্তিগণ হযরত (সা:) এর বাসভবন ঘেরাও করে থাকবে। ভোরে তিনি
যখন বাইরে বেরোবেন
,তখন
তারা আপন কর্তব্য সমাধা করবে। এরুপ সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণ এই যে
, আরবরা রাতের বেলায় অন্য কারো ঘরে
প্রবেশ করাকে পছন্দ করতো না।

কিন্তু আল্লাহ তাআলার
কৃপায় দুশমনদের ঐসব গোপন অভিসন্ধির কথা হযরত (সা:) এর কাছে যথারীতি পৌঁছতে থাকে।
অতঃপর সেই প্রতিক্ষিত সময়টি এলো
,যখন তিনি মক্কা ছেড়ে মদিনায় গমন করার জন্যে ওহী যোগে
নির্দেশ পেলেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে হিজরতের দুদিন আগে থেকেই তিনি আবু বকর সিদ্দিক
(রা:) এর সঙ্গে এ সম্পর্কে পরামর্শ করেন এবং এই মর্মে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে
, তার সাথে হযরত আবু বকর(রা:) ও গমন
করবেন। সফরের জন্যে দুটি উষ্ট্রী ঠিক করা হলো এবং কিছু পাথেয়ও তৈরি করা হলো।

 

মক্কা থেকে রওয়ানা

কাফির কুরাইশগণ হযরত(সা:)
কে হত্যা করার জন্যে যে রাতটি নির্দিষ্ট করেছিল
, সেই রাতেই তিনি আলী(রা:) কে ডেকে
বললেন:
আমি হিজরতের নির্দেশ
পেয়েছি এবং আজ রাতেই মদিনা রওয়ানা হয়ে যাচ্ছি। আমার কাছে বহু লোকের আমানত জমা
রয়েছে। এগুলো তুমি প্রত্যুষে লোকদের কাছে প্রত্যার্পণ করে দিয়ো। আর আজ রাতে তুমি
আমার বিছানায় থেকো
,যেন
আমি ঘরে আছি ভেবে লোকেরা নিশ্চিন্ত থাকে।

কুরাইশরা ইসলাম বৈরিতার
কারণে হযরত(সা:) এর রক্তের নেশায় উন্মাদ হয়ে উঠেছিল
; কিন্তু এ অবস্থায়ও তারা হযরত(সা:) কে
এতোখানি আমানতদার ও বিশ্বাসভাজন মনে করতো যে
, তাদের নিজ নিজ আমানত ও মাল-মাত্তা এনে
তার কাছে জমা রাখতো।

নির্দিষ্ট রাতে কাফিররা
হযরত(সা:) এর গৃহ ঘেরাও করলো। রাত যখন গভীর হলো
, হযরত(সা:) নিরবে ও নিশ্চিন্তে ঘর থেকে
বের হলেন। সে সময় তিনি সূরা ইয়াছিনের একটি আয়াত (
فَأَغْشَيْنَاهُمْ فَهُمْ لاَ يُبْصِرُونَ) পাঠ করছিলেন। তিনি এক মুঠো মাটি
হাতে নিয়ে
শাহাতিল
ওজুহ
’(মুখমন্ডল আচ্ছন্ন হয়ে
যাক) কথাটি বলে কাফিরদের দিকে ছুঁড়ে মারলেন এবং তাদের ব্যূহ ভেদ করে নিবিঘ্নে
বেরিয়ে গেলেন। সে সময় আল্লাহর কুদরতে অবরোধকারি গণ যেন তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলো
; ফলে তারা হযরত(সা:) কে বেরিয়ে যেতে
দেখতে পেলো না।প্রথমে তিনি হযরত আবু বকর (রা:) এর গৃহে গমন করলেনএবং সেখান থেকে
তাকে নিয়ে মক্কার বাইরে গিয়ে সওর পর্বত গুহায় আশ্রয় নিলেন।

ভোরবেলা কাফিরগণ দেখতে
পেলো
, হযরত (স) মক্কা ছেড়ে চলে
গেছেন। তারা অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়লো এবং তাঁর সন্ধানে চারদিকে ছুটাছুটি শুরু
করলো। একবার তারা খুঁজতে খুঁজতে
সওরর্পবত
তাদের পদধ্বনি শুনে হযরত আবু বকর (রা) কিছুটা বিচলিতও হয়ে উঠলেন। তার কারণ
,তার নিজের জীবন সম্পর্কে তার কোন ভয়
ছিল না
;বরং হযরত(সা:)- এর ওপর না
জানি কোন বিপদ এসে যায় এই ছিল তার আশংকা। তার এই অস্থিরতা লক্ষ্য করে
হযরত(স)অত্যন্ত প্রশান্ত চিত্তে বললেনঃ
লা তাহযান ইন্নাল্লাহা মাআনা’ – ঘাবড়িও না,আল্লাহ আমাদের সঙ্গে রয়েছেন। কার্যত
তা-ই হলো।

আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহে
গুহামুখে এমন কতকগুলো নিদর্শন ফুটে উঠলে যে
, তা দেখে কাফিররা বিভ্রান্ত হয়ে পড়লো।
তাদের মনে ধারণা জন্মালো যে
, এ গুহার ভেতরে কেউ প্রবেশ করে নি।

হযরত আবু বকর(রা:)-এর
পুত্র হযরত আব্দুল্লাহ তখন বয়সে নবীন। তিনি রাতের বেলায় হযরত(সা:) ও সিদ্দিক
(রা:)-এর কাছে থাকতেন এবং ভোরে মক্কায় এসে কাফিরদের শলা-পরামর্শ সম্পর্কে খোঁজ-খবর
নিয়ে গুহায় ফিরে গিয়ে বুজর্গদ্বয়কে অবহিত করতেন। কয়েক রাত যাবত হযরত আবু
বকর(রা:)-এর গোলাম বকরীর দুধ নিয়ে যেত
, কখনো বা ঘর থেকে কিছু খাবার নিয়ে
পৌঁছতো। এভাবে তিন রাত পর্যন্ত হযরত(সা:) ও সিদ্দিক(রা:) সেখানে অবস্থান করলেন।

চতুর্থ দিন হযরত(সা:) সওর
পর্বত গুহা থেকে বেরোলেন এবং পুরো এক রাত এক দিন তারা সমানে পথ চললেন। সফরের জন্যে
আবু বকর(রা:) আগে থেকেই দুটি উষ্ট্রী ঠিক করে রেখেছিলেন। পথ বাতলানোর জন্যে একশো
জানাশোনা লোকও নির্দিষ্ট করে রেখেছিলেন। পরদিন দুপুর বেলা রোদের তেজ প্রখর হয়ে
উঠলে বিশ্রামের জন্যে একটি বৃহদাকার পাথরের ছায়ায় তারা কিছুক্ষণ অবস্থান করলেন।
অদূরেই একটি গোয়ালা ছিল
; তার
বকরী থেকে হযরত(সা:) দুধ পান করলেন।অতঃপর সেখান থেকে তিনি আবার যাত্রা শুরু করলেন।
তিনি সামনে পা বাড়াতেই সোরাকা বিন জাশিম নামক জনৈক্য কুরাইশ হঠাৎ তাকে দেখে
ফেললো।এই লোকটি পুরস্কারের লোভে হযরত(সা:) এর সন্ধানে বেরিয়েছিল। সে হযরত(সা:) কে
দেখতে পেয়েই ঘোড়া ছুটিয়ে দিল। কিন্তু ঘোড়াটি হোঁচট খেয়ে মাটিতে পড়ে গেল। সে আবার
নিজেকে সামলে নিল এবং হযরত(সা:) এরওপর হামলাকরার জন্যে তৈরি হলো। কিন্তু এবারও
সামনে এগুতেই তার ঘোড়া হাঁটু পর্যন্ত মাটিতে বসে গেল। এবার সোরাকা শংকিত হয়ে উঠলো
এবং বুঝতে পারলো। ব্যাপারটা মোটেই সুবিধাজনক নয়। তার পক্ষে মুহাম্মদ(সা:) এর ওপর
হামলা করা কিছুতেই সম্ভবপর নয়। সে অত্যন্ত ভীত হয়ে পড়লো এবং হযরত(সা:) এর কাছে
আত্মসমার্পণ করে ক্ষমা ভিক্ষা চাইলো। হযরত(সা:) তাকে ক্ষমা করে দিলেন। এও ছিল
হযরত(সা:) এর একটি মু
জিযা।

 

মদিনায় শুভাগমন

হযরত(সা:) এর আগমন বার্তা
পূর্বেই পৌঁছেছিল গোটা শহরই তার শুভাগমনের জন্যে প্রতিক্ষমান ছিল। ছোট-বড় সবাই
প্রতিদিন সকালে শহরের বাইরে গিয়ে জমায়েত হতো এবং দুপুর পর্যন্ত ইন্তেজার করে ফিরে
আসতো। অবশেষে একদিন তাদের সেই প্রতিক্ষিত শুভ মুহূর্তটি এসেই পড়লো। দূর থেকে হযরত
(সা:) এর আসবার আলামত দেখে গোটা শহরটি তকবীর ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠলো। প্রতিটি
প্রতিক্ষাকারী হৃদয় উজার করে তাকে স্বাগত জানালো। মদিনা থেকে তিন মাইল দূরে
কুবানামক স্থানে আনসারদের অনেকগুলো
খান্দান বসবাস করতো। এদের মধ্যে আমর ইবনে আওফের খান্দান টি ছিল সবচেয়ে
শীর্ষস্থানীয়। কুলসুম বিন আল হাদাম ছিলেন এদের প্রধান ব্যক্তি। এর পরম সৌভাগ্য যে
, দো-জাহানের নেতা সবার আগে এরই আতিথ্য
কবুল করেন এবং কুবাই এর গৃহেই অবস্থান করেন। হযরত (সা:) এর রওয়ানার তিন দিন পর
হযরত আলী(রা:) মক্কা থেকে যাত্রা করেছিলেন
; তিনিও এখানে এসে হযরত (সা:) এর সঙ্গে
মিলিত হলেন।

কুবায় হযরত (সা:) শুভাগমন
করেন নবুয়্যাতের ত্রয়োদশ বছরের ৮ রবিউল আওয়াল (মুতাবেক ২০সেপ্টেম্বর
, ৬২২ খ্রিষ্টাব্দ)।এখানে অবস্থানকালে
তার পয়লা কাজ ছিল একটি মসজিদ নির্মাণ করা। তিনি তার পবিত্র হস্ত দ্বারা এইমসজিদের
ভিত্তি স্থাপন করেন এবং অন্যসাহাবীদের সঙ্গে নিয়ে এর নির্মানকাজ সম্পূর্ণ করেন।
কয়েকদিন অবস্থান করে তিনি শহরের দিকে রওয়ানা করলেন। দিনটি ছিল শুক্রবার। পথে বনী
সালেমের মহল্লা পর্যন্ত পৌঁছলে জুহর নামাজের সময় হলো। এখানে তিনি সর্বপ্রথম জুম
আর খুতবা প্রদান করেন এবং প্রথম বার
জুম
আর নামাজ পড়ালেন।

মদিনায় প্রবেশকালে
প্রতিটি আত্মোৎসর্গী মুসলিমের হৃদয়েই তার মেহমানদারীর সৌভাগ্য লাভের আকাঙ্খা
জাগলো। তাই প্রত্যেক গোত্রের লোকই তার সামনে এসে আবেদন জানাতে লাগলো:
হুযুর, এই হচ্ছে আপনার ঘর, অনুগ্রহ করে এখানে আপনি অবস্থান করুন।
লোকদের মধ্যে এতখানি আগ্রহ-উদ্দীপনার সঞ্চার হলো যে প্রতিটি হৃদয়ই যেন পথের ফরাশে
পরিণত হলো
; প্রতিটি
হৃদয়ই উৎসর্গীকৃত হবার জন্যে অস্থির হয়ে উঠলো। এমনকি মেয়েরা পর্যন্ত গৃহের ছাদে
উঠে গাইতে লাগলোঃ

চন্দ্র উদিত হয়েছে,

বিদা পর্বতের ঘাঁটি থেকে,

খোদার শোকর আমাদের
কর্তব্য
,,

যতক্ষণ প্রার্থনাকারীরা
প্রার্থনা করে।
,

কিশোরী বালিকারা দফ
বাজিয়ে বাজিয়ে গাইতে লাগলোঃ
,

আমরা নাজ্জার খান্দানের
বালিকা
,

(আর) মুহাম্মদ (সা:) আমাদের কত উত্তম
পড়োশী!
,

হযরত(সা:) বালিকাদের
জিজ্ঞেস করলেন
তোমরা
কি আমায় ভালোবাস
?তারা
বললো
,হ্যাঁ। তিনি বললেনঃ আমিও তোমাদের ভালোবাসি।

 

মদিনায় অবস্থান

হযরত(সা:) এর মেহমানদারীর
সৌভাগ্য কে লাভ করবে
? এমন
একটি প্রশ্ন যে এর মিমাংসা মোটেই সহজসাধ্য ছিল না। হযরত বললেন যে
, আমার উষ্ট্রী যার গৃহের সামনে দাঁড়াবে, এ খেদমত সেই আজ্ঞাম দিবে। ঘটনাক্রমে এ সৌভাগ্য টুকু হযরত আবু
আইয়ুব আনসারী (রা) এর ভাগ্যে পড়লো। বর্তমানে যেখানে মসজিদে নববী অবস্থিত
, তার নিকটেই ছিল তার গৃহ। গৃহটি ছিল
দ্বিতল বিশিষ্ট। তিনি হযরত (সা:) এর থাকবার জন্যে ওপরের তলাটি পেশ করেন। কিন্তু
লোকদের আসা-যাওয়ার সুবিধার্থে হযরত (সা:) নিচের তলায় থাকা পছন্দ করলেন্‌ হযরত আবু
আইয়ুব এবং তার স্ত্রী নিচের তলা ছেড়ে ওপরের তলায় চলে গেলেন। এখানে হযরত(সা:) সাত
মাস কাল অবস্থান করলেন। এরপর তার বসবাসের জন্যে মসজিদে নববীর নিকটে একটি কোঠা
নির্মিত হলো এবং সেখানেই তিনি স্থানান-রিত হলেন। কয়েক দিনের মধ্যে তার খান্দানের
অন্যান্য লোকও মদিনায় চলে এলো।

 

মসজিদে নববীর নির্মাণ

মদিনায় আগমনের পর সবচেয়ে
প্রথম ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল একটি মসজিদ নির্মাণ করা। হযরত (সা:) যেখানে অবস্থান
করছিলেন
, তার
নিকটেই দুই ইয়াতিমের কিছু অনাবাদী জমি ছিল। নগদ মূল্যে তাদের কাছ থেকে এই জমিটি
খরিদ করা হলো। তারই ওপর মসজিদের নির্মাণ কাজ শুরু হলো। এবারও হযরত(সা:) সাধারণ
মজুরের ন্যায় সবার সাথে মিলে কাজ করলেন। স্বহস্থে তিনি ইট-পাথর বয়ে আনলেন। মসজিদটি
অত্যন্ত সাদাসাদি ভাবে নির্মিত হলো। কাঁচা ইটের দেয়াল
, খেজুর গাছের খুঁটি এবং খেজুর পাতার
ছাদ
এই ছিল এর উপকরণ। মসজিদের
কিবলা হলো বায়তুল মুকাদ্দিসের দিকে। কেননা
, তখন পর্যন্ত মুসলমানদের কিবলা ছিল ‌ঐ
দিকে। অতঃপর কিবলা কা
বামুখী
হলে তদনুযায়ী মসজিদের সংস্কার করা হলো। মসজিদের একপাশে একটি উঁচু চত্বর নির্মিত
হলো। এর নাম রাখা হলো
সুফফাযে সব নও মুসলিমের কোন
বাড়ি-ঘর ছিলো না। এটি ছিল তাদের থাকবার জায়গা।

মসজিদের নির্মাণ কাজ
সমাপ্ত হলে তার নিকটেই হযরত (সা:) তার স্ত্রীদের জন্যে কয়েকটি কোঠা তৈরি করে
নিলেন। এগুলো কাঁচা ইট এবং খেজুর গাছ দ্বারা নির্মিত হলো। এই ঘরগুলো ছয়-সাত হাত
করে চওড়া এবং দশ হাত করে লম্বা ছিল। এর ছাদ এতোটা উঁচু ছিল যে
, একজন লোক দাঁড়ালে তা স্পর্শ করতে
পারতো। দরজায় ঝুলানো ছিল কম্বলের পর্দা।

হযরত(সা:) এর গৃহের নিকটে
যে সব আনসার বাস করতো
, তাদের
ভিতরকার স্বচ্ছল লোকেরা তার খেদমতে কখনো তরকারী
, কখনো বা অন্য কিছু পাঠাতো। এর দ্বারাই
তার দিন গুজরান হতো
; অর্থাৎ
সংকটের ভেতর দিয়েই তার জীবন-যাত্রা নির্বাহ হতো।

 

ভাই ভাই সম্বন্ধ

মক্কা থেকে যে সব মুসলমান
ঘর-বাড়ি ত্যাগ করে মদিনায় চলে এসেছিল
, তাদের প্রায় সবাই ছিল সহায় সম্বলহীন।
তাদের মধ্যে যারা স্বচ্ছল ছিল
, তারাও নিজেদের মাল-পত্র মক্কা থেকে আনতে পারেন নি। তাদের
সবকিছু ছেড়ে-ছুঁড়ে একদম রিক্ত হস্তেই আসতে হয়েছিল। এই সব মুহাজির যদিও মুসলমানদের
(আনসার) মেহমান ছিলো
, তথাপি
এদের স্থায়ী বসবাসের ব্যবস্থা করার প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছিল। তাছাড়া
এরা নিজেরাও স্বহস্থে পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করতে ভালবাসতো। তাই মসজিদে নববীর
নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হলে একদিন হযরত (সা:) আনসারদের মধ্যে থেকে এক ব্যক্তি এবং
মুহাজিরদের ভেতর থেকে এক ব্যক্তিকে ডেকে বললেন
, ‘আজ থেকে তোমরা পরস্পর ভাই।এভাবে সমস- মুহাজিরকে তিনি আনসারদের
ভাই বানিয়ে দিলেন। তার ফলেই আল্লাহর এই খাঁটি বান্দাগণ শুধু ভাই-ই নয়
, পরস্পরে ভাইয়ের চেয়েও ঘনিষ্ঠ বন্ধুতে
পরিণত হলেন। আনসারগণ মুহাজিরদেরকে নিজ নিজ বাড়িতে নিয়ে গেল এবং তাদের সামনে
নিজেদের সমস্ত সম্পত্তি ও সামান-পত্রের হিসাব করে বললো:
এর অর্ধেক তোমাদের আর অর্ধেক আমাদের।এভাবে বাগানের ফল, ঘরের সামান, বাসগৃহ, সম্পত্তি মোটকথা, প্রতিটি জিনিসই সহোদর ভাইদের মতো
বিভক্ত হলো। ফলে আশ্রয়হীন মুহাজিরগণ সব দিক থেকে নিশ্চিন্ত হলো। তারা যথারীতি
ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করলো
, দোকান-পাট
খুললো এবং অন্যান্য কাজে নিযুক্ত হলো। এভাবে মুহাজির পুনর্বাসনের কাজ সুষ্ঠুভাবে
সম্পাদিত হলো এবং এদিক দিয়ে সবাই নিশ্চিন্ত হলো।

 


. নবপর্যায়ে
ইসলামী আন্দোলন


হিজরতের আগে ইসলামের দাওয়াত পেশ করা
হচ্ছিল মক্কার মুশরিকদের কাছে। তাদের কাছে এটা ছিল একটি অভিনব জিনিস। কিন্তু
হিজরতের পর সমস্যা দেখা দিল মদিনার ইহুদীদের নিয়ে। এরা তাওহীদ
, রিসালাত, আখিরাত, ফেরেশতা, ওহী ইত্যাদি বিশ্বাস করতো
এবং একজন পয়গম্বরের (হযরত মূসার ) উম্মত হিসাবে খোদার তরফ থেকে আগত একটি শরীয়াতের
অনুগামী হবারও দাবিদার ছিল। নীতিগত ভাবে হযরত মুহাম্মদ (সা:) যে দ্বীন-ইসলামের
দিকে আহ্বান জানাচ্ছিলেন
, তাদেরও প্রকৃত দ্বীন ছিল তা-ই। কিন্তু শতাব্দী কালের অনাচার ও বেপরোয়া আচরণের
ফলে তাদের ভেতর নানারকমের দোষ-ত্রুটি দেখা দিয়েছিল।তাদের জীবন প্রকৃত খোদায়ী শরীয়ত
থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল এবং তাদের ভেতর অসংখ্য কুসংস্কার
, বিদয়াত,ও কুপ্রথার অনুপ্রবেশ
ঘটেছিল।তাদের কাছে তওরাত কিতাব ছিল বটে
, কিন্তু তার মধ্যে তারা বহু মানবীয়
কালাম শামিল করে নিয়েছিল। তবুও তার মধ্যে খোদায়ী বিধি-বিধান যা কিছু বাকী ছিল
, তাও মনগড়া ব্যাখ্যা
বিশ্লেষণের ছাঁচে ফেলে তারা ওলট-পালট করে দিয়েছিল। এভাবে খোদার দ্বীনের সাথে তাদের
সম্পর্ক অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছিল। সামাজিক দিক দিয়ে তাদের ভেতর মারাত্মক সব
দোষ-ত্রুটি শিকড় গেড়ে বসেছিল। আল্লাহর কোন বান্দাহ যদি তাদেরকে সঠিক পথ দেখাতে
চাইতো
, তার কোন কথা পর্যন্ত তারা শুনতে প্রস্তুত ছিল না। বরং তাকে তারা ঘোরতর দুশমন
বলে মনে করতো এবং তার কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্যে সর্বোতভাবে চেষ্টা চালাতো।
যদিও তারা মিলগতভাবে মুসলিমই ছিল
, তবুও তাদের এতখানি পতন ঘটেছিল যে, তাদের আসল দ্বীন কি ছিল, তা তাদের নিজেদেরই স্মরণ
ছিল না।

এদিক দিয়ে ইসলামী
আন্দোলনের সামনে শুধু দ্বীন-ইসলামের মূলনীতি সংক্রান্ত বুনিয়াদী প্রচারের কাজই
ছিলনা
, বরং ঐসব বিভ্রান্ত
মুসলমানের ভেতর পুনরায় দ্বীনি ভাবাদর্শ জাগ্রত করার দায়িত্বও বর্তমান ছিল। তাছাড়া
হযরত (সা:) এর আগমনের পর মুসলমানেরা ক্রমান্বয়ে চারদিক থেকে এসে মদিনায় জমায়েত
হচ্ছিল এবং এই সব মুহাজির ও মদিনার আনসার গণ মিলে একটি ক্ষুদ্রাকৃতির ইসলামী
রাষ্ট্রেরও ভিত্তি পত্তন করেছিল। ৩৭ এ কারণে আন্দোলনকে এ যাবত শুধু আদর্শ প্রচার
, আকীদা-বিশ্বাসের সংস্কারে এবং কিছু
নৈতিক শিক্ষা সংক্রান্ত নির্দেশ প্রদান করতে হলেও
, এখন সামাজিক জবিনধারার সংস্কার, প্রশাসনিক আইন-কানুন প্রণয়ন এবং
পারস্পরিক সম্পর্ক-সম্বন্ধ বিষয়ক বিধি-ব্যবস্থা জারির প্রয়োজন দেখা দিলো। সুতরাং
এবার এদিকে পুরোপুরি মনোযোগ দেয়া হলো।

এ সময় আরো একটি বিরাট
পরিবর্তন সাধিত হলো। এই পর্যন্ত কুফরী পরিবেশেই ইসলামী দাওয়াত পেশ করা হচ্চিলো এবং
এরই ভেতর থেকে মুসলমানরা কাফিরদের জুলুম-পীড়ন বরদাশত করছিরো। কিন্তু এবার তারা
ক্ষুদ্রাকৃতির হলেও একটি স্বাধীন রাষ্ট্র লাভ করলো যা চারদিকে দিয়েই ছিলো কাফিরদের
দুর্গ দ্বারা পরিবেষ্টিত। তাই ব্যাপারটি এখন আর শুধু উৎপীড়ন আর হয়রানির মধ্যেই
সীমাবদ্ধ রইলো না
, বরং
গোটা আরব উপদ্বীপই এবার সংকল্পগ্রহণ করলো যে
, এই নগন্য দলটিকে যতো শীঘ্র সম্ভব খতম
করে দিতে হবে
; নচেৎ
ইসলামের এই কেন্দ্রটি শক্তি অর্জন করতে শুরু করলে তাদের জন্যে দাঁড়াবার স্থান
পর্যন্ত থাকবে না। তাই নিজেদের এবং আন্দোলনের নিরাপত্তার তাগিদে এই নয়া ইসলামী
দলের সামনে জরুরী কর্তব্য হয়ে দেখা দিলো:

১. পূর্ণ উৎসাহ-উদ্দীপনার
সাথে জিদের আদর্শ প্রচার করা
, দলিল প্রমাণ দ্বারা তার সত্যতা প্রতিপন্ন করা এবং যতো বেশি
সম্ভব লোকদেরকে এর সমর্থক বানানোর চেষ্টা করা
;

২. বিরুদ্ধবাদীগণ যে সব
আকীদা-বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরেছিলো
, যুক্তি-প্রমাণের সাহায্যে তার অসারতা প্রমাণ করা, যেনো বিবেকের আলোয় কেউ কিছু বুঝতে
চাইলে প্রকৃত সত্য পর্যন্ত পৌঁছতে তাকে কোনো বেগ পেতে না হয়:

৩. ঘরবাড়ি ও
ব্যবসায়-বাণিজ্য নষ্ট করে যারা এই নতুন রাষ্ট্রে এসে আশ্রয় গ্রহণ করেছে
, তাদের জন্যে শুধু বসবাসের ব্যবস্থাই
নয়
, বরং তাদেরকে উন্নত মানের
নৈতিক ও ঈমানী শিক্ষা দান করা
, যেনো চরম দুঃখ-দারিদ্র্য এবং অনিশ্চয়তার মধ্যেও তারা পূর্ণ
ধৈর্যের সাথে পরিস্থিতির মুকাবিলা করতে পারে এবং কোনো কঠিনতর অবস্থায়ও তাদের পা
কেঁপে না ওঠে
;

৪. মুসলমানদেরকে চরম
প্রতিকূল অবস্থার মুকাবিলার জন্যে প্রস্তুত করা
, যাতে করে তাদের নিশ্চিহ্ন করার
উদ্দেশ্যে বিরুদ্ধবাদীগণ কোনো সশস্ত্র হামলা চালালে নিজেদের দুর্বলতা ও
অস্ত্রপাতির দৈন্য সত্ত্বেও তারা পূর্ণ দৃঢ়তার সাথে শত্রুর মুকাবিলা করতে পারে এবং
আপন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সত্যতা সম্পর্কে গভীরতর প্রায় ও খোদার প্রতি ঐকান্তিক
নির্ভরতার কারণে ময়দান থেকে কখনো পশ্চাদপসারণ না করে
;

৫. যে সব লোক নানাভাবে
বুঝানো সত্ত্বেও ইসলামের কাঙ্খিত জীবন পদ্ধতির প্রতিষ্ঠার পথে বাদ সাধবে
, তাদেরকে প্রয়োজন হলে শক্তি প্রয়োগ করে
ময়দান থেকে তাড়িয়ে দেয়ার জন্যে আন্দোলনের অনুবর্র্তীদের মধ্যে পূর্ণ হিম্মত ও সৎ
সাহস পয়দা করা।

 

ইহুদীদের সঙ্গে চুক্তি

মদীনার প্রায় চারদিকেই
ইহুদীদের বসতি ছিলো। ৩৮এদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পেশ করার সঙ্গে সঙ্গে একটা
রাজনৈতিক সম্পর্ক নির্ধারণেরও প্রয়োজন ছিলো। কারণ মুসলমানদের মক্কা ত্যাগের কথা
জানতে পেরে কাফির কুরাইশগণ নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থাকেনি
, বরং মুসলমানদের একটি সংঘবদ্ধ দলকে
মদীনায় একত্রিত হতে দেখেই তারা ইসলামের এই নয়া কেন্দ্রকে আপন শক্তি ও প্রভাবে
মিটিয়ে দেবার পন্থা সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা শুরু করে দিয়েছিলো। এ কারণেই মদীনার চার
দিককার ইহুদী বাসিন্দাদের সথে একটা স্পষ্টতর রাজনৈতিক সম্পর্ক নির্ধারণের প্রয়োজন
দেখা দিলো
, যেনো
মক্কার মুশরিকগণ কোনো হামলা চালালে ইহুদীদের ভূমিকাটা অনুমান করা যেতে পারে। তাই
মদীনা ও লোহিত সাগরের মধ্যবর্তী এলাকায় বসবাসকারী ইহুদী গোত্রগুলোর সঙ্গে হযরত (স)
নিরপেক্ষতার চুক্তি সম্পাদন করলেন। অর্থাৎ কুরাইশ বা অন্য কেউ যদি মদীনার
মুসলমানদের ওপর হামলা করে
, তাহলে
এরা না মুসলমানদের পক্ষে লড়াই করবে আর না তাদের শত্রুপক্ষকে সমর্থন করবে
; আর কারো সঙ্গে এই মর্মে চুক্তি করা
হলো যে
, যদি মুসলমানদের ওপর কেউ
হামলা করে
, তাহলে
তারা মুসলমানদেরকে সক্রিয়ভাবে সাহায্য করবে।

 

মুনাফিক

এ সময় মদীনায় ইসলামী
আন্দোলনকে কতকগুলো নতুন সমস্যার মুকাবিলা করতে হলো। এর মধ্যে মুনাফিকদের সমস্যাটি
ছিলো অতীব গুরুত্ব্‌পূর্ণ। মক্কায় শেষ পর্যায়ে এমন কিছু লোক ইসলামী সংগঠনের
অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলো
, যারা
ইসলামী দাওয়াতকে সম্পূর্ণ সত্য বলে জানতো বটে
, কিন্তু ঈমানের দুর্বলতাবশত ইসলামের
খাতিরে পার্থিব স্বার্থত্যাগ করতে প্রস্তুত ছিলো না। চাষাবাদ
, ব্যবসা-বাণিজ্য, আত্নীয়তা ইত্যাদি প্রায়শ ইসলামের দাবি
পূরণের পথে তাদের অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতো। কিন্তু মদীনায় আসার পর এমন কিছু লোকও
ইসলামী সংগঠনে অনুপ্রবেশ করলো
, যারা আদতেই ইসলামে বিশ্বাসী ছিলো না। এরা নিছক ফিতনা
সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই ইসলামী সংগঠনে শামিল হয়েছিল। আবার কিছু লোক অক্ষমতা হেতু
নিজেদেরকে মুসলমান বলে জাহির করতো। এদের হৃদয় যদিও ইসলাম সম্পর্কে নিশ্চিন্ত ছিল
না। কিন্তু নিজ গোত্র বা খান্দানের বহু লোক মুসলমান হবার ফলে এরা বাধ্য হয়ে
মুসলমানের দলে শামিল হয়ে যায়। সেই সঙ্গে আরো কিছু সুযোগ সন্ধানী লোকও ইসলামী
সংগঠনে ঢুকে পড়েছিল। এরা একদিকে মুসলমানদের সঙ্গী হয়ে পার্থিব ফায়াদা হাসিলের
চিন্তা করতো
, অন্যদিকে
কাফিরদের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখতো। এদের চেষ্টা ছিল ইসলাম ও কুফরের সংঘর্ষে
যদি ইসলামী বিজয়ী হয়
, তাহলে
এরা যেন ইসলামের মধ্যে আশ্রয় পেতে পারে আর যদি কুফর জয়লাভ করে
, তবুও যেন এদের স্বার্থ নিরাপদ থাকে।

ইসলামী আন্দোলনের পক্ষে
এই মিত্রবেশী শত্রুরাই ছিল সবচেয়ে বেশি অসুবিধার কারণ। এদের সঙ্গে কাজ-কারবার করা
মোটেই সহজতর ছিল না। মদিনার গোটা জীবনে এই শ্রেণীর লোকদের সৃষ্ট ফিতনার কিভাবে
মুকাবেলা করা হয়
, যথাস্থানে
তা আলোচিত হবে। এখানে শুধু ঐ শ্রেণীর মুনাফিক আর সাচ্চা মুমিনদের তুলনামূলক
পরিচয়টা জেনে রাখারই প্রয়োজন বেশি। কারণ এইসময় ইসলামী আন্দোলন কে এক সংকটজনক
পরিস্থিতির মুকাবেলা করতে হয় এবং এ কারণেই যেসব লোক পুরানো বিদ্বেষ এবং ইসলাম
বিমুখ চিন্তাধারা আঁকড়ে ধরে ছিল অথবা যাদের ঈমান কোন দিক দিয়ে দুর্বল ছিল
, আন্দোলন থেকে তাদের সরে পড়বার
প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছিল।

 

কিবলা পরিবর্তন

এ যাবত ইসলামের কিবলা ছিল
বায়তুল মুকাদ্দাস। এদ্দিন ঐদিকে মুখ করেই মুসলমানরা নামায পড়তো। বায়তুল
মুকাদ্দাসের সাথে ইহুদীদের সম্পর্ক ছিল খুব ঘনিষ্ঠতর। এরাও ঐদিকে মুখ করে উপাসনা
করতো। দ্বিতীয় হিজরীর শাবান মাসে একদিন ঠিক নামাজের মধ্যে কিবলা পরিবর্তন করার
নির্দেশ এলো এবং তখন থেকে বায়তুল মুকাদ্দাসের বদলে কা
বাকে মুসলমানদের কিবলা বলে ঘোষণা করা
হলো। তাই হযরত (সা:) নামাজের মধ্যেই তার মুখ বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে কা
বার দিকে ঘুরিয়ে দিলেন। ইসলামী
আন্দোলনের ইতিহাসে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। খোদ আল্লাহ তাআলা এর গুরুত্ব
নিম্নোক্ত ভাষায় বর্ণনা করেছেনঃ

আমরা কাবাকে তোমাদের কিবলা নির্ধারণ করে
দিয়েছি। এর কারণ হচ্ছে
, কে
পয়গম্বরের অনুবর্তী আর কে পশ্চাদপসরণকারী
, তা যাচাই করে নেয়া

এর দ্বারা এ সত্য ঘোষিত
হলো যে
, এ যাবত দুনিয়ার নৈতিক এবং
ঈমানী নেতৃত্বের যে দায়িত্ব ইহুদীদের ওপর ন্যস্ত ছিল
, তা থেকে তাদেরকে অপসারণ করা হয়েছে।
কারণ তারা এ দায়িত্ব পালন করেনি এবং এ নিয়ামতটির কদরও বুঝতে পারেনি। তাই তাদের
বদলে এ খেদমতের দায়িত্ব এখন উম্মতে মুসলিমার ওপর ন্যস্ত করা হলো। তারা এই কর্তব্য
পালন করে যাবে।

এই ঘটনার প্রভাবে বহু কপট মুসলমানেরই
-যাদের হৃদয়ে ঈমানের আসন প্রতিষ্ঠিত হয়নি
মুখোশ খসে পড়লো। তারা রাসূলুল্লাহ
(সা:) এর এই কার্যের তীব্র সমালোচনা করলো। এর ফলে ইসলামী আন্দোলনে এইসব লোকের
ভূমিকা কি
, তাও
অত্যন্ত সুস্পষ্ট হয়ে উঠলো। এভাবে বহু দো-দিল বান্দাহ ইসলামী সংগঠন থেকে বিচ্ছিন্ন
হয়ে গেল এবং এই শ্রেণীর মিত্ররুপী শত্রুদের দুষ্ট প্রভাব থেকে আন্দোলনও বহুলাংশে
মুক্ত হলো।

 


৯. ইসলামী আন্দোলনের প্রতিরক্ষা

পূর্বেই বলা হয়েছে যে, মক্কার অদূরবর্তী আকাবা
নামক স্থানে মদিনার কিছু লোক হযরত (সা:) এর কাছে আনুগত্যে শপথ গ্রহণ করেছিল। তারা
হযরত (সা:) এবং তার সঙ্গী-সাথীদের মদিনায় চলে আসবার জন্যে তার খেদমতে একটি
প্রস্থাবও পেশ করেছিল। তখনই এ আশংকা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছিল যে
, এইশপথও প্রস্তাব প্রকৃতপক্ষে
তামাম আরব উপদ্বীপের প্রতি মদিনাবাসীদের একটি চ্যালেঞ্জ স্বরুপ।এ ব্যাপারে শপথ
গ্রহণকারীদের অন্যতম পুরোধা হযরত আব্বাস বিন উবাদাহ (রা:) তার সাথীদের উদ্দেশ্য
করে যা বলেছিলেন
, আজো তা ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছেঃ তোমরা কি জানো, এই ব্যক্তির কাছে তোমরা
কি জিনিসের শপথ গ্রহণ করছো
? তোমরা এর কাছে শপথ গ্রহণ করে প্রকৃতপক্ষে সারা দুনিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা
করছো। সুতরাং তোমরা যদি ধারণা করে থাকো যে
, তোমাদের জান-মাল ও সম্ভ্রান-
ব্যক্তিগণ বিপন্ন হয়ে পড়লে একে একে দুশমনদের হাতে সোপর্দ করে দিবে
, তাহলে আজই একে পরিত্যাগ করা
তোমাদের পক্ষে উত্তম। কেননা খোদার কসম
,দুনিয়া এবং আখিরাত উভয়ের পক্ষেই এটা
চরম অবমাননাকর। পক্ষান্তরে তোমাদের উদ্দেশ্য যদি এ-ই হয় যে
, তোমাদের জান-মাল ও
সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিগণ বিপন্ন হলেও তোমরা তাকে রক্ষা করবে
,তাহলে নিসন্দেহ এর হাত
তোমরা আঁকড়ে ধরো। খোদার কসম
,এটা দুনিয়া এবং আখিরাত উভয়ের পক্ষেই কল্যাণকর।এ সময় গোটা প্রতিনিধিদলই
সম্মিলিতভাবে বলেছিলেন:
আমরা একে সঙ্গে নিয়ে নিজেদের জান-মাল ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের ধ্বংসের মুখে
ঠেলে দিতেও প্রস্তুত আছি।
এবার মদিনাবাসীদের সেই প্রতিশ্রুতিরই সত্যতা যাচাইয়ের সময় এলো।

 

কুরাইশদের বিপদ

মদিনায় মুসলমান এবং
হযরত(সা:) এর স্থানান্তরিত হবার অর্থ ছিল এই যে
, এবার ইসলাম অন্তত দাঁড়াবার মতো একটি
জায়গা পেলো এবং মুসলমানরাও বারবার ধৈর্যের পরীক্ষা দেবার পরিবর্তে একটি সুসংহত
সমাজ সংগঠনে পরিণত হলো। কুরাইশদের পক্ষে এ ছিল একটি কঠিন বিপদের ইঙ্গিত। তারা
স্পষ্টভাবে দেখতে পেলো
, এভাবে
ইসলামী সংগঠনের শক্তি সঞ্চয় প্রকৃতপক্ষে তাদের জাহিলী ব্যবস্থারই মৃত্যু ঘটার
শামিল। এ ছাড়া আরও একটি কঠিন আশংকা তাদেরকে অস্থির করে তুলেছিল। তাহলো এই যে
, মক্কাবাসীদের জীবিকার একটি বড় উপায়
ছিল ইয়েমেন ও সিরিয়ার বাণিজ্য। আর লোহিত সাগরের তীর দিয়ে সিরিয়া পর্যন্ত যে
বানিজ্য-পথ ছিলো
, মদিনা
ঠিক তারই ওপর অবস্থিত। সুতরাং মদিনায় মুসলমানদের শক্তি অর্জনের অর্থ ছিলোঃ
মুসলমানদের সঙ্গে সুষ্ঠু সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে কুরাইশদেরকে সিরিয়ায় বানিজ্যিক
সুবিধা ভোগ করতে হবে। নতুবা মুসলিম শক্তিকে চিরতরে খতম করে দিয়ে ঐ পথে তাদের
ব্যবসায়ের পণ্য চলাচলের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। এ কারণেই হিজরতের আগে মুসলমানরা
যাতে মদিনায় গিয়ে জমায়েত হতে না পারে
, সেজন্যে কুরাইশরা আপ্রাণ চেষ্টা
করেছিলো কিন্তু তাদের সে চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হওয়ায় তারা এই ক্রমবর্ধমান বিপদকে
যেভাবে হোক
, চিরতরে
মিটিয়ে ফেলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।

 

কুরাইশদের চক্রান্ত

আবদুল্লাহ বিন উবাই ছিলো
মদীনার একজন প্রভাবশালী ইয়াহূদী সর্দার। হিজরতের আগে মদীনাবাসীগণ তাকে নিজেদের
বাদশা নিযুক্ত করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। কিন্তু বিপুল সংখ্যক মদিনাবাসীর ইসলাম
গ্রহণ এবং মক্কা থেকে হযরত (সা:) এর মদিনায় আগমনের ফলে এই পরিকল্পনাটি বানচাল হয়ে
যায়। সেই সঙ্গে আব্দুল্লাহ বিন উবাইর আশা আকাঙ্ক্ষাও পণ্ড হয়ে যায়। এমনি সময়
মক্কাবাসীগণ তাকে এই মর্মে একটি চিঠি লিখলোঃ
তোমরা আমাদের লোকদেরকে আশ্রয় দান করেছো। আমরা খোদার
কসম করে বলছি
, হয়
তোমরা নিজেরা লড়াই করে ওখান থেকে তাদের তাড়িয়ে দাও
, নচেত আমরা সবাই মিলে তোমাদের ওপর
হামলা চালাবো
; তোমাদের
পুরুষদের কে হত্যা করবো এবং মেয়েদেরকে বাঁদি বানিয়ে রাখবো।
এই চিঠিখানি আবদুল্লাহ বিন উবাইর হতাশ
মনে কিছুটা আশার সঞ্চার করলো। কিন্তু হযরত (সা:) যথাসময়ে তার নষ্টামি প্রতিরোধ
করার জন্যে উপযুক্ত পদক্ষেপ নিলেন। তিনি তাকে এই বলে বুঝালেন যে
, ‘তুমি কি আপন পুত্র এবং
ভাইদের সঙ্গে লড়াই করতে চাও
? যেহেতু মদিনাবাসীদের (আনসার) অধিকাংশই ইতোমধ্যে ইসলাম গ্রহণ
করেছিল
, এজন্যে আব্দুল্লাহ বিন
উবাইর শেষ পর্যন্ত তার উচ্চাভিলাস থেকে বিরত হলো।

এসময়েই একবার মদিনার নেতা
সা
দ বিন মাআজ উমরা উপলক্ষে মক্কা গমন করলেন। কাবার দরজায় আবু জেহেলের সঙ্গে তার
সাক্ষাত হলো। আবু জেহেল তাকে বললোঃ
তোমরা আমাদের ধর্মত্যাগীদের আশ্রয় দান করেছো আর
তোমাদেরকে নিশ্চিনে- কা
বা
তাওয়াফ করতে দিবো
?তুমি
যদি উমাইয়া বিন খালাফের মেহমানই না হতে তাহলে এখান থেকে জিন্দা যেতে পারতে না।
একথা শুনে সা

বললেনঃ খোদার কসম
, তোমরা
যদি আমায় এতে বাধা দান করো
, তাহলে
তোমাদের পক্ষে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে (অর্থাৎ মদিনার ওপর দিয়ে বাণিজ্য
যাত্রায় ) আমি তোমাদেরকে বাধা দিবো। বস্তুত কুরাইশরা কোনরূপ নষ্টামি করলে মদিনার
ওপর দিয়ে তাদের বাণিজ্য পথ বন্ধ হয়ে যাবে
, এ ছিল তারই সুস্পষ্ট ঘোষণা।

 

কুরাইশদের ওপর চাপ প্রদান

বস্তত এ সময় কুরাইশরা
মুসলমান এবং ইসলামী আন্দোলনকে নিশ্চিহ্ন করার জন্যে যে পরিকল্পনা আঁটছিল
, তার পরিপ্রেক্ষিতে তাদেরকে জব্দ করতে
হলে তাদের ঐ বাণিজ্য পথটি দখল করে সিরিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য পথ বন্ধ করে দেওয়ার চেয়ে
উত্তম পন্থা মুসলমানদের কাছে আর কিছুই ছিল না। একমাত্র এহেন চাপের দ্বারাই
মক্কাবাসী কুরাইশদের জব্দ করা সম্ভব ছিল। তাই হযরত (সা:) এ বাণিজ্য পথটির
নিকটবর্তী ইহুদী বাসিন্দাদের সঙ্গে বিভিন্নরুপ চুক্তি সম্পাদন করে যেমন নিশ্চিন্ত
হয়েছিলেন
, তেমনি
কুরাইশদের বাণিজ্য কাফেলাকে শাঁসানোর জন্যে মাঝে মাঝে মুসলমানদের ছোট ছোট প্রহরী
দল ও পাঠানো শুরু করলেন। অবশ্য এইসব প্রহরী দলের দ্বারা না কখনো কোন খুন-খারাবী
হয়েছে আর না কোন কাফেলার ওপর লুটতরাজ চলেছে। এদের প্রেরণ করে শুধু কুরাইশদের
জানিয়ে দেয়া হয়েছিল যে
, তারা
যে পদক্ষেপই গ্রহণ করুক না কেন
, হাওয়ার গতি কোন দিকে তা বুঝে শুনেই যেনো গ্রহণ করে। তারা
যদি এখনো মুসলমানদের উত্তক্ত করতে চায়
, তাহলে তাদেরকেও আপন ব্যবসায় থেকে হাত
গুটাতে হবে।

 

হাযরামীর হত্যা

এরই মধ্যে কুরাইশগণ কখন
কি পরিকল্পনা গ্রহণ করে
, তা
জানবার জন্যে হযরত (সা:) সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে যথারীতি অবহিত থাকার চেষ্টা
করতে লাগলেন। দ্বিতীয় হিজরীর রজব মাসে তিনি বারোজন লোক দিয়ে আব্দুল্লাহ বিন
হাজারকে নাখলার দিকে পাঠালেন। জায়গাটি মক্কা ও তায়েফের মাঝখানে অবস্থিত। হযরত
(সা:) আব্দুল্লাহর হাতে একটি দিয়ে বললেনঃ এটি দু
দিন পরে খুলবে। আব্দুল্লাহ যথাসময়ে চিঠিখানা খুলে
দেখলেন
,‘নাখলা নামক স্থানে
অবস্থান করো কুরাইশদের অবস্থান জেনে নিয়ে খবর দাও।
ঘটনাক্রমে কুরাইশদের কতিপয় লোক সিরিয়া
থেকে ব্যবসায়ের পণ্য নিয়ে ঐ পথ দিয়ে আসছিল। হযরত আব্দুল্লাহ তাদের মুকাবেলা করলেন।
ফলে আমর বিন হাযরামী নামক এক ব্যক্তি নিহত হলো।এছাড়া আরো দুই ব্যক্তি কে বন্ধী করা
হলো এবং গনীমতের মাল ও যুদ্ধের পরিত্যক্ত সম্পদ সংগ্রহ করা হলো। হযরত আবদুল্লাহ
মদীনায় প্রত্যাবর্তন করে এই ঘটনার কথা বিবৃত করে হযরত (স) এর খেদমতে গণীমতের মাল
উপস্থাপন করলেন। কিন্তু হযরত (স) এতে বেজায় অসন্তুষ্ট হয়ে বললেনঃ আমি তো তোমাকে এর
অনুমতি দেয়নি। তিনি গণীমতের মাল গ্রহণেও অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন।

এই দুর্ঘটনায় নিহত ও ধৃত
ব্যক্তিগণ অত্যন্ত উত্তেজিত হলো তারা মুসলমাদের কাছ থেকে রক্তের বদলা নেবারও একটি
অজুহাত খুঁজে পেলো।

 

বদর যুদ্ধের পটভূমি

এমনি অবস্থায় দ্বিতীয়
হিজরীর শা
বান
মাসে (৬২৩ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রূয়ারী কিংবা মার্চ কুরাইশদের এক বিরাট কাফেলা সিরিয়া
থেকে প্রত্যাবর্তনকালে মুসলিম অধিকৃত এলাকার কাছাকাছি এসে পৌঁছলো। কাফেলার সঙ্গে
প্রায় ৫০ হাজার আশরাফী মূল্যের ধন-মাল এবং ৩০/৪০জনের মতো তত্ত্বাবধায়ক (মুহাফেজ )
ছিল। তাদের ভয় ছিল
, মদিনার
নিকটে পৌঁছলে মুসলমানরা হয়ত তাদের ওপর হামলা করে বসতে পারে। কাফেলার নেতা ছিল আবু
সুফিয়ান। সে এই বিপদাশংকা উপলব্ধি করেই এক ব্যক্তিকে সাহায্যের জন্যে মক্কায় পাঠিয়ে
দিল। ঐ লোকটি মক্কায় পৌঁছেই এই বলে শোরগোল শুরু করলো যে
, ‘তাদের কাফেলার ওপর
মুসলমানরা লুটতরাজ চালাচ্ছে। সুতরাং সাহায্যের জন্যে সবাই ছুটে চলো।

কাফেলার সঙ্গে যে ধন-মাল
ছিল
, তার সাথে বহু লোকের
স্বার্থ জড়িত ছিল। ফলে এ একটা জাতীয় সমস্যায় পরিণত হলো। তাই সাহায্যের ডাকে সাড়া
দিয়ে কুরাইশদের সমস্ত বড় বড় সর্দারই যুদ্ধের জন্যে বেরিয়ে পড়লো। এভাবে প্রায় এক
হাজার যোদ্ধার এক বিরাট বাহিনী তৈরি হয়ে গেল।এই বাহিনী অত্যন্ত উৎসাহ-উদ্দীপনা ও
শান-শওকতের সঙ্গে মক্কা থেকে যাত্রা করলো। এদের হৃদয়ে একমাত্র সংকল্প:মুসলমানদের
অস্তিত্ব এবার নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে হবে
, যেন নিত্যকার এই ঝঞ্ঝাট চিরতরে মিটে
যায়। বস্তত
,একদিকে
তাদের ধন-মাল রক্ষার আগ্রহ
, অন্যদিকে
পুরনো দুশমনি ও বিদ্বেষের তাড়না
এই দ্বিবিধ ক্রোধ ও উন্মাদনার সঙ্গে কুরাইশ বাহিনী মদিনা
আক্রমনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলো।

 

কুরাইশদের হামলা

এদিকে রাসূলুল্লাহ (সা:)
এর কাছেও এই পরিস্থিতি সম্পর্কে যথারীতি খবর পৌঁছতে লাগলো। তিনি বুঝতে পারলেন
, এবার সত্যসত্যই মুসলমানদের সামনে এক
কঠিন সংকটকাল উপস্থিত হয়েছে। এবার যদি কুরাইশরা তাদের লক্ষ্য অর্জনে সফলকাম হয় এবং
মুসলমানদের এই নয়া সমাজ-সংগঠনটিকে পরাজিত করতে পারে
, তাহলে ইসলামী আন্দোলনের পক্ষে সামনে
এগোনো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। এমনকি
, এর ফলে ইসলামের আওয়াজও হয়তো চিরতরে
স্তব্ধ হয়ে যেতে পারে। মদিনায় হিজরতের এ যাবত দুটি বছর ও অতিক্রান্ত হয়নি।
মুহাজিরগণ তাদের সবকিছুই মক্কায় ফেলে এসেছে এবং এখনো তারা রিক্তহস্ত। আনসার গণ
যুদ্ধ সম্পর্কে অনভিজ্ঞ। অন্যদিকে ইহুদীদেরও অনেকগুলো গোত্র বিরুদ্ধতার জন্যে
প্রস্তত। খোদ মদিনায় মুনাফিক এবং মুশরিকদের অবস্থিতি এক বিরাট সমস্যার রুপ পরিগ্রহ
করেছে। এমনি অবস্থায় কুরাইশরা যদি মদিনা আক্রমণ করে
,তাহলে মুসলমানদের এই মুষ্টিমেয় দলটি
হয়তো নিশ্চিহ্ন হয়েও যেতে পারে। আর হামলা যদি নাও করে বরং আপন শক্তি বলে
,শুধু কাফেলাকে মুক্ত করে নিয়ে যায়,তবুও মুসলমানরা নিবীর্য হয়ে পড়বে।
অতঃপর তাদেরকে জব্দ করতে আশ-পাশের গোত্রগুলোকে আর কোন বেগ পেতে হবে না। কুরাইশদের
ইঙ্গিতে তারা মুসলমানদের কে নানাভাবে উত্যক্ত করতে শুরু করবে। এদিকে মদিনার ইহুদী
,মুনাফিক এবং মুশরিকগণও মাথা তুলে
দাঁড়াবে। ফলে মুসলমানদের টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়বে। এসব কারণেই হযরত মুহাম্মদ
(সা:) সিদ্ধান্ত নিলেন যে
, বর্তমানে
যতটুকু শক্তিই সঞ্চয় করা সম্ভব
,তা নিয়েই ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে এবং মুসলমানদের কে আপন
বাহুবল দ্বারা টিকে থাকার অধিকার প্রমাণ করতে হবে।

 

মুসলমানদের প্রস্তুতি

এই সিদ্ধান্তের পর নবী
করীম (সা:) মহাজির ও আনসার গণকে জমায়েত করে তাদের সামনে সমগ্র পরিসি
তি সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরলেনঃএকদিকে মদিনার উত্তর প্রান্তে রয়েছে
ব্যবসায়ী কাফেলা আর অন্য দিকে দক্ষিণ দিক থেকে আসছে কুরাইশদের সৈন্য-সামন্ত।
আল্লাহ ওয়াদা করেছেন যে
, এর
যেকোন একটি তোমরা লাভ করবে। বলো
,তোমরা এর কোনটি মুকাবেলা করতে চাও? জবাবে বহু সাহাবী কাফেলার ওপর আক্রমণ
চালানোর আগ্রহ প্রকাশ করলেন। কিন্তু নবী করীম (সা:) এর দৃষ্টি ছিল সুদূরপ্রসারী।
তাই তিনি তার প্রশ্নটির পুনরাবৃত্তি করলেন। এরপর মুহাজির দের ভেতর থেকে মিকদাদ বিন
আমর(রা:) নামক জনৈক্য সাহাবী দাঁড়িয়ে বললেনঃ
হে আল্লাহর রাসূল! প্রভু আপনাকে যেদিকে আদেশ করেছেন
সেদিকেই চলুন। আমরা আপনার সঙ্গে আছি। আমরা বনী ইসরাঈলের মতো বলতে চাইনা
যাও তুমি এবং তোমার খোদা গিয়ে লড়াই
করো
, আমরা এখানে বসে থাকবো। ৪০

কিন্তু এ সম্পর্কে
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে আনসারদের থেকেও মতামত গ্রহণের প্রয়োজন ছিল। এজন্যে
হযরত (সা:) তাদেরকে সরাসরি সম্বোধন করে উল্লিখিত প্রশ্নটির পুনরাবৃত্তি করলেন।
এরপর হযরত সা
দ বিন
মা
আজ (রা:) দাঁড়িয়ে বললেন।
হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আপনার প্রতি ঈমান এনেছি। আপনাকে সত্য বলে মেনে নিয়েছি এবং
আপনি যা কিছু নিয়ে এসেছেন তা সবই সত্য বলে সাক্ষ্য দিয়েছি। সর্বোপরি আমরা আপনার
আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করেছি। অতএব হে আল্লাহর রাসূল! আপনি যা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন
তা-ই কার্যে পরিণত করুন। যে মহান সত্ত্বা আপনাকে সত্য সহকারে পাঠিয়েছেন
, তার কসম, আপনি যদি আমাদের নিয়ে সমুদ্রে গিয়ে ও
ঝাঁপ দেন
, তবুও
আমরা আপনার সাথে থাকবো এবং এ ব্যাপারে আমাদের একটি লোকও পিছু হঠবে না। আমরা যে শপথ
নিয়েছি
, যুদ্ধকালে তা হরফে হরফে
পালন করবো। সাচ্চা আত্মোৎসর্গীর ন্যায় আমরা শত্রুদের মুকাবেলা করবো। কাজেই আল্লাহ
খুবই শিগগিরই আমাদের দ্বারা আপনাকে এমন জিনিস দেখাবেন
, যা দেখে আপনার চক্ষু শীতল হয়ে যাবে।
অতএব
, আল্লাহর রহমত ও বরকতের
ওপর ভরসা করে আপনি আমাদের নিয়ে এগিয়ে চলুন।

এই বক্তৃতার পর স্থির করা
হলো যে
, কাফেলার পরিবর্তে
সৈন্যদেরই মুকাবেলা করা হবে। কিন্তু এটা কোনো মামুলি সিদ্ধান্ত ছিল না। কারণ
কুরাইশদের তুলনায় মুসলমানদের সংগঠন ছিল নেহাত দুর্বল। এর মধ্যে ঘোড়া ছিল মাত্র দু
’-তিন জনের কাছে। উট ছিল মাত্র সত্তরটির
মতো। যুদ্ধের সাজ-সরঞ্জাম ও ছিল অপ্রতুল। মাত্র ষাট ব্যক্তির কাছে ছিল লৌহবর্ম। এ
কারণে মাত্র কতিপয় মুসলমান ছাড়া বাদবাকী সবারই মনে ভীতির সঞ্চার হলো। তাদের অবস্থা
দেখে মনে হতে লাগলো
, যেনো
জেনে-শুনে তারা মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেছে। সূরা আনফালের নিম্নোক্ত আয়াতে এই দৃশ্যই
ফুটে উঠেছেঃ

كَمَا أَخْرَجَكَ رَبُّكَ مِن بَيْتِكَ بِالْحَقِّ وَإِنَّ فَرِيقًا مِّنَ
الْمُؤْمِنِينَ لَكَارِهُونَ
**يُجَادِلُونَكَ فِي الْحَقِّ بَعْدَمَا تَبَيَّنَ كَأَنَّمَا يُسَاقُونَ
إِلَى الْمَوْتِ وَهُمْ يَنظُرُونَ
**وَإِذْ يَعِدُكُمُ اللَّهُ إِحْدَى
الطَّائِفَتَيْنِ أَنَّهَا لَكُمْ وَتَوَدُّونَ أَنَّ غَيْرَ ذَاتِ الشَّوْكَةِ
تَكُونُ لَكُمْ وَيُرِيدُ اللَّهُ أَن يُحِقَّ الْحَقَّ بِكَلِمَاتِهِ وَيَقْطَعَ
دَابِرَ الْكَافِرِينَ
**لِيُحِقَّ الْحَقَّ وَيُبْطِلَ الْبَاطِلَ وَلَوْ كَرِهَ الْمُجْرِمُونَ 

“(হে নবী!) এই লোকগুলো তো আপন বাড়ি ঘর
থেকে তেমনি বের হওয়া উচিত ছিল
,তোমার প্রভু যেমন তোমায় সত্য সহকারে তোমার গৃহ থেকে বের করে
এনেছেন
; কিন্তু মুসলমানদের একটি
দলের কাছে এ ছিল অত্যন্ত অপছন্দনীয়। তারা সত্য সুস্পষ্টরূপে প্রতিভাত হওয়ার পরও সে
সম্পর্কে তোমার সঙ্গে তর্ক করছিল
; তাদেরকে যেন দৃশমান মৃত্যুর দিকে ঠেলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।
(সেই সময়ের কথা) স্মরণ করো
,যখন
আল্লাহ তোমাদের সঙ্গে ওয়াদা করেছিলেন
,(আবু সুফিয়ান ও আবু জেহেলের ) দুই দলের
মধ্যে থেকে যেকোন একটি তোমাদের করায়ত্ত হবে। আর তোমরা চেয়েছিল অপেক্ষাকৃত
দুর্বল(অর্থাৎ নিরস্ত্র)দলটিকে বশীভূত করতে। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা ছিল তিনি আপন
বিধানের দ্বারা সত্যকে অজেয় করে রাখবেন এবং কাফিরদের মূলোচ্ছেদ করে দিবেন
, যেন সত্য সত্য হয়েই থাকে এবং মিথ্যা
মিথ্যাই থেকে যায় -অপরাধীদের কাছে এটা যতই অপছন্দনীয় হোক না কেন।
” (সূরা আল আনফালঃ ৫)

 

মদিনা থেকে মুসলমানদের যাত্রা

যুদ্ধ সম্ভার ও রসদ
পত্রের এই দৈন্য সত্ত্বেও দ্বিতীয় হিজরীর ১২ রমজান নবী করীম (সা:) আল্লাহর ওপর
ভরসা করে মাত্র তিনশ
র মতো
মুসলমান নিয়ে মদিনা থেকে যাত্রা করেন। তারা সোজা দক্ষিণ কোণে পা বাড়ালেন
; কারণ কুরাইশদের বাহিনীটি ঐ দিক থেকে
আসছিল। ১৬ রমজান তারা বদরের নিকটে পৌঁছলেন। এটি মদিনা থেকে কিঞ্চিত দিক ৮০মাইল
দক্ষিন -পশ্চিম অবস্থিত একটি প্রান্তর। এখানে পৌঁছার পর জানা গেল যে
, কুরাইশ বাহিনী প্রান্তরের অপর
সীমান্তে এসে পৌঁছেছে। তাই হযরত(সা:) এর নির্দেশে এখানে ছাউনি ফেলা হলো।

কুরাইশদের বাহিনীটি
অত্যন্ত জাঁকালো সাজ-সজ্জা সহকারে বের হয়েছিল। এদের দলে এক সহস্রাধিক সৈন্য ছিলো
,সর্দার ছিলো প্রায় একশোর মতো।
সৈন্যদের জন্যে রসদ-পত্রেরও খুব উত্তম আয়োজন ছিল। উতবা বিন রাবিয়া ছিল সিপাহসালার।

বদরের কাছে কাছে পৌঁছে
কুরাইশ সৈন্যরা জানতে পারলো যে
, তাদের বাণিজ্য কাফেলা মুসলমানদের আয়ত্ত্বের বাইরে রয়েছে।এতে
জাররাহ ও আদী গোত্রের প্রধানগণ বললো যে
, এখন আর আমাদের যুদ্ধ করার প্রয়োজন
নেই। কিন্তু আবু জেহেল তাতে সায় দিলেন না। ফলে জাররাহ ও আদী গোত্রের লোকেরা মক্কায়
ফিরে গেল এবং বাকী সৈন্যরা সামনে অগ্রসর হলো।

যুদ্ধক্ষেত্রের যে অংশটি
কুরাইশদের দখলে ছিল
, উপযোগিতার
দিক দিয়ে তা ছিল খুবই উত্তম তাদের জমিন ছিল অত্যন্তু মজবুত। পক্ষান্তরে মুসলমানরা
যেখানে ছাউনি ফেলেছিল
,তা ছিল
লবণাক্ত ভূমি। সৈন্যদের পা তাতে দেবে যাচ্ছিল। অন্যান্য দিক দিয়েও তাদের অসুবিধা
ছিল প্রচুর। এই পরিস্থিতিতে রাতভর সমস্ত সৈন্য বিশ্রাম গ্রহণ করলো
;কিন্তু নবী করীম (সা:)সারারাত ইবাদাত
-বন্দেগীতে মশগুল রইলেন। ১৭রমজান ফজরের পর তিনি মুসলিম সৈন্যদের সামনে জিহাদ
সম্পর্কে এক উদ্দীপনাময় ভাষণ দিলেন। অতঃপর যুদ্ধের নিয়ম অনুসারে সৈন্যদের শ্রেণী
বিন্যাস করা হলো। এ বছরই মুসলমানদের প্রতি রমজানের রোজা ফরজ করা হয়েছিল। আশ্চর্যের
বিষয়
,এই পয়লা রোজার মধ্যেই
মুসলমানদের তিনগুন বেশি সৈন্যের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্যে প্রস্তুত হতে হলো। কি কঠোর
পরীক্ষা!

সে রাতে আল্লাহ তাআলার
বিশেষ রহমত স্বরুপ দুটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটলো। প্রথমত
,মুসলিম সৈন্যগণ অত্যন্ত প্রশান্তি ও
সুনিদ্রার ভেতর দিয়ে রাত যাপন করলো। প্রত্যুষে তারা সতেজ বল-বীর্য নিয়ে ঘুম থেকে
জাগলো দ্বিতীয়ত
, রাতে
খুব বৃষ্টিপাত হলো। তার ফলে লবণাক্ত জমি শক্ত হয়ে গেলো। এবং মুসলমানদের পক্ষে
ময়দান খুব উপযোগী হলো। পক্ষান্তরে এই বৃষ্টির ফলে কুরাইশদের অধিকৃত অংশ কর্দমাক্ত
হয়ে গেল এবং তাতে সৈন্যদের পা দেবে যেতে লাগলো।পরন্ত মুসলমানদের অধিকৃত অংশের নীচু
ভূমিতে পানি জমে গেল এবং তাতে তাদের ওযু-গোসল ইত্যাদির প্রচুর সুযোগ হলো। এসব
কারণে মুসলমানদের অন্তর থেকে ভয়-ভীতি ও শংকাবোধ দূর হয়ে গেল সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত
মনে তারা শত্রু সৈন্যদের মুকাবেলার জন্যে প্রস্তত হলো।

ময়দানে যখন উভয় পক্ষের
সৈন্যদল মুখোমুখি এসে দাঁড়ালো
, তখন এক অদ্ভূত দৃশ্যের অবতারণা হলো। একদিকে ছিল আল্লাহর
প্রতি ঈমান পোষণকারী তার বন্দেগী ও আনুগত্য স্বীকারকারী মাত্র ৩১৩ জন মুসলমান
, যাদের কাছে সাধারুণ যুদ্ধ সরঞ্জাম
পর্যন্ত ছিল না। অন্যদিকে ছিল অস্ত্র-শস্ত্র ও রসদ-পত্রে সুসজ্জিত এক সহস্রাধিক
কাফির সৈন্য
,যারা
এসেছে তওহীদের আওয়াজকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেয়ার কঠিন প্রতিজ্ঞা নিয়ে। যুদ্ধ শুরুর
প্রাক্কালে নবী কারীম(সা:) খোদার দরবারে হাত তুললেন এবং অতীব বিনয় নম্রতার সাথে
বললেনঃ
হে খোদা এই কুরাইশরা চরম
ঔদ্ধত্য ও অহমিকা নিয়ে এসেছে তোমার রাসূলকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে। অতএব আমায় যে
সাহায্যের প্রতিশ্রুতি তুমি দিয়েছিলে
,এখন সে সাহায্য প্রেরণ করো। হে খোদা! আজ এই মুষ্টিমেয়
দলটি যদি ধ্বংস হয়ে যায়
, তাহলে
দুনিয়ায় তোমার বন্দেগী করার আর কেউ থাকবে না।

এই যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি
কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়েছিল মুহাজিরদেরকে। এদের প্রতিপক্ষ ছিল আপন ভাই
,পুত্র এবং অন্যান্য আত্মীয় স্বজন।
কারো বাপ
, কারো
চাচা
, কারো মামা আর কারো ভাই
ছিল তার তলোয়ারের লক্ষ্যবস্তু এবং নিজ হাতে তাদের হত্যা করতে হয়েছিল এইসব কলিজার
টুকরা কে। এই কঠিন পরীক্ষায় কেবল তারাই টিকে থাকতে পেরেছিল
, যারা সাচ্চা দিলে আল্লাহর সঙ্গে ওয়াদা
করেছিলঃ যে সব সম্বন্ধকে তিনি বজায় রাখতে বলেছেন
,তারা শুধু তাই বজায় রাখবে আর যেগুলোকে
তিনি ছিন্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন
তা যতোই প্রিয় হোক না কেন তারা ছিন্ন করে ফেলবে।

কিন্তু সেই সঙ্গে
আনসারদের পরীক্ষাও কোনো দিক দিয়ে সহজ ছিল না। এ যাবত আরবের কাফির এবং মক্কার
মুশরিকদের চোখে তাদের
অপরাধছিল এটুকু যে, তারা তাদের দুশমন অর্থাৎ মুসলমানদের
কে আশ্রয় দান করেছে। কিন্তু এবার তারা প্রকাশ্যভাবেই ইসলামের সমর্থনে কাফির
মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে এসেছে। এর অর্থ হচ্ছে এই যে
, তারা তাদের জনপদটির (মদিনা) বিরুদ্ধে
গোটা আরবদেরকেই দুশমন বানিয়ে নিয়েছে। অথচ মদিনার জনসংখ্যা তখন সাকুল্যে এক হাজারের
বেশি ছিল না। এতো বড় দুঃসাহস তারা এজন্যেই করতে পেরেছিল যে
, তাদের হৃদয় আল্লাহর ও রাসূলের
মুহাব্বত এবং আখিরাতের প্রতি অবিচল ঈমানে পরিপূর্ণ হয়েছিল। নতুবা আপন ধন-দৌলত
স্ত্রী-পুত্র-পরিবারকে এভাবে সমগ্র আরব ভূমির শত্রুতার ন্যায় কঠিন বিপদের মুখে কে
নিক্ষেপ করতে পারে
?

 

কুরাইশদের পরাজয়

বস্তত ঈমানের এই স্তরে
উন্নীত হবার পরই বান্দার জন্যে আল্লাহর সাহায্য অবতীর্ণ হয়ে থাকে। বদর যুদ্ধেও তাই
আল্লাহ তাআলা এই সহায়-সম্বলহীন ৩১৩ জন মুসলমানকে সাহায্য দান করেন। এর ফলে তাদের
প্রতিদ্বন্দ্বী এক সহস্রাধিক সুসজ্জিত সৈন্য অত্যন্ত শোচনীয়ভাবে পরাজিত হলো এবং
তাদের সমস্ত শক্তি একেবারে নিঃশেষ হয়ে গেল। এই যুদ্ধে কুরাইশ পক্ষের প্রায় ৭০
ব্যক্তি নিহত হলো এবং সম সংখ্যক লোক বন্দী হলো।নিহতদের মধ্যে তাদের বড় বড় নামজাদা
সর্দারগণ প্রায় সবাই ছিল। এদের মধ্যে শায়বা
, উতবা, আবু জেহেল, জামআহ, আস, উমাইয়া প্রমুখ বিশেষ ভাবে
উল্লেখযোগ্য। এসব নামজাদা সর্দারের মৃত্যুর ফলে কুরাইশদের মেরুদণ্ড একেবারে ভেঙ্গে
পড়লো। মুসলমানদের পক্ষে প্রায় ৬ জন মুহাজির এবং ৮ জন আনসার শহীদ হলেন।

যুদ্ধে যারা বন্দী হলো, তাদের কে দু’-দুচার জন করে সাহাবীদের মধ্যে ভাগ করে
দেয়া হলো এবং নবী করীম (সা:) তাদের কে সদাচরণ করার নির্দেশ দান করলেন। ফলে
সাহাবীগণ তাদের কে এমনি আরামে রাখলেন যে
, বহুতর ক্ষেত্রে তারা নিজেরা কষ্ট
স্বীকার করলেও বন্দীদের কষ্ট দেন নি। এই সদাচরণের ফলে তাদের হৃদয়ে ইসলামের জন্যে
অনেক নম্রতার সৃষ্টি হলো। আর এটাই ছিল আন্দোলনের সবচেয়ে বড় সাফল্য। পরে এইসব
বন্দীর অনেকেই ফিদয়ার(মুক্তিপণ) বিনিময়ে মুক্তি লাভ করে। যারা গরীব অথচ শিক্ষিত
ছিল
, তাদেরকে দশদশটি শিশুকে লেখাপড়া শেখানোর বিনিময়ে
মুক্তি দেয়া হয়।

 

বদর যুদ্ধের ফলাফল ও প্রতিক্রিয়া

ফলাফল ও প্রতিক্রিয়ার দিক
দিয়ে বদর যুদ্ধ ছিল অতীব গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতপক্ষে ইসলামের দাওয়াত অগ্রাহ্য করার
দরুন মক্কার কাফের দের জন্যে যে খোদায়ী আযাব নির্ধারিত হয়েছিল
, এ যুদ্ধ ছিল তারই প্রথম নিদর্শন।
তাছাড়া ইসলাম ও কুফরের মধ্যে মূলত কার টিকে থাকবার অধিকার রয়েছে এবং ভবিষ্যতের
হাওয়ার গতিই বা কোন দিকে মোড় নেবে
, এ যুদ্ধ তা স্পষ্টত জানিয়ে দিল। এ
কারণেই একে ইসলামী ইতিহাসের পয়লা যুদ্ধ বলা হয়। কুরআন পাকের সূরা আনফালে এই যুদ্ধ
সম্পর্কে অনেক বিস্তৃত পর্যালোচনা করা হয়েছে। তবে দুনিয়ার রাজা- বাদশাহ বা
জেনারেলগণ কোন যুদ্ধ জয়ের পর যে ধরণের পর্যালোচনা করে থাকে
, এ পর্যালোচনা তা থেকে সম্পুর্ণ
স্বতন্ত্র।

এ পর্যালোচনার একটি
বৈশিষ্ট্য এই যে
, এর ওপর
একটু বিস্তৃত ভাবে দৃষ্টিপাত করলে ইসলামী আন্দোলনের প্রকৃতি এবং মুসলমানদের
প্রশিক্ষণ কর্মসূচি অত্যন্ত সুস্পষ্ট উদ্ভাসিত হয়ে উঠে।

 

বদর যুদ্ধের পর্যালোচনা এবং মুসলমানদের প্রশিক্ষণ

১. পূবেই বলা হয়েছে যে, ইসলামের আগে যুদ্ধ ছিল আরবদের একটি
প্রিয়
হবিযুদ্ধে যে মাল-পত্র
(গনিমত) হস্তগত হতো
, তার
প্রতি ছিল তাদের দুর্নিবার মোহ। এমনকি কখনো কখনো ঐ মাল-পত্রের আকর্ষণই তাদের
যুদ্ধের কারণ হয়ে দাঁড়াতো। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে যুদ্ধের উদ্দেশ্য ছিল
ধন-সম্পদের চেয়ে অনেক উন্নত সে উদ্দেশ্যকে মুসলমানদের হৃদয়-মূলে বদ্ধমূল করে নেয়া
অতীব প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। এ দিক দিয়ে বদর যুদ্ধ ছিল মুসলমানদের জন্যে একটি
পরীক্ষামূলক যুদ্ধ। মুসলমানদের হৃদয়-মূলে ইসলামী যুদ্ধের নিয়ম-নীতি ও নৈতিক আদর্শ
পুুরোপুরি বদ্ধমূল হয়েছে
, না
অনৈসলামী যুদ্ধের ধ্যান-ধারণা তাদের হৃদয়ে এখনো প্রভাব বিস্তার করে আছে
, এই যুদ্ধ ছিল তারই পরীক্ষামাত্র।

বদর যুদ্ধে কাফিরদের
মালমাত্তা যাদের হস্তগত হয়েছিল
, তারা পুরনো রীতি অনুযায়ী তাকে তাদের আপন সম্পত্তি বলেই মনে
করে বসলো। ফলে যারা কাফিরদের পেছনে ধাওয়া করা কিংবা হযরত(সা:) এর নিরাপত্তার কাজে
ব্যস্ত ছিল
,তারা
কিছুই পেল না। এভাবে তাদের পরস্পরের মধ্যে কিছুটা তিক্ততার সৃষ্টি হলো। ইসলামী
আন্দোলনের ধারক ও বাহকদের প্রশিক্ষণ দেয়ার এটাই ছিল উপযুক্ত সময়। তাই সর্ব প্রথম
তাদেরকে স্পষ্টভাবে বলা হলো যে
, গনীমতের মাল প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধের কোন পারিশ্রমিক নয়। এ
হচ্ছে আপন পারিশ্রমিকের বাইরে মালিকের তরফ থেকে দেয়া একটি বাড়তি অবদান বা পুরস্কার
বিশেষ(আনফাল)। আল্লাহর পথে যুদ্ধ করার যথার্থ প্রতিদান তো তিনি আখেরাতেই দান
করবেন। এখানে যা কিছু পাওয়া যায়
, তা কারো ব্যক্তিগত স্বত্ত্ব (হক) নয়, তা হচ্ছে আল্লাহ তাআলার একটি বাড়তি
অবদান মাত্র। কাজেই এই অবদান সম্পর্কে কারোর স্বত্ত্বাধিকার দাবির প্রশ্নই উঠে না।
এর স্বত্ত্বাধিকার হচ্ছে আল্লাহ এবং তার রাসূলের। তারা যেভাবে চান
, সেভাবেই এর বিলি-বণ্টন করা হবে। এর পর
সামনে অগ্রসর হয়ে এই বিলি-বণ্টনের নীতিমালাও বাতলে দেয়া হলো। এভাবে যুদ্ধ
সংক্রান্ত এক বিরাট প্রশ্নের নিষ্পত্তি করা হলো। মুসলমানদের কে চূড়ান্ত ভাবে বলে
দেয়া হলো যে
, তারা
দুনিয়ার ফায়দা হাসিলের জন্যে কখনো অস্ত্র ধারণ করতে পারে না
,বরং দুনিয়ার নৈতিক বিকৃতিকে সংশোধন
করা এবং আল্লাহর বান্দাদেরকে গায়রুল্লাহর গোলামী থেকে মুক্ত করার অপরিহার্য
প্রয়োজনেই তাদের শক্তি প্রয়োগ করতে হয়। তারা যখন দেখবে যে
, বিরুদ্ধ শক্তি তাদের কণ্ঠকে স্তব্ধ
করে দেয়ার উদ্দেশ্যে শক্তি প্রয়োগ করতে উদ্যত হয়েছে এবং দাওয়াত ও তাবলীগের মাধ্যমে
সংশোধন প্রচেষ্টাকে অসম্ভব করে তুলেছে
,ঠিক তখনি এরুপ পদক্ষেপ গ্রহণ করা যাবে কাজেই তারা যে
সংস্কার সংকল্প নিয়েছে
, তাদের
দৃষ্টি শুধু সেদিকেই নিবদ্ধ থাকা উচিত এবং এই লক্ষ্য অর্জনের পথে কোনরুপ অন্তরায়
হতে পারে
, এমন
কোন পার্থিব স্বার্থের দিকেই তাদের ফিরে তাকানো উচিত নয়।

২. ইসলামী জীবন ব্যবস্থায়
আমীর বা নেতার আনুগত্য হচ্ছে দেহের ভেতর রুহের সমতুল্য। তাই নেতৃত আদর্শের
পরিপূর্ণ ও নির্ভেজাল আনুগত্যের জন্যে মনকে প্রস
ত করার নিমিত্ত বারবার মুসলমানদের
দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলো। ৪১আলোচ্য যুদ্ধের গনীমতের মাল সম্পর্কেও তাই সর্বপ্রথম
লোকদের কাছে পূর্ণাঙ্গ আনুগত্যের দাবি জানানো হলো এবং তাদেরকে বলে দেয়া হলো যে
,এসব কিছুই আল্লাহ এবং তার রাসূলের
স্বত্ত্বা। এ ব্যাপারে তারা যা ফয়সালা করেন
, তাতেই সবার রাযী থাকতে হবে।

৩. সাধারণ আন্দোলনগুলোর
প্রকৃতি এই যে
, সেগুলো
আপন কর্মী ও অনুবর্তীদের মনে উদ্দীপনা সৃষ্টির জন্যে তাদের কৃতিত্বের কথা নানাভাবে
উল্লেখ করে থাকে। এভাবে খ্যাতি-যশ লাভের আকাঙ্ক্ষাকে উস্কিয়ে দিয়ে লোকদের কে ত্যাগ
তিতিক্ষার জন্যে উদ্বুদ্ধ করা হয়। বস্তত এ কারণেই বড় বড় যুদ্ধ বা বিজয় অভিযানের পর
এইসব আন্দোলন তার আত্মোৎসর্গী কর্মীদের মধ্যে বড়ো বড়ো খেতাব পদক ইনাম ইত্যাদি
বিতরণ এবং নানাভাবে তাদের পদোন্নতির ব্যবস্থা করে থাকে। ফলে একদিকে তারা আপন
কৃতিত্বের বদলা পেয়ে সন্তোষ লাভ করে এবং ভবিষ্যতে আরো অধিক ত্যাগ স্বীকারের জন্যে
উদ্বুদ্ধ হয়
, অন্যদিকে
অপর লোকদের মনেও তাদেরই মতো উন্নত মর্যাদা লাভের আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হয়। কিন্তু
ইসলামী আন্দোলনের প্রকৃতি এর সম্পূর্ণ বিপরীত। মাত্র ৩১৩ জন মুসলিম সৈন্য কতৃক এক
সহস্রাধিক কাফের সৈন্যকে পরাজিত করা এবং এক প্রকার বিনা সাজ-সরঞ্জামে কয়েকগুণ বেশি
প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিকে নির্মূল করা সত্ত্বেও তাদের কে বলে দেয়া হলোঃতারা যেন এ ঘটনাকে
নিজেদের বাহাদুরি বা কৃতিত্ব বলে মনে না করে। কারণ তাদের এ বিজয় শুধু আল্লাহর
করুণা ও অনুগ্রহ মাত্র। কেবল তারই দয়া এবং করুণার ফলে এতো বড়ো শত্রু বাহিনীকে তারা
পরাজিত করতে সক্ষম হয়েছে। কাজেই তাদের কখনো আপন শক্তি -সামর্থের ওপর নির্ভর করা
উচিত নয়
; বরং
সর্বদা আল্লাহর ওপর ভরসা করা এবং তারই করুণা ও অনুগ্রহের ওপর নির্ভর করে ময়দানে
অবতরণ করার ভেতরে নিহিত রয়েছে তাদের আসল শক্তি। যুদ্ধ শুরুর সাথে সাথে হযরত (সা:)
এক মুঠো বালু হাতে নিয়ে
শাহাদাতুল
ওজুহ
’ (চেহারা আচ্ছন্ন হয়ে যাক)
বলে কাফিরদের দিকে ছুঁড়ে মারেন। এরপরই মুসলমান সেনারা একযোগে কাফিরদের ওপর ঝাঁপিয়ে
পড়ে এবং তাদের কে ধরাশয়ী করে। অন্য লোক হলে এই ঘটনাকে নিজের
কেরামত বা অলৌকিক কীর্তি বলে ইচ্ছামত গর্ব
করতে পারতো এবং একে ভিত্তি করে তার অনুগামীরা ও নানারুপ কিস্‌সা-কাহিনীর সৃষ্টি
করতো। কিন্তু কুরআন পাকে খোদ আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে বলে দিলেনঃ
তাদেরকে (কাফিরদেরকে ) তোমরা হত্যা
করো নি
, বরং তাদের হত্যা করেছেন
আল্লাহ।
এমনকি
তিনি হযরত (সা:) কে পর্যন্ত বলে দিলেন যে
, ‘(বালু) তুমি ছুঁড়োনি,বরং ছুঁড়েছেন আল্লাহ এবং মুমিনদের কে
একটি উত্তম পরীক্ষায় সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ করা হয়েছে।
’(সূরা আনফাল,আয়াতঃ১৮)। এভাবে মুসলমানদেরকে বলে
দেয়া হলো যে
,প্রকৃত
পক্ষে সমস্ত কাজের চাবিকাঠি রয়েছে আল্লাহর হাতে এবং যা কিছু ঘটে তার নির্দেশ ও
ইচ্ছানুক্রমেই ঘটে থাকে। মুমিনদের কাজ হচ্ছে আল্লাহর ওপর পুরোপুরি নির্ভর করা এবং
সর্বাবস্থায় আল্লাহ ও রাসূলের পূর্ণ আনুগত্য করা এর ভেতরই নিহিত রয়েছে তাদের জন্যে
সাফল্য।

৪. ইসলামী আন্দোলনে জিহাদ
হচ্ছে চূড়ান্ত পরীক্ষা
, যার
মাধ্যমে আন্দোলনের অনুবর্তীদের পূর্ণ যাচাই হয়ে যায়। যখন কুফর ও ইসলামের দ্বন্দ্ব
চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হয় এবং মুমিনদের পক্ষে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ অব্যাহত রাখার
জন্যে ময়দানে অবতরণ করা ছাড়া গত্যন্তর থাকে না
, তখন সেখান থেকে তাদের পশ্চাদপসরণ করা
কিছুতেই সম্ভবপর নয়। আল্লাহর পথে যুদ্ধ করতে নেমে ময়দান থেকে পলায়ন করার অর্থ এ
ছাড়া আর কিছু হতে পারে না যে
,

ক. মুমিন যে উদ্দেশ্য
নিয়ে যুদ্ধ করতে নেমেছে
, তার
চেয়ে তার নিজের প্রাণ অধিকতর প্রিয় কিংবা

খ. জীবন ও মৃত্যু যে
প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর হাতে নিবদ্ধ এবং তার হুকুম না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যু আসতেই পারে
না আর হুকুম যখন এসে যায়
,তখন
মৃত্যু এক মুহূর্ত ও বিলম্বিত হতে পারে না
তার এই ঈমানই অত্যন্ত দুর্বল অথবা

গ. তার হৃদয়ে আল্লাহর সনষ্টি এবং আখিরাতের সাফল্যে ছাড়াও অন্য
কোন আকাঙ্ক্ষা লালিত হচ্ছে এবং প্রকৃত পক্ষে সে খোদার দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করার
জন্যে নিজেকে পুরোপুরি উৎসর্গ করতে পারেনি। যে
, ঈমানের ভেতর এর কোনো একটি জিনিসও ঠাঁই
নিয়েছে
, তাকে কিছুতেই পূর্ণাঙ্গ
ঈমান বলা যায় না। এ কারণেই ইসলামের এই প্রথম ও গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধোপলক্ষে
মুসলমানদের কে সুস্পষ্ট ভাবে বলে দেয়া হলো যে
, যুদ্ধ থেকে পশ্চাদপসরণ করা মুমিনদের
কাজ নয়। এ প্রসঙ্গে হযরত (সা:) ইরশাদ করেন
, তিনটি গুনাহের মুকাবেলায় মানুষের কোন
নেকীই ফলপ্রসূ হতে পারে নাঃ এক
,খোদার সাথে শিরক,দুই,পিতামাতার অধিকার হরণ এবং তিন,আল্লাহর পথে চালিত যুদ্ধ থেকে পলায়ন
করা।

৫. যখন পার্থিব সম্পর্ক
-সম্বন্ধের প্রতি মানুষের আকর্ষণ সঙ্গত সীমা অতিক্রম করে যায়
,তখন আল্লাহর পথে অগ্রসর হতেও তার
শৈথিল্য এসে যায়। ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিই হচ্ছে এ পথের প্রধান প্রতিবন্ধক। তাই
এই উপলক্ষে আল্লাহ তাআলা ধন-সম্পদ ও সন্তান -সন্ততির সঠিক মর্যাদা সম্পর্কে ও
মুসলমানদের অবহিত করলেন। তিনি বললেনঃ

وَاعْلَمُوا أَنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ وَأَنَّ اللَّهَ
عِندَهُ أَجْرٌ عَظِيمٌ
 

জেনে রাখো,তোমাদের ধন-সম্পদ ও তোমাদের
সন্তান-সন্ততি তোমাদের পরীক্ষায় উপকরণ মাত্র
; আল্লাহর কাছে প্রতিফল দেবার জন্যে
অনেক কিছুই রয়েছে।

(সূরা আনফাল,আয়াতঃ২৮)

বস্তত,মুমিন তার ধন-সম্পদের সদ্ব্যবহার করে
কিনা এবং সম্পদের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত আকর্ষণ হেতু আল্লাহর পথে জীবন পণ করতে তার
হৃদয়ে কিছুমাত্র সংকীর্ণতা আসে কিনা অথবা সম্পদের মোহে সত্যের জিহাদে সে শৈথিল্য
দেখায় কিনা
, ধন-সম্পদ
দিয়ে আল্লাহ শুধু তা-ই পরীক্ষা করে থাকেন। অনুরুপ ভাবে সন্তান-সন্ততি হচ্ছে
মানুষের পরীক্ষার দ্বিতীয় পত্র। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে -প্রথমত
সন্তান-সন্ততিকে আল্লাহর বন্দেগী এবং তার আনুগত্যের পথে নিয়োজিত করার পূর্ণ
প্রচেষ্টার মাধ্যমে মুমিনকে তাদের প্রতি সঠিক কর্তব্য পালন করতে হবে। দ্বিতীয়ত
,মানুষের হৃদয়ে আল্লাহ যে স্বাভাবিক
মমত্ববোধ জাগিয়ে দিয়েছেন
, তার
আধিক্যহেতু আল্লাহর পথে পা বাড়াতে গিয়ে যাতে বাধার সৃষ্টি না হয়
, তার প্রতিও লক্ষ্য রাখতে হবে।
ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততির ব্যাপারে এই মহা পরীক্ষার জন্যে প্রতিটি মুমিনের তৈরি
থাকা উচিত।

৬. ধৈর্য যে কোন
আন্দোলনেরই প্রাণবস্ত। দেহের জন্যে আত্মা যতোখানি প্রয়োজনীয়
,ইসলামী আন্দোলনের জন্যে এই গুণটি
ততোখানিই আবশ্যক। মক্কার মুসলমানরা যে দুরবস্থার মধ্যে কালাতিপাত করছিল
,সেখানেও এই গুণটি বেশি করে অর্জন করার
জন্যে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছিল। কিন্তু সেখানে শুধু একতরফা জুলুম-পীড়ন সহ্য
করা ছাড়া মুসলমানদের আর কিছুই করণীয় ছিল না। কিন্তু এখন আন্দোলন দ্বিতীয় পর্যায়ে
প্রবেশ করার দরুণ খোদ মুসলমানদের দ্বারাই অন্যের প্রতি অন্যায় আচরণ হবার আশংকা
দেখা দিল। কাজেই এই পরিবর্তিত অবস্থায়ও এ গুণটি বেশি পরিমাণে অর্জন করার জন্যে
তাগিদ দেয়া হলো। বলা হলোঃ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا لَقِيتُمْ فِئَةً فَاثْبُتُوا
وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيرًا لَّعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
**
وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ
رِيحُكُمْ ۖ وَاصْبِرُوا ۚ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ

হে ঈমানদারগণ! যখন কোন দলের সঙ্গে
তোমাদের মুকাবেলা হয়
,তখন
তোমরা সঠিক পথে থেকো এবং আল্লাহ কে বেশি পরিমাণে স্মরণ করো। আশা করা যায় তোমরা
সাফল্য অর্জন করতে পারবে। আল্লাহ এবং তার রাসূলের আনুগত্য করো এবং পরস্পর বিবাদ
করো না। (বিবাদ করলে)তাহলে তোমাদের মধ্যে দুর্বলতার সৃষ্টি হবে এবং তোমাদের
অবস্থার অবনতি ঘটবে। সবর বা ধৈর্যের সঙ্গে কাজ করো
; নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্য অবলম্বনকারীদের
সাথে রয়েছেন। (সূরা আনফাল
,আয়াত
ঃ৪৫ও৪৬)

এখানে ধৈর্যের (সবরের)তাৎপর্য হচ্ছে এইঃ

১.আপন প্রবৃত্তি ও
ভাবাবেগকে সংযত রাখতে হবে।

২.তাড়াহুড়া,ভয়-ভীতি ও উৎকণ্ঠা থেকে মুক্ত হতে
হবে।

৩.কোন প্রলোভন বা অসঙ্গত
উৎসাহকে প্রশ্রয় দেয়া যাবে না।

৪.শান্ত মন সুচিন্তিত
ফয়সালার ভিত্তিতে সকল কাজ সম্পাদন করতে হবে।

৫.বিপদ-মুসিবত সামনে এলে
দৃঢ় পদে তার মুকাবেলা করতে হবে।

৬.উত্তেজনা ও ক্রোধের
বশবর্তী হয়ে কোন অন্যায় কাজ করা যাবে না।

৭.বিপদ-মুসিবতের কারণে
অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকলে আতঙ্ক বা অস্থিরতার কারণে মনোবল হারানো যাবে না।

৮.লক্ষ্য অর্জনের
আগ্রহাতিশয্যে কোনো অসঙ্গত পন্থা অবলম্বন করা যাবে না।

৯.পার্থিব স্বার্থ ও
প্রবৃত্তির তাড়নায় নিজের কামনা-বাসনাকে আচ্ছন্ন করা এবং সে সবের মুকাবেলায়
দুর্বলতা প্রকাশ করে কোনো স্বার্থের হাতছানিতে আকৃষ্ট হওয়া যাবে না।

এখন এই পরিবর্তিত অবস্থায়
মুমিনদের আপন ধৈর্যের পরীক্ষা অন্যভাবেও দেয়ার প্রয়োজন ছিল। মানুষের ওপর
উদ্দেশ্য-প্রীতির প্রাধান্য কখনো কখনো এতোটা চেপে বসে যে
, তার মুকাবেলায় সে হক ও ইনসাফের প্রতি
পুরোপুরি লক্ষ্য রাখতে পারে না। সে মনে করে যে
, উদ্দেশ্যের খাতিরে এরুপ করায় কোনো
ক্ষতি নেই। কিন্তু ইসলামী আন্দোলন সর্বতো ভাবে একটি সত্য ভিত্তিক আন্দোলন বিধায়
স্বীয় অনুগামীকে সে কখনো হক ও ইনসাফের সীমা অতিক্রম করতে অনুমতি দেয় না। তাই কুফর
ও ইসলামের এই গুরুত্বপূর্ণ দ্বন্দ্বের সময় অন্যান্য নৈতিক ও শিক্ষামূলক
নির্দেশাবলীর সঙ্গে বিরুদ্ধবাদীদের সাথে রাজনৈতিক চুক্তির ব্যাপারেও মুসলমানদেরকে
সম্পূর্ণ হক ইনসাফভিত্তিক নির্দেশাবলী প্রদান করা হলো। এইসব নির্দেশাবলীর সারমর্ম
এই যে
, মুসলমান যেন কখনো জয়-পরাজয়
কিংবা পার্থিব স্বার্থের হাতছানিতে চুক্তিভঙ্গ না করে
, বরং আল্লাহর ওপর সম্পূর্ণ বিশ্বস্ততার
সঙ্গে যেনো চুক্তির মর্যাদা রক্ষা করে। এর ফলে তার আপন মুসলিম ভাইয়ের সাহায্য
থেকেও যদি বঞ্চিত হতে হয়
,তবুও
যেনো সে পিছপা না হয়।

বদর যুদ্ধের পর কুরআন পাকে এই গুরুত্বপূর্ণ
ঘটনা সম্পর্কে যে পর্যালোচনা করা হয়
, এ হচ্ছে তার কয়েকটি উল্লেখ বৈশিষ্ট্য।
দুনিয়ার অন্যান্য আন্দোলনের তুলনায় ইসলামী আন্দোলন যে কতোখানি উন্নত ও শ্রেষ্ট এবং
অনুবর্তীদের কে সে কি ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে
,এ থেকে তা সহজেই অনুমান করা চলে।

ওহুদ যুদ্ধ

পটভূমি

বদর যুদ্ধে মুসলমানরা
জয়লাভ করলো বটে
, কিন্তু
যুদ্ধের মাধ্যমে তারা যেনো ভীমরুলের চাকে ঢিল ছুঁড়লো। এই প্রথম যুদ্ধেই তারা
দৃঢ়তার সঙ্গে কাফিরদের মুকাবেলা করেছিল এবং কাফিরদেরকেও শোচনীয় ভাবে পরাজিত হয়ে
পিছু হটতে হয়েছিল। এ ঘটনা মুসলমানদের বিরুদ্ধে সমগ্র আরব জনগোষ্ঠীকে প্রচণ্ড ভাবে
উত্তেজিত করে দিলো। যারা এই নয়া আন্দোলনের দুশমন ছিল
, তারা এ ঘটনার পর আরো ক্ষিপ্ত হয়ে
উঠলো। তদুপরি মক্কার যে সব কুরাইশ সর্দার এ যুদ্ধে নিহত হয়েছিল
, তাদের রক্তের বদলা নেবার জন্যে অসংখ্য
চিত্ত অস্থির হয়ে উঠলো। আরবে যেকোন এক ব্যক্তির রক্তই পুরুষানুক্রমে যুদ্ধের কারণ
হয়ে দাঁড়াতো। আর এখানে তো এমন অনেক ব্যক্তিই নিহত হয়েছিল
,যাদের রক্তমূল্য অসংখ্য যুদ্ধে ও আদায়
হতে পারতো না। তাই চারদিকে ঝড়ের আলামত দেখা যেতে লাগলো। ইহুদীদের যে সব গোত্র
ইতঃপূর্বে মুসলমানদের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন করেছিলো
, তারা চুক্তির কোন মর্যাদা রক্ষা করলো
না। এমন কি তারা খোদা
,নবুয়্যাত
আখিরাত এবং কিতাবের প্রতি ঈমান পোষণের দাবি করার ফলে যেখানে মুসলমানদের সাথে
অধিকতর নৈকট্য থাকা উচিত ছিলো
,সেখানে মুশরিক কুরাইশদের প্রতিই তাদের সমস্ত সহানুভূতি উপচে
পড়তে লাগলো। তারা খোলাখুলিভাবে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে কুরাইশদে কে
উত্তেজিত করতে শুরু করলো।বিশেষত কাব বিন আশরাফ নামক বনী নাযির গোত্রের জনৈক্য
সরদার

ব্যাপারে মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি ও অন্ধ শত্রুতায় লিপ্ত হলো। এ থেকে স্পষ্টত
অনুমিত হলো যে
, ইহুদীরা
না পড়োশী হিসেবে কোন কর্তব্য পালন করবে আর না হযরত (সা:) এর সঙ্গে সম্পাদিত
চুক্তির মর্যাদা রক্ষা করবে।

এর ফলে মদিনার এই ক্ষুদ্র
জনপদটি চারদিক দিয়েই বিপদ পরিবেষ্টিত হয়ে পড়লো। অভ্যন্তরীন দিক দিয়ে মুসলমানদের
অবস্থা ছিল এমনিতেই দুর্বল
,তদুপরি
যুদ্ধের ফলে তাদেরকে আরো বেশি সমস্যার সম্মুখীন হতে হলো।

মক্কার মুশরিকদের অন্তরে
এমনিতেই মুসলমানদের কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছিল। তাদের
বড়ো বড়ো সর্দারগণ প্রতিশোধ গ্রহণের জন্যে ইতোমধ্যে প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করেছিল।
প্রত্যেক গোত্রের মনেই ক্রোধ ও উত্তেজনা কানায় কানায় পূর্ণ হয়েছিল। এমনি অবস্থায়
ইহুদীগণ কর্তৃক মক্কাবাসীকে যুদ্ধের জন্যে উদ্বুদ্ধ করারচেষ্টা আগুনে তেল ছিটানোর
কাজ করলো। ফলে বদর যুদ্ধের পর একটি বছর অতিক্রান্ত হতে না হতেই মদিনায় এই মর্মে
খবর পোঁছলো যে
, মক্কার
মুশরিকগণ এক বিরাট বাহিনী নিয়ে মদিনা আক্রমনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

 

কুরাইশদের অগ্রগতি

এই প্রেক্ষাপটে তৃতীয়
হিজরীর শাওয়াল মাসের প্রথম সপ্তাহে হযরত (সা:) কয়েকজন লোককে সঠিক খবর খবর সংগ্রহের
জন্যে মদিনার বাইরে প্রেরণ করলেন। তারা ফিরে এসে খবর দিল যে
, কুরাইশ বাহিনী মদিনার প্রায় কাছাকাছি
এসে পড়েছে। এমনকি তাদের ঘোড়গুলো মদিনার একটি চারণ ভূমি পর্যন্ত সাফ করে ফেলেছে।
এবার নবী করীস (সা:) সাহাবীদের কাছে পরামর্শ চাইলেন। কুরাইশ বাহিনীর মুকাবেলা কি
মদিনায় বসে করা হবে
, না
বাইরে গিয়ে তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করা হবে
? কোন কোন সাহাবী এই অভিমত ব্যক্ত করলেন
যে
, মুকাবেলা মদিনায় বসেই
করতে হবে। কিন্তু বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণের সুযোগ পান নি অথচ শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষায়
উদ্বেলিত এমন কতিপয় যুবক দৃঢ়তার সাথে বললেনঃ
না, বাইরের ময়দানে গিয়েই তাদের মুকাবেলা করতে হবে। অবশেষে তাদের এই দৃঢ়তা দেখে নবী করীম
(সা:) মদিনার বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলেন।

 

মুনাফিকদের ধোকাবাজি

কুরাইশগণ মদিনার একেবারে
কাছাকাছি পৌঁছে ওহুদ পাহাড়ের পাদদেশে তাদের ছাউনি ফেললো। তার একদিন পর হযরত (সা:)
জুম
আর নামাজ বাদ এক হাজার
সাহাবী নিয়ে মদিনা থেকে রওয়ানা করলেন। এদের মধ্যে বিশ্বাসঘাতক আবদুল্লাহ বিন উবাইও
ছিল। এ লোকটি দৃশ্যত মুসলমান হলেও কার্যত ছিল মুনাফিক।এর প্রভাবাধীন আরো বহু
মুনাফিক মুসলমানদের সঙ্গে যাত্রা করেছিল। কিছুদূর গিয়ে আবদুল্লাহ বিন উবাই তিন
শ লোক নিয়ে হঠাৎ যুদ্ধ হবে নাবলে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো। এখন শুধু সাত
শ সাহাবী বাকী রইলেন। এমনি নাজুক অবস্থায় মুনাফিকদের এই আচরণ ছিল গুরুতর
মনস্তাত্ত্বিক আঘাতের শামিল। কিন্তু যে সব মুসলমানের হৃদয় আল্লাহর প্রতি ‌ঈমান
, আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস এবং সত্যের
পথে শহীদ হবার আকাঙ্ক্ষায় পরিপূর্ণ ছিল
, এ ঘটনায় তাদের ওপর কোন বিরুপ
প্রতিক্রিয়ারই সৃষ্টি হলো না। তাই তারা আল্লাহর ওপর ভরসা করে সামনে অগ্রসর হলেন।

 

যুব সমাজের উদ্দীপনা

এ সময় হযরত (সা:) তার
সঙ্গী- সাথীদের অবস্থা একবার যাচাই করে নিলেন এবং অপ্রাপ্ত বয়স্ক তরুণদের ফেরত
পাঠিয়ে দিলেন। এদের মধ্যে রাফে
ও সামারাহ নামক দুটি কিশোর বালকও ছিল। কিশোরদের কে যখন
সেনাবাহিনী থেকে আলাদা করে দেয়া হচ্ছিল
, তখন রাফে তার পায়ের অগ্রভাগের ওপর ভর
করে দাঁড়ালো। যেনো লম্বায় তাকে কিছু
উঁচু দেখায়, এবং তাকে সঙ্গে নেয়া হয়। তার এই কৌশল
ফলপ্রসূও প্রমাণিত হলো। কিন্তু সামারাহ সেনাবাহিনীতে থাকবার অনুমতি না পেয়ে বললোঃ
রাফেকে যখন রেখে দেয়া হয়েছে, তখন আমাকেও থাকবার অনুমতি দেয়া উচিত।
কারণ আমি তাকে কুস্তি প্রতিযোগিতায়া পরাজিত করতে পারি।
তার এ দাবির যথার্থতা প্রমাণের জন্যে
উভয়ের মধ্যে প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করা হলো। অবশেষে সে রাফেকে পরাজিত করলো এবং
তাকেও সেনাবাহিনীতে নিয়ে নেয়া হলো। এ একটি সামান্য ঘটনামাত্র। কিন্তু এতেই আন্দাজ
করা চলে যে
, মুসলমানদের
মধ্যে আল্লাহর পথে জিহাদ করার কতখানি অদম্য আগ্রহ ছিল।

 

সৈন্যদের প্রশিক্ষণ

ওহুদ পাহাড় মদীনা থেকে
প্রায় চার মাইল দূরে অবস্খিত। হযরত (স) এমনভাবে তার সৈন্যদের মোতায়েন করলেন যে
, পাহাড় পিছন দিকে থাকলো আর কুরাইশ
সৈন্যরা রইলো সামনের দিকে। পিছন দিকে পাহাড়ের মাঝ বরাবর একটি সুড়ঙ্গ পথ ছিলো এবং
সে দিক থেকেও হামলার কিছুটা আশাংকা ছিলো। হযরত (স) সেখানে আবদুল্লাহ বিন জুবাইরকে
পঞ্চাশ জন তীরন্দাজসহ মোতায়েন করলেন। তাকে এই র্মমে নির্দেশ দিলেন যে
, এই সুড়ঙ্গ পথ দিয়ে কাঊকে আসতে দেয়া
যাবে না এবং তুমিও এখান থেকে কোন অবস্থায় নড়বে না। এমন কি যদি দেখো যে
, পাখিরা আমাদের গোশ্‌ত ছিঁড়ে নিয়ে
খাচ্ছে
, তবুও তুমি নিজের স্থান
ত্যাগ করবে না।

 

কুরাইদের সাজ-সজ্জা

এবার কুরাইশরা অত্যন্ত
আড়ম্বরপূর্ণ সাজ-সজ্জা করে এসেছিলো। প্রায় তিন হাজার সৈন্য ও প্রচুর সামান্তপত্র
তাদের সঙ্গে ছিলো। তখনকার দিনে যে যুদ্ধে মেয়েরা যোগ দান করতো
, তাতে আরবরা জীবনপণ করে লড়াই করতো।
তারা মনে করতো
, যুদ্ধে
যদি পরাজয় হয় তো মেয়েদের বেইজ্জত হবে। এ যুদ্ধেও কুরাইশ বাহিনীর সঙ্গে অনেক মহিলা
এসেছিল। এদের মধ্যে আপন পুত্র ও প্রিয়জন মারা গেছে
, এমন অনেকেই ছিলো। এতে কেউ কেউ
প্রিয়জনদের হত্যাকারীদের রক্তপান করে তবেই নিঃশ্বাস ফেলবে-এমন প্রতিজ্ঞা পর্যন্ত
করেছিলো।

 

যুদ্ধের সূচনা

কুরাইশরা তাদের
সৈন্যদেরকে খুব ভালোমতো প্রশিক্ষণ দিয়েছিলো। যুদ্ধের সূচনা-পর্বে কুরাইশ মহিলারা
দফ বাজিয়ে আবেগ ও উদ্দীপনাময় কবিতা আবৃতি করতে লাগলো। তারা যোদ্ধদেরকে বদর যুদ্ধে
নিহতদের রক্তের বদলা নেবার জন্যে অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ভাষায় উৎসাহ যোগালো। এরপর
শুরু হলো যুদ্ধ। প্রথম পর্যায়ে মুসলমানদের দিকেই পাল্লা ভারী রইলো এবং কুরাইশ
পক্ষের বহু সৈন্য নিহত হলো।তাদের সৈন্য দের মধ্যে হতাশা ও বিশৃঙ্খলা দেখা দিল।
এদিকে সুড়ঙ্গ পথের প্রহরায় নিযুক্ত সৈন্যরা যখন দেখলো যে
, মুসলমানরা মাল সংগ্রহে লিপ্ত হয়েছে
এবং দুশমনরাও ছত্রভঙ্গ হয়ে গেছে.তখন তারাও গনীমতের মাল সংগ্রহে ঝাঁপিয়ে পড়লো।
তাদের নেতা হযরত আবদুল্লাহ বিন জুবাইর বারবার তাদেরকে বিরত রাখতে চাইলেনএবং হযরত
(সা:) এর কথাও স্মরণ করিয়ে দিলেন।কিন্তু কতিপয় লোক ছাড়া কেউ তার কথা শুনলো না।

 

পশ্চাদিক থেকে কুরাইশদের হামলা

খালিদ বিন অলীদ তখন কাফির
সৈন্যদের একজন অধিনায়ক। সে এই সুবর্ণ সুযোগ কে পুরোপুরি কাজে লাগানো এবং পাহাড়ের
পেছন দিক দিয়ে ঘুরে গিয়ে সুড়ঙ্গ -পথে মুসলমানদের ওপর হামলা করলো।হযরত আবদুল্লাহ
এবং তার ক
জন
সঙ্গী শেষ পর্যন্ত সুড়ঙ্গ পথের প্রহরায় ছিলেন
,তাদের অধিকাংশই এই হামলার মুকাবেলা করলেন।কিন্তু
কাফের দের এই প্রচণ্ড হামলাকে তারা প্রতিহত করতে পারলেন না। তারা শহীদ হয়ে গেলেন।
অতঃপর দুশমনরা একে একে মুসলমানদের ওপর ঝাঁপিয়ে
পড়লো। ওদিকে যে সব পলায়নপর কাফির দূর
থেকে এই দৃশ্য দেখছিল
, তারাও
আবার ফিরে এলো।এবার দুদিক দিয়ে মুসলমানদের ওপর হামলা শুরু হলো।এই অভাবিত
পরিস্থিতিতে মুসলমানদের মধ্যে এমন আতঙ্কের সঞ্চার হলো যে
, যুদ্ধের মোড়ই সম্পূর্ণ ঘুরে গেলো।
মুসলমানেরা ছত্রভঙ্গ হয়ে এদিক ওদিক পালাতে লাগলো। এমনকি আতঙ্কের মধ্যেই গুজব ছড়িয়ে
পড়লো যে
, নবী
করীম(সা:) শহীদ হয়ে গেছেন। এই খবরে সাহাবীদের মধ্যে বাকী উদ্যমটুকুও নষ্ট হয়ে গেলো
এবং অনেকে সাহস পর্যন্ত হারিয়ে ফেললো।

 

আল্লাহর সাহায্য এবং বিজয়

এ সময় দশ-বারো জন সাহাবী
নবী করীম(সা:) কে ঘিরে রেখেছিলেন। তিনি অবশ্য আহত হয়েছিলেন। সাহাবীরা তাকে একটি
পাহাড়ের ওপর নিয়ে এলেন। অতঃপর অন্য মুসলমানরা ও জানতে পারলেন যে
, নবী করীম (সা:) সুস্থ ও নিরাপদ
আছেন।তাই তারা আবার দলে দলে তার কাছে একত্রিত হতে লাগলেন। কিন্তু এ সময় কি কারণে
যেন কাফিরদের মনোযোগ হঠাৎ অন্যদিকে নিবদ্ধ হলো এবং নিজেদের বিজয়কে পূর্ণ পরিণতি
পর্যন্ত না পৌঁছিয়েই তারা ময়দান ছেড়ে চলে গেল।

তারা যখন কিছু্‌টা দূরে
চলে গেল
, তখন
তাদের সম্ভিত ফিরে এলো। তারা পরস্পরকে বললোঃ এ আমরা কি ভুল করলাম! মুসলমানদের
সম্পূর্ণ খতম করে দেবার দুর্লভ সুযোগটিকে নষ্ট করে এমনিই চলে এলাম! এরপর তারা এক
জায়গায় থেকে পরস্পর বলাবলি করলোঃ এবার তাহলে মদিনার ওপর আর একবার হামলা করা উচিত।
কিন্তু শেষ পর্যন- আর তাদের সাহস হলো না। তারা মক্কায় ফিরে গেলো।

এদিকে নবী করীম (সা:)
চিন্তিত ছিলেন যে
,শত্রুরা
না জানি আবার ফিরে এসে আবার হামলা করে বসে। তাই তিনি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে
মুসলমানদের কে দুশমনদের পশ্চাদ্ধাবন করার নির্দেশ দিলেন। এটা ছিল অত্যন্ত নাজুক
সময়। কিন্তু যারা সাচ্চা মুমিন ছিল
, তারা আল্লাহর ওপর ভরসা করে পুনরায় জান
কুরবান করার জন্যে তৈরি হয়ে গেল। নবী করীম(সা:) হামরা-উল-আসাদ নামক স্থান পর্যন্ত
দুশমনদের পশ্চাদ্ধাবন করলেন। এ জায়গাটি মদিনা থেকে ৮ মাইল দূরে অবস্থিত। এখানে
পৌঁছে জানা গেল যে
, কুরাইশরা
মক্কায় ফিরে গেছে। তাই তিনিও মুসলমানদের নিয়ে মদিনায় ফিরে এলেন।

এ যুদ্ধে ৭০ জন সাহাবী
শহীদ হলেন। এদের মধ্যে বেশির ভাগই ছিলেন আনসার। তাই মদিনায় ঘরে ঘরে শোকের বন্যা
নেমে এলো। এ সময় হযরত (সা:) মুসলমানদের শোক প্রকাশের নিয়মাবলী সম্পর্কে অবহিত
করলেন।তিনি বললেনঃ
মাতম
করা এবং ছাতি পিটিয়ে কান্না-কাটি করা মুসলমানদের পক্ষে মর্যাদা হানিকর।

 

বিপর্যয়ের কারণ এবং মুসলমানদের প্রশিক্ষণ

ওহুদের যুদ্ধে মুসলমানদের
যে বিপর্যয় ঘটে
, তার
পেছনে মুনাফিকদের চালবাজি ও কলা কৌশলের প্রভাব ছিল সন্দেহ নেই
; কিন্তু সেই সঙ্গে মুসলমানদের নিজস্ব
দুর্বলতাও কম দায়ী ছিল না। অবশ্য ইসলামী আন্দোলন যে ধরণের মেজাজ তৈরি করে এবং তার
কর্মীদের যে রুপ প্রশিক্ষণ দিতে ইচ্ছুক
, তার জন্যে তখনও পুরোপুরি সুযোগ পাওয়া
যায় নি। আল্লাহর পথে জীবন উৎসর্গ করার এ ছিল দ্বিতীয় সুযোগ মাত্র। তাই এ ক্ষেত্রে
স্বভাবতই কিছু কিছু দুর্বলতা প্রকাশ পেলো। যেমনঃ সম্পদের মোহে কর্তব্য অবহেলা করা
, নেতার হুকুম অমান্য করা,দুশমনকে পুরোপুরি খতম করার আগে
গনীমতের মালের দিকে মনোযোগ দেয়া ইত্যাদি। এ কারণেই যুদ্ধ শেষ হবার পর আল্লাহ তাআলা
যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি অত্যন্ত বিস্তৃত ভাবে পর্যালোচনা করলেন। এ পর্যালোচনা
ইসলামের দৃষ্টিতে মুসলমানদের মধ্যে যা কিছু দোষ-ত্রুটি বাকী ছিল
, তার প্রতিটি দিককেই তিনি স্পষ্টভাবে
তুলে ধরলেন এবং সে সম্পর্কে প্রয়োজনীয় নির্দেশাবলীও প্রদান করলেন।সূরা আল ইমরানের
শেষাংশে এই নির্দেশাবলীর কথা বিবৃত হয়েছে। এখানে তার কতিপয় অংশ উদ্ধৃত করা যাচ্ছে।
এ থেকে ইসলামী আন্দোলনে যুদ্ধের স্থান কোথায় এবং ইসলামের দৃষ্টিতে যুদ্ধ সংক্রান্ত
ঘটনাবলীর ওপর কিভাবে আলোকপাত করতে হয়
, তা আর একবার উপলব্ধি করা যাবে।

 

খোদা-নির্ভরতা

মুসলমানরা যখন যুদ্ধের
জন্যে যাত্রা করেছিল
,তখন
তাদের সংখ্যা ছিল এক হাজারের মতো। পক্ষান্তরে দুশমনদের সংখ্যা ছিল তিন হাজার।
এরপরও কিছুদূর গিয়ে তিন শ
মুনাফিক
আলাদা হয়ে গেল। এবার বাকী থাকলো শুধু সাত শ
মুসলমান। তদুপরি যুদ্ধের সামান্তপত্র
ছিল কম এবং এক তৃতীয়াংশ সৈন্যও গেল বিচ্ছিন্ন হয়ে। এই নাজুক পরিস্থিতিতে কিছু
লোকের মনোবল ভেঙ্গে পড়তে লাগলো। এ সময় শুধু আল্লাহর প্রতি ঈমান এবং তার সাহায্যের
ওপর ভরসাই মুসলমানদেরকে দুশমনদের মুকাবেলায় এগিয়ে নিয়ে চললো। এ উপলক্ষে হযরত (সা:)
মুসলমানদের কে যে সান্ত্বনা প্রদান করেন
, আল্লাহ তা নিম্নোক্ত ভাষায় উল্লেখ
করেছেনঃ

إِذْ
هَمَّت طَّائِفَتَانِ مِنكُمْ أَن تَفْشَلَا وَاللَّهُ وَلِيُّهُمَا ۗ وَعَلَى
اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُونَ
** وَلَقَدْ نَصَرَكُمُ اللَّهُ بِبَدْرٍ وَأَنتُمْ أَذِلَّةٌ ۖ فَاتَّقُوا
اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
**إِذْ تَقُولُ لِلْمُؤْمِنِينَ أَلَن يَكْفِيَكُمْ أَن يُمِدَّكُمْ رَبُّكُم
بِثَلَاثَةِ آلَافٍ مِّنَ الْمَلَائِكَةِ مُنزَلِينَ
 **بَلَىٰ ۚ إِن تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا وَيَأْتُوكُم مِّن فَوْرِهِمْ هَٰذَا
يُمْدِدْكُمْ رَبُّكُم بِخَمْسَةِ آلَافٍ مِّنَ الْمَلَائِكَةِ مُسَوِّمِينَ
 **وَمَا جَعَلَهُ اللَّهُ إِلَّا بُشْرَىٰ لَكُمْ وَلِتَطْمَئِنَّ قُلُوبُكُم
بِهِ ۗ وَمَا النَّصْرُ إِلَّا مِنْ عِندِ اللَّهِ الْعَزِيزِ الْحَكِيمِ
 

স্মরণ করো, যখ,তোমাদের মধ্যকার দুটি দল নির্বুদ্ধিতা
প্রদর্শনের জন্যে প্রস্তুত হয়েছিল
, অথচ আল্লাহ তাদের সাহায্যের জন্যে
বর্তমান ছিলেন। আর মুমিনদের তো আল্লাহর ওপরই ভরসা করা উচিত। এর আগে বদরের যুদ্ধে
আল্লাহ তোমাদের শোকরী থেকে তোমাদের বেঁচে থাকা উচিত। আশা করা যায়
, এবার তোমরা কৃতজ্ঞ হবে। স্মরণ করো, যখন তুমি (হে নবী) মুমিনদের কে
বলেছিলঃ তোমাদের জন্যে এটা কি যথেষ্ট নয় যে
, আল্লাহ তিন হাজার ফেরেশতা প্রেরণ করে
তোমাদের সাহায্য করবেন। তোমরা যাতে খুশি হও এবং তোমাদের হৃদয় নিশ্চিন্ত হয়
, সে জন্যেই আল্লাহ তোমাদের কাছে একথা
প্রকাশ করলেন। বিজয় বা সাহায্য যা কিছুই হোক
, আল্লাহর কাছ থেকেই আসে। তিনি অত্যন্ত
শক্তিমান
, বিচক্ষণ।
(আলে ইমরান আয়াতঃ১২২-১২৬)

এখানে মুসলমানদের কে শেষ
বারের মতো বুঝিয়ে দেয়া হলো যে
, প্রকৃতপক্ষে বস্তগত শক্তির ওপর ভরসা করা মুসলমানদের কাজ নয়।
তাদের শক্তির আসল উৎস হচ্ছে আল্লাহর প্রতি ঈমান এবং তার সাহায্যের ওপর ভরসা।

 

ধন-সম্পদের মোহ

ওহুদে মুসলমানদের
বিপর্যয়ের আর একটি বড় কারণ হলো এই যে
, মুসলমানরা যুদ্ধের ঠিক মাঝখানেই
সম্পদের মোহে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল এবং দুশমনকে সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করার আগেই
সম্পদের দিকে আকৃষ্ট হয়েছিল। এমনকি
, যারা সুড়ঙ্গ-পথের প্রহরায় নিযুক্ত ছিল,তাদের মধ্যে পযর্ন্ত দুর্বলতা প্রকাশ
পেল। এভাবে যুদ্ধের মোড় সম্পূর্ণ ঘুরে গেল। তাই আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের হৃদয় থেকে
ধনের মোহ দূরীভূত করার জন্যে আ সময়ই মোহ সৃষ্টির একটি বড় কারণকে নিশ্চিহ্ন করে
দিলেন। অর্থাৎ এ সময় সূদকে হারাম ঘোষণা করা হলো। যারা সূদী কারবার করে
, তাদের হৃদয়ে ধনের মোহ এমনি বদ্ধমূল
হয়ে যায় যে
, তা আর
কোন মহৎ কাজের উপযোগী থাকে না।সূদের ফলেই এক শ্রেণীর মনে লালসা
, কার্পণ্য, আত্মকেন্দ্রিকতা এবং ধনের মোহ সৃষ্টি
হয়। আর এক শ্রেণীর মধ্যে জাগ্রত হয় হিংসা দ্বেষ ও ক্রোধ-বিক্ষোভ।

 

সাফল্যের চাবিকাঠি

যদি মনোবলকে সমুন্নত
রাখার জন্যে কোন ক্রিয়াশীল শক্তি বর্তমান না থাকে
, তাহলে পরাজয়ের পর তা হ্রাস পেতে
থাকবেই। ওহুদে মুসলমানদের যে পরাজয় ঘটেছিল
, তাতে কিছু লোকের মনোবল ভেঙ্গে পড়ার
আশংকা ছিল। কিন্তু এ সময় মুসলমানদের কে এই বলে আশ্বাস দেয়া হলো যে
, “ তোমাদের না নিরুৎসাহ হওয়া
উচিত আর না দুঃখ প্রকাশ করা উচিত। তোমাদেরই হবে
, যদি তোমরা খাঁটি মুমিন হও, ঈমানের ওপর অবিচল থাকো এবং তার দাবি
সমূহ পূর্ণ করতে থাকো। তোমাদের কাজ শুধু এটুকুই
; এরপর তোমাদের সমুন্নত করা এবং দুঃখ ও
দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত করার দায়িত্ব আল্লাহর। এরপর রইলো তোমাদের এই সাময়িক দুঃখ-
ক্লেশ ও পরাজয়ের প্রশ্ন। এটা শুধু তোমাদেরই ব্যাপার নয়
, তোমাদের বিরুদ্ধ দলের ওপরও এরকম
দুঃখ-মুসিবত এসে থাকে। তারা যখন মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়েও নিরুৎসাহিত হয়না
, তখন তোমরা কেন সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে
চিন্তা-ভাবনা করো
?তোমরা
তো জান্নাতের প্রত্যাশী। তোমরা কি মনে করো
, এমনিই তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ তোমাদের ভেতর কে আল্লাহর পথে জীবন
উৎসর্গ করেছে আর কে তার জন্যে প্রতিকূল অবস্থায়ও ধৈর্য অবলম্বন করতে ইচ্ছুক
, আল্লাহ তা এখন পর্যন্ত যাচাই-ই
করেননি।(আল -ইমরানঃআয়াত১৩৯-১৪২)

 

ইসলামী আন্দোলনের প্রাণবস্ত

পৃথিবীর যেকোন আন্দোলনেই
তার প্রাণবস্ত কিংবা চালিকা-শক্তিরুপে একজন কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব বর্তমান থাকে।
কিন্তু আদর্শবাদী আন্দোলনের উন্নতি বা স্থায়িত্ব কোন ব্যক্তিত্বের ওপর নির্ভরশীল
নয়
, বরং যে নীতি ও আদর্শের
ভিত্তিতে এ আন্দোলন উত্থিত হয়
, তার দৃঢ়তা ও সত্যতার ওপরই এর সবকিছু নির্ভর করে। ইসলামী
আন্দোলনের জন্যে নবীদের ব্যক্তিত্ব কতোখানি গুরুত্বপূর্ণ
, তা সহজেই অনুমেয়। কিন্তু তা
স্বত্ত্বেও এটি একটি আদর্শবাদী আন্দোলন এবং এর উন্নতি ও স্থায়িত্ব সম্পূর্ণত
ইসলামের উপস্থাপিত নীতিমালার ওপর নির্ভরশীল। এ কারণে মুসলমানদের এ কথা জানিয়ে দেয়া
প্রয়োজন হলো যে
, নবীর
মহান ব্যক্তিত্ব তাদের ভেতর বর্তমান থাকলেই কেবল তারা আল্লাহর দ্বীনের ঝাণ্ডা
সমুন্নত করবে এবং নবীর প্রত্যক্ষ নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত হলে অমনি তারা এ পথ ছেড়ে
দিয়ে অন্য কোন পথ অবলম্বন করবে
, এরুপ ধারণা যেনো তাদের মনের কোণেও ঠাঁই পায়। ইতঃপূর্বে
ওহুদের ময়দানে যখন এই মর্মে গুজব প্রচারিত হলো যে
, হযরত (সা:) শহীদ হয়ে গেছেন, তখন কিছু মুসলমানের মনোবল একেবারে
ভেঙ্গে পড়েছিল। তারা ভেবেছিল: হযরতের ছায়াই যখন চলে গেল
, তখন আর যুদ্ধ করে কি হবে! এই ভুল
ধারণা দূর করার জন্যেই এই সময় মুসলমানদের বুঝিয়ে দেয়া হলোঃ

وَمَا
مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِن قَبْلِهِ الرُّسُلُ ۚ أَفَإِن مَّاتَ
أَوْ قُتِلَ انقَلَبْتُمْ عَلَىٰ أَعْقَابِكُمْ ۚ وَمَن يَنقَلِبْ عَلَىٰ
عَقِبَيْهِ فَلَن يَضُرَّ اللَّهَ شَيْئًا ۗ وَسَيَجْزِي اللَّهُ الشَّاكِرِينَ

 দেখো,মুহাম্মদ (সা:) একজন রাসূল বৈ কিছুই নন। তার আগেও
অনেক রাসূল চলে গেছেন। এখন তিনি যদি মরে যান কিংবা নিহত হন
, তাহলে তোমরা কি পশ্চাদপসরণ করবে? মনে রেখো, যে ব্যক্তি পশ্চাদপসরণ করবে সে
আল্লাহর কোনই ক্ষতি করবে না। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দাহ হিসেবে
জীবন যাপন করবে
, তাকে
তিনি পুরস্কৃত করবেন।
”(আল
ইমরানঃ আয়াত১৪৪)

আরো বলা হলোঃ তোমরা যে দ্বীনকে বুঝে-শুনে গ্রহণ
করেছো
, তার ওপর অবিচল থাকার এবং
তাকে প্রতিষ্ঠিত করবার জন্যে তোমাদের মধ্যে হামেশা নবীর উপস্থিত মাত্র।এর ওপর
অবিচল থাকলে তোমরা নিজেরাই সুফল পাবে। এ দ্বীনের আসল শক্তি হচ্ছে এর উপস্থাপিত
সত্যতা। এর সমুন্নতি না তোমাদের শক্তি -সামর্থের ওপর আর না কোনো বিশেষ
ব্যক্তিত্বের ওপর নির্ভরশীল।

 

দুর্বলতার উৎস-১

মানুষের সমস্ত দুর্বলতার
উৎস হচ্ছে মৃত্যু-ভয়।তাই এ সময় মুসলমানদের স্মরণ করিয়ে দেয়া হলো যে
, তোমাদের মৃত্যু-ভয়ে পলায়ন করা
নিতান্তই অর্থহীন। কারণ মৃত্যুর জন্যে নির্ধারিত সময় না আসা পর্যন্ত কোন প্রাণীরই
মৃত্যু হতে পারে না। অন্য কথায়
, আল্লাহর নির্ধারিত সময়ের আগে না কেউ মরতে পারে আর না তারপর
এক মুহূর্তও কেউ বেঁচে থাকতে পারে। অতএব
, তোমাদের মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচবার
চিন্তা করার প্রয়োজন নেই
; বরং
জীবনের যেটুকু অবকাশ পাওয়া গেছে
, তা কি দুনিয়াদারিতে ব্যয়িত হচ্ছে না আখিরাতের কাজে,তা-ই শুধু চিন্তা করা উচিত। কারণ যে
ব্যক্তি শুধু দুনিয়াদারির জন্যে তার শ্রম-মেহনত নিয়োজিত করে
, তার যা কিছু প্রাপ্য তা দুনিয়ায়ই পেয়ে
থাকে।আর যে ব্যক্তি আখিরাতের কল্যাণের জন্যে কাজ করে
,আল্লাহ তাকে আখিরাতেই প্রতিফল দান
করবেন।কাজেই যারা আল্লাহর দ্বীন কবুল করার
,এর ওপর কায়েম থাকার এবং একে হারাম করবার
চেষ্টা-সাধনার সুযোগ পেয়েছে
, তাদের পক্ষে এই মহা মূল্যবান নিয়ামতটিরই কদর করা এবং এর
জন্যেই নিজেদের সবকিছু নিয়োজিত করা উচিত। এর ফলাফল অবশ্যই তাদের পক্ষে কল্যাণপ্রদ
হবে
; আখিরাতের স্থায়ী সাফল্য
তারা অর্জন করবে। আর এই নিয়ামতের যারা শোকর আদায় করবে
, আল্লাহ তাদেরকে সর্বোত্তম নিয়ামত
দ্বারা কৃতার্থ করবেন। তারা আপন মালিকের কাছ থেকে সর্বোত্তম পুরস্কারে ভূষিত হবে।

 

 

১০. ওহুদের বিপর্যয়ের পর

 

আগেই বলা হয়েছে যে, আরবের দু-একটি গোত্র ছাড়া
বাদবাকী সমস্ত গোত্রই এই নবোত্থিত ইসলামী আন্দোলনের বিরোধী ছিলো। কারণ
, এ আন্দোলন তাদের পৈত্রিক
ধর্ম ও রসম-রেওয়াজের ওপর প্রচণ্ডভাবে আঘাত হানছিলো। সেই সঙ্গে মানুষ নৈতিক দিক
থেকে উন্নত হোক এবং জুয়া
, ব্যভিচার, মদ্যপান, লুটতরাজ ইত্যাকার প্রচলিত দুষ্কৃতি পরিত্যাগ করুক, এ-ও ছিলো এ আন্দোলনের
দাবি। তাই বদর যুদ্ধের আগে এই নয়া আন্দোলনকে ধ্বংস করার বিষয়ে অনেক গোত্রই
চিন্তা-ভাবনা করছিলো। কিন্তু বদরে কুরাইরশরা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হবার ফলে তারা
কিছুটা হতোদ্যম হয়ে পড়লো এবং এর পরবর্তী কর্মপন্থা সম্পর্কে তাদের মধ্যে
দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দেখা দিলো। কিন্তু ওহুদের যুদ্ধের পর পুনরায় অবস্থার পরিবর্তন
ঘটলো। এবার আরবের বহু গোত্রই ইসলামের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ালো। এ ধরণের কয়েকটি
গোত্রের ভূমিকা এখানে উল্লেখ করা যাচ্ছে।

 

বিভিন্ন গোত্রের বিশ্বাসঘাতকতা

১. চতুর্থ হিজরীর মুহাররম
মাসে কাতান এলাকার জুফায়দ নামক একটি গোত্র মদীনা আক্রমণের পরিকল্পনা করলো। হযরত
(স) এদের মুকাবিলার জন্যে একটি ক্ষুদ্র বাহিনী নিয়ে হযরত আবু সালামাকে প্রেরণ
করলেন। শেষ পর্যন্ত আক্রমণকারীরা পালিয়ে গেলো।

২. এরপর ঐ মাসেই লেহইয়ান
নামক কুহিস্থান আ
রনার
একটি গোত্র মদীনা আক্রমণের সিদ্ধান্ত করলো। তাদের মুকাবিলার জন্যে হযরত আব্দুল্লাহ
বিন্‌ আনীস (রা)-কে প্রেরণ করা হলো। অবশেষে তাদের সর্দার সুফিয়ান নিহত হলো এবং
আক্রমণকারীরা ফিরে গেলো।

৩. একই বছর সফর মাসে
কালাব গোত্রের প্রধান আবু বারাআ হযরত (স)-এর খেদমতে হাযির হয়ে বললোঃ
আমার সঙ্গে কতিপয় লোক পাঠিয়ে দিন; আমার কওমের লোকেরা ইসলামের দাওয়াত
শুনতে চায়।
হযরত
(স) তার সঙ্গে সত্তর জন সাহাবী পাঠিয়ে দিলেন। এদের অনেকেই ছিলেন সুফ্‌ফার৪২ সঙ্গে
সংশ্লিষ্ট। কিন্তু ঐ ২ গোত্রের শাসনকর্তা আ
মের বিন্‌ তুফাইল এদেরকে ঘেরাও করে হত্যা করলো। এই
ঘটনায় হযরত (স) যারপরনাই মনোকষ্ট পেলেন। তিনি সমগ্র মাসব্যাপী ফজরের নামাযের পর ঐ
জালিমদের জন্য বদদোয়া করলেন। এই সত্তর জন সাহাবীর মধ্যে মাত্র হযরত আ
মর বিন উমাইয়া নামক একজন সাহাবীকে আমের এই বলে মুক্তি দিলো যে, ‘আমার মা একটি গোলাম মুক্ত
করার মান্নত করেছিলো
; যা এই
মান্নত হিসেবে তোকেই আমি মুক্তি দিলাম।

হযরত আমর বিন উমাইয়া যখন ফিরে আসছিলেন তখন আমের গোত্রের দুজন লোকের সঙ্গে তাঁর
পথে দেখা হলো। তিনি তাদেরকে হত্যা করলেন। মনে মনে ভাবলেন
, মের গোত্রের বিশ্বাসঘাতকতার কিছু প্রতিশোধ তো গ্রহণ করা
হলো। কিন্তু হযরত (স) এ ঘটনার কথা জানতে পেরে খুব অসন্তোষ প্রকাশ করলেন। কারণ এই
গোত্রের লোকদের তিনি ইতোমধ্যে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন এবং এ ঘটনা ছিল সেই
প্রতিশ্রুতির খেলাফ। তাই হযরত (স) এ দু
জন লোকের হত্যার ক্ষতিপূরণ দানের কথা ঘোষণা করলেন।

এভাবে আরো দুটি গোত্র বিশ্বসঘাতকতা করলো। হযরত (স)
তাদের কথা অনুযায়ী দ্বীনী শিক্ষা বিস্তারের জন্যে দশজন সাহাবীকে প্রেরণ করলেন।
কিন্তু ঐ জালিমরা বিশ্বাসঘাতকতা করলো। এর মধ্যে সাতজন সাহাবী কাফিরদের সঙ্গে লড়াই
করে শহীদ হলেন। বাকী তিনজন বন্দী হলেন। এদের মধ্যে হযরত খুবাইব (র) এবং হযরত জায়েদ
(রা) ও ছিলেন। দুশমনরা
এদেরকে মক্কায় নিয়ে বিক্রি করে দিলো। হযরত খুবাইব (সা)
ওহুদের যুদ্ধে হারেস বিন আ
মের
নামক এক ব্যক্তিকে হত্য করেছিলেন। হারেসের পুত্রগণ পিতৃহত্যার বদলা নেবার জন্যে
হযরত খুবাইব (রা)-কে কিনে নিলো। কয়েকদিন পর কাফিরদের হাতে তিনি শহীদ হলেন।
অনুরূপভাবে সুফিয়ান বিন্‌ উমাইয়া নামক এক এক ব্যক্তি হযরত জায়ে (রা)-কে নিয়ে হত্যা
করলো।

এভাবে আরবের বিভিন্ন
গোত্রের সঙ্গে মুসলমানদের নিয়মিত সংঘর্ষ চলছিলো। এতে বিরুদ্ধবাদীরাই একতরফাভাবে
নির্মমতার পরিচয় দিচ্ছিলো আর মুসলমানরা তাদের উৎপীড়ন সয়ে যাচ্ছিলো। এই সময়
ইহুদীদের সঙ্গেও সম্পর্কের অবনতি মুসলমানদের জন্যে যথেষ্ট দুশ্চি্ন্তার কারণ হয়ে
দাঁড়ালো।

 

ইহুদী আলেম ও পীরদের বিরোধিতা

পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে
যে
, মদীনায় আসার পর হযরত (স)
ইহুদী গোত্রগুলোর সঙ্গে নানারূপ চুক্তি সম্পাদন করেছিলেন এবং তাদের জান-মালের কোনো
ক্ষতি না করার ও তাদেরকে সর্বপ্রকার ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রদানের নিশ্চয়তা
দিয়েছিলেন। তথাপি ইসলামী আন্দোলনের ক্রমবর্ধমান উন্নতিতে ইহুদী আলেম ও পীরগণ
বিশেষভাবে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত চিলো। এর অবশ্য কতকগুলো কারণও ছিলো। নিম্নে তার কয়েকটি
কারণ উল্লেখ করা যাচ্ছে।

১. ধর্মীয় দিক থেকে এ
পর্যন্ত ইহুদীদের এক প্রকার অহমিকা ছিলো। খোদাপরস্তি ও দ্বীনদারির দিক দিয়ে সবাই
তাদেরকে শ্রদ্ধার পাত্র বলে গণ্য করতো। কিন্তু ইসলামী আন্দোলনের প্রসারের ফলে
তাদের এই ভ্রান্ত ধার্মিকতা ও পেশাদারী খোদাপরস্তির মুখোশ খসে পড়লো। সত্যিকার
ধার্মিকতা কাকে বলে এবং যথার্থ খোদাপরস্তির তাৎপর্য কি
, হযরত (স) -এর বক্তব্য শুনে লোকেরা তা
জানতে পরলো। ফলে ইহুদী আলেম ও পীরদের
ধর্ম ব্যবসায়েমন্দাভাব দেখা দিলো।

২. কুরআন শরীফে ইহুদি
জনগোষ্ঠী
, বিশেষভাবে
তাদের আলেম ও ধার্মিক শ্রেণীর লোকদের নৈতিকতা ও আচার-ব্যবহার সম্পর্কে খোলাখুলি
সমালোচনামূলক আয়াত নাযিল হচ্ছিলো। যেমন:
তারা মিথ্যা কথা শ্রবণকারী এবং হারাম মাল ভক্ষণকারী’ (সূরা মায়েদা: ৪২), ‘তুমি এদের অধিকাংশকেই
দেখবে পাপাচার ও সীমালংঘনের দিকে দ্রুত এগিয়ে চলছে
’ (সূরা মায়েদা: ৬২), ‘এরা সূদখোর, অথচ এদের জন্যে সূদ নিষিদ্ধ করা হয়েছিলো’, ‘এরা লোকদের ধন-মাল খেয়ে
ফেলে
’ (সূরা নিসা: আয়াত ১৬১)
ইত্যাদি। এছাড়া বাকারা
, মায়েদা, আলে-ইমরান প্রভৃতি সূরায় এ ধরনের আরো
বহু মন্তব্য বিধৃত হয়েছে। এসব মন্তব্য শুনে মাত্র কতিপয় সত্যসন্ধ লোক ছাড়া তাদের
বেশির ভাগ লোকই অত্যন- ক্ষুদ্ধ হলো এবং অন্ধভাবে ইসলামী আন্দোলনের বিরোধিতায় লেগে
গেলো।

৩. ইসলামের ক্রমবর্ধমান
শক্তি দেখে তারা স্পষ্টত আশংকাবোধ করছিলো যে
, একদিন না একদিন এর সামনে তাদের মাথা
নত করতে হবেই।

এসব কারণেই ইহুদীরা
ইসলামী আন্দোলনের ঘোরতর দুশমন বনে গেলো।

 

বনী কায়নুকার যুদ্ধ

বদরের মুসলমানদের জয়লাভের
পরই ইহুদীদের সর্বপ্রথম চৈতন্যোদয় হলো। তারা গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করলো যে
, ইসলাম একটি অপরাজেয় শক্তির রূপ
পরিগ্রহ করে চলেছে। তাই বদর যুদ্ধের অব্যবহিত পরই- দ্বিতীয় হিজরীর শাওয়াল মাসে-
ইহুদীদের বনী কায়নুকা গোত্র মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলো এবং হযরত (স)
এর সাথে সম্পাদিত চুক্তি ভেঙে দিলো।
এই যুদ্ধের একটি মুখ্য কারণ ছিলো এইঃ এক ইহুদী জনৈক মুসলিম মহিলার শ্লীলতাহানি
করে। এ ঘটনায় উক্ত মহিলার স্বামী ক্রুদ্ধ হয়ে একজন ইহুদীকে মেরে ফেলে। এরপর
ইহুদীরা একজন মুসলমানকে হত্যা করে। হযরত (স) বিষয়টির আপোষ-রফার চেষ্টা করলেন।
কিন্তু ইহুদীরা ঔদ্ধত্যের সঙ্গে বললো:
আমরা বদরে পরাজিত কুরাইশ নই। আমাদের সঙ্গে যখন বেধে
গেছেই
, তখন যুদ্ধ কাকে বলে তা
আমরা দেখিয়ে দেবো।

এভাবে চুক্তির অমর্যাদা
করে ইহুদীরা যখন যুদ্ধের হুংকার ছাড়লো
, তখন হযরত (স)-ও যুদ্ধের জন্যে
প্রস্তুতি নিলেন। ইহুদীরা একটি কিল্লার মধ্যে ঢুকে আত্নরক্ষার ব্যবস্থা করলো।
কিল্লাটি পনেরো দিন অপরাধের পর স্থির করা হলো যে
, ইহুদীদের নির্বাসিত করা হবে। ফলে সাত
ইহুদীকে নির্বাসিত করা
হলো।

 

কাব বিন আশরাফের হত্যা

কাব বিন আশরাফ ছিলো ইহুদীদের একজন
খ্যাতনামা কবি। সে যুগে কবিদের অত্যন্ত প্রভাব ছিলো। তাই বদর যুদ্ধের পর এই লোকটি
এমন উত্তেজনাপূর্ণ কবিতা রচনা করতে লাগলো যে
, মক্কায় মুসলমানদের বিরুদ্ধে আগুন
জ্বলে উঠলো। বদর যুদ্ধে নিহতদের সম্পর্কে সে অত্যন্ত দরদপূর্ণ মার্সিয়া রচনা করলো
এবং মক্কায় গিয়ে তা লোকদের শুনাতে লাগলো। অতঃপর সে মদীনায় এসে হযরত (স)-কে হত্যা
করার নানারূপ আপত্তিকর কবিতা রচনা করলো এবং তাঁর বিরুদ্ধে লোকদেরকে উত্তেজিত করতে
লাগলো। এমন কি
, একবার
একটি নিমন্ত্রণের ভাব করে সে হযরত (স)-কে হত্যা করার ষড়যন্ত্র পর্যন্ত করলো। এ
অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে লোকটি সম্বন্ধে কি ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়
, সে সম্পর্কে হযরত (স) সাহাবীদের সাথে
পরামর্শ করলেন। অবশেষে তাঁর সম্মতিক্রমে তৃতীয় হিজরীর রবিউল আউয়াল মাসে মুহাম্মদ
বিন মুসলিমা (রা) কা
ব বিন
আশরাফকে হত্যা করেন। ৪৩

 

বনু নযীরের নির্বাসন

বনু নযীর গোত্রের ইহুদীগণ
কয়েকটি ব্যাপারে বিশ্বাসঘাতকতা করলো। তারাও হযরত (স)-কে হত্যা করার উদ্দেশ্যে
কয়েকবার গোপন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলো। এ উদ্দেশ্যে মক্কার কুরাইশরাও তাদেরকে উস্কানি
দিলো। তাদের এই আচরণ যখন সীমা অতিক্রম করে গেলো
, তখন হযরত (স) তাদের কিল্লা অবরোধ করে
ফেললেন। এই অবরোধ ১৫৫ দিন পর্যন্ত অব্যাহত রইলো। অবশেষে তারা এই মর্মে সন্ধি করলো
যে
, উটের পিঠে চাপিয়ে যতটুকু
সম্ভব
, ততোটুকু মাল-পত্র নিয়ে
তারা মদীনা ছেড়ে চলে যাবে। এই সন্ধি অনুযায়ী তাদের বহু সর্দার খায়বর চলে গেলো।
তারা নিজেদের সঙ্গে বহু সামান্তপত্র নিয়ে গেলো। যে সব সামান তারা নিতে পারেনি তা-ই
শুধু ফেলে গেলো।

এবার মুসলমানদের উভয় দুশমন অর্থাৎ
মুশরিক আরব (বিশেষত মক্কার কুরাইশ) এবং ইহুদীগণ মিলে ইসলামকে ধ্বংস করার বিষয়ে
চিন্তা করতে লাগলো। অবশেষে তারা সবাই মিলে মদীনা আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিল এবং এর
জন্যে প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করে দিলো। প্রথম দিকে হযরত (স) এই প্রস্তুতির কথা
জানতে পেরে তাদের মুকাবিলার জন্যে মুসলমানদের একটি কাহিনী নিয়ে কিছু দূর অগ্রসরও
হয়েছিলেন। কিন্তু দুশমানরা মুকাবিলা না করে পালিয়ে গেলো। এভাবে পঞ্চম হিজরীর
মুহররম মাসে একবার তিনি
জাতুরাকাএবং রবিউল আউয়াল মাসে আর একবার দমমাতুল জুনদালপর্যন্ত অভিযান চালালেন।

 


১১. খন্দকের
যুদ্ধ


মদীনা থেকে বেরিয়ে গিয়ে
বনু নযীর গোত্রের লোকেরা ইসলামের বিরুদ্ধে এক বিরাট ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলো। তারা
আশপাশের গোত্রগুলো মুসলমানদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে তুললো। মক্কায় গিয়ে
কুরাইশদেরকে তারা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করলো এবং এই মর্মে প্রস্তাব দিলো যে
, সবাই মিলে এক সংগে হামলা
করলে এই নয়া আন্দোলনকে খুব সহজে ধ্বংস করে দেয়া যাবে। কুরাইশরা এরূপ প্রস্তাবের
জন্যে আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলো। অবশেষে ইহুদী ও কুরাইশদের সমবায়ে প্রায় দশ হাজার
লোকের এক বিরাট বাহিনী গঠিত হলো।

হযরত (স) মদীনা আক্রমণের
এই বিপুল আয়োজন সম্পর্কে সাহাবীদের সঙ্গে পরামর্শ করলেন। হযরত সালমান ফারেসীর (রা)
পরামর্শ দিলেন যে
, এতো
বড়ো বাহিনীর সঙ্গে খোলা ময়দানে মুকাবিলা করা সমীচীন হবে না। আমাদের সৈন্যদেরকে
মদীনার নিরাপদ স্থানেই থাকতে হবে এবং দুশমনরা যাতে সরাসরি হামলা করতে না পারে
, সেজন্যে নগরীর চারদিকে পরিখা (খন্দক)
খনন করতে হবে। ৪৪ এই অভিমতটি সবার মনোপুত হলো এবং পরিখা খননের প্রস্তুতি চলতে
লাগলো।

 

খন্দকের প্রস্তুতি

মদীনার তিন দিক ঘর-বাড়ি ও
খেজুর বাগান দ্বারা পরিবেষ্টিত আর একদিক মাত্র উন্মুক্ত ছিলো। হযরত (স) তিন হাজার
সাহাবী নিয়ে সে উন্মুক্ত দিকেই পরিখা খননের আদেশ দিলেন। পঞ্চম হিজরীর ৮ জিলকদ এই
খনন কার্য শুরু হলো। হযরত (স) নিজে পরিখার খনন কাজ উদ্বোধন করলেন এবং প্রতি দশজন
লোকের মধ্যে দশ গজ ভূমি বন্টন করে দিলেন। পরিখার প্রস্ত পাঁচ গজ এবং গভীরতা পাঁচ
গজ। বিশ দিনে তিন হাজার মুসলমান এ বিরাট পরিখা খনন করে ফেললেন। পরিখা খননকালে হযরত
(স) সকল লোকের সঙ্গে কাজে ব্যস্ত রইলেন। ঘটনাক্রমে এক জায়গায় একটি বিরাটাকার পাথর
সামনে পড়লে। সেটাকে কোনো প্রকারেই ভাঙা যাচ্ছিলো না। হযরত (স) সেখানে গিয়ে এরূপ
জোরে কোদাল মারলেন যে
, পাথরটি
ভেঙে চুরমার হয়ে গেলো। এ ঘটনাও নবী করীম (স)-এর একটা বিশিষ্ট মু
জিজা।

 

কাফিরদের হামলা

কাফিরদের সৈন্য বাহিনী
তিন দলে বিভক্ত হয়ে তিন দিক থেকে মদীনার ওপর হামলা করলো। এই হামলা ছিলো অত্যন্ত
প্রচণ্ড ও ভয়াবহ। কুরআন পাকের সূরা আহযাব এর ১০ এবং ১১ নং আয়াতে নিম্নোক্ত ভাষায়
এই হামলার চিত্র আঁকা হয়েছেঃ

যখন দুশমনরা ওপর (পূর্ব)
ও নীচের (পশ্চিম) দিক থেকে তোমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো
, যখন চক্ষু ফেটে যাবার উপক্রম হলো এবং
কলিজা মুখের কাছে আসতে লাগলো আর তোমরা খোদা সম্পর্কে নানারূপ সন্দেহ করতে লাগলে
, ঠিক তখন মুমিনদের পরীক্ষার সময় এলো
বেং তীব্রভাবে ভূ-কম্পন সৃষ্টি হলো।

এটা ছিলো বাস্তবিকই
অত্যন্ত কঠিন পরীক্ষার সময়। একদিকে প্রচণ্ড শীতকাল
, খাদ্য-দ্রব্যের অভাব, উপর্যুপরি কয়েক বেলা অনশন, রাতের নিদ্রা আর দিনের বিশ্রাম উধাও, প্রতিটি মুহূর্ত জীবনের ভয়, মালমাত্তা ও সন্তানাদি দুশমনের আঘাতের
মুখে আর অন্যদিকে বেশুমার শত্রু সৈন্য। এমনিতরো সংকটাবস্থায় যাদের ঈমান ছিলো
সাচ্চা ও সুদৃঢ়
, কেবল
তারাই সত্যের পথে অবিচল থাকতে পারছিলো। দুর্বল ঈমানদার ও মুনাফিকগণ এ পরিস্থিতির
আদৌ মুকাবিলা করতে পারছিলো না
; বরং মুসলমানদের সমাজ-সংগঠনে যে সব মুনাফিক অনুপ্রবেশ
করেছিলো
, তারা এ
সময় খোলাখুলিভাবে আত্নপ্রকাশ করলো। তারা বলতে শুরু করলো:
আল্লাহ ও তাঁর রাসূল আমাদের কাছে বিজয়
ও সাহায্যের যে ওয়াদা করেছিলেন
, তা সম্পূর্ণ ধোকা।’ (আহযাব:আয়াত ১২)। এর পাশাপাশি তারা
নিজেদের জান বাঁচানোর জন্যে নানারূপ বাহানা তালাশ করতে লাগলো এবং:
হে মদীনাবাসী! ফিরে চলো, আজ আর তোমাদের রক্ষা নেই।তারা নবী করীম (স) -এ সামনে এসে বলতে
শুরু করলোঃ
আমাদেরকে
ঘর-বাড়িতে থেকে আত্নরক্ষা করার অনুমতি দিন
; আমাদের বাড়ি-ঘর সম্পূর্ণ অরক্ষিত।’ (আহযাব: আয়াত ১৪)।

কিন্তু যাদের ভেতর যথার্থ
ঈমান ছিলো এবং যারা ঈমানের দাবিতে ছিলো সত্যবাদী
, এ সময় তাদের অবস্থা ছিলো সম্পূর্ণ
ভিন্ন। তারা কাফিরদের সৈন্য-সামন্ত দেখে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে উঠলো:

আল্লাহ এবং রাসূল তো আমাদের সঙ্গে এরই
(অবস্থার) ওয়াদা করেছিলেন। পরন্ত এ অবস্থা দেখে তাদের ভেতর ঈমানের ভাবধারা আরো
সতেজ হয়ে উঠলো এবং অধিকতর আনুগত্য ও আজ্ঞানুবর্তিতার জন্যে তারা প্রস্তত হলো। এই
কঠিন অবস্থা তাদের ভেতরে অনু পরিমাণও পরিবর্তন ঘটাতে পারলো না। (সূরা আহযাব: ২২ ও
২৩ আয়াত)

দুশমনরা প্রায় এক মাসকাল
মদীনা অবরোধ করে রইলো। এই অবরোধ এতো কঠিন ছিল যে
, মুসলমানদেরকে একাধিক্রমে তিন-চার বেলা
পর্যন্ত অনশনে কাটাতে হলো। এভাবে অবরোধ অত্যন্ত কঠিন ও বিপজ্জনক রূপ পরিগ্রহ করলো।
কিন্তু তা সত্ত্বেও অবরোধকারীরা কিছুতেই পরিখা পার হতে পারলো না। এ কারণে তারা অপর
পারেই অবস্থান করতে লাগলো। হযরত (স) তাঁর সৈন্যদেরকে পরিখার বিভিন্ন স্থানে
মোতায়েন করলেন। কাফিররা বাহির থেকে পাথর ও তীর ছুঁড়তে লাগলো। এদিক থেকেও তার প্রত্যুত্তর
দেয়া হলো। এরই ভেতর বিক্ষিপ্তভাবে দু-একটি হামলাও চলতে লাগলো। কখনো কখনো কাফিরদের
আক্রমণ এতো তীব্রতর রূপ ধারণ করতে লাগলো যে
, তাদেরকে পরিখার এপার থেকে প্রতিহত
করার জন্যে পূর্ণ দৃঢ়তর সাথে মুকাবিলা করতে হলো। এমন কি এর ফলে দু-একবার নামায
পর্যন্ত কাযা হয়ে গেলো।

 

আল্লাহর সাহায্য

অবরোধ যতো দীর্ঘায়িত হলো, হানাদাদের উৎসাহও ততোটা হ্রাস পেতে
লাগলো। দশ-বারো হাজার লোকের খানাপিনার ব্যবস্থা করা মোটেই সহজ কাজ ছিলো না। তদুপরি
ছিলো প্রচণ্ড শীত। এরই মধ্যে একদিন এমনি প্রচণ্ড বেগে ঝড় বইলো যে
, কাফিরদে সমস্ত ছাউনি উড়ে গেলো। তাদের
সৈন্য-সামন্ত ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে গেলো। তাদের ওপর যেন খোদার মূর্তিমান আযাব নেমে এলো।
আর বাস্তবিকই আল্লাহ তা
আলা
মুসলমানদের জন্যে রহমত এবং কাফিরদের জন্যে আযাব হিসেবেই এ ঝড় প্রেরণ করেছিলেন। এই
ঘটনাকে আল্লাহ তাঁর একটি অনুগ্রহরূপে আখ্যায়িত করে বলেছেনঃ

হে মুমিনগণ! খোদার সেই অনুগ্রহের কথা
স্মরণ করো
, যখন
তোমদের ওপর সম্মিলিত বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো আর আমি তাদের ওপর প্রচণ্ড ঝঞ্ঝা বইয়ে
দিলাম এবং এমন সৈন্য (ফেরেশতা) পাঠালাম
, যা তোমরা দেখতে পাওনি। (সূরা আহযাব:
আয়াত ৯)

তাই কাফিরগণ এ পরিসিতির মুকাবিলা করতে পারলো না। তাদের
মেরুদণ্ড অচিরেই ভেঙে পড়লো। অবস্থা বেগতিক দেখে ইহুদীরা আগেই কেটে পড়েছিলো। এখন
বাকী রইলো শুধু কুরাইশরা। তাই তাদেরও ফিরে যাওয়া ছাড়া গত্যন্তর রইলো না। এভাবে
শুধু আল্লাহর অনুগ্রহ এবং তাঁর অদৃশ্য সাহায্যে মদীনার আকাশে ঘনীভূত ঘনঘটা
আপনা-আপনি কেটে গেলো। কুরআন মজীদে এই যুদ্ধের কাহিনী যে ভঙ্গিতে বর্ণিত হয়েছে এবং
তাতে মুসলমানদের প্রশিক্ষণের জন্যে যে সব উপাদান রয়েছে
, তার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় নিম্নে
উদ্ধৃত করা যাচ্ছে।

 

আল্লাহর অনুগ্রহের ওপর ভরসা

মুমিনের প্র্যয় হচ্ছে এই
যে
, প্রকৃত শক্তি আল্লাহর
হাতে নিবদ্ধ। বিশ্বজাহানে যা কিছু ঘটে
, তা শুধু তাঁরই অভিপ্রায় ও হুকুম
অনুসারে ঘটে থাকে। মুমিন তার কোনো সাফল্যকেই আপন চেষ্ট-সাধনা বা নিজস্ব শক্তির ফল
মনে করে না
; বরং
তাকে মনে করে আল্লাহ তা
আলার
অনুগ্রহ (ফযল)। দৃষ্টন্ত স্বরূপ বলা যায়ঃ খন্দক যুদ্ধের সময় দশ-বারো হাজার কাফির
সৈন্য তিন হাজার মুসলমানের কোনোই ক্ষতি করতে পারলো না
; বরং তাদেরকে দিশেহার হয়ে ফিরে যেতে
হলো। এই পরিস্থিতিকে কিছু মুসলমান হয়তো নিজেদের চেষ্টা-তদবিরের (পরিখা খননের) ফল
মনে করতে পরতো। কিন্তু আল্লাহ তা
আলা তাদেরকে এই দুর্বলতা থেকে বাঁচানোর জন্যে পূর্বাহ্নে
ইরশাদ করলেনঃ
হে
ঈমানদারগণ! আল্লাহর সেই অনুগ্রহের কথা স্মরণ করো
, যখন তোমাদের ওপর সম্মিলিত বাহিনী
ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো এবং আমরা তাদের ওপর প্রচণ্ড ঝড় বইয়ে দিলাম আর এমন সৈন্য পাঠালাম
, যা তোমরা দেখতে পাওনি(আহযাবঃ ৯)

বস্তত ইসলামী আন্দোলনের
অনুবর্তীদের জন্যে এরূপ নৈতিক প্রশিক্ষণই একান্ত প্রয়োজন। তাদের প্রতি মুহূর্ত এটা
স্মরণরাখা আবশ্যক যে
, প্রতিদ্বন্দ্বী
শক্তি যতো বড়োই হোক না কেন
, তারা
শুধু আল্লাহর অনুগ্রহের ওপরই ভরসা করবে এবং তাঁকেই সমস্ত কাজের নিয়ামক মনে করে
দ্বীন-ইসলামের জন্যে সর্বাত্নক চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকবে।

 

ঈমানের দাবি যাচাই

মানুষের ঈমানের পরীক্ষা
হয় দুঃখ-কষ্ট ও মুসিবতের সময়। তখন সে নিজে যেমন নিজের অবস্থাটা উপলব্ধি করতে পারে
, তেমনি অপরেও আন্দাজ করতে পারে যে, এই পথে সে কতোখানি অবিচল থাকতে সক্ষম।
স্বাভাবিক অবস্থায় বহু লোক সম্পর্কেই এটা অনুমান করা যায় না যে
, উদ্দেশ্যের প্রতি স্বাভাবিক ভালবাসা এ
জীবন পণ করার সংকল্পে তারা বাস্তবিকই কতোটা প্রস্তুত
, বরং কখনো কখনো তারা নিজেরাই নিজেদের
সম্পর্কে একটা ধোকায় পড়ে থাকে। কিন্তু যখন কোনো সংকটকাল আসে
, তখন আসল ও মেকীর পার্থক্যটা অত্যন্ত
সুস্পষ্ট হয়ে উঠে। খন্দক যুদ্ধ এই কাজটিই করেছে। মদীনার মুসলমানদের দলে এক বিরাট
সংখ্যক মুনাফিক ও মেকী ঈমানদার ঢুকে পড়েলিলো। তাদের সত্যিকার পরিচয়টা সাধারণ
মুসলমানদের সামনে উদঘাটন করার প্রয়োজন ছিলো। তাই এই সংকটের মাধ্যমে তাদের মুখোসটি
খসে পড়লো। ক্রমাগত পরিখা খনন করা
, খানাপিনা ও আরাম-আয়েশ ত্যাগ করে রাত-দিন একাকার করে দেয়া, একটি বিরাট বাহিনীর মুকাবিলার জন্যে
জীবন হাতে নিয়ে তৈরী থাকা
, সর্বোপরি
কুড়ি-বাইশ দিন পর্যন্ত ক্রমাগত ভীতি ও শংকার মধ্যে রাতের ঘুম ও দিনের বিশ্রাম
হারাম করে দেয়া কোনো সহজ কাজ ছিলোনা। তাদের অনেকেই বরং বলতে লাগলো:
রাসূল আমাদের কাছে বিজয় ও সাহায্যের
ওয়াদা করেছিলেন
; কিন্তু
এখন তো দেখছি হাওয়া ঘুরে যাচ্ছে। আমরা বুঝতে পেরেছি
, আল্লাহ ও রাসূল আমাদের কাছে যে ওয়াদা
করেছিলেন তা নিছক একটি ধোকা মাত্র।
’ (আহযাব)। কিছু লোক আবার নানারকম বাহানা
তালাশ করে ফিরছিলো। তারা আপন ঘর-বাড়ির হেফাজতের বাহানায় ময়দান থেকে সরে পড়লো।
পক্ষান্তরে আল্লাহর যে সব বান্দাহ সাচ্চা ঈমানের অধিকারী ছিলো
, তারা এ অবস্থায় স্বতন্ত্র ভূমিকা
গ্রহণ করলো। তারা শত্রু সৈন্যদেরকে এগিয়ে আসতে দেখেই বলতে লাগলো:
ঠিক ঠিক এমনি অবস্থার কথাই আল্লাহ এবং
রাসূল আমাদেরকে আগে জানিয়েছিলেন
, আল্লাহ ও রাসূল তো এরই ওয়াদা করেছিলেন আমাদের কাছে। আল্লাহ
ও রাসূল তো সত্য কথাই বলেছেন। এই অবস্থায় তাদের ভেতর ঈমানের শক্তি আরো বৃদ্ধি পেলো
এবং তারা অধিকতর আনুগত্য ও ফর্মাবরদারির জন্যে প্রস্তুত হলো।
’ (আহযাব)

 

দুর্বলতার উৎস-২

জান ও মালের ক্ষতির
আশঙ্কা হচ্ছে মানুষের সবচাইতে বড়ো দুর্বলতা
; বরং বলা চলে, সমস্ত দুর্বলতার মূল উৎস। আল্লাহর
সত্ত্বা ও তাঁর গুণাবলী সম্পর্কে ইসলাম যে ধরণের ঈমান আনার দাবি জানায়
, তাতে মূলগতভাবে এই আকীদা শামিল রয়েছে
যে
, জীবন-মৃত্যু, লাভ-ক্ষতি ইত্যাদি সবকিছুই আল্লাহর
হাতে নিবদ্ধ। অপর কোনো শক্তি মৃত্যুকে বিলম্বিত করতে পারে না। এমনি প্রত্যয় এবং
এমনি ঈমানই হচ্ছে শক্তির মূল ভিত্তি। এই ভিত্তি যতোটা দুর্বল হবে
, মুসলমানের প্রতিটি কাজে ততোটা
দুর্বলতাই প্রকাশ পাবে। তাই এই দুর্বলতাকে দূর করার জন্যে সুস্পষ্টভবে জানিয়ে দেয়া
হলোঃ
হে নবী! তাদেরকে বলে দিন
যে
, তোমরা যদি মৃত্যু বা
হত্যার ভয়ে পালাতে চাও তো পালিয়ে দেখ
; এরূপ পলায়নে তোমাদের কোনোই ফায়দা হবে
না। তাদেরকে আরো বলে দিন যে
, (তারা চিন্তা করে দেখুব) আল্লাহ যদি তাদের কোনো ক্ষতি করার
সিদ্ধান্ত নেন
, তাহলে
তাদেরকে আর কে বাঁচাতে পারে
? আর যদি আল্লাহ সিদ্ধান্ত নেন তাদের কোনো উপকার করার, তাহলে তাঁকে আর কে প্রতিরোধ করতে পারে? (তাদের স্মরণ রাখা উচিত যে,) আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে না
পাবে পৃষ্ঠপোষক আর না পাবে মদদ্গার।
’ (আহযাব: আয়াত ১৭)

 

রাসূলের অনুকরণীয় আদর্শ

এই যুদ্ধ সংক্রান্ত
আলোচনার মধ্যেই মুসলমানদেরকে এ কথা জানিয়ে দেয়া হলো যে
, রাসূল (স) -এর জীবন হচ্ছে তোমাদের
জন্যে অনুকরণীয় আদর্শ। তবে যারা আল্লাহ তা
আলার দীদার এবং আখিরাতের প্রাপ্য পুরস্কারের
প্রত্যাশা করে এবং আল্লাহকে খুব বেশি পরিমাণ স্মরণ করে
, এ আদর্শ থেকে কেবল তারাই ফায়দা হাসিল
করতে পারে। এ প্রসঙ্গে ইসলামপন্থীদের মনোবল বজায় রাখা এবং চরম সংকটকালে তাদের
অন্তরকে সুদৃঢ় রাখার জন্যে পূর্ণ ধৈর্য-স্থৈর্য
, কঠোর সংকল্প ও খোদা-নির্ভরতার কিছু
নমুনা পেশ করা হলো। যারা আল্লাহর দ্বীনকে বাস্তবে কায়েম কতে ইচ্ছুক এবং এ
উদ্দেশ্যেই এ পথের অগ্রপথিক
, খোদার সেইসব বান্দার জন্যে এ নমুনা কিয়ামত পর্যন্ত
অনুকরণযোগ্য হয়ে থাকবে। তাই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই এ নমুনা তাদের সামনে রাখা
উচিত। কারণ এ-ই হচ্ছে তাদের জন্যে প্রকৃত আলোকবর্তিকা।

 

বনু কুরায়জার ধ্বংস

ইতঃপূর্বে বিবৃত হয়েছে যে, হযরত (স) মদীনায় আসার পর ইহুদীদের
বিভিন্ন গোত্রের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন করেন। প্রথম দিকে কিছুদিন ইহুদীরা সে সব
চুক্তির ওপর অটল থাকলেও অত্যল্প দিনের মধ্যেই তারা বেপরোয়া ভাবে চুক্তি ভঙ্গ করতে
লাগলো। এর ফলে তাদের বনু নযীর গোত্রকে মদীনার থেকে বহিষ্কার করে দেয়া হয়েছিলো
; কিন্তু বনু কুরায়জা আবার চুক্তি
সম্পাদন করেলো এবং হযরত (স) তাদেরকে শান্তিপূর্ণভাবে আপন কিল্লায় থাকার অনুমতি
দিলেন।

কিন্তু খন্দক যুদ্ধের সময়
ইহুদী গোত্রসমূহ বনু কুরায়জাকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে উস্কিয়ে দিলো এবং তারাও এ
যুদ্ধে শত্রু পক্ষে যোগদান করলো। তারা হযরত (স)-এর সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির কোনোই
মর্যাদা রাখলো না। তাই খন্দকের ঘনঘটা কেটে যাবার পরই হযরত (স) সর্বপ্রথম বনু
কুরায়জার প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেন এবং তাদেরকে এ বিশ্বাসঘাতকতার জন্যে যথোচিত
শাস্তি দেবার সিদ্ধান্ত নিলেন। তাদের অপরাধ ছিলো বনু নযীরের অপরাধের চেয়েও
মারাত্নক। কেননা তারা এরূপ এক সংকটাবস্থায় বিশ্বাসঘাতকতা করলো
, যখন গোটা আরব জনগোষ্ঠী মুসলমানদের ওপর
ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো এবং দৃশ্যত তাদের টিকে থাকবার আর কোনো উপায় ছিলো না। তারা
মুসলমানদের সাথে স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে চুক্তি নির্মমভাবে লংঘন করে তারা মুসলমানদের
নাস্তানাবুদ করার উদ্দেশ্যে শত্রুদের সঙ্গে হাত মিলালো। এভাবে নিজেদের আচরণ
দ্বারাই বনু কুরাইয়জা এটা প্রমাণ করে দিয়েছিলো যে
, তারা মুসলমানদেতর পক্ষে প্রকাশ্য
শত্রুর চেয়েও বেশি মারাত্নক।

তাই যুদ্ধের পর হযরত (স)
তাদের কিল্লা অবরোধ করলেন। অবরোধ প্রায় এক মাসকাল অব্যাহত থাকলো। অবশেষেষ বাধ্য
হয়ে তারা আত্নসমর্পণ করলো। অতঃপর তাদের ধর্মগ্রন্থ তওরাতের বিধি মুতাবেক এই মর্মে
ফয়সালা করা হলো যে
, তাদের
সমস্ত যুদ্ধোপযোগী লোককে হত্যা করা হবে এবং বাকী লোকদের বন্দী করে রাখা হবে। এছাড়া
তাদের সমস্ত মালপত্র বাজেয়াপ্ত করা হবে। এই ফয়সালা অনুসারে প্রায় চারশ লোককে হত্যা
করা হলো। এর মধ্যে একজন মহিলাও ছিলো। তার অপরাধ ছিলো এই যে
, সে কিল্লার প্রাচীরের ওপর থেকে পাথর
ফেলে একজন মুসলমানকে হত্যা করেছিলো।

 


১২. হুদাইবিয়া
সন্ধির পটভূমি

 

কাবা ছিলো ইসলামের মূল কেন্দ্র। এটি
আল্লাহর নির্দেমানুক্রমে হযরত ইবরাহীম (আ) ও তাঁর পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ) নির্মাণ
করেছিলেন। মুসলমানরা ইসলামের এই কেন্দ্রস্থল থেকে বেরোবার পর ছয়টি বছর অতিক্রান্ত
হয়েছিলো। পরন্ত হ্‌জ্জ ইসলামের অন্যতম মৌল স্তম্ভ হওয়া সত্ত্বেও তারা এটি পালন
করতে পারছিলো না। তাই কা
বা শরীফ জিয়ারত ও হজ্জ উদযাপন করার জন্যে মুসলমানদের মনে তীব্র বাসনা জাগলো।

 

কাবা জিয়ারতের জন্যে সফর

আরবরা সাধারণত তামাম
বছরব্যাপী যুদ্ধে মেতে থাকতো। কিন্তু হজ্জ উপলক্ষে লোকেরা যাতে শান্তিপূর্ণভাবে কা
বা পর্যন্ত যাতায়াত করতে এবং
নিশ্চিন্তে আল্লাহর ঘরের জিয়ারত সম্পন্ন করতে পারে
, এজন্যে চার মাসকাল তারা যুদ্ধ বন্ধ
রাখতো। ষষ্ঠ হিজরীর জিলকদ মাসে হযরত (স) কা
বা জিয়ারতের সিদ্ধান্ত নিলেন। এহেন সৌভাগ্য লাভের
জন্যে বহু আনসার ও মুহাজির প্রতীক্ষা করছিলো। তাই চৌদ্দ শ
মুসলমান হযরত (স)-এর সহগামী হলেন। যুল
হুলায়ফা নামক স্থানে পৌঁছে তাঁরা কুরবানীর প্রাথমিক রীতিসমূহ পালন করলেন। এভাবে
সবাইকে জানিয়ে দেয়া হলো যে
, মুসলমানদের
উদ্দেশ্য শুধু কা
বা
শরীফ জিয়ারত করা
, কোনোরূপ
যুদ্ধ বা আক্রমণের অভিসন্ধি নেই। তবুও কুরাইশদের অভিপ্রায় জেনে আসবার জন্যে হযরত
(স) এক ব্যক্তিকে মক্কায় প্রেরণ করলেন। সে এই মর্মে খবর নিয়ে এলো যে
, কুরাইশরা সমস্ত গোত্রকে একত্রিত করে
মুহাম্মদ (স)-এর মক্কায় প্রবেশকে বাধা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এমন কি
, তারা মক্কার বাইরে এক জায়গায় সৈন্য
সমাবেশ করতেও শুরু করেছে এবং মুকাবিলার জন্যে সম্পূর্ণ তৈরি হয়ে আছে।

 

কুরাইশদের সঙ্গে আলোচনা

এই সংবাদ জানার পরও হযরত
(স) সামনে অগ্রসর হলেন এবং হুদাইবিয়া নামক স্থানে পৌঁছে যাত্রা বিরতি করলেন। এ
জায়গাটি মক্কা থেকে এক মঞ্জিল দূরে অবস্থিত।৪৫ এখানকার খোজায়া গোত্রের প্রধান হযরত
(স)-এর খেদমতে হাযির হয়ে বললো:
কুরাইশরা লড়াইয়ের জন্যে প্রস্তুতি নিয়েছে। তারা আপনাকে
মক্কায় প্রবেশ করতে দেবে না।
হযরত (স) বললেন: তাদেরকে গিয়ে বলো যে, আমরা শুধু হজ্জের নিয়্যাতে এসেছি, লড়াই করার জন্য নয়। কাজেই আমাদেরকে কাবা শরীফ তাওয়াফ ও জিয়ারত করার সুযোগ
দেয়া উচিত।
কুরাইশদের
কাছে যখন এই পয়গাম গিয়ে পৌঁছলো
, তখন কিছু দুষ্ট প্রকৃতির লোক বলে উঠলো: মুহাম্মদের পয়গাম শোনার কোনো প্রয়োজন
আমাদের নেই।
কিন্তু
চিন্তাশীল লোকদের ভেতর থেকে ওরওয়া নামক এক ব্যক্তি বললো:
না, তোমরা আমার উপর নির্ভর করো; আমি গিয়ে মুহাম্মদ (স)-এর সঙ্গে কথা
বলছি।

ওরওয়া হযরত (স)-এর খেদমতে
হাযির হলো বটে
, কিন্তু
কোনো বিষয়েই মীমাংসা হলো না। ইতোমধ্যে কুরাইশরা মুসলমানদের ওপর হামলা করার জন্যে
একটি ক্ষুদ্র বাহিনী প্রেরণ করলো এবং তারা মুসলমানদের হাতে বন্দীও হলো
; কিন্তু হযরত (স) তাঁর স্বভাবসুলভ
করুণার বলে তাদেরকে ক্ষমা করে দিলেন এবং তাদেরকে মুক্তি দেয়া হলো। এর পর সন্ধির
আলোচনা চালানোর জন্যে হযরত উসমান (রা) মক্কায় চলে গেলেন
; কিন্তু কুরাইশরা মুসলমানদেরকে কাবা জিয়ারত করার সুযোগ দিতে কিছুতেই
রাযী হলো না
; বরঞ্চ
তারা হযরত উসমান (রা)-কে আটক করে রাখলো।

 

রিযওয়ানের শপথ

এই পর্যায়ে মুসলমানদের
কাছে এই মর্মে সংবাদ পৌঁছলো যে
, হযরত উসমান (রা) নিহত হয়েছেন। এই খবর মুসলমানদেরকে
সাংঘাতিকভাবে অস্থির করে তুললো। হযরত (স) খবরটি শুনে বললেন:
আমাদেরকে অবশ্যই উসমান (সা)-এর রক্তের
বদলা নিতে হবে।
একথা
বলেই তিনি একটি বাবলা গাছের নীচে বসে পড়লেন। তিনি সাহাবীদের কাছ থেকে এই মর্মে শপথ
গ্রহণ করলেন:
আমরা
ধ্বংস হয়ে যাবো
, তবু
লড়াই থেকে পিছু হটবো না। কুরাইশদের কাছ থেকে আমরা হযরত উসমান (রা)-এর রক্তের বদলা
নেবোই।
এই দৃঢ় প্রতিজ্ঞা
মুসলমানদের মধ্যে এক আশ্চর্য উদ্দীপনার সৃষ্টি করলো। তারা শাহাদাতের প্রেরণায়
উদ্দীপ্ত হয়ে কাফিরদের কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণের জন্যে প্রস্তুত হলেন। এরই নাম
হচ্ছে
রিযওয়ানের শপথকুরআন পাকেও এই শপথের কথা
উল্লেখ করা হয়েছে। সে সব ভাগ্যবান ব্যক্তি এ সময় হযরত (স)-এর পবিত্র হাতে হাত রেখে
শপথ গ্রহণ করেছিলেন
, আল্লাহ
তা
আলা তাঁদেরকে পুরস্কৃত
করার কথা বলেছেন।

 

হুদাইবিয়া সন্ধির শর্তাবলী

মুসলমানদের এই
উৎসাহ-উদ্দীপনার কথা কুরাইশদের কাছেও গিয়ে পৌঁছলো। সেই সঙ্গে এ-ও জানা গেলো যে
, হযরত উসমান (রা)-এর হত্যার খবর
সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। এই পরিস্থিতিতে কুরাইশরা সন্ধি করতে প্রস্তুত হলো এবং এ
সম্পর্কে আলোচনা করার জন্যে সুহাইল বিন্‌ আমরকে দূত বানিয়ে পাঠালো। তার সঙ্গে
দীর্ঘ সময়ব্যাপী আলোচনা হলো এবং শেষ পর্যন্ত সন্ধির শর্তাবলী স্থিরিকৃত হলো।
সন্ধিপত্র লেখার জন্যে হযরত আলী (রা)-কে ডাকা হলো। সন্ধিপত্রে যখন লেখা হলো
এই সন্ধি আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ
(স)-এর তরফ থেকে তখন কুরাইশ প্রতিনিধি সুহাইল প্রতিবাদ জানিয়ে বললো:
আল্লাহর রাসূলকথাটি লেখা যাবে না; এ ব্যাপারে আমাদের আপত্তি আছে।একথায় সাহাবীদের মধ্যে প্রচন্ড
ক্ষোভের সৃষ্টি হলো। সন্ধিপত্র লেখক হযরত আলী (রা) কিছুতেই এটা মানতে রাযী হলেন
না। কিন্তু হযরত (স) নানাদিক বিবেচনা করে সুহাইলের দাবি মেনে নিলেন এবং নিজের
পবিত্র হাতে
আল্লাহর
রাসূল
কথাটি কেটে দিয়ে বললেন: তোমরা না মানো, তাতে কি? কিন্তু খোদার কসম, আমি তাঁর রাসূল।এরপর নিম্নোক্ত শর্তাবলীর ভিত্তিতে
সন্ধি-চুক্তি স্বাক্ষরিত হলোঃ

১. মুসলমানরা এ বছর হজ্জ
না করেই ফিরে যাবে।

২. তারা আগামী বছর আসবে
এবং মাত্র তিন দিন থেকে চলে যাবে।

৩. কেউ অস্ত্রপাতি নিয়ে
আসবে না। শুধু তলোয়ার সঙ্গে রাখতে পারবে: কিন্তু তাও কোষবদ্ধ থাকবে
, বাইরে বের করা যাবে না।

৪. মক্কায় সে সব মুসলমান
অবশিষ্ট রয়েছে
, তাদের
কাউকে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারবে না। আর কোনো মুসলমান মক্কায় ফিরে আসতে চাইলে তাকেও
বাধা দেয়া যাবে না।

৫. কাফির বা মুসলমানদের
মধ্য থেকে কেউ মদীনায় গেলে তাকে ফেরত পাঠাতে হবে। কিন্তু কোনো মুসলমান মক্কায় গেলে
তাকে ফেরত দেয়া হবে না।

৬. আরবের গোত্রগুলো
মুসলমান বা কাফির যে কোনো পক্ষের সাথে সন্ধিচুক্তি সম্পাদন করতে পারবে।

৭. এ সন্ধি-চুক্তি দশ
বছরকাল বহাল থাকবে।

দৃশ্যত এই শর্তাবলী ছিলো
মুসলমানদের স্বার্থ বিরোধী আর মুসলমানরা যে চাপে পড়েই এ সন্ধি করেছিলো
, তাও বেশ বোঝা যাচ্ছিলো।

 

হযরত আবু জান্দালের ঘটনা

সন্ধিপত্র যখন লিখিত
হচ্ছিলো
, ঠিক
সেই মুহূর্তে ঘটনাচক্রে সুহাইলের পুত্র হযরত আবু জান্দাল (সা) মক্কা থেকে পালিয়ে
সেখানে এসে উপস্থিত হলেন। তিনি শৃংখলিত অবস্থায় মুসলমানদের সামনে এসে হুমড়ি খেয়ে
পড়লেন এবং সবাইকে নিজের দুর্গতির কথা শোনালেন। তাঁকে ইসলাম গ্রহণের অপরাধে কি কি
ধরণের শাস্তি দেয়া হয়েছে
, তা-ও
সবিস্তারে খুলে বললেন। অবশেষে তিনি হযরত (স)-এর কাছে আবেদন জানালেন:
হুযুর আমাকে কাফিরদের কবল থেকেকে
মুক্ত করে আপনার সঙ্গে নিয়ে চলুন।
একথা শুনে সুহাইল বলে উঠলো: দেখুন, সন্ধির শর্ত নিয়ে যেতে পারেন না।এটা ছিলো বাস্তবিকই এক নাজুক সময়।
কারণ
, আবু জান্দাল ইসলাম গ্রহণ
করে নির্যাতন ভোগ করছিলেন এবং বারবার ফরিয়াদ জানাচ্ছিলেন:
হে মুসলিম ভাইগণ! তোমরা কি আমাকে আবার
কাফিরদের হাতে তুলে দিতে চাও
?’ সমস্ত মুসলমান এই পরিস্তিতিতে অত্যন্ত অস্থির হয়ে উঠলো।
হযরত উমর (রা) তো রাসূলুল্লাহ (স)-কে এ পর্যন্ত বললেন যে
, ‘আপনি যখন আল্লাহর সত্য
নবী
, তখন আর আমরা এ অপমান কেন
সইব
? হযরত (স) তাকে বললেন: আমি খোদার পয়গাম্বর, তাঁর হুকুমের নাফরমানী আমি করতে পারিন
না। খোদা-ই আমায় সাহায্য করবেন।

মোটকথা, সন্ধি-চুক্তি সম্পাদিত হলো। সন্ধির শর্ত
মুতাবেক আবু জান্দালকে ফিরে যেতে হলো। এভাবে ইসলামের পথে জীবন উৎসর্গকারীরা
রাসূলের আনুগত্যের এক কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন। একদিকে ছিলো দৃশ্যত ইসলামের
অবমাননা ও হযরত আবু জান্দালের শোচনীয় দুর্গতি আর অন্যদিকে ছিলো রাসূলুল্লাহ (স)
-এর নিরংকুশ আনুগত্যের প্রশ্ন।

হযরত (স) আবু জান্দালকে
বললেন:
আবু
জান্দাল! ধৈয্য ও সংযমের সাথে কাজ করো। খোদা তোমার এবং অন্যান্য মজলুমের জন্যে
কোনো রাস্তা বের করে দিবেনই। সন্ধি-চুক্তি সম্পন্ন হয়ে গেছে। কাজেই আমরা তাদের
তাদের সাথে বিশ্বাসভঙ্গ করতে পারি না।
তাই আবু জান্দালকে সেই শৃংখলিত
অবস্থায়ই ফিরে যেতে হলো।

 

হুদাইবিয়া সন্ধির প্রভাব

সন্ধি-চুক্তি সম্পাদিত
হবার পর হযরত (স) সেখানেই কুরবানী করার জন্যে লোকদেরকে হুকুম দিলেন। সর্বপ্রথম
তিনি নিজেই কুরবানী করলেন। সন্ধি চুক্তি সম্পাদনের পর হযরত (স) তিন দিন সেখানে
অবস্থান করলেন। ফিরবার পথে সূরা ফাতাহ নাযিল হলো। তাতে এই সন্ধির প্রতি ইঙ্গিত করে
এতে
ফাতহুম মুবীনবা সুস্পষ্ট বিজয় বলে অভিহিত করা হলো।
যে সন্ধি-চুক্তি মুসলমানরা চাপে পড়ে সম্পাদন করলো
, তাকে আবার সুস্পষ্ট বিজয়বলে আখ্যা দেয়া দৃশ্যত একটি বেখাপ্পা
ব্যাপার ছিলো। কিন্তু পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্টত প্রমাণ করে দিলো যে
, ইসলামের ইতিহাসে হুদাইবয়ার সন্ধি ছিলো
একটি বিরাট বিজয়ের সূচনা মাত্র। এর বিস্তৃত বিবরণ হচ্ছে নিম্নরূপ:

এতদিন মুসলমান ও কাফিরদের
মধ্যে পুরোপুরি একটা যুদ্ধংদেহী অবস্থা বিরাজ করছিলো। উভয় পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক
মেলামেশার কোনোই সুযোগ ছিলো না। এই সন্ধি-চু্‌ক্তি সেই চরম অবস্থার অবসান ঘটিয়ে
রুদ্ধ দুয়ার খুলে দিলো। এরপর মুসলমান ও অমুসলমানরা নির্বাধে মদীনায় আসতে লাগলো।
এভাবে তারা এই নতুন ইসলামী সংগঠনের লোকদেরকে অতি নিকট থেকে দেখার ও জানার সুযোগ
পেলো। এর পরিণতিতে তারা বিস্ময়কর রকমে প্রভাবিত হতে লাগলো। যে সব লোকের বিরুদ্ধে
তাদের মনে ক্রোধ ও বিদ্বেষ পুঞ্জীভূত হয়েছিলো
, তাদেরকে তারা নৈতিক চরিত্র, আচার-ব্যবহার ও স্বভাব-প্রকৃতির দিক
দিয়ে আপন লোকদের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত মানের দেখতে পেলো। তারা আরো প্রত্যক্ষ করলো
, আল্লাহর যে সব বান্দাহর বিরুদ্ধে তারা
এদ্দিন যুদ্ধংদেহী মনোভাব পোষণ করে আসছে
, তাদের মনে কোনে ঘৃণা বা শত্রুতা নেই; বরং তাদের যা কিছুই ঘৃণা, তা শুধু বিশ্বাস ও গলদ আচার-পদ্ধতির
বিরুদ্ধে। তারা (মুসলমানরা) যা কিছুই বলে
,তার প্রতিটি কথা সহানুভূতি ও মানবিক ভাবধারায়
পরিপূর্ণ। এতো যুদ্ধ-বিগ্রহ সত্ত্বেও তারা বিরুদ্ধবাদীদের সঙ্গে সহানুভূতি
সদাচরণের বেলায় কোনো ত্রুটি করে না।

পরন্ত এরূপ মেলামেশার ফলে ইসলাম
সম্পর্কে অমুসলিমদের সন্দেহ ও আপত্তিগুলো সম্পর্কে সরাসরি আলোচনা করাও প্রচুর
সুযোগ হলো। এতে করে ইসলাম সম্পর্কে অমুসলিমরা কতোখানি ভ্রান্ত ধারণায় নিমজ্জিত
ছিলো
, তা তারা মর্মে মর্মে
উপলব্ধি করতে পারলো। মোটকথা
, এই পরিস্থিতি এমনি এক আবহাওয়ার সৃষ্টি করলো যে, অমুসলিমদের হৃদয় স্বভাবতঃই ইসলামের
প্রতি আকৃষ্ট হতে লাগলো। এর ফলে সন্ধির-চুক্তির মাত্র দেড়-দুই বছরের মধ্যে এতো লোক
ইসলাম গ্রহণ করলো যে
, ইতঃপূর্বে
কখনো তা ঘটেনি। এরই মধ্যে কুরাইশদের কতিপয় নামজাদা সর্দার ও যোদ্ধা ইসলামের প্রতি
আকৃষ্ট হলো এবং অমুসলিমদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করে মুসলমানদের সঙ্গে হাত মিলালো।
হযরত খালিদ বিন্‌ অলিদ (রা) এবং হযরত আমর বিন্‌ আস (রা) এ সময়ই ইসলাম গ্রহণ করলেন।
এর ফলে ইসলামের প্রভাব-বলয় এতোটা বিস্তৃত হলো এবং তার শক্তিও এতোটা প্রচণ্ড রূপ
পরিগ্রহ করলো যে
, পুরনো
জাহিলিয়াত স্পষ্টত মৃত্যু-লক্ষণ দেখতে লাগলো। কাফির নেতৃবৃন্দ এই পরিস্থিতি
অনুধাবণ করে অত্যন্ত শঙ্কিত হয়ে উঠলো। তারা স্পষ্টত বুঝতে পারলো
, ইসলামের মুকাবিলায় তাদের পরাজয়
অবশ্যম্ভাবী। তাই অনতিবিলম্বে সন্ধি-চুক্তি ভেঙে দেয়ার এবং এর ক্রমবর্ধমান সয়লাবকে
প্রতিরোধ করার জন্যে আর একবার ইসলামী আন্দোলনের সাথে ভাগ্য পরীক্ষায় অবতীর্ণ হওয়া
ছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ তারা খুঁজে পেলো না। এই চুক্তি ভঙ্গের কথা পরে মক্কা বিজয়
প্রসঙ্গে আলোচিত হবে।

 


১৩. সম্রাটদের
নামে পত্রাবলী

 

হুদাইবিয়ার সন্ধির ফলে
কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়ে হযরত (স) ইসলামের দাওয়াত প্রচারের প্রতি মনোনিবেশ করলেন।
একদিন তিনি সাহাবীদের উদ্দেশ্যে বললেন:
হে জনমণ্ডলী! আল্লাহ তাআলা আমাকে তামাম দুনিয়ার জন্যে রহমত
স্বরূপ পাঠিয়েছেন (আমার বাণী সারা দুনিয়ার জন্যে প্রযোজ্য এবং এটা সবার জন্যে রহমত
স্বরূপ)। দেখো
, ঈসার
হাওয়ারীদের (সঙ্গী-সাথী) ন্যায় তোমরা মতানৈক্য করো না। যাও
, আমার পক্ষ থেকে সবার কাছে সত্যের
আহবান পৌঁছিয়ে দাও।

এ সময়, অর্থাৎ ষষ্ঠ হিজরীর শেষ কিংবা সপ্তম
হিজরীর শুরুতে তিনি বড়ো বড়ো রাজা-বাদশার নামে আমন্ত্রণ-পত্র লেখেন।৪৬ এসব পত্র
নিয়ে বিনন্ন সাহাবীকে বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়। ইতিহাসে যে সব আমন্ত্রণ-পত্রের কথা
উল্লেখিত হয়েছে
, তার
কয়েকটি নিম্নরূপঃ

১. রোম সম্রাট (কাইসার)
হিরাক্লিয়াসের নামে পত্র
ওহিয়া
কালবী (রা) নিয়ে যান।

২. পারস্য সম্রাট (কিসরা)
খসরু পারভেজের নামে পত্র-হযরত আবদুল্লাহ বিন্‌ খাজাফা সাহমী (রা) নিয়ে যান।

৩. মিশরের শাসক আজীজের
নামে পত্র-হযরত হাতিম বিন্‌ আবী বালতায়া (রা) নিয়ে যান।

৪. আবিসিনিয়ার সম্রাট
নাজ্জাশীর নামে পত্র- হযরত উমর বিন্‌ উমাইয়া (রা) নিয়ে যান
৪৭

 

রোম সম্রাটের নামে

রোম সম্রাটের কাছে যে
পত্র প্রেরিত হয়
, তা
নিম্নরূপঃ

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। আল্লাহর
বান্দাহ এবং তাঁর রাসূল মুহাম্মদের পক্ষ থেকে রোমের প্রধান শাসক হিরাক্লিয়াসের
নামে।

যে ব্যক্তি সত্যাপথ (হেদায়েত) অনুসরণ
করে
, তার প্রতি শান্তি বর্ষিত
হোক। অতঃপর আমি তোমাকে ইসলামের দিকে আহবান জানাচ্ছি।

আল্লাহ তাআলার আনুগত্য ও ফর্মাবর্দারী কবুল করো, তুমি শান্তিতে থাকবে। আল্লাহ তোমাকে
দ্বিগুণ প্রতিফল দান করবেন। কিন্তু তুমি যদি আল্লাহর ফর্মবর্দারী থেকে বিমুখ হও
তাহলে তোমার দেশবাসীর (অপরাধের) জন্যে তুমি দায়ী হবে। (কারণ তোমার অস্বীকৃতির
কারণেই তাদের কাছে ইসলামের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছতে পারবে না।

হে আহলি কিতাব! এসো এমন একটি কথার
দিকে
, যা আমাদের ও তোমাদের
মধ্যে সমান
; তা এই
যে
, আমরা আল্লাহ ছাড়া আর কারো
বন্দেগী করবো না
, তাঁর
সঙ্গে কাউকে শরীক করবো না এবং আমাদের মধ্যেও কেউ আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে নিজের প্রভু
বানাবো না। কিন্তু তোমরা যদি এ কথা মানতে অস্বীকৃত হও
, তাহলে (আমরা স্পষ্টত বলে দিচ্ছি যে,) তোমরা সাক্ষী থাক, আমরা মুসলিম (অর্থাৎ আমরা শুধু খোদারই
আনুগত্য ও বন্দেগী করে যাবে।

 

আবু সুফিয়ানের সাথে কথাবার্তা

হযরত ওহিয়া কালবী (রা) এই
পত্রগুলি বসরায় অবস্থানরত কাইসারের প্রতিনিধি হারি গাস্‌সালীর নিকট পৌঁছিয়ে দিলেন।
গাস্‌সালী তখন কাইসারের অধীনে সিরিয়া শাসন করতো। সে পত্রখানি কাইসারের কাছে পাঠিয়ে
দিলো। কাইসাস পত্র পেয়েই আরবের কোনো অধিবাসীকে তাঁর কাছে পাঠিয়ে দেবার নির্দেশ
দিলেন। ঐ সময় বাণিজ্য উপলক্ষে আবু সুফিয়ান উক্ত এলাকায় অবস্থান করছিলো। কাইসারের
কর্মচারীরা তাকেই দরবারে উপস্থিত করলো। তার সঙ্গে কাইসারের নিম্নরূপ কথাবার্তা
হলো:

কাইসার; নবুয়্যাতের দাবিদার লোকটির খান্দান
কিরূপ
?

আবু সুফি: সে শরীফ
খান্দানের লোক।

কাইসার: এ খান্দানের কেউ
আর কেউ নবুয়্যতের দাবি করেছিলো
?

আবু সুফি: কক্ষনো নয়।

কাইসার: এই খান্দানে কেউ
কখনো বাদশাহ ছিলো কি
?

আবু সুফি: না।

কাইসার: যারা নতুন ধর্ম
গ্রহণ করেছে
, তারা
কি গরীব না ধনবান
?

আবু সুফি: গরীব শ্রেণীর
লোক।

কাইসার: তার অনুগামীর
সংখ্যা বাড়ছে না হ্রাস পাচ্ছেঃ

আবু সুফি: ক্রমশ বেড়ে
চলেছে।

কাইসার: তোমরা কি তাকে
কখনো মিথ্যা বলতে দেখেছো
?

আবু সুফি: কক্ষনো নয়।

কাইসার: সে কি চুক্তি ও
প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে থাকে
?

আবু সুফি: এ পর্যন্ত সে
কোনো চুক্তি ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেনি। তবে তার সাথে একটি নতুন চুক্তি (হুদাইবিয়া
সন্ধি) সম্পাদিত হয়েছে। এখন সে চুক্তির উপর অটল থাকে কিনা
, দেখা যাবে।

কাইসার: তোমরা তার সঙ্গে
কখনো যুদ্ধ করেছো
?

আবু সুফি: হ্যাঁ, করেছি।

কাইসার: যুদ্ধের ফলাফল কি
হয়েছে
?

আবু সুফি: কখনো আমরা
জিতেছি
, কখনো তার জয় হয়েছে।

কাইসার: সে লোকদের কি
শিক্ষা দিয়ে থাকে
?

আবু সুফি: সে বলে, কেবল এক খোদার ব্‌ন্দেগী করো। অপর
কাউকে তার সঙ্গে শরীক করো না। নামায পড়ো। পুত-পবিত্র থাকো। সত্য কথা বলো। একে
অপরের প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ প্রদর্শন করো ইত্যাদি।

এই কথাবার্তার পর কাইসার
বললোঃ
পয়গাম্বর হামেশাই ভালো
খান্দানে জন্মগ্রহণ করেন। যদি এ লোকটির খান্দানের প্রভাব বলে বিবেচনা করা যেতো-বলা
যেতো
, রাজত্বের লিপ্সায়ই হয়তো
সে এই কৌশল অবলম্বন করেছে। কিন্তু ব্যাপারটি তা নয়। আর যখন প্রমাণিত হয়েছে যে
, লোকদের ব্যাপারে সে কখনো মিথ্যা কথা
বলেনি
, তখন সে খোদার ব্যাপারে
এতো বড় মিথ্যা খাড়া করেছে (যে খোদা তাঁকে রাসূল বানিয়ে পাঠিয়েছেন)
, এটা কি করে বলা যায়? তাছাড়া পয়গাম্বরদের প্রথম দিককার
অনুসারীরা স্বভাবতঃই গরীব শ্রেণীর লোক হয়ে থাকে। সত্য ধর্মও হামেশা বৃদ্ধি পেতে
থাকে। পরন্ত এ-ও সত্য যে
, পয়গাম্বররা
কখনো কাউকে ধোঁকা দেন না
, কারো
সঙ্গে ফেরেববাজীও করেন না। সর্বোপরি
, তোমরা এও বলছো যে, সে নামায-রোযা, পাক-পবিত্রতা, খোদা-নির্ভরতা ইত্যাদির উপদেশ দিয়ে
থাকে। এ সব যদি সত্য হয়
, তাহলে
তাঁর আধিপত্য একদিন নিশ্চিত রূপে আমার রাজত্য পর্যন্ত পৌঁছবেই। আমি জানতাম যে
, একজন পয়গাম্বর আসবেন; কিন্তু তিনি যে আরবেই জন্ম নেবেন, এটা আমার ধারণা ছিলো না। আমি যদি
সেখানে যেতে পারতাম তো নিজেই তাঁর পা ধুয়ে দিতাম।

কাইসারের এসব অভিমত শুনে
তাঁর দরবারের পাদ্রী ও আলেমরা ভীষণ খাপ্পা হলো। এমন কি তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের
আশংকা পর্যন্ত দেখা দিলো। এই আশংকার ফলেই কাইসারের হৃদয়ে যে সত্যের আলো জ্বলে
উঠেছিলো
, তা
আবার নিভে গেলো। বাস্তবিকই সত্যকে গ্রহণ করার পথে ধন-মাল ও ক্ষমতার মোহই সবচেয়ে
বড়ো প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়।

 

পারস্য সম্রাটের নামে

পারস্য সম্রাট খসরু
পারভেজের নামে নিম্নোক্ত পত্র লেখা হলো:

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। আল্লাহর
রাসূল মুহাম্মদের তরফ থেকে পারস্যের প্রধান শাসক কিসরা সমীপে।

যে ব্যক্তি সত্যপথ (হেদায়েত) অনুসরণ
করে
, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের
প্রতি ঈমান পোষণ করে এবং এই সাক্ষ্য দেয় যে
, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই, তার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। আমি
সমস্ত মানুষের জন্যে আল্লাহর তরফ থেকে প্রেরিত পয়গাম্বর
, যেনো প্রত্যেক জীবিত ব্যক্তিকে
(আল্লাহর নাফরমানীর) মন্দ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করতে পারি। তুমিও আল্লাহর আনুগত্য
ও ফর্মাবর্দারী কবুল করো। তোমার প্রতি শান্তি বর্ষিত হবে। নচেত অগ্নিপূজকদের পাপের
জন্যে তুমি দায়ী হবে।

খসরু পারভেজ ছিলো প্রবল
প্রতাবান্বিত সম্রাট। তার কাছে প্রথম খোদার নাম
, তারপর পত্র-প্রেরকের নাম এবং তারপর সম্রাটের
নাম লেখা
, তাও
আবার নিতান্ত সাদাসিধা ভাবে
,তদুপরি দরবারে প্রচলিত কায়দা-কানুন, লিখন-পদ্ধতি ও সম্বোধন রীতির ছাপ
পর্যন্ত নেই- পত্র লেখার এ ধরণটাই ছিলো অসহ্য। খসরু পারভেজ এই পত্র দেখে
তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলো এবং বললো:
আমার গোলাম হয়ে আমায় এমনিভাবে পত্র লেখার স্পর্ধা!
একথা বলেই সে পত্রখানি ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেললো এবং এই নবুয়্যাতের দাবিদারকে
অবিলম্বে গ্রেফতার করে তার সামনে হাযির করার জন্যে তার ইয়েমেনস
গভর্নরকে নির্দেশ পাঠালো।৪৮

ইয়েমেনের গভর্নর হযরত
(স)-কে ডেকে নেবার জন্যে তাঁর খেদমতে দুজন কর্মচারী পাঠিয়ে দিলো। এরই মধ্যে খসরু
পারভেজের পুত্র তাকে হত্যা করে নিজেই সিংহাসন দখল করে বসলো। গভর্নর কর্তৃক প্রেরিত
কর্মচারীদ্বয় যখন হযরত (স)-এর খেদমতে পৌঁছলো
,তখর এ সম্পর্কে তারা কিছুতেই অবহিত ছিলো না। হযরত (স)
আল্লাহর নির্দেশক্রমে এ কথা জানতে পারলেন। তিনি কর্মচারীদ্বয়কে এ ঘটনা অবহিত করে
বললেন:
তোমরা
ফিরে যাও এবং গভর্নরকে গিয়ে বলো
, ইসলামের কর্তৃত্ব শীগগীরই খসরু পারভেজের রাজধানী পর্যন্ত
পৌঁছবে।
কর্মচারীদ্বয়
ইয়েমেনে ফিরে গিয়ে জানতে পারলো
, খসরু পারভেজ সত্য সত্যই নিহত হয়েছে।

 

আবিসিনিয়ার নাজ্জাশী ও মিসরের আজীজের নামে

আবিসিনিয়ার বাদশাহ
নাজ্জাশীর কাছেও প্রায় অনুরূপ বিষয়-সম্বলিত পত্র প্রেরণ করা হলো। তার জবাবে তিনি
লিখলেন:
আমি
সাক্ষ্য দিচ্ছি যে
, আপনি
খোদার সাচ্চা পয়গাম্বর।
নাজ্জাশী
হযরত জাফরের হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন
, একথা ইতঃপূর্বে আবিসিনিয়ায় হিজরতপ্রসঙ্গে আলোচিত হয়েছে।

মিশরের আজীজ যদিও চিঠি পড়ে ইসলাম
গ্রহণ করেন নি।
, কিন্তু
তিনি পত্র-বাহককে খুব সম্মান করেন এবং উপঢৌকন দিয়ে ফেরত পাঠান।

 


১৪. ইসলামী
রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা

 

মদীনা থেকে বনু নযীর
গোত্রের লোকদেরকে বহিস্কৃত করার পর তারা খায়বরে এসে বসতি স্থাপন করলো। খায়বর মদীনা
মুনাওয়ারা থেকে প্রায় দু
শ মাইল উত্ত-পশ্চিমে অবস্থিত। এখানে ইহুদীরা কয়েকটি বড়ো সুদৃঢ় কিল্লা নির্মাণ
করেছিলো।

খায়বর তখন ইসলামী
আন্দোলনের বিরুদ্ধতার সবচাইতে বড়ো কেন্দ্র এবং ইসলামের পক্ষে একটি স্থায়ী বিপদে
পরিণতি হয়েছিলো। খন্দক যুদ্ধের সময় মদীনার ওপর যে প্রচণ্ড হামলা চালান হয়েছিলো
, তার মূল কারণ ছিলো এই খায়বরের
ইহুদীরাই। সেই চক্রান্ত ব্যর্থক হবার পর ভিন্নতর পন্থায় ইসলামী আন্দোলনের
মূলোৎপাটনের জন্যে তারা ক্রমাগত ষড়যন্ত্র পাকাতে লাগালো। এই উদ্দেশ্যে তারা আরবের
বিভিন্ন গোত্র বিশেষত কুরাইশদের সঙ্গে আঁতাত স্থাপন তো করলোই
, সেই সঙ্গে মদীনার মুনাফিকদেরও উস্কাতে
শুর করলো। তাদেরকে এই মর্মে বুঝানো হলো যে
, তারা যদি মুসলমানদের ভেতরে থেকে এদের
শিকড় কাটতে থাকে
, তাহলে
বাইরের বিরুদ্ধবাদীদের পক্ষে ইসলামকে চিরতরে মিটিয়ে দেয়া সহজতর হবে। ইহুদীদের এই
সব চক্রান্তের খবর হযরত (স)-এর কাছেও যথারীতি পৌঁছতে লাগলো। তিনি ইহুদীদেরকে এ
জঘন্য তৎপরতা থেকে বিরত হলো না। এমন কি তারা বিভিন্ন গোত্রের কাছ এই মর্মে
প্রস্তাব পাঠালো যে
, ‘আমাদের
সঙ্গে মিলে যদি তোমরা মদীনার ওপর হামলা করো
, তাহলে তোমাদেরকে স্থায়ীভাবে আপন খেজুর
বাগানের অর্ধেক ফসল দিতে থাকবো।
মোটকথা, ইহুদীদের চক্রান্তের ফলে বহু গোত্রের মন-মানস পরিবর্তিত হলো
এবং তারা একযোগে মদীনার ওপর হামলা করার ব্যাপরে ঐক্যমত্যে পৌঁছলো।

আক্রমণাত্নক যুদ্ধ

এ যাবত মুসলমানরা যুদ্ধ
করে আসছে শুধু আত্নরক্ষার খাতিরে। দুশমনরা তাদেরকে খতম করার জন্যে হামলা চালিয়েছে
আর তাঁরা আত্নরক্ষার জন্যে অস্ত্র হাতে নিয়েছেন। অতঃপর আল্লাহ তা
আলার সাহায্য তাঁদের সঙ্গে যুক্ত
হয়েছে এবংদুশমনরা অপমানিত ও লাঞ্ছিত হয়ে পলায়ন করেছে। কিন্তু এই স্তরে এসে অবস্থার
গতি অন্যদিকে মোড় নিলো। কুফরী শক্তির সুসংহত রূপ নেবার আগেই আক্রমণাত্নক হামলা
চালিয়ে তাকে খতম করে দেবার প্রয়োজন দেখা দিলো। কারণ ইসলামী আদর্শের প্রতিষ্ঠা ও
নিরাপত্তার জন্যে যেমন প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধেত্ম প্রয়োজন রয়োছে
, তেমনি প্রয়োজন মতো আক্রমণাত্নক হামলা
করারও দরকার আছে। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন-পদ্ধতি ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা। এই জীবন
পদ্ধতি ও রাষ্ট্র-ব্যবস্থা কায়েম ও তাকে নিরাপদ করতে হলে কেবল অন-ইসলামী জিন্দেগী
ও জীবন বিধানের অনুপর্তীদের হামলা থেকে আত্নরক্ষা করাই যথেষ্ট নয়
; বরং এই জীবন বিধানকে প্রতিষ্ঠিত করার
পথে কখনো কখনো অন্যান্য বাতিল জীবন পদ্ধতিকে উৎখাত করার জন্যে আক্রমণাত্নক আঘাত
হানারও প্রয়োজন হয়ে পড়ে।

খন্দক যুদ্ধের পর ইসলামী
আন্দোলন এই স্তরেই প্রবেশ করলো। এবার শুধু প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধই নয়
; বরং এখন আক্রমণাত্নক মনোভাব নিয়ে
বিপদাশংকা চিরতরে মুছে ফেলারই প্রয়োজন দেখা দিলো। তাই খন্দক যুদ্ধের সমআপ্তির পর
হযরত আমরা শুধু তার মুকাবিলা করবো
, এখন আর এটা চলবে না; বরং এখন আমরা নিজেরাই গিয়ে দুশমনদের
ওপর হামলা করবো।৪৯

 

খায়বর আক্রমণ

এবার খায়বরের ইহূদীদের
ক্রমবর্ধমান ফিতনাকে কার্যকর ভাবে প্রতিরোধ করার সময় এসে পড়লো! হযরত [স] খায়বরের
ওপর হামলা চালানোর প্রস্তুতি শুরু করে দিলেন এবং ইহুদীদের তরফ থেকে সম্ভাব্য হামলা
প্রতিরোধ করার উদ্দেশ্যে মদীনা থেকে যাত্রা করলেন। এটা সপ্তম হিজরীর মুহাররম মাসের
ঘটনা। এই হামলার জন্যে তিনি ষোলশ
সৈন্য সঙ্গে নিলেন। এর ভেতরে মাত্র দুশ ছিলো অশ্ব ও উষ্ট্রারোহী, বাকী সব পদাতিক।

খায়বরে ছয়টি দুর্গ এবং
তাতে বিশ হাজার ইহুদী সৈন্য মোহায়েন ছিলো। সেখানে পৌঁছে হযরত (স) নিশ্চিতরূপ জানতে
পারলেন যে
, ইহুদীরা
সত্য সত্যই যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত
; তারা কোনো অবস্থায়ই কোনো সন্ধি-চুক্তি
সম্পাদন করতে রাযী নয়। তিনি সাহাবীদের সামনে জিহাদ সম্পর্কে একটি উদ্দীপনাময় ভাষণ
প্রদান করলেন এবং আল্লাহর দ্বীনের খাতিরে তাদেরকে জীবন পণ করার উপদেশ দিলেন। পর
দিন তিনি ইহুদীদের দুর্গগুলো অবরোধ করলেন। অবরোধকালে কয়েকটি খণ্ডযুদ্ধ সংঘটিত হলো।
প্রায় বিশ দিন অবরোধের পর আল্লাহ তা
আলা মুসলমানদেরকে বিজয় দান করলেন। এই যুদ্ধে ৯৩ জন
ইহুদী নিহত এবং ১৫ জন মুসলমান শহীদ হলেন। হযরত আলী (রা)-এর হাতে মারহাব নামক
ইহুদিদের এক বিরাট পাহলোয়ান নিহত হলো। ইহুদীরা তার বীর্যবত্তার জন্যে গর্ব করতো।
তার মৃত্যু তাই এ যুদ্ধের এক বিরাট উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিলো।

বিজয়ের পর ইহুদীগণ আবেদন
জানালো
, তাদের কাছে যে সব জমি-জমা
রয়েছে
, তা তাদেরকেই ছেড়ে দেয়া
হলে মুসলানদেরকে তারা অর্ধেক ফসল দিতে থাকবে। তাদের এই আবেদন হযরত (স) মঞ্জুর
করলেন। পরবর্তী বছরগুলোতে এই ফসল আদায়ের ব্যাপরে মুসলিম কর্মচারীগণ ইহুদীদের সঙ্গে
অত্যন্ত ইনসাফপূর্ণ ব্যবহার প্রদর্শন করেন। তাঁরা ফসলকে দু
ভাগে বিভক্ত করতেন এবং কৃষকদের যে ভাগ
ইচ্ছা পছন্দ করে নেবার অধিকার দিতেন। এভাবে ফসল আদায়ের সঙ্গে সঙ্গে ইহুদীদের
অন্তরও তাঁরা জয় করে নিলেন।

 

মুসলিম সমাজের প্রশিক্ষণ

ওহুদ যুদ্ধের পর ইসলামী
আন্দোলনের জন্যে বাইরের বিপদাশংকা কি পরিমাণে বেড়ে গিয়েছিলো
, খন্দক যুদ্ধ এবং তার পরবর্তী ঘটনাবলী
থেকে তা সহজেই আন্দাজ করা চলে। এটি ছিলো অত্যন্ত সংঘাতের সময়
; কিন্তু তা সত্ত্বেও ইসলামী আন্দোলনের
আহবায়ক একজন জেনারেল হিসেবে যেমন দৃঢ়তার সাথে এসব ঘটনাবলী মুকাবিলা করছিলেন
, তেমনি একজন সুদক্ষ নৈতিক শিক্ষক
হিসেবেও তিনি আন্দোলনের অগ্রসেনাদের জন্যে যথোচিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছিলেন।
তিনি এই নয়া ইসলামী সমাজের জন্যে প্রায়োজনীয় আইন-কানুন ও নিয়ম-বিধি শিক্ষা দেয়া
হতো
, তা এ সময়ে অবতীর্ণ দুটি
গুরুত্বপূর্ণ সূরা অর্থাৎ নিসা ও সূরা মায়েদা অধ্যয়ন করলেই স্পষ্টত অনুমান করা
যায়।

সূরা নিসা চতুর্থ ও পঞ্চম
হিজরীর বিভিন্ন সময়ে অবতীর্ণ সময়ে অবতীর্ণ হয়। এ সময় নবী করীম (স) এই নতুন ইসলামী
সমাজকে পুরনো জাহিলী রীতিনীতি ও বিধি-ব্যবস্থা থেকে মুক্ত করে কিভাবে নৈতিকতা
, কৃষ্টি-সভ্যতা, সামাজিক ও অর্থনীতির নবতর ভিত্তির ওপর
দাঁড় করিয়েছিলেন
, এ থেকে
তা সহজেই আন্দাজ করা চলে। এ সময় আল্লাহ তা
আলা মুসলমানদের ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে সঙ্গে তাদের
সামাজিক জীবনেও ইসলামী ধারায় শুধরে নেবার প্রক্রিয়া সম্পর্কে সুস্পষ্ট ভাষায় পথ
নির্দেশ দিলেন। তাদেরকে পারিবারিক ব্যবস্থাপনার নীতি বাতলানো হলো
; বিবাহ ও তালাক সম্পর্কে সুস্পষ্ট
নিযম-নীতি জানিয়ে দেয়া হলো
; নারী-পুরুষের
অধিকার-সীমা নির্দিষ্ট করে সমাজের নান ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর করা হলো
, ইয়াতিম, মিসকীন ও দরিদ্র লোকদের অধিকারের
নিরাপত্তা বিধানের জন্যে তাগিদ করা হলো
; সম্পদের উত্তরাধিকর সংক্রান-
নীতিভঙ্গি নির্ধারণ করা হলো
; পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তির পদ্ধতি বাতলে দেয়া হলো, শরাব পানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা
হলো এবং পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার নিয়ম-কানুন বলে দেয়া হলো। এভাবে খোদা ও তাঁর
বান্দাদের সাথে একজন সৎ লোকের সম্পর্ক সম্বন্ধে মুসলমানদেরকে অবহিত করা হলো। সেই
সঙ্গে আহলি কিতাবদের ভ্রান্ত আচরণ ও অসঙ্গত জীবন যাপন পদ্ধতির সমালোচনা করে তাদের
দোষ-ত্রুটিগুলো সুস্পষ্ট রূপে তুলে ধরা হলো এবং মুসলমানদেরকে এ ধরণের ভ্রান্তি
থেকে বেঁচে থাকার জন্যে সতর্ক করে দেয়া হলো।

বস্তুত ইসলামী আন্দোলনের
এ দিকটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ এবং এর সংশোধন ছাড়া বাতিলের মুকাবিলায় তার সাফল্য অর্জন
কখনোই সম্ভব নয়। অন্য কথায়
, ইসলামী
আন্দোলনের অগ্রসেনাদের শুধু ব্যক্তিগত নৈতিকতার দিক থেকেই বাতিলপন্থীদের চেয়ে
উন্নত হওয়া যথেষ্ট নয়
; বরং
অন-ইসলামী সমাজের তুলনায় সর্বদিক থেকে শ্রেষ্ঠ একটি আদর্শ সমাজের দৃষ্টান্ত স্থাপন
করাও তাদের কর্তব্য। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্যে কোনো বিশেষ ধরণের উদ্যোগ-আয়োজনের
প্রয়োজন নেই
; বরং
আন্দোলনের অগ্রসেনাদের মধ্যে খোদানির্ভরতা ও খোদাপ্রেমের গুণাবলী সৃষ্টি হতে থাকলে
স্বভাবতই এরূপ ফলাফল প্রকাশ পেতে থাকে। এ কারণেই একজন নবীর সংস্কারক ও বিপ্লবাত্নক
আন্দোলন অন্যান্য সমস্ত আন্দোলনের চেয়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে থাকে। নবী সাধারণ
লোকদের মধ্যে আদর্শ প্রচার করার জন্যে যতোটা অস্থির হয়ে থাকেন
, তাঁর অনুবর্তীদের শিক্ষা-দীক্ষা ও
সংশোধনের প্রতি তার চেয়ে অনেক বেশি মনোযোগী হয়ে থাকেন। ইসলামী আন্দোলনের এই
বৈশিষ্ট্য-বিশেষত্ব সূরা নিসা বক্তব্যেও প্রতিভাত হয়েছে। এই সূরায় নৈতিকতা
, কৃষ্টি-সভ্যতা, সামাজিকতা ইত্যাদি বিষয়ে আইন-কানুন
বর্ণনার পাশাপাশি দাওয়াত ও তাবলীগের প্রতিও লক্ষ্য রাখা হয়েছে এবং মুশরিক ও আহলি
কিতাবদেরকে যথারীতি সত্য দ্বীনের দিকে আহবান জানানো হয়েছে।

সূরা মায়েদা হুদাইবিয়া
সন্ধির পর প্রায় সপ্তম হিজরীতে অবতীর্ণ হয়। হুদাইবিয়ার সন্ধি-চুক্তির
পরিপ্রেক্ষিতে মুসলমানরা ঐ বছর
উমরাকরতে পারে নি। তখন স্থির করা হয়েছিলো যে, হযরত (স) পরবর্তী বছর কাবা জিয়ারত করতে আসবেন। তাই ঐ সময়ের
পূর্বে কা
বা
জিয়ারত সম্পর্কে বহু নিয়ম-কানুন বাতলে দেবার প্রয়োজন হলো। এ ছাড়া কাফিরদের
বাড়াবাড়ি সত্ত্বেও মুসলমানরা স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে কখনো যাতে সীমালংঘন না করে
, সে সম্পর্কে তাদেরকে সতর্ক করে দেয়া
হলো।

এ সূরাটি (সুলা মায়েদা)
যখন অবতীর্ণ হয়
, তখন
পর্যন্ত মুসলমানদের অবস্থা অনেক বদলে গিয়েছিলো। ওহুদ যুদ্ধের পরবর্তীকালে
মুসলমানরা যে রূপ চারদিক দিয়ে বিপদ পরিবেষ্টিত হয়ে পড়েছিলো
, এ সময়টা ঠিক সে রকম ছিলো না। এ সময়
ইসলাম নিজেই একটি প্রচণ্ড শক্তির রূপ পরিগ্রহ করেছিলো এবং ইসলামী রাষ্ট্রও যথেষ্ট
সমপ্রসারিত হয়েছিলো। মদীনার চারদিকে দে-দুশ
মাইলের মধ্যকার সমস্ত বিরোধী গোত্রের
শক্তি এ সময় ভেঙে পড়েছিলো এবং খোদ মদীনা থেকে বিপজ্জনক ইহুদীগণ সমূলে নিশ্চিহ্ন
হয়ে গিয়েছিলো। কোথাও কিছু অবশিষ্ট থাকলে তারাও মদীনা সরকারের অধীনতা স্বীকার করে
নিয়েছিলো। মোটকথা
, এ সময়
এ সত্য স্পষ্টত প্রতিভাত হয়ে উঠলো যে
, ইসলাম শুধু কতিপয় আকীদা-বিশ্বাসেরই
সমষ্টি নয়
, যাকে
প্রচলিত ভাষায়
ধর্মবলা যায় এবং যার সম্পর্ক কেবল মানুষের
মন-মগজের সঙ্গে বরং ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন-পদ্ধতি
, যার সম্পর্ক মানুষের মন-মগজ ছাড়াও তার
পূর্ণ জীবনের সঙ্গে
; সমাজ, রাষ্ট্র, যুদ্ধ, সন্ধি সব কিছুই তার অন্তর্ভুক্ত।
পরন্ত এ সময় মুসলমানরা বেশ শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলো। তারা যে জীবন পদ্ধতিকে (দ্বীন)
বুঝে-শুনে গ্রহণ করেছিলো
, তার
ভিত্তিতে তারা নিজেরা নির্বোধ জীবন যাপন করতে পারছিলো। বাইরের অন্য কোনো জীবন
পদ্ধতি বা আইন-কানুন তাদের গতিরোধ করতে পাছিলো না
; বরং তারা এই দ্বীনের দিকে অন্যান্য
লোকদেরকেও আহবান জানাতে সমর্থ হচ্ছিলো।

এ সময় মুসলমানদের নিজস্ব
একটি কৃষ্টি-সভ্যতা গড়ে উঠেছিলো এবং অন্যান্য কৃষ্টি-সভ্যতা থেকে তার শ্রেষ্ঠত্ব
প্রমাণিত হতে লাগলো। মুসলমানদের নৈতিক চরিত্র
, তাদের জীবন যাপন পদ্ধতি, তাদের আচার-ব্যবহার-এক কথায় তাদের
জীবনের সমগ্র কাঠামোই ইসলামী নীতির ছাঁচে ঢালাই হতে লাগলো। অন্যান্য জাতির
মুকাবিলায় তারা সুস্পষ্ট বৈশিষ্ট্য ও স্বাতন্ত্র্যের অধিকারী হয়ে উঠলো। তাদের
নিজস্ব দেওয়ানী ও ফৌজদারী আইন প্রচলিত হলো
; নিজস্ব আদালত ও কোর্ট-কাচারী বসলো; লেনদেন ও বেচা-কেনার নিজস্ব পদ্ধতি
চালু হলো
; উত্তরাধিকার
সম্পর্কে একটি স্থায়ী বিধান জারি হলো। এ ছাড়া বিবাহ
,তালাক, পর্দা এবং এ ধরনের অন্যান্য বিষয়েও
তাদের নিজস্ব আইন-কানুন চালু হলো। এমন কি তাদের উঠা-বসা
, খানা-পিনা ও মেলামেশার নিয়ম-কানুন
সম্পর্কেও সুস্পষ্ট পথ-নির্দেশ দেয়া হলো।

সূরা মায়েদার হজ্জ
সংক্রান- নিয়মাবলী
, খাদ্য-দ্রব্যে
হারাম-হালালের বাচ-বিচার
, অযু-গোসল
ও তায়াম্মুমের নিয়মাবলী
, শরাব ও
জুয়ার প্রতি নিষেধাজ্ঞা
, সাক্ষ্য
আইন সম্পর্কিত নির্দেশাবলী
, বিচার
ও ইনসাফের ওপর কয়েম থাকার তাগিদ ইত্যাদি সহ ইসলামী সমাজ গঠনের জন্যে অপরিহার্য
বিষয়াদি বিবৃত হলো। তাই এর প্রতিটি বিষয়ের প্রতিই অতীব গুরুত্ব আরোপ করা হলো।

 

উমরা উদযাপন

হুদাইবিয়া সন্ধির একটি
শর্ত ছিলো এই যে
, মুসলমানরা
পর বছর এসে উমরা উদযাপন করবে। তাই পর বছর অর্থৎ সপ্তম হিজরী সালে হযরত (স)
মুসলমানদের এক বিরাট কাফেলা নিয়ে কা
বা জিয়ারতের মনস্ত করলেন। এ উপলক্ষে সাহাবীদের মধ্যে
এক আশ্চর্য রকমের আনন্দ ও উদ্দীপনা পরিলক্ষিত হলো। এ দৃশ্য কাফির কুরাইশদের অন্তরে
হিংসা-বিদ্বেষের চাপা আগুন আবার জ্বালিয়ে দিলো। এমন কি তাদের ইচ্ছা মাফিক সম্পাদিত
সন্ধি-চুক্তিকে এখন নিজেদের কাছেই অর্থহীন বলে মনে হতে লাগলো।

 


১৫. মক্কা
বিজয়

 

হুদাইবিয়ার সন্ধি-চুক্তি ভঙ্গ

হুদাইবিয়ার সন্ধি-চু্‌ক্তিতে
আরব গোত্রগুলোকে এই অধিকার দেয়া হয়েছিলো যে
, তারা মুসলমান এবং কাফিরদের মধ্যে যে
কোনো পক্ষের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন করতে পারবে। এই শর্তানুযায়ী বনু খোজা
আ গোত্র মুসলমানদের সাথে চুক্তিবদ্ধ
হলো আর বনু বকর গোত্র মৈত্রী স্থাপন করলো কুরাইশদের সঙ্গে। এভাবে প্রায় দেড় বছর এই
সন্ধি-চুক্তি পূর্ণভাবে পালিত হলো। কিন্তু তারপরই এক নতুন পরিস্থিতির উদ্ভব হলো।
ইতঃপূর্বে খোজা
আ ও
বকর গোত্রদ্বয়ের মধ্যে বেশ কিছুকাল যাবত লড়াই চলে আসছিলো
; এদের মধ্যে হঠাৎ একদিন বনু বকর গোত্র
খোজা
আদেরকে আক্রমণ করে বসলো
এবং এ ব্যাপারে কুরাইশগণ বনু বকরকে সাহায্য প্রদান করলো। কারণ খোজা
আ গোত্র তাদের মর্জীর বিরুদ্ধে
মুসলমানদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হওয়ায় কুরাইশরা আগে থেকেই তাদের ওপর খাপ্পা ছিলো।
এভাবে উভয় পক্ষ মিলে খোজা

গোত্রের লোকদেরকে নির্মমভাবে হত্যা করতে শুরু করলো। এমন কি তারা কা
বা শরীফে আশ্রয় গ্রহণ করেও রেহাই পেলো
না
; বরং সেখানেরও তাদের
রক্তপাত করা হলো।

খোজাআগণ বাধ্য হয়ে হযরত (স)-কে তাদের
দুরাবস্থা সম্পর্কে অবহিত করলো এবং তাঁর সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী তারা
সাহায্য প্রার্থনা করলো। হযরত (স) খোজা
আদের এই মজলুমী অবস্থার কথা শুনে অত্যন্ত মর্মাহত
হলেন। তিনি এই নিষ্ঠুর আচরণ থেকে বিরত থাকার এবং নিম্নোক্ত তিনটি শর্তের মধ্যে যে
কোনো একটি গ্রহণ করার আহবান জানিয়ে কুরাইশদের কাছে একজন দূত প্রেরণ করলেন:

১. খোজাআদের যে সব লোক নিহত হয়েছে, তাদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে অথবা

২. বনু বকরের সাথে
কুরাইশদের সম্পর্কচ্ছেদ করতে হবে কিংবা

৩. হুদাইবিয়ার
সন্ধি-চুক্তি বাতিল ঘোষণা করতে হবে।

দূত মারফত এই পয়গাম শুনে
কোরতা বিন্‌ উমর নামক জনৈক কুরাইশ বললো:
আমরা তৃতীয় শর্তটাই সমর্থন করি।কিন্তু দূত চলে যাবার পর তাদের খুব
আফসোস হলো এবং হুদাইবিয়ার সন্ধি পুনর্বহাল করার জন্যে নিজেদের পক্ষ থেকে আবু
সুফিয়ানকে প্রতিনিধি হিসেবে প্রেরণ করলো। কিন্তু সামগ্রিক পরিস্থিতি
, বিশেষত কুরাইশদের এতদিনকার আচরণের
পরিপ্রেক্ষিতে হযরত (স) তাদের এই নয়া প্রস্তাব সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারলেন না।
তিনি আবু সুফিয়ানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন।

 

মক্কা অভিযানের প্রস্তুতি

কাবাগ্রহ ছিলো খালেস তওহীদের
কেন্দ্রস্থল। নির্ভেজাল খোদার বন্দেগীর জন্যে এটি হযরত ইবরাহীম (আ) নির্মাণ
করেছিলেন। কিন্তু এ যাবতকাল তা মুশরিকদের অধিকারে থেকে শিরকের সবচেয়ে বড়ো
কেন্দ্র-স্থলে পরিণত হয়েছিলো। হযরত মুহাম্মদ (স) প্রকৃতপক্ষে হযরত ইবরাহীম (আ)-এর
প্রচারিত দ্বীনের আহবায়ক এবং খালেস তওহীদের অনুবর্তী ছিলেন। এ কারণে তওহীদের এই
পবিত্র কেন্দ্রস্থলকে শিরকের সমস্ত নাপাকী ও নোংরামি থেকে অবিলম্বে মুক্ত করার
একান্ত প্রয়োজন হয়ে পড়েছিলো। কিন্তু এতদিন এ অবস্থা অনুকূলে ছিলো না। হযরত (স)
এবার অনুমান করতে পারলেন যে
, অল্লাহর এই পবিত্র ঘরকে শুধু তাঁরই ইবাদতের জন্যে নির্ধারিত
করা এবং মূর্তিপূজার সমস্ত অপবিত্রতা থেকে একে মুক্ত করার উপযুক্ত সময় এসেছে। তাই
তিনি চুক্তিবদ্ধ সমস্ত গোত্রের কাছে এ সম্পর্কে পয়গাম পাঠালেন। অন্য দিকে এই
প্রস্তুতির কথা যাতে মক্কাবাসীরা জানতে না পারে
, সেজন্যে তিনি কঠোর সতর্কতা অবলম্বন
করলেন। প্রস্তুতি কার্য সম্পন্ন হলে অষ্টম হিজরীর ১০ রমযান প্রায় দশ হাজার
আত্নোৎসর্গী সৈন্যের এক বিরাট বাহিনী সঙ্গে নিয়ে হযরত (স) মক্কা অভিমুখে যাত্রা
করলেন। পথিমধ্যে অন্যান্য আরব গোত্রও এসে তাঁর সঙ্গে মিলিত হলো।

 

আবু সুফিয়ানের গ্রেফতারী

মুসলিম সৈন্যবাহিনী
মক্কার সন্নিকটে পৌঁছলে কুরাইশ-প্রধান আবু সুফিয়ান গোপনে তাদের সংখ্যা-শক্তি
আন্দাজ করতে এলো। এমনি অবস্থায় হঠাৎ তাকে গ্রেফতার করে হযরত (স)-এর খেদমতে হাযির
করা হলো। এ সেই আবু সুফিয়ান
, ইসলামের দুশমনি ও বিরুদ্ধতায় যার ভূমিকা ছিল অনন্যসাধারণ।
এই ব্যক্তিই বারবার মদীনা আক্রমণের ষড়যন্ত্র করেছিলো এবং একাধিকবার হযরত (স)-কে
হত্যা করার গোপন চক্রান্ত পর্যন্ত ফেঁদেছিলো। এই সব গুরুতর অপরাধের কারণে আবু
সুফিয়ানকে সঙ্গে সঙ্গে হত্যা করা উচিত ছিলো। কিন্তু হযরত (স) তার প্রতি করুণার
দৃষ্টি প্রসারিত করে বললেন:
যাও, আজ আর
তোমাকে কোনো জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না। আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করে দিন। তিনি সমস্ত
ক্ষমা প্রদর্শনকারীর চেয়ে শ্রেষ্ঠ ক্ষমা প্রদর্শনকারী।

আবু সুফিয়ানের সঙ্গে এই
আচরণ ছিলো সম্পূর্ণ অভিনব। রাহমাতুল্লিল আলামীন-এর এই অপূর্ব ঔদার্য আবু সুফিয়ানের
হৃদয় -নেত্রকে উন্মীলিত করে দিলো। সে বুঝতে পারলো
, মক্কায় সৈন্য নিয়ে আসার পেছনে এই মহানুভব
ব্যক্তির হৃদয়ে না প্রতিশোধ গ্রহণের মানসিকতা আছে আর না আছে দুনিয়াবী
রাজা-বাদশাদের ন্যায় কোনো স্পর্ধা-অহংকার। এ কারণেই তাকে মুক্তিদান করা সত্ত্বেও
সে মক্কায় ফিরে গেলো না
; বরং
ইসলাম গ্রহণ করে হযরত (স)-এর আত্নোৎসর্গী দলেরই অন্তর্ভুক্ত হলো।

 

মক্কায় প্রবেশ

এবার হযরত (স) খালিদ বিন
অলীদ (রা)-কে আদেশ দিলেন:
তুমি
পিছন দিক থেকে মক্কায় প্রবেশ করো
, কিন্তু কাউকে হত্যা করো না। অবশ্য কেউ যদি তোমার ওপর অস্ত্র
উত্তোলন করে
, তাহলে
আত্নরক্ষার জন্যে তুমি ও অস্ত্র ধারন করো।
এই বলে হযরত (স) নিজে সামনের দিক থেকে
শহরে প্রবেশ করলেন। হযরত খালিদ-এর সৈন্যদের ওপর কতিপয় কুরাইশ গোত্র তীর বর্ষণ করলো
এবং তার প্রত্যুৎত্তর দিতে হলো। ফলে ১৩ জন হামলাকারী নিহত হলো এবং বাকী সবাই
পালিয়ে গেলো। হযরত (স) এই পাল্টা হামলার কথা জানতে পেরে হযরত খালিদ-এর কাছে কৈফিয়ত
তলব করলেন। কিন্তু তিনি প্রকৃত ঘটনা জানতে পেরে বললেন:
খোদার ফয়সালা এ রকমই ছিলো।পক্ষান্তরে হযরত (স) কোনোরূপ প্রতিরোধ
ছাড়াই মক্কায় প্রবেশ করলেন। তাঁর সৈন্যদের হাতে একটি লোকও নিহত হলো না।

 

মক্কায় সাধরণ ক্ষমা

হযরত (স) মক্কায় প্রবেশ
করে কোনো প্রতিশোধ গ্রহণের কথা বললেন না
, বরং তিনি এই মর্মে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা
করলেনঃ

১. যারা আপন ঘরের মধ্যে
দরজা বন্ধ করে থাকবে
,তারা
নিরাপদ।

২. যারা আবু সুফিয়ানের
ঘরে প্রবেশ করবে
, তারও
নিরাপদ এবং

৩. যারা কাবাগৃহে আশ্রয় নেবে, তারাও নিরাপদ।

কিন্তু এই সাধারণ ক্ষমা
ঘোষণা থেকে এমন ছয়-সাত ব্যক্তি ব্যতিক্রম ছিলো
, ইসলামের বিরুদ্ধতায় ও মানবতা বিরোধী
অপরাধে যাদের ভূমিকা ছিলো অসাধারণ এবং যাদের হত্যা করার প্রয়োজন ছিলো অপরিহার্য।

নবী করীম (স) কি অবস্থায়
মক্কায় প্রবেশ করলেন
, তাও
এখানে উল্লেখযোগ্য। তাঁর পতাকা ছিলো সাদা ও কালো রঙের। মাথায় ছিলো লৌহ শিরস্ত্রাণ
এবং তার ওপর ছিলো কালো পাগড়ী বাঁধা। তিনি উচ্চ:স্বরে সূরা ফাতাহ (ইন্না ফাতাহনা)
তিলাওয়াত করছিলেন। সর্বোপরি আল্লাহ তা
আলা সমীপে তাঁর এমনি বিনয় ও নম্রতা প্রকাশ পাচ্ছিলো
যে
, সওয়ারী উটের পিঠের ওপর
ঝুঁকে পড়ার দরুন তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডল যেনো উটের কুঁজ স্পর্শ করছিলো।৫০

 

কাবা গৃহে প্রবেশ

হযরত (স) কাবা মসজিদে প্রবেশ করে সর্বপ্রথম
মর্তিগুলোকে বাইরে ছুঁড়ে ফেলার নির্দেশ দিলেন। তখন কাবাগৃহে ৩৬০ টি মূর্তি বর্তমান
ছিলো। তার দেয়ালে ছিলো নানারূপ চিত্র অংকিত। এর সবই নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হলো। এভাবে
আল্লাহর পবিত্র ঘরকে শিরকের নোংরামি ও অপবিত্রতা থেকে মুক্ত করা হলো। এরপর হযরত
(স) তাকবীর ধ্বনি উচ্চারণ করলেন
, কাবা গৃহ
তওয়াফ করলেন এবং
মাকামে
ইবরাহীম
’-এ গিয়ে
নামায আদায় করলেন। এই ছিল তার বিজয় উৎসব। এ উৎসব দেখে মক্কাবাসীদের হৃদয়-চক্ষু
খুলে গেলো। তারা দেখতে পেলো
, এতোবড়ো একটি বিজয় উৎসবে বিজয়ীরা না প্রকাশ করলো কোনো
শান-শওকত আর না কোনো গর্ব-অহংকার
, বরং অত্যন্ত বিনয় ও কৃতজ্ঞতার সাথে তারা খোদার সামনে অবনমিত
হচ্ছে এবং তাঁর প্রশংসা ও জয়ধ্বনি উচ্চারণ করছে। এই দৃশ্য দেখে কে না বলে পারে যে
, প্রকৃতপক্ষে এ বাদশাহী কিংবা রাজত্ব
জয় নয়
, এ অন্য কিছু।

 

বিজয়ের পর ভাষণ

মক্কা বিজয় সম্পন্ন হবার
পর হযরত (স) এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। এর কিছু অংশ হাদীস শরীফে
বিধৃত হয়েছে। তাতে তিনি বলেন:

এক আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ (ইলাহ) নেই; কেউ তাঁর শরীক নেই। তিনি তাঁর ওয়াদাকে
সত্যে পরিণত করেছেন। তিনি তাঁর বান্দাদের সাহায্য করেছেন এবং সমস্ত শত্রুবাহিনীকে
ধ্বংস করে দিয়েছেন। জেনে রেখো
; সমস্ত গর্ব-অহংকার, সমস্ত পুরনো হত্যা ও রক্তের বদলা এবং
তামাম রক্তমূল্য আমার পায়ের নীচে। কেবল কা
বার তত্ত্বাবধান এবং হাজীদের পানি সরবরাহ এর থেকে
ব্যতিক্রম। হে কুরাইশগণ! জাহিলী আভিজাত্য ও বংশ-মর্যাদার ওপর গর্ব প্রকাশকে অল্লাহ
নাকচ করে দিয়েছেন। সমস্ত মানুষ এক আদমের সন্তান আর আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে মাটি
থেকে।

অতঃপর তিনি কুরআন পাকের
নিম্নোক্ত আয়াত পাঠ করেনঃ

লোক সকল! আমি তোমাদেরকে একজন পুরুষ ও
একজন নারী থেকে পয়দা করেছি এবং তোমাদেরকে নানান গোত্র ও খান্দানে বিভক্ত করে
দিয়েছি
, যেনো তোমরা একে অপরকে
চিনতে পারো। কিন্তু খোদার কাছে সম্মানিত হচ্ছে সেই ব্যক্তি
, যে অধিকতর পরহেজগার। আল্লাহ মহাবিজ্ঞ
ও সর্বজ্ঞ।

এর সাথে অন্য কতিপয় জরুরী
মসলাও শিক্ষা দেন।

ইসলামের শ্রেষ্ঠতম বিজয়ী
তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ বিজয়ের পর যে ভাষণ দান করেন
, এই হচ্ছে তার নমুনা। এতে না আছে তাঁর
দুশমনদের বিরুদ্ধে জিঘাংসা
, না আছে
কোনো বিদ্বেষ। এতে না আছে তাঁর আপন কৃতিত্বের কোনো উল্লেখ আর না তাঁর আত্নোৎসর্গী
সহকর্মীদের কোনো প্রশংসা
, বরং
প্রশংসা যা কিছু
, তা
শুধু আল্লাহরই জন্যে আর যা কিছু ঘটেছে তা শুধু তাঁরই করুণার ফলমাত্র।৫১

আরব দেশে হত্যার প্রতিশোধ
গ্রহণের ওপর অত্যন্ত গুরুত্ব আরোপ করা হতো। বংশের কোনো ব্যক্তি কারো হাতে নিহত হলে
ঐ বংশের স্মরণীয় ঘটনাবলীর মধ্যে তা শামিল করা হতো
এমনকি ভবিষ্যত বংশধররা
পর্যন্ত হত্যাকারীর বংশ থেকে নিহত ব্যক্তিদের রক্তের বদলা না নিয়ে স্বস্তি লাভ করতো
না। তাই এ উপলক্ষে হযরত (স) এ ধরনের যাবতীয় রক্তের বদলাকে বাতিল করে দিলেন এবং বলা
যায়
, তিনি আরববাসীদেরকে
সত্যিকর অর্থে এক অনাবিল শান্তি ও স্বস্তিময় জীবন প্রদান করলেন। আরবে বংশ ও গোত্র
নিয়ে গৌরব করার এক বহু পুরনো ব্যাধি বর্তমান ছিলো। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষে
মানুষে এ ধরনের পার্থক্য সৃষ্টি সম্পূর্ণ অবৈধ। ইসলামে পার্থক্য সৃষ্টির একমাত্র
বৈধ মাপকাঠি হচ্ছে খোদায়ী বিধানের আনুগত্যের প্রশ্ন। যে ব্যক্তি আল্লাহর বিধানের
যতো অনুগত হবে
, তাঁর
সন্তোষ-অসন্তোষকে ভয় করবে
, সে
ততোই সম্ভ্রান্ত ও সম্মানিত বলে গণ্য হবে। ইসলামে বংশগত শরাফতের কোনে স্থান নেই।
বংশ বা খান্দানের সৃষ্টি কেবল পারস্পরিক পরিচয়ের জন্যে। আল্লাহর রাসূল তাই এই
ব্যাধিটিরও মূলোৎপাটন করে দিলেন এবং মানুষের জন্যে এমন এম সাম্যের বাণী ঘোষণা
করলেন
, আজ পর্যন্ত যা ইসলাম ছাড়া
অন্য কোনো ধর্মই মানুষকে দিতে পারে নি।

 

শত্রুর হৃদয় জয়

হযরত (স) যে জনসমাবেশে
ভাষণ দিচ্ছিলেন
, সেখানে
বড়ো বড়ো কুরাইশ নেতা
, উপস্থিত
ছিলো। যে সব ব্যক্তি ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করার জন্যে জীবন পণ করেছিলো
, সেখানে তারাও হাযির ছিলো। যাদের অকথ্য
উৎপীড়নে মুসলমানরা একদিন নিজেদের ঘর-বাড়ি পর্যন্ত ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলো
, তারাও সেখানে ছিলো। যারা হযরত (স)-কে
গালি-গালাজ করতো
, তাঁর
পথে কাঁটা বিছিয়ে রাখতো
, তাঁর
প্রতি প্রস্তর নিক্ষেপ করতো
, প্রতি মুহূর্ত তাঁকে হত্যা করার চিন্তা করতো, তারাও সেখানে উপস্থিত ছিলো। যে পাষণ্ড
হযরত (স) -এর আপন চাচার কলিজা বের করে চিবিয়েছিলো
, সেও সেখানে হাযির ছিলো। যারা এক খোদার
বন্দেগী করার অপরাধে বেশুমার মুসলমানকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছিলো
, তারাও সেখানে ছিলো। হযরত (স) এদের
সবার দিকে তাকালেন এবং জিজ্ঞেস করলেন:
বলো তো, আজ তোমাদের সঙ্গে আমি কিরূপ আচরণ করবো?’ হযরত (স) কিভাবে মক্কায়
পদার্পন করেছেন এবং এ পর্যন্ত কিরূপ ব্যবহার করেছেন
, লোকেরা তা গভীরভাবে লক্ষ্য করেছিলো।
তাই তারা সঙ্গে সঙ্গেই বলে উঠলো:

আপনি আমাদের সম্ভ্রান্ত ভ্রাতা ও
সম্ভান্ত- ভ্রাতুষ্পুত্র।

একথা শুনেই হযরত (স)
ঘোষণা করলেন:

যাও, আজ আর তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ
নেই
; তোমরা সবাই মুক্ত।

যারা মুসলমানদের
পরিত্যক্ত বাড়ি-ঘর দখল করে নিয়েছিলো
, হযরত (স) তাও তাদেরকে প্রত্যর্পন করার
ব্যবস্থা করলেন না
বরং
মুহাজিরদেরকে নিজেদের দাবি পরিত্যাগ করার উপদেশ দিলেন।

হযরত (স)-এর এই বিস্ময়কর
আচরণে মুগ্ধ হয়ে বড়ো বড়ো কুরাইশ নেতা তাঁর চরণে লুটিয়ে পড়লো। তারা
স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘোষণা করলো:
আপনি সত্যি আল্লাহর নবী, কোনো দেশজয়ী বাদশাহ নন। আপনি যে
দাওয়াত পেশ করেন
, তা ই
সত্য।

এই ছিল মক্কা বিজয়ের
দৃশ্য। এ